বে-শরম, থুককু, বে-সরকারী সমাচার-১:
ব্যক্তিখাত বা প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি করেন-এমন কর্মী, বিশেষত ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনা কর্মীদের ভবিষ্যত কী? বিশেষত গার্মেন্টস সেক্টরে? বছর বিশ, পঁচিশ চাকরি করার পরে যখন অবসরে যেতে বাধ্য হবেন, তখন কতটুকু স্বনির্ভরতা অর্জিত থাকবে? বসে খাবার মতো কতটুকু সঞ্চয় ২৫ বছরে সম্ভব? তদুপরি প্রতি হাজারে ১ জন হয়তো সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে পারেন। বাকিরা অফিসার, ম্যানেজার বা কাছাকাছি পদ ও বেতন স্তরেই ঘুরপাক খেতে থাকে। জিএম বা সমমান পর্যায়ে যাবার পর বিপদ আরও বাড়ে।।কারন ওই পর্যায়ে গেলে চাকরির বাজার অতি অতি অতি সংকীর্ণ। নিজের ব্যবসা দাড় করানো তো মুখের কথা নয়। আমার চাক্ষুস অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ভয়াবহ। গার্মেন্টসে স্বেচ্ছায় অবসরে যাবার মতো সুযোগ বা সাহস করার সামর্থ প্রায় শূন্য শতাংশ। ৫০ হতে ৬০ বছর বয়সে যখন আর কোথাও চাকরি হয় না, তখন হয় হঠাৎ স্ট্রোক, কিংবা পরিবার নিয়ে সেই বাপের করে যাওয়া গ্রামের বাড়িটাতে আশ্রয়। ৪ দশকের এই সেক্টরের এই নিরব মানবিক সংকট নিয়ে ভাবা দরকার। বাদবাকি ব্যক্তিগত খাতও এর থেকে খুব বাইরে নয় বলেই বিশ্বাস।
বে-শরম, থুককু, বে-সরকারী সমাচার-২:
প্রতিটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে একজন পীর থাকে। যেই পীরকে প্রতিষ্ঠানের আবালবৃদ্ধবণিতা পীর মানেন। ওয়ারেন বাফেট, ম্যাক্স ওয়েবার কিংবা মন্টেষ্কু ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়ে যাই বলে গিয়ে থাকেন না কেন, পীর সাহেবরাই ওই প্রতিষ্ঠানের সংবিধান প্রণেতা। তারাই ভাগ্য নিয়ত্তা । খুব বিষ্ময়কর যেটা, তা হল, পীর সাহেবরা একাধারে সব বিভাগের কাজের ওপর পিএইচডি করা। তাদের বিদ্যার ধার জুতো সেলাই হতে চন্ডি পাঠ-সব কিছুতেই সেরা। ODখোর’-এই টার্মটি কখনো শুনেছেন? না শুনলে শুনে নিন, মুখস্ত করে নিন, মনে গেঁথে নিন। কর্পোরেটে ’ODখোর’ কিছু দেবতা থাকেন। এঁরা প্রতিষ্ঠানের সবরকম OD ইনিশিয়েটিভের জন্য ব্ল্যাকহোলের মতো। প্যারাসাইটের মতো। ব্লটিং পেপারের মতো। এঁরা প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় OD ইনিশিয়েটিভকে যাস্ট শুষে নেন, গিলে ফেলেন, ভ্যানিস করে দেন। আপনি OD নিয়ে যতই ঘাঁইকিঁচিং করুন না কেন, এই মহান দেবতারা যতক্ষণ আছেন, আপনার সব এফোর্ট ব্ল্যাকহোল বা চোরাবালিতে গিলে খাবে। প্রতিভার আঁতুড় ঘর নামে যেমন কিছু আছে, তেমনি, রয়েছে প্রতিভার কসাইখানা, প্রতিভার ডাম্পইয়ার্ড, প্রতিভার লাশকাটা ঘর, প্রতিভার মর্গ। যেখানে প্রতিভার মরণ হয়, প্রতিভাকে ফেলে রেখে পঁচানো হয়, প্রতিভাকে ব্যবচ্ছেদ করা হয়, প্রতিভাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। আরও আছে প্রতিভার ব্ল্যাকহোল। যেটা ব্যক্তির প্রতিভাকে, সৃষ্টিশীলতাকে, সম্ভাবনাকে শুষে, গিলে ভ্যানিশ করে দেয়।। ব্যক্তি, টিম, প্রতিষ্ঠান-যার সাথেই কাজ করতে মনস্থ করুন, আগে একটু দেখে নিন, তিনি, বা তারা প্রতিভার আঁতুড় ঘর, নাকি মর্গ। অন্যথায়, প্রথমে কাঁচা টাকা আর শো-ম্যান-শীপ পেয়ে মজা লাগলেও, বেশিদিন সেটা এনজয় করতে পারবেন না। আর করলেও, আপনার সামুরাই জং ধরে অকেজো হবে। টাকা জীবনের অবজেকটিভ নয়, মিডিয়াম মাত্র।
প্রতিটি রাষ্ট্রে যেমন আর্মি ক্ষমতায় এলে সবার আগে নারকেল গাছের গোড়ায় হোয়াইট ওয়াশ করা হয় আর পুকুরের কচুরিপানা পরিষ্কার করা হয়। তেমনি, প্রতিটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কোনো বিভাগে (৬ মাস পর পর) নতুন বস এলেই সর্বপ্রথম যেই কাজটা করার ধুম পড়ে, সেটার নাম ‘জব ডেসক্রিপশন’ আর ‘অরগানোগ্রাম’-যেই দুইটা বাংলাদেশের কোনো বসই তার জীবদ্দশায় শেষ করে যেতে পারে না। প্রতিটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেই কয়েকজন জাতির পিতা, থুককু, পাতি পিতা থাকেন। যারা আপনি জয়েন করার পরেই দ্রূততম সময়ের মধ্যেই আপনাকে টুক করে জানিয়ে দেবেন, “এই যে দ্যাখতাছেন বড় বড় বিল্ডিং, ওফিশ, জমি জিরাত, পাখপাখালি, গাছগাছালি, ব্যাংক ব্যালেন্স-এই সবই আমার নিজের হাতে করা।”প্রতিটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেই কিছু মহাত্মা গান্ধী থাকেন, যারা বিশ্বাস করেন, যে, “তারা কখনো কাউকে তেল দেন না বলে প্রমোশন হয় না।”
প্রতিটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেই একজন সুপ্রাচীন ‘ভাই’ থাকেন। যিনি রামচন্দ্রের যুগ হতেই ওই প্রতিষ্ঠানের সবারই ভাই। রামচন্দ্রকে চিনেছেন? ওই যে, মোদী সাহেবের ঈশ্বর। একই সাথে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একজন কমোন ‘বিবিসি’ থাকেন। যার কাজ হল, সারা অফিসে খবর নেয়া আর দেয়া। আপনি যদি আপনার শত্রূর প্রমোশনের গোপন খবরও জানতে চান, ওই বিবিসিকে একটান ক্যাপিসটান সিগ্রেট খাওয়ান, গড়গড় করে সব বলে দেবে। প্রতিটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেই আম পাবলিকের হৃদয় মন্দীরে মৎসকন্যা বা ক্যাসপারের মতো কিছু বেনামা, অজ্ঞাত পরিচয়, অচীন, অদৃশ্য ’ইবলিশ’ থাকেন, যারা নাকি (তাদের ভাষায়) “ওফিশে খালি গুডিবাজি হরে।”প্রতিটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেই ‘স্যার, ভাই, সাহেব’ নিয়ে শতাব্দী প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহি জব্বরের বলি খেলার মতো কনফিউশন, চাপানউতোড় থাকে। মজার বিষয় হল, প্রতিষ্ঠান কখনোই সেই কনফিউশন দূরে করে উঠতে পারে না। আর প্রতিটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানেই একটি বিভাগ থাকে, যেটিকে ওই প্রতিষ্ঠান পিকদান হিসেবে ব্যবহারের জন্য সৃষ্টি করে। প্রতিষ্ঠানের সব কর্মী ও মালিক তাদের সকল রাগ, গোস্বা, ক্ষোভ, বঞ্চনা, বেদনা, ঘৃনা, আক্রোশ মিটানোর জন্য ওই বিভাগকে মক্কার ‘শয়তানের খাম্বা’র মতো ব্যবহার করে। যার যখনই ক্ষোভ ও ঝাল ঝারতে হবে, সেই ওই বিভাগকে ডেকে নিয়ে তার মুখের ওপর যা ঢালার তা ঢেলে দেয়। আর ওই বিভাগ সেটাকে গায়ে মাখিয়ে নিয়ে হাসতে হাসতে, হেঁটে হেঁটে এসে আবার আগের যায়গায় ঠিকঠাক লেজ গুটিয়ে বিশেষ প্রভূভক্ত প্রাণীর মতো বসে থাকে আর পরের জনের থু থু নেবার জন্য মনে মনে জপ করতে থাকে। ওই বিভাগটিকে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান ও প্রোফেশনালরা ‘হুদাই রাখছে ডিপারমেন’ বলে জানলেও ওই বিভাগের লোকেরা নিজেদের মুখ রক্ষা করতে সেটাকে প্রচার করার চেষ্টা করে, Human Resource Department নামে। ’মানুষ’ আমাদের গালি দেয়, ‘হুদাই রাকচে ডিপারমেন’, মানে HRD .
এই সেদিনও একজন লিংকডেইনে রাগ ঝাড়লেন, “’এইছাড়’ একটা পয়সাও আর্ন করে না, খালি পটর পটর কথা।” তার রাগ অবশ্য পুরোপুরি অমূলক নয়। এইছাড় ষাড়েরাও এর জন্য দায়ী।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মিথস্ক্রিয়া গড়ে ওঠার জন্য প্রতিষ্ঠানে প্রচুর এনগেজমেন্ট ও এক্সচেঞ্জিং এফোর্ট থাকতে হয়। সমস্যা হল, প্রতিষ্ঠান, HR ইটসেলফ এবং বাকি বিভাগগুলো-এরকম ইনিশিয়েটিভে খুব আগ্রহী না। HUMAN resource DEVELOPMENT বা HR নিয়ে আমাদের বহু বছরের দৌড়ঝাঁপের টক মিষ্ট প্রতিফলের সবচেয়ে হতাশাজনক অংশ হল,
১. এত বছরেও আমরা ওই HUMAN কে সত্যি সত্যিই ‘মানুষ’ হিসেবে মূল্যায়ন করবার মতো মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিটা গড়ে তুলতে পারিনি।
২. HUMAN development এর চেয়ে HR এর মধ্য দিয়ে আমরা আইন-কানুন ও মেকানিজম ডেভেলপমেন্টে বেশি পারঙ্গমতা দেখিয়েছি।
HR নিয়ে সম্ভব, অসম্ভব, বড়-ছোট অসংখ্য উদ্যোগ, কার্যক্রম অথবা টানাপোড়েনের মধ্যে আসলে হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট জিনিসটাই বাদ পড়ে যায়।
আমাদের ডিসকোর্সে ‘মানব উন্নয়ন’ জিনিসটাই কোন ফাঁকে যেন বাদ পড়ে যায়।
আমরা বার্থ-ডে করি, ফিতা কাটি, বুট ক্যাম্প করি, এই করি, সেই করি।
কিন্তু, এর মধ্যেই মানুষ হিসেবে মানুষগুলোর আত্মিক, মানসিক, শারিরীক, আর্থিক, পারিবারিক, মনোজাগতিক উৎকর্ষ আনয়নের ভাবনাটা হারিয়ে যায়। মিসিং রয়ে যায়।
কৃত্রিমতা দিয়ে আপনি দু’চারটা অ্যাওয়ার্ড আনতে পারবেন, হিউম্যান ডেভেলপ করতে পারবেন না। কারন, আপনি তো কখনো ভাবেনই নাই, যে, প্রতিষ্ঠানের হিউম্যানগুলো কারা, তাদের কী চাই, তারা কী চায়, তাদের উৎকর্ষের জন্য কিছু করব ও কী করব।
যা হচ্ছে, তা নারকেল গাছের গোড়ায় সাদা চুন লেপে সুদৃশ্য করা মাত্র।
তাতে গাছের পঁচা গোড়া সুন্দর হতে পারে, ভাল হবে না।
হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের বুনিয়াদ শুরু হয় মানুষকে ‘মানুষ’ হিসেবে দেখবার চোখ ক্রিয়েশনের মধ্য দিয়ে। সেটা কি হয়েছে আদৌ? আপনার, আমার খেতাবপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কি তার মানুষকে ‘মানুষ’ ভাবে? নাকি স্রেফ ওয়েজ আর্নার বা রেভিনিউ জেনারেটর?
বাংলাদেশে আমরা আইকন বা পীর সংস্কৃতির খুব পাবন্দ।
আমরা আজীবন স্বপ্ন দেখি, একদিন আমি বা আমরা পাহাড় হব।
আমি কারও কাছে যাব না, কারও সাথে ওপেন হব না, পার্টিসিপেটরি হব না। আমি টেবিলে, আমার দরবারে জলদগম্ভীর পীর হয়ে বসে থাকব। আর মানুষ আমার দরবারে এসে এসে কদমবুচি করে হাত কচলে করুণা ভিক্ষার মতো করে সার্ভিস ভিক্ষা করবে-আমরা নিজেদের এমন সম্রাটের ভূমিকায় দেখার অবসেশনে ভূগি। সমস্যা সেখানে।
এই চরিত্র এইচ.আরের, এই চরিত্র অন্য অনেকেরই। একচেটিয়াভাবে কোনো বিভাগ বা ব্যক্তির না।
ফলে, বিভাগে বিভাগে, অফিসে অফিসে, ডিভিশনে ডিভিশনে দ্বন্দ্ব তৈরী হয়, সমন্বয়হীনতা তৈরী হয়, অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরী হয়।
অথচ, সেই কবেই স্বামী শ্রী বিবেকানন্দ বলে গিয়েছিলেন,
”পাহাড় যদি মহম্মদের কাছে না যায়, তাহলে মহম্মদই পাহাড়ের নিকট আসবে।”
বে-শরম, থুককু, বে-সরকারী সমাচার-৩:
আজ একটু সিরিয়াস বিষয় নিয়ে বলি। কয়েক দিন আগেই একজন ভদ্রলোক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে আত্ম উন্নয়নের সুযোগ নিয়ে কিছু প্রশ্ন করলেন (যদিও একটি বিশেষ সেক্টরের কথা তিনি বলেছিলেন। আমি মামলা খাবার ভয়ে সেক্টরের বদলে বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বলছি। মাফ করবেন, আমি নেহাতই কেরানী ও মুখচোরা ল্যাখোক। আমি কোনো মান্ডেলা বা মার্টিন লুথার হবার মতো সাহসী নই। গরম ডিমকে আমি খুব ভয় পাই।]। আত্ম উন্নয়ন বলতে, ব্যক্তির নিজের স্কীল বাড়ানোর সুযোগ ও উদ্যোগ। আরও যোগ করলেন একজন কর্মীর নিজ খরচে হায়ার এডুকেশন ও ডিগ্রী নেয়াসহ প্রোফেশনাল সার্টিফিকেশন নেবার সুযোগের কথাও।
বাংলাদেশের খুব কম প্রতিষ্ঠানই আছে, যারা তাদের ম্যানপাওয়ারের উন্নয়নের জন্য সময়, এনার্জি, ইফোর্ট ও পয়সা খরচ করতে রাজি থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে গালভরা নামে OD, LnD, HRBP-এসব জার্গনের ফুলঝুড়ি ছিটিয়ে বড় বড় ‘সাপ’ বা ‘সাব’রা চাকরি বাগালেও তাদের যোগ্যতা যেমন তেমন, প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তাদের ওই লবডঙ্কা ইনসাইটটুকুও কাজে লাগানোর ইচ্ছা বড্ড কম। HRBP এখন একটি খুব চালু পণ্য। মুখরোচক পণ্য।
চাকরি প্রত্যাশীদের কাছে জবকে আকর্ষনীয় করে তুলতে এমপ্লয়াররা এই টেস্টিং সল্ট মাখিয়ে জব অফার করেন। আবার, চাকরি প্রত্যাশীরাও এই পারফিউম মেখে নিজের এমপ্লয়্যবিলিটি ভ্যালু বাড়িয়ে নিতে চান। একজন HRBP হবার জন্য আপনার কী কী দরকার? আমি জানি, আপনি অবশ্যই বলবেন, যে, আমার আগে একটি Certified HRBP তকমা দরকার। অবশ্যই। ডিগ্রী ও প্রথাগত স্বীকৃতি অবশ্যই বড় কিছু। তবে সেসবের ভেতর দিয়ে একটা ল্যবেলিং পাবার পাশাপাশি আপনার আরও যেটি হাসিল করণীয় সেটা ডিগ্রী ছাড়াও অর্জন করার দিকে নজর দিন। সেটা হল Business approach অব HR এবং business acumen. বলতে চাইছি, যে, একজন নয়া জামানার HR প্রফেশনাল হিসেবে আপনার বিজনেস এপ্রোচ থাকা দরকার।
আপনাকে তথাকথিত ও ট্র্যাডিশনাল পিপল ম্যানেজার হলেই কেবল হবে না। আপনাকে বিজনেস ফোকাসড এবং বিজনেস ফার্স্ট ফিলোসফিতে দীক্ষা নিতে হবে। এক জরিপে দেখা গেছে, বঙ্গদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো নামজাদা পীর পয়গম্বরদের হায়ার করার ক্ষেত্রে যতটা আগ্রহী, তাদের পোটেনশিয়ালকে কাজে লাগাতে ঠিক ততোটাই অনাগ্রহী। pedigree hiring পদ্ধতিতে স্টার ও সেলেব কর্মকর্তা হায়ার করা তাদের একটা হবি। স্টার হায়ার করে তারা শোকেসে সাজিয়ে রাখেন। ওই সেলেব দেশে, বিদেশে প্রতিষ্ঠানের শোভা বর্ধন করেন। কাজের কাজ লবডঙ্কা। একটি প্রতিষ্ঠানে একজন তারকার নিখাঁদ অবদান বা মূল্য সংযোজন আসলে কতটা, বা, ঠিক কী এক্সপেকটেড?
আমি দুটি ’জায়ান্ট’, ‘সুনামধন্য’, ‘আরাধ্য’ ও ‘মুল্টিন্যাশনাল’ এর অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ভাবছি।
দুই জায়ান্টেরই দুইজন সুপারস্টার ‘প্রধান গো-রক্ষক’ মানে ‘মূখ্য দানবসম্পদ কেরাণী’ রয়েছেন।
দুই প্রতিষ্ঠানই তাদের কর্মীদের ‘ন্যায্য’ ও ‘আইননানুগ’ অধিকার হরণের জন্য ‘কুখ্যাতি’ পেয়েছে। আবার, উভয়েই তাদের চাকচিক্য ও ‘সহমতভাই’ পর্যায়ের সুশীল ক্রিয়াকলাপের জন্য নামজাদা।
কথা হল, এই সুপারস্টার দানবসম্পদ কর্তারা আসলে ততোধিক সুপার জায়ান্টে ঠিক কী কী যোগ করতে সক্ষম, বা, সত্যি সত্যি ঠিক কতটা যোগ করে থাকেন?
নাকি ফিতা কাটা আর ঝুটক্যাম্পই সই?
এক সুপারস্টারকে চিনি। আরেক সুপারস্টেশনে গিয়ে পায়খানায় হ্যান্ডড্রায়ার লাগিয়ে সেটাকে প্রমোটের নামে নিজের ঢোল বাজাতে গিয়ে তাৎক্ষণিক চাকরি হারান পরিণামে।
সুপারস্টেশানে সুপারস্টার হয়ে আমরা কি সুপারস্টিশাস কিছু আদৌ করি? বা করবার চিন্তা কি থাকে? করবার অবকাশই কি থাকে?
নাকি পুরোটাই গিমিক? পুরোটাই রেটোরিক? পুরোটাই কেবলই ব্যক্তিগত অর্জনের নামাবলি মাত্র?
#PedigreeHiring #SurfaceGlamour
জানা বিষয়ের নতুন ও চোস্ত একটি নাম শিখলাম কাল-Pedigree Hiring
এই টার্মটিকে স্থিরভাবে ধরবার চেষ্টা করছিলাম অনেক দিন ধরে। হয়ে উঠছিল না। চ্যাটজিপতিকে কাল বললাম, আমি ঠিক এই এই রকম একটা কনসেপট নিয়ে ভাবছি। এটাকে এক কথায় কী বলা যায়। সে টার্মটা বেছে বের করে দিল। বাহ!
কী সেই পেডিগ্রি হায়ারিং?
নতুন কিছু না। আমি যেটা নিয়ে অনেক অনেক কথা বলি-সেটাই। বংশলতিকা।
একজন প্রফেশনাল, বিশেষ করে সিনিয়র পজিশনার, তাকে হায়ার করবার সময় কেবলমাত্র, শুধুমাত্র, একমাত্র, মূখ্যত, সাধারনত-
১. তার স্টারডম
২. তার বাজার স্টেক
৩. তার জনপ্রিয়তা
৪. তার সাবেক প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড ইকুইটি
৫. তার বিশ্ববিদ্যালয়
৬. তার জেন্ডার
৭. তার রেফারেল ভ্যালু
৮. তার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপিয়ারেন্স ও গিমিক
৯. অ্যাবসলুট থার্ড পার্টি সিলেকশন
১০. ইন্টারভিউতে দেখানো কোনো গিমিক বা চমক
১১. তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার
১২. অথবা তার চুল, দাঁড়ি পাকা
এর যেকোনো একটিকে একমাত্র চলক হিসেবে ধরে তাকে ঘরে তুলে নেয়াকে বলে পেডিগ্রি হায়ারিং। এমনকি ডিগ্রীর উৎস, আউটফিট, চোস্ত ইংরেজি, চকমকে প্রেজেন্টেশন, গ্ল্যামারাস লুক, ওয়েস্টার্ন অ্যাকসেন্ট-এসব #ProxiSignal #SurfaceSignal #SignalTrait #SurfaceTrait #SurfaceGlamour ও হায়ার পেডিগ্রির অংশ হিসেবে পূজিত হয়ে ট্রফি জিতে নেয়।
এই পদ্ধতির লক্ষ্য থাকে বাজার হতে স্টার, সেলেব, দেবতা, মুরব্বী, পীর হায়ার করা। তার তলানি থাক বা না থাক, আর, থাকলে আবার, তাকে ঘরে এনে কাজে লাগানো যাক বা না যাক, আগে হায়ার করো। লাগলে শোকেসে সাজিয়ে রাখা হবে। তবু সুপারস্টার হায়ার করো।
এই পেডিগ্রি হায়ারিংকে সুরুত করে কাজে লাগিয়ে অনেকেই দু’হাতে দুইয়ে নিচ্ছে কামধেনুর সুযোগ। আর হায়ারারবৃন্দ কীভাবে গজবে পড়ছেন-তা তো জানা কথাই। জানেনই তো, গরুর হাঁটের ৫০ মণ সাইজের গরু দেখতেই ব্রাহামা অথবা ব্রাহ্মন মাত্র। খেতে কিন্তু সেই দেশী ৩ মণী গরুই বেটার।
স্রেফ চুল, দাঁড়ি সাদা না বলে, আর দেখতে চ্যাংড়া লাগে বলে একটা ভাল চাকরি হয়নি না পাবার বঞ্চনা অনেকবার হয়েছে আমার। আর, চাকরি হবার পরে চুল, দাঁড়ি সাদা মুরব্বী নই বলে কাজ ও ড্রাইভের দাম পাইনি-এমন তো কত কত বার হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্যালেন্ট ও ভ্যালু অ্যাডিশন চাই না। তাদের চাই স্টার, মুরব্বী।
যাহোক। বলছিলাম ব্যক্তিগত উন্নয়নের সুযোগের কথা। আপনি নিজ খরচ ও শক্তিতে, সারাদিন গরু খাটা খেটে তারপরও যদি একটা MBA বা PGD করতে চান, হার্ভার্ডে না হোক, আইবিএ হতে একটা ডিগ্রী নিয়ে প্রমোশনের দৌড়ে কিংবা প্রতিষ্ঠানের অশিক্ষিত ও গাড়ল এইচআরের মন জয় করে ফাইলটা অন্তত ভারী করতে চান, সেটা করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
বোদ্ধা রিজভান বলেছিলেন, কোন মহামতি নাকি বলে গেছেন, কর্পোরেট বিজনেসের অফিস ম্যানেজমেন্ট এমনভাবেই ডিজাইন করা হয়ে থাকে, যাতে আপনি ওর থেকে বেশি কিছু ভাববার মতো সুযোগই না পান। তো, আপনি নিজ সময় ও খরচে গতর খাটার অবসরে একটা এমবিএ করবেন। হয়তো সন্ধ্যার পরে, বা শুক্রবারে। আপনি চোখ বুজে সব প্ল্যান করে ফেলবেন আর পরের এক বছর রাম রাম করে কোনোমতে বউকে বাচ্চাকে ঠকিয়ে, নিজেকে বঞ্চিত করে হলেও এমবিএটা করে ফেলবেন-সেই সুযোগ এত অবারিত না। অবারিত না বলে বরং বলতে পারি, অনেকটাই অবরুদ্ধ।
কর্পোরেট আপনাকে এমন টাইটে রাখবে, আপনি ভুলেই যাবেন, যে, সেই যে বাপটা স্ট্রোক করায় অসময়ে গ্রাজুয়েশন শেষেই জবে ঢুকে পড়েছিলেন, পরে এমবিএ করে নেবেন ভেবে, সেই এমবিএ আর করাই হয়নি। কর্পোরেটের এই চিপা মানেই শুধু সময় আর কাজের চাপ না। কর্পোরেট চলে মূলা আর চুলা মেথডে। আপনাকে সবসময় একটা মূলা সামনে দিয়ে রাখবে। সেটা পেতে গিয়ে আপনি বাকি সব ভুলে যাবেন। আবার একটা চুলা আপনার পশ্চাতদেশের নিচে দিয়ে রাখা হবে। সেটার গরম সামলাতেই আপনি ব্যস্ত থাকবেন আর বুঝে যাবেন, একটু এদিক ওদিক হলেই আপনি চেয়ার হতে চুলাতে যাবেন। ফলাফল-আপনি কখন ১২ বছর পার করে ফেলবেন আর তারপর যেদিন চাকরি হারাবেন, দেখবেন, নতুন প্রতিষ্ঠান এমবিএ ছাড়া চাকরি দেয় না। আপনার এমবিএ নেই। আবার তারাও তাদের কর্মীদের এমবিএ করার কোনো স্কোপ দেয় না।
আমি অনেকবারই চাক্ষুস করেছি। কর্মী শুক্রবারে এমবিএ ক্লাস ভর্তি হবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান ও বস এলাউ করবে না। কারন? এমবিএ করলে সে চলে যাবে। কিংবা প্রায়ই শুক্রবারে অফিস খোলা থাকে, সম্ভব না। এমবিএ করতে পারলেন না। সারাদিন ১০-১২ ঘন্টা চাকরির পেছনে ব্যয় করে বাসায় ফিরে থিতু হয়ে বসে আপনি গুগল, হারভার্ড বিজনেস রিভিউ আর ড. আরমিন ট্রস্টের লেকচার দেখে নিজের প্রফেশনাল স্কীলে ধার দেবেন? সম্ভব? এনার্জি আর ধৈর্য্যে কুলোবে? (চলবে)
বে-শরম, থুককু, বে-সরকারী সমাচার-৪:
সরকারি চাকরি ও বেসরকারী চাকরির মধ্যে গুরুত্বপূর্ন কিছু পার্থক্য বলি। সরকারি চাকরিতে আপনার ব্যক্তিগত প্রাপ্তি ও রিটার্ন সবসময়ই আপনার ভ্যালূ এ্যাডিশন, কোয়ালিফিকেশন ও কনট্রিবিউশনের চেয়ে উপরে বা এগিয়ে থাকবে। বেসরকারী চাকরিতে তার উল্টো। এখানে একজন এমপ্লয়ার আপনাকে এমনভাবে ট্রীট করবেন, যাতে আপনার ব্যক্তিগত প্রাপ্তি ও রিটার্ন সবসময়ই আপনার ভ্যালূ এ্যাডিশন, কোয়ালিফিকেশন ও কনট্রিবিউশনের চেয়ে নিচে বা পেছনে থাকবে। বঙ্গদেশে যাবতীয় সরকারি চাকরি করতে দরকার হয় ১৪ পারা গাইড মুখস্ত করে হাফেযে-MP3 হওয়া আর পারলে নিজের গায়ে রাজনীতির একটা ছাল পরে থাকা।
বেসরকারী চাকরি পেতে দরকার মাথা আর মামা।
জগতের সকলে চাকরিতে শুধু দরকার হয় কাজ জানা। আমাদের এখানে বেসরকারী চাকরি করতে দরকার হয় দুটো:- কর্পোরেটে কাজ করতে জানা ও চাকরি করতে জানা দুটো ভিন্ন ধরনের কাম্য যোগ্যতা।
এখানে চাকরি করতে জানার পুরোটাই ২০% ইনফরমাল লারনিংয়ের অংশ। কাজ করতে জানা ৭০% অন দি জব ও ১০% ফরমাল লারনিংয়ের অংশ।
চাকরি করতে জানার অন্যতম একটি ক্যারিশমা হল ডিপ্লোম্যাটিক হতে পারা। এখানে সবকিছুতে ডিপ্লোম্যাসি বজায় রাখুন। রাখতে শিখুন।
করোনার পরে যখন পৃথিবী নরমাল বেবি ডেলিভারি শুরু করবে, তখন আরও একটা জিনিস লাগবে, তা হল, “চাকরি টিকিয়ে রাখতে জানা”।
#nongovtjob #nongovernmentjob #privatesector #privatejob #icon #idol #corporateoligark #corporatecult #corporatehooligan #corporateterror #bigshotsincorporate #GettingJobDoingJob