Skip to content

রোজার মাসের বিশেষ পুনশ্চ

  • by

রামাদ্বন এবং আমাদের মৌসুমী খাসলত:

বাসার অতি জরুরী কাঁচামরিচ, টয়লেট পেপার, ঝাড়ু আর বউয়ের আবদারের শুঁটকী কিনতে তাকে নিয়ে অফিস ফেরত আমি রাতে বাজারে গিয়েছি। গার্মেন্টসের কর্মী। ব্যক্তিগত সময় কম হওয়ায় এরকম দুরদার করেই বাজারঘাট করতে হয়। ঠেকায় পড়েই যাওয়া। কিন্তু রাত ৯টায় বাজারে গিয়ে মনে হল সুপার পিক আওয়ার। মিরপুরের সমস্ত মানুষ (আমার ধারনা মিরপুরেই ঢাকার অন্তত ৫০ লাখ মানুষ থাকে) এই রাতে বাজারে। মনে পড়ল রামাদ্বন (বাংলায় আমরা কী এক অদ্ভূত কারনে রমজান/রোজা বলে থাকি) সমাগত। মানুষের উদভ্রান্ত চাহুনি, ইতস্তত দামাদামী, ৪-৫টা করে পেটমোটা ব্যাগ, যুদ্ধংদেহী মনোভাব, ক্রেজি কথাবার্তা, অস্থির দৌড়াদৌড়ি-সব দেখে মনে পড়লো কাল বা পড়শু সংযমের (!!!!) মাস শুরু হবে।  নয়া সংযমীদের অত্যাচারে আমার মরিচ কেনা লাটে উঠল।

মানুষের কেনাকাটার ব্যকুলতা দেখে অবশ্য সংযমের ব্যপারটা বিশ্বাস হল না। মনে হচ্ছিল এক দানবীয় সর্বগ্রাসী ক্ষুধার মাস শুরু হতে যাচ্ছে। সবাই তাই যতটা সম্ভব খাদ্যপণ্য নিজের নিজের করায়ত্ব করার উলঙ্গ কাড়াকাড়ি করতে বাজারে আসছে। শৈশব হতেই কখনো আমার বুঝে আসেনি, কেন রোজা এলে আমরা মানুষেরা কেনাকাটা কমানোর বদলে, খাওয়া কমানোর বদলে তা উল্টা অশ্বগতিতে বাড়াতে থাকি। রোজা যদি উপোসের মাস হয় তাহলে খাবার কুক্ষিগত করে রাখার এই নির্লজ্ব প্রতিযোগীতা কেন?

আমার যতটা মনে পড়ে নবীজির কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.) ক্রমাগত পানি খেয়ে খেয়ে রোজা রাখতেন আর পানি দিয়ে ইফতার করতেন। ধর্ম পালনে তারাইতো আমাদের আইকন তাইনা? তাহলে আমরা এটা কি করছি? কেন?খাওয়াটাই যদি মচ্ছব হয় তবে তা ধর্মের নামে কেন? দয়া করে আমাদের ধর্মকে রেহাই দিন। ধর্মকে ধর্মই রাখুন। খাওয়ার উদ্দেশ্য থাকলে অন্য নাম দিয়ে খান। আর সারা বছর খান। তাতে অন্তত আমাদের মতো গার্মেন্টস কর্মীদের অতি জরুরী তেল, নুন, আকিজ বিড়ি কেনার সুযোগটা বাধাগ্রস্থ হয় না। রামাদ্বন আসলেই জিনিসপত্রের দাম ব্যবসায়ীরা আকাশছোঁয়া করে ফেলায় যারা যারপরনাই ক্ষুদ্ধ, তারা একটা বিপরীত দিক নিয়ে ভাবতে পারেন। রামাদ্বন (বাংলায় আমরা নব্য বিশেষজ্ঞগন রমজান বলি) আসলে যেখানে সংযমী হবার কথা, সেখানে কেন আপনার আমার খাওয়ার পরিমান বেড়ে যায়?

চাহিদা বাড়লে দাম বাড়বে-এটাই তো অর্থনীতির মূল আদি নীতি। বাংলাদেশে কি সেটার বিপরীত হওয়া সম্ভব? পিয়াজু, ঘুগনি, কাবাব, হালিম, মুড়ি, ছোলা, জুস, শরবত, খেজুর, বড় বাপের মাইয়ায় খায়. মগজ, রোস্ট, চপ, চাপ, রেজালা, বিফ, মাটন, চিকেন, ফালুদা, দইবড়া, কাস্টার্ড, ফল, মুল-এর কোনটা কোনটা আমাদের নবিজী সা. এর ইফতারে থাকত?

দাম বৃদ্ধি নিয়ে আহাজারি ও তার বিপরীতে আমাদের খাই খাই স্বভাবের উল্লম্ফন নিয়ে নিরব নীতি দেখে একটা গল্প মনে পড়ে যায়।

এক কঞ্জুস আখ খাবে, কিন্তু নিজের পয়সায় না। সে কী করল, একজন আখ খেতে খেতে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। তার পিছু পিছু যাচ্ছে, আর সে আখ খেয়ে যে ছোবড়া ফেলে দিচ্ছে, সেটা চুষে চুষে রস আস্বাদনের চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ যাবার পরে ওই কঞ্জুস বলছে, ”শালা একটা কঞ্জুস। ছোবড়ায় একটু রসও রাখে না।”

ইফতার পার্টি নামক একটা অদ্ভুৎ রোগ বছরের এই মাসে সংক্রামিত হয়ে পড়ে এদেশে। এই রোগে সাধারণত প্রকৃত ধর্মপ্রাণ রোজাদাররা আক্রান্ত হন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অরোজাদার, সারাবছরের বেনামাজী, রাজনীতিক, রাজনীতিক দল, উঠতি সুযোগসন্ধানী নেতা, কর্পোরেট দাস, পয়সাপ্রেমী বণিক-এরাই বেশী এই রোগে আক্রান্ত হন। তাই যদি আপনি এ্রই রোগ হতে বাঁচতে চান এবং আল্লাহকে খুশি করতে চান তাহলে প্রকৃত রোজা রাখতে পারেন।

সিয়াম সাধনার সামাজিক দায়বদ্ধতা:

সংযম ও সিয়ামের মাস প্রায় সমাপ্তির পথে। মনের আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে স্রষ্টার বন্দেগী পালনের মধ্য দিয়ে আমরা সকলেই রহমত, মাগফিরাত, নাজাত-তিন বরকতের সন্ধানে অতিবাহিত করছি। প্রতিটি ধর্মীয় অনুশাসনের অবশ্যই যেমন কিছু ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য থাকে তেমনি একইসাথে রয়েছে এর আর্থ-সামাজিক দ্যোতনা। ইসলাম একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আত্মিকতা নির্ভর ধর্ম বিশ্বাস। এর যাবতীয় মৌলিক ভিত্তির অন্যতম হল বিশ্বাস ও একনিষ্ঠতা।

আমার সীমিত ধর্ম জ্ঞানে আমি যতটুকু জানি, কোনো ধর্মীয় অনুশাসন পালন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ’র সন্তুষ্টি ব্যতিত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে করা হলে তা কবুল বা গৃহিত হয় না। আমরা পবিত্র রোজার মাসে যতরকম ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করছি তার মূল উদ্দেশ্য কী তা অবশ্যই ভেবে নেব প্রথমেই। পবিত্র রোজা মুসলিমদের উপর ফরয হিসেবে প্রদানের অন্যতম একটি স্যোশাল আসপেক্ট হল দারিদ্র বিমোচন। রোজা সংক্রান্ত বিধানাবলির আলোচনায় রমজানে সংযম সাধনের মধ্য দিয়ে যে অর্থ সাশ্রয় হবে তা দরিদ্রদের সাহায্যার্থে ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে।

এই রমজানেই রয়েছে ফিতরা দেবার মতো বিধান যার উদ্দেশ্য হল গরীবের সহায়তা। মনে রাখতে হবে রমজান হল সংযম সাধনার মাস। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হল এই মাসে এসেই আমরা যেন সম্পূর্ণ বিপরীতক্রমে আমাদের কনজুমার কনজাম্পশন বিশেষত খাওয়া দাওয়া আরো বহুগুণে বাড়িয়ে দিই। যাহোক, ধর্মীয় জ্ঞানদান আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য হল আমরা আমাদের বিশ্বাস, কর্মকান্ড, সিয়াম সাধন, কৃচ্ছতা সাধনকে যেন মুলস্রোতের দিকে ধাবিত করতে পারি।

আমরা এবার ঈদে নিশ্চই নিজের জামা, জুতা, বাবার সাদা পাঞ্জাবী, বোনের সালোয়ার-কামিজ, ভাইয়ের জন্য নতুন প্যান্ট, স্ত্রীর নতুন ফ্যাশনের শাড়ি কিনব।

অপরিসীম কষ্ট স্বীকার করে দূর-দূরান্তে আমাদের আপনজনদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ছুটে যাব গ্রামে। সবার হাতে সাধ্যমতো একটি ছোট্ট উপহার তুলে দিয়ে চাইব হাসি ফুটাতে। ঈদের চাঁদ দেখে খুশিতে আত্নহারা হব। মোবাইলে এসএমএস এর কর্পোরেট ঈদ শুভেচ্ছা, নানান মিষ্টি-পায়েসে ঈদ উদযাপন করব।কিন্তু এই ঈদেও এই বাংলার লক্ষ লক্ষ শিশু সারাদিন ভুখা থাকবে, রাতে কারওয়ান বাজার, কমলাপুরের ফুটপাতে টুকরীতে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাবে।

এই ঈদে প্যালেস্টাইনের ৩০০ জন নিহত হতভাগার মা তার সন্তানকে ছাড়া, শিশুটি তার মা’কে ছাড়া, স্ত্রী তার স্বামীকে ছাড়া ঈদ করবে (করতে বাধ্য হবে বলা ভাল)। এই ঈদেও সেলাই শ্রমিক বোনটি তার সমস্ত মাসের রোজগারের শেষ পয়সাটি দিয়ে বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা, অসুস্থ মা, ৭ বছরের বোন ফুলি, পাশের বাড়ির অশিতিপর বিধবা নানীর জন্য একটি অতি সস্তার শাড়ি কিনে নেবে। তার নিজের জন্য কিছুই হয়তো কেনা হবে না।

অবস্থাপন্ন বাড়ির ছোট বাচ্চারা যখন নতুন জামা জুতা পড়ে বাবার হাত ধরে ঈদের মাঠে যাবার প্রস্তুতি নেবে তখন রাস্তার শিশুটি মায়ের সাথে ঈদের মসজিদে ভিক্ষায় যাবার থলেটি খুঁজে নেবে।বড়জোর ছিন্নমুল শিশুটির মা তার গতবারের যাকাতের পাওয়া শাড়িটি কেটে হাতে সেলাই করে একটি জামা তার প্রিয় সন্তানের জন্য বানিয়ে দেবেন যেটা হবে তার অসাধারন ঈদ গিফট যেটি হাতে পেয়ে তার মুখে ফুটে উঠবে একচিলতে স্বর্গীয় হাসি।

কারো বাড়ির একবাটি টকে যাওয়া বাসি সেমাই পরদিন মা তার সন্তানের জন্য কারো বাড়ি থেকে দান পেয়ে আঁচলে জড়িয়ে নিয়ে আসবেন।তার আদরের সাত রাজার ধন পরম তৃপ্তিতে খাবে সেই এটো বাসি সেমাই। এই স্বর্গীয় হাসিটি কি আমরা ফুটাতে পারি না?

আমাদের ঈদের বাজেটে একটি একশো টাকা দামের লাল শার্ট কি রাস্তার শিশুটির জন্য রাখতে পারি না? আমাদের কয়েক লক্ষ (হয়তো বা এক কোটি) লোক অতি দরিদ্র যাদের কাছে রোজার উপবাস কোনো নতুনত্ব বহন করে না, ঈদের চাঁদের বিলাসিতা বাড়তি কোনো দ্যোতনা সৃষ্টি করে না।আমরা কি সবাই একটি করে শিশুর দায়ীত্ব নিতে পারি না? আমাদের সন্তানদের স্থানে তাদের কল্পনা করতে পারি না? বাকি রমজানগুলোর অন্তত একটিতে একজন বৃদ্ধ দুস্থকে ইফতার করাতে পারি না? বাসার কর্পোরেট ইফতার পার্টির অন্তত একটি কাটছাট করে একটি দিন কোনো এতিমখানা বা বৃদ্ধাশ্রমের ভাগ্যহীনদের সাথে ইফতারের আনন্দ ভাগাভাগী করতে?

রমজান তার সত্যিকার মহিমা নিয়ে উদ্ভাসিত হোক আমাদের জীবনে। তা যেন শুধু ভোগ-বিলাসিতা আর ইবাদত পালনের রোসম-রেওয়াজে পর্যবসিত না হয়।পরম করুণাময়ের অন্যতম মৌলিক অনুশাসন যেন আমরা না ভুলি-হক্কুল্লাহ ও হক্কুল এবাদ।

স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার:

আরেকটা ঈদ বাড়ির দরজায়। মনে আছে একবার, তখন মহসীন হলে থাকি। রোজার ঈদের কয়েকদিন বাকি। সবাই বাক্স পেটরা ভরছে। সেবার আমি বাড়িতে যাইনি। যাইনি না বলে বলা ভাল যেতে পারিনি। না, পড়ার বা পরীক্ষার চাপ না (সেটা আমার এই জীবনে কখনো ছিল না)। বাড়ি যাবার পয়সা ছিল না। মা’র জন্য, বাবার জন্য কিছু কেনা হয়নি। নিজের ওপর অভিমানেই যাইনি। মনে আছে সারাটা চাঁদরাত অসহ্য কষ্টে ঘুমাতে পারিনি। পরদিন ঢাকার এককোটি লোক যখন ঈদ আনন্দে ব্যস্ত, আমি ইউনির্ভাসিটি পড়ুয়া বাবা-মা’র আপাত বেকার সন্তান পথে পথে হেটে ঢাকার কর্কষ নাগরিক সৌন্দর্য আর চাকচিক্যময় ঈদ উদযাপন দেখেছি।

আমার মা জননী নিশ্চই ছেলেকে রেখে ঈদের সেমাই খান নি। অনেকে ভাবতে পারেন সামান্য বাসভাড়াটাও ছিল না-এ কেমন কথা? যারা গ্রামের অবস্থাপন্ন পরিবার হতে এই ঢাকা শহরে এসেছেন বা ঢাকার চকচকে বুকে আগে থেকেই মানুষ, তারা ভাবতেও পারনেন না গ্রামের সাধারণ একটা ভাত-ভর্তা নির্ভর পরিবারের ছেলেমেয়েরা কিভাবে তাদের সর্বস্বের বিনিময়ে, তাদের বাবা-মায়েরা কিভাবে তাদের জীবন পানি করে সন্তানদের ঢাকায় পাঠান সন্তানের ভবিষ্যতটা অন্তত আলোকিত করতে।

তখনো মোবাইল, ইন্টারনেট এত সস্তা হয়নি। অনেক কায়দা কসরত করে ফোনে কথা বলতে হত। মা’কে শুধু বললাম বাড়ি যাব না, পরীক্ষা পড়া আছে (!!)।

”ও! ঠিক আছে বাবা” (মা’কে কিছু সান্তনা দেব সে উপায়ও নেই কারন বেশীক্ষণ কথা বলা যেত না মোবাইলে বিল ওঠার ভয়ে)।

আমার শান্ত, নির্বিবাদী মা মেনে নেন। মা, ক্ষমা করে দিও। প্রতিবার ঈদে যখনি বাড়িতে যাই তখনি সেই ঈদটার কথা মনে পড়ে। আসলে আমরা কেন বাড়িতে যাই? প্রাণের টানে? শিকড়ের টানে? রক্তের আকর্ষণে নাকি হৃদয়ের দুর্নিবার আবেগে?

ঢাকা হতে সাড়ে তিনশো কিলোমিটার দুরে বাগেরহাটে যেতে প্রতি ঈদে শক্তি, ধৈর্য আর সহ্যের চরম পরীক্ষা দিতে হয়। তবুও এইযে মানুষগুলো ছোটে বাড়ির পানে, কাউকে কি দেখেছেন বিন্দুমাত্র ক্লান্ত, বিরক্ত হতে?

গ্রামীনের বিজ্ঞাপনটা যতবার দেখি ততবার চোখ ভিজে ওঠে, আজও। শিকড়ের টান কখনো ভোলা কি যায়? ঈদে বাড়ি যাবার আবেগকে নিয়ে এত হৃদয় নাড়া দেয়া সৃষ্টি আর হয় না।

#Ramadan #frugality #restraint #social #eidcelebration #mother #sacrifice #restrain #shopping #market

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *