Skip to content

পথের বাপই বাপরে মনা, পথের মা ই মা

  • by

আমি মানুষটা দ্বিচারী বলতে পারেন। দুনিয়াদারী দেখতে মন চায়। আবার রাস্তায় নামলে দশ পা পেছাই। ঘরের কোণে নরম বিছানার আরামও মিস করতে মন চায় না। ঘুরতে পছন্দ করি। কিন্তু সেটা প্রথাবদ্ধ টুরিষ্ট স্পটগুলোতে না। আমার ভাল লাগে অগ্যস্ত ঘুরতে। যেখানে কেউ যায় না, যেটার সেলফী মূল্য নেই সেখানে যেতে।

জানেন, আমি আমার বাসার আশপাশের গলিগুলো দেখতেও মাঝে মধ্যে বের হই? বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে ভূতের গলি সত্যিই আছে কিনা, দেখতে সেন্ট্রাল রোডে ঘুরে বেরিয়েছি। ঢাকার রাস্তায় অগ্যস্ত হাঁটতে আমার প্রচন্ড ভাল লাগে। আমার ব্যস্ত চাকরী জীবনের পরেও ছুটির দিনে রোদের মধ্যে টো টো করে ঘুরি। কোনো লক্ষ্য ছাড়া।

মানুষ দেখতে, দোকানপাট, মানুষের ব্যস্ততা, জীবন জগত, হাসি, অভাব, প্রণয়, রাস্তাঘাট, পার্কের বেঞ্চ-এসব দেখতে ভাল লাগে। পাগলামীও বলতে পারেন। আমার সহধর্মীনি নিটোল আমাকে পাগলই বলে।

একবার কী হয়েছে বলি। টিউশনি শেষ করে দুপুর ১১ টা। হঠাৎ রাস্তায় নেমে নিয়ত করলাম, হাঁটব। যেই ভাবা, সেই কাজ।

আসাদ গেট হতে হাঁটা শুরু করলাম। হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছি সাভার হেমায়েতপুর। কানে ওয়াকম্যান। রাস্তার মানুষ আমাকে নির্ঘাত পাগল ঠাউরেছিল। দুপুর তিনটা বা চারটা নাগাদ রাস্তার পাশের আক্ষরিকভাবেই এক টঙে কড়া ঝালের ট্যাংরা মাছ, প্রচন্ড রকম মরিচ পোড়া দিয়ে বানানো আলু ভর্তা আর কড়কড়ে মোটা চালের ভাত দিয়ে সারলাম দুপুরের খানা। ওই ট্যাংরার ঝোলের স্বাদ আমি জীবনেও ভুলব না। এটাকে কি ট্রাভেল বলা চলে? বা পর্যটন? হা হা হা।

ট্যুরিজম নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা ভাল না। সাধারন যা হয়, রিভিউ দেখে, বিভিন্ন সাইটে একটা স্থানের বর্ননা শুনে সেখানে বহু কষ্টে সময় জোগাড় করে যাই। গিয়ে দেখা যায়, ছবিতে ও বর্ননায় দেয়া স্থানের সাথে তার মিল সামান্যই। তার সাথে আছে রাস্তা ও রূটের বর্ননাসহ যাতায়াত ও আবাসনের বর্ননার অমিল।

বাংলাদেশের যেকোনো মানুষকে আপনি কোনো স্থানের হদিস জানতে চাইবেন, সে বিনা দ্বিধায় বলে দেবে, “ওই তো, দেখা যায়।” অথচ স্থানটা হয়তো আরো ১০ মাইল দূরে। হাসবেন না। এবার চালনা যেতে গিয়ে ওই “ওই তো ওই দেখা যায়” শুনে শুনে ৮ মাইল হেঁটেছিলাম। তাছাড়া গ্রামের মানুষের কাছে ২/৩ মাইল স্থানকে মোড়ের দোকানে গিয়ে বিড়ি কেনার মতো সহজ মনে হয়।

আবার দেখা যাবে, কাউক জিজ্ঞেস করলেন, “অমুক রাস্তা বা ঠিকানাটা কোথায়?” তিনি না চিনলেও বলবেন, “সামনে গিয়ে ডানে ঘুরবেন। তারপর কিছুদূর গিয়ে বামে, তারপর ডানে, তারপর সোজা গিয়ে একটা বড় দোকান, তারও পরে……………………………….” অথচ গিয়ে দেখব, যেখানে শুরুতে ছিলাম, সেখানেই আছি। তখন নিজের চুল ছিড়ি।

আবার সদ্য চালু হওয়া গুগল ম্যাপের সাহায্য নেবেন? একবার একটা অফিসে যাব। সাভারে। চোখ বুজে ম্যাপে লোকেশন দেখে সেইমতো ড্রাইভারকে যেতে বললাম। ম্যাপে ট্রাক করছি। ঠিকমতোই এগোচ্ছি। যেতে যেতে প্রায় পৌছে গিয়েছি। শেষতক ম্যাপে যেখানে দেখালো, এখানেই স্পট, সেখানে নেমে দেখি একটা ধু ধু করা মাঠ। কোনো অফিস নেই। শেষতক মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে তবে বাঁচোয়া।

তবে ভ্রমনে আমি আজও একচেটিয়া বা অন্ধের মতো করে গুগল ম্যাপের ওপর ভরসা করি না। কারন জিনিসটা বাংলাদেশে একশোভাগ প্রূভেন না। তাই ম্যাপের সাথে সাথে মানব ম্যাপেরও সাহায্য নিই।  

এক দশক আগে কক্সবাজার আর সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম। একা একা। ২০১৫তে আবার গেলাম স্ত্রীকে নিয়ে। দেখলাম আমার দেখা কক্স“বাজার”কে আক্ষরিক অর্থেই বাজারে পরিণত করা হয়েছে। অর্থলোলুপ মাড়োয়ারীরা এই অসাধারন স্থানটাকে স্রেফ একটা নদীর চর বা পরিত্যক্ত ভাগাড়ে পরিনত করেছে।

কোনো এক মনীষি ঢাকা শহরকে দেখে বলেছিলেন “বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যায়”। কক্সবাজারকে দেখে আমার মনে হল “হোটেল, রেষ্টূরেন্ট আর ফাইভস্টারে বীচ দেখা দায়”। ন্যুনতম কোনো সৌন্দর্যজ্ঞান কী আমাদের নেই?

মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখি কোনো সম্ভাবনাময় সৃষ্টি, আবিষ্কার, স্থান বা ঘটনা সম্পর্কে লেখা হয় “সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি আরো …………..হত”। আমি বলি কি, ভাল কোনো কিছুর উপর সরকারের সুদৃষ্টি (বিষদৃষ্টি) যতক্ষণ না পড়ে ততক্ষনই ভাল। কারন নজর পড়লেই বরং সেটা শেষ। একবার সুনজর পড়ল মানেই………. প্রকল্প, এডিবি, একনেক, সংসদীয় কমিটি, প্রকল্প অফিস, এসি গাড়ি, বিষাক্ত ধোয়া,……..অতঃপর জমি দখল, কংক্রিটের জঙ্গল, গাছপালা সাফ, ব্যাঙ এর পোনার মতো হোটেল, ধান্দাবাজ লোকজন, দালাল, নিশীকন্যা, ওয়াটার বোট, ক্যামেরা, শুটিং, টেন্ডার, পরিবেশ দরদী দল, ক….ম বিক্রেতা-সবাই হামলে পড়ে। সুতরাং সরকারের বিষদৃষ্টি পড়ার আগেই যা দুয়েকটা স্পট এখনো নিজের মতো আছে সেগুলো দেখে সারুন। সরকারের বিষদৃষ্টি আর বেসরকারের মায়াবী! (লোলুপ) দৃষ্টি পড়ার আগেই যা করার করুন।

আমাকে আমার একজন অফিসার গাজিপুর সাফারী পার্কে ভ্রমনার্থী একটা দলের বাঘ দর্শন ও তৎসংলগ্ন বিপুল কলকাকলী,”শিৎকার (সরি ওটা চিৎকার)”, ব্যপক কোলাহল-এসবের একটা অডিও ক্লিপ শোনালো। আমি অত্যন্ত ক্রূদ্ধ হয়ে পুরোটা শুনলাম। ছেলে, বুড়ো, বাচ্চা, মহিলারা সমস্বরে ”শিৎকার (সরি চিৎকার)” করে বাঘকে ডাকছে, গালাগাল দিচ্ছে, বাঘকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করছে। এর নাম সাফারি এবং সাফারি ভ্রমন অর্থাৎ পর্যটন?

আমি এতকাল জানতাম আর ডিসকভারী বা ন্যাট জিও’র কল্যানে দেখতাম, সাফারি বা গেম রিজার্ভে গেলে তারা যতটা সম্ভব নিরবতা বজায় রাখে, শব্দ করে না যাতে প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবন ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। আর আমাদের এখানে সাফারি বা চিড়িয়াখানাগুলো পাবলিকের উত্তেজিত আনন্দের খোরাক।

আরেকটা কথা। প্রায়ই টিভি বা পেপারে বলতে শুনি-সরকারী-বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই সম্ভাবনাময় স্পটটি অসম্ভব সাধন করতে পারত। দেশকে পর্যটনে আসমানে তুলে দিতে পারত। আমার মনে হয়-থাক, আমাদের পর্যটন স্পটগুলো বুনো, জঙলা, অবহেলিত, ন্যাচারাল থাকুক। মানুষের একটু দৃষ্টি পড়লেই সেটা শেষ। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন আর সাজেকের অবস্থা তো দেখছেনই। একটা স্পট একটু নাম করল। ব্যাস, দলে দলে নাম কামানিয়া সদ্যজাত পর্যটক ছুটবে সেখানে। কারণ হল, সবাই “সাজেকে তোলা সেলফি” তার নিজের ফেসবুকে চান।

আমার অনেক সহকর্মী আর পরিচীত লোকজন ইদানীং বেশ পর্যটন করছেন তবে সেটা কয়েকটা টাইপট স্থানেই সীমিত। সেইসব স্থান যেখানে সবাই যায় আর গেলে দুই চারজনকে বলা যায়যে, “জানিস, গেছিলাম………….? এদের একটা বড় অংশই সারাবছর শুক্রবারে ছুটির দিনে লেপের তল থেকেও বের হয়না। তবে শীত আসলেই পর্যটন চেতনা লাফ দিয়ে ওঠে আর সবাই ছুট ছুট “বান্দরবন, সাজেক, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন……….।

খুব বেশি কাউকে আড়িয়ল বিলে বা চলন বিলে, টাঙুয়ার হাওড়, ষাটগুম্বজ মসজিদ কিংবা ঝিনাঈদহের সুবিশাল বটগাছের বিষ্ময় দেখতে যেতে দেখি না। কারন ওইযে, ওগুলার ফেসবুকীয় বা সেলফীময় দাম কম।

আর আমাদের লোকদের পর্যটন তো বোঝেন। কয়েকদিন আগে পড়লাম, সেন্ট মার্টিনের প্রবালের ৮০% মরে শেষ। ওইযে, পৃষ্ঠপোষকতার ধাক্কা।

আমাদের মানুষেরা এখনো সব রকম পশ্চিমা জীবনের জন্য তৈরী না। ম্যাচিওরড না। তাই সাফারি পার্ক বিষয়টা আপাতত “খাঁচাবিহীন চিড়িয়াখানা” নামে চলতে পারে। সাফারি নামে ডেকে সেটাকে আর হাস্যকর করে তোলার দরকার কী?

ভ্রমনে গেলে আমার সবচেয়ে কষ্ট হয় যেই বিষয়টাতে, তা হল আমাদের অধিকাংশ ভ্রমনপিয়াসুদের দায়ীত্বজ্ঞানহীন কর্মকান্ড। তারা নিজেদের অবিবেচনাপ্রসূত কাজ দ্বারা নিজেদের হয়তো তৃপ্ত করেন ঠিকই, কিন্তু অন্যের জন্য স্থান ও ট্রিপটাকে নরকে পরিণত করতে ওস্তাদ।  পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশের কথা নাই বললাম। যার জন্য প্লাস্টিক বোতল, কনডম, চিপস, মায় স্যানিটারী প্যাডও মেলে টুরিষ্ট স্পটে। সেরের ওপর সোয়া সের, প্রায়ই দলবেঁধে যাওয়া টুরিষ্টরা চিৎকার, চেচামেচি, হৈ হৈ চিৎকার, স্পিকারে গান বাজনা, বাচ্চাকাচ্চার হাগুমুতু অস্থানে অবনমনসহ, একটা সুন্দর স্পটকে গাজিপুরের গতানুগতিক একটা পিকনিক স্পটে রূপ দেন।

ভাবুন তো, আপনি গেলেন হয়তো সুনামগঞ্জের শিমুল বাগানে। সেখানে দিয়ে যদি দেখেন, ডেকসেটে ”ধুম মাচা লে” বাজছে, কেমন লাগবে?  আমার কাছে মনে হয়, আমাদের টুরিস্ট স্পটগুলোর বাসিন্দারাও সবাই আজও পুরোপুরিভাবে নিজেদের টুরিজমের নাগরিক হিসেবে রুপান্তরিত করে উঠতে পারেননি।

কীভাবে টুরিস্টদের বিনোদন ও আনন্দ দেবার ফাঁকে ফাঁকে নিজ সংস্কৃতি, এলাকা ও স্পটটিকে হাইলাইট করে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা করা যায়-সেদিকে আমাদের নজর কম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এদেশে ‍টুুরিস্টকে মুরগী হিসেবে দেখার প্রবণতা বেশি দেখি।  হ্যা, আমি জেনারেলাইজ করব না। সবাই অবশ্যই একরকম না। মন্দ যেমন আছে, ভালও আছে।

এই সবকিছুর মাঝে আমি মিস করি সেই ক্যাম্পাস জীবনে ঢাকার নিরিবিলি রাস্তাগুলোতে দিনময় অগ্যস্ত হেঁটে হেঁটে আরবান টুরিজমের স্বাদ। এখন আর ঢাকার রাস্তায় হাঁটা যায় না। ঢাকা এখন পদচারীর না। ঢাকা এখন নাগরিকের না। ঢাকা শুধুই ভবঘুরের আর দামী গাড়ির নগর। সাহস করে একদিন রাতে ঘুরব ভাবছি। যদি ঘরের বউ পাবনা হেমায়েতপুরে পাঠানোর ‍হুমকী না দেয়।

 #tourism #trip #walking #vagabond #gypsi #travelling

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *