বলা হয়ে থাকে, সব কিছুরই ভাল ও মন্দ-উভয় দিক আছে। কোভিড-১৯ মহামারীও আমাদেরকে নানাদিক হতে অসম্ভব রকমের নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত ও ক্ষতিগ্রস্থ করার পাশাপাশি কিছু পজিটিভ পরিবর্তনও এনে দিয়েছে। যার ভিতরে আছে আমাদের অর্থনীতি, কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট ও ব্যবস্থার ডিজিটাইলাইজেশন ও অটোমেশন। যা বহুদিন ধরেই কাঙ্খিত ছিল। খুব ধীরে চলতে থাকা ওই দুই প্রোসেস কোভিড-১৯ এর ধাক্কায় এক লাফে এগিয়ে গেছে অনেকটা। বলা চলে-আসলে বদলাতে বাধ্য হয়েছে।
আমাদের কালচারে চলে এসেছে হোম অফিস, অনলাইন ইন্টারভিউ, ভার্চুয়াল মীট, ডিজিটাল কনফারেন্স, অনলাইন ট্রানজেকশন-এমন বহু কিছু। বিগত ১৩ মাসে আমরা আমাদের অফিস ও কারখানার কাজের বেশ কিছু অংশ ডিজিটাল ও অনলাইন মাধ্যমে সরিয়ে নিয়েছি। বিশেষত মিটিং, ট্রেইনিং, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও কনফারেন্সের মতো বিষয়গুলো তো এখন বলতে গেলে সবই অনলাইনে বা ভার্চুয়ালেই হচ্ছে। এই কাজের জন্য আমরা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করছি অসংখ্য ডিজিটাল মিডিয়াম, যার মধ্যে আছে-Google meet, Microsoft team, Zoom, Skype, Duo, Stream yard, Faceboom room, messenger, Whatsapp, viber, telegram বা এরকম আরও কিছু।
এখন, আমরা বাধ্য হয়ে হলেও এসব মিডিয়ামে শিফট হয়েছি ঠিকই, কিন্তু নতুন করে এসব মাধ্যমে আমাদের চিরাচরিত অফলাইন বা সশরীরে করা ইভেন্টগুলো সংঘটিত বা আয়োজন করতে আমরা বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি। এসব সেশন করতে গিয়ে প্রায়ই হতে হচ্ছে নাস্তানাবুদ। বাংলাদেশের দুর্বল ইন্টারনেট পরিসেবা, ডিভাইসের জটিলতা, ইলেকট্রিসিটির সীমাবদ্ধতা, আমাদের কালচারাল ল্যাগসহ নানা কারনেই সেসব চ্যালেঞ্জ উদ্ভূত হচ্ছে। মূল অনুষ্ঠান সংঘটন করার সময় আয়োজক ও অংশগ্রহনকারীদের পড়তে হচ্ছে নানা বিপত্তিতে।
আজকে তাই, অনলাইন সেশন আয়োজনের কিছু টুকিটাকি বিষয় তুলে ধরছি, যেগুলো আপনাকে পুরো আয়োজনগুলো আরেকটু সহজে, সংগঠিতভাবে ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে সাহায্য করতে পারে: –
১. অনলাইন সেশন করার যতগুলো মাধ্যম আছে, সেগুলোর প্রতিটিরই ভিন্ন ভিন্ন তুলনামূলক ফিচার ও সুবিধা-অসুবিধা আছে। তাই আগে হতেই একটু রিহার্সাল করে রাখুন। টুকটাক টেকনিক্যালিটিগুলো জেনে রাখুন। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, গুগল মিট এরকম কাজে সবদিক হতে ভাল হয়ে থাকে, কারন এতে স্ক্রীন শেয়ারিং, সহজে সেশন সেট করা, ইনভাইটেশন পাঠানো, নোট রাখা, ফাইল শেয়ার করে রাখা সহ খুব সহজেই একে ডিল করা যায়। যদিও তার পার্টিসিপ্যান্ট লিমিট আছে, যেটা জুমে আরও বেশি এলাওড। আবার জুমে রেকর্ড করা যায়, যেটা গুগল মীটে যায় না। ওটাই আমার মুল আক্ষেপ। আবার, জুম যদি প্রিমিয়াম ভার্সন না হয়, তাহলে ৪৫ মিনিট পরে অটো-টাইম আউট হয়ে যায়।
২. নির্দিষ্ট সময়ের অন্তত ৫ মিনিট পূর্বে সেশনে জয়েন করুন। যেই মিডিয়ামে সেশনটি হবে, সেটি আপনার মোবাইল বা ল্যাপটপে সাপোর্ট করে কিনা, তা আগে হতেই নিশ্চিত হয়ে নিন।
৩. বিভিন্ন মিডিয়ামের ধরন অনুযায়ী অংশগ্রহনকারীর সংখ্যার একটি সীমা দেয়া থাকে। সেটি জেনে রাখুন। সেশনের লিংক কমপক্ষে ৬ ঘন্টা আগে পার্টিসিপ্যান্টদের দিয়ে রাখুন।
৪. অনলাইন হলেও সেশনে আপনার ফরমাল এটায়ার ও এপিয়ারেন্স নিশ্চিত করুন। আগে হতেই আপনার টীম বা ভিজিটর বা পরিবারস্থ লোকদের ব্রিফ করে রাখুন, যেন, তারা র্যান্ডম ভিউ রেঞ্জে চলে না আসেন। আপনার ব্যাকগ্রাউন্ডটি যেন আপত্তিকর না হয়। যেই এ্যাপেই সেশন করুন, তাতে আপনার ফরমাল প্রোফাইল পিকচার ব্যবহার করুন এবং পুরো নাম ব্যবহার করুন।
৫. আপনার ইন্টারনেট লাইনটি যেন আনইনটারাপটেড থাকে। অভিজ্ঞতা বলে, ২০ MBPS না হলে ব্রডব্যান্ড ঝামেলা করে। মোবাইল ইন্টারনেটটিও চালু রাখুন এবং আপনার ফোনের নেট কানেকটিভি অটো শিফটিং করে রাখুন।
৬. মিটটি যদি ভিজুয়াল করার কথা থাকে, তাহলে ভিডিও অন রাখুন। সেশনে জয়েন করে আপনার মাইক ও ক্যামেরা ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, তা নিশ্চিত হোন। চেষ্টা করবেন, আলোর উৎসের বিপরীতে বসতে। আপনার পিছনে প্রচুর আলো থাকলে ভিজুয়াল ঝাপসা হয়ে যাবে। ক্যামেরার একদম সামনে না বসে এমন একটি দূরত্ব রেখে বসুন যেন আপনার কাঁধ হতে মাথা এই অংশটুকু ভিজিবল হয়। আবার এত দূরে নয়, যে আপনার পুরো শরীরই ভিজিবল হয়ে যায়। হ্যা, আপনি যদি কোনো অনলাইন ক্লাস নিতে থাকেন, সেটিকে ক্লাসরুমের আদল দিতে পারেন।
৭. সেশনের মাঝে যদি অতি জরুরী কারনে অন্য কাউকে এটেন্ড করতেই হয়, মাইক ও ক্যামেরা অফ করে নিন। যখন আপনি কথা বলছেন না, তখন মাইকটি অফ রাখুন। জয়েন করবার আগে নিশ্চিত করুন, যে, ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ আসবে না।
৮. মধ্যম আওয়াজে কথা বলুন। আপনি যদি মডারেটর হোন, তাহলে খুব ভিজিল্যান্ট থাকুন। সবদিকে সমান নজর রাখুন ও নিয়ন্ত্রণ করুন। শক্ত হাতে মডারেট করুন। কাউকে থামিয়ে দিতে হলে আগে তার মাইকটি মিউট করুন, তারপর তাকে বলা শুরু করুন থামার জন্য। নিজে হতেই সব পার্টিসিপ্যান্টের উচিত সময়ের দিকে নজর রাখা।
৯. সেশনের মাঝে যদি কোনো প্রশ্ন করতে হয় বা ইন্টারভিন করতেই হয়, তাহলে কিছু টুলস আছে (যেমন হ্যান্ডস আপ), সেগুলো ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে ড্যাশবোর্ডের পাশে থাকা সিক্রেট চ্যাটের সাহায্য নিন। অনলাইন সেশন করার জন্য যেসব এ্যাপ বা মিডিয়াম আছে, তার প্রায় কোনোটাই টু ওয়ে কমিউনিকেশন সাপোর্ট করে না। একজন কথা বললে আরেকজন বলতে গেলেই জ্যাম লেগে যাবে। আবার ইন্টারনেট লাইনের স্পিডের তফাতের কারনে অনেক সময়ই সব পার্টিসিপ্যান্টের মধ্যে ভিজুয়াল ও ভোকালের মধ্যে ব্যবধান থাকে। তাই সতর্কভাবে ডিল করুন।
১০. স্ক্রীন শেয়ারিংয়ের আদ্যোপান্ত জেনে নিন।
১১. অনলাইন মাধ্যমে স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা বলতে বা তথ্য দিতে খুব সাবধান থাকবেন। সরাসরি এর সাথে জড়িত না হলেও, প্রায় সংশ্লিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে ছোট করে বলছি। ফেসবুক কভার ফটোর জন্য ৮৫১x৩১৫ পিক্সেল (কম্পিউটার এর জন্য), ৬৪০x৬৪০ পিক্সেল (স্মার্ট ফোনের জন্য) এবং ১০০ কিলোবাইটের মধ্যে ফাইল সাইজ রাখুন। ফেসবুক আপনাকে 1.75 গিগাবাইট পর্যন্ত ভিডিও ফাইল আপলোড করতে দেয়। ভিডিও 45 মিনিটেরও কম হতে হবে। ফেসবুক ও গুগলকে জয়েন্টলী অনলাইন ইভেন্ট ও সেশন করতে সিংক্রোনাইজড করতে চাইলে, ফেসবুকে ইভেন্ট খুলতে হবে।
ইভেন্টের লিংক বা ইভেন্ট মিডিয়াম অংশের সেটিংসয়ে (Choose a way for people to join your event online.) আগে হতে গুগল মীট বা জুমে তৈরী করা সেশন শিডিউলের লিংক দিয়ে রাখতে হবে। তাতে করে ইভেন্ট থাকবে ফেসবুকে, যেখান হতে যে কেউ সরাসরি লিংক দিয়ে জয়েন করবে। আবার জয়েন করতে পারবে গুগল মীটের মাধ্যমেও। আর, ইভেন্টকে প্রোমোট করতে যেখানেই পোস্ট যাবে, সেখানে একটা গুগল ফরম যোগ করে দিতে হবে। ফরমে থাকা আগ্রহীদের জিমেইল আইডি তখন ব্যাক এন্ডের একসেল ফাইল হতে একবারে কপি করে গুগল মীট বা জুমের এ্যাড গেস্ট/পারটিসিপ্যান্ট বক্সে দিয়ে দিলে আলাদা করে আর ইনভাইটেশন বা লিংক শেয়ারিং মেইল করতে হবে না। আমন্ত্রিত লোকেরা সরাসরি গুগল ক্যালেন্ডারেই তাদের শিডিউল ও লিংক একবারে পেয়ে যাবেন। তার পরেও গুগল মিটের ওপরের দিকে একটা মেইলিং অপশন থাকে। সেখানে ক্লিক করলে গেস্ট লিস্টে দেয়া সব মেইল আইডিতে জয়েনিং লিংক বা যেকোনো পরবর্তি আপডেট একবারে মেইল করা যাবে।
#digitalization #onlinesession #virtualsession #meetingpreparation