স্বর্গের সাবকনট্রাকটর:
It’s not the God who divided us into millions of groups, roads, casts, paths, flocks, races.
It’s the so-called AGENT of GOD and the politicians who divided us.
বাংলাদেশে গুণীজনদের জন্ম ও তাদের বিকাশ কেন তাত্বিকভাবে দিন দিন অসম্ভব হয়ে পড়ছে-তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বেশ কিছু ছোট ছোট লেখা লিখেছিলাম। কোনো একজন গুণীজন বলে গিয়েছেন, “যেই দেশে গুনের কদর নেই, সেই দেশে গুণী জন্মাতে পারে না।”
প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় আমি এখানে মি. মহিউদ্দিন মোহাম্মদের কিছু কথা জুড়ে দেব।
[“প্রকৃতিতে ডোয়ার্ফিজম ও জাইগান্টিজম নামে দুটি ঘটনা ঘটে। ঘটনাগুলো একটু ব্যাখ্যা করছি:
বড় প্রাণীরা, যেমন হাতি, বাঘ, সিংহ, এরা যখন ছোট ও বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বসবাস শুরু করে, তখন বংশপরম্পরায় এদের আকার ছোট হতে থাকে। শরীর, মগজ, হাত-পা, সবই ধীরে ধীরে খর্বাকায় হয়। কারণ বড় শরীর ধারণের জন্য যে-বিপুল খাদ্য দরকার, তা ছোট জঙ্গলে পাওয়া যায় না। ফলে টিকে থাকার তাগিদে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, প্রাণীগুলোর আকার খর্ব হয়ে আসে, যেন কম খাবারে বেশিদিন বাঁচা যায়। বড় অতিকায় প্রাণী পরিণত হয় বেঁটে জন্তুতে।
অন্যদিকে ছোট প্রাণীরা, যেমন ইঁদুর, ছুঁচো, ও টিকটিকি, ওই পরিবেশে বংশ পরম্পরায় বড় হতে থাকে। কারণ ছোট দ্বীপে বড় প্রাণীর খাবার কম থাকলেও ছোট প্রাণীর খাবার থাকে অঢেল। প্রিডেটর বা শিকারী প্রাণীর ভয়ও কম। ফলে ছোট প্রাণীগুলো নির্ভয়ে প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। এতে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, ছোট প্রাণী পরিণত হয় বড় প্রাণীতে।
উদাহরণ হিশেবে মাদাগাস্কার, সার্ডিনিয়া, ও মৌরিশাসের কথা বলা যায়। ওখানে ইঁদুর, টিকটিকি, কোমোডো, এসব প্রাণী দানবাকৃতির, কিন্তু হাতি, ছাগল, জলহস্তী, এগুলো খর্বাকৃতির।
এই যে কোনো এলাকায়, রসদের অভাবে বড় প্রাণীর ছোট হয়ে যাওয়া, এটি হলো ডোয়ার্ফিজম; আর রসদের প্রাচুর্যে, ছোট প্রাণীর বড় হয়ে যাওয়া, এটি হলো জাইগান্টিজম।
ইভোলিউশোনারি বায়োলোজির এ চমৎকার ধারণাটি সংস্কৃতি, দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা, এগুলোতেও প্রয়োগ করা যায়। গভীর চোখে তাকালে দেখতে পাই, জাইগান্টিজম ও ডোয়ার্ফিজম, প্রাণিজগতের মতো সমাজেও প্রতিদিন ঘটে চলছে।
কোনো এলাকায় মহৎ সাহিত্য, মহৎ দর্শন, মহৎ শিল্পকলা, মহৎ বৈজ্ঞানিক চিন্তা, উঁচু রাজনীতিক ভাবনা, এগুলোর গ্রাহক যদি কমে যায়, বা এপ্রিশিয়েশন উধাও হয়ে যায়, তাহলে ওই এলাকায় প্রতিভাবান মহৎ মানুষের সংখ্যা, ধীরে ধীরে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, কমতে থাকে। ফলে যা কিছু উঁচু ও মহৎ, তার আকার ও প্রভাব আস্তে আস্তে বেঁটে ও খর্বাকায় হতে শুরু করে। হাই-আর্ট ও হাই-কালচার পর্যবসিত হয় নিম্নমানের মেঠো-শিল্পকলা ও মেঠো-সংস্কৃতিতে। উঁচু সভ্যতা ক্ষয় হয়ে রূপ ধারণ করে বামন-সভ্যতার।
সংস্কৃতির রসদ ও খাদ্য মূলত সমাজের বাসিন্দারা। বাসিন্দাদের কর্মকাণ্ডেই সংস্কৃতি বেঁচে থাকে। তাদের রুচির ওপরই দর্শন, শিল্পকলা, সাহিত্য, বিজ্ঞান, এগুলোর বিকাশ ও বিস্তার নির্ভর করে। উঁচু সাহিত্য, উঁচু দর্শন, উঁচু শিল্পকলার জন্য দায়ী মানুষের উঁচু রুচিবোধ। সমাজে মানুষের গড় রুচিবোধ নিচে নেমে গেলে, হাই-আর্ট ও হাই-থট এপ্রিশিয়েট করার মতো মগজ মাথা থেকে হারিয়ে গেলে, সেখানে বিকাশ ঘটে বেঁটে সাহিত্য, বেঁটে দর্শন, বেঁটে বিজ্ঞান, ও বেঁটে শিল্পকলার। গৌণ বিষয়াদি বিরাজ করতে থাকে মুখ্য রূপে। বেঁটে সংস্কৃতি পায় উঁচু সংস্কৃতির মর্যাদা।
সংস্কৃতি কী? লর্ড রাগলান বলতেন— মানুষ যা করে, আর বানর যা করে না, তাই সংস্কৃতি। কিন্তু বাংলাদেশে মনে হচ্ছে, বানরদের কাজকর্মই সংস্কৃতির প্রধান শাখা। লোকজন শরীর ধারণ করছে মানুষের, মন ধারণ করছে বানরের। বাস্তবের সুবোধ বানর নয়, কল্পনার নির্বোধ বানর; কারণ আমরা যা করছি, তা জঙ্গলের বানর করে না।
গোশালাকে বলা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়, স্ক্রিপচারকে ডাকছি বিজ্ঞান, পাগলামোকে বলছি রাজনীতি। অ্যারিস্টোটল এ সমাজে বড় হলে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর উপর তসবিহ লিখতে হতো। বার্ট্রান্ড রাসেলকে দেখা যেতো শিক্ষক সমিতির আহাম্মকী পদে। রবীন্দ্রনাথকে খাতির রাখতে হতো শাহবাগ থানার ওসির সাথে। অর্থাৎ কালচারাল ডোয়ার্ফিজম এখানে প্রকট। প্রতিভাবানরা টিকে থাকার তাগিদে প্রতিভা কমিয়ে ফেলছে। উঁচু সংস্কৃতি কদর হারিয়ে পরিণত হচ্ছে বেঁটে সংস্কৃতিতে। আর এই ফাঁকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বিসিএস গাইড, স্পোকেন ইংলিশ, হিরো আলম, আহমদুল্লাহ, আয়মান সাদিক, ধর্মযুদ্ধ, মোটিভেশোনাল স্পিচ, এসব। এ জঙ্গলে এগুলোই এখন মেইনস্ট্রিম জাইগান্টিক এনিম্যাল।”
-মহিউদ্দিন মোহাম্মদ পৃষ্ঠা ১৪-১৫, বই: মূর্তিভাঙা প্রকল্প]
ইদানীং লেখালিখি প্রায় বাদ দিয়েছি। হঠাৎ হঠাৎ গুড়াকৃমি কামড় দিলে কমোডে বসে দুই চার লাইনের চিকা মার্কা লেখায় ন্যাস্ত হই। ভারমুক্ত হবার বেকার সময়টা কাজে লাগে। আপনারাই বলুন, কমোডের ১৫ মিনিট আর কোন শুভকাজে লাগানো সম্ভব?
প্রথম প্রথম যখন কারখানায় চাকরিতে ঢুকি, ঘুমের প্রচন্ড অভাব পুষিয়ে নিতে দুপুরে কমোডের ওপরই মিনিট পাঁচেক ঢুলে নিতাম। এক কাজে দুই কাজ। পরশু হতে একটা গুড়া কৃমি কামড়াচ্ছিল। অবশ্য এই কৃমিটা প্রায়ই কামড়ায়। বিশেষত ফেসবুকে নব্য ধার্মিক, নব্য দেশপ্রেমী, নব্য চেতনাবাজ, নব্য বিপ্লবীদের, নব্য কমিউনিস্টদের, উদীয়মান বিশেষজ্ঞদের কিছু পোস্ট পড়লে। তেমনই একটা পড়ে কমোডে বসে গেলাম।
বাংলাদেশে বেশ কিছু বছর ধরেই, বিশেষত ফেসবুক নামক ফালতু জিনিস আমজনতার হাতে মোবাইল ইন্টারনেটের হাত ধরে এসে পড়বার পরে, এদেশে, আমার ধারনা প্ল্যান করেই, বাংলাদেশ, বাংলা ও বাঙালি-এই তিন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত যে কোনো বিষয় ও ব্যক্তিকে ফেসবুকে আক্রমণ করার ও হেয় প্রতিপন্ন করার, আর একই সাথে এরকম যে কোনো কিছুকে ধর্মের বিপরীতে দাড়া করিয়ে ’মোরতাদ’ বানাবার একটা ধারা খুব সুক্ষ্ণভাবে হয়ে আসছে। বিশেষত সেটি যদি প্রথম আলো, বিডিনিউজ২৪ অথবা বিবিসি বাংলার পেজের সংবাদ হয়। সেটা নিয়ে অন্য কখনো লিখব।
সেই ধারাতেই, অনেক দিন ধরেই দেখছি, বাংলাদেশ, বাংলা ও বাঙালিত্ব নিয়ে বিশ্বাসী ও চর্চাকারী কেউ মারা গেলেই একদল অসভ্য, ইতর ও আমার ভাষায় ‘মোরতাদ’ ফেসবুকে নেমে পড়ে। জঘন্য, কুৎসিত ভাষায় ওই মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে নানা মন্তব্য, কটুক্তি করে চলে। সংখ্যাটা আশংকা করার মতোই। বিষয়টা এমন নয়, যে, এদেশের আম জনতা পর্যায়ের ফেসবুক ব্যবহারকারীরা শিক্ষার অভাব ও সচেতনতার অভাবে সেটা করে।
আমার কাছে মনে হয়, জিনিসটা পরিকল্পিত ও ইচ্ছাকৃত। যদি তাই না হয়, তাহলে, একজন ড. আনিসুজ্জামান, কবি শামসুর রাহমান, কবি শামসুল হক, শিল্পী কাইউম চৌধুরী, শিল্পী বারি চৌধুরী, মিজ মিতা হকের মতো আরও অনেকে, যারা আমাদের মূলধারার স্বীকৃত শিল্পী ও বুদ্ধিজীবি-তাদের কেউ প্রয়াত হলে, সেই মৃত্যুসংবাদের ওপর অগুনতি মানুষ (নাকি অমানুষ?) তীব্র শ্লেষ, কটুবাক্য, ঘৃনা, নোংরা আক্রমণ বর্ষন কীভাবে করতে পারে?
নোংরামি ও অসভ্যতা কোন পর্যায়ে গেলে একজন মানুষ মৃত্যুর সংবাদে কেউ বলতে পারে, “ফি নারে জাহান্নামা……..”।
আমার ভাবনাটিকে আরও একটু খোরাক যোগালো, যখন আমি খুব অবাক হয়ে দেখলাম, এর বিপরীতে সেই ফেসবুকেই ’জামাতে ইশলাম’ এর সাবেক পান্ডা মি. মকবুল এর মৃত্যু সংবাদ, অথবা মি. মওদুদ এর মৃত্যুর নিউজের নিচে বিশুদ্ধতমভাবে কেবলই শোক, শুভকামনা আর স্তুতি। সেখানে আমাদের সাধারন ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ’অনিচ্ছাকৃত’ হীনতার দেখা পাইনি। যেন ওঁরা খোদার দরবেশ ছিল।
আমার একজন সুহৃদ তো ড. আনিসুজ্জামান মারা যাবার পরে তাকে জাতীয় অভিভাবক বলা যায়েজ আছে কিনা-তা নিয়ে তিন পাতা লিখে ফেলেছিলেন।
এই গ্রূপটা কারা? যারা মানুষের ধর্মবিশ্বাস, বোধ, অধিকার, বিশ্বাস, চর্চা, মতাদর্শ, জীবনাচরনসহ তাদের ইহ ও পারলৌকিক জীবনের মুক্তি বা অধঃগতির অথরিটি খোদার হাত হতে সাবকন্ট্রাক্ট নিয়ে নিয়েছেন? এরাই সার্টিফিকেট দিচ্ছে-কে স্বর্গে যাবে আর কে দোযখে। কে মোমেন আর কে কুফফার। কে সহিহ আর কে মোরতাদ। কে মরলে ইন্না লিল্লাহ পড়া যাবে, কে মরলে ফি নারে জাহান্নামা……….পড়তে হবে। এমনকি কার জানাযা দেয়া যাবে আর কাকে দেয়া যাবে না-সেই ফতোয়াও ফেসবুকে মিলছে। যদিও এই বিশুদ্ধাচারীরা নিজেরা বিশুদ্ধতম দরবেশ-আমি এমন কোনো আলামত দেখিনি। কী জানি, তারা হয়তো রুহানী মারফতি দরবেশ।
কথা হল, এই অধিকারটা কে দিল এদের? কে দিল তাদেরকে ঈশ্বরের ফ্রাঞ্চাইজি? কে তাদেরকে ধর্মের এজেন্ট নিযুক্ত করল? আল্লহ তো নিশ্চয়ই নন-অন্তত আমি যতটা পড়াশুনা করেছি, তাতে এমনই জানি। প্রমাণিত কিতাব ও দলিলাদিতেও আমি কোথাও মানুষ ও তার খোদার সম্পর্ক ও মোয়ামালাতের রহস্য নিয়ে মন্তব্য ও বিচার করবার অধিকার কোনো মানুষকে দেয়া হয়েছে বলে শুনিনি।
এই অসভ্যগুলোকে কি কেউ কখনো কানটা ধরে বলে দেবে না, যে, গীবত, সে যে কোনো ধর্মের মানুষের নামে করাই হারাম? যদি সে মারাও যায়, তবুও? এই অসভ্যরাই আবার যখন গোয়াজম বা মকবুলের মতো জঘন্য একটি যুদ্ধাপরাধী কীট মারা যায়, তখন যুক্তি দেয়, ‘মানুষ মরলে তাকে নিয়ে আর খারাপ কিছু বলতে নেই।”
বলতে পারেন, আপনি যদি আমার পেয়ারা গোয়াজমের মতো একজন নিস্পাপ অধ্যাপকের মৃত্যুর পরও তার যুদ্ধাপরাধ নিয়ে কথা বলতে পারেন, তাহলে আমি একজন খোদার নাফারমানকে নিয়েও কথা বলতেই পারি। স্যরি, না, পারেন না।
গোয়াজমের দায়, কাদের মোল্লার দায়- এই দেশের ৩০ লাখ শহীদের কাছে। তারা বা তাদের কাছের মানুষেরা (বা যারা তাদের কাছের মানুষ মনে করে-তারা) তাদের মজলুমাত নিয়ে কথা বলার অধিকার রাখেন, গোয়াজম বা দেলুর অন্যায় নিয়ে কথা বলতে নিশ্চয়ই পারে। কিন্তু, কেউ বাস্তবে অথবা আপনার কল্পনায় যদি মোরতাদ হয়, সেই ইস্যু আল্লহ ও বান্দার ভিতরে। আমার কোনো অধিকার নেই, আল্লহ’র এক্সক্লুসিভ ইস্যু ও হক নিয়ে কথা বলার।
একজন মিজ. মিতা হক যদি কোনোভাবে আপনার হক নষ্ট করে থাকেন, তাহলে সেটা নিয়ে লিখুন। কিন্তু, তিনি যদি খোদার হক নষ্ট করেই থাকেন (খোদা-বান্দা সম্পর্কের গুঢ়তায়), সেটা নিয়ে কথা বলার অধিকার তৃতীয় বান্দার নেই।
আপনি বলবেন, তিনি আমার ধর্মবোধে আঘাত করে আমার অধিকারহানি করলেও বলতে পারব না? না, ধর্মবোধ আহত হলে খোদার কাছে গভীর রাতে তাহাজ্জুদ পড়ে তার হেদায়েতের জন্য দোয়া করবেন। সেটাই ধর্মের বিধান। আর যদি তত ভাল হতে না পারেন, তাহলে তার সেই আঘাত দেয়া কথার যৌক্তিক ও গঠনমূলক পর্যালোচনা করবেন। তাকে ব্যক্তি আক্রমন নয়।
কেউ যদি আমার মতো করে কিছু না করে, তাহলেই সে কাফের? কেউ যদি আমার মাযহাব না মানে, তাহলেই সে বিতর্কিত? কেউ যদি আমাকে জানিয়ে দেখিয়ে ধর্মকর্ম না করে, তাহলেই সে নরকবাসী আর আমি তার রেটিফাইয়ার? কে বানালো আমাকে সেই রেটার? আমি নিজে কী এমন ফেরেশতা, যে, আরেকজন মানুষকে নরকের নিবাসী মোরতাদ রায় দেবার অধিকার আমার জন্মে গেছে? নাকি আমাদের কাছে ওহি আসা শুরু করেছে? আমরা প্রত্যেকে কি এক একজন ইমাম মাহদী বনে গেলাম?
বুঝলাম, ধর্ম নিয়ে আমাদের সবার একটি সফট কর্ণার ও সেনসিটিভিটি আছে। কিন্তু, যদি সত্যি সত্যিই সেটি থেকে থাকে, যদি সত্যিই আমরা ধর্মের বিধান ও নিদানে এক্বিন রাখি, যদি সত্যিই আমরা মন হতে মুহাম্মদ সাঃ কে আমাদের আইকন ও নেতা মানি, তাহলে, আমরা কীভাবে সেই আল্লহ ও রাসূলের সত্যিকারের নর্মস, আদর্শ ও নির্দেশকে অমান্য করে, নিজের খেয়ালখুশি মতো নিজস্ব মতবাদের আলোকে, মানুষকে নিজেদের খেয়ালমতো তকমা লাগাই? আমার শেষ প্রশ্ন হল, সুস্পষ্টভাবেও কেউ যদি কাফের বা মুরতাদ হয়ে থাকে, তাকে কাফের ডাকবার বা তাকে বদদোয়া করবার অথবা তার ক্ষতি করবার অধিকার বা উৎসাহ কোন ধর্মীয় দলিলে আমরা পেয়েছি?
বরং আমি জানি, প্রকাশ্য কুফরী করেও কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করার পরেও নবী সাঃ তার তক্কদীরের কথা ভেবে চোখের পানি ফেলেছেন। [কিছু কিছু আলগা বোদ্ধা এর পরেও নিজে না বোঝা সত্ত্বেও কিছু আয়াত ও হাদিস নিজেদের পীর সাবের ওয়াল হতে কপি করে এনে বেকুবের মতো প্রমাণ দেখাবে নিজেদের পাপের সপক্ষে। কারো কারো অবশ্য এই লেখাটাকেই মনে হবে, “ভেকধারী ইহুদী নাসারার ষড়যন্ত্র। তাদের খোদা হেদায়েত দিন। আল্লহ আমার হৃদয়ে বসত করেন। সেখানে তোর একসেস নেই দুরাচার।]
যুগে যুগে স্বর্গব্যবসায়ীদের মুখোশের ক্যরিকেচার:
Paradigm shift এর কথাতো নিশ্চয়ই কখনো শুনে থাকবেন। একটা জলজ্যান্ত সাক্ষর দেখাই।
আজ হতে শ তিনেক বছর আগে, সনাতন বিধবাকে চিতার আগুনে মৃত স্বামীর সাথে পুড়িয়ে হত্যা করাটা ছিল পরিবার, সমাজ, উপাসনালয় ও এমনকি খোদ উক্ত বিধবাদেরও কারো কারো কাছে ধর্ম, উচিত ও পূণ্যের কাজ। সেটা না করলে, বা, না করতে দিলে যেটা হত, তা হল পাপ।
আজ হতে শ’খানেক বছর আগে যখন সতীদাহ বন্ধ করবার উদ্যোগ হল, আইন হল, তখন ওই দলটা এর তীব্র বিরোধীতা করে। বিপ্লব শুরু হয়ে যায়। বিপ্লবীদেরকে ক্রুসেডারের মহানত্ব দেয়া হয়। সতীদাহের পক্ষে বিপ্লব করাকে পূণ্যকর্ম আখ্যা দেন ধর্মগুরু, উপাসনালয় ও ধর্মপুলিশরা।
আজ তিনশো বছর পর। ২০২৪ সাল। আজকে যদি খোদ একজন সতী বিধবা নিজেই চিতার আগুনে সহমরণে যেতে চান, তাহলে সেই ৩০০ বছর আগের সবচেয়ে গোঁঁড়া, ও ধর্মের পান্ডা পুরোহিত, উপাসনালয় ও ধর্মপুলিশরাই সবার আগে বলবে, সতীদাহ মহাপাপ।
আরেকটু সাইডে যান।
আজ হতে শ’খানেক, এমনকি বছর পঁচিশেক আগেও, একদল ধর্মগুরু, উপাসনালয়, ধর্মসচিবালয়, ধর্মপুলিশ ও অবশ্যই প্রচুর ধর্মফুলিশদের বিশ্বাসের ন্যারেটিভটা ছিল-ফটো তোলা পাপ। ভিডিও পাপ। ক্যামেরা পাপ। টিভি পাপ। ধর্মীয় জ্ঞান বা সেবা দিয়ে পারিশ্রমিক নেয়া (মানে ধর্মীয় সেবা বিক্রী করা) পাপ।
আজ। শ খানেক বছর পরে। ২০২৪ সাল। ওই ধর্মগুরু (যারা ছিলেন সবচেয়ে পাঁড় ও গোঁড়া বিরোধী), তারা ছবি তুলছেন, ছবি পোস্টাচ্ছেন, ইন্টারভিউ দিচ্ছেন, সেই ইন্টারভিউ বিক্রী করে পয়সা নিচ্ছেন, নিজেদের ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন, খুলে ভিউ বানিজ্য করছেন, ধর্মীয় বয়ানের জন্য মোটা সম্মানি নিচ্ছেন, ধর্মীয় সেবার জন্য তো পয়সা নেয়া বহু আগে হতেই আইনসিদ্ধ করে নিয়েছেন। শুধু সিদ্ধ না, সেগুলোকে পূণ্যের কাজ হিসেবে ফতোয়াও দেয়া হচ্ছে। আবার ধর্মিফুলিশরাও সেটাকে মান্যতা দিচ্ছে।
শ’খানেক বছর, মায় মাত্র ২৫ বছর আগেও হারাম ও কুফরীর কাজ, মাত্র ২৫ বছর ব্যবধানে পূণ্যের কাজ বলে ফতোয়া পাচ্ছে। ন্যারেটিভটাই বদলে গেছে।
প্যারাডাইম শিফট বোধহয় একেই বলে।
২০৫০ সালে জনৈক মুনমুনুল পাদ্রি হক যদি ক্যামেরার সামনে এসে বলেন, যে, একজন ট্রান্সজেন্ডারকে বিয়ে করলে ১ টি ক্রুসেডের সমান পূণ্য পাওয়া যাবে-এমনটাই ক্যাতাবে আছে।” আমি অবাক হব না।
উল্লেখ্য, এখানে আমি *মুনমুনুল হক, *ট্রান্সজেন্ডার-দুটো নামকে স্রেফ উদাহরন ও এক্সট্রিম রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছি। ওই দুটো স্থানে যে কাউকে ও যে কোনো ইস্যু/ন্যরেটিভকে প্রতিস্থাপন করে নিন। ফলাফল একই।
আমাদের বরিশালে দেশের অন্য সব অঞ্চলের মতোই ভাষাকে কিছুটা বিকৃত করে বলবার অভ্যাস রয়েছে।
তো এরা ওয়াজ-মাহফিল কে বলে ‘অজ মফেল’। এক ওয়াজিন অজ মফেল এ বলছিলেন,
”পচ্চিম মি ফিরা মুতলে গুনা লাজেম অইব। শ্রোতারা শুনে আহা উহু করে। অতীতের কৃত অনুরুপ পাপের জন্য তোবা করে। লালসালুর মজিদের শিষ্য তো সারাদেশেই ও সবযুগেই থাকে।
তো, অজের শেষে বক্তার তলপেটে চাপ পড়ায় তিনি প্যান্ডেলের পেছনে কলার ফাতরার বেড়ার পাশে বসে পড়েছেন জলত্যাগে।
মফেলের এক নারী শ্রোতা তাকে দেখে ফেলে চিৎকার করে উঠলেন,
”হুজুর, আমনে নিজেই অজ হইর্যা নিজেই পচ্চিম মি ফিররা মোতছেন, আমনে কুফফার ওইয়া গ্যাচেন।”
ওই জৈনক বক্তা সাথে সাথে গর্জে উঠলেন,
”বেগানা নারী, আমনে মিশটেক বুঝতাছেন। আমি পচ্চিম মুহি ওইলেও কি ওইব, যন্তর অন্যদিগে ঘুরাইয়া দিছি তো। যেইটা আমনেরা পারেন না। ঘুরানিফিরানি মাছলা বুঝবেন না”
এই বরিশালেই গরমের ওয়াজ আর শীতের ক্যাঁথার গল্প তো রীতিমতো পৌরাণিক।
মনে রাখবেন, খলের, অভাব হয় না ছলের।
ছোটবেলায় পাড়ার পাঞ্জেগানা মসজিদের ইমাম সাহেবরা হতেন একটু লো প্রোফাইল। মহল্লার কারো বাচ্চার পেটে ব্যথা কিংবা পশ্চাতে ব্যথা-যাই হোক, হলে যেতেন তার কাছে। তার পানি পড়াই ছিল ওষুধ।
কিন্তু, যখন কোনো ‘বাজা বেডি’র বাচ্চা হচ্ছে না-তার চিকিৎসা তদবীর চাই, তখন আর ওই পাঞ্জেগানায় হত না। তখন যেত বড় জামে মসজিদের খতিবের দরবারে। পানি পড়া আসত, বাচ্চা আসত কিনা জানি না। ঢাকায় একজন খুব বিখ্যাত ইনফার্টিলিটি হুজুর ছিল, যে আবার পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে ইনফার্টিলিটির জন্য ডিম পড়ার (দুষ্টুরা বলত ডিম পাড়া) দেবার ব্যবসার করতেন। তার নাম…..জুর……সায়েদাবাদী। অবশ্য, তিনি ডিম পড়া না দিয়ে ডিম থেরাপিতে নিজেই অংশ নিতেন-এমন অভিযোগও ছিল।
দরকার যখন আরো বড় হত, যেমন ধরুন, ইলেকশনে জিততে হবে, তখন মানুষ যেত শশসিনা, ধরমো-নাই, কাকের মঞ্জিলের হুজুরের দরবারে। যত বড় নীড, তত বড় পীর ধরো।
পাড়ার ওয়াজমফেলে বক্তা রাখা হত সেই পাঞ্জেগানা হুজুরকে, আর বড়জোর অমুক পাড়ার মসজিদের পেশ ইমাম। নোটের ঝনঝনানি নাই, মফেল শেষে এক পেট খানা। শ্যাষ। রিক্সা ভাড়াটা দিয়ে দিলে সেটাই অনেক।
বড় মসজিদের ওয়াজমফেল হলে কথা ভিন্ন। ভিন জেলা হতে কূ-যুক্তিবাদী হুজুর, টুমচরি, বালুচরি হুজুর, আগুনবর্ষী বক্তা ভাড়া করা হত। টঙ্কার জোগান খারাপ না। কাচ্চি চড়ত উনুনে। যাবার সময়ে খাম, হাজি রুমাল, মোটা চালের বিরানীর প্যাকেট-সবই হত।
আন্তর্জাতিক বক্তা নামে একটা জিনিস আছে-সেটা আমি শিখেছি ঢাকায় এসে। এখানে এসে দেখি, এখানে অনলবর্ষীদের ভাত নেই। এখানে ভাড়ায় খাটেন যারা, তারা সব আন্তর্জাতিক মানের। তারা আবার এজেন্ট রেখেছেন মেসী-রোনালদোর মতো। তারাই নেগোসিয়েশন ও শিডিউল করেন। হেলিকপ্টার ওড়ে, ইউটিউব গরম হয়।
যত বড় আয়োজন, তত বড় স্টার বক্তার আবির্ভাব। নামের পাশে ৫ স্টার না থাকলে পাড়ার মোড়ের বক্তা ও প্রশিক্ষকদের বেইল নাই।
শীতকাল শো-অফের অত্যুপযোগী মৌসুম। চারিদিকে সাজসাজ ধ্বনি কান পাতলেই শোনা যায়।
এরকম মৌসুমেই দেশে দেশী ও বিদেশী মৌসুমি পাখিদের আনাগোনা বাড়ে। সভাসমিতি, ‘লিভটুগেদার’, কনফারেন্স, ’পুষ্কুরনি বিতরণ’, অজমফেলের মচ্ছব চারিদিকে।
এমন মোলায়েম আবহাওয়াতেই ঈশ্বর ও নশ্বর-উভয়কে চাঁদা বা ডোনেশনের বিনিময়ে বিক্রী করার ধূম পড়ে। যারা এপাড়ের নশ্বর বিক্রী করবার কাবেলিয়াত রাখে না, তারা ওপাড়ের ঈশ্বর ও তার স্বর্গ সওদা করতে পাড়ায়,মহল্লায় খ্যাপ দিতে শুরু করেন। ঘন্টাখানেক ক্যানভাজ করলেই উভয় পক্ষের সওদা ভালই হয়। আমার খালি মাথায় ঢোকে না, এই যে গরমকাল চলছে, এই সময়ে একটাও ধর্মীয় সভা কেন হয় না? সারাবছর কি গুনাহগার বান্দাদের ধর্মবাণী শোনার দরকার নেই?
একদল এক ঘন্টায় কানের পরিশ্রমে স্বর্গ কেনে। আর বিক্রেতা মাড়োয়ারীরা এক ঘন্টা গলা বিক্রী করে জাগতিক টঙ্কা কেনে। বিকিকিনির মফেলে আবার জাগতিক সুখের তাবিজ, কবজ, মাদুলিও হাত বদল হয়।
এতো গেল জৈনকদের নিজেদের ভন্ডামী।
বেকুব মুরীদদের কথা শুনবেন না?
এক বন্ধু আরেকজনকে বলল, “বার হাত পুকুরে তেরো হাত মাছ।”
বন্ধু শুনে বলল, “কইছে কোন হালায়?”
”তোর বাপে।”
”তাইলে কোণাকুণি করে থাকতেও পারে।”
অন্ধ ও ভন্ডদের সবসময়ই অ্যালিবাই মলম সাথে থাকে। সুতরাং অন্ধকার দূরীকরণের বৃথা চেষ্টা না করাই ভাল। মিছেমিছি কিছু এমবি নষ্ট হবে।
যুগে যুগে ধর্মকে নিজ নিজ স্বার্থে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা ও খাসলত সব ধর্মের ধান্দাবাজরাই করে গেছে। একক কোনো ধর্ম বিশ্বাসের লোকেরা না, সব ক্ষেত্রেই-সে হোক পশ্চিমের, সে হোক দক্ষিণের। হোক গম্বুজের, হোক চূড়ার।
আমি এখানে বর্ণিত যেকোনো কিছু, যেকোনো ইস্যু বা ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় বা কাজ নিয়ে একদমই বলছি না। তারা বা সেগুলো আমার ফোকাস নয়। আমার ফোকাস হল কেবল প্যারাডাইম শিফটের বিষয়টা।
মানে, আজ যেটা নিষিদ্ধ গন্ধম, কালকে সেটার অমীয় পানীয় হয়ে ওঠার প্যারাডাইম শিফটের জার্নিটার মহিমা, বৈচিত্র এবং ইন্টারেস্টিং দিকটাই আমার ফোকাস।
#intellectual #hatespeech #racism #communalviews #franchiseOfGod #MoralPolicing #religiousfanatism #extremeism #Paradigmshift #changeinnarrative #selfdeceit #hypocrisy #hypocritenation #selfambiguity #doublestandard