সুনয়না,
রোজকার মতো আজও বুড়ো শরীরটাকে টেনেটুনে বিছানা থেকে তুলে রেডি করে অফিস যাচ্ছি।
মন আর বাস্তবতা যেখানে পরস্পরের শতভাগ বিপরীত, তার নাম জীবিকা। বসন্ত বোধহয় এসে গেছে। কিংবা হয়তো আরো আগেই এসেছে। আমি রাখিনি তার খোঁজ।
পুরোনো স্মার্টফোনটার স্ক্রীন বহু আগে ঝাপসা হয়ে গেছে বহু ব্যবহারে। তোমার স্মৃতির মতোই। সেটাতে নজর ডুবিয়ে ফেসবুক ও আরো অন্যান্য সামাজিক নামের অসমাজিক মাধ্যম স্ক্রল করছিলাম।
হঠাৎ একটা নুলো ভিকিরি গাড়ির কাঁচে নক করায় ফোন হতে দৃষ্টি তুলে জানালার বাইরে চোখ পড়ল। ভাগ্যিস নক করেছিল। তা না হলে বসন্তের অন্তত লক্ষনটুকু দেখা হতে বঞ্চিত হতাম। কী যে নধর কান্তি হয়েছে বিজয় স্মরনি আর ক্রিসেন্ট লেকের পাড়ের গাছগুলো। যেন বয়স কমে গেছে আশি বছর।
নিজেকে কখনো কখনো গাছেদের চেয়েও দুর্ভাগা মনে হয়। গাছেরাও এমনকি নিজেকে বদলাতে পারে, প্রকৃতিও তাদের বদলাতে ব্যস্ত। শুধু আমারই কোনো পরিবর্তন নেই। আমি এই জড় পৃথিবীতে শিকড় বাকড় গজিয়ে থিতু হয়ে বসে শুধু শতাব্দীর পর শতাব্দী অতীতকে নিয়ে রক্তাক্ত হব। বারবার নতুনের আশায় পুরোনো আমিকেই আবার ফিরে পাব। আবার আবার আবার আবার। মানব জনম ক্লীব জড়তার নামান্তর।
সুনয়না, কাল তোমাকে ক্ষনিকের আবেগে লেখা একটা হঠাৎ চিঠি ফাঁস হয়ে গিয়ে মানুষের বেশ বাহবা কুড়িয়েছে। সবাই এটাকে বসন্ত নিয়ে একজন পতিত কবির মন্দ্রীভূত আবেগ হিসেবে নিয়েছে, এই যা বাঁচোয়া। ফাঁকে দিয়ে আমার উন্মুক্ত হয়ে পড়া রুদ্ধ আবেগটা (তোমায় নিয়ে) কেউ খেয়ালও করেনি।
আসলে সুনয়না, কেউ খেয়াল করেও না। সবাই শুধু রঙীন অংশটাই দেখে। প্রদীপের গোড়ার অন্ধকারটুকু প্রদীপ সারাজীবনই মিস করে।
জানো সুনয়না,
আজ অফিস যাবার পথে আমাদের ফুটপাতে হঠাৎ একজনকে তুমি বলে ভুল করে পিছন থেকে ডেকে বসেছিলাম। কম বয়েসী মেয়েটা যখন ঘুরে তাকিয়ে দেখল, ক্ষণিকের জন্য সে কি বিব্রত হয়েছিলাম আমি তা আর কী বলব। আমারই ভুল।
ভুল ভাঙতে সময়ও নেয়নি। যদিও কিছু কিছু ভুল কখনো ভাঙে না। ঠিক যেমনটা তোমার সাথে প্রথম দেখার দিনের ভুল।
কী হাসতে শুরু করলে নাতো?
সেই স্মৃতি মনে করে? মনে পড়ে? তখনো মোবাইল অতটা সহজলভ্য হয়নি। আমার মতো লজিং তথা টিউশনি মাস্টারের কাছে তো নয়ই।
কথা ছিল তুমি বাসন্তি একটা শাড়ি পড়ে হাতে নীল চুড়ি পরে আসবে। ক্রিসেন্ট লেকের ওই কোণাটায় দাড়াবে। ঠিক ৫ টায়। আমি ৫ টায়ই এসেছিলাম। তুমি পারোনি। তুমি অবশ্য কখনোই আমাকে হারাতে পারতে না।
যাহোক, তোমার দেরী হয়েছিল। মা তোমাকে সহজে ছাড়েননি বলে। কিন্তু আমি হলুদ শাড়ি পড়া আরেকজনকে সুনয়না বলে গুলিয়ে ফেলেছিলাম। তারপর কত কান্ড…………….এই কান্ডের মাঝখানে তোমার পদার্পন।
তুমি সারাজীবন আমাকে সেই ভুলের জন্য বকে গেছ। “হাদারাম কোথাকার? হলুদ আর বাসন্তির তফাৎটাও বোঝোনি?”
সত্যিই সুনয়না, আমি আজও অনেক কিছুর পার্থক্য করতে শিখিনি। যেমনটা শিখিনি, প্রেম ও বিরহের তফাৎ করতে, সুখের অসুখকে দুঃখের সাথে মিলাতে। আর হ্যা, জীবনের সব ভুল এক হয় না। সব ভুলের পরিণতিও এক না। কোনো কোনো ভুল সত্যিই বড্ড ভুল পথে নিয়ে যায় জীবনকে। সে কথা না হয় আরেকদিন।
অফিস এসে পড়েছি। অনেকক্ষণ আগেই। কীপ্যাডে চোখ থাকায় খেয়ালই হয়নি। হবেই বা কেন? খেয়াল করে চলার মানুষ হলে কত কিছুই তো জীবনটাকে আজ অন্যরকম করে দিতে পারত।
#Sunayona #letter #season #spring #estrangement