Skip to content

যে কথা যায় না বলা

  • by

কাউকে যদি সামান্যতম ও তুচ্ছতম কথাও দিয়ে থাকো, সেটি রক্ষা করবার কথা মনে রাখো মন। হতে পারে, সেটি একটি সামান্য “ফোন দিবোনে”, হতে পারে, “আমি জানাবো”।

বাংলাদেশে কি এখনও উচিত কথার ভাত আছে? কিছুটা হলেও আছে বলে আশা করি। নিন, এটুকুতেই আমাকে ইতিবাচক মানুষ ভাবতে বসবেন না। অবশ্য আপনি কী ভাববেন, সেটাও যদি আমি ভাবি, তাহলে আপনি কী ভাববেন?

ধরুন, আপনার ড্রাইভারকে ১০০ টাকা দিয়ে একটি ঔষধ আনতে পাঠালেন। ৯০ টাকা দাম। সে এসে আপনাকে ঔষধ দিলো। চলে যাবার উদ্যোগ করল। জিজ্ঞেস করলেন, “ঔষধ ৯০ টাকা না?” (মানে ১০ টাকা ফেরত দিলে না?) ড্রাইভার হয় ১০ টাকা ফেরত দেবে, অথবা, “বস, ১০০ টাকাই রাকচে” বলে সামাল দেবে। উভয় ক্ষেত্রেই বিলাই বেজার। সে এই বিষয়টাকে সহজভাবে নিতে পারবে না। আপনার গাড়ি নিয়ে তিন জায়গায় সেদিন গোত্তা খাওয়া নিশ্চিত।

সহকর্মীকে একটি চিঠি ড্রাফট করতে দিলেন। করে আনলো। ৮ টা বানান ভুল। আপনি ধরিয়ে দিলেন, ঠিক করে আনতে বললেন, সেই সাথে, “আরেকটু সতর্ক হতে হবে ভায়া” বলে দিলেন। সে করে আনবে, কিন্তু, মনে মনে হাজারটা অভিশাপ ও গাল পাড়বে।

মুদি দোকানে, এমনকি সুপারশপে। বিল এলো ২৯ টাকা। আপনি তিনটা দশ টাকার নোট দিলেন। আপনাকে পণ্য ভরা প্যাকেট দেবে, বিলের কপি দেবে। ব্যস, শেষ। আপনি হয়তো আমার মতো ঠ্যাটা। (যদিও আমি ঠ্যাটা নই, আমি সাদা চোখে ও মেথডিক চিন্তায় চলতে চাই, যদিও সেটা এদেশে হবার নয়।) আপনি হয়তো বলে বসলেন, “বাকি ১ টাকা?” পুরো দোকান, এমনকি অন্য ক্রেতারাও বিশাল বেজার। বিশেষত বিক্রেতা তো আপনাকে মনে মনে পারলে ভস্ম করে দেবে। অথচ, ১ টাকা ফেরত চাওয়া একদমই অনুচিত কিছু না।

ছুটি চাই। বসকে বললেন, ’স্যার, কাল ছুটিতে থাকতে চাই, বাসায় কিছু জরুরী বিষয় রয়েছে।” কাল হয়তো তেমন চাপ নেই। তবুও, “কেন? কী করবা?” এখন, আপনি কী করবেন-সেটি হয়তো বলার উপায় নেই। তবু কিছু একটা বলতে হয়। যা ই বলুন, তিনি বেজার। আবার, তিনি হয়তো বললেন, “কাল তো অমুক প্রতিষ্ঠানের সাথে একটি সিরিয়াস মিটিং ছিল, তুমি হয়তো জানো না। এক কাজ করো, পরশু নাও?” আপনি জানেন, আগামি কাল আপনি ছুটি নিয়ে এক্স ক্রাশ মোকলেসের সাথে দেখা করতে যেতে প্ল্যান করেছিলেন। (বাসায় বলবেন, অফিসে গেছি)। আপনি জানেন, কাজটা পরশু করাই যাবে। তবুও আপনি বেজার।

দোকান হতে ১ ডজন ডিম কিনেছেন। কিনবার সময়ই কথা ছিল, পঁচা পড়লে সেটি ফেরত নেবে। আপনি আমার মতো ঠ্যাটা হলে ঠিকই পঁচাটা নিয়ে হাজির হবেন। দোকানদার জানে, কাজটি খুবই উচিত। তারও বদলে দেয়া উচিত। তিনি বেজার তো বেজার, উল্টো বলবেন, “পঁচা অইলে ভাংচেন ক্যা, আস্তা আনতে অইব তো, নাইলে ফিরত নাই।” ডিম না ভাঙলে কীভাবে সেটা পঁচা জানবেন, এই ভাবনা তিনি খাবেন না।

বাসার কাছের একটি টঙ দোকানে মাঝেমধ্যে আমরা চা খাই। দু’জন জোয়ান নারী ভিক্ষা করেন। এবং, তাদের টেকনিক বেশ ইউনিক ও ইফেকটিভ। আবার, আমাদের তাদেরকে না করে দেবার পন্থা টেকনিক্যাল না হলেও ট্যাকটিক্যাল। তো, যদি তার বাইরে গিয়ে কখনো বলি, “সক্ষম মানুষ, এভাবে ভিক্ষা না করলে হয় না?” তাদের রাঘব নয়নের আগুন দৃষ্টি তখন বলে দেয়, ”তোমারে এত কতা কেডায় কইতে কইচে?” অথচ, সে ও জানে, উচিত কথাই বলা হয়েছে।

জ্যামে ও সিগন্যালে পড়ে রিক্সায় গরমে ভাজা ভাজা হচ্ছেন। পেছনের গাড়ির মালিক ক্রমাগত হর্ণ দিচ্ছেন। একটা সময়ে আর সহ্য করতে না পেরে নেমে গিয়ে তাকে বললেন, “ভাই, সিগন্যাল পড়েছে তো, হর্ণ দিয়ে কেন বিরক্তির কারন হচ্ছেন?” কথাটা যে উচিত ও ন্যায্য, সেটি তিনি জানেন। তবুও, তিনি এই কথা শোনাটা সহজভাবে নিতে পারবেন না। দুই কথা বাঁকা শোনাবেনই।

পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী রান্নাঘরের ময়লা একটি নোংরা বালতিতে খোলা অবস্থায় এক্সিট প্যাসেজে ফেলে রাখবেন। ক্লিনার কখন নেবে ঠিক নেই। নোংরা, মাছি ও গন্ধ ছড়াবে। আপনি তাকে গিয়ে যদি ভুলেও বলেন, “একটু পলিব্যাগে ভরে ফেললে সবার ভাল হত না?” ব্যাস, তিনি জানেন, কথা অনুচিত বলেননি। কিন্তু, সেটা উনি হজম করতে পারবেন না। তিনটা বাঁকা কথা শোনাবেনই। না শোনালেও মনে মনে সেদিনই সম্পর্ক শেষ।

পাবলিক বাসের মধ্যে পেছনের সিটেই কেউ সিগারেট ধরিয়েছে। আপনার সাথে হয়তো একজন প্রেগন্যান্ট নারী। আপনি তাকে বললেন, “ভাই/আপা, পাবলিক বাসে সিগারেট না ফুঁকলে হয় না?” তিনি জানেন, কাজটি অনুচিত এবং আপনার কথা উচিত। কিন্তু, সহজভাবে নিতে পারবে না। (এই যেমন, আপনি বাসে মহিলারা সিগারেট খায় নাকি?-এই ভাবনায় পড়ে গেলেন, এই ভাবনাও অনুচিত। কারন, এটা কথার কথা, ব্যলেন্স সূচক কথা।)

ফেসবুকে একজন কবিতা লিখেছেন। আপনি পড়লেন। ভাল লাগাতে পারলেন না। আবার, যদিও জানেন, চেপে যাওয়াই উচিত, তবুও নিজেকে চুপও রাখতে পারলেন না। মন্তব্যে লিখলেন, ”ভাল লাগেনি আপি।” ব্যস, আপনি শেষ। কবিনী (কবির ফেমিনিন ভারশন) জানেন, তিনি অখাদ্য লিখেছেন। তবুও ক্ষেপে যাবেন। আপনাকে ব্লক মারার সম্ভাবনা ১০০%।

এমনকি, ফেসবুকে যদি তার গোলমেলে কমিউনিটি পলিসি আর তার গোলমেলে প্রয়োগ নিয়ে লেখেন, ব্যস, গেল গণেষ উল্টে। তারা জানে, তারা গোলমাল করছে। তারপরও ফেসবুক সহজভাবে নিতে পারবে না। আপনার প্রোফাইল ব্লক হতে শুরু করে বিভিন্ন মৌসুমী সমস্যা সহসাই উপভোগ করবার ব্যবস্থা হয়ে গেল।

এবার, ধরুন, আপনি আমাকে বললেন, “মিঁয়া(ও) ভাই, এই যে, লেখার শুরুতে দুটো লাইন লিখলেন, যার সাথে পুরো লেখার কোনো সংযোগই নেই। এটা কী করলেন?” আমি জানি আপনি উচিত কথাই বলেছেন। অথচ, আপনি এটা বলা মাত্রই আমার আপনাকে একটা উচিত জবাব দিতে মুখ চুলকোচ্ছে।

উচিত কথায় বিড়াল বেজার। সত্যি কথায় ভাসুর।

#commitment #fairtalk #righttalk #fairness

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *