Skip to content

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বজনীন ভাবনার টুকিটাকি

  • by

এক: বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে চাওয়া ও পাওয়া: –

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাম্য ভূমিকা ও দায়ীত্ব কী হওয়া উচিৎ-তা নিয়ে আমি প্রচুর কথা বলি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মের মূল কারন কী-সেটা জানতে হারভার্ডের বর্তমান ভূমিকার দিকে চোখ রাখলেই হয়।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় একাই এক নির্বোধ, মূর্খ ও উন্মত্ত দানব এবং তার ততোধিক মূর্খ পারিষদদের ভুল নীতি ও চাপের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছে; নিজের নীতি, ঐতিহ্য, দৃষ্টিভঙ্গি, নর্ম রক্ষা করতে। হ্যা, হারভার্ড, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, কলাম্বিয়া, স্ট্যানফোর্ড, MIT, কেউই ধোয়া তুলসিপত্র নন। তাদেরও অন্ধকার দিক ও অতীত আছে। কিন্তু, সেটার বিপরীতে তাদের সৃষ্ট প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের ওজন কমে যায়নি। (হ্যা, একটি বডির ভ্যালুজ ও ইনার এপ্রোচ তাদের সৃষ্ট জ্ঞানের ওপর বায়াস নিয়ে আছড় করে-সেটা লং রেঞ্জে অস্বীকার করা যাবে না।)

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও তার পারিষদদের এ থেকে শেখার আছে।

ট্রাম্প এবং তার ট্রাম্পেট বাহিনী যেই নীতি, স্ট্রাটেজি ও চটক নিয়ে এগোচ্ছে, তার সবথেকে বড় শিকার সম্ভবত হবে আমেরিকার শিক্ষা ও গবেষনা খাত। মেকিং অ্যামেরিকা গ্রেইট-এই লক্ষ্য খুব পবিত্র। তবে পদ্ধতি, যেটা এই ভাড় ও মূর্খ চটক ও চমকের জন্য এপ্লাই করছে, সেটা চমক সৃষ্টি করতে পারবে, পপুলিজমকে খুশি করবে, আমজনতাকে অর্গাজম দেবে। কিন্তু, জাতিকে গ্রেইট করতে পারবে না। রাজনীতিবীদরা এক্সেলেন্স নামের মাকাল ফল বেচতেই অভ্যস্ত। তাদের অন্ধ ভক্তরাও মাকালকেই পিচ ফল বলে বিশ্বাস করতে অভ্যস্ত। তবে সবাই অন্ধ নয়।

শিক্ষা, গবেষনা ও উদ্ভাবন একটি খাত, যেখানে চট করেই কোনো ভাল বা মন্দের আছড় মালুম হয় না। মালুম হবে দশ বছর পরে। এই তিনকে একটি দেশ বা জনগোষ্ঠীর মাদার অব অল ডেভেলপমেন্ট বলা যায়। এখানে কোনো যাদু নেই। এখানে জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। জ্ঞানের কোনো শর্টকাট নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়সহ যেকোনো ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ আমার সব সময়ের একটি অন্যতম আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

বিশ্ববিদ্যালয়ের থীম, জন্মের প্রেক্ষাপট, বিশ্ববিদ্যালয়ের করণীয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রমের প্রত্যাশিত রোডম্যাপ-এই বিষয়গুলোর উপরে আমার নিজস্ব কিছু ভাবনা রয়েছে। এই ভাবনাকে সমৃদ্ধ করবার জন্য এবং আমার ভাবনাকে যাচাই করে নেবার জন্য পাঠকদের কাছে যেটি জানতে চাই, তা হল, বিশ্ববিদ্যালয় হতে শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা আসলে কি পেতে চাই?

অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালযয়ে গমন এবং সেখান থেকে ৪-৫ বছর পরে কোর্স শেষ করে বেরিয়ে আসার ভেতর দিয়ে আমাদের কী কী প্রত্যাশা থাকে?

আমি কিছু উদাহরণ বলছি, বিশ্ববিদ্যালয় হতে আমি কী পেতে চাইব বা চেয়েছিলাম-তা নিয়ে। আপনিও কিছু যোগ করুন:-

-প্রথমত, আমার মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আমাদের প্রথম প্রত্যাশা থাকে সাবজেক্টিভ নলেজ প্রাপ্তি।

-দ্বিতীয়ত, সরাসরি সাবজেক্টের সাথে রিলেটেড না হলেও, পারিপার্শ্বিক অনেক বিষয়ের উপরে ইনসাইট পাওয়া।

-কী করে চিন্তা করতে হয়-তার দিক নির্দেশনা পাওয়া।

-কীভাবে জ্ঞান আহরণ করতে হয়, কী করে শিখতে হয়, এবং কী করে শেখাতে হয়-তা জানা।

-নতুন ভাবে ভাবতে শেখার পাঠ অর্জন করা।

-দৃষ্টিভঙ্গিতে কাঙ্খিত পরিবর্তন আনয়ন করা।

-জীবন, জগত, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব ব্যবস্থার উপরে বিস্তৃত, বহুমুখী এবং নবতর ভাবনা অর্জন করা।

-ডাইভারসিটি অর্জন এবং পারসেপশনের ডাইমেনশনকে মাল্টিফোল্ড ও মাল্টিডিসিপ্লিনারী করতে শেখা।

-গবেষণা করতে শেখা। চিন্তাকে সাজাতে ও ক্লাসিফায়েডভাবে প্রকাশ করতে শেখা।

-একজন আধুনিক এবং আলোকিত মানুষ হবার দীক্ষা অর্জন করা।

-জ্ঞান সৃষ্টি, জ্ঞান নিয়ে একাডেমিক আলোচনা ও চর্চা, জ্ঞান বিস্তার, গবেষনা।

-সার্বিকভাবে বললে জ্ঞানচক্ষু ও অন্তর চক্ষু খুলে নেয়া।

এক কথায়, এগুলোই আমার দৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার প্রধানতম ডেলিভারেবলস। আমি প্রায়ই বলি (যদিও বিষয়টি এত সরল নয়।) চাকরির বাজারের সাথে মিল রেখে কারিক্যুলাম ডিজাইন করা এবং চাকরির বাজারের উমেদার সরবরাহ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়ীত্ব নয়। আপনি যদি এর সাথে কিছু যোগ করেন, বা, আপনার বিশ্ববিদ্যালয় হতে এগুলো পেলেন কিনা-তা জানান, তাহলে আমরা আরও ঋদ্ধ হতাম।

দুই: বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার প্রক্রিয়া কেমন হতে পারত?: –

গত সপ্তাহে একটি বিশেষ কারণে  আমি Facebook এবং লিংকডইনে একটি  পোস্ট দিই, যে পোস্টটিতে আমি  দেশের  একটি প্রথম সারির পাবলিক ইউনিভার্সিটি, একটি প্রথম সারির প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এবং ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একটি কলেজের  চতুর্থ বর্ষে অধ্যায়ন করছেন-এমন তিনজন মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলবার আগ্রহ প্রকাশ করি।

অনেকে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি সেখান থেকে বাছাই করে তিন জনের সাথে কথা বলি।  তাদের সাথে হওয়া  কথার  আলোকে এবং আগে-পরে  বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সাথে আমার যেসব আলোচনা হয়েছে, তা সংযুক্ত করে, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের থিম, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য,  বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয় থেকে  শিক্ষার্থীরা  কি পেতে চান বা সাধারণভাবে  একটি দেশ কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে-তার উপরে আমার আগের বক্তব্যকে যুক্ত করে কিছু ইনসাইট সামনে এলো।

কখনো ভেবে দেখেছেন কি, যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের  কারিক্যুলাম অথবা সার্বিক কার্যক্রম, সার্বিক আয়োজন কী হওয়া উচিত? বা কী হতে পারতো? আমি আপনাদের কোন  নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ বা ডিটেকটিভস বলে দেব না।

আমি সেটি পছন্দও করি না। তাছাড়া, আমি যেহেতু শিক্ষাবীদ নই, সেহেতু শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে করণীয়’র ওপরে আমার কথা বলার কাবেলিয়াতও নেই। কিন্তু, একজন সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র এবং বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজের অন্যতম সুবিধাভোগী টেল এন্ডের একজন রিক্রুটার প্রতিনিধি হিসেবে আমি আপনাদের ভাবনার জন্য কিছু ফুড ফর থট বলছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে এই বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া উচিত, কি উচিত নয়; শিক্ষার্থীদের অভিভাবক হিসেবে  অথবা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত কেউ না কেউ  হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে এই বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন কিনা?

যেমন ধরুন: –

ক্লাস লেকচার (এটা বাধ্যতামূলক হলেও ন্যাশনালের কলেজগুলোতে অনুষ্ঠানের বা অংশ নেবার হার অতি সামান্য)। এই লেকচার হওয়া উচিত পার্টিসিপেটরি, কোলাবোরেটিভ, ইনটারেকটিভ, অডিও-ভিজ্যুয়াল বেজড, প্রাকটিক্যাল ও ওপেন। গৎবাঁধা লেকচার বা লেকচার শিট বিতরণের নয়। সেই সাথে ফ্যাকাল্টিবৃন্দের ডক্টরেট থাকাটা ম্যান্ডেটরি হওয়া উচিত।

ক্লাস পারফরম্যান্স বেজড স্কোরিং,

ওপেন ক্রেডিট প্রোগ্রাম (কিছু ডিফল্ট কোর্সসহ স্বাধীনভাবে আরও কিছু কোর্স নেবার স্কোপ, যা কোনো নির্ধারিত ঘরানার হবে না। সায়েন্সের শিক্ষার্থী হলেও তিনি চাইলে দুটো-চারটা কমার্সের কোর্সও করতে পারবেন। সেই সাথে, ক্রেডিট ট্রান্সফার/কনভার্সন/ট্রান্সফরম সহ, ফ্লেক্সিবলি ক্রেডিট শেষ করবার অপশন থাকা দরকার।

ফাইনাল এক্সাম,

মিড টার্ম এক্সাম

টিউটোরিয়াল ক্লাস,

টিউটোরিয়াল এক্সাম,

থিসিস অর রিসার্চ পেপার,

রিসার্চ ওয়ার্ক,

প্রজেক্ট ওয়ার্ক,

ফিল্ড স্ট্যাডি,

ইন্ডাস্ট্রিয়াল এটাচমেন্ট,

ইন্টার্নশিপ,

ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবরেশন এন্ড নলেজ এক্সচেঞ্জ,

ইন্টার ইউনিভার্সিটি কোলাবরেশন এন্ড নলেজ এক্সচেঞ্জ,

লাইব্রেরি ওয়ার্ক,

ল্যাবরেটরি ওয়ার্ক,

একাডেমিক সেমিনার অ্যান্ড ওয়ার্কশপ (যা মূল কার্যক্রমের বাধ্যতামূলক অংশ),

আর্টিকেল পাবলিকেশন,

ক্যারিয়ার ক্লাবিং।

হ্যা, এর সবগুলোই, বা, প্রায় সবগুলোই হয়তো এখনো রয়েছে। আমি বলছি, যে,

এই কার্যক্রমগুলো অতি অবশ্যই কারিকুল্যাম ও ক্যালেন্ডারে বাই-ডিফল্ট থাকা এবং সেগুলো মূল প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে সার্বিক মূল্যায়ন বা রেজাল্টের অংশ হওয়া জরুরী মনে করেন কিনা।

যারা এখনো শিক্ষার্থী আছেন, তারা জানাতে পারেন, যে, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে এই কার্যক্রমের কতটা চালু রয়েছে। বা, চালু থাকলে, সেটি কতটা ভ্যালু অ্যাড করছে? কতটুকু সন্তুষ্ট আপনি সেটি নিয়ে?

আমার একজন সাবেক HR সহকর্মী দেশত্যাগ করে বিলেতে স্থায়ী হবার চেষ্টা করছেন। তার সাথে সম্প্রতি কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, তিনি সিরিয়াসলি একাউন্টিং পেশায় শিফট হবার চেষ্টা করছেন। আর সেটার জন্য তিনি ফরমালি একটা কোর্সও করছেন। তার ভাষ্যমতে, বিদেশে আমাদের দেশী ডিগ্রী ও অভিজ্ঞতাগুলো খুব বেশি পাত্তা পায় না। সব নতুন করে পড়তে ও শিখতে হয়। তদুপরি, সেখানে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অত্যন্ত ডায়নামিক।

আগে হতেই আমি জানতাম, যে, বিদেশে পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ আমাদের দেশের মতো ফিক্সড, স্ট্যাটিক বা রিজিড না। একজন ব্যক্তি যেকোনো সময় যেকোনো বিষয় নিয়ে পড়তে পারেন। একটি অ্যাকাডেমিক ডিগ্রীতে তিনি তার পছন্দমতো সাবজেক্ট বাছতে পারেন। সেখানে মিক্সড সাবজেক্টও থাকে। এমনকি, ভেঙে ভেঙেও ক্রেডিট সিস্টেমে পড়তে পারেন। আবার, একটা ডিরেকশনে পড়তে পড়তে যদি তার মনে হয়, যে, তিনি ডিরেকশন বদল করবেন, সেই সুযোগও আছে। শুরু করবার ২৪ বা ৩৬ মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে-এমন বাধ্যবাধকতাও নেই। আর, নিজের বয়স যতই হোক, যে কেউ নতুন করে পড়াশোনায় নামবার সুযোগ অবারিত। এই ডায়নামিক শিক্ষা ব্যবস্থা এই দেশে কেন আসে না?

#takeawayfromuniversity #deliverablesofuniversity #roleofuniversity #expectationfromuniversity #university #universityeducation #myexpectation

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *