মাঝে মধ্যেই আমি ’জিজ্ঞাসা’ শিরোনামে নানারকম কৌতুহল নিয়ে লিখি। ৯৯% ক্ষেত্রেই যথাযথ ও প্রযোজ্য প্রতিউত্তর কম আসে। জানতে চাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, মানুষ হয়তো দেয় সংগৃহিত জ্ঞান। জানতে চাই আইন, মানুষ জানায় নৈতিক জ্ঞান।
তো, একবার জানতে চেয়েছিলাম, নর ও নারী কেন বাবা-মা হতে চায়? সোজা কথায়, মানুষ কেন সন্তান জন্মদান করে?
যথারীতি, অনেক রকম উত্তর এলো। বেশিরভাগ যুক্তির সাথেই স্বার্থের একটি সূক্ষ্ণ সংযোগ ছিল। জন্ম প্রক্রিয়ার মূল অনুঘটক বাবা ও মায়ের ভবিষ্যতের সাথে সেই জন্মদান অনেকখানি সম্পর্কিত হিসেবেই সবাই উত্তর দিয়েছিলেন।
বুড়ো বয়সে কে দেখে রাখবে-এরকম খুবই সূক্ষ্ণ একটি ভাবনা সব নর-নারীর মনেই থাকে। আমার এক সহকর্মী ছিলেন। তা
কে আমি প্রায়ই বলতাম, ভাইজান, আপনি একদম নিশ্চিন্ত থাকুন, আপনি আমি যেই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করি, তারা তাদের বাবা-মা’কে যেভাবে দেখে রেখেছে, যেমনটা তাদের জন্য দায়বদ্ধতার প্রমান রেখেছে, আপনার সন্তানরা সুনিশ্চিতভাবেই সেই দায়বোধ অনুভব করবে না এবং বুড়ো বয়সে তারা আপনাদের দু’জনের দায়দায়িত্ব নেবে-সেই আশা মনের মধ্যে পোষণ না করলে ভাল করবেন। শুনে তিনি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন।
ব্যক্তি স্বাধীনতা, ব্যক্তিত্ব, ব্যক্তিগত মতামত, ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গী, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র-এই দেশে এক চির উপেক্ষিত ও উপহাসের বস্তু। মানুষ অহরহ অন্যের জীবনে ঢুকে পড়ে। নিজের চোখ দিয়ে অন্যের চোখের দৃষ্টি নির্ধারন করে দেবার চেষ্টা করে, নিজের স্বাদ দিয়ে অন্যের রুচী বেঁধে দেবার প্রয়াস চালায়। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে অন্যের জীবনবোধকে বেঁধে দিতে চায়। আমাদের বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু, সহকর্মী স্বজন, প্রতিবেশী, এমনকি অপরিচীত বা ন-পরিচীত সামাজিক মাধ্যমের সুহৃদ-সবাইই।
না, মতামত দেয়া আর উপদেশ দেয়া কিন্তু এক নয়, সেটা মাথায় রাখুন।
একইভাবে মতামতের সম্মান দেয়া আর মতামত মানতে বাধ্য করাও এক নয়। যেমন ধরুন, আয়মান সাদিক ও টেন মিনিট স্কুল। এই বিষয়টা নিয়ে যা কিছু শুনেছি, তাতে আমার একটি জিনিসই মাথায় এসেছে, আমরা বাঙালিরা অন্যের জীবন ও জগত নিয়ে এত উদগ্রীব কেন? কে আস্তিক, আর কে নাস্তিক-সেই আত্মপরিচয় ও বিশ্বাসবোধ কেন আমি অন্যের কাছে জবাবদিহি করব? কবে হতে এই নৈতিক, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় দায় আমার তৈরী হয়ে পড়ল? বিশেষ করে এই জবাবদিহিতা যখন চাওয়া হয় জাগ্রত মর্দে মুমীনদের পক্ষ হতে।
কে লাইসেন্স দিল এই জাগ্রত জনতাকে, যখন তখন, যাকে তাকে, যেভাবে সেভাবে, যেকোনো কারনে বা যেকোনো প্রকারে অন্যের বিশ্বাস ও কর্ম নিয়ে কৈফিয়ত তলবের? যাহোক। পরিবার, তথা, বাবা-মা, ভাই-বোন, স্ত্রী, সন্তান-এই একান্ত জগতের মানুষেরা নিশ্চই মানুষের সবচেয়ে কাছের মানুষ। সেই সুবাদে তাদের যে কেউই একজন ব্যক্তি মানুষকে তাদের নিজস্ব চাওয়া, পাওয়া, মতামত, পছন্দ, দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস-এসব নিয়ে উপদেশ বা সৎ পরামর্শ দিতেই পারেন।
কিন্তু, সেটারও নিশ্চই একটি গন্ডী থাকতে হয়। একজন ব্যক্তি মানুষের নিজস্ব বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ন উপেক্ষা করে, স্রেফ বাবা-মা কিংবা স্রেফ সম্পর্কে আবদ্ধতার জের ধরে তার বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের অধিকার কারোরই নেই।
এই সত্যটা পরিবার হতেই বিশ্বাস করা শুরু করতে হবে। তাহলেই তথাকথিত সমাজ, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র অযাচিত হস্তক্ষেপ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমা লংঘনের পাপ হতে বেরোনো শুরু করবে। সারা পৃথিবীতে উপদেশ খুব ব্যয়বহুল একটি পণ্য। ওটা পেতে হলে অনেক পয়সা খরচ করতে হয়। পেতে হলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অবশ্য যেটা পাওয়া যায়, সেটা বেশ কার্যকরও।
বুগান্ডায় উপদেশ সবচেয়ে সস্তা, খেলো, কমজোর ও অকার্যকর। মুড়ি মুড়কির মতো মেলে। যিনি একদম কিছুই পারেন না, তিনিও প্রচুর উপদেশ দিতে পারেন। চাইলেও দেন, না চাইলে আরও বেশি দেন। বেকার থাকলে উপদেশের ফুলঝুড়ি ছোটান।
এমনিতে বুগান্ডানরা পকেট হতে এক সিকি পয়সার একটা চার আনার কয়েনও কাউকে এমনি এমনি দিতে প্রস্তুত না। কিন্তু, তারাই না চাইতেও উপদেশ উগড়ে দিতে, এমনকি জোর করে দিতে সিদ্ধহস্ত।
এক্ষুনি একজন আবার আমাকে গাল পারবেন, “ওই মিয়া, আপনে নিজেই তো সারাক্ষন উপদেশ দ্যান।”
ওহে মিয়া সাব, নিজের ওয়ালে বা ব্লগে আর্টিকেল লেখাকে উপদেশ কহে না। উপদেশ একটা নির্দিষ্ট বস্তু। চ্যাটজিপতিকে জিজ্ঞেস করুন, সংজ্ঞা পেয়ে যাবেন।
*বুগান্ডা ক্যারিবিয়ান সাগরের নতুন একটি চর।
#parenthood #beingparent #advice #influence #popularmajority #majoritypressure #liberty #freedomofspeech #freedomofopinion #personalfreedom #freedomofchoice