Skip to content

বোহেমিয়ানের ডায়রী

  • by

অনেকদিন হল, শুক্রবারের বদলে শনিবারে সপ্তাহান্ত পাই। সপ্তাহান্ত অনেকের কাছেই অনেক রকম দ্যোতনা নিয়ে আসে। আমার জন্য সেটা হয় সারা সপ্তাহের জমানো কাজ সারবার একটি দিন।

এই যেমন আজ। সকাল আটটা হতে শুরু করেছি। এখন রাত আটটা। কিছুক্ষণ আগে শেষ হল এই সপ্তাহান্তের কর্মযজ্ঞ। তারপর বসে পড়েছি কীপ্যাডে। কপাল।

কর্মযজ্ঞের মধ্যে ছিল বাসার সবচেয়ে দরকারী সুইচবোর্ডে ঝামেলা ঠিক করা। সাতসকালে প্লায়ারস, স্ক্রূ ড্রাইভার নিয়ে লেগে পড়েছি। বাসার ছোটখাটো বৈদ্যুতিক কাজ নিজেই সারি। জ্বীনের ভিতরে বংশগতি প্রবাহিত হবার কথা যদি সত্যি হয়, তবে আমি বোধহয় বাবার জ্বীন হতে এটাই পেয়েছি। বাবা ছিলেন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রী। বিদ্যুৎ অফিসের অতি সুদক্ষ একজন ফোরম্যান আমার বাবা তার জীবনের শুরুতে তিনবার চাকরি ছেড়েছেন। সাহসীকতার জন্য প্রশংসাপত্র পেয়েছেন কয়েকবার। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, ঈদ, কোরবানি-কোনোকিছুই তাকে কর্তব্যে আটকাতে পারেনি। তার চলে যাওয়ার ৫ বছরেও আজও বাবাহীনতায় কিংবা ‘বড় হয়ে গেছি’তে অভ্যস্ত হতে পারিনি। যাহোক, তার সেই সাহসিকতা জ্বীনে না পেলেও কিছুটা ছিটেফোঁটা দক্ষতা পেয়েছি। সেটাই কাজে লাগাই আর গিন্নীর কাছে ভাব নিই। একবার পাকনামো করে এপার্টমেন্টের পুরো বৈদ্যুতিক সংযোগের বারোটা বাজানো ছাড়া, আর দুইবার কায়দা মতো শক খাওয়া ছাড়া আজতক মোটামুটি চালিয়ে নিচ্ছি।

কর্পোরেট আইনে জিএম সাপদের বাসার কাজ করায় আশা করি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে ভাববেন না, লোকটা কাজের চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে ত্যক্ত। কাজ করতে ভালই লাগে। অনেক দিন আগে ঘুম নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। যাতে লিখেছিলাম, একজন মানুষ গড়পড়তা ষাট বছর বাঁচলে তার একটি বড় অংশই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। যদি ঘুম নামে কিছু না থাকত, তবে আরো অন্তত ছয়টি ঘন্টা কাজে লাগানো যেত। ইশ!

চাকরি নামের কাজে নেমে পড়েছি গত দেড় দশক। এই দেড় দশকের ৫৪৭৫ দিনের মধ্যে দুপুরে ভাত ঘুম দিয়েছি যতটা মনে পড়ে, পাঁচ থেকে ছয়দিন। তাও সবশেষটা হবে আরো বছরখানেক আগে। কপাল।সারাদিনে নানা অভিজ্ঞতায় ঝুলি ভরেছি। আজকে রাতটাও তেমন। কেমন যেন অচেনা অচেনা। কী

প্যাডে বসার এটাই সময়। তবে মনে হচ্ছে শেষ করতে পারব না।

কোলস্থিত’র প্রাণশক্তি, মানে চার্জ ফুরিয়ে আসছে।

এক; #LavishLifestyle #WastageOfMoney

নিটোলের আবদারে দুপুর বেলায় গিয়েছি কিছুদিন আগে বয়কট হওয়া আড়ং এ। ওহ, ভুলে গিয়েছেন কি? আড়ং যে বয়কট হয়ে গেছে বাংলাদেশে? জাগ্রত ফেসবুক জনতার বয়কটে ভেবেছিলাম, আড়ং এখন হতে ফাঁকা থাকবে। গিয়ে দেখলাম, বঙ্গদেশের সব জাগ্রত মহিলা জনতা দলে দলে আড়ং এ। আর তাদের সাথে ত্যাগের মহান মাসে নিজেকে বিলিয়ে দেবার বাসনাতুর তাদের সব মর্দে মুমীন স্বামীগন।

আমার কেনাকাটার বিদ্যার দৌড় ঘরের বহুমূল্য ঝাড়ুুুু কেনার মধ্যেই সীমিত। গত হপ্তায় দুই হালি ডিম কিনেছি। ৩ টা পঁচা। তাই ওপথে আর হাঁটি না। নিটোল কাপড় দেখে। আমি দেখি মানুষ আর তাদের কাম কাজ। এক দম্পতি এসেছেন ত্যাগের মাসের মহান মন্ত্রে উজ্জিবিত হয়ে। কোলের বাচ্চাটি ভীড়ের চাপে পাগল হয়ে ট্যাঁ ট্যাঁ করে আড়ং মাথায় তুলেছে। বাচ্চার মায়ের কোনো বিকার নেই। কী এক কায়দায় সে বাচ্চাকে এক কাঁখে ঝুলিয়ে আরেক হাতে কাপড় বাঁছে।

আপনারা দেখেছেন কিনা জানি না। বড় বড় কেনাকাটা বাজারগুলোতে বিশেষত কাপড়ের দোকানগুলোতে মহিলারা ঢুকেই প্রতিটি তাক, প্রতিটি প্রদর্শন দেয়াল, প্রতিটি ইঞ্চি কী এক উন্মত্ত নেশায় তন্ন তন্ন করে কী যেন খোঁজেন। সেই সময়কার ত্রস্ত চিত্রটি আমি সাহস করে কখনো চিত্রগ্রাহক যন্ত্রে ধারন করতে পারিনি। পারলে আপনাদের দেখাতাম।

এক পরিবার এসেছেন কারো জন্য উপহার কিনতে। সাথে বয়স্ক স্ত্রী, ছোট বাচ্চা এবং সম্ভবত ছোট শ্যালিকা, যে প্রায় একজন তন্বী। ভদ্রলোক আধা ধার্মিক। তার স্ত্রী কঠোর বোরকার আড়ালে কাপড়ের গুনাগুন যাঁচাই করছেন। ভদ্রলোকের ছোট শ্যালিকা তার বোনের ঘাটতি পোষাতে তার পোশাকে সব আয়োজন রেখেছেন। আমার মাথায় ধরল না, স্ত্রীকে বোরকার আড়ালে রেখে শ্যালিকাকে মডেল হিসেবে দাড় করে পোষাকের জীবন্ত মহড়া কী করে দিচ্ছেন দুলামিয়া। ওদিকে সেই ট্যাঁ ট্যাঁ করা বাচ্চার মা তখনো এক হাতে ত্রস্তব্যস্তে পোষাক বাঁছাই করেই চলেছেন। বাচ্চাটা মনে হয়, তার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে ট্যাঁ ট্যাঁ করতে। ভীড়ের বাজারে ধুলা, শব্দ, চিৎকার, শিৎকার, হাহাকার, উন্মাদনা, নানান পদের সুগন্ধির ঘামে ভেজা বিকৃত ঘ্রান, সদ্যই নিচে থেকে ফুঁচকা খেয়ে পেটে গ্যাস বানানো নারী পুরুষের পশ্চাৎ নিশ্বাসের কুঘ্রান-সব মিলিয়ে নরক গুলজার। আহ ত্যাগের মাস।

দুই; #LawaltyToLaw #ObeyingLaw #LegalObligation #ViolationOfLaw

দুপুর নাগাদ মিরপুরে এক দফা প্রবল বর্ষণ হল। সেই বর্ষণের মধ্যে ভাবলাম, মানুষ কম থাকবে, যাই দরকারী একটা কাজ সেরে আসি। তুমুল বৃষ্টির মধ্যে আমাকে বহনকারী চার চাকার শকটটি চালক সাহেব একটি বাজারের সামনের রাস্তায় সামনে পিছে দুটো চটপটি আর সান্ডার তেলের ভ্রাম্যমান ভ্যানের মাঝখানে কায়দা করে রাখল। গিয়েছি মশাড়ি কিনতে। ডেঙ্গুতে কিছুতেই মরা চলবে না। ও মা! ডেঙ্গু হতে রেহাই পেতে গিয়ে বঙ্গদেশের সদাশয় পুলিশের হাতে ধরা। কী হয়েছে? না, তেমন কিছুই না। রাস্তায় পার্কিং এর অপরাধে জরিমানা করেছেন দারোগা বাবু। শত হলেও ইদের মৌসুম। আমি শুধু তাকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা, আমার শকটের সামনে আর পিছনে দুটো ভ্যান গাড়ি স্থায়ীভাবে রাস্তা দখল করে ব্যবসা করছে। আর আমার শকটটি ১৫ মিনিটের জন্য অস্থায়ীভাবে তাদের মাঝে রাখলাম, তাও প্রবল বৃষ্টির মধ্যে, কোথায় নো পার্কিং বিজ্ঞপ্তিও নেই। তাহলে কেন জরিমানা?

দারোগা বাবু একরকম অর্থপূর্ন দৃষ্টিতে তাকালেন। যার অর্থ হল, দাদা, বোঝেনই তো, ইদের মৌসুম, মহান আল্লহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য গরুর মাংস খেতে হবে তো। গরু কিনতে তো পয়সা লাগে, তাই না? আমি স্পিকার হয়ে জরিমানা দিলাম। নিজের গাধামোকে অভিশাপ দিলাম। হায় সেলুকাস! একই স্থানে কয়েক সপ্তাহ আগে গিয়েছিলাম। যন্ত্রশকট রাখতে গেলে দুইজন জাগ্রত জনতা এসে বাঁধা দিলেন। আমি ভাবলাম, বাহ, দেশতো কত্ত কত্ত কিউট ও নিয়মতান্ত্রীক হয়ে গেছে। মানুষ স্বেচ্ছাসেবক হয়ে রাস্তার নিয়ম বলবত করছে। বাহ। ওমা! পরে দেখি, তারা রাস্তায় বসানো তাদের দোকানের বিক্রী বাট্টা বাধাগ্রস্থ হওয়া আটকাতে আমার শকটকে বিতাড়িত করছেন। অপদার্থ ও স্পিকার হয়ে আমি তবু জানতে চাইলাম, রাস্তায় দোকান বসানো গেলে আমার শকটটি কিছুক্ষণ রাখতে কেন বাঁধা? তারা দুজনই আমাকে বললেন, আপনি ’আনলিগ্যাল’ কথা বলছেন। দোকান বসানোর জন্য মার্কেট কর্তৃপক্ষ মাসিক চাঁদা নিয়ে তারপর অনুমতি দিয়েছে। তারা দোকান বসাবে। আপনি গাড়ি রাখতে পারবেন না। আমি স্পিকার হয়ে গেলাম। কেন আমি এই মহান যুক্তিটি নিজে জানতাম না।

বাসার কাছে একটি চায়ের দোকানে প্রায়ই আমরা দুই সমাজ বঞ্চিত নর নারী মালাই চা খেতে যাই। একদিন গিয়েছি। আমাদের বহনকারী যান্ত্রিক শকটটি চায়ের দোকানের সামনে দাড় করাতেই লাঠি হাতে একটি অপুষ্ট বালক ছুটে এলো। কী হয়েছে? ডিসি অফিস হতে নিষেধ আছে, এই রাস্তায় গাড়ি দাড়ানো যাবে না। আর ওই বালক ও তার রেস্তোরা মালিক হল বাংলাদেশের বিবেক এবং আইনের একমাত্র বৈধ রক্ষক। মুশকীল হল, রেস্তোরাটির প্রায় পচাত্তর ভাগ ফুটপাতেই তার কার্যক্রম চালাচ্ছে। আর তাদের সামনের প্রায় তিনশো গজ যায়গা আগত চা-খোরদের বাইক দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ। শুধু গাড়ি দাড়ানো যাবে না। বাহ! আইন ভঙ্গের প্রবণতা মানুষের সহজাত ও আদি স্বভাবের অংশ। তার ওপর, হ্যা, আমরা বাঙালিরা অপরাধপ্রবণও।

#সবাই১না অবশ্যই। তারপরও বলব, আমাদের ভেতরে আইন না মানা ও অপরাধ প্রবণতার জন্মের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী হল আমাদের আইন প্রণেতা ও প্রয়োগকারীরা। এই যে, এই দেশে মানুষ সামান্য ৫ টাকা পেশাব করার টাকাও মেরে দিয়ে সটকে পড়তে চায়, এই যে মাসুল না দেবার, কর না দেবার প্রবণতা, তার জন্য প্রধানত দায়ী কর গ্রহিতা ও করের টাকা নয়ছয় করে গিলে খাওয়া কর্তারা। একেকজন রাজকীয় কর্তা আর রাজনৈতিক কর্তা আর সেই সাথে তাদের লুটেরা সাঙ্গপাঙ্গরা যে হারে টাকা লুটবার সামান্য ছিটেফোঁটা খবর লিক হয়, তা হতেই আন্দাজ হয়ে যায়, যে, মানুষের টাকা কোথায় কীভাবে যাচ্ছে। একজন রিক্সাওয়ালা তার রক্ত পানি করা টাকা হতে অতি অতি সামান্য যে ডিফল্ট ট্যাক্স রাষ্ট্রকে দেয়, সেটা যখন কোনো ইতর কর্তার ছেলের ছাগল কিনতে ব্যায় হয়ে যায়, একজন বেশ্যার রাত শ্রমের টাকা ব্যাংকে রাখার পরে যখন সেই অতি কষ্টের টাকা ভূতে খেয়ে মোটা হয়, তখন আর কারোরই ট্যাক্স দেবার, আইন মানার ইচ্ছেটা বেঁচে থাকে না। এর পর হতে কাউকে আইন না মানার জন্য ভর্ৎসনা করার আগে বিষয়টা একটু মনে রাখলে সবার ভাল।

বাংলাদেশের মানুষ কেন নিত্য দিন কোনো আইন মানতে চায় না, তা নিয়ে আমাদের বহু বহু অভিযোগ। কিন্তু আরেকটি দিক হতে দেখলে, আমাদের আইন না মানার মতো খাসলতের জন্য সরকার, সরকারী ব্যবস্থাপনা, রাজনীতি ও সবকিছুতে রাজনৈতিক দৃর্বৃত্তায়নই দায়ী। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন আমাদেরকে একটি উদাসীন, বেপরোয়া, আত্মকেন্দ্রীক, স্বার্থপর, সুবিধাবাদী ও ভীরু জনগোষ্ঠীতে পরিণত করেছে। তাহলে এর থেকে আর কী আশা করবেন?

তিন;

নিটোলের নতুন এক নেশা হয়েছে। বারান্দা বাগানের। গাছপালা নিয়ে থাকা আমার আশৈশব অভ্যাস। শত হলেও সুন্দরবনের দেশের মানুষ। আমার আজও মনে পড়ে, আমাদের কলোনীর পতিত জমিতে সবজি, ফুল ফলের গাছ লাগানোর একটি বিশাল প্রকল্প ছিল সেসময়। একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগিয়েছিলাম ফুলের জন্য। তাতে ফুল ফোটা দেখে আসতে পারিনি। তার আগেই জীবিকার টানে ঢাকা আসা। এমনই হয়। এক মানুষ গাছ লাগায়। ফল খায় অন্যজন। যাহোক। গিন্নীরও গাছের বাতিক আছে। গত এক মাসে দুটো বিশাল বারান্দা গাছ দিয়ে মোটামুটি জঙ্গল বানিয়ে ফেলেছিলাম। শুক্রবার আর শনিবার মিলে তাকে মানুষ করেছি দু’জনে। হ্যা, এখন ওটাকে ভদ্রলোকের ব্যালকনি বলা চলে।

নিটোলের দিনের সময়ের একটি বড় অংশ কাটে গাছের যত্ন আত্তিতে। আমার শনিবারগুলোর বড় অংশ যায় বারান্দা বাগানের গাছের পিছনে। কিনে আনা নানা গাছ তো আছেই। নতুন করে যা হয়েছে, তা হল, রাস্তায় চলতে ফিরতে কোনো বাসার সামনে কোনো একটা জঙলা বা বাহারি গাছ পেলে তার দুয়েকটা চারা বা ডাল সংগ্রহ করে নিয়ে আসছি। কিন্তু তাতেও বাধ সাধল ডেঙ্গু। কীভাবে? গতকাল বেরসিক সিটি কর্পোরেশন (সিটি বাজানো করপোরেশন ভাববেন না আবার) এসে এলাকার যত বাসার সামনে অর্কিড বা বাহারি ছোটখাটো গাছ ছিল, সব সমূলে উপড়ে ফেলেছে। এই শনিবারে লতা সংগ্রহ অভিযানে যাবার কথা ছিল আমাদের। হায় ঈশ্বর! আমার বুঝে আসে না, মশা তো এইসব অর্কিড বা ঘাসজাতীয় গাছের মধ্যে জন্মে না। সেগুলো কী অপরাধে কাটা পড়ল। মুশকীল হল, এলাকায় সমস্ত দামী টাইলস বসানো ফুটপাতগুলোতে বাড়িওলা কিংবা দোকানদাররা যে দেদারসে পানি জমার মতো নানা অপদ্রব্যে ভরে রেখেছে, সেগুলো তেমনি বহাল তবিয়তেই আছে। তবু মনকে বুঝ দিলাম, সরকার বাহাদুর আমাদের ভালোবেসে আগাছা উচ্ছেদ করেছেন। যাতে আমরা ডেঙ্গুতে না মরি। ভাল।

বাসার কাছেই ফুটপাতে কী করে  কী করে যেন একটি বিশাল কাজু বাদাম গাছ হয়েছে। গাছটির বয়স কমপক্ষে দশ বছর হবে। আমি খুব কাকতালীয়ভাবে একদিন আবিষ্কার করেছি, যে গাছটি কাজু বাদামের। মিরপুরের ফুটপাতে কাজু বাদাম গাছ। তাও আমার মতো ভবঘুরের চোখে। গত তিন চারমাস আগে গাছটিতে ফল ধরেছিল। আমি আশায় আশায় ছিলাম, পাঁকলে একদিন গিয়ে দুয়েকটা নিয়ে আসব। ওমা! গিয়ে দেখি, ঢাকার ভদ্র সন্তানেরা তার পুরোটা ঢিল মেরে ফুটপাতে কাচা ফলের বন্যা বইয়ে দিয়েছে। সম্ভবত কেউ আঁচও করেনি, গাছটি মূল্যবান বস্তুতে ঠাসা। হায় ঢাকা। বাঙালী সবকিছুতেই নিজেকে শামিল করতে চায়। তারা পিটিয়ে নিরীহ একা নারীকে মেরে ফেলার জেহাদে অংশ নেয় স্রেফ কৌতুহল আর মনের মধ্যে জমানো অবদমিত ক্রোধ প্রশমনের জন্য। গাছে ঢিল কেন ছোঁড়ে কে জানে।

চার;

মায়ের কাছে শুনেছিলাম, তাদের ছোটবেলায়, সেই বৃটিষ আমলে দেশে ওলাওঠা নামের মহামারি আসত। গ্রামকে গ্রাম সেই ওলা ওঠায় উজাড় হয়ে যেত। আর ছিল বসন্ত দেবীর আশির্বাদ। এই দুই দানব ব্যাধি ফি বছর এসে বাংলার গ্রামকে গ্রামের ছেলে, বুড়ো, বাচ্চা, নারী-সবাইকে আশির্বান্বিত করে বিধাতার পদতলে স্থান দিত। সেই আমলে মূর্তিমান আতঙ্ক ছিল ওলা ওঠা (কলেরা) আর গুটি বসন্ত। কোনো গ্রামে কোনো বাড়িতে কারো বসন্ত হলে তার ত্রিসীমানায় কেহ ঘিঁষত না। হাল আমলে সেই অন্ধকার যুগ আবার ফেরত এলো কিনা কে জানে। সামান্য মশার সাথে যুঝে নাকাল আস্ত একটি দেশ। ডেঙ্গু যেভাবে থাবা বসাচ্ছে, তাতে কোরবাণীর পরে তার বিস্তার আরো ভয়াবহ হবে বলে কেহ কেহ মনে করছেন। বিশেষত আমাদের লক্ষ লক্ষ হক হালালী টাকার মালিকরা লাখ টাকা দিয়ে যে গরু জবেহ করে তার রক্ত, উচ্ছিষ্ট ইমানের সাথে রাস্তায় ফেলে দেবেন, পরিষ্কার করবেন না, সেই নোংরায় এডিসের সুবিধা হবে বলে মনে হয়। বিশেষত ডেঙ্গুর ভাইরাসবাহি মশা কোরবাণীর পশুগুলোকে কামড়ালে তার ফলাফল ও বিস্তার কী হবে-সেই নিয়ে কোনো গবেষনা হয়েছে বলে মনে হয় না।

এদেশে অবশ্য গবেষনাও এক পাপ। আর তাই লেজেহুমু এ্যাশ্যাদ চাচার প্রবর্তিত রাষ্ট্রধর্মের লেবেল লাগানো দেশে দুধে অপদ্রব্য ও রাসায়নিকের উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করা পাপ। কিন্তু দুধে ভেজাল ও অপদ্রব্য সরবরাহ করা আবার পাপ না। রাষ্ট্রধর্মের দেশে আবার টেলিভিশন চ্যানেলে বাতাবি নেবুর চাষ বাড়াতে শত কোটি টাকা বাজেট দেয়া হয়, কিন্তু  বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বাজেট টান পড়ে। প্রতিবার কোরবানী এলে আমি দুটো অনুরোধ আমার চারপাশের লোকজনকে করি-এক, পশু জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজটি যেন পরিচ্ছন্নতার সাথে করা হয়। আর দুই, শিশুদেরকে যেন এই কাজগুলোতে শামিল না করা হয়। ত

বে আমার মর্দে মুমিন ভাইয়েদের কেউ কেউ মনে করেন, শিশুদের ছোটবেলা হতে এতে অভ্যস্ত করা ইমানি দায়ীত্ব। মফস্বলেও দেখেছি, ঢাকাতেও দেখি, মাদ্রাসার শিশু বাচ্চাদেরকে তাদের শিক্ষকগণ বিশাল বিশার ছুরি হাতে দিয়ে জবাইয়ের কাজে পাঠান। প্রতিটি জবাই হতে তারা একটি হাদিয়া পান। একটি নয় দশ বছরের শিশু হাতে রক্তাক্ত একটি ছুরি নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, তার সারা জামায় রক্তের ছোপ ছোপ দাগ, হাতে, মুখে রক্তের চিহ্ন-এই দৃশ্যটি ওই শিশুটির জন্য মোটেই কাম্য হতে পারে না। (জবাইও করে তারা, আমি জানি। তবে বিগত দশ বছরে কখনো আমি পশু জবাই করতে দেখিনি বিধায় জোর গলায় বলছি না।) আমরা চাইলেই এই অংশটুকু ডিলিট করে দিতে পারি। খুব সহজে।

পাঁচ;

বাসার আশপাশের প্রায় সবগুলো গলি সরকার বাহাদুরের স্থানীয় প্রতিনিধি, মানে ওয়ার্ড কমিশনারের বদৌলতে ঢালাই রাস্তায় রূপ নিয়েছে। বহুদিন প্রচন্ড ভাঙাচোরা থাকার পরে তাদের এই রূপ দেখে আশান্বিত হয়ে উঠেছিলাম। যাক, এবার এলাকার ছিরি ফিরল বলে। ওমা! রাস্তা বানানোর পরেই দেখি, প্রত্যেক গলির বাড়িওলারা তাদের গলির দুই পাশ দিয়ে পেল্লাই আকারের দুটো গেট বসিয়ে স্থায়ীভাবে গলির মালিকানা দখল করে নিয়েছে। একটা বিশাল রাস্তায় তো রীতিমতো স্থায়ীভাবে গেট বসিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে কারো চলাচল। কেন? ওই রাস্তার দুপাশের এপার্টমেন্টের ছেলেছোকরারা ওখানে সারাদিন ক্রিকেট খেলেন। আর তাদের ধনী মায়েরা ও বাবারা সকাল বিকাল রাতে সরকারী খরচে পাঁকা করা ওই রাস্তায় নিজস্ব জমিদারী বলবত করে স্বাস্থ্য চর্চায় হাঁটাহাঁটি করেন। সমাজের অর্বাচীন শ্রেনীর উচিত নয়, তাদের এই বিনোদনে ব্যঘাত ঘটানো। যদিও সরকারী রাস্তায় কীভাবে ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য গেট বসানো যায়, আমার জানা নেই। এদেশে আসলে সবই সম্ভব। সিটি কর্পোরেশন হতে এলাকার ময়লা নেয়া সমিতিকে বাড়ি বাড়ি হতে টাকা নেবার আদেশ করা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশনের  বেতনভূক্ত রাস্তা কুড়ানীদের বেতনের জন্য চাঁদা তুলতে। তাহলে তাদের জন্য বরাদ্দ বাজেক কোথায় গেল?

রাস্তায় নামব, ট্রাফিক বাবাজিদের নানা নিয়মের ঠ্যালা। ওই ঠ্যালা অবশ্য সুবিধা বুঝে। ঢাকার রাস্তায় বাস চলে, ট্রাক চলে, বেবিট্যাক্সি চলে, রিক্সা চলে, ভ্যান চলে, প্রাইভেট কার ও বাইক চলে। কিন্তু সীট বেল্ট বাঁধার বাধ্যবাধকতা শুধু কার চালকদের। বাস, ট্রাক, লরি, সিএনজির চালকদের সীটবেল্ট নেইও, বাঁধবারও নিয়ম নেই। তার মানে, শুধু প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাসের চালক সীটবেল্ট না বাঁধাই নিরাপত্তা হুমকী। কত চমৎকার দেশ।

ছয়;

ইহ! গালে একটি মশায় কামড় দিলো। ইদানীং মশা কামড়ালে আগে দেখি, এখন দিন নাকি রাত। ঘড়ি দেখলাম, রাত সাড়ে নটা। যাক, ডেঙ্গু মশা অন্তত না। গত দেড়ঘন্টা ধরে একটানা লিখছি। কীসব লিখছি, তাও জানি না। লেখাটা আমার একটি নেশা। সহকর্মীর স্ত্রী মারা গেছেন ডেঙ্গুতে। মৃত্যুর মতো ভয়াল বিষয় নিয়ে লিখতে কখনো স্বস্তি পাই না। কিন্তু গত পরশু ঘটনাটা ঘটার পর হতে মাথাটা ভয়ানক রকম এলোমেলো হয়ে আছে। কাউকে বুঝতে দিই না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা ভয়াবহ অস্থিরতা অনুভব করি। আমার সহকর্মীকে কোনো সান্তনার বাণী আমি দিতে পারিনি। তার ভয়াবহ শোকের মুখোমুখি হবার সাহস করিনি। আমি জানি আমি ভীরু, দুর্বল। এই ভয়াবহ ঘটনা নিয়ে ভাবতেও একরকম অসহায় বোধ হয়। মৃত্যুর একটা হিমশীতল স্রোত গ্রাস করে রেখেছে গোটা দেশকে। মানুষগুলো মশার যত রকম ওষুধ আছে, তার জন্য উদভ্রান্তের মতো ছুটছে। আহা আহা!

আর আমাদের ব্যবসায়ী জাগ্রত জনতা, যারা দয়া করে নিজেরা না বানালে, আইনত কোনো ট্রেড লাইসেন্স লাগে না, তারা এই সুযোগে মস্কিটো রিপিলেন্টের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন দশগুন। এদেশে লাইসেন্স লাগে টিভি কিনতে, বন্দুক কিনতে, কুকুর পালতেও হয়তো লাগে। কিন্তু হাজার হাজার ভাসমান কিংবা দোকানদার কিসিমের ব্যবসা করতে লাইসেন্স লাগে না। বাহ বাহ বাহ। যে যেভাবে পারছে, টাকা লুটছে এদেশে। যে লুটছে না, সে কেবল সুযোগ বা সাহসের অভাবে। কীভাবে একটি মধ্যম আয়ের দেশ এত তুচ্ছ একটি সমস্যাকে মহামারিতে রূপান্তর করে, তা জানতে হলে বাংলাদেশ হতে পারে পিএইচডি গিনিপিগ।

সাত;

প্রাচীনকালে সমাজে একঘরে করার একরকম নিষ্ঠুর প্রথা ছিল। সমাজের ও মেজরিটির মতের বাইরে চললেই যে কাউকে একঘরে করে রাখা হত। তার ধোপা নাপিত বন্ধ করা হত। তার মুখদর্শনও করত না কেউ। হ্যা, সমাজপতিরা অবশ্য ওই বাড়ির ডাগর ডাগর নারী সদস্যদের প্রতি উদগ্র লোভ ও কামনার আগুন নিয়ে হা করে তাকিয়ে থাকত। সেকালে বালিকা বয়সে বিধবা হওয়া নারীকূল সমাজে বাকি জীবন অস্পৃশ্য হয়ে বেঁচে থাকলেও তাদেরকে ভোগের ক্রীড়ানক হিসেবে কাছে পেতে আবার সমাজের পুরুষ ও গুরুকূল ওৎ পেতে থাকত। যাক সেসব কথা। আজকের সভ্য সমাজেও একঘরে করে রাখার প্রথা আছে। নয়া রূপে যদিও। আজ সেরকম একটি অভিজ্ঞতা নিয়ে একটু বলি।

কিছু সুসভ্য মানুষ তাদের বনেদিয়ানা, নতুন করে জাতে ওঠা, অতি ব্যক্তিত্ব ও রক্তচক্ষুর জোর বজায় রাখতে এই ঢাকা শহরের অখ্যাত দুটি প্রাণীকে কতকটা একঘরেই করেছেন। তাদের পরিচয় উহ্য থাকুক। একঘরে প্রাণী দুটি তাই এই নিষ্ঠুর নগরের পথ, গলি, বাজার, ফুটপাত, অচেনা জনস্রোত, রিক্সাওলা, গাছওলা, সেলসগার্ল, হকার, ফেসবুক আত্মীয়, ফেসবুক বান্ধব নিয়েই বাঁধে তাদের একঘরে জীবন। পৃথিবী সবাইকে আপন করে নেয়, শুধু তার নিজের আপনজনকে আপন করতে চায় না। “ও যার আপন খবর, আপন আর হয় না। একবার আপনারে চিনতে পারলে রে। যাবে অচেনারে চেনা।।

লেখার মধ্যেখানে ফেসবুক টাইমলাইনে একটি ’বন্ধুতা অনুরোধ জানানি’ (ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট নোটিফিকেশন) এলো। কোনো এক অচেনা মানব আমার মুখবই বন্ধু হতে চেয়েছেন। টাইমলাইনে ঢুকে দেখি, আরো ৯৭৮ টি এমন অনুরোধ আটকা পড়ে আছে। যাদের কাউকেই চিনি না। আবার চিনিও। আহ, নতুন ধরনের বন্ধুতা-ফেসবুক বন্ধুতা। বন্ধুহীন জীবনে এই বা কম কীসে? কৈশোরে, যৌবনে, পূর্ন বয়সে বন্ধু বানাইনি, বাড়াইনি। আস্তে আস্তে বোহিমিয়ান আর একাকী জগতের বাসিন্দা হয়ে পড়েছি। ’বন্ধু’ খুঁজতে আতশ কাঁচ লাগে এখন। কখনো কারো সাথে বন্ধুত্ব বিষয়টি ঠিক হয়ে ওঠেনি। হয়তো পড়তায় পড়ে না, অথবা মানুষটাই আমি চাঁছাছোলা। আমি তাই দুটো শব্দ ব্যবহার করি, ‘সুহৃদ’ ও ‘ফেসবুক কানেকশন’।

একবার একজন অমন সুহৃদ ‘ধন্যবাদ বন্ধু’ জানিয়ে একটা বার্তা দিয়েছেন। আমি তাকে বললাম, ভাই, আমি তো বন্ধু না। স্রেফ শুভাকাঙ্খী। বেচারা রেগে গেল। কিংবা অভিমান করল। হয়তো সেই অভিমান আজও ভাঙেনি। না ভাঙুক।কিছু অভিমান জমে থাক চোখের কোণে,অভিমান জমুক রক্তাক্ত হৃদয়ে। আনমনে।

আবদ্ধ ঘরের সিলিঙে থেমে যাক কিছু জমানো কষ্ট,অথবা জানালার কাঁচে বিন্দু বিন্দু জমা বাস্প।কাল আবার বন্ধুত্ব দিবস। কাল কাকে তবে মেসেজ দেব-খুঁজে পাই না। তার চেয়ে এই ভাল। খারাপ কী এই ভার্চুয়াল বন্ধুত্বে?

সুহৃদ মিঠুলকে নিয়ে একবার একটি পোস্ট দেবার পরে ঘটনাপ্রবাহে, মিঠুলকে অনেকগুলো মানুষ বন্ধুতা অনুরোধ পাঠালো। মিঠুল পরের দিন দুঃখ প্রকাশ করে জানালো, ”ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট চেক করে দেখি, ওয়ালিদের আর আমার সবগুলা মিউচুয়াল ফ্রেন্ডই হইল পোলা। অর ফ্রেন্ডলিস্টে কোনো মাইয়া মানুষ নাই লাগে।” হা হা হা। বেচারা।

নারে, আছে। একজন। খালি আমার গিন্নী নিটোল। বাকিরা কেবলই পান্ডববর্জিত পুরুষকূল। লিখতে লিখতে ফেসবুকেও একটু ঢুঁ মারি। এমনিতেই ফেসবুক এনগেজমেন্ট কমিয়ে দিয়েছি। দিনের দুটি নির্দিষ্ট সময় ছাড়া পেশাগত মেসেঞ্জার মেসেজ পড়া বা উত্তর দিই না। ফেসবুকে ফ্রেন্ড কতজন, তার সংখ্যা নিয়ে ও সেই সংখ্যায় নানা উপলক্ষ্যে কাঁচি চালানো নিয়ে অনেক লেখা দেখি। মজা লাগে। ফেসবুক ফ্রেন্ড! তায় আবার সত্যিকারের ভালোবাসা আর মিথ্যাকারের ভালোবাসা। হা হা হা হা হা।

একটি সত্যি কথা বলি। পৃথিবী সত্য কথা, সত্য বচন, ন্যায্য বচনের স্থান নয়। পৃথিবী আসলে মেকী সভ্যতার। মেকী ভালোবাসার।আমাদের চিরচেনা পৃথিবী স্বার্থের, আত্মকেন্দ্রীকতার, প্রতারনার, কপোটতার। মুখোশের। মাঝে মাঝে পৃথিবীটাকে ভেঙে নতুন করে গড়তে ইচ্ছে হয়। পাগলামি।

#collection #combined #thuglife #workaholic #shopping #breakinglaw #violatinglaw #parking #traffic #friendship #fraud #hypocrisy #socialreality #urbanlife #weekendvibes #lawandorder #bangladeshidiary #everydaylife #satire #bohemianthoughts #familylife #truth #everydaystruggle #politics #society #injustice #corruption #reflection #LifeAndReality #HumanReflection #SocialMirror #EthicsAndEmotion #DeathAndDignity #UrbanStories #BangladeshSociety #WriterThoughts #FriendshipAndFaith #CollectiveConscience

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *