এই লেখাটি এমদাদ ভাইকে নিয়ে লেখা নয়। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সবাই কিছু না কিছু বলছে, তাই আমিও বলব — সেজন্যও লেখা নয়। এমদাদ ভাইয়ের মৃত্যু আমাদের জন্য কোনো উপলক্ষ্য নয়। কোনো কিছুরই উপলক্ষ্য হতে পারে না। কে কার আগে শোক মাহফিল করব, কে কী রকম ব্যানারে শোক জানাব, কে কোন সংগঠনের নামকে সমুন্নত করতে তার মৃত্যুকে উছিলা বানাব — তার জন্যও নয়।
এমদাদ ভাইয়ের সাথে আমার কোনো ছবি নেই। তাই দেয়া যাচ্ছে না। তবে সত্যি বলতে, আছে, আজ হতে ১৩ বছর আগে তোলা। কিন্তু সেটি দেব না। আমার ব্যক্তিগত নীতির বিরোধী সেটা, তাই দেব না।
এমদাদ ভাই আমার জীবনের প্রথম চাকরীর সহকর্মী। আর আজকে আমি যা, তার জন্য তিনি অনেকখানি দায়ী। সেদিনের বাচ্চা একটি ছেলেকে নানা বুদ্ধি, পরামর্শ, বকা, গালাগাল, প্ররোচনা দিয়ে তিনি সামনে যেতে বাধ্য করেছেন। আমাকে তিনি দু’দুটো বড় ব্রেক থ্রূ দিয়েছেন।
তাকে একবার খুব বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছিলাম। অনিচ্ছাকৃত। তিনি রাগ করেছিলেন। পরে রাগ ভেঙেছিলেন। তেজগাঁয়ে অফিস হবার পরে দেখা করব — কথা দিয়েছিলাম। কথা আর রাখা হয়নি। আর কখনো হবেও না।
এমদাদ ভাই কেমন মানুষ ছিলেন, ভাল না মন্দ, যোগ্য না অযোগ্য, সেটা আমার জানার দরকার নেই। যেটা জানা যেতে পারে, সেটা হল, জীবিত এমদাদ ভাইয়ের বন্ধুসংখ্যার বিশালতা আমাকে ইর্ষান্বিত করত। লোকটা মানুষকে জড়াতে পারত। খুব।
জান্নাতবাসী এমদাদ ভাই আজও আমাকে ইর্ষান্বিত করছেন। তার আকষ্মিক প্রয়ানে আমাদের অপাংক্তেয় তৈরী পোশাক খাতে কাল হতে যেই পরিমান ভক্ত, সুহৃদ, বন্ধুমহলের শোক দেখেছি, তা আমাকে তার মৃত্যুর পরও ইর্ষান্বিত করছে। ক’জন পারে এভাবে মৃত্যুর পরে মানুষকে নাড়া দিতে? আমি তো জীবিত থেকেও পারছি না।
না আমাকে কেউ চেনে। না কাউকে আমি চিনি। না আছে বন্ধুমহল। না আছে শোকগাঁথা লেখার মতো গুনগ্রাহী কেউ। এর সবই ছিল তার।
কাল সকাল হতে আমি নিজেকে সামলানোর অনেক চেষ্টা করেছি। ভুলে যাবার চেষ্টা করেছি। পারছি না। এই অদ্ভূৎ প্রাণপ্রাচুর্যের লোকটিকে খোদাতায়ালা একটি কামব্যাক চান্সও দিলেন না! আমি চাই না, আমি আপনাকে ভুলে যাই এমদাদ ভাই।
বলেছিলাম, এই লেখাটি এমদাদ ভাইকে নিয়ে নয়। এটি আসলে আমার নিজেকে নিয়ে ভাবনা হতে লেখা। কাল হতে ভাবছিলাম, আমি যদি আজ হঠাৎ মরে যাই, আমি কতটা দাগ কাঁটতে পারব মানুষের মনে?
এমদাদ ভাইয়ের মতো ভাগ্য ক’জনের হয়? আবার ক’জনের হয় এমন হতভাগ্য? যে মানুষটার হাতে ছিল সবার নিয়ন্ত্রণ, সে আটকে পড়ল, যখন বাকিরা বেঁচে ফিরেছেন। ভাগ্য খুব রহস্যময়। খুব নিষ্ঠূর।
আমার মৃত্যু খবর ছড়ালে কী হতে পারে তার মানবিক প্রতিক্রিয়া, তার একটা ছবি দেখি কল্পনায়। মরে গেছি — এটা মানুষের জানতে অনেক দেরী হবে। কারণ লেখালেখির বাইরে আমার সামাজিক উপস্থিতি প্রায় নেই। বলার জন্য বলা নয়, আক্ষরিকভাবেই, আমার প্রায় কোনো বন্ধুবান্ধব নেই। যাকে আপনারা বন্ধু বলেন আরকি, সেটা।
তাই মারা গিয়েছি, সেটা খুব বেশি মানুষের জন্য কোনো দ্রষ্টব্য ঘটনা হবে না। আমি খুব বন্ধুবৎসলও নই। অন্তত বেশ কিছু মানুষ ইন্না লিল্লাহ পড়ার সাথে সাথে “লোকটা নাক উঁচা ডাট উঁচা ছিল” বলবে।
তিন চারদিন পরে যখন নিউজ হবে (হবার সুযোগ কম যদিও), তার ভাষ্য হবে, “ওয়ালিদ ওরফে বিদ্যুৎ নামে একজন গার্মেন্টস কর্মকর্তা গত পরশু হঠাৎ………………….কারণে মারা গেছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি খুব বেশি শুভাকাঙ্খী রেখে যাননি। তার মৃত্যুতে শোকগাঁথা লেখার জন্য কাউকে পাওয়া যায়নি। নিভৃতচারী ও অসামাজিক হওয়ায় তার সন্মন্ধে খুব বেশি কিছু জানা যায়না। তবে তিনি নিয়মিত সামাজিক মাধ্যমে লিখতেন। তার লেখার অল্প সংখ্যক ভক্ত থাকলেও পেশাজীবি মহলে তাকে খুব একটা শ্রদ্ধার চোখে দেখা হত না। তিনি তার বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গী ও মতবাদের জন্য সমালোচিত ছিলেন। তার আত্মীয় স্বজন বা তার পারিবারিক জীবন নিয়ে খুব একটা জানা যায়নি। তাছাড়া জানা গেছে, স্বভাবগতভাবে তিনি অনেক দিন ধরেই অনেকটা সুশীল সমাজচ্যুত ছিলেন। এমনিতে নাঁক উঁচু, অহঙ্কারী আর দলছুট ওয়ালিদ সাহেবের মৃত্যুতে গার্মেন্টস সেক্টর একজন জেষ্ঠ্য কিন্তু অস্বস্তিপূর্ন সদস্যকে হারালো।”
এমনটা হবে। কেন তা বলি। কারণ এমদাদ ভাইয়ের আকাশচুম্বী গ্রহনযোগ্যতা ও সামাজিক যোগাযোগ আমি দূর হতে দেখে গেলেও নিজের মধ্যে তাকে কখনো আনতে পারিনি।
সবাইকে নিয়ে, সবার সাথে ব্যাপক মেলামেশার কারণে এত বড় একটা সেক্টরে যে তাকে সবাইই চিনত, সেই অর্জনও কখনো সম্ভবও না। না হোক, তিনি তার মতো একজনই উদাহরণ থাকুন।
দক্ষিণবঙ্গের একজন অসাধারন মায়ের কোলে আজ হতে কয়েক দশক আগে যার জন্ম, তার জীবনটা এরকম হঠাৎ করে মায়ের বর্তমানেই থেমে যাবে, কেউ কি জানত। ”ওপাড়ে ভাল থাকবেন” এই কথাটি বলে শেষ করে দেয়া যায়। কিংবা ”এমন করে চলে যাওয়াটাই কি নিয়ম” এটা দিয়েও।
#life #death #Emdad #accident #socialization #friendship #mourn