স্কটল্যান্ডের এক স্কুল বালক একবার স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখল তাদের শহর রক্ষাকারী বাধের এক স্থানে ফাটল হয়ে পানি ঢুকছে। ব্যবস্থা না নিলে ফাটল বড় হয়ে সমুদ্রের পানিতে শহর তলিয়ে যাবে। উপায়ান্তর না দেখে সে নিজেই ফাটলের মধ্যে হাত দিয়ে পড়ে রইল। সারারাত ঠান্ডায় জমে যখন তার মরার দশা তখন পরের দিন তার শহরবাসী তাকে উদ্ধার করল। শহরকে রক্ষার জন্য তার এই অবদানের জন্য তাকে পুরষ্কৃত করা হয়। দায়ীত্ব ও কর্তব্য কাঁধে তুলে নেবার অনন্য নজির হিসেবে এই গল্পটি ব্যবহৃত হলেও এর একটি বিপরীত গল্পও আছে। সেটাও বিবেচনার দাবিদার। ছেলেটি তার উপস্থিত কর্তব্য পালন করেছে সেটা যেমন প্রশংসার দাবীদার, তেমনি বাঁধের নিরাপত্তা ও রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদের সীমাহীন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা যার জন্য ফাঁটল তৈরী হয়েছে, বাঁধরক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের বাঁধের ফাটল সবার আগে দেখার কথা যা তারা দেখেনি-এসবকিছুর বিচারও সমান গুরুত্ব দিয়ে করা উচিৎ। প্রায়ই একদল লোক তাদের কর্তব্যবোধের তাগিদে নিজের ও অন্যের কাজের বোঝা নিজের কাঁধে নিয়ে নেন দেশ বা সমাজের স্বার্থে। ফলে যাদের সেই দায়ীত্ব পালনের কথা তারা থাকেন আরামে। তাদের বিচার কে করবে? একের দায়ীত্ব অন্যে পালন করা বাহবা পেলেও এতে সিস্টেম নষ্ট হয়, জবাবদিহীতার সংস্কৃতি তৈরী হয়না, ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কালচার গড়ে ওঠে না, একদল মানুষের কাজে ফাঁকি দেবার সুযোগ তৈরী হয়। রোজ রোজতো আর স্কুল বালক দায়ীত্ব নেবে না। সেদিন কি হবে?
পেশাদারিত্ব ও মানবিকতার একটা ব্যাপক পরস্পর বিরোধী চাপ এইচ আর প্রোফেশনালদের উপর আসে। পেশাদার এইচ আর কর্মীদের জন্য মানবিকতা আর পেশাদারিত্ব একযোগে দেখানোটা কখনো কভনো খুব চ্যালেঞ্জিং বিষয় হয়ে যায়। আমার এইচ আর পেশায় এই প্রশ্নটা অনেকবারই সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে মানবিকতা ভার্সেস পেশাদারিত্বের প্রশ্নটা আবার একটা প্রশ্নের মুখে দাড় করাল।
একটা গল্প দিয়ে বিষয়টা বলি। বলা বাহুল্য এটা ধার করা গল্প।
এক ভদ্রলোক বিদেশ যাবেন। ব্যাগপত্র গুছিয়ে রওনা হবেন এয়ারপোর্টে। হঠাৎ তার বাসার নাইট গার্ড এসে তাকে অনুরোধ করল, স্যার আজকের ফ্লাইটে যাবেন না। কেন? কারন আমি কাল রাতে স্বপ্নে দেখেছি আপনার প্লেন ক্রাশ করেছে। ভদ্রলোক তার কথায় একটু দমে গেলেও তবু রওনা হলেন। কিন্তু শেষ পযন্ত এয়ারপোর্টে গিয়েও ফেরত এলেন না গিয়ে। মনের কুসংস্কার তাকে আটকালো। বাসায় এসে টিভি ছেড়ে বসতেই খবরে দেখেন তিনি যে ফ্লাইটে যাবার কথা সেটি সত্যি সত্যি ক্রাশ করেছে। তিনি বিধাতাকে ধন্যবাদ জানালেন। এরপর সেই নাইট গার্ডকে ডেকে তাকে ১০০০০ টাকা পুরষ্কার দিয়ে তাকে ধন্যবাদ দিলেন। তাকে ঘটনা খুলে বললেন। নাইটগার্ডতো খুশিতে কৃতজ্ঞতায় গদগদ।
কিন্তু একটু পরে তার মনিব তাকে বললেন, আগামীকাল হতে তুমি বরখাস্ত হলে। আর কাজে আসবে না। নাইটগার্ডতো আকাশ হতে পড়ল। মাত্রই তাকে পুরষ্কৃত করে তার পরেই চাকরিচ্যুত!! সে মালিককে জিজ্ঞাসা করল এর কারন কী? মালিক তাকে বললেন, তুমি স্বপ্ন দেখেছ এবং সেই স্বপ্ন দেখে আমাকে সতর্ক করেছ এবং তাতে আমার জান বেঁচেছে। তাই তোমাকে পুরষ্কার। আর তুমি ডিউটি ফাকি দিয়ে কাল রাতে ঘুমিয়েছ এবং স্বপ্ন দেখেছ। তার মানে তুমি কাজে ফাঁকি দাও। তুমি নাইট গার্ড। তোমার কাজ রাতে পাহারা দেয়া। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা নয়। তাই কাজে ফাঁকি দেয়ায় তোমাকে বরখাস্ত করা হল।
এই গল্পটা বলেছিলেন আব্রাহাম লিংকন। আব্রাহাম লিংকন সবে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। গৃহযুদ্ধের পরে।দলে দলে লোকে তার কাছে এসে বলতে লাগল, আমরা দেশের জন্য অনেক স্বার্থত্যাগ করেছি। পদ চাই। আমাদের মূল্যায়ন করুন।তখন আব্রাহাম লিংকন এই গল্পটা করেন।এক রাজা বেরুবেন শিকারে। তিনি মন্ত্রীকে জিগ্যেস করলেন, আজকের আবহাওয়া কেমন। পথে ঝড়বৃষ্টি হবে না তো।
মন্ত্রী বললেন, না না, আজ ঝড়বৃষ্টি হবে না। আবহাওয়া চমৎকার।কিছুদূর যাওয়ার পরে এক ধোপার সঙ্গে দেখা। ধোপা বলল, রাজা মশাই, বেশ তো চলেছেন, কিন্তু সামনে তো ঝড়বৃষ্টি হবে।রাজা এগুলেন। ঝড়বৃষ্টির কবলে পড়লেন।তখন তিনি ওই মন্ত্রীকে বরখাস্ত করে সেই পদে বসালেন ধোপাকে।ধোপা বলল, রাজা মশাই, যখন ঝড়বৃষ্টি হয়, তখন আমার গাধার কান নড়ে। আমার গাধার কান নড়া দেখে আমি বুঝেছিলাম, আজ বৃষ্টি হবে।রাজা তখন ধোপাকে বরখাস্ত করে গাধাটাকে মন্ত্রী বানালেন।তখন হলো আসল বিপদ। রাজ্যের সব গাধা এসে রাজাকে ঘিরে ধরল, আমরাও তো গাধা। আমাদেরকেও মন্ত্রী বানান।
গল্পটির শানে নজরুল: আমরা অনেকেই আমাদের প্রফেশনাল দায়ীত্ব পালন শেষে বিনিময়/প্রতিদান পাওয়াটাকে বাধ্যতামুলক অধিকার ভাবি। হ্যা, প্রতিদান ও স্বীকৃতি আমাদের উৎসাহিত করে। তবে একই সাথে মনে রাখতে হবে নিজের কাজের সর্বোচ্চ উৎকর্ষ সাধন ও কোম্পানীর সর্বোচ্চ স্বার্থ আদায় আমার প্রফেশনাল দায়ীত্বের অংশ। এর জন্য পুরষ্কার বাধ্যতামূলক নয়। কাজ করে যাওয়াটা্র বড় কথা।
এবার আপনারা কী বুঝলেন? পেশাদার এইচ আর কর্মীদের বাস্বববাদী ও পেশাদারীত্ব নিয়ে কাজ করতে হয়। তাদের মানবতাবোধ অবশ্যই থাকবে। তবে তা যেন কখনো পেশাদারীত্বের উপর জয়ী না হয়।
কে কিভাবে নেবেন জানি না। আমি শুধু পেশাদারিত্বের চরম উদাহরন হিসেবে এই লেখাটা শেয়ার করলাম।
তাজউদ্দীন আহমেদ মন্ত্রী ছিলেন যত দিন, সাধারণত প্রতিদিনের ফাইল সে দিনই প্রয়োজনীয় নিদের্শনা দিয়ে ছেড়ে দিতেন। অর্থসচিব কফিলউদ্দীন মাহমুদ একবার লক্ষ্য করলেন, তিন-চার দিনের বেশি হয়ে যাচ্ছে একটি প্রমোশনের ফাইল ফিরে আসছে না। এমন সময় তাজউদ্দীন আহমদ কফিলউদ্দীন মাহমুদকে ডেকে পাঠালেন। টেবিলের ওপর সেই ফাইলটি রাখা।
তিনি ফাইলটি দেখিয়ে বললেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই এই ফাইলটির বিষয়ে ভেবেছেন।’ হ্যাঁ-সূচক উত্তর শুনে তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, ‘২৫ মার্চ রাতে আমার স্ত্রী ছোট ছেলে আর মেয়েটিকে নিয়ে ভাড়াটিয়া সেজে পাকিস্তান আর্মির হাত থেকে রক্ষা পায়। ২৬ তারিখ আমাদের বাসার দেয়াল টপকে এদিক-সেদিক দুই রাত থেকে একপর্যায়ে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে যান। তিনি বিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারেন না। তিনি আমার স্ত্রীকে আরও নিরাপদ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে রাস্তার সামনে গিয়ে বলেন, আপনি একটু দাঁড়ান, আমি চাবি ফেলে এসেছি। চাবিটা নিয়ে এক মিনিটের মধ্যেই আসছি। তিনি যে ভেতরে গেলেন আর দরজা খুললেন না।
আমার স্ত্রী নিরুপায় হয়ে রাস্তার পাশে রাখা ইটের পাঁজার পেছনে ছোট বাচ্চা দুটিকে নিয়ে লুকিয়ে রইলেন বাইরে, তখন কারফিউ।’ ‘সেই ভদ্রলোকের প্রমোশনের ফাইল এটি। আমি কয়েক দিন চিন্তা করলাম। আমার ব্যক্তিগত বিষয় তাঁর সারা জীবনের এই চাকরির প্রমোশনের বিষয়ের সঙ্গে জড়ানো ন্যায়সংগত কাজ হবে না। আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার একান্তই আমার।’ তিনি তাঁর প্রমোশনের সুপারিশ অনুমোদন করে দিয়েছেন।
কফিলউদ্দীনের মনে হলো, আমরা গল্পে-ইতিহাসে অত্যন্ত মহত্ এবং মহান মানুষদের যেসব উদাহরণ পড়ি, এটি তারই একটি। ব্যক্তিগত সুখ, দুঃখ, ইচ্ছা, ক্রোধ, প্রতিশোধ—এগুলোর ঊর্ধ্বে উঠে নৈর্ব্যক্তিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে ক্ষমতা, এটি সেই ক্ষমতা।
যে ব্যক্তি বিপদের দিনে তাজউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী ও শিশু সন্তানদের একটু আশ্রয় দেয়নি,তাঁর প্রতি ও প্রতিহিংসা প্রদর্শন করেননি আমাদের প্রথম প্রধানমন্ত্রী।
Impersonal বা নৈর্ব্যক্তিক হোন, বিশেষত যখন আপনি Administrator, decision maker, leader, judge এটির সাথে Impartial হবার একটি যোগ আছে। যদিও বিষয়টি সামান্য আলাদা।
ইমপারসনাল হবার জন্য আপনাকে আরও কিছু সদগুন মাথায় রাখতে হবে-নিরপেক্ষ, নির্লিপ্ত, নির্মোহ, নিরাসক্ত। ইমপারসনাল ও ইমপারসনালিজম কী? খুব সংক্ষেপে বললে, যখন আপনি কোনো বিষয়, ইস্যু, ব্যক্তি, ঘটনা, প্রপঞ্চ সম্পর্কে কোনো মতামত দেবেন, রায় দেবেন, সিদ্ধান্ত দেবেন-এমন পরিস্থিতির মুখে থাকবেন, তখন ওই বিষয়, ইস্যু, ব্যক্তি, ঘটনা, প্রপঞ্চটির সাথে আগে হতেই থাকা আপনার ব্যক্তিগত কোনো কনসার্ন যেন আপনার ওই মতামত, রায় বা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত না করে।
একইসাথে, ব্যক্তি, বস্তু, ঘটনা বা বিষয়ের ঠিক যেই দিক বা ডাইমেনশন বা এ্যাঙ্গেলটি নিয়ে আপনি ওই মতামত বা রায় দেবার মুখে আছেন, সেটি ছাড়া তার অন্য কোনো গুন বা দোষ যেন আপনার ওই প্রোপোজিশন মেকিংয়ে প্রভাব না ফেলে। এবং, আরো মনে রাখুন, আপনার কাছে যদি কেউ তথ্য চান, শুধু নিরেট তথ্যই দেবেন, মতামত না। মতামত ও নিরেট তথ্য-এই দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান জেনে নিন।
যেমন ধরুন, আপনার কাছে কোনো কর্মীর ব্যকগ্রাউন্ড জানার জন্য অন্য কোম্পানী থেকে ফোন দিল। ওই ব্যক্তি ছিল আপনার জুনিয়র টীমমেট, যে আপনাকে ‘স্যার’ না ডেকে ’ভাই’ ডাকত বলে আপনি তার ওপর মনে মনে ক্ষুদ্ধ ছিলেন, অথবা, সে একবার ১ হাজার টাকা ধার নিয়ে আর কখনো ফেরত দেয়নি। এখন ব্যকগ্রাউন্ড চেকার কিন্তু আপনার মনোভাব জানতে চাননি। চেয়েছেন ওনার নির্দিষ্ট কিছু পেশাগত বা আধা-পেশাগত তথ্য। আপনি যদিও তার সম্পর্কে আগে হতেই ক্ষুদ্ধ বা ক্ষিপ্ত, তবুও, তাকে ওই ব্যক্তির সম্পর্কে জানতে চাওয়ার সুনির্দিষ্ট দিকের সুস্পষ্ট তথ্য বা ঘটনাপ্রবাহ ওনাকে দিলেন। যার ভেতরে নিজের ব্যক্তিগত মনোভাব বা বিক্ষুদ্ধতা একদমই মিশ্রিত করবেন না।
অথবা, ধরুন, জানতে চাইল, উনি কি কখনো কারো সাথে দুর্ব্যবহার করতেন? আপনি বললেন, না, করত না। তবে টাকা ধার নিয়ে ফেরত দিত না। এটা না করাই ইমপারসনালিজম। আবার, ধরুন, আপনার বান্ধবী, পার্টনার বা স্ত্রীর সাথে আজ বিচ্ছেদ হল। আপনি কালকেই তাকে নিয়ে ফেসবুকে বিশাল একটা পোস্ট দিলেন, যেখানে তাকে এই গ্রহের একদম জঘন্যতম ও যাবতীয় বদগুনের আধার হিসেবে চিত্রিত করলেন। হয়তো, দোষ ছিল, তিনি গাঁজা সেবন করতেন। তার সাথে বাকিগুলো আপনার ক্ষোভজনিত সৃষ্টি। আপনার এই পোস্ট এবং তাতে বর্ণিত ব্যক্তিগত ক্ষোভজনিত এনডেক্সিং অব নেগেটিভ ফিচারস-দুটোই ইমপারসনালিজমের খেলাপ।
#professionalism #impersonalism #impartial #aptitude #favouritism #reference #relation #humanity #sacrifice #ass #donkey #Lincoln