Skip to content

হ্রস্ব ই-দ, দীর্ঘ ঈ-দ: আনন্দ হোক অভিন্ন

  • by

ঈদ একটি ধর্মীয় প্রথা হিসেবে এদেশে এলেও সময়ের পরিক্রমায় তা পেয়েছে বহুমুখী মাত্রা (ডাইমেনশন)। কালক্রমে ঈদ পরিণত হয়েছে ধর্ম বর্ণের উর্দ্ধে একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উৎসবে। বিভিন্ন সময়ে ঈদ নিয়ে টুকরো টুকরো কিছু লেখা লিখেছিলাম। একেকটা বিশেষ সময়ের প্রেক্ষিতে। আজ মনে হল, সেই টুকরো টুকরো লেখাগুলোকে একটু জুড়ে দিই। তারই ফলশ্রূতিতে এই লেখা।

লেখাগুলো বিচ্ছিন্ন ও এলোমেলো। পড়তে গিয়ে অনেকটা ডায়রি লেখার মতো মনে হতে পারে।

এক; স্বপ্ন যাবে কি বাড়ি?

”আজ ঈদ, মদীনার ঘরে ঘরে আনন্দ”-বাংলাদেশে বোধহয় এমন মানুষ খুব কমই আছেন, যারা এই গল্পটি পড়েননি। এই গল্পটার পুরোটা মনে নেই। শুধু মনে পড়ে, ঘটনাটি হাযরাত মুহাম্মাদ সাঃ এর জীবনের একটি ঘটনা। নবীজি ইদের দিন রাস্তায় বসে কাঁদতে থাকা একটি ইয়াতিম ছেলেকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাকে যথাসম্ভব যত্ন করেছিলেন এবং হযরাত ফাতিমা রাঃ এর কাছে তাকে সমর্পন করেছিলেন।

হয়তো আগামী ৫ জুন তারিখে ঈদ, বা ৬ এ। ঢাকাবাসীর ঢাকা ছাড়া শুরু হয়েছে। আগামী ৪/৫ দিন টিভি নিউজে শীর্ষে থাকবে বিভিন্ন টারমিনালের লাইভ, মানুষের ভীড়।ওদিকে বাংলাদেশের দূর কোনো গাঁয়ে কোনো এক মায়ের, কোনো এক বোনের, কোনো এক প্রিয়তমার চোখের কোণে প্রতিক্ষার কিংবা আনন্দের অশ্রু অধীর।……………………..ঈদ যাত্রা, ফেলে আসা গ্রাম, মা জননী, বাড়ি, মেঠো পথ, ঘাসের গালিচা, ধান ক্ষেতের বাতাস, সোঁদা গন্ধ-এসবের টান মাথায় নিয়ে টিভিতে বারবার “স্বপ্ন’র গৃহ যাত্রা” শূন্য চোখে দেখা সম্ভব নয় বিধায় আগামী ১১ জুন তক বাংলা টিভিকে আল বিদা। স্বেচ্ছা নির্বাসন আমার। টিভি হতে, জনারণ্য হতে, বাড়ি হতে, ভীড় হতে, সামাজিকতার বেড়ি হতে।

ইদে সবারই স্বপ্ন বাড়িতে যাওয়া। সেটা হতে পারে দূর কোনো গাঁয়ে। হতে পারে মনের গহীনে ডুব মেরে থাকা কোনো স্বেচ্ছা নির্বাসনের ঘরেও।স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার।সব স্বপ্নের হয় না বাড়ি ঘর।কাউকে স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে কারো স্বপ্ন বাড়ি যায়না আর।

দুই; শৈশবের ঈদ:

ঈদ বা ঈদ নিয়ে আমাদের একটি বয়সভিত্তিক গ্রূপে (SSC 96 HSC 98) একটা লেখার আয়োজন হয়েছিল। এমন একটা সময়ে, যখন মস্তিষ্ক আলোড়ন করেও কোনো লেখা বের করতে পারছিলাম না। তারপর মনে হল, ঈদ নিয়ে যেকোনো বাঙাল শিশুর গড়পড়তা কিছু চিরাচরিত স্মৃতি তো আমারও আছে, সেটাই স্মৃতিচারন করি না! নতুন পোষাক, সেমাই, টোঁ টোঁ করে ঘোরা, দলবেঁধে ২০-২৫ টা বাচ্চা একেক বাসায় যাওয়া-একই। ইদে এখন কী কী মিস করি?

১.তখনকার মফস্বল বাগেরহাটে রেডিমেড পোষাক ছিল না। বাসায় দর্জি আসতেন। সবার মাপ নিয়ে যেতেন। তারপর একদিন মা সাথে করে বাজারে নিয়ে ছিট কাপড় পছন্দ করে দর্জিকে দিয়ে আসতেন। ইদের দিন সকাল তক যক্ষের ধনের মতো সেই কাপড়ের রহস্য গোপন রাখা হত।

২.কলোনীর ৫০ টার মতো বাচ্চাকাচ্চা। সবার জন্য একদিন একজন নাপিত আসত। সে এসে সবার চুল একই কাটে কেটে দিত। সেই কাটের নাম বাটিছাট। ইদের দিন কলোনীর সব বাচ্চার মাথায় বাটিছাট চুল।

৩.তখনকার মফস্বলে ইদের খাবার বলতে সস্তা চালের পোলাও আর ইন্ডিয়ান গরুর ঝাল মাংস পদ। আর মোটা মোটা সেমাই। সেটাই খাবার জন্য সারাবছর আমরা বসে থাকতাম। আমার মনে পড়ে, আমার আম্মা পোলাও না করে মোটা চাল দিয়ে দুই তিন পদ ডালের খিচুড়ি করতেন। বাচ্চারা পোলাওয়ে বিরক্ত হয়ে সব দল বেঁধে সবার আগে আমাদের বাসায় দুপুরে খেত। ভেবে দেখো, ৩০-৪০ টা বাচ্চা একসাথে দুপুরের খাবার খাচ্ছে। চিৎকার, হুড়োহুড়ি।

৪.এখনকার মতো ট্যাব বা ফেসবুক তো হয়নি। রাতে সব বাচ্চারা একসাথে মাঠে বসে গল্পের আসর বসত। মফস্বলের ঈদ ছিল একটিই দিন।

৫.সালামী জিনিসটা মফস্বল বাগেরহাটে তেমন ছিল না। বিশেষত নিম্ন মধ্যবিত্ত আমাদের পরিবারগুলোতে সালামী খুব দেয়া বা নেয়াও হত না। দুই এক টাকা যাও পকেটে আসত, সেটাও মা’র হেফাজতে চলে যেত। আমার যতটা মনে আছে, একবার এক চাচা ৫ টাকা করে আমাদের সব বাচ্চাদের দিয়েছিলেন। সেটাই মনে হয় সবচেয়ে বড় অঙ্ক ছিল। আজকালের ডিজিটাল যামানায় এই সালামীটা এত বড় আকারে টিকে আছে, তার কারন বোধহয় সালামীর টাকার ঝনঝনানিটা।

৬.পাতলা একরকম রঙীন কাগজ পাওয়া যেত তখনকার দিনে। সেই কাগজ ভাজ করে নানান প্যাটার্নে কেটে ঝালর বানানো হত। সেই ঝালর দিয়ে নানাভাবে ঘর ও দরোজা সাজানো হত। বাজার হতে কিনে আনার মতো পয়সা তখনকার বাচ্চাদের না থাকায় একরকম রাংতা কাগজ কেটে ঈদ মোবারক লেখা হত। সেটা দরোজার ওপর সাটানো থাকত। কার লেখা কতটা নতুনত্ব থাকে-তা নিয়ে প্রতিযোগীতা হত। আমার মনে আছে, একবার আমার বড় ভাই কীভাবে কীভাবে যেন রঙিন কাগজ মুড়িয়ে তা দিয়ে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সাদা আর্টবোর্ডে একটা একটা অক্ষর বসিয়ে কীভাবে যেন নতুন কায়দায় একটা ঈদমোবারক বোর্ড বানিয়ে ফেলল। ব্যাস। তার পরের বছর পুরো কলোনীর ৫০ টা বাসায় সবার সেই ঈদমোবারক বোর্ড চাই। বড়ভাই রাতারাতি হিট।আর মিস করি সেই সময়কার আন্তরিকতা, ঐক্য, সামাজিক হৃদ্যতা। আজকাল ঈদ আছে, উৎসব আছে, ফূর্তি আছে, প্রাণটা নেই।

তিন; মানবিকতার ঈদ:

আচ্ছা, জানেন কি, ইদের বাজারের ভীড় কি শুরু হয়ে গেছে? কী জানি, হয়তো হয়েছে। প্রতি ইদে বাঙালী হিসেবে যেকোনো প্রকারেই হোক, একটা বড় বাজেট আমরা খরচ করি নতুন পোষাক কেনা এবং উৎসবের খানাপিনাসহ নানা আয়োজনে। সবচেয়ে দরিদ্র লোকটিও এই উৎসবে চেষ্টা করে প্রিয়জনকে যাহোক কিছু একটা দিতে। ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোর মার্কেট ও শপিং মলগুলো এখন সরগরম। আপনিও নিশ্চই দিন গুনছেন। বাসায় হয়তো অসন্তোষ, আজও গেলেন না, আর কবে যাবেন। বাচ্চারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কবে বাবা কিংবা বাবা-মা তাদের নিয়ে শপিংয়ে যাবেন।

যেভাবেই দেখি, এই ধর্মীয় পার্বণের সাথে আমাদের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া জড়িয়ে গেছে যুগে যুগে। ভালই লাগে। নিজের মানুষদের কিছু না কিছু দিতে। হ্যা, পেতেও।

এই দেয়া থোয়ার ভিতরেই, আরেকটু কাজ কি করবেন, এই ইদে আপনার কাছে যদি বাড়তি বাজেট থাকে, কিংবা যদি বাজেটটাকে সামান্য সমন্বয় করার সুযোগ থাকে?

-ঢাকার অন্তত ১০ লক্ষ পরিবার শপিং করবে। প্রত্যেক পরিবার একটি পথশিশুর জন্য ১৫০ টাকায় ফুটপাত হতে একটি জামা বা ফ্রক কিনে দিলেও ১০ লক্ষ পথশিশু (অত শিশু নেইই) ইদের জামা পাবে।

-অন্তত ৫ লক্ষ পরিবার ঢাকায় ঈদ করবে। ঢাকা ও আশপাশে অন্তত ৫০ টি বৃদ্ধাশ্রম আছে। এই ৫ লক্ষ পরিবার হতে মাত্র ১,০০০ পরিবার যদি ইদের দিন ২ জন করে বৃদ্ধ বৃদ্ধাকে সেমাই খাওয়াতে চায়, সমস্ত বৃদ্ধাশ্রমে ইদের সেমাই খাওয়ানো খুব সম্ভব।

-আজ ১০ রোজা। আর আছে ১৯-২০ টি। এই ১৯-২০ দিন আমরা যতগুলো রিকশায় চড়ব, প্রত্যেকবার ১ টাকা করে বাড়তি ভাড়া দেব। প্রতিদিন ঢাকায় রিকশা ট্রিপ হয় অন্তত ২ লক্ষ রিকশাওলার ৫০ টি করে। প্রতিবার ১ টাকা বাড়তি পেলে দিনে পাবে ৫০ টাকা বাড়তি। তাতে ২০ দিনে ১,০০০ টাকা। তার পরিবারের ঈদ আনন্দ কেনার জন্য যথেষ্ট।

-পিওন, ক্লিনার, ড্রাইভার, বাসার দারোয়ান যে সারাবছর আপনাকে সেবা দেয়, ১৩০ টাকার একটি বাজেট রাখা যাবে তাদের জন্য? এপারটমেন্টে ১০ টি পরিবার। ১৩০ টাকা করে দিলে ১,৩০০ টাকায় তার ঈদ দারুন হয়ে যাবে।

-বহু বছর হয়তো রাগ করে, অভিমান করে মা-বাবার কাছে যান না। এই ইদে ভেঙে ফেলুন সেই অভিমান। হঠাৎ করে গিয়ে হাজির হোন ইদের দিন।

-অামাদের জানার বাইরে আরেকটা জগত আছে। ইদের মতো দিনেও কিছু মানুষ আছেন যারা নিঃসঙ্গ দিন কাটান। একটু কান পাতলেই তাদের দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাবেন। তাদের কাছে ডেকে নিতে পারেন।

-আপনার কাছাকাছি কোনো কবরস্থান থাকবেই। এই জাতীয় খুশির দিনে তাদের খুশি করবেন না? চলুন, কবরস্থানে যাই, দোয়া করি তাদের জন্য। ঘরে বসেও করা যায়, কিন্তু সেখানে গেলে আপনার লাভ বেশি।

চার; রাস্তায় ফুরোনো ঈদ:

গত পরশু রাতে সারা বছর যাই-একটা নিয়মিত দোকানে নিটোল আর আমি ইদের আগে শেষ দেখা করতে গেলাম। দোকানের সবার সাথে খুবই ভাল সম্পর্ক আমাদের। দুটো ছেলে, সেলসম্যান। ইদে পার্ট টাইমার। কাজ করে কিছু টাকা আয় করে বাড়িতে যাবে। পরিবারের জন্য কেনাকাটা করার টাকা। সারা মাস কাজ করেছে। রাত গভীর অব্দি। রোজার মধ্যে বেশ কবার দেখা হয়েছে। ওইদিন রাতেও ওদের দুজনের সাথে কথা হল। ক্যারিয়ার নিয়ে। গতকাল চান রাতে রাত দুটোয় দোকানের ডিউটি শেষ করে বাস ধরেছিল। বাড়ির কাছাকাছি পৌছেও গিয়েছিল। ফরিদপুরে গতকাল রাতের বাস দুর্ঘটনায় ওদের একজন ওখানেই মারা গেছে। আরেকজন হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি।পরিবারের সবার জন্য কেনা পোষাকের ব্যাগটা পাশেই পড়ে ছিল।

কী হবে এসব ঈদ দিয়ে। আনন্দ আড্ডা দিয়ে।

ফেসবুকে ফালতু বিষয় নিয়ে মাতামাতি করে?

 বাংলাদেশের দূর গাঁয়ে মায়ের, বোনের, কোনো এক প্রিয়তমার চোখের কোণে প্রতিক্ষার অশ্রু আর শুকাবে না। একজন বাবার নতুন সাদা পাঞ্জাবী পরা হবে না। শুধু পরা হবে তার সন্তানের।

সাদা কাফন।…………………….. ঘরে আর ফিরবে না প্রিয় মুখটি। পরিবারের জন্য দায়ীত্ব নেয়া ছেলেটি। ………………………….

ঈদ কারো জন্য অপার আনন্দ দান।

কারো হয়তো শুকনো ব্যথার লুকোনো নদীতে হঠাৎ অশ্রূ বান।

#eidcelebration #festival #benevolent #philanthropy #socialwork #emotion

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *