একটি গোটা জীবন আমরা প্রতিক্রীয়াশীল হয়ে কাটিয়ে দিই। বিশেষত এই বঙ্গভূমের ভূমিদাস আমরা।
আমাদের জীবনের ধারা, পথ; আমাদের জীবনবোধ ও সিদ্ধান্ত; আমাদের করণীয় ও বিবেচ্য নির্ধারন করি অন্যের কথা, কাজ, চিন্তা বা পছন্দের ওপর ভিত্তি করে। অধিকাংশ সময়ই অন্যের ওগুলোর প্রতিক্রীয়া কিংবা সম্ভাব্য প্রতিক্রীয়া হিসেবে।
সেজন্য আমাদের এখানে “লোকে কী বলবে?”-একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ চলক।
একবার একজন ইন্ডিয়ানের একটি পোস্ট খুব মাথায় গেঁথে গেল। খুব ছোট ও সংক্ষিপ্ত পোস্ট “National Award is simply a joke.” এরপরই তিনি অভিনেতা শাহরুখের স্বদেশ মূভির একটি ছোট ক্লিপ জুড়ে দিয়েছেন (শাহরুখ যেখানে ট্রেনের কামরায় বসে একটি ছোট শিশুর হাত হতে এক কাপ পানি কিনে খান।)
ইঙ্গিতটা খুব পরিষ্কার, শাহরুখের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডটা প্রাপ্য হয়েছিল সেই ১৪ বছর আগে, স্বদেশ মুক্তির পর, অথচ, তাকে জওয়ানের জন্য ২০২৫ এ ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড দিচ্ছে। এবং, এই ইঙ্গিতটা আমার অনেক শক্তিমান বিশ্বাসের একটা-
রেজাল্ট ও অ্যাচিভমেন্ট কখনো তোমার কাজের মাহত্ম, গুরুত্ব, ওজন, মূল্য’র নির্দেশক না।
অ্যাওয়ার্ড, পাবলিক অ্যাপ্লাউড, পাবলিক চয়েজ, পপুলারিটি, পাবলিক রিকগনিশন, সাইটেশন-কোনোটাই আমার কাজের, কথার, বিশ্বাসের, লেখার, সৃষ্টি যাচাইয়ের কষ্টিপাথর না।
তুমি তোমার বিশ্বাস ও কাজ নিয়ে এগোও। ডোন্ট নোটিশ অর অ্যাটেন্ড দ্য বারকিং ডগস অর প্রেইজিং হোরস।
আমরা পোশাক কিনি, পোশাক পরি অন্যরা আমাকে কীভাবে নেবে, কী চোখে দেখবে, অন্যের চোখে আমার পোশাক কেমন লাগবে-সেই চিন্তা মাথায় রেখে। এই অন্যের চোখই আমাদের বলে দেয়, বয়স হলে লাল জামা নয়, বিধবা হলে রঙিন নয়, তরুণ হলে অফ-হোয়াইট নয়।
পোশাক পরে বারবার আয়নায় দেখি, সেটা যতটা নিজের সন্তুষ্টির জন্য, তার চেয়ে অনেক অনেকটা বেশি বাইরে থাকা সকল কল্পিত বা অকল্পিত ‘লোক’, দর্শক ও সমাজের জন্য। তাদের চোখে আমাকে কেমন লাগবে, ভাল লাগবে কিনা, স্মার্ট লাগবে কিনা, অভিজাত দেখাবে কিনা, ‘মানুষ’ পছন্দ করবে কিনা-সেই ভাবনাই আমাদেরকে পোশাক বাছাই করায়।
এমনকি কথা বলতে গেলেও, আমার নিজস্ব বিশ্বাস, বোধ, বিবেচনা যতটা না গুরুত্ব পায়, তার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়, লোকে শুনলে কী বলবে, লোকে মন্দ বলবে, কখনো কখনো লোকে পছন্দ করবে, লোকে প্রশংসা করবে-লোক নিন্দার এমন ভয় ও প্রশংসার এমন লোভই আমাদের চালিত করে।
আবার, অন্য দিকে, ‘লোক’ এর কথা, কাজ, পছন্দ, আচরন আমাদের অজান্তেই আমাদের চিন্তা, মানসিকতা, রুচি, আচরন, প্রতিক্রীয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।
সেটি কেমন?
একটু চোখ বন্ধ করুন। গভীরভাবে তলিয়ে দেখুন তো।
একজন ঠান্ডা মেজাজের চুপচাপ, শান্ত মানুষ। মানুষ তাকে আজীবন দেখে এসেছে, জেনে এসেছে একজন ‘Cool guy’ হিসেবে। সেই মানুষটিই একজন উচক্কা, অবিবেচক অথবা ইতর প্রাণীর বেমক্কা আচরন বা কথায় ক্ষেপে গিয়ে তীব্রভাবে ক্রোধ ও কন্ঠের উত্তাপ প্রকাশ করতে পারে। ছুড়ে দিলেও দিতে পারেন দু’চারটা চ বা ম বর্গীয় বচনামৃত।
একজন সৎ ও হিসেবী মানুষ। তার পাশে রোজ রোজ ঘুষের বান্ডেলটা পকেটে পুরে ছক্কা পেটান কেউ। একটি পর্যায়ে সৎ মানুষটির মতিভ্রম ঘটায় প্রতিনিয়ত পাশের মানুষটির আচরন। তার মনেও বিভ্রম জাগে, এত সৎ থেকে কী হবে, অসৎ হলে কী এমন ক্ষতি। সবাই যখন পঁচে গেছে, তাহলে আমিই বা বসে থাকি কেন? ব্যস, তিনি কারও আচরনের প্রতিক্রীয়ায় নিজেও নেমে পড়েন পাঁকে।
সঙ্গদোষে লোহা ভাসে বলে না? সেরকম। অন্যের কাজের প্রতিক্রীয়া আমাদের মনের গঠন ও ভাবনাকে এভাবেই আছর করে। এই আছর কুকুরের ঘেঁউ ঘেঁউয়ের বদলায় আমাদের ঘেঁউ ঘেঁউ করতে বলে। ইটটি মারলে পাটকেলটি মারতে বলে। চোখের বদলা চোখ নিতে বলে। গালির বিপরীতে গালি দিতে বলে। রুচিহীনতার প্রতিদানে আমাদেরও রুচিহীন আচরন করতে বলে। হীন আচরন কেউ করলে আমাদেরকে ঠেলতে থাকে, “তুইও কম যাস কীসে? দিয়ে দে না দু’ ঘা।”
এ তো গেল প্রতিক্রীয়াশীল কাজ বা আচরনের কথা। যা চোখে দেখা যায়, পরিবর্তনটা চাক্ষুস করা যায়।
কিন্তু, এর বাইরেও দিব্যি আমরা অগোচরে, সন্তর্পনে, এমনকি নিজেরই অজান্তে, অবচেতনে অন্যের কথা, কাজ, আচরন বা বিশ্বাসকে আমাদের নিজেদের কথা, কাজ, বোধ বা অনুভবের ভিত্তি বানিয়ে ফেলি।
বিষন্নতা নামের এক রোগ আছে মানুষের। এই জিনিসের জন্মই প্রতিক্রীয়াশীলতা হতে।
আমাদের বিষন্নতার জন্ম আমাদের চারপাশের কাছের বা দূরের মানুষের কারনেই। কখনো অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা, অন্য কারো সাথে তুলনা, অন্যের অসঙ্গত কাজ বা কথার প্রভাব, অন্য কারো হতে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়া, প্রতিদানের আশার বিপরীতে হতাশা প্রাপ্তি-আমাদের বিষন্ন করে। এমনিতে হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল মানুষটি বিষন্ন হয়ে পড়েন।
নিজের কারনে নয়। অন্যের কথা বা আচরনের প্রতিক্রীয়ায়। আমরা আমাদের মুড ও মোড নিজেদের অজান্তেই অন্যের কথা, কাজ, আচরন কিংবা বোধের হাতে শঁপে দিই।
পাশের বাসায় একটি ৫২ ইঞ্চি স্মার্ট টিভি এসেছে। আমার বাসায় কেন নেই-আমরা বিষন্নতার সাথে নিজেকে অসুখী ভাবতে শুরু করি। ৫২ ইঞ্চির মালিককে নিজের অজান্তেই হিংসা করতে শুরু করি। নিজেকে ৫২ ইঞ্চির মালিক হবার অযোগ্য পাওয়ায় হীনমন্যতায় ভুগতে থাকি। আমাদের নাগরিক জীবনের কর্মকান্ডের ও লাইফস্টাইলের একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হয় কিসের দ্বারা? থাক থাক, কষ্ট করে ভাবতে হবে না। ওটা বিবেক, বিবেচনা, বুদ্ধি ওসব কিছুই না। ওটার নাম হল ‘পাশের বাসার ভাবি’। কেমন করে? ’এই জানো, পাশের বাসার ভাবিরাতো একটা ৩০০ ইঞ্চি…….তরকারীর চামচ কিনেছে’, ’এই শুনছ, পাশের বাসার ভাবিতো কাল সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখেছে’, ’এই জানো, পাশের বাসার ভাবিতো …… “, “পাশের বাসার ভাবি না রোজ বসুন্ধরার পিয়াজ ব্যবহার করেন”………ইত্যাদি। মানে, এখন আর নিজের কোনো চয়েজ নেই। ’পাশের বাসার ভাবি’ নামক কুফাই সব ঠিক করবে।
সহকর্মীর প্রমোশন হয়েছে। বন্ধু ’মুল্টিন্যাশনালে’ জব পেয়েছে। ছোট বোনের জামাই ঢাকায় ফ্ল্যাট কিনেছে। বড় জা ঈদে ৩ লাখ টাকার ল্যাহেঙ্গা কিনেছে। পাড়ার মতি দোকানদার তার ছেলেকে কানাডায় পড়তে পাঠিয়েছে। আমরা তীব্রভাবে নিজেকে দোষী করতে থাকি। আমার কেন হল না-এই বোধ আমাদের বিষন্ন করতে থাকে। অমুকের আছে, তাই আমারও সেটা থাকতে হবে, তমুকের হয়েছে, সুতরাং আমারও হতে হবে, সমুক করেছে, আমাকেও করে দেখিয়ে দিতে হবে-আমাদের ইচ্ছাশক্তি এভাবেই ঠিক হয়ে যায়। FOMO বা ফিয়ার অব মিসিং আউট নামে একটা বিষয়ের কথা আগেও বলেছি। এই ভয়ও আমাদেরকে চালিত করে। অন্যরা করছে, করে ফেলছে, ওপরে চলে যাচ্ছে-এই ভয় আমাদের চালিত করে। অন্য কেউ আমাকে কড়া বা কুৎসিত একটা গালি দিয়েছে, আমি তার মুখের ওপর একটা কষে কুৎসিত গালি না দিতে পারলে আমি পিছিয়ে যাব-এই ভয় আমাদের রুচির অধঃগমন ঘটায়।
এক ভদ্রলোকের একটি লেখা হতে এই FOMO কথাটি প্রথম শুনি। সেই হতে মাথায় গেঁথে আছে।
কথার মর্ম হল, আমরা এই যে খাচ্ছি, পড়ছি, পরছি, ঘুরছি, করছি, সবকিছুর মর্ম যখন হয়ে যায় দেখনদারী, যখন উদ্দেশ্য হয়ে যায় সবকিছুর মধ্যে আমি আছি-এমন একটা গুপ্ত প্রদর্শনেচ্ছা, আমার যেন কোনো কিছুই হাতছাড়া না হয়ে যায়-তেমন একটা ভয়, অমুকটা তো দেখা হয়নি অথচ তমুক সেটা বহু আগে এনজয় করে ফেলেছে-এমন যেন কখনো না হয়ে বসে-এই ভয় আমাদের সারাক্ষণ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
আর সেই ভয়ই আমাদেরকে সব কিছু করিয়ে নিচ্ছে।
কোথাও বেড়াতে যাব, মূল লক্ষ্য হল, অনেকে গেছে, আমি এখনো যেতে পারিনি। কিছু খাবো, অনেকে খেয়ে ফেসবুকে দিয়ে শেষ করে ফেলেছে, আমি পিছিয়ে গেলাম ছবি দেয়ায়-সেই ভয়ে দ্রুত খাচ্ছি। মূভি দেখব, মনে বাসনা, অন্য কেউ দেখে রিভিউ দেবার আগেই যেন আমি দিতে পারি।
জামা পড়ব, এই জামাটা ভাইরাল, অনেকে কিনেছে। আমি কিনিনি, আমি ক্ষ্যাত হয়ে গেলাম কিনা নেটিজেনদের চোখে-সেই ভীতি আমাকে তাড়িয়ে দোকানে নিয়ে যাচ্ছে।
যেখানে যা কিছু করছি, বলছি, ভাবছি, দেখছি, দেখাচ্ছি, করছি, করাচ্ছি-সব কিছুর পেছনেই সূক্ষ্ণতম উদ্দেশ্য বা ভয় যখন ওই একটাই-আমি কি পিছিয়ে পড়লাম অন্যদের হতে-সেটা এখন মূর্তিমান মৃত্যু আতঙ্কের মতোই আমাদের বুকে চেপে বসে যাচ্ছে।
তুলনা ও পরশ্রীকাতরতা একসময় আশপাশের গন্ডি ছাড়িয়ে সমাজে, দেশে, এমনকি বিদেশের দিগন্তেও বিস্তৃত হয়ে পড়ে। আমরা এমনকি, পশ্চিমের সাথে নিজেদের তুলনা করতে থাকি, জার্মানদের সুখ, আমেরিকানদের স্বাধীনতা, থাই জনতার উন্মত্ত জীবন-আমাদের ইর্ষান্বিত করতেই থাকে।
হ্যা, হয়তো থাইল্যান্ডের রাতের জীবনের মাদকতা আমাদের বিষন্ন করে না, কিন্তু, নিজের অজান্তে, অবচেতনে ও ধীরলয়ে আমাদের মনের মধ্যে ওই তুলনা কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলে এবং তাকে প্রতিক্রীয়াশীল কোনো কাজ বা আচরনে রূপান্তর করেই করে।
আমরা কখনো সখনো তেড়েফুড়ে এসে নিজেকে ফাঁকি দেবার জন্য বলি ঠিকই “মাই লাইফ ইজ মাই লাইফ” কিংবা চমৎকার বাংলায় “আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।”
কিন্তু, আসলে আমরা আমাদের মতো থাকতে চাই না। আমরা চাই অন্যের মতো থাকতে। অন্যের চোখে নিজেকে দেখতে। অন্যের রঙিন জামাকে আমার জামা করতে।
আর তাই, ‘অন্য’কে অতি গুরুত্ব দেয়া আমরা অবচেতনেই নিজেকে ছাপিয়ে একটি ‘অন্য’ অচেনা মানুষের রুপ পরিগ্রহ করতে শুরু করি।
অন্যের হাতে, অন্যের মর্জি ও বোধের ওপর আমার মুড ও মোডের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিই। আমার মুড তখন ঠিক করে দেয় ‘অন্যে’র মুড ও মোড। আমি কী ভাবব, কী পছন্দ করবে, কী বিশ্বাস করব, কীভাবে কিছুকে দেখব-সবই তখন ঠিক করে দেয় অদৃশ্য অন্যরা।
কেউ গালি দিল, আমিও গাল দিই।
কেউ ঘুষ খায়, আমিও খেতে সুযোগ খুঁজি।
কেউ আমার সাথে অন্যায় করল, আমিও প্রতিশোধের রাস্তা খুঁজি।
কেউ কুৎসিত ভাষায় কথা বলে, আমিও নকল করি।
কেউ রুচিকে নিম্নগামী করে জনপ্রিয় হল, আমিও কাছা মেরে নেমে পড়ি।
কেউ কাপড় খুলল, আমিও খুলবার রাস্তা খুঁজি।
প্রতিক্রীয়াশীল আমরা অন্যের হাতের ক্রীড়ানক হয়ে যাই এভাবেই। আমি আমার নিজস্ব রকম মানুষটাকে তখন হারিয়ে ফেলি। হয়ে যাই ‘অন্য’ মানুষের কপি।
আষাঢ়ের আকাশের কালে মেঘ দেখে মন খারাপ হওয়া, শরতের শুভ্র কাঁশফুল দেখে স্নিগ্ধতা, আর, দীঘির টলটলে জল দেখে মন চনমনে হবার পাঠ হয়তো কবি সাহিত্যিকরা আমাদের দিয়ে গেছেন। তবে অন্যের মনের আকাশ, বাতাস, চোরা গলির প্রভাব আমাদের মনের ওপর প্রভাব ফেলতে দিতে হবেই-এমন দিব্যি কবিদের ঠাকুর রবী দা-ও দিয়ে যাননি।
#influencer #socialimpact #socialization #mood #mode #mindcontrol #blindfollowing #FOMO #পাছেলোকেকিছুবলে #ভাবমূর্তি