Skip to content

কালো চোখের সাদা মানুষ

  • by

আমি মানুষটা বড্ড ভাল নই। তথাকথিত গুডি বয়তো নইই। সমাজের দশজনের একজনও নই। বন্ধুসমাজের চোখের মণিও হতে পারিনি। অসামাজিক ও অমিশুক হিসেবে বেশ বদনাম আছে আমার। না না, আমার গুণপনার জন্য গল্প ফাঁদতে আসিনি।

বহুদিন ধরে একটা ছোট্ট পোষ্ট দেবার এরাদা মনে ছিল। এরাদাটি যখন করেছি সেখান হতে পোষ্টের কলেবর মনে মনে আরো বড় হয়েছে। তবু লেখা হয়নি। আজকে রাতে মনে হল, কবে ডাক পড়ে বসে। হয়তো শেষতক লেখাটা শেষ করতে পারব না। আফসোস নিয়ে মরতে হবে। কেন যেন জীবনে ন-মানুষদের সংস্পর্শে আসার অভিজ্ঞতাই আমার বেশি হয়েছে। আমার মতো সস্তা মানুষের চোখে দেখা কয়েকজন অসামান্য মানুষের গল্প এটা। না আমি তাদের সারাজীবনের সব সুকীর্তির বা দুষ্কীর্তির ডালা খুলে বসব না।

শুধু আমার দেখা কয়েকটা ঘটনাতে তাদের মহানুভবতার পরিচয় পেয়ে বিপরীতে আত্মস্বার্থমগ্ন আমার নিচ জীবনের তুলনা করতে গেলে বড্ড ক্লীশবোধ করি। ব্যক্তিগত প্রাইভেসি রক্ষার স্বার্থে এই অসামান্য মানুষগুলোর নাম বলব না। ওঁরা যদি আমার এ লেখা কখনো পড়েন তবে আমার ইচ্ছাটুকু মূল্য পাবে।

সন ১৯৯৮।

এইসএসসি পাস করলাম। মফস্বলের একটি কলেজ হতে পাশ করা একটি সাধারন ঘরের ছেলে আর কতটুকু স্বপ্ন দেখতে পারে? আমি সেই কলেজেই ইংরেজিতে অনার্স ভর্তি হলাম। কোনো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হব কিনা সেটা নিয়ে দোদুল্যমান। এমন সময় একজন তৎকালীন ঢাকা ডেন্টালের সিনিয়র ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় হল। তিনি আমাকে অনেকটা শাসন করলেন, অধিকারের ভঙ্গিতে বললেন, তুমি অবশ্যই যেকোনো মূল্যে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবে। আমি বললাম, খরচ? তিনি বললেন, লাগলে চেয়ে চিন্তে পড়বে। বিশ্বাস করুন তার চাপাচাপিতেই আমি শেষতক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। আমার ও আমার পরিবারের আজকের জীবনটা এমন হত না যদি সেই বড়ভাই সেদিন আমাকে সেই শাসনটুুকু না করতেন। তার নামটি বা খোঁজটি আর রাখতে পারিনি। তিনি এসেছিলেন দেবদূত হয়ে।

আমার পরের চরিত্রের নাম “……..ল্লাহ”। ওঁর সাথে আমি একই রুমে থেকে ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। যখন একত্রে থাকতাম তখনও আমি কখনো ভাবিনি ছেলেটা এতটা মহানুভবতা রাখে মনে। ওঁর হৃদয়ের সত্যিকার পরিচয় পাই যখন আমাদের আরেকজন সাবেক রূমমেট ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু পথযাত্রী হন। “………ল্লাহ” ওঁনাকে শুরু হতে শেষ পর্যন্ত যেভাবে সেবা করেছে, ওনার জন্য ফান্ড তোলা হতে তার বিছানার পাশে বসে তাকে সাহস দেয়া পর্যন্ত-আমার মতো সামান্য মানুষ কলমে তার বর্ননা দিতে পারবে না। “………ল্লাহ”-তোমার প্রতিদান ঈশ্বর নিশ্চই দেবেন। তুমি হয়তো জানো না, আমি মনে মনে কতটা শ্রদ্ধা অনুভব করি তোমার ওই কাজের জন্য। ”

……উল” নামের আরেকজন অসামান্য মানুষকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। আমাদের একজন সাবেক সহপাঠি যাকে আমরা সবাই ভুলে গেছি তার চরম আর্থিক দুরবস্থা, দুর্ঘটনায় পড়ে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষনে লড়াই চলাকালীন “……..উল ব্যক্তিগতভাবে যেভাবে লড়াই করেছেন ওঁর চিকিৎসার খরচ যোগাতে, তার পাশে থেকে-আমি শপথ করে বলতে পারি-সেটা কোনো মহামানবের চেয়ে কম না। ”

……….যম”, “………..ক খান”, “……..শা” সহ আরো ২২ জন মানুষকে আমি মন হতে শ্রদ্ধা করি। ফেবু’র উপর হতে যখন বিশ্বাস উঠে যাচ্ছিল, তখনি ফেবুতে আপন নিবাস নামে একটা বৃদ্ধাশ্রম দেখার পর হতে ভাবছিলাম কী করতে পারব তাদের জন্য। অনেকদিন কাটার পরেও স্বার্থপর ও কেরানী সমাজের যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে যখন ব্যাপারটা প্রায় ভুলতে বসেছি তখনি একদিন দেখি এই দারুন মানুষগুলো আপন নিবাস নিয়ে স্থায়ী একটা প্রোগ্রাম দাড়া করিয়ে ফেলেছে। আরো ২২ জন শ্রদ্ধাষ্পদ মানুষ তাদের সাথে। আশ্রমের ২৫ জন অসহায় মায়ের স্থায়ী দেখভালের ব্যবস্থাসহ ওরা যা যা করেছে সেটা মাদার তেরেসার চেয়ে কম কিছু নয়। আপনাদের নাম বললাম না। শুধু আকাশের ঠিকানায় প্রণতি রইল। যাজাকাল্লাহু খাইরান। ”

………ভেজ” ভাই। আমার দেখা একজন (ভীতিজাগানিয়া) সাদা মানুষ। এই ভদ্রলোক ঠিক কী কারনে বাংলাদেশে ডাক্তার হতে গেলেন তার দিশা আমি আজও পাইনা। তিনি অনায়াসে কবি অথবা একজন মাদার তেরেসা হতে পারতেন। বাংলাদেশের মানুষ যখন নির্বিচারে ডাক্তারদের বদনাম করে, আমি শুধু এই মানুষটিকে মনে করে সেসব সমালোচনাকে অম্লান বদনে ক্রস করে দিই। এই জীবনে রাত নেই, দিন নেই, উৎসব নেই, সময় অসময় কিছু নেই-যখনি তাকে ফোন করে ডাক্তারি পরামর্শ চেয়েছি কখনো তিনি বলেননি, এখন কেন? আমি ও আমার স্ত্রী নিটোলকে তিনি তার ডাক্তারী জীবন দিয়ে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। ভাববেন না, নিজের উপকার পেয়েছি বলে এত বলছি। আমি নিজে দেখেছি, বাংলাদেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটের বিপরীতে কী অপরিসীম নিবেদন ও আন্তরিকতা নিয়ে তিনি ডাক্তারীটাকে উপভোগ করেন। মজার বিষয় হল, তার হাতের লেখা প্রেসক্রিপশন কোনোমতেই কম্পোজের চেয়ে খারাপ না।

নাম না জানা একজন রিক্সাওয়ালাও আছেন আমার এই তালিকায়। একবার রাতের গাড়িতে ঢাকায় নেমে বউসহ বাসার গেটের সামনে দাড়িয়ে সমানে গেটম্যানকে ডাকছি গেট খুলতে। গেটম্যান অসুস্থ থাকায় গেট খুলবার ডাক শুনতে না পাওয়ায় আমরা দু’জন মানুষ রাত আড়াইটার সময় গেটের বাইরে খোলা রাস্তায় যেকোনো মুহূর্তে ছিনতাই/ডাকাতি হবার ভয়ে আতঙ্কিত। তো আমি আমাদের রিক্সাওয়ালাকে বললাম আমাদের সাথে একটু দাড়াতে। তিনি পুরোটা সময় (প্রায় ২৫ মিনিট) আমাদের জন্য দাড়ালেন। যখন গেট খুলল, আমি তাকে ২০ টা টাকা বকশিশ দিতে গেলাম। আসল মানুষটার পরিচয় পেলাম তখনি। ভদ্রলোক জিব কেটে আমার বকশিশ প্রত্যাখ্যান করে বললেন, আমি যদি এই টাকাটা নিই তবে নিজের প্রতি অবিচার হবে। গুনাহ হবে।” আমি একজন সামান্য রিক্সাওয়ালার মহানুভবতার কাছে আজীবনের জন্য নত হলাম।

খোরশেদ নামের একজন মোটর মেকানিকের সাথে পরিচয় হয়েছিল ঘটনাক্রমে। বছর দু’য়েক আগে একদিন অফিসে আসার সময়ে আমার মোবাইল, চাবি, আইডিকার্ডসহ একটা পার্সব্যাগ বাসে হারিয়ে যায়। সেটার চিন্তায় আমার যখন জান বেরোবার যোগাড়, তখনি এই ভদ্রলোকের জিম্মায় আমার সব মালামাল ফেরত পাই। তিনি বাসে আমার ব্যাগটা পড়ে থাকতে দেখে নিজের জিম্মায় নেন। ওনার সাথে দেখা করে যখন জিনিসগুলো আনতে যাই তিনি আমাকে ভাই বলে ভরসা দিয়ে পাশে বসান। আমাকে সান্তনা দেন। আমার সাথে তার সুখ দুঃখের গল্প করে আমার ব্যাগ ফেরত দেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তার সাথে খাওয়া এককাপ চা যখন শেষ করে উঠলাম, তিনি মানিব্যাগ বের করলেন বিল দিতে। আমাকে তিনি বড্ড লজ্জিত আর বাধিত করলেন তার ভিতরের অসাধারন মানুষটার পরিচয় দিয়ে।

আমাদের চারপাশে কিলবিল করা অসংখ্য কালোর ভিড়েই অনেক সাদা মানুষ ছুপা রুস্তম ভাল মানুষ হয়ে বসে আছেন। আমরা আমাদের প্রাত্যহিক আটপৌড়ে জীবনে তাদের সাথে চলাফেরা উঠবসে বিষয়গুলো সেভাবে অনুভব করি না। করলে সেটা খুব সুখকর অভিজ্ঞতাই হত।

পৃথিবীটা শুধু কালো মানুষে ভর্তি না। আমি আজও বিশ্বাস করতে চাই, পৃথিবীকে বিধাতা এখনো টিকিয়ে রেখেছেন এই সাদা মানুষগুলোরই জন্য।

#greathearts #goodman #whiteimage #EnlightenedPerson #GoodHuman #NobleHeart

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *