Skip to content

বেঁচে থাকায় জিন্দাবাদ

মফস্বল শহরের একজন অখ্যাত বাবার সন্তান হিসেবে এই রাজধানী শহরে এসে কোনোরকমে দুটো ভাত পানির বন্দোবস্ত করে বেঁচে ছিলাম এতকাল। এই ক্লিষ্ট জীবনে আবার বৈরাগীর সাথে যোগ হয়েছে বৈষ্ণবী একজন। কায়ক্লেশে জীবনযাপন করে যৎসামান্য সঞ্চয় করে বৃদ্ধ বয়সের জন্য যাহোক কিছু একটা করতে পারছিলাম। হঠাৎ করে দেশকে পেল মধ্যম আয়ের দেশ হবার কুহক বাসনায়। সাথে যোগ হয়েছে কিছু অর্থলোভী দানবের উদগ্র লোভের ছোবল। মাঝখানে পড়ে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত (আসলে নিম্নবিত্ত)’র জীবন ছাড়খার। বেতন হতে ট্যাক্স, ট্যাক্স দেবার পরে থাকা অর্থ দিয়ে কিছু কিনতে গেলেই ভ্যাট, নানারকম ঘাইকিচিং করে যৎসামান্য অর্থ ব্যাংকে রাখতে গেলেই সার্ভিস চার্জ, ট্যাক্স, ভ্যাট, এক্সাইজ। বেখেয়ালে এতদিন মনেই ছিল না, ব্যাংকের প্রোফিট রেট হতে ইনফ্লেশন রেট বেশি হওয়ায় প্রতি বছরে টাকার পরিমান কমে যাচ্ছে অটোমেটিক্যালি। মানছি দেশ হয়তো এগিয়ে যাচ্ছে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হচ্ছে। কিন্তু মাননীয় ভাগ্য বিধাতা, সেটাতো আমার জীবনে কোনো আশির্বাদ বয়ে আনছে না যদিও সেই ইমার্জিং টাইগারকে খাওয়ানো, পিন্দানো হচ্ছে আমার টাকায়, আমাদের টাকায়।

মাথাপিছু আয় অঙ্কের হিসাবে আমারও ১৬০০ ট্রাম্পীয় ডলার। কিন্তু আমার পকেটেতো ১৬০০ টাকাও নেই। এই কথা বললেই বোদ্ধা সুশীলরা বলে এই চুপ চুপ, ওটা অর্থনীতির কঠিন তত্ব, তুই বুঝবি না। আমি সত্যিই বুঝি না। বুঝতে চাইও না। ছোটবেলায় অংকের স্যার আমাদের ঐকিক নিয়মের ফাঁকিটা বোঝাতে একটা গল্প বলতেন। উন্নয়নের অংক ও অঙ্ক নিয়ে যারা অতি উদ্বেলিত, তাদের জন্য নিবেদিত। গল্পটি লিখতে আমাদের অতি উচ্চহারের জিডিপি গ্রোথ রেট এবং অবিশ্বাস্য রকমের মাথাপিছু আয়ের অঙ্ক আমাকে উজ্জিবিত করেছে।

ঐকিক নিয়ম অনুসারে, মনে করুন,

যদি ৫০ জন লোকের একটি পুকুর কাটতে ১০ দিন লাগে।

তাহলে, ১০০ জন লোকের ওই পুকুর কাটতে লাগবে ৫ দিন।

তাহলে, ২০০ জন লোকের ওই পুকুর কাটতে লাগবে ২.৫ দিন।

তাহলে, ৪০০ জন লোকের ওই পুকুর কাটতে লাগবে ১.২৫ দিন।

তাহলে, ৮০০ জন লোকের ওই পুকুর কাটতে লাগবে ১৫ ঘন্টা। 

তাহলে, ১৬০০ জন লোকের ওই পুকুর কাটতে লাগবে ৭.৫ ঘন্টা। 

তাহলে, ৩২০০ জন লোকের ওই পুকুরটি কাটতে লাগবে ৩.৭৫ ঘন্টা। 

তাহলে, ৬৪০০ জন লোকের ওই পুকুরটি কাটতে লাগবে ১.৮৭ ঘন্টা।

তাহলে, ১২৮০০ জন লোকের ওই পুকুরটি কাটতে লাগবে ০.৯ ঘন্টা।

এমনি করে, যদি ৫০ হাজার লোক লাগানো হয়, তাহলে তারা এসে ওই স্থানে দাড়ানো মাত্র অঙ্কের নিয়মে মুহূর্তে পুকুরটি কাটা হয়ে যাবে। কোনো সময়ই লাগার কথা না। কিন্তু, বাস্তবতা হল, ৫০ হাজার লোক ওখানে এলে, পুকুরটি কোনোদিনই কাটা হবে না। অংক আর বাস্তবতা ভিন্ন বিষয়। অঙ্ক ও অংক দিয়ে বিজ্ঞানের জটিল আবিষ্কার করা যায়, সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হয়, তালকে তিল করে দেখানোও যায়। কিন্তু জীবন ও মানব সম্পর্কিত বিষয়কে স্রেফ অংক ও অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে খুব ভুল হবে।

 দেশের বিশাল অঙ্কের বাজেট, মারাত্মক হারে জিডিপি গ্রোথ ও অবিশ্বাস্য মাথাপিছু আয়ের উল্লম্ফন দেখে ‍যদি আপনার উত্তেজনা চরমে উঠে থাকে, তাহলে পুকুর কাটার অংকটি আবার করুন। উত্তেজনা কিছুটা হলেও প্রশমন হবে। বিশাল জিডিপি আর আপনার গরিবী মুক্তি-অর্থনীতির জটিল মারপ্যাঁচে সমানুপাতিক হলেও তা বাস্তবের মাঠে মোটেও সমার্থক নয়।** অযথা রাজনৈতিক মন্তব্য করতে চাইলে অন্যত্র করুন। মুছে ফেলব। আমি রাজনীতির মানুষ নই। পেটটা আমার , পকেটটাও আমার কাটা হচ্ছে।  বলা হচ্ছে কাটা অর্থের বিনিময়ে আমি বহু সেবা ফেরত পাব। কই? কতিপয় অতি আশির্বান্বিত ভাগ্যবানের পকেটেই যাচ্ছে সব। আমাদেরতো ইহ ও পরকাল দুটোই ঝরঝরে হয়ে যাচেছ। জীবনটা মধ্যবিত্তদের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। নাকি এটাকে মানবেতর বলব বুঝতে পারছি না।

কর্পোরেটের ইঁদুর দৌড়ে টিকে থাকার জন্য প্রতিমাসে ও বছরে আপনাকে যে খরচটা করতে বাধ্য হতে হয়, না চাইতেও যে প্রতিযোগীতা আপনাকে টেনে নিজের মাঠে নিয়ে আসছে, সক্ষমতা থাক বা না থাক, জীবনের আর দশটা কসট কাট করে হলেও যে খরচগুলো আপনার করতে বাধ্য হতে হচ্ছে-স্রেফ স্রোতে টিকে থাকতে, আলোচনায় থাকতে, প্রাসঙ্গিক থাকতে, পারসোনাল ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিংয়ে, সেটার পরিমান কত?

আমি এটার একটা নাম দিয়েছি-PDCC পারসোনাল ডিজিটালাইজেশন অ্যান্ড কমপেটিটিভনেস কসট

প্রতিদিন আমাদের যে খরচগুলো ভাত-মাছের খরচের নিয়মিত ও জানা হিসেবের বাইরে করতে বাধ্য হতে হচ্ছে-তার কিছু নমুনা:

মোবাইল ডেটা প্যাক
ব্রডব্যান্ড কসট
লিংকডইন প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
বিডিজবস প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
ক্লড প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
ক্যানভা প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
গামা প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
মামা প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
ঠাম্মা প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
ফেসবুক প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
ইনসটা প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
মাসে ৩ বার গ্লোরিয়া ও নর্তেন্ড প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
বছরে ১ টা প্রিমিয়াম সার্টিফিকেশন কসট
বছরে ৬ টা গেট টুগেদার কসট
বছরে ২.৫ টা মেডেল ও ক্রেসট কেনার কসট
বছরে ১৮ টা কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করবার সাবসক্রিপশন কসট
বছরে ৩ টা পিকনিক ও ৩.৫ টা ইফতার অ্যাটেন্ড করবার কসট
কিছু স্থানে উবারে যাতায়াতে বাধ্য হবার কসট
বছরে আটবার “আশ্চর্য মলমে”র মতো যুগান্তকারী সিভিট লিখিয়ে নেবার কসট
বছরে ১ বার করে জুম ও স্ট্রিমইয়ার্ড প্রিমিয়াম সাবসক্রিপশন কসট
বছরে অসংখ্যবার দরকার অনুযায়ী স্থানে, অস্থানে গিফট করবার কসট
বছরে ২ বার পেইড পেইজকে দিয়ে নিজেকে ফিচারড করবার কসট
বছরে অসংখ্যবার নিজের ও পেজের ডিজিটাল প্রোমোশান করানোর কসট


এত এত কিছু শুধুমাত্র আপনাকে জাতে তোলার ও খবরে থাকার জন্য।

আপস্কিলিং ও রিস্কিলিং কসট এর মধ্যে নেই।

এখন ভাবুন, আপনি আয় হতে ব্যয় করবেন, নাকি ব্যয় নির্বাহের জন্য যেভাবে পারেন আয় করবেন?

হে ভাগ্য বিধাতা, সত্যি প্রাণে বাঁচা বড্ড কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সত্যি আমরা বড় কষ্টে আছি। নানারকম অ্যাডজাস্ট করে, বন্ধুদের আড্ডা স্যাকরিফাইস করে, সামাজিক অনুষ্ঠান বয়কট করে, এক ডিম ৪ জনে ভাগ করে খেয়ে, ফুটপাতের জামাকাপড় কিনে, অফিসে তিনবেলা চা খেয়ে চা’য়ের পয়সা বাঁচিয়ে, ঈদ কোরবানিতে বিকেলে ভাগার মাংস কিনে চালিয়ে বিগত বছরগুলো আমরা মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা জীবনটাকে তাও চালিয়ে নিচ্ছিলাম। টিসিবির ট্রাকের লাইনে দাড়িয়ে চাল ডাল চিনি, আটা না হয় কিনে পেট চালানো যাবে কিন্তু গ্যাস কই পাব, বিদ্যুত, পানি, বাসভাড়া, বিড়ির প্যাকেট, বাচ্চার দুধ, ন্যাপি, ওরস্যালাইন, মায়াবড়ি-এগুলো কেনার টাকা কই পাব? না হয় সারাবছর রোজা থাকলাম ‍কিন্তু উদীয়মান অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে যে হারে সবকিছুর দাম বাড়ছে তাতে দু’চার বছরতো মরার দড়ি কেনার পয়সাও হাতে থাকবে না। ধনী অর্থনীতির অন্যতম বাধ্যতামূলক অনুসঙ্গ হল সম্পদের অসম বন্টন। একদলের হাতে প্রচুর আলগা টাকা। তারা মার্কেটে আলগা টাকা ঢালায় প্রাইস লেভেল কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেবে। পাশাপাশি তারা ফটকা কারবারি করে টাকা কুক্ষিগত করে রাখে। সবদিক হতেই দরিদ্র ও ভদ্রদের জন্য সমস্যা।

তার উপরে এখনতো দেখছি সামান্য দুইটা টাকা হাতে থাকলেও বছর না ঘুরতেই অংকের মারপ্যাচে সেই দুই টাকা হয়ে যাচ্ছে দেড় টাকা।

হে ভাগ্য বিধাতা:

ধনী দেশের তকমা পাবার কুহক লালসার পেছনে আমরা আর কত বলি দেব? (যারা সবকিছুতেই রাজনীতির আর ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজেন তারা দয়া করে দুরে থাকুন। যারা ত্যানা প্যাচাতে সবকিছুতেই দেশের দোষগুন খোঁজেন তারাও তফাত যান। আমি শুধুমাত্র একজন নিম্নবিত্ত শহুরের জীবনবোধ নিয়ে কথা বলেছি। দেশের আর্থ-সামাজিক উত্থান বা পতন আমার মতো নাদানের আওতার মধ্যে না। আমি তাতে নাক গলাই ও না। ওটা বোদ্ধা লোকদের জন্য তোলা থাকুক।

আরেকটা কথা বলি। যত কথাই আমরা বলি, দেশের উন্নয়নের ইন্টারিম সময়ে বহু টালমাটাল ঘটবেই, অনেক কিছু ইগনোর করেই কাজ করতে হয়। রাষ্ট্রযন্ত্র আমার আপনার মতো করে ভাবলে দেশ চলে না। বিষয়টা অনেক বিশাল সিস্টেমের। নিখাঁদ পবিত্রভাবে ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বলে কিছু হয় না।)

#middleclasslife #nakedlife #thuglife #cosmeticdevelopment #economy #tax

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *