গাঁথা-১: #বাঘহতেবিড়াল
বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি উন্নত রাষ্ট্র উগান্ডার যেকোনো গর্ভিত নাগরিকের মতো করে, জীবনে একবারের তরে হলেও, একজন মাস্তান অথবা একজন রাজনৈতিক ক্যাডারের ভাতিজা হয়ে জন্ম না নেবার আফসোস যদি আপনাকে না পোড়ায়, তাহলে আপনি হয়তো মাটির বদলে গোলাপের পাপড়ির ভস্ম হতে পয়দায়িত হয়ে থাকবেন। এই উগান্ডার পথে পথে সব ইয়া ইয়া মাস্তান, পদে পদে দুবৃত্ত। রাস্তায় যে কারো সাথে ন্যায্য কিছু বলতে যান, সবাই, হ্যা সবাই আপনাকে তার বড় ভাইয়ের ‘কালা বন্দুকের’ ভয় দেখাবে। নিজের মাসল পাওয়ার যদি না থাকে, তাহলে উগান্ডার পথে পথে শরীর বা ইজ্জত-যেটাই, যতটাই ন্যাক্কারজনকভাবে লাঞ্চিত হোক না কেন, চুপচাপ মাথা নিচু করে চলে যান। ভুলেও মুখ খোলা, প্রশ্ন করা কিংবা পুরতিবাদ করতে গেলে লুঙ্গি হারানোর শঙ্কা আছে। বিশ্বাস না হলে, যাস্ট পরীক্ষা করে দেখুন। বাসের জানালা হতে পিচিক করে আপনি-বাইকে বসা মানুষটার ব্লেজারে পানের পিক ফেলেছে বাসের হেলপার। যান, প্রতিবাদ করে দেখুন। ব্লেজার তো যাবেই, পরনের জাঙ্গিয়াটা নিয়ে ফিরতে পারেন কিনা দেখুন। হ্যা, মাসল পাওয়ার কিংবা ফোন-পাওয়ার থাকলে হিসাব অন্য। তখন দেখবেন, মুহূর্তের মধ্যে রাস্তার বাঘ বিড়ালের মতো মিঁউ মিঁউ-চুকচুক-কুঁইকুঁই করতে শুরু করবে। অবশ্য সেটা সত্যি সত্যিই আছে কি নাই, তা আপনার গলার স্বরেই ওই দুবৃত্তরা বুঝে নেবে। মাসল পাওয়ার থাকলে তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কেমন হয়-তা আপনার জানা থাকার কথা না। যদি আপনি নিজে দুবৃত্ত না হন। দুবৃত্তের উগান্ডায়, দুর্বলের ঠাঁই নাই।
গাঁথা-২: #vandalism #hooliganism মস্তান ও মাস্তানের শহর:
আমার স্ত্রী নিটোল আমাকে তার শৈশবের ’ঘোড়া শাহ মাস্তান’ নামে এক ভবঘুরে দরবেশের গল্প করেন প্রায়ই। যদিও আমার ধারনা, নামটা ছিল “গোর-এ শাহ মাস্তান”। মাস্তানী তন্ত্র এই দেশে এখন এক প্রতিষ্ঠিত সত্য। আপনার মাস্তানী শক্তি, তথা মাসল পাওয়ার না থাকলে আপনি সমাজে নিতান্তই ব্রাত্য। নিজ এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স হতে শুরু করে মহল্লায়, কর্মক্ষেত্রে, বাজারে, রাস্তায়, সমাজের সর্বত্র আপনাকে মাস্তানী করার মতো যথেষ্ট দুর্বার সাহস, শক্তিমত্তা, গতরের জোর, চাপার জোর এবং ”তুই জানোস আমি কে” টাইপ ধমকি দেবার মতো সত্যিকারের জনবলের সাপোর্ট মেইনটেইন করে চলতে হবে। সেটা না থাকলে সর্বত্রই আপনাকে মাথা নিচু করে নেহাত দুর্বল ও ভীরু সেজে ‘ভাই, আদাব” টাইপের এ্যালিবাই ব্যবহার করে চলতে হবে। আপনি যতই সত্য হোন, ন্যায্য দাবীদার হোন, যতই সঠিক, যৌক্তিক হোন না কেন, আপনার মাস্তানী করার শক্তি না থাকলে আপনাকেই সব স্থানে কম্প্রোমাইজ করে চলে আসতে হবে। নিজের অধিকার ও আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে স্রেফ জান বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে হবে। এমনকি, রাস্তায় একজন বা একদল পারভার্ট যদি আপনার গায়ে পানের পিক ফেলে দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে চলে যায়, আপনার ‘বাড়ি কই’ ও ‘চিনোস আমারে’ টাইপ মাস্তানী শক্তি না থাকলে আপনি প্রতিবাদ করলে মুখের দাঁত হারাবেন। পাবলিককে পাশে পাবেন না। তারাও দাঁত কেলিয়ে হাসবে-যখন প্রতিবাদী আপনাকে পেটানো হবে। এই দেশে ‘জনতা’ নামক পাবলিক নিরীহ একজন মা’কে কিংবা নামাজী ব্যক্তিকেও ধর্ম অবমাননাকারী অপবাদে পিটিয়ে বা পুড়িয়ে মারার কাজে সোৎসাহে সঙ্গ দেবে। কিন্তু রাস্তায় যখন অভিজিতদের কুপিয়ে খুন করা হবে, তখন তারা সেলফী তুলবে। ‘সাধারন জনগন’ নামক পাঠাকে বহু আগেই উদ্যোগ নিয়ে ‘খাসি’ করে দেয়া হয়েছে। উদ্দেশ্যপূর্নভাবেই। মাস্তানী শক্তি নেই-এমন মানুষ হলে আপনাকে স্রেফ পিষে ফেলা হবে। সর্বত্র। বিশ্বাস না হলে, বাসার ছুটা বুয়াকেই আজকে একটা ধমক দিয়ে দেখুন। আধ ঘন্টার ভিতরে আপনার দরোজায় ২৯ জন বঙ্গসন্তান বা বঙ্গমাস্তান দন্ডায়মান হয়ে যাবে। আপনি তখন প্রতিবাদ নয়, মুখের দাঁত কটা বাঁচানোর পথ খুঁজবেন। সত্তর দশকের বাংলাদেশে হয়তো ‘ঘোড়াশা মাস্তান’রা রাজ করতেন। একুশ শতকের বাংলায় ‘বড় ভাই’ ও ‘টিকটক হৃদয়’ নামক মাস্তানদের রাজ চলছে। তবু ভাল থাকুক বাংলাদেশ।
গাঁথা-৩: #চিনোসআমারে #তুইকিডা
রাস্তায় চলার সময়ে খুব সাবধানে। কারো গায়ে যেন আপনার গায়ের ধাক্কা তো দূরে, বাতাসও যেন না লাগে। কারো সাথে সামান্যতম চোখ তুলে কথা বলতে যাবেন না। বড়জোর কাউকে যদি জিজ্ঞেসটুকুও করতে চান, যে, তিনি আপনার গায়ের ওপর থু থু মেরেছেন কিংবা মলত্যাগও করেছেন কেন, তাহলে আগেই জেনে নিন, তিনি কার ব্যাটা। বেঘোরে জানটা খোয়াবেন, তা না হলে। আপনার যদি অতিরঞ্জিত মনে হয়, তাহলে র্যান্ডম বের হয়ে, র্যান্ডম হেঁটে, র্যান্ডম রাস্তায়, একজন র্যান্ডম হকারের সাথেও কোনো র্যান্ডম বিষয় নিয়ে র্যান্ডম একটা জোরে কথা বলেন। আপনি যদি র্যান্ডম জান বাঁচিয়ে, মান বাচিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন, অন্তত কয়েকটা র্যান্ডম গলাধাক্কাও না খান, তাহলে আমার নাম বদলে দিয়েন। বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে ১৯ কোটিই CB আব্দুল্লা। ফার্মগেটের ওভারব্রীজের নুলো ভিক্ষুককেও গলা উঁচিয়ে সামান্য ধমক দিয়ে দেখুন। আস্ত ঘরে ফিরতে পারবেন না। পথ চলতে খুব সাবধান। গাঁথা-৪; অসুস্থ এই রাজধানী নগরের, প্রতিদিনকার সকালের দিকটাতে, রাজপথে উন্মত্ত জনতার ব্যস্ততা, দৌড়াদৌড়ি, উর্দ্ধশ্বাসে পথে চলা, অস্থির ছুট, আইন অমান্য, উন্মত্ত ড্রাইভিং, ক্রেইজি চলাচল দেখলে যে কারো মনে হতে পারে, যে, এই নগরের আপিসের বাবুরা অতি অত্যন্ত ‘Prunkচুয়াল’। তবে, এই উন্মত্ত যাত্রার পরে ৯টার মধ্যে আপিসের পাঞ্চ মেশিনে গলায় ঝুলন্ত ‘ডান্ডিকার্ডখানা’ ছুঁইয়ে দিয়েই শশব্যস্ততার শেষ। ৯টা ১১ মিনিটে আপনি এই ক্রেইজি Prunkচুয়াল, যারা এতক্ষন রাস্তায় সবাইকে পা বা চাকা দিয়ে পিষে দিয়ে এসেছে, তাদের সবাইকে ফেসবুক কিংবা আপিসাঞ্চলের সিঙারার টঙে পাবেন। কন্ঠহার ডান্ডিকার্ড আর পাঞ্চ মেশিনের সময়ানুগ স্পর্শসুখের নিশ্চয়তার জন্যই রাস্তায় এই উন্মত্ততা। এই শহরের মানুষগুলো এমন অস্থির, অধৈর্য কেন? রাস্তায় নামলেই মনে হয়, সবাই যেন ইস্রাফিলের বাঁশির ডাকে হাশরের মাঠে দৌড়াচ্ছে। বড় গাড়ি ছোটটাকে চেপে ভর্তা করে সামনে বাড়ছে। ছোট গাড়ি তার সহদরকে সমানে ঠুঁয়া দিয়ে সামনের সামান্য একহাত স্পেসের দখল নিচ্ছে। বাইকার পঙ্খিরাজের মতো সবাইকে গুঁতিয়ে জায়গা বেজায়গা দিয়ে ছুটছে। পথে কাউকে গুঁতা লাগলে স্যরি বলার ধার দিয়ে যাবারও সময় নেই। রিক্সা পথচারিকে গুঁতিয়ে আলু বানাচ্ছে। পথচারি পাশের, সামনের সবাইকে ঢুঁয়া মেরে উর্দ্ধশ্বাসে সামনে ছুটছে। কতজনকে সে ল্যাঙ মারল সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই ছুটছে, ছুটছে, ছুটছে। কোথায়?
#devidednation #nationaldestruction #destructivenation #socialdestruction #socialdeviation #hooliganism #musclepower #domination