Skip to content

ব্যবহারে ‘বংশের’ পরিচয়

  • by

”শুনে রাখো আজ হতে বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব বা কৌলিন প্রথা বিলুপ্ত করা হলো। কুলীন বা শ্রেষ্ঠ সেই, যে বিশ্বাসী ও মানুষের উপকার করেন” [হযরত মুহাম্মাদ সাঃ (শ্রূতলিখন)]

আমার মধ্যে খুব অদ্ভূৎ একটা বাতিক (অবসেশন) আছে। সন্ধ্যার সময় আমি ঘরে থাকতে পারি না। আকাশের দিকে তাকাতে পারি না। কেন? সন্ধ্যার সময়টাতে আমার প্রচন্ড বিষন্নতাবোধ হয়। ডুবন্ত আলো, আজানের ধ্বনি, মানুষের ঘরে ফেরার তাড়া কেমন একটা অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করে। খুব খেয়াল করে দেখবেন, ঠিক যখন মাগরিবের আজান দেয়, সেই সময়টা হঠাৎ করে খুব নির্জন ও নিশূতি সৃষ্টি হয়। প্রচন্ডরকম বিষন্নতা গ্রাস করে যেন। তাই সবসময়ই চেষ্টা করি ঠিক সন্ধ্যাটা ঘরে না থাকতে। কোনো ব্যাখ্যা নেই এর। তবু বাস্তবতা তো বাস্তবতাই, তাই না? 

অনেকদিন আগে একবার বলেছিলাম, আপেক্ষিক ও বাঙালীরা উন্নাসিক-এমন কিছু বিষয় নিয়ে একদিন লিখব। যেমন, ব্যক্তিত্ব, আত্মসম্মান, ব্যক্তিস্বাধীনতা, পিতৃপরিচয়, জাতীয়তাবোধ ইত্যাদি। নানা কারনেই লেখাটিতে হাত দিতে পারিনি। হয়তো ভুলেই যেতাম। কিন্তু একটা মজার ব্যপার কি জানেন, লেখকদের যেমন রাইটারস ব্লক নামে একটা বিষয় আছে, ঠিক তেমনি, রাইটারস ফ্লো নামেও বোধহয় একটা অদৃশ্য জিনিস আছে। তা না হলে, গত ১০ দিন ধরে মাথার মধ্যে সারাক্ষণ লেখা ও লেখার প্লট কিলবিল করছে। ২৩ মার্চ একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম বসবার। তবে ওই যে, সন্ধ্যারবির সাথে আমার আড়ি। তাই বসলাম রাত পড়তে।

হ্যা, আমাকে তাতিয়ে দিয়ে লেখাটা লিখতে বসিয়েছে একটা ছোট্ট ঘটনা। আর আমি বেশিরভাগ সময়ই বিশাল যেসব লেখা লিখেছি, তার একটা বড় অংশই কোনো না কোনো ঘটনাতে তেতে থেকেই লেখা। ঘটনাটা, না না, ঘটনা দুটো বলি একটুখানি।

টিভিতে একটা সত্যি ঘটনার নাট্যায়ন দেখছিলাম। একজন বাবা। তার স্ত্রী গত হয়েছেন। ছেলে ও ছেলের বউ বুড়ো বাপকে উঠতে বসতে চাপ দিচ্ছে বাড়ি লিখে দেবার জন্য। পাষন্ড সন্তান এমনকি এই ভয়ে ভীত, যে, তার বাপ যেকোনো সময় তার ছেলের দুই মেয়েকে বাড়ি লিখে দেবে। ছেলে ও ছেলের বউয়ের অত্যাচারে বৃদ্ধ শেষতক বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেন। তারপর ঘটনা আরো এগোয়।

আরেকটা ঘটনা। এটা আমার চাক্ষুস করা। একজন বৃদ্ধ। যৌবনে প্রতাপশালী ছিলেন। অর্থশালীও। এখন ১০৫ বছরে পড়েছেন। তার ৮ সন্তান। মুশকীলটা বেঁধেছে, বৃদ্ধের কোনো সন্তান তাকে নিজের কাছে রাখতে চান না। আর তাই তারা তাকে পালাক্রমে ফুটবলের মতো করে সারাবছর নানা সন্তানের বাসায় পাঠান থাকবার ও খাবার জন্য। ১০৫ বছরের একজন অশীতিপর বৃদ্ধ বাসে, লঞ্চে করে বিভিন্ন জেলাতে তার সন্তানদের কাছে দু’চার মাস পরে পরে ছোটেন। সন্তানরা পুরো বিষয়টার নির্মমতা, অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, অসভ্যতার বিষয়ে নির্বিকার। ওই বৃদ্ধ ও তার সন্তানরা তাদের এলাকায় খুব উঁচু বংশীয় ও বড় বাড়ির মানুষ।

ঘটনা দুটির সংশ্লেষ এখানে কী-সেটা জানতে পড়তে থাকুন। আমি লেখাটির পাঠকদের শুরুতেই অনুরোধ করব, দুটি বিষয়কে মাথায় রেখে সবসময় নিজের ধারনা (পারসেপশন) তৈরী করতে। তা হল,

এক; (প্রায়) সব কিছুরই দ্বিতীয় আরেকটি দিক থাকে।

দুই; জাজমেন্টাল হবেন না। আরেকবার ভেবে নিন। গভীরে চিন্তা করুন।

বিতর্ককে আমি সবসময় এড়িয়ে চলি। কারন বিতর্ক, বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খুব যৌক্তিক পথে এগোয় না। আর শেষ হয় ব্যক্তিগত তিক্ততা দিয়ে। তবুও এই বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে লিখতে বসেছি, কারন কথাগুলো না বলে মরে গেলে একটা অপূর্নতা রয়ে যেত জীবনে। তাছাড়া, সামাজিক বিজ্ঞানের বেশিরভাগ বিষয়ই আপেক্ষিক অর্থাৎ বৈজ্ঞানিকভাবে ল্যাব টেষ্ট করে প্রমানিত করা যাবে না। সময় ও প্রেক্ষিত অনুযায়ী তার পরিক্রমা ঘটে থাকে। যাহোক, আমি কখনো পাঠকের জন্য লিখি না। লিখি আমার জন্য। এজন্যই লেখার TRP নিয়ে হৃদয়ের অলীন্দে খুব ব্যথা হয় না। মূল লেখায় যাই।

এক;

ছোটবেলায় সন্ধানী থেকে তহবিল তুলবার জন্য বড় ভাইয়েরা টিকিট বিক্রী করতে আসতেন। ওই টিকিটে একটা কথা লেখা থাকত, “অন্ধজনে দেহ আলো।” অন্ধজনকে চোখে আলো না দিয়ে কেন দেহে আলো দেবার আহবান সেখানে থাকত, সেটা বুঝে আসত না। ঠিক তেমনি, ”ব্যবহারে বংশের পরিচয়” কথাটাও আমার বুঝে আসে না। বংশের পরিচয় কেন ব্যক্তির ব্যবহারে থাকবে? তবে কি যার ব্যবহার ভাল সে বড় বংশের, উঁচু বংশের, বনেদী বংশের? আর যাদের ব্যবহার খারাপ, কুৎসিত, অন্যায্য, তারা সবাই নিচু আর ছোট বংশের? কিংবা উল্টো করে বললে, নিচু বংশের মানুষ হলেই কি তার ব্যবহার বংশানুক্রমিকভাবে খারাপ হবে আর উঁচু বংশ হলেই কেবল চমৎকার ব্যবহারের মানুষ হবে? 

আর এই উঁচু বংশ ও নিচু বংশ জিনিসটাই বা কী? লম্বা বাঁশ তথা বংশ দন্ডের কথা হচ্ছে না, তা নিশ্চিত থাকুন।

বাংলাদেশের প্রচলিত কথা ও চর্চায় আমরা যা দেখি, তা হল, উঁচু বা বড় বংশ বলতে বোঝায় ব্যক্তির নামের শেষে কিছু বহুল শ্রুত বা ব্যবহৃত শব্দমালাকে। যেমন, তালুকদার, চৌধুরী, খান, মজুমদার, কাজি এরকম কিছু টাইটেল বা পদবীকে বংশলতিকায় উঁচু স্তরের বলে ধরা হয়। যার বংশ বা নামের শেষ অংশ এমন কোনো শব্দমালায় রঞ্জিত, তাকে বনেদী বংশীয় বলে মানা হয়ে থাকে। যদিও আধুনিক বাংলাদেশে নামের শেষে এই লেজুর লাগানোটা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

আমার এক সময়কার সহকর্মী ছিলেন এক ভদ্রলোক। তিনি তার নামের শেষের তকমাটা কেঁটে স্কুলে নাম লিখিয়েছিলেন। তাকে তার অগ্রজ সেজন্য সবসময় দোষ দিতেন। যদিও আবার অনুজ সবসময়  সেই বংশের সন্তান হিসেবে গর্ব বোধও করতেন। কিন্তু আবার তকমার শব্দটি তার ভাষায় গেঁয়ো বলে সেটাকে নামের ডগায় লাগাতে চাইতেন না। আমাদের দেশে বিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মের জন্য পাত্র ও পাত্রীর বংশ পরিচয় জানা একটি দ্রষ্টব্য বিষয়। এমনকি একটি ধর্মের অনুসারীরা রীতিমতো বিগত ৮ পুরুষ পর্যন্ত বংশলতিকা সংগ্রহ করে থাকে।

একবার আমি সামাজিক মাধ্যমে বংশ পরিচয় কীভাবে নির্ধারিত হয়, তা জানতে চেয়ে একটা লেখা দিয়েছিলাম। খুব যুৎসই উত্তর পাইনি যদিও। আপনারা কি জানেন, ব্যক্তির বংশ পরিচয় কীভাবে নির্ধারিত হবে? প্রচলিত যেই পন্থা অনুসরন করা হয়, সেটা হল, ব্যক্তির বাবার যেই বংশ ছিল, সেটাই তার বংশ। তো সেই নিয়মে ধরুন আপনার বাবার বংশ পরিচয় “চৌধুরী”। তাহলে একই সূত্র ধরে আপনার বাবার বাবা, মানে আপনার দাদার বংশও নিশ্চই “চৌধুরী” ছিল। সেকারনেরই আপনার বাবার বংশ চৌধুরী। সেই একই কারনে আপনার দাদার বাবা, মানে আপনার প্রপিতামহের বংশ চৌধুরী। আপনার প্রপিতামহের প্রপিতামহের বংশও চৌধুরী। তার প্রপিতামহের বংশও চৌধুরী। কারন বাবার সূত্র ধরে কারো বংশ বদলানোর সুযোগ নেই। এই হিসেবে পেছাতে পেছাতে বাবা আদম পর্যন্ত ধরলে পৃথিবীর সকল মানুষের বংশ আদম।

যতটা জেনেছি, আদি পিতা হযরত আদম (আঃ) এর নামের শেষে আর কোনো শব্দ নেই। তার কোনো বংশ নেই। বংশধর আছে। তো বাবা আদমের বংশধররা যদি তার বংশ নামই পেতেন, তবে পৃথিবীর সব লোকের বংশ পরিচয় আদম। তাহলে চৌধুরী, খান, তালুকদার কোথা হতে এলো? আপনি বলবেন, মাঝখানে কোনো এক কুলাঙ্গার তার পিতার বংশ নাম ত্যাগ করে নিজে একটা নাম ধারন করে ফেলায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। আচ্ছা, তাহলে আপনার আমার শুরুতে মেনে চলা বিষয়টা, মানে প্রচলিত উঁচু বংশ, নিচু বংশ ও সেই কেন্দ্রীক ভাল ব্যবহার, আভিজাত্য, পদমর্যাদা বিষয়টা প্রয়োগ করা অনর্থক। কারন ওটা আমাদের সত্যিকারের বংশ না। আমাদের বংশ আদম।

কেউ কেউ আবার বলেছেন, তিন পুরুষের পরে বংশ বদলে যায়। তাহলেও সেটা আদমই হয়। কারন? অংকের খাতা নিয়ে বসুন। পেয়ে যাবেন।

বংশ নির্ধারনের এই পদ্ধতির একটা মুশকীল বলি। ধরুন আপনার বংশ তালুকদার। তো আপনার মেয়ের বংশও তালুকদার। তার সন্তানদের বংশ পরিচয় কী হবে? তালুকদার নিশ্চই? কিন্তু বাংলাদেশে তা হবে না। আপনার মেয়ের সন্তান মনে করেন দুজন। ছেলের নাম নাবিল, মেয়ের নাম নাবিলা। আপনার জামাতার নাম কাবিল। তো নাবিল ও নাবিলা-দুজনের বংশই হবে তাদের বাবা কাবিলের বংশের অনুরুপ। ধরুন সেটা হল জমাদ্দার। নাবিলের যখন সন্তান হবে, তাদের বংশ হবে জমাদ্দার। কিন্তু নাবিলার সন্তানদের বংশ পরিচয় হবে তাদের বাবা অর্থাৎ আপনার মেয়ে ও মেয়ে জামাতার জামাতার বাপের বংশের নামে।   

বলবেন, বংশ পরিচয় নির্ধারিত হয় বাবার বংশ দ্বারা। কে বানালো এই নিয়ম ভাই? আল্লহ নিশ্চই নন। [আমাদের সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও মহাপ্রভূর নামের বিশুদ্ধ উচ্চারন আল্লাহ নয়, আল্লহ। আরবীতে যারা বিজ্ঞ, তাদের কাছে শুনে নেবেন।] যাহোক, ছেলেরা শুধু বাবার বংশ পরিচয় বহন করে নিয়ে যাবে, মেয়েরা পাবে না-এই নিয়ম একেবারেই মানুষের বানানো। যাতে ভূমিকা রেখেছেন সামন্ত, সমাজপতি, ধর্মগুরু, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারকরা। পুরুষতান্ত্রীকতার চরম পরাকাষ্ঠা। 

আপনাদের মনে পড়ে? এই কিছুকাল আগেও আমাদের বীরপুঙ্গব পুরুষরা বংশ রক্ষার জন্য (মানে ছেলে পাবার জন্য) একাধিক বিবাহ করতেন? আর সমাজও সেটা অনুমোদন করত? আজকাল যদিও সেই বহুবিবাহটা কমেছে (হাসি মশকরা আর খরচ কুলাতে না পেড়ে যদিও), কিন্তু পুরুষ (এবং নারীরও) জাতির বংশ রক্ষার জন্য ছেলে পয়দা করার খাহেশ এখনো যায়নি। আর তাই তিন মেয়ের পরে ৬০ বছর বয়সে ছেলের আশায় বউকে পোয়াতি করে তাকে হাতে ধরে মরবার ব্যবস্থা করার উদাহরন আকছার দেখতে পাই। হায় বংশ। তোকে রক্ষা করতে পশ্চাৎদেশে বংশ (বাঁশ) খায় বাঙালী।

শুরুতে বলছিলাম উঁচু ও নিচু বংশের কথা। কোথা হতে এলো এই বংশের ক্লাসিফিকেশন ও ক্যাটেগোরাইজেশন? কে বলে দিল, অমূক বংশ উঁচু  ও অভিজাত আর তমুক বংশ অচ্ছুৎ? বাংলাদেশে কিছু মানুষ নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব ও তার বিপরীতে অন্য ধর্ম ও ধর্মানুসারীদের নিচুত্ব নিয়ে খুব একরোখা মনোভাব দেখান বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে।

আজ সকালেও একটা উদাহরন দেখলাম। যার ভাষা অনেকটা এরকম: “বিধর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে না। তারা আমাদের তাবেদারে থাকবে। তবে তাদেরকে ভাল ব্যবহার দিতে হবে, যাতে তারা মুগ্ধ হয়ে আমাদের ধর্মে চলে আসে“। তো ভাইজান, অন্যের ধর্মকে এতটা জঘন্য মনে করলে, তার ধর্মের বর্ণ ও জাতপাতের ভূয়া ও আরোপিত গোত্রপ্রথা আপনি নিজে কেন মানেন? বংশ, সদ্বংশ, জাত, বর্ণ, গোত্র, সূত্র-এই ধারনা (কনসেপ্ট)গুলো মনুষ্য নির্মীত, সেটা নানান দাপ্তরিক দরকারে এবং বিভিন্ন কোটারী স্বার্থের জন্য আরোপিত। লালনের গানটা মনে পড়ে, “জাত গেল, জাত গেল বলে, এ কী আজব কারখানা।” খোদার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষকে জাত, গোত্র, বংশ ও বর্ণের লেবেল লাগিয়ে উঁচু নিচু করা মানুষের অন্ধকার কর্মকান্ডের দুঃখ জনক অধ্যায়।

দুই;

বংশ পরিচয়ের মতো করে আরেকটা বিষফোঁড়ার নাম বলি। পিতৃপরিচয়। ইন্ডিয়ান সিরিয়ালগুলো জঘন্য প্রকৃতির হলেও একটা সাম্প্রতিক সিরিয়ালে খুব হৃদয়স্পর্শী একটি নাট্যায়ন দেখেছিলাম। গল্পের নায়ক রোদ্দুর হঠাৎ একদিন জানতে পারেন, যাকে তিনি মা বলে জেনে এসেছেন, তিনি তার মা নন। চিরপরিচীত বাবা তার বাবা নন। তৎপরবর্তিতে মা ও ছেলের মধ্যে আধাঘন্টার একটি সিকোয়েন্স দেখানো হয়। আমার দেখা অন্যতম মর্মান্তিক হৃদয়স্পর্শী মা-ছেলে চিত্রায়ন ছিল সেটা। তৎপরবর্তিতে প্রতিষ্ঠিত একজন ডাক্তার রোদ্দুর নিজের পিতৃ-মাতৃ পরিচয়হীন সত্ত্বাকে কিছুতেই মানতে না পেরে প্রায় অপ্রকৃতস্থ হয়ে যান।

নাটক হলেও এটাই এখনো সত্যি। পৃথিবীর খুব মানুষ এই ২০১৯ সালের পৃথিবীতেও এটার অসারতাকে হদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছে। পিতৃপরিচয় যখন একটা খুব আপেক্ষিক বিষয় হয়ে গেছে পশ্চিমে, তখনো টিভিতে সিনেমা, নাটকে সন্তানের পিতৃপরিচয় নিয়ে সন্দেহ ও ষড়যন্ত্রের প্রচুর নির্মান দেখতে পাই। সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবীতে নায়িকার হেনস্তা হওয়া খুব প্রচলিত। ডিএনএ প্রোফাইল এনালিসিস বিষয়টা যেন বিজ্ঞানীরা এই পিতৃপরিচয়ের অপবাদ ঘোঁচাতেই আবিষ্কার করেছিলেন। হায় বিজ্ঞানী বেচারা! পশ্চিমে পিতৃপরিচয় একটি খুব প্রান্তিক ও আপেক্ষিক বিষয়। কেন?

তার কারন খুব সাদামাটাভাবে বললে, বিজ্ঞান। আজকাল শুধুমাত্র সেই আদিমকালের মতো একজন নর ও একজন নারীর শারিরীক ঘনিষ্ঠতাতেই শুধু সন্তান জন্ম হবে-এই ধারনাটাকে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীরা স্রেফ মিথ্যে ও খেলো একটা বিশ্বাসে পরিণত করে ফেলেছেন। দুয়েকটা উদাহরন বলি। মনে করুন একটি বাচ্চার নাম, পরি। তো পরির গর্ভধারিনী হলেন মলি। আর মলির গর্ভে দুজন পুরুষের সিমেন হতে সংগৃহিত শুক্রাণুর উপাদান ওই নারীর গর্ভে রোপিত ও বর্ধিত হয়ে পরির জন্ম। এখন বলুন, পরির বাবা কে হবে? আবার ধরুন পরীর গর্ভধারিনী মলি। কিন্তু তার গর্ভে পরির ভ্রূন সৃষ্টি মলির ডিম্বানুতে নয়। সে শুরু সারোগেট করছেন। মূল শুক্রাণু ও ডিম্বানুদাতা অন্য দুজন নর ও নারী। এবার বলুন, পরির বাবা ও মা কে হবে? কথা বাড়াব না।

সারোগেসি, আইভিএফ তথা টেষ্টটিউবসহ মানব ভ্রূন ক্লোনিং, মৃত মানুষের সিমেন নিয়ে বা সিমেন ব্যাংক হতে সিমেন ডোনারের শুক্রাণু বা ডিম্বানু হতে ভ্রূন নার্চারিং এসব পদ্ধতি যেসব মানব সন্তানের জন্ম হচ্ছে, তাদের শুধু পিতৃ নয়, মাতৃ, দাতৃ, গর্ভধারিনী পরিচয় কী হবে, তা নির্ধারনে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানীরা হিমসিম। বাবা ও মা-এই বিষয়টাই উহ্য হয়ে যাবার যোগাড়। হয়তো ভবিষ্যত পৃথিবীতে বাবা ও মা-এর যায়গায় দুটি নতুন শব্দ প্রতিস্থাপিত হবে-শুক্রাণু দাতা ও ডিম্বানু দাতা। আচ্ছা, ভাবুনতো, ক্লোনিং পদ্ধতিতে মানুষ বানালে তার বাবা-মা কে হবেন? মাথা ঘুরছে।

এই কয়দিন আগেই খবরে দেখলাম একজোড়া জমজের মধ্যে দুটির মা একইজন। কিন্তু বাবা দু’জন। কী? মাথাটা ঘুরছে? নাকি ঘৃনা হচ্ছে? নাকি বলবেন, সব বেদাত, বেদাত? বেদাত হতে পারে, কিন্তু আমার লেখার সাথে বিষয়টা অপ্রাসঙ্গিক না। এইক্ষণে ছোট্ট করে বলি, পিতৃপরিচয় বলে আসলে কোনো বিষয়ই নেই। মানুষের পরিচয় তার বাপের পরিচয়ে না। মায়েরটাতেও না। এই নিষ্ঠুর অপবিষয়গুলো সমাজে এসেছে কিছু মুর্খ সমাজপতির হাত ধরে।

আর পিতৃপরিচয় যদি সত্যিই এত ভয়ানক জরুরী বিষয়ই হয়, তবে আমি আরেকটা প্রশ্ন করি, পৃথিবীতে মাতৃপরিচয় নিয়ে কেন কেউ প্রশ্ন করে না? আর কারো কেন পিতৃপরিচয়টি  লাগবে, মানে পৃথিবীতে ঠিক কোন কাজটাতে পিতার নামটি সত্যিকারে কাজে লাগে, মানে অতি দরকার, যেটা ছাড়া কাজ ভন্ডুল হয়, এমন একটা উদাহরন দিনতো। হায় পিতৃ মাতৃ স্বীকৃতি। সেই ৭১ সাল হতে এই দেশে পিতৃপরিচয় নিয়ে একটা নিষ্ঠূর চর্চার জন্ম। বিরাঙ্গনার সন্তানদের আমরা বাস্টার্ড চাইল্ড তকমা দিয়েছি। আজও বিরাঙ্গানার সন্তানরা যারা ওই সময় বিদেশে দত্তক ও নানাভাবে স্থানান্তরিত হয়েছিলেন, তারা আসেন এই দেশে। হ্যা, তারা পিতাকে খুঁজতে আসেন না। আসেন মা’কে খুঁজতে। যদি তারা তাদের পিতাকে খুঁজতে বের হতেন, তবে পাকিস্তান (এবং বাংলাদেশেরও) বহু পুরুষ মুখ লুকাবার স্থান খুঁজে পেতেন না। কারন তাদের দানবীয় ধর্ষণে ওই শিশুদের জন্ম হয় ৭১ সালে। এরপরও আপনি পিতৃপরিচয় নিয়ে উদ্বেলিত হবেন?

তিন;

ব্যক্তিত্ব বিষয়টা নিয়ে বঙ্গদেশ খুব খুব খুব উচ্চকিত। আচ্ছা, একটা সোজা প্রশ্ন করি, “ব্যক্তিত্ব কী?” আমি জানি, যদি কোনো পাঠক এই পর্যন্ত লেখাটা পড়েন, তারা এবার গালে হাত দিয়ে ভাবতে বসবেন, “লেখক লোকটা কি পাগল? নাকি সে ইচ্ছে করেই সব স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে বিতর্ক বাড়ানোর মধ্য দিয়ে বিখ্যাত হতে চাইছে?” ওসব ভাবনা বাদ দিন। শুরুতেই বলেছিলাম না? সবকিছুর আপেক্ষিকতা নিয়ে ভাবতে আর জাজমেন্টাল না হতে? ভাবনা বাদ দিয়ে বলুন, পার্সোনালিটি বা ব্যক্তিত্ব কী? আপনি ভাবতে থাকুন, আমি গল্প করি। ভারতীয় টিভিতে জাঙিয়ার একটি বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়। পাঞ্চলাইন হল, “………জাঙিয়া, পার্সোনালিটির প্রশ্ন। আরেকটা ফুড সাপ্লিমেন্টের বিজ্ঞাপনে মডেল বলেন, “যেদিন হতে ………….খেয়ে নিজের ওজন বাড়ল, সেদিন হতে ফিরে পেলাম নিজের নতুন পার্সোনালিটি। হা হা হা। ওজনের ওপর আর জাঙিয়ার ওপর আমার পার্সোনালিটি নির্ভরশীল।

ব্যক্তিত্ব জিনিসটা তাহলে আমার জাঙিয়া, ওজন, চুলের রং, উচ্চতা, গায়ের কাপড়, গলার স্বর, কথা বলার ধরন, স্বভাবের ভারিক্কি, ভাবসাব-কত কিছুর উপর নির্ভর করে আছে। দূর পশ্চিম তো আরো কয়েক কাঠি সরেস। তাদের ব্যক্তিত্ববোধ আছে বক্ষের সৌন্দর্য, গায়ের ট্যাটুর সংখ্যা, নারীর পুরুষ সাজা আর পুরুষের নারী হবার চেষ্টার মধ্যে, সফলতার সাথে নিজের লিঙ্গ বদলের মধ্যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজের গন্ডী পেরিয়ে অন্যের কোর্টে ঢুকে তাকে পীড়ন করার মধ্যেও। খুব হাস্যকর কী জানেন? বাংলাদেশে গলা ভারী করে কথা বলা, রক্ষণশীল (রিজার্ভ থাকা) আর চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলাকেও ব্যক্তিত্বের পরিচয় বলে ভাবা হয়। হা হা হা।

আমি যখন জানি আমার দৃষ্টিভঙ্গি ভুল তবুও নিজের যুক্তিতে অটল থাকি শুধু ছোট হবনা বলে, সেটা ব্যক্তিত্ব নয়, গোয়ার্তুমী।যখন অ্যমাজন ফরেষ্টে বেড়াতে গেলেও টাই পড়ে শু গলিয়ে ফুল শার্ট ইন করে যাই, সেটা ব্যক্তিত্ব নয়, গোয়ার্তুমী।

যখন সবাই মাটির ভাড়ে হাইওয়েতে টঙ দোকানে চা খাচ্ছে কিন্তু আমি গাড়িতে ঘাড় বাঁকিয়ে বসে নাক সিঁটকাচ্ছি, সেটা ব্যক্তিত্ব নয়।তবে আবার যখন কেউ স্রোতের বিপরীতে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে চলতে চান, আমি সমাজের বিবেক হয়ে তাকে নানান পিড়নে নাস্তানাবুদ করছি-সেটাও ব্যক্তিত্ব নয়।

ব্যক্তিত্ব নিজের উপড়ে ফলানোর জিনিস, অন্যের উপরে নয়। ব্যক্তিত্বের ধরণে পৃথিবীতে ৩ ধরণের মানুষ থাকে-introvert, extrovert, ambivert. আপনি কোন ধরণের?

প্রতিটি ধরণের রয়েছে নিজস্ব রকম বৈশিষ্ট। আবার, প্রতিটিরই রয়েছে কিছু সুবিধা ও অসুবিধা।

আপনাকেই বেছে নিতে হবে, আপনি কোন ধরণটি হতে চান? হ্যা, বলেছি, ”হতে চান“। মানে, ব্যক্তিত্ব যেমন প্রকৃতি প্রদত্ত, আবার এটিও ঠিক, বড় হয়ে, ম্যচিওরড হবার যাত্রায় আপনি নিজেও নিজের ধরণ তৈরী করে নিতে পারেন।

সাধারণত, বাংলাদেশে আমরা নিজেদেরকে Introvert হিসেবে ভাবতে ও পরিচয় দিতে বেশি ভালোবাসি। আমরা বাবা-মায়ের সেই আলাভোলা ছেলেটি, সবচেয়ে কম আদর পাওয়া, ভালোবাসার কাঙাল, সেই সবচেয়ে দায়ীত্ব নেয়া সন্তানটি হিসেবে নিজেকে দেখাতে ভালোবাসি। আমরা ছন্নছাড়া, ঘরপালানো, স্কুল পালানো, লাজুক, সাত চড়ে রা কাড়ে না-এমন ভালোমানুষটি হিসেবে নিজেদের দেখাতে, নিজের ঢোল বাজাতে পারি না, শো-অফ পারিনা-এমন চুনোপুটির ইমেজে দেখাতে বেশি ভালোবাসি।

সে আপনি ভালোবাসতেই পারেন। তবে আপনি যদি চাকরিজীবি প্রফেশনাল হন, আপনার জন্য Introvert স্বভাব বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যার তৈরী করবে। খুব কম পেশাতেই এই ধরণটি পজিটিভ অ্যাডভানটেজ দেবে।

এই যেমন, ধরুন, আমরা আমাদের চারপাশে কমিউনিকেশন, ইন্টারপারসনাল স্কিল, ইনটারেকটিভ স্কিল, ইন্টাররিলেশনশিপ বাড়ানোর এত এত ফোরাম বা প্লাটফরম চোখে পড়ে, সেখানে কথা বলার, মেসেজ দেবার, মতামত দেবার, নিজের জ্ঞান শেয়ার করার, আনন্দ শেয়ার করার, পারটিসিপেট করার এত এত সুযোগ থাকা সত্বেও, আমরা কি আমাদের জড়তার ঘেরাটোপ হতে, সংকোচের স্থান হতে, সংশয়ের স্থান হতে বের হতে পারছি? কী হয় কী হয়-এই দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আমরা কি মুক্তভাবে এমন দারুন ফোরামগুলোতে অংশ নিতে পারছি?

যদি না পেরে থাকি, বুঝতে হবে, আমি ইন্ট্রোভার্ট, এবং, এই ট্রেন্ড অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিজের ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পজিটিভ অ্যাডভানটেজ দেবে না।

কথা বলুন, অংশ নিন, ইনটারেকট করুন। এবং, টিম লিডার হয়ে থাকলে কথা বলবার, অংশ নেবার, ইনটারেকট করবার কালচার গড়ে তুলুন। নিজের, টিমের ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই।

মনে রাখুন, ব্যক্তিত্ব আর ব্যক্তিগত-এক জিনিস নয়। তবে হ্যা, দুটোর একটা মেলবন্ধন আছে। একটু পরে বলি।

ব্যক্তিগত সেটাই, যেটা আপনার একান্ত নিজস্ব। অন্যের সাথে তার কোনো মিথঃস্ক্রিয়া নেই। আর ব্যক্তিত্ব নিজের মধ্যে জন্ম নিলেও তার বহিপ্রকাশ অন্যের সাথে। ব্যক্তিত্ব থাকে নিজের ভিতরে চুপ করে। তার প্রকাশ ও পরিচয় পাওয়া যায় অন্য কারো সাথে তার প্রকাশে। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তবে আপনিই বলুন, ব্যক্তিত্ব কী? আমি বলব, ব্যক্তির তথা ব্যক্তিমানুষের দৃষ্টিভঙ্গী, জীবনবোধ, মনুষ্যত্ববোধ, রুচীবোধ, সৌজন্যবোধ, ঔচিত্যবোধ, নৈতিকতাবোধ, বাচনভঙ্গী, বচন, বিবেচনাবোধ, সিদ্ধান্ত নেবার পদ্ধতি-এসব কিছুর সমষ্টি। ব্যক্তিত্বের এই সংজ্ঞায়নের কোনো নারী পুরুষ ভেদ নেই। কোনো লিঙ্গভিত্তিক বিশেষত্ব নেই। দুই গোত্রেরই এক। পুরুষ নারীর মতো পোষাক পড়লে কিংবা নারী পুরুষের মতো করে সিগারেট ফুঁকলে তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে টান পড়ার কোনো কারন দেখিনা।

মনে রাখবেন, অভিব্যক্তিকে অনেকে ব্যক্তিত্ব বলে ভুল করেন। ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিস্বাধীনতা বিষয়টা নিয়েও একটু বলি। ব্যক্তিত্ব ব্যক্তির ব্যক্তিগত অর্জন। কিন্তু তার স্বরুপ প্রকাশিত হয় ব্যক্তিগত জগতের বাইরে। ব্যক্তিগত বিষয়গুলো ব্যক্তি মানুষের ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তিস্বাধীনতা তাকে পরিণত করে। স্বাধীনতা খুব আপেক্ষিক একটি ধারনা (কনসেপ্ট। বাংলার সাথে ইংরেজির শব্দ বিনিময়ে বেশ গন্ডগোল আছে। ইংরেজির যথার্থ বাংলা করার ক্ষে্ত্রে বেশ কিছু গোলমাল ঘটে। যেমন এই যে, ধারনা। আমাদের এখানে কনসেপ্ট মানে ধারনা। কিন্তু আবার এককভাবে বাংলাতে ধারনা মানে হল, অনুমান। কী মুশকীল!)

তো বলছিলাম, স্বাধীনতা খুব আপেক্ষিক। ঠিক কোন পরিবেশ বা পরিস্থিতিকে স্বাধীনতা বলা চলে, সেটার সংজ্ঞায়নের সমাজবিজ্ঞানীরা কেউ একমত হননি। একজন বিজ্ঞানীর সংজ্ঞা পড়েছিলাম যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রী নিচ্ছিলাম। সংজ্ঞাটা কার তা আজ আর মনে করতে পারব না। (বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটা কৌশল খুব অপব্যবহার করতাম আমরা। যখনি লেখা বড় করতে চাইতাম বা সমাজবিজ্ঞানীর নাম ভুলে যেতাম, সংজ্ঞা বানাতাম। যেমন হয়তো বলতাম, অমুক বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী মাইকেল বারাক বলেছেন…………………” অথচ বারাক নামে কেউই নেই ভূভারতে। হা হা হা।)

যাহোক, সংজ্ঞাটা অনেকটা এমন, “স্বাধীনতা হল ব্যক্তির নিজস্ব মত ও অধিকারের সেই অবাধ চর্চা, যেটা উপভোগ করা অন্য একজন মানুষের একই ধরনের অধিকার চর্চাকে বাধাগ্রস্থ করে না।” আজ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংজ্ঞায় এটিকেই আমার সবচেয়ে যথার্থ মনে হয়। ব্যক্তিস্বাধীনতার সাথে অধিকার, প্রাইভেসী (এর সঠিক বাংলা জানি না) খুব অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। ব্যক্তিস্বাধীনতাই মনে হয় সেই অধরা অধিকার, যেটা এই বাংলাদেশে তো বটেই, গোটা বিশ্বেই খুব দুর্লভ।

ডিজিটাল ও আধুনিক এই বিশ্বে এর প্রাপ্তি বাড়ার কথা থাকলেও তা বরং দিন দিন কমছে। প্রতিটি পদে পদে ব্যক্তিস্বাধীনতা লঙ্ঘিত হচ্ছে। লুটে নেয়া হচ্ছে, কেড়ে নেয়া হচ্চে ব্যক্তিস্বাধীনতা। ব্যক্তিস্বাধীনতার নিয়ামক ও সহদর ভাই হল ব্যক্তিগত মতামত, দৃষ্টিভঙ্গী ও পছন্দ। সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র ও বিশ্বসভা পদে পদে জনতার, রাষ্ট্রের, বিশ্বের কল্যাণের দোহাই দিয়ে, কখনো জাতীয়তাবাদের মিথ্যে তকমা পড়িয়ে পদে পদে কেড়ে নিচ্ছে ওই সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলবার কারিগর ব্যক্তিমানুষের জীবন হতে। সেই গল্প করেছিলাম এই লিংকের লেখায়:

চার; বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় সামাজিক বিজ্ঞানের যে বিষয়গুলো নিয়ে কখনোই কোনো উপসংহারে পৌছাতে আমাদের শিক্ষরাও ব্যর্থ হতেন, তার একটা হল জাতীয়তা। জাতি, জাতীয়তা ও জাতীয়তাবাদ-যুগে যুগে বিতর্ক ও মতভিন্নতার খোরাক যুগিয়ে গেছে সমাজবিজ্ঞানীদের মাঝে। অধূনা সেই বিতর্ক (আসলে ঘৃনা) বিস্তৃত হয়েছে সাধারন জনগনের মধ্যেও। দেশীয় পর্যায়ে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।

আমাদের রাজনীতিকরা আমাদের যত রকম সর্বনাশ করেছেন, তার মধ্যে বিভেদ একটা। জাতীয়তার প্রশ্নেও শতধা বিভক্ত এই বাঙালী জাতি। কীভাবে? পড়লেই বুঝবেন। বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই একটা পোষ্ট দেখতে পাবেন, “আমাদের” জাতির পিতা শেখ মুজিব নন, ইব্রাহীম (আঃ)।” একজন রক্তমাংসের জাতীয় নেতা ও জাতির স্রষ্টাকে একজন নবীর বিপরীতে মিলিয়ে ঝগড়ায় নামার মতো রুচী আমার নেই। সেই জ্ঞানও আমার নেই। শুধু বললাম যে, এরকম হাস্যকর বাহাসও এদেশে চলে। জাতীয়তার ধারনা আজও আমার যতটা মনে পড়ে, তা বলতে গেলে ওই বিষয়টার সাথে আরো অনেকগুলো ধারনা আনয়ন করতে হবে। জাতি ও জাতীয়তার রয়েছে বহুমুখী ব্যখ্যা। জাতীয়তাবোধের পরিচয় হতেই জাতির পরিচয়।

আপনি আপনাকে কোন জাত বা জাতি মনে করেন, আপনার জাতীয়তাবোধ সেটাই। সেই জাতীয়তাবোধ (এই দেশে, এমনকি বিদেশেও কোথাও কোথাও) বলতে দেখি, ধর্মীয় বিশ্বাস ভিত্তিক জাতীয়তা (মুসলিম জাতি, হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদী জাতি), আঞ্চলিক বা ভৌগলিক অবস্থান ভিত্তিক জাতীয়তা (কাতালান জাতি), ঐতিহ্য ভিত্তিক জাতীয়তা (বাঙালী জাতি), ভাষা ভিত্তিক জাতীয়তা (বাংলা ভাষা কেন্দ্রীক জাতীয়তা), এথনোসিটি ভিত্তিক (সেমেটিক, মায়ান, রেড ইন্ডিয়ান), গোষ্ঠীভিত্তিক (পাহাড়ি আদিবাসীরা)। কারো কারো আছে একাধিক ভিত্তিসহ জাতীয়তা। যেমন:-বাংলাদেশের মুসলমানরা ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলিম জাতি, যার সহজাতি রয়েছে সারাবিশ্বে কয়েকশো কোটি। আবার তারা ভাষার ভিত্তিতে বাংলাভাষী জাতি।

একই মানুষেরা রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশী জাতি। রাখুন রাখুন, আপনি এবার আমাকে বাঙালী জাতীয়তাবাদ আর বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদ-যা নিয়ে এই দেশে দুটি দল চির বিচ্ছেদে বিভক্ত, তার স্বরুপ নিয়ে প্রশ্ন করে বসবেন না। তার উত্তর আমার কাছে নেই। তাছাড়া, আমি কোনো সমাজবিজ্ঞানী না। তাত্ত্বিক উত্তর আমি দিতেও পারব না। তো যা বলছিলাম, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বাঙালী ও বাংলাদেশী-উভয় জাতীয়তাবাদের অস্তিত্বই বিদ্যমান ও ক্রীয়াশীল। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি ১৯৭১ এ। সেদিন হতে আপনি যেই ধর্মের, বিশ্বাসের, গোত্রের, বংশের, নামের, স্বভাবেরই হোন, বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখায় জন্মালে আর নাগরিকত্ব পেলে আপনার জাতীয়তা বাংলাদেশী। বাঙাল অঞ্চলের জাতীয়তায় ভর করে আপনি বাঙালীও। যার সহোদররা আছেন কলকাতায়ও। আপনি যদি তার ভিতর ইসলাম ধর্মতে বিশ্বাস করেন, তবে আপনি মুসলিম জাতিরও সদস্য। ব্যাস, মারামারি শেষ।

সেই বিচারে বাংলাদেশী জাতীয়তায় আপনার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এবং আপনার ভাল না লাগলেও আপনাকে মানতে হবে, আনুষ্ঠানিকভাবে দি পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আপনি যখন আপনার মুসলিম পরিচয় নিয়ে কোনো কাজ করবেন বা কোথাও মিথষ্ক্রিয়া করবেন, তখন মুসলিম জাতির পিতার পরিচয়ে আপনি পরিচীত হবেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর উত্তরসুরী হিসেবে।

বাঙালীদের জাতিস্বত্ত্বার জন্মদাতা কে, সেটা অবশ্য আমার নিজেরই জানা নেই। এত কথার পরও যারা মানবেন না, তারা শুনে রাখুন, ধর্ পালনে যেসব দেশ বা জাতিকে আপনারা অনুসরন করেন, ফতোয়া খোঁজেন, উদাহরন দেন, সেই দেশগুলোতে জাতির পিতা মানা হয় কামাল আতাতুর্ক, ফয়সাল, জিন্নাহ, নাসেরকে। কবির একটা লাইন কপি করি, ওটা মানলে আর এত এত মারামারি লাগে না। সেটা হল, “জগত জুড়িয়া এক জাতি আছে। সে জাতির নাম মানুষ জাতি।”

জাতীয়তা ও রাষ্ট্র নিয়ে আমার একটা বিস্তারিত লেখার লিংক এই লেখাতেই শেয়ার করেছি। রাষ্ট্র ও জাতীয়তার নামে কীভাবে ব্যক্তিমানুষের জীবনকে উৎপিড়িত করা হয়, তার বর্ননা ওই লেখায় পাবেন। আমার লেখাটি কয়েক লাইন পড়ে, অর্ধেক পড়ে, পুরোটা পড়ে, বুঝে, বুঝেও না বুঝে, ইচ্ছে করে না বুঝে প্রচুর পাঠক গালাগাল করবেন-এটা আমার ধারনা (এবার আর কনসেপ্ট না। এই ধারনা মানে অনুমান)।

দাদারা আমার লেখার সার্থে ধর্মীয় বিভিন্ন নর্মসের দ্বন্দ্ব খুঁজে বের করবেন। কোথায় কোথায় সাংঘর্ষিক তা নিয়ে নোংরা কথা বলাও শুরু করবেন। আমার ধর্মপরিচয় নিয়ে বিরাট প্রশ্ন করবেন। করুন। ধর্ম মানুষের পরিচয় না, খোলস না, বর্ম না ধর্ম স্রষ্টা ও সৃষ্টির গোপন সম্পর্ক। গোপন আলাপ। ধর্ম গায়ে চড়িয়ে বেড়াবার জিনিস না, ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়, অনুধাবনের বিষয়, ভক্তির বিষয়। অন্যের সাথে ধর্মের মিথঃষ্ক্রিয়া যতটা, তার একশো গুন নিজের সাথে। আমাদের দেশে ধর্মকে প্রায়শই রিচুয়ালের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। দাদারা, ধর্ম মানে শুধু রিচুয়াল না। ধর্ম মানে বিশ্বাস ও অনুভব। সেটা না করে শুধুমাত্র রিচুয়ালের পিছনে পড়ে থাকলে খোদা খুশি হবেন না।

মাছের গায়ে বা বেগুনের গায়ে যারা আল্লহ’র নাম দেখে আল্লহ’র মাহত্ম্য মনে করে চোখের জলে ভাসেন, তারা অবশ্য এত কথা বুঝবেন না, বুঝতে চাইবেনও না। ওই যে, সব কথার এক কথা, “তালগাছটা আমার।”

আমি আমার মহাপ্রভূকে অন্তরে কতটা স্থান দিয়ে রাখি, তার গল্প বহু করেছি। আপনি সেগুলো পড়বেন না আর আমাকে ভুল বুঝবেন, সেটা আপনার সমস্যা। আমার না।  গল্পের উপসংহার টানি। যতই দিন যাবে, পৃথিবী বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, জ্ঞান ও জীবনবোধে আরো পরিবর্তিত হবে। এতে করে সামাজিক বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখা বিশেষত আমাদের ওসব বংশ, পিতৃ-মাতৃ পরিচয়, ব্যক্তিত্ব, জাতীয়তা, ব্যক্তিস্বাধীনতা শুধু খটকা না, রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

এক ফেসবুক এসেই সমাজ ও সামাজিকতার হাজার হাজার বছরের প্রাতিষ্ঠানিকতাকে হুমকীর মুখে ফেলেছে। আর স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ডিজিটাল কমিউনিকেশনসহ নানা নিত্যনতুন ঘটনা আমাদের জীবনবোধ, সমাজবোধ, দেশবোধ এমনকি বিশ্ববোধকেই বদলে দেবে। গোটা বিশ্বটা এখন একটা দেশ হবার যোগাড়। আমার মা একটা কথা বলেন, “দাদার নামে গাধা, বাবার নামে আদা, নিজ নামে শাহজাদা।” ওটাই মনে রাখুন।

বংশ, পিতা ও ব্যক্তিত্ব-কোনোটাই না, আপনার পরিচয় আপনার মনুষ্যত্বে। কাজে। অবদানে। শিক্ষায়। দৃষ্টিভঙ্গীতে। কেন? মানুষ শব্দটার সন্ধি বিচ্ছেদ, মানে নামের ব্যবচ্ছেদ দেখুন। মন+হুশ =  মানুষ। মানে মন (বিবেক) থাকলে ও তাতে বিবেকবোধটা থাকলে তাকে মানুষ বলে।

#dynasty #title #personality #personal #typeofpersonality #opinion #liberty #openminded

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *