সহানুভূতি। মানুষ মাত্রই নাকি এটা থাকতে হয়। মানুষ হবার জন্য এই মানবীয় গুন অত্যবশ্যকীয়। আসলেই কি? সবার জন্যই কি সহানুভূতি থাকতে হয়? সবাইকে সহানুভূতি দেখানো সমীচিন কি?
মনে করুন, হিরামণির ধর্ষক আসামীদের একজনকে সরাসরি গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আপনি কি তার জন্য সহানুভূতি দেখাবেন? অথবা, ধরুন, দেইল্লা রাজাকার, যে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জেলে পঁচছে, সে একজন বয়স্ক ও তথাকথিত আল্লামা। এখন আপনার কি তার জন্য মনে সহানুভূতি জাগবে? বা জাগাটা সমীচিন হবে? ভাবুন।
মৃত মানুষকে নিয়ে কোনো নেগেটিভ কথা না বলার, আর ভাল ভাল কথা বলার একটা রীতি দেশের মনুষ্য সমাজে আছে। এই সমাজ আবার সেই সমাজ, যেখানে করোনায় মৃত মানুষকে খাটিয়া দেয়া হয় না। লাশ ভাইয়ের কাঁধে সওয়ার হয়ে মাটি পায়। কয়েক স্থানে দেখলাম, কেউ কেউ মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে কটূক্তি না করার সপক্ষে হাদিসও রেফার করেছেন। [যেন এই দেশের লোকেরা এতই হাদিস ভক্ত, যে, হাদিস না দেখে কুলিও করে না।]
আমি একটা কাউন্টার বলি তবে। গো.আযম [যাকে আবার কিছু বঙ্গবাসী অধ্যাপক গো.আযম বলে থাকে] ফাঁসিতে ঝোলার আগেই পটল তুলেছে, নিজামী, কামারুজ্জামান ও মীর কাশেম ম্যানিলা রোপে জীবন দিয়েছে [ভক্তরা বলে শহীদ হয়েছে]। এখন, এই রাজাকার শিরোমনিদের মরার পরে তাদের নিয়ে দুই চার কথা বলা যাবে তো? নাকি মরে গেছে বলে তাদেরকে নিয়ে সুন্দর সুন্দর শায়ের রচনা করতে হবে?
বিচারাধীন বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা আইনে নিষেধ। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে নাকি দোষী বা নির্দোষ বলাও নিষেধ। এখন, ধরুন, গো. আযম বিচার চলাকালীন পটল তুলেছে। [ভক্তরা বলে শহীদ হয়েছে] তা এখন আমরা কী ভেবে নেব? ভবিষ্যতে গো. আযমকে নিয়ে কথা বলার সময় কি তাকে রাজাকার শ্রেষ্ঠ, গণহত্যাকারী, পাকিস্তানের দোষর, খুনি বলা যাবে? যেহেতু বিচার শেষ হয়নি?
আসামী মরে গেলে যুদ্ধাপরাধের মতো একটি বিচার কেন থেমে যাবে, কেন আসামীকে ফাঁসিতে ঝুলোনো না গেলেও, সত্যটা শেষ পর্যন্ত অফিশিয়ালী প্রমানিত করার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেয়া হবে, তা আমার আজও বোধগম্য হয় না। ভবিষ্যতে আমাদের টেক্সটবুক ও ইতিহাসের বইয়ে তাহলে কী লেখা থাকবে? এরকম নাতো, “অধ্যাপক গো. আযম বিতর্কিত ছিলেন। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হলেও তা প্রমানিত হয়নি।” হায় হায় হায়। বলছিলাম সহানুভূতি নিয়ে। কোথা হতে কোথায় চলে গেলাম।
করোনা দেবী ছারখার করে দিচ্ছে বঙ্গদেশকে। রোজই হাজার তিন চার মানুষ সনাক্ত হচ্ছে, [আক্রান্ত না, সনাক্ত] আর জীবনাবসান হচ্ছে জনা পঞ্চাশেকের। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত হৃদয় বিদারক অভিজ্ঞতা। গোটা একটি দেশ শ্বাসরুদ্ধকর দিন কাটাচ্ছে মৃত্যুর আতঙ্কে। প্রিয়জন হারানোর আতঙ্কে আধমরা হয়ে বাঁচছে। [অতিরঞ্জিত বললাম। গোটা দেশের ৯০% মানুষই বিন্দাস ঘুরে বেড়াচ্ছে। ১০% বোকা ভীরু মানুষ আহাজারি করছে।] প্রতিনিয়ত যারা আক্রান্ত ও নিহত হচ্ছেন, তাদের জন্য সহানুভূতি থাকাই উচিত। তবে আমি তো বদ লোক। একটা বিপরীত চিন্তা বলি। গত ৮ মার্চ হতে এই ১০০ দিনে সবরকম ভীতি, সতর্কতা, সাবধানতা, ব্যবস্থা, বিধিনিষেধের মধ্যেও যারা বিন্দাস হয়ে ঘুরেছে, টঙ চা খেয়েছে, হাতিরঝিলে বোরকা পরে ডেটিং করেছে, বন্ধুদের সাথে চিল করেছে, পুলিশের সাথে টিলো এক্সপ্রেস খেলেছে, এদের যদি কারো করোনায় মরণ দশা হয়, হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে আধমরা হয়, শ্বাসকষ্টে কাটা মুরগীর মতো তড়পাতে থাকে, আপনার কি সহানুভূতি জাগ্রত হবে তার জন্য? হতেও পারে। আপনি মহামানব।
আপনার সহানুভূতির বোধ পুরুষের কামভাবের মতো। যখন তখন বিনা কারনেই জাগ্রত হয়ে ওঠে। আমার সহানুভূতি আসে না। যেই অসভ্য ইতরগুলো যাবতীয় নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের ও অনেকের মরণের কারন হয়েছে, তাদের জন্য আমার কোনো সহানুভূতি আসবে না। এমনিতেও আমার সহানুভূতি আসে না। এই ভন্ড, অভিশপ্ত, স্বার্থপর, দ্বিচারী, ধান্দাবাজ সমাজের জন্য আমার সহানুভূতি আসে না।
ওপরের ছবিগুলো দেখে নিশ্চই আপনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। আমিও হই। আবেগ গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে। চোখে কেবল অশ্রূ আসে না। আসে ক্রোধের অগ্নি। কারন?
>কারন, এই ছবিগুলোর জন্ম আমাদের অক্ষমতায় নয়, দারিদ্রে নয়, আমাদের অমার্জনীয় অদক্ষতায়, অযোগ্যতায়, অবহেলায়, উদাসীনতায়, দুর্নীতিপরায়নতায়, আর আমাদের ধর্ষিত গণমানুষের ক্ষমাহীন নির্লিপ্ততায়। >কারন, ঠিক এইরকম করেই আমি আমার স্বজনকে নিয়ে হৃদয়বিদারকভাবে ঢাকার হাসপাতালে হাসপাতালে বিভিন্ন সময় ঘুরেছি। আমার অভিজ্ঞতা আমাকে কাঁদায় না, রাগায়। [কিছু মানুষের হৃদয়হীন নিষ্ঠূরতায় হয়তো এই দৃশ্যে আমাকে আবারও অভিনয় করতে হবে শিগগীরই। সেই হৃদয়হীনদের কাউকে ক্ষমার প্রশ্নই আসে না।
আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারি না, কীভাবে একদল মানুষ নিতান্তই ইগো ও অকৃতজ্ঞতা বশত নিজেরই আত্মজা কাউকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে। ] তাই সহানুভূতি আসে না। ঘৃনা আসে। ক্রোধ আসে। হাসি আসে। প্রতিহিংসা আসে। আর তারপর, এই নিষ্ঠুর, অকৃতজ্ঞ, ভন্ড সমাজটাকে দলে পিষে ভেঙেচুরে ধ্বংস করতে না পেরে অক্ষমের কান্নায় গলা ধরে আসে।
#sympathy #resilience #empathy #victim #corona #undertrial #emotionalfool