আমার শুভাকাঙ্খীদের ভিতরে একটা বড় সংখ্যক মানুষ মনে করেন, আমি আমার পেশাগত কাজে ফাঁকি দিয়ে বিশাল বিশাল লেখা লিখি। তাদের জন্য শুরুতেই বলে রাখি, আজ শুক্রবার দুপুর ২ টা। আপনি যখন বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আরামে ভাত ঘুম দিচ্ছেন কিংবা বাচ্চাদের আন্দোলনে মুফতে পাওয়া যানজটমুক্ত ঢাকার সুবিধা নিয়ে ঢাকার বাইরে কোনো অবকাশ যাপন কেন্দ্রের ঝুল বারান্দায় বসে আরামে লচ্ছির গেলাসে চুমুক দিচ্ছেন, তখন আমি কড়া করে এককাপ কফি খেয়ে খুব আয়াসসাধ্য প্রক্রিয়ায় লিখতে বসেছি। কফির ক্যাফেইনেও ঘুম বাগ মানছে না। ঢুলে ঢুলে লিখে যাচ্ছি। বিশাল লেখা। আপনি যদি একটু সময় করে পড়েন, আপনার লস হবে না জানি।
এক; নয়া জামানার ক্ষুদিরাম:
আচ্ছা, আপনারা ক্ষুদিরামকে চেনেন? যদি না চেনেন, আমি আপনাকে চিনিয়ে দিতে পারি। আমি জানি আপনি দধিচিকেও চেনেন না। সেই দধিচি, যার আত্মদানের কারনে অসুর বধের ব্রহ্মাস্ত্র নির্মীত হয়েছিল। তবে হ্যা, আমি আপনাকে এযুগের দধিচি আর নয়া ক্ষুদিরামদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেব। ছোটবেলায় মাঝে মাঝে ছেলেধরার প্রকোপ বাড়ত। মা বলত, “কোনো এক নাম না জানা নদীতে ব্রীজ বানানো হবে। জলদেবী এসে দাবী করেছে, ৭ টা মাথা না দিলে তিনি ব্রীজ বানাতে দেবেন না। ভাসিয়ে নেবেন। সেই ৭ টি মাথা জোগাড় করতে ব্রীজের লোকেরা ছেলে ধরে নিয়ে যাচ্ছে আর ব্রীজের নিচে তাদের মাথা বলি দিচ্ছে।”
বাচ্চাদের ঘরে আটকে রাখতে খুব নৃশংস মিথ্যে গল্প, তবে বাংলাদেশের চরিত্রের সাথে খুব যায়। বাংলাদেশকে আমার মনে হয় এমনি এক দেশ, যেখানে বুকের রক্ত না দিলে কোনো দাবী, কোনো আাহবান কানে তোলা হয় না। এই ট্রেন্ড নতুন না। যুগে যুগে এই চলে আসছে। আর তাই স্বৈরাচারী আইয়ুব খানকে সরাতে, ভাষার দাবী আদায় করতে, স্বাধীকার আদায় করতে, স্বাধীনতা আদায় করতে, স্বৈরাচার এরশাদ হটাতে, তত্বাবধায়ক চাইতে, সুষ্ঠূ নির্বাচন চাইতে, তনু, সাগর-রুনি হত্যার বিচার চাইতে, কোটা সংস্কার করতে, পরীক্ষার ডেট দেবার দাবী জানাতে, প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে, নিরাপদ সড়ক দাবী করতে, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি নিশ্চিত করতে-যে কোনো ন্যায্য ও স্বাভাবিক দাবীতে বুকের রক্ত দিতেই হয়েছে। রক্ত না দেয়া তক, লাশ বলি না দেয়া তক কোনো দাবী কানে তোলা হয়নি। হয় না। এ এক চিরন্তন নিয়তি এই দেশের।
আর এই ধারায় সবশেষ ক্ষুদিরামরা হল বাংলাদেশ নামক স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের আন্ডার/১৮ স্কুল/কলেজের বাচ্চারা। যারা গত ৪ দিন ধরে তাদের সহপাঠির সড়কে খুন হবার পরে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে We want justice স্লোগানে গোটা বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, বাঙালি মধ্যবিত্ত সুবিধাভোগী নাগরিকদের নির্লজ্জ নির্লিপ্ততায় ঘা দিয়েছে। তারাই এ যুগের ক্ষুদিরাম। আর এই অগ্নিষ্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়েছে যেই দুটি কচি প্রাণের আত্মাহুতি, সেই বাচ্চা দুটি-দিয়া আর করিম-আমার কাছে এ যুগের দধিচী। ওরা নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের প্রদীপ। দিয়া ও করিম-তোমাদের কাছে আমরা লজ্জিত, কৃতজ্ঞ ও দুঃখিত।
দুই; বিভক্ত নির্লীপ্ত জাতি:
চিরবিভক্ত এই জাতি ও চিরদ্বিধাগ্রস্থ এই দেশ। এই বিভক্তির শুরু সেই ১৭৫৭ সালে। যখন দেশমাতার স্বাধীনতা অস্তমিত হচ্ছিল পলাশীর আম্রকাননে। নবাব তথা বাংলার পরাজয় যখন সুনিশ্চিত, বাংলার স্বাধীনতা যখন প্রায় হরন হয়ে গেছে, তখনো যদি এই বাংলার কোটি জনতা (তখনকার জনসংখ্যার সঠিক তথ্য আমার কাছে নেই) সামান্য লাঠিসোটা বা দা বটি নিয়েও হুংকার দিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে, তাতেও সামান্য ইংরেজ বাহিনী ফুৎকারে উড়ে যায়। তাতে বদলে যেত বাংলার স্বাধীনতা হরন আর তার পরে বিগত ২৬১ বছরের ইতিহাস। কিন্তু ওই যে? আমার কী-এই নীতি। বাংলার মানুষ সেদিনও বলেছিল, “যুদ্ধ তো হচ্ছে নবাব আর কোম্পানীর লোকেদের। নবাব হারলে আমাদের কী?” সেই হতে বাঙালির বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতার শুরু (এটা অবশ্য আমার নিজস্ব বিশ্বাস)। আজও চলছে সেই বিভক্তি। যেকোনো দাবীতে, যখনই হোক, যেমনই হোক, সব ইস্যূতে, সব অর্জনেও গোটা দেশ পশ্চাৎদেশের মতো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে থাকে। সবাই ভাবে, “আমার কী?” কোটা সংস্কার আন্দোলন? আমার কী? সড়ক নিরাপত্তার আন্দোলন? আমার কী? যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চেয়ে আন্দোলন? আমার কী? তনুর খুনীদের বিচার চেয়ে আন্দোলন? আমার কী? সাগর-রুনীর খুনিদের ধরার আন্দোলন? আমার কী? যেকোনো কিছুতেই আমরা ভাবি, “আমার যাবার দরকার কী? আমার কী?”
তিন; রাষ্ট্র যখন নিজেই বিপদ: #TyrannyofState#OppresiveState #CoersiveState #StateMonster
পৃথিবীতে ৩টি রাষ্ট্র আছে। ‘রাষ্ট্র’ বলেছি। ‘দেশ’ বলিনি। ‘জাতি’ বলিনি।
রাষ্ট্র অনেকটা সরকারের প্রতিরূপ। প্রায়শই সরকার ও রাষ্ট্র সমার্থক হয়ে দেখা দেয়। সরকারের কাজ ও চরিত্রই রাষ্ট্র’র চরিত্র হিসেবে প্রতিভাত হয়।
তো, পৃথিবীতে ৩টি রাষ্ট্র (অথবা সরকার) রয়েছে।
এই রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে খুবই পরিকল্পিত, গোছানো, মেটিকুলাস, টারগেটেড ও মিউচুয়াল একটা উদগ্র, উগ্র, কর্তৃত্ববাদী ও নিয়ন্ত্রণবাদী লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গিকে এনডোর্স করে।
তারপর, জন্মের পরে এরা ধীরে ধীরে নিজেদের আরও আরও আরও বেশি উদগ্র, উগ্র, সাম্রাজ্যবাদী, কর্তৃত্ববাদী ও নিয়ন্ত্রণবাদী করে তুলেছে। খুব গুছিয়ে ও জেনেশুনে।
এরা এদের জনগনকেও খুবই সূচারুভাবে এদের মেটিকুলাস ও সিলেকটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে ল্যাবেলড, গ্রুমড ও ব্র্যান্ডেড করেছে। ফলত, তাদের জনতাও তাদের ব্রেইন ও ফিলোসফিক্যাল চাইলড।
একটি রাষ্ট্র বা তার সরকার যদি বিপথে যায়ও, তবুও তার আলোকিত মানুষদের ভিন্নতা, ভিন্নমত, প্রতিবাদ ও আলোকিত কর্মকান্ড অন্তত সরকার বা রাষ্ট্রের চরিত্রহীনতার দায় হতে জনতাকে মুক্তি দেয়, রাষ্ট্রের কু-চিন্তার কলঙ্ক কিছুটা হলেও মোচন করে। অন্তত সিংহভাগ জনতাও যদি তেমন আলোকিত হয়। যদি উগ্র জাতীয়তাবাদ ও কর্তৃত্ববাদ হতে মুক্ত হয়।
আফসোস, এই ৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে এই বদগুনগুলোর প্রবল উপস্থিতিতে প্রচন্ড মিল। প্রচন্ড। আর, এদের সিংহভাগ জনতারও এই অসভ্যতায় ব্র্যান্ডেড হবার প্রবল আগ্রহ ও অভ্যাস। এমনকি, এরা গর্বের সাথে এই সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্রবাদকে সেলেব্রেটও করে।
হ্যা, এক কোটি মানুষের মধ্যে যদি ১ জন ভিন্নমত দেখায়, আমি তবুও বলি, #সবাই১না
যদিও সেই ১ জনের দৃষ্টিভঙ্গি বা কাজ রাষ্ট্রের বা সরকারের চরিত্রের ইরেজার বা পিওরিফায়ার হতে অক্ষম।
সম্প্রতি একটি তথাকথিত ‘সভ্য’ মস্তান রাষ্ট্র আরেকটি তথাকথিত স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপ্রধানকে ডাকাত পাঠিয়ে কিডন্যাপ করেছে। করে আবার বুক ফুলিয়ে সেটা প্রচার করেছে। তারপর, আবার, সেই কিডন্যাপ যে প্রায় পুরোটা নিজেদের কুৎসিত স্বার্থে, সেটা প্রায় খোলাখুলি প্রচার করছে। একই পরিণতি আরও অনেককে করবার হুমকি সমানে দিচ্ছে।
হ্যা, ওনারা আবার বিশ্ব মোড়ল, সভ্যতার ঝান্ডাবাহি। গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক আইনের পুরোহিত।
বিষ্ময়ের বিষয়, ওই রাষ্ট্রের ৩০ কোটি মানুষের ১ জনও বলে নাই, এটা অন্যায়, এটা দস্যুবৃত্তি, এটা ক্রিমিনাল অফেন্স। ও মা! তার রাষ্ট্রের মহান কোর্ট আবার এই ডাকাতির বিচার না করে ধরে আনা আসামীর বিচারও করতে লেগে গেছে। ওয়াও!
একই চরিত্র বাকি ২ রাষ্ট্রেরও।
খুব আশ্চর্যের বিষয়, এই রাষ্ট্রগুলোর বিপুল জনতা তাদের রাষ্ট্রের উগ্র জাতীয়তাবাদে এতটাই ব্যুঁদ, যে, রাষ্ট্রের বা সরকারের কমপ্লিটলি অন্যায় ও ক্রিমিনাল অফেন্সকেও হাততালি দেয়। তাতে করে আমি ধরে নিতেই পারি, গোটা দেশটাই একটা ‘ন-সভ্য’ দেশ। এত বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে একটা মানুষও কি নেই, যে, বলবে, ও রাষ্ট্র, ও সরকার, তুমি যা করছ ও আমাদের করাচ্ছ, সেটা অসভ্যতা, সেটা অন্যায়, সেটা সাম্রাজ্যবাদ, সেটা কলোনিয়াল এপ্রোচ, সেটা ডমিনেশন, সেটা শোষণ, সেটা ব্রেক অব ইন্টারন্যাশনাল ল।
একটা গোটা সাম্রাজ্যের দৈত্যাকার অন্যায়কে ঠেকানোর শেষ হাতিয়ার বা ভরসা কেবলই পৃথিবীর বিলিয়ন বিলিয়ন একদমই ভাত-পানি খাওয়া জনতার প্রতিবাদ। অন্তত সেই রাষ্ট্রগুলোর জনতার প্রতিবাদ। সুবুদ্ধিসম্পন্ন জনতার প্রতিবাদ। কিন্তু সে তো হবার নয়। সভ্যতার আলোকবর্তিকা হিসেবে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও শ্রেষ্ঠত্ববাদের বড়ি তাদের সবাইকে গিলোনো হয়েছে তো।
দল, সরকার, রাষ্ট্র-তিনটি স্বত্ত্বা। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা এই তিনটিকে তালগোল পাকাই। মানুষ নাকি তার সৃষ্টিলগ্নে আদিম যুগে পাহাড়ে, জঙ্গলে, বনে, গাছের ওপরে বাস করতে। ধারাবাহিক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সেই মানব জাতি একসময় নিজের সুরক্ষা, সুন্দর থাকা, সভ্য হবার তাগিদ হতে প্রথমে পরিবার, তারপর দল, তারপর সমাজ, তারপর রাষ্ট্র গঠন করে।
তো কথাটা হল, ব্যক্তিমানুষ বা একক মানুষ তার নিজের দরকারে রাষ্ট্র পয়দা করেছিল। রাষ্ট্র’র নিজের অস্তিত্বের জন্য ব্যক্তিমানুষের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ। কিন্তু আজকে রাষ্ট্র নিজেই একটি দানবীয় প্রতিষ্ঠান। প্রায় সর্বত্রই রাষ্ট্রযন্ত্র নামক দানব ব্যক্তিমানুষের গলাটা টিপে ধরে তার যাবতীয় ইচ্ছা, অনিচ্ছা, চাওয়া, পাওয়া, ভাল-মন্দ লাগা, তার মতামত, স্বাতন্ত্র সবকিছুকে নির্মমভাবে পিষে মারছে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, ব্যক্তিমানুষের কল্যাণ ও জীবনমান উন্নয়নের স্বার্থে। কিন্তু সেই রাষ্টযন্ত্র আজ প্রতিটি ক্ষেত্রে তার নিজের স্বার্থে জনগনের যেকোনো দাবীকে পদদলিত করার লাইসেন্স নিয়ে নিয়েছে।
বনে বাদাড়ে ও গাছে বসবাস করা মানুষ নিজেকে সভ্য ও নিরাপদ করার জন্য জন্ম দেয় রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানের। সেই রাষ্ট্রই আজ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব হয়ে সেই মানুষকে গিলে খাচ্ছে। বুটে পিষে দিচ্ছে তার যেকোনো প্রাণের চাওয়াকে। নিজের সৃষ্ট রাষ্ট্র নামক অস্ত্রে নিজেই খুন হচ্ছে তার স্রষ্টা মানুষ। রাষ্ট্র যেটা বিশ্বাস করে, সেটা তার নাগরিকদের মানতে বাধ্য করা হয়। কোথায় সে তার সন্তানদের কাছে টানছে? সে ব্যস্ত কতিপয় ধান্দাবাজ ও পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষায়।
সাধারনের মুখ সেলোটেপ দিয়ে বন্ধ করে দেয়ায়। খুব দুর্ভাগ্যজনক হল, আমাদের এই প্রিয় রাষ্ট্রে যেকোনো রকম দ্বিমত পোষণ করাকে রাষ্ট্রবিরোধীতা বলে মনে করা হয়। আর তাই, রাষ্ট্রের আনাচে কানাচে যেকোনো স্থানে সামান্য জোরে কথা বললেও, শাসকরা শিউরে ওঠে। এই বুঝি রাষ্ট্রবিরোধী যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। সরকারের ভুলের বিরুদ্ধে সাধারন জনতার যেকোনো ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়াকেও তাই এখানে রাষ্ট্রবিরোধীতার তকমা পরিয়ে সাইজ করা হয়। রাষ্ট্র কেন ধরে নেয়, যা কিছু ক্ষোভ ও বিক্ষোভ, সবই রাষ্ট্রের বিপক্ষে? নাগরিকদেরই কেন বারবার নিজের বৈধ ও ন্যায্য অধিকারকে রাস্তায় নেমে চাইতে হয়? এ কেমন রাষ্ট্র? সব যুগের বঙ্গ শাসকরাই এই দলে নিজেদের নাম লিখিয়েছেন।
চার; আরোপিত দেবত্ত্ব:
জাফর ইকবাল স্যারসহ বেশ কিছু বরেণ্য ব্যক্তিত্বকে নিয়ে গত ২ দিন ধরে নানা টিটকারী ও ট্রল পোস্ট হচ্ছে। শুধু এবারই না। যেকোনো জাতীয় ইস্যুতে একটা বড় সংখ্যক মানুষ এই ব্যক্তিত্বদের কেন কোনো বিবৃতি ও বক্তব্য নেই-সেই ধুয়া তুলে তাদের কুৎসিত ভাষায় আক্রমন করে। গীবত যে ধর্মে নিষিদ্ধ-তা ভুলে যায় তারা।
একবার একজন সাহিত্য বোদ্ধা প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদকে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, আপনি এত গল্প, সাহিত্য লিখলেন, অথচ একটাও রবীন্দ্র সংগীত তো লিখলেন না?” বোঝেন অবস্থা? ভক্তদের মন রাখতে, হুমায়ুনকে রবীন্দ্র সংগীত লিখতে হবে।
তো একজন জাফর ইকবাল স্যারের কেন দায় পড়ল-এই দেশের যাবতীয় সমস্যা, যাবতীয় দাবী, যাবতীয় জন বা জনবিহীন আন্দোলনে অবশ্যই একটা না একটা স্ট্যাটাস দেবেনই, সমর্থন জানিয়ে কিছু লিখতেই হবে তাকে? তিনি কি জাতীয় নেতা? তিনি কি জাতির বিবেক? তিনি কি দাবী করেছেন, তিনি একজন বুদ্ধিজীবি? তিনি কি দাবী করেছেন, জনগনের মুখপাত্র হবার তিনি একমাত্র যোগ্য দাবীদার? তো আমাদেরকে কে এই অধিকার দিল, এটা নির্ধারন করে দেবার, তিনি কী ভাববেন, কী লিখবেন, কখন লিখবেন, কোন বিষয় নিয়ে লিখবেন, লিখবেন নাকি লিখবেন না, কাকে সমর্থন দেবেন, কাকে দেবেন না, কোন ভাষায় কথা বলবেন, কোথায় সরব হবেন, কোথায় নিরব থাকবেন? কেন ভাই, কেন?
আমি, আপনি, আমরা যেমন একজন সাধারন মানুষ, তিনিও একজন সাধারন মানুষ। নেহায়েত তিনি লেখালেখি করেন, লোকে তাকে চেনে, তিনি হুমায়ুন আহমেদের ভাই-এই পরিচয়ে আমরা প্রচুর মানুষ তাকে চিনি। তার জন্য তিনি আমাদের সম্পত্তি হয়ে গেলেন? তার ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে কিছু নেই? সিলেটে যেদিন প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে তিনি একা একা বৃষ্টিতে বসে ছিলেন, আপনারা কতজন ঢাকা হতে সিলেট গিয়ে তার পাশে বসে ছিলেন? তাকে যখন খুশি যেমন নাচতে বললেও তাকে নাচতে হবে? না নাচলে তিনি দেশবিরোধী, দালাল, সুবিধাবাদী? তাও আবার পপুলার মেজরিটির বয়ান শুনেই? আসলে, এই ব্যাশিংয়ের পেছনে একটা বড় জনগোষ্ঠীর পড়ে থাকার পেছনে একটা বড় বাস্তবতা হল জনশ্রুতি। আরেকজন বলেছেন, তিনি খারাপ, অমনি আর দশজনও সেই রিভিউতে আমল করা শুরু করে। আসলে পাবলিক রিভিউ কতটা কাজের? কতটা তার দৌড়?
কারো কাছে রিভিউ, বুদ্ধি অথবা জাজমেন্ট চাইবার আগে বা, কারো রিভিউকে পাত্তা দেবার আগে নিজে নিশ্চিত হয়ে নিন, যে, ওই ব্যক্তির রিভিউ দেবার মতো যোগ্যতা আদৌ আছে কিনা।
বাসার কাজের মেয়েকে যদি জিজ্ঞেস করেন, “বল তো, রাশিয়ার কি ইউক্রেনে হামলা করা ঠিক হইছে?”-তাহলে বিশ্লেষণটা কোন মাত্রায় পাবেন-সেটা ভেবে নিন।
রিভিউ যদি দরকারই পড়ে, যদি সেটি নেয়া হয়, আর, যদি সেটাকে বেস করে কিছু সিদ্ধান্ত নেবার বিষয় থাকে, তাহলে খুব সতর্কতার সাথে, সবার আগে বিচার বিশ্লেষণ করা উচিত, যে, রিভিউটা কার কাছ হতে নেয়া হচ্ছে।
মাতালের কাছে যদি জানতে চান, “ওয়াইন খেতে কেমন?”
সুদের মহাজনের কাছে যদি জানতে চান, “সুদ কি হারাম?”
মেসির কাছে যদি জানতে চান, আর্জেন্টিনা সেরা, নাকি ব্রাজিল?
দশ বছরের শিশুর কাছে যদি জিজ্ঞেস করেন, “বাবাজি, করল্লা কি সুস্বাদু খাবার?”
মোল্লার কাছে যদি শুধান, “মিলাদ কি বেদাত?”
পাড়ার মন্তাজ পাগলাকে যদি প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা, বলতো, অফহোয়াইট শার্টের সাথে ব্লু শার্ট নাকি ক্রিম কালার শার্ট বেশি মানাবে?”
হালের কোনো নাট্যকারকে যদি আশির দশকের টিভি নাটকের বিপরীতে বর্তমানের নাটকের মান নিয়ে রিভিউ চান।
কিংবা, কার্ল মার্কসের কাছে যদি আমেরিকান পুঁজিবাদী অর্থনীতির ইথিকস নিয়ে জানতে চান, তাহলে আপনার প্রাপ্ত রিভিউ বা বিশ্লেষনের অন্তর্গত গুনাগুন নিয়ে বেশি ভাবা দরকার পড়ে না। রিভিউ নেয়া ভাল। তবে, রিভিউটা কার হতে নিচ্ছেন, সেটা ম্যাটার করে। বাঙালির রিভিউ জগতের সবচেয়ে বায়াসড রিভিউ। আর, সবচেয়ে মারাত্মক রিভিউ হল ফুড ব্লগারদের রিভিউ।
এমনিতে, বাঙালির রিভিউ ক্ষমতার ধরন হল, কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, অমুক যায়গাটা কতদূর? সে অবলিলায় বলে দেবে, ওই তো, ওই দেখা যায়। বাস্তবে দেখবেন, স্থানটা দশ মাইল দূরে। এরকম ধরা জীবনে বহুবার খেয়েছি। ফুড ব্লগারদের রিভিউতে মজে কোথাও খেতে গেলে টাকা গচ্চা যাবার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যাবেন। এমনিতে, কুল, ডুড, টিকটক প্রজন্মের কাছে আপনি তো মানুষই নন, আপনি, আমি হলাম গায়েজ। তো, এই গাইদের জন্য তারা ভুড়ি ভুড়ি দায়ীত্বশীল রিভিউ অনলাইনে আপ করে রেখেছেন-ভাবলে ধরা খাবেন।
আবার, ভাবলেন, ঠিক আছে, আমি সবসময় জ্ঞানী, বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, পক্ক কেশ মানুষদের হতে রিভিউ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তারপরও বিপদ আছে। বাঙালির মতো বায়াস জাতি খুব কম আছে। মজার বিষয়, যে যত বায়াসড, সে নিজেকে ততটাই নিরপেক্ষ দাবী করবে। আর জানেন তো, বাঙালিকে এক গাল পান খাওয়ালেই লেবুর স্বাদ মিঠে লাগতে শুরু করবে। তদুপরি, নিজের জানা ও ভাবনাকে গঠনমূলক ও ক্লাসিফায়েডভাবে বিবৃত করতে সবাই সমান পারঙ্গম না।
আবার, রিভিউ দিতে হয়তো সক্ষম, কিন্তু, আপনি রিভিউটা নিচ্ছেন কীভাবে, আর, সেটাকে কীভাবে একসট্র্যাকট করছেন, সেটারও ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে। ধরুন, আপনি একজন প্রাচীন ব্যক্তিকে যদি সবচেয়ে সেরা গায়ক কে, নায়ক কে-সেই রিভিউ দিতে বলেন, বা, ধরুন, তাকে টিকটক হৃদয় সম্পর্কে রিভিউ দিতে বলেন, আবার, ওদিকে GenZ এর কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, দেশের সবচেয়ে বড় নায়ক কে, এই মুহূর্তের ন্যাশনাল হিরো কে-তা নিয়ে; উভয় ক্ষেত্রেই যে রিভিউ পাবেন, সেটা হাইলে বায়াসড। ধরুন, মদ সম্পর্কে যদি আপনি একজন বার টেন্ডারের কাছে জিজ্ঞেস করেন, তার রিভিউ আর, যদি একজন মোল্লাকে জিজ্ঞেস করেন, তার রিভিউ-দুটোই যার যার স্থানে শক্ত রিভিউ, কিন্তু, আপনি যদি একজনের রিভিউকে বেজ ধরে আপনার সিদ্ধান্ত পাকা করেন, সেটা ভুল হবে। কারন, প্রতিটি রিভিউই যার যার মতো। আপনি যদি একটাকে গ্রহন করেন, সেটা হবে খোলাখুলিভাবে বায়াজড। জরিপ ও রিভিউয়ের ক্ষেত্রে স্যাম্পল সিলেকশন ক্রূশিয়াল।
জ্ঞানী হওয়া আর জ্ঞান বিতরণ করতে পারা এক বিদ্যা নয়। ঠিক যেমন গ্রেট প্লেয়ার হওয়া মানেই গ্রেট কোচ নয়, শচীন যেমন গ্রেট ক্যাপ্টেন কখনোই হতে পারেননি। অধিকন্তু, বাংলাদেশে আপনি আপনার রিভিউ কলে ঠিক কী বোঝাতে বা বুঝতে চাইছেন, একটি বড় সংখ্যক ক্ষেত্রে রিভিউ দাতা সেটা না বুঝেই রিভিউ দিয়ে দেন। আপনার জানার আগ্রহের কনটেক্সট নির্ভুলভাবে রিভিউ দানকারীকে বোঝাতে পারাও সঠিক রিভিউ পাবার একটি করণীয়।
একবার এক ভদ্রমহিলা অফিসের অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজে মেসেজ দিয়েছেন, “……কুম্বানি আগের থোন অনেক বেশি খারাব অয়া গ্যাচে।”
অসীম ধৈর্য নিয়ে তার মেসেজ পড়লাম, পাঠোদ্ধার করলাম। তারপর তার কাছে তার অভিযোগের বিস্তারিত জানতে চেয়ে উত্তর দিলাম। তাকে অভয় দিলাম।
দুই দিন তার প্রতিউত্তর দেখার জন্য বারবার ইনবক্স দেখলাম। তৃতীয় দিন তার উত্তর এলো,
”কুম্বানি এহন পরতেক বছর অর্কার পিকনিক করে না। হগল কুম্পানি করে।”
ব্যাস, এই হল তার অভিযোগ। পিকনিক করে না-এই জন্যই কোম্পানি খারাপ হয়ে গেছে। (মজার বিষয়, কোম্পানির ইতিহাসে পিকনিক হয়েছেই মোট ২-৩ বার, যার সবশেষটা হয়েছে মাত্রই গত বছর।)
একইভাবে, অন্য কারো কাছে কারো ব্যাপারে ভাল বা মন্দ মতামত শুনলে দশবার ভেবে নেবেন। কারন, বাঙালির বুদ্ধিমত্তা ও বিবেচনা বোধের ইতিহাস বলে, যে, এমনকি কেউ চুলে লাল রং করেছে, অথবা, কেউ চুল খাটো করে রেখেছে-শুধুমাত্র এতটুকুর কারনেই কেউ তাকে অবলিলায় সনদ দিয়ে বসতে পারে,
”আরে, ব্যাটা বিরাট চোর। ফালতু একটা।”
আপনি জানেন কি, পরের মুখে তামুক খাওয়া একটি উগান্ডান জাতীয় চরিত্র?
আমরা প্রায়ই পরের মুখে তামুক খাই। তামুক খেতেও মন চায়, কিন্তু মুখে গন্ধ হবে-সেই ভয়ে অন্যের মুখে খাই। আবার, আমরা অন্যের মতামতকেই নিজের মতামত, অন্যের কাছে পাওয়া তথ্যকেই নিজের তথ্য হিসেবে চালিয়ে দিই।
অন্যের রিভিউকেই নিজের রিভিউ ধরে নিয়ে নিজেদের মতামত ও সিদ্ধান্ত দাড়া করিয়ে ফেলি। অন্যের কথাকে নিজের কথা বলে চালাই। এবং, সবচেয়ে মারাত্মক হল, নিজেই আবার সেটাকে বিশ্বাসও করি।
কারো কাছে জিজ্ঞেস করুন, ভাই, অমুক সাবানটা কেমন? ওই লোক কালবিলম্ব না করে বলে দেবে, “জঘন্য”। কারন, হয়তো, তার বউ তাকে একবার বলেছিল, ওই সাবানটা জঘন্য। যদি বলেন, আপনি শিওর? সে বলবে, ”শিওর শিওর। আমি নিজে দেখছি।”
একইভাবে, মানুষ বিচার করে ফেলে, অমুক জিনিসটা জাস্ট মারভেল, তমুক লোকটা তুখোড়। সিম্পল ম্যাথ। সবই পরের কথায়।
আবার, এই উগান্ডাবাসীকে শুধু জিজ্ঞেস করবেন, ভাই, অমুক কোম্পানীটা কি ঢাকায় নাকি চট্টগ্রাম?
সে শুরু করবে-”ভাই, ওই কোম্পানীতে যাবেন না। ওটা অমুক নেতার বানানো। ওদের বিল্ডিংটা জঘন্য লাল রঙের। ওখানে সময়মতো বেতন দেয় না। ওখানে সেমাইয়ের প্যাকেট দেয় না। ওখানে নাইট ডিউটি করতে হয়। ওখানে প্রত্যেক বছর আনরেস্ট হয়। ওরা গ্রীন ফ্যাক্টরী হলেও বাগানে একটা গাছও নেই। ওই কোম্পানী পিকনিক করতে নেয় না। …………………………………………………… এই সবের অনেক অনেক পরে…………………………..ওহ, ভাই, ওটা ঢাকায়।”
আর সুখের বিষয়, এই পুরো রিভিউটাই তার অন্যের কাছে শোনা। কিন্তু, বলবে এত কনফিডেন্টলী, যে, আপনার মনে হবে, তিনি নিজে থ্রিডি চশমায় সব দেখে এসেছেন।
ব্যক্তি জাফর ইকবাল স্যারকে ডিফেন্ড করা আমার দায় না। আমার দায়, উজবুকের মতো অন্যের ব্যক্তি অধিকারে হানা দেবার অনধিকার চর্চার বিরুদ্ধে। বহুদিন তো তিনি কাজ করেছেন নানা জাতীয় দাবীতে। এবার আপনারা নিজেরা কিছু করেন না।
হেটারদের বোঝা উচিৎ, তিনি বিগত ৪০ বছরে যা যা করেছেন, সেটুকু আমরা আগে একটু করি। তারপর তার সমালোচনা করি। সোলায়মান সুখন, আয়মান সাদিক, সুলতানা কামাল, মুনতাসির মামুন, আবদুল্লা আবু সাইয়্যিদ, আসিফ নজরুল, মিজানুর রহমান-এনাদের নিয়েও তীব্র শ্লেষ ঝরেছে ফেসবুকে। কেন ভাই? ওনাদের চিন্তার স্বাধীনতা কি আপনার হাতে ইজারা দেয়া হয়েছে?
তারা আপনার আমার কথামতো কথা বলবেন? বাংলাদেশে হাজার হাজার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক আছেন, বড় বড় লেখক আছেন, প্রফেশনাল আছেন, শিল্পী আছেন। তো এখন, যেকোনো ইস্যু হলেই এই হাজার শিক্ষক, পেশাজীবি, বুদ্ধিজীবিকে অবশ্যই কিছু না কিছু বিবৃতি ও লেখালেখি করে আমাদের মতো হেটারদের মন যোগাতে হবে? আমরা ঘরে আগুন লাগলে সবাই চেচাই, “পানি আনো, পানি দাও।” কিন্তু কেউ নিজে এক বালতি পানি ছিটাই না।
হ্যা, আমরা সবাই কীবোর্ড বিপ্লবী ও বেডরুম যোদ্ধা হয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে ফেসবুকে স্ট্যাটাস প্রসব করি আর বাম হাতে আলাগোছে হুইস্কিতে চুমুক দিই কিংবা আইপিএলের বাসি খেলা দেখি। ভন্ডামী আমরাই করি। পরকে শুধু দোষ দিই। মজার বিষয় হল, আন্দোলনরত বাচ্চা বাচ্চা ছা্ত্ররা তাদের কাজটা মন দিয়ে রাস্তায় করছে। তাদের কোনো দাবী বা ঘৃনা নেই। যত রাগ ও দাবী সব আমাদের-বুড়োদের। আমরা বসে বসে খেয়াল রাখছি, কোন কোন বুদ্ধিজীবি এখনো বিবৃতি দেননি। আর সেটা করার ব্যস্ততায় আমরা রাস্তায় গিয়ে গলা ফাঁটাতে পারছি না।
পাঁচ; ব্যক্তিস্বাধীনতা কোথায়:
কেউ কেউ বলবেন যে, দেখুন, একজন সমাজ বরেণ্য ব্যক্তি ও জাতীয় ব্যক্তিত্ব’র নৈতিক দায় তৈরী হয়ে যায়, সমাজ ও দেশের ক্রান্তীলগ্নে দেশের জন্য কথা বলার। হ্যা, নিশ্চই। কিন্তু তার মানে তো এই নয়, তিনি একজন রাজনৈতিক নেতার মতো হবেন? তাকে যে যেমন করে চাইবে, তেমন করেই ফেসবুকে, ব্লগে তোলপাড় তুলতেই হবে। কই, তারা যখন আওয়াজ দেন, তখন আমরা তো তাদের ডাকে ঝাঁপিয়ে পড়ি না। জনাব ইলিয়াস কাঞ্চন গত ১০/১২ বছর ধরে নিরাপদ সড়কের জন্য একা একা লড়ে গেছেন। আমরা কতজন তাকে সেই আন্দোলনে সঙ্গ দিয়েছি এতদিন? এখন কেন তাকে পঁচানো হচ্ছে? আমাকে গত ৩ দিন বেশকিছু মানুষ মেসেঞ্জারে বা অন্য মাধ্যমে প্রচুর ভিডিও, বাণী, আহবান পাঠিয়েছেন। কিছু কেন লিখছি না-সেই প্রশ্ন করেছেন। তাদের দুটো ট্রেন্ড ছিল।
১. কিছুকে আমি খুব সুনিশ্চিতভাবে চিনি, তারা একটি নির্দিষ্ট ঘরানার রাজনৈতিক বিশ্বাসে বিশ্বাস করেন। তাদের ধান্দাটা আমি বুঝি।
২.কিন্তু বাকিদের কাছে আমার প্রশ্ন, শাহবাগসহ সারাদেশে যখন যুদ্ধাপরাধবিরোধী আইন সংশোধন আর যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি নিশ্চিতের দাবী নিয়ে দেশ কাঁপছিল-তখন আপনারা কেউ গিয়েছিলেন সেখানে? যাননি তো?
কারন আপনি ওই কনসেপ্টের সাথে দ্বিমত পোষন করেন। তো? আপনার অধিকার আছে আমার সাথে দ্বিমত করার, অন্যকারো সাথে দ্বিমত করার। তো, বাকিদের সেই অধিকার নেই? আপনার চোখে বিশ্বকে দেখার মতো কিরা কসম কি আমাদের বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা কখনো করেছিলেন? আপনি যা ভাববেন, যেমন করে ভাববেন, তাদেরও তাই ভাবতে হবে? আপনার আজ মুড এসেছে, আপনি মাঠে যাবেন, তাই তাদেরও আপনার মুডের সাথে মিল রেখে মাঠে নামতেই হবে? আপনি কীভাবে কথা বলবেন-সেটা কি আমি নির্ধারনের অধিকার রাখি? উনারা প্রত্যেকে আগে নিজের একজন মানুষ। তারপরে তারা সমাজের। প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা রয়েছে। আমি কী ভাবব, কী বিশ্বাস করব, কী করব-তা নির্ধারনের অধিকার একমাত্র আমার। অন্যের তা নিয়ে কথা বলার অধিকার নেই-এটা বাঙালি কবে বুঝবে?
ছয়; কোথায় থেমে আছি আমরা?
আমি এই চলমান বিক্ষুদ্ধতাটাকে মোটেই শুধু ছাত্রদের আন্দোলন বলব না। আমি তাদের এই রাষ্ট্রের বৈধ নাগরিক মনে করি। তাই এটি একটি নাগরিক ও জনতারও আন্দোলন। হয়তো আমরা রাস্তায় শুধু ছাত্রদেরই দেখছি। কিন্তু একটু কান পাতলেই শুনবেন, যেই জনদাবী রাজপথে বাচ্চাদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে, সেটা এই রাষ্ট্রের, এই বাংলার ১৭ কোটি মানুষের প্রাণের দাবী। তা হল, ”একটি নিরাপদ দেশ।” বাংলাদেশের যেকোনো আন্দোলন বিশেষত সাম্প্রতিক দু দুটো ছাত্র বিক্ষোভের কথাও যদি বলি, কেন বিক্ষুদ্ধরা সহিংসার পথে হাঁটে, কেন তারা বাস ভাঙে, কেন রাস্তা অবরোধ করে তা নিয়ে প্রচুর মানুষ বিতর্কে মাতেন। We want justice দাবীতে যে আন্দোলন চলছে, তাতে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা অসম্ভব মায়া ভরা কাজকর্মে মন জয় করেছে গোটা দেশের। হ্যা, হয়তো, স্ল্যাং ভাষায় প্যাকার্ড লিখে প্রদর্শন করেছে।
যদিও আমার বিশ্বাস, ওগুলো ধান্দাবাজ ও প্রোপাগান্ডাবাজদের এডিট অপকর্মের গর্ভপাত। ওই পোস্টারগুলো বাচ্চাদের করা নয় বলেই আমার বিশ্বাস। তারপরও তারা যদি করেও থাকে, আমি খুব অবাক হই না। আমার প্রশ্ন জাগে, কেন তাদের ওটা করতেই হয়? কেন এই রাষ্ট্রে ভাল কথায় কেউ কান দেয় না? কেন সোজা কথায় ঘি ওঠে না? মানুষকে কেন সব অচল করে দিয়ে আন্দোলন করতে হয়? কারন একটাই, রক্ত না দেয়া তক বাংলাদেশে কখনো কেউ কথা আমলে নেয় না। ইউরোপ বা আমেরিকার মতো করে সুবোধ ও নিরীহ পথে রাস্তার পাশে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাড়িয়ে থেকে কিংবা সবাই মিলে গণপরিবহন বর্জনের মতো অহিংস আন্দোলন এই দেশে অচল। ওতে শুধু দুদিনের প্রগতি চর্চাই হবে। কাজের কাজ, মানে সরকার, প্রশাসন, বিরোধীদল, রাজনীতিক, ক্ষমতাবানদের তাতে কিছুই হয় না।
এই দেশে রক্ত না ঝরলে, গুলি না চললে, স্লোগান না চললে, তাকে কেউ পাত্তা দেয় না। গান্ধিজী এ যুগে অচল। তবে কি আমি সহিংসতাকে উৎসাহ দিচ্ছি? উস্কে দিচ্ছি? না, অবশ্যই না। আমি শুধু বলতে চাই, কেন বাচ্চারা বাস ভাঙে, কেন তারা রাস্তা বন্ধ করে দেয়, কেন তারা নোংরা ভাষায় প্ল্যাকার্ড লেখে, কেন তারা ইস্কুলে না গিয়ে রাস্তায় রোদ বৃষ্টিতে ভেজে।
সাত; আমাদের প্রাপ্তি:
আমাদের যেকোনো আন্দোলন ব্যর্থ হয় কেন জানেন? অনেক অনেক কারনের একটা হল লক্ষ্যহীনতা। আমরা জানি না, আমরা কী চাই। আরেকটা কারন থাকে। তা হল, সাধারনের প্রাণের দাবীতে জেগে ওঠা একটা আন্দোলনকে ধান্দাবাজ গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা। আমাদের রাজনীতিকরা বহু আগেই জনগনের প্রতিনিধি হয়ে তাদের প্রাণের দাবী নিয়ে কথা বলার ম্যান্ডেট ও বিশ্বাস হারিয়েছেন। জনগন রাজনীতিকদের সামান্যতম বিশ্বাসও করে না। কিন্তু এই ব্যর্থ রাজনীতিকরা চান্সে থাকেন। যখনি কোনো জনআন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তারা এটাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর ধান্দা করে। সরকারও তখন একে কাল্পনিক “বিরোধীদলের” কাজ আখ্যা দিয়ে পেটোয়া বাহিনী দিয়ে সাইজ করে। ফলাফল আগের মতোই। সুখের বিষয়, আমাদের বাচ্চাদের এই আন্দোলন বৃথা যায়নি। সবচেয়ে বড় যে সফলতা হয়েছে, তা হল, ঘুমিয়ে থাকা নির্লজ্জ সুবিধাবাদী জাতির বিবেককে নাড়া দিতে পারা। আর দ্বিতীয়ত, সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে এই বাচ্চারা একটা ধাক্কা দিতে পেরেছে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় কী হচ্ছিল এতদিন তার স্বরুপ উন্মোচন করে দিতে পেরেছে। আর হ্যা, সরকার তাদের সকল দাবীর প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছে। প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সবগুলো বাস্তবায়নের। গোটা দেশ বাচ্চাদের সাথে এক কাতারে দাড়িয়েছে-ভার্চুয়ালি, মেন্টালী ও কিছুটা ফিজিক্যালী। এটাই আমাদের শিশু, বাচ্চা ও ছাত্রছাত্রীদের সাফল্য। প্রাপ্তি।
আট; সব কিছু একাত্তর
আমি মনে করি, বাচ্চাদের রাস্তায় লাইসেন্স চেক করতে দেখে আমাদের, মানে হাড়ে পঁচন ধরা বুড়োদের আহ্লাদিত হওয়ার কিছু নেই। বরং লজ্জা পাবার আছে। আমরা বুড়োরা কিন্তু এই অর্জনটুকু কোনোদিন আনতে পারিনি। যাহোক, বাচ্চাদের লাইসেন্স চেক করতে দেখা হয়তো আমাদের এক ধরনের পুলক ও সান্তনা পাইয়ে দেয় ঠিকই, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আইন প্রয়োগ নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর না। তাতে বিশৃঙ্খলা, এনার্কি বাড়ে। ফরমাল অথরিটি ও রাষ্ট্রীয় প্রোটোকলের বাইরে কারো আইন প্রয়োগ খুবই বিপজ্জনক ও ঝুকিপূর্ন। এটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৌলিক পাঠ।
ফরাসি বিপ্লবের পরবর্তিতে নাগরিক, বিপ্লবী, অভিজাত সমাজ, শাসক সমাজ, সুযোগ সন্ধানী ও সুবিধাবাদীদের যে বহুমূখী সংঘাত ও সংঘর্ষের আগুন জ্বলে ওঠে, তার মূলে ছিল ওই আইন হাতে তুলে নেয়া। বিদ্রোহ হিসেবে সাময়িক সময়ে বাচ্চাদের লাইসেন্স চেকিং বিষয়টাকে সিম্বলিক্যালী উৎসাহিত আমিও করি। কিন্তু সেটি দীর্ঘমেয়াদে চলতে দিলে মূল আন্দোলন ও দাবীটিকে মাটিচাপা দেবার রাস্তা খুলে দেবে। ছাত্রদের চলমান কাজকর্ম কি নৈরাজ্য-সেই প্রশ্ন কেউ কেউ তুলেছেন। আমার এক বন্ধু বলেছে, রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেছে বছরের পর বছর ধরে। সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর একটা প্রতিকী তাৎপর্য আছে। এটাকে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের এখতিয়ারকে চ্যালেঞ্জ করা হিসাবে না দেখে ইউথফুল স্পন্টেনিটি দিয়ে ভাল কিছু করার চেষ্টা হিসাবে দেখলে ভাল হবে।”
আমার খুব ভাল লেগেছে কথাটা। হ্যা, ’নৈরাজ্যবাদী‘ স্বাধীনতা সংগ্রাম না হলে আমরা তো স্বাধীনই হতাম না। কিন্তু মুশকীল হল, সময়টা আর ৭১ না। আর বাংলাদেশে ৭১ আর কখনো আসবে না। অনেকেই আইন ভাঙার যৌক্তিকতাকে একাত্তরের আইন ভাঙার সাথে তুলনা করেন। সবকিছুকে একাত্তরের সাথে তুলনা করবেন না। ওই তুলনা এমনিতেই অমূলক। তারপরও বলছি, একাত্তর আর ১৮’র প্রেক্ষাপট এক নয়। তাছাড়া তখন আমরা বহিঃশত্রূর বিরুদ্ধে কিছু করতে চেয়েছি। আর এখন আমাদের শত্রূ মিত্র কোনোটারই ঠিক নেই। আমরাই আমাদের শত্রূ। আর একাত্তরে আমাদের একজন বঙ্গবন্ধু ছিলেন, একজন তাজউদ্দীন, নজরুল ইসলাম ছিলেন, একজন মওলানা ভাসানী ছিলেন। আজ তা নেই।
নয়; বাচ্চাদের নিরাপত্তা দেখুন:
শিশু ও কিশোররা যারা আন্দোলন করছে, তাদের প্রত্যেকের ছবি ভাইরাল করা হচ্ছে সোস্যাল মিডিয়াতে। প্ল্যাকার্ড হাতে, রাস্তায় বীরের মতো দাড়ানো, বিক্ষোভরত, লাঠি হাতে, লাইসেন্স চেকরত, ট্রাফিকের ভূমিকা পালনরত কোমলমতি বাচ্চাদের বড় বড় ছবি মিডিয়া ও সোস্যাল মিডিয়ায় হটকেক হিসেবে প্রচার হচ্ছে। কেউ কি ভেবেছেন, সাময়িক আবেগে এটাকে চরম বীরত্ব ও ঠিক কাজ মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই বাচ্চাগুলোর জীবন ও ক্যারিয়ারের ক্ষতি করা হচ্ছে। এটা তাদের নিরাপত্তারও বিষয়। আজ হোক, কাল হোক এই আন্দোলন থামবে। সবাই ঘরে ফিরবে। ফেসবুক বিপ্লবী, কীবোর্ড সংগ্রামী, বেডরুম যোদ্ধারা যার যার ধান্দায় রত হবেন। তখন এই বাচ্চাদের কে দেখবে? কে তাদের নিরাপত্তা দেবে? কে তাদের পাহারা দেবে? যে বাচ্চাগুলো টিসি পেয়েছে, কে তাদের হয়ে আবার প্রতিবাদ জানাবে? আর খুব বেদনার বিষয় হলেও সত্য ও বাস্তব, এই বাচ্চাদের প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের একটা বিরাট অংশ তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করবে ও এড়িয়ে চলবে। (বিশ্বাস না হলেও এটা বাস্তব।) সেইদিন ওই বাচ্চাদের পাশে কে দাড়াবে? আমি আন্দোলনরত বাচ্চাদের অনুরোধ করব, তোমাদের পরিচয় ঢেকে নিতে। মিডিয়াতে চেহারা না দেখাতে, ভবিষ্যত বাস্তবতা ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে রাস্তায় নামতে। আমি তোমাদের ভয় পেতে বলছি না। আমি তোমাদের অনুৎসাহিত করছি না। শুধু সতর্ক করছি।
দশ; ছাত্রদের উদ্দেশ্যে:
আগেই বলেছি, রাষ্ট্রের ভিতরে যেকোনো ক্ষোভ ও বিক্ষোভ মানেই রাষ্ট্রদোহ নয়। রাষ্ট্রযন্ত্রকে আমি অনুরোধ করবার মতো কোনো সেলেব, নেতা বা বড় মানুষ নই। একজন খুব ক্ষুদ্র মানুষ হিসেবে অনুরোধ করব, বাচ্চাদের নিরাপত্তা দিতে, বাচ্চাদের সাহস ও শক্তি যোগাতে, বাচ্চাদের পথ দেখাতে, বাচ্চাদের গাইড করে সঠিক পথে রাখতে, বাচ্চাদের এই দুঃসাহসিক কাজকে ইতিহাসে স্থান দিতে, বাচ্চাদের দাবী ও সংগ্রামকে শত্রূ হিসেবে না দেখতে, বাচ্চাদের কাজকে পরিণতি দিতে। হয়তো আমরা রাস্তায় শুধু বাচ্চাদের দেখছি, হয়তো আমরা একে শুধু ছাত্র আন্দোলন বলেই মনে করছি, কিন্তু এটা আমাদের ১৭ কোটি মানুষের প্রাণের কথা-নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ দেশ। একে স্বীকৃতি দিলে, সম্মান দিলে ১৭ কোটি মানুষকেই ভালোবাসা হবে। আর একে মোকাবেলা করার দরকার নেই। বিশ্বাস সৃষ্টি করে একে পরিণতি দেবার চেষ্টা করুন।
ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রযন্ত্র হতে বাচ্চাদের দাবী মেনে নেবার ঘোষনা এসেছে। যদিও এই ঘোষনা রক্ষার কোনো রক্তকসম রাষ্ট্র করে না। তবু, এভাবেই রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজ চলে। বিশ্বাস না হলেও আমাদের বিশ্বাস করতে হবে। সরকার তার করনীয়টি শুরু করেছে, বাকি কাজও তারা করবে বলে শপথ করতে বাধ্য হয়েছে, বাচ্চাদের মানে জনতার দাবীকে স্বীকৃতি দিয়েছে-আপাতত এই হোক আমাদের প্রাপ্তি। বাচ্চারা এমনিতেই স্কুলে ফিরে যাবে।
আমি জানি, আমাদের বিশ্বাসভঙ্গ হবার মতো বহু কারন এই রাষ্ট্র ঘটিয়েছে। তবু, আমি আমার সন্তানদের বলব, তোমাদের এই আন্দোলন খুব অবিশ্বাস্য এক সত্যের আলো দেখিয়েছে এই ঘুমন্ত জাতিকে, এই কোমরভাঙা জাতিকে, এই পলায়নপর নাগরিক (অ)সভ্যতাকে। যথেষ্ট করেছ তোমরা। তোমাদের করনীয় (আর যা করনীয়তার বাইরে), সবই তোমরা করে দেখিয়েছ। তোমরা আমাদের মনে নতুন করে বিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছ। এবার তোমরা ক্লাসরুমে ফিরে যাও। বিশ্বাস হবে না, বিশ্বাস না হবার হাজারটা কারন আছে, তবু বাস্তবতার স্বার্থে এবার তোমরা থামো।
দেশকে আমূল বদলে দেয়া তোমাদের দায়ীত্ব নয়। ওটা তোমাদের পিতার, মাতার, ভাইয়ের, বোনের, রাজনীতিকদের-মানে বড়দের দায়। তোমাদের মূল কাজ খুব ভাল করে, কষে লেখাপড়া করা। তোমরা সেটা মন দিয়ে করো। আমরা বড়রা তোমাদের কাছে লজ্জিত। আমরা ক্ষমা চাই। তোমাদের যা করার কথা, তোমরা তার বাইরে এসে আমাদের কাজে নেমেছ। পুলিশের নির্যাতন সয়েছ, রোদে পুড়েছ, বৃষ্টিতে ভিজেছ। তোমরা এই ঘুনে ধরা রাষ্ট্রব্যবস্থার, এই ক্ষয়িষ্ণু সভ্যতার প্যারালাইজড বিবেকে আঘাত করেছ। মোক্ষম কাজটা তাতেই হয়েছে। এবার তোমরা তোমাদের বইয়ে মন দাও।
এরপরও তোমরা মাঠে থাকলে, আমাদের ধান্দাবাজ রাজনীতিকরা, তোমাদের পবিত্র যাত্রাকে নানাভাবে নানাখাতে কলুষিত করে দেবে। হয়তো ভাবতে পারো, আমি তোমাদের বলার কে? আমি সুবিধাবাদী? আমি ভিরু, আমি তোমাদের সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছি। না বাবারা, সত্যিই তোমাদের এবার ঘরে ফেরা উচিৎ। বাকিটা আমাদের করার কথা। আমরা সেটা করব না জানি। আমরা বড় সুবিধাবাদী। কিন্তু আমাদের অসহায়ত্ব ও সুবিধাবাদীত্বের বলি তোমরা কেন হবে? মনে রেখো, আবারও বলছি, দেশ একদিনে বদলে যাবে না।
এগারো; ব্যক্তিস্বাধীনতার জয় হোক:
আজ শুক্রবার দুপুরে ঘুমের বাড়িতে তালা লাগিয়ে যখন এই লেখা লিখছি, তখন হয়তো আমাদের সন্তানেরা আন্দোলন আপাত থামিয়ে স্কুলে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মনে হতে পারে, এই লেখা ও লেখক দুজনেই সুবিধাবাদী। ওয়েল, নিজেকে বারবার অন্যের বাক্যবানের সামনে ব্যাখ্যা করার দায় আমার নেই। আর সেই চেষ্টা করাও বৃথা। সবাইকে সব বোঝানো সম্ভবও না। তবু বলছি, ব্যক্তিত্ব, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্যক্তিগত পছন্দ-এইগুলো ব্যক্তির এবসলুট অধিকার। কোনো অবস্থাতেই, কোনো স্টাটাস অর্জনের পরেই, কোনো কারনেই তার এই অধিকার রহিত হয়না। আমি কী করব, কী ভাবব, কী পছন্দ করব, কী লিখব, কী বলব-সেটা আমার বেঁছে নেবার অধিকার আছে। ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র নিয়ে প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রচুর হা-হুতাশ শুনি।
জ্ঞানী হওয়া আর জ্ঞান বিতরণ করতে পারা এক বিদ্যা নয়। ঠিক যেমন গ্রেট প্লেয়ার হওয়া মানেই গ্রেট কোচ নয়, শচীন যেমন গ্রেট ক্যাপ্টেন কখনোই হতে পারেননি। তাই, যারা ড. জাফর ইকবাল, সুখন বা আয়মান সাদিক হতে শুরু করে মায় আমাকেও শাপ শাপান্ত করেছেন, কেন এত এত ফেসবুক প্রসবের ভীড়ে আমার কোনো স্টাটাস নেই, তাদের জন্য এই পুরোনো উচ্চারনটি দিয়ে শেষ করি:
”আমরা কেউ নিজের নিজের ইচ্ছার অধীন মনুষ্য নেই।আমরা সবাই আমাদের ‘ভাবমূর্তি’র বৃত্তে বন্দী। আমরা কেউ একটু পরিচীতি পেলেই হল। ব্যাস, জাগ্রত বিবেক জনতা আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়ে দেয়-“আপনি আজ হতে জনতার প্রোপার্টি, জনতার দেবতা। আপনি আর নিজের ইচ্ছার অধীন নন। আপনি আর নিজের মতো ভাবতে পারবেন না, নিজের মতো বলতে পারবেন না, নিজের মতো চলতে পারবেন না, যেমনটা চান, তেমনটা করতে পারবেন না। আপনার পা ভাবমূর্তিতে বন্দী। আপনার স্বাধীনতা রুদ্ধ। পা জড়িয়ে রাখে ভাবমূর্তির লোভ।”দাও ফিরিয়ে মুক্ত জীবন, নাও ফিরিয়ে আরোপিত ভাবমূর্তি।” আমাদের সারাজীবনই ভাবমূর্তি নামের এক ভার্চুয়াল ভয় বা বিভিষিকার ভয় দেখানো হয়, আর আমরাও ওই জুজুর ভয়ে সারাজীবন ‘পূঁতিয়ে’ থাকি। সেই ভাবমূর্তির ভয় বলে, এই বলো না, ওই করো না, ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। এরকম ঘটেছে, ওরকম ঘটেছে, ব্যাস, ভাবমূর্তি গেল গেল।
সত্য হল, আপনার পকেটে টাকা বা ক্ষমতা থাকলে ভাবমূর্তি নেহাতই একটি নস্যি মাত্র। ভাবমূর্তি দিয়ে চাইলে তখন নেশাও করতে পারেন, আবার, সেটা নাকে ঢুকলে সামান্য হাঁচি দিয়ে ঝেড়েও ফেলতে পারেন।
দিন শেষে টাকা ও ক্ষমতাই হল ঈশ্বর।
#studentmovement #rights #personalliberty #freedomofspeech #freedomofopinion #personalfreedom #choice ##judgementalattitude #CognitiveBias #ConfirmationBias #inferioritycomplex #SuperiorityComplex #SupremacySyndrome #JaforIqbal #celebrityaholic #publicreview #publicdemand #stateasoppressor