ব্রাত্য ও সমাজচ্যুত হবার ঝুঁকি নিয়ে একটি কথা বলি? কথাটি হল, HR প্রফেশনে ফোরাম, কোরাম, সিন্ডিকেট, সালতানাত ও পরম্পরাহ’র কদর, প্রভাব, চাহিদা ও বাস্তবতা বাড়ছে।
আগেও ছিল, হয়তো মাত্রায় কম। এখন সেটা ফরজ, ওয়াজিবের পর্যায়ে চলে গেছে। কোরামের ‘হুক্কা’ অথবা ’হুক্কাহুয়া’ হওয়াটাই বরং এখন স্ট্যাটাস সিম্বল।
কোরামের ’হুক্কাহুয়া’বৃন্দ ও তাদের Roaring SIMBA-the white lion গণ, কিংবা; পীরে মোদাচ্ছের, অর্থাৎ, গুরুভাইরা যখন পরস্পরের গুণকীর্তন, পিঠ চাপরানো ও পিঠ চুলকানোতে মজা নিচ্ছেন, ঠিক তখনই আবার অন্য প্রফেশনের মানুষেরা এই HR প্রফেশন ও প্রফেশনালদের ’হুক্কাহুয়া’ চরিত্র নিয়ে মজা নিচ্ছেন। তাতে অবশ্য HR প্রফেশনালদের (#সবাই১না) খুব একটা কিছু যায় আসে না। আসলে, প্রফেশনাল প্যাশনের চেয়ে ক্ষুদ্র জাগতিক প্রাপ্তি ও স্বার্থই যখন হয় মূখ্য, তখন, গণমানুষের, বা, আরও স্পষ্ট করে বললে, সেবাগ্রহিতা শ্রেনীর দাঁত কেলানোতে কী-ই বা আসে যায়?
দিনকাল যা পড়েছে, তাতে আপনি এই কোরাম, ফোরাম, সালতানাতের দাসানুদাস না হলে ভাত পাবেন না। ঠিক যেমন গোটা দেশের শিক্ষক সমাজ লাল, নীল, সাদা, কালো (#rainbow) কোরামে বিভক্ত। ব্যবসায়ী সমাজে, তথা পটল বিক্রেতা, খড়কুটো হতে কামান বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট হতে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট-সবার মুখদর্শন শেষ করে আমরা যখন ত্যক্ত, বিরক্ত, তখন নতুন এই সিন্ডিকেটের আবির্ভাব।
জ্যাক, লবি, চাপা-তিন যদি সুপার লেভেলে থাকে, তাহলে টকশো হতে রোড শো-সব গৃহ হতেই সমানে ডাক পাবেন ও ছক্কা পেটাতে পারবেন।
ওই তিন যদি ভাল না হয়, তাহলে টকশো আর পডশো তো বহু দূর, পাড়ায় কেউ মরলে জানাযায়ও ডাক পাবেন না।
স্বার্থ দিতে পারলে চান্দে যাবার মিশনেও সাথী হবার ডাক পাবেন। স্বার্থপদ্ম হাতে না থাকলে মসজিদে মিলাদের জিলাপী খাবার ডাকও পাবেন না। প্রতি মাসে ‘উত্তর কোণা’, ‘গুড়িয়া জ্বিন’ আর ‘ভুতকিলাব’ এ আপনার ‘হাওলাত কার্ড’ (ক্রেডিট কার্ড) হতে চার্জ হওয়া স্ফিত সংখ্যাটির সাথে আপনার জ্যাক, লবি ও তথাকথিত নেটওয়ার্ক পাওয়ারের শনৈ শনৈ উর্দ্ধযাত্রা সমানুপাতিক।
সবথেকে বড় কথা হল, এই যাদুর শহরে, ওই তিন ভাল না হলে আপনি মরলে আপনার জানাযা পড়তে মোল্লাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
অন এ সিরিয়াস নোট, কারো কি জানা আছে, ঢাকা শহরে ক. কবর খুড়তে খ. কবরের যায়গা পেতে গ. জানাযা পড়াতে ঘ. মাইয়্যেত গোসল করাতে কি টাকা লাগে? যদি লেগে থাকে, তাহলে কী হারে?
হাইপ ও ভাইরালের এই যুগে এখনো কোনো অরগানিক ভক্ত থেকে থাকেন, আর বোকার মতো বিশ্বাসও করেন যে, হিজ হিউজ কমপিটেন্সি উইল আলটিমেটলি টক, বিশ্বাস করে বসে থাকেন, যে, হিজ/হার ওয়ার্কস উইল ব্রিং অপারচুনিটি টু ডোরস্টেপ, অগাধ ভরসা রাখেন অরগানিক নেটওয়ার্ক ও অরগানিক অপরচুনিটি হান্ট এর ওপর, তার জন্য একটা বাস্তব চিত্র দিই।
গ্রামে আগুনের মতো সুন্দরী কোনো পাত্রী থাকলে, তার বিয়ের বাজারে ক্রেইজি রকমের ক্রাশ যেমন থাকতে পারে, পাগলা চাহিদার হুড়োহুড়ি থাকতে পারে।
তেমনি আবার, তীব্র সুন্দরীকে ভয়ে, এবং চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হবার সংকোচে বিয়ের বাজারে তার দর পরেও যেতে পারে। নাও বিকোতে পারে সওদা।
ঠিক তেমনি করে, চাকরির বাজারে বিপুল যোগ্যতার কারো যেমন চাহিদা ও কাড়াকাড়ির বাড়াবাড়ি হবেই বলে আমরা ধরে নিই, বাস্তবে, উল্টোও হতে পারে। তার ভীতিপ্রদ সুতীব্র ব্যক্তিত্ব, সমীহ জাগানিয়া যোগ্যতা আর জনপ্রিয়তা তাকে এমপ্লয়ার বা হেড হান্টার, এমনকি সম্ভাব্য যে কোনো জব লিংকারের মনেও তাকে এভয়েড করে বা তাকে তো পাওয়া যাবে না-এই ভুল ভয়ে তাকে নিয়ে ভাবনাই নাও আসার মাশুল টানতে হতে পারে। লোকে ভাবে, ওরেহ বাপরে, ওনারে কি আর আমি কিনতে পারব! উনি কি আর যেই সেই তালেবর! যোগ্যতাহীনতায় চাকরি পাওয়া যাবে না, যোগ্যতা আপগ্রেড করতে না থাকলে প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পড়তে হবে-এই ন্যারেটিভ তো আমরা সবাই জানি ও মানি।
কিন্তু, যোগ্যতা (কিংবা যোগ্যতাজনিত স্টাটাস বা ক্যাপাসিটি) যদি অত্যধিক হয়ে পড়ে, সেটাও যে কারো বিপদের কারন হয়ে বসতে পারে-এই দৃষ্টিকোণটি আমাদের ভাবনার অংশ হবার সময় হয়েছে?
বিষয়টা কিছুটা ভাবতে এমন, যে, আপনি ভুরুঙ্গামারি গ্রামের একটা হাঁটে ম্যাকবুক বিক্রী করার জন্য দোকান দিয়ে বসলেন। দোষ আপনার প্রোডাক্টের না, দোষ আপনার বাজার চয়েসে অথবা, বাজার অনুপাতে প্রোডাক্ট চয়েসে।
তো, জব মার্কেটে যদি আপনি ঘটনাচক্রে ওভার কোয়ালিফায়েড হয়ে বসেন, আপনি অবিক্রীত কিংবা ইগনোরড হবার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। শুনতে খুব আজগুবি ও অতি কল্পনা মনে হতেই পারে। আপনারও কি সেটা মনে হচ্ছে? নাকি বিপরীতটা?
কথায় বলে, আপনি গাত্রে হরিণা বৈরী।
মজার বিষয়, এই সিন্ডিকেটই আবার আনাজপাতির বাজারের সিন্ডিকেট নিয়ে খুব সরব।
বিপদ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে একটা সত্য, যে, স্টার বোদ্ধা, বিজ্ঞ, গুরুভাই, পীরে কামেলে-HR, যাঁরা HR এর রিসালাত ও পরম্পরার সহিহ ও হালাল উত্তরাধিকার রক্তে বহন করেন, যাঁরা ব্রাহ্মণ গোত্রীয়, তাদের ভেট না দিয়ে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। সহিহ রাজকীয় ও আরবীয় HR রিসালাত ও খান্দানের জাতকের তাফসীরের বিপরীতে আপনার মুখনিঃসৃত কোনো HR জ্ঞানই টিকবে না। কোরামের দাপটে প্রকৃত যোগ্য বর (প্রফেশনাল) তার যোগ্য ঘর (কর্পোরেট) পাচ্ছে না; যোগ্য ঘর তার যোগ্য বর পাচ্ছে না।
এমনকি, ওই সহিহ HR রিসালাতের বাইরের মানুষ হলে, আপনি যাই জানুন না কেন, যাই পারুন না কেন, যতই আপনার বিলাতি বা নেড়ি বিদ্যা থাকুক না কেন-সেগুলোসহ, আপনার কৃত বিদ্যা কোনো সামাজিক স্বীকৃতির হকদার হবে না। আপনাকে মেনে নিতে হবে, যে, আপনার পেটের বিদ্যা বিশুদ্ধ রিসালাতের না হওয়ায় সবই বাতেল। আপনার কথার মূল্য দুই কঁড়ি মাত্র। আপনার কদর ও আপ্যায়ন তিন কঁড়ি মাত্র। ভাল পদ-পদবী-কঁড়ির মহান দাসত্ব, মানে চাকরি আপনার জন্য ‘বামুন হয়ে চাঁদের পানে হাত বাড়ানো’র মতো।
এই কোরাম, এই পরম্পরাহ’র উৎস ও শান-এ-মাকাম হতে পারে অভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব (ওই যে আজকাল নানারকম ইয়ান/টিয়ান শোনা যায়, যেমন ঢাবিয়ান, চবিয়ান, খুবিয়ান, জাক্কায়ান, বুয়েটিয়ান, রুয়েটিয়ান, নসুয়ান, ইউলাভান-ওসব আরকি), হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি (ব্যবসাবানিজ্য, ছলাকলা, বিজ্ঞান, অজ্ঞান কত কী), হতে পারে সাবজেক্ট, হতে পারে দাদার বাড়ির অঞ্চল, হতে পারে বিলাতি ডিগ্রীর ব্যাচমেটিত্ব, হতে পারে বুড়োকালের বন্ধুত্বের প্লাটফরম, হতে পারে যৌথ কারবারের সংযোগ, হতে পারে কমোন স্বার্থের যোগসূত্রও। অনেকটা ওই “উত্তরা বারো নম্বরস্থ লাইসেন্সবিহীন ভ্যানচালক লীগ’ এর মতো।
কোরামের বালামে ও পবিত্র তীর্থে আপনার নাম অন্তর্ভূক্তির জন্য আপনার হাই TRP এবং সেলেব হওয়া বাঞ্চনীয়। বাঞ্চনীয় কী বলছি, ফরজে আঈয়েন।
আজ একজন খুব সিনিয়র ও প্রতিষ্ঠিত ভদ্রলোক মন্তব্য করেছেন, যে, পশ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ, বিশেষত, যেগুলোতে বিলিতি কর্মী প্রচুর, তারা তাদের প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে ক্রিম পজিশনগুলোতে আগে হতেই লোক সিলেক্ট করে রাখে। পরে সেটাকে আইনানুগ হালাল করার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। ওই বিজ্ঞাপন লোক নেবার জন্য না, স্রেফ আইন মানার বাধ্যবাধকতা হতে। বলা চলে ঘোস্ট সার্কুলার। কতটুকু সত্যি এটা?
এর থেকেও ভয়ঙ্কর হল, বাজারের বেতনের রেঞ্জ বুঝবার জন্য ডেলিবারেটলি ক্যানডিডেট ডাকা। ১০ জনকে ১০ টা প্রতিষ্ঠান ও ১০ ধরনের প্রতিষ্ঠান হতে ডাকলেই বাজারের অবস্থা বোঝা হয়ে যায়। ক্যনডিডেট জানেন, যে, তাকে জবের জন্য ডাকা ও কথা বলা হল। আদতে, তাকে ডাকা হয়েছে একটা গিনিপিগ হিসেবে।
এরও থেকে ভয়ঙ্কর হল ম্যাজিক্যাল চেয়ার। প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা চলে যাচ্ছেন। তিনি তার চেয়ারে হাতে ধরে তার সিন্ডিকেট ও কোরামের ছোট ভাইকে বসিয়ে দিয়ে যান। এভাবে ম্যাজিক্যাল চেয়ার বিনিময় হয় একটা ছোট গ্যাঙ বা সিন্ডিকেটের মধ্যে। এই দলের প্রত্যেকে তার বাকি গ্যাং মেম্বারদের মধ্যে চেয়ার কমপ্লিমেন্ট করেন।
যে প্রকারেই অর্জিত হোক, আপনার উচ্চ TRP যুক্ত স্টারডম ও স্টারডাস্ট আপনাকে কোরামের দলভূক্তিতে সাহায্য করবে। এই দলভূক্তি আবার অসংখ্য নাজনেয়ামতের নিশ্চয়তা দেয়। যার ভিতরে লোভনীয় পদ-পদবী, উচ্চবেতনের নোকরি, স্বপ্নের প্লাটফরমে জব, ‘অন্যরকম বিষয়সমূহ’ কত কী-ই না আছে। কোরাম হুজুরের ফুঁ থাকলে, বা, ইজমের তাবিজ গলায় ঝুলালে আপনার “এক পা কোরামে, আরেক পা স্বপ্নের কর্পোরেটে।” ফোরামের ছু মন্তরে ক্যাবলাকান্তও হয়ে যাবে কমলাকান্ত। যোগ্যতা টোগ্যতা সব ফুহ।
আপনি কি বৈষম্যহীনতায় বিশ্বাস করেন? নাকি ইকুইটিতে? নাকি মনে করেন, যে, ঈশ্বরই বৈষম্যপূর্ণভাবে প্রকৃতিকে সৃষ্টি ও সাজিয়েছেন, তাই এটা এমনই বেস্ট?
ধরুন, আপনি বৈষম্যহীনতা চান। কিন্তু, ধরুন, আপনার তিনটা সন্তান। একজন আপনার সংসারের সব খরচ দেয়। বাকি দু’জন দেয় না। আপনি কি সবাইকে সমান ভালোবাসা দেখান? সমান সুযোগ দেন? অথবা, আপনার বউয়ের ডেলিভারীর সময়ে আপনাকে এক বন্ধু রক্ত দিয়েছিল। আপনি কি তবুও, তাকে বাড়তি খাতির করবেন, নাকি করবেন না?
আবার, আপনার তিনটা সন্তান। ছোটটা সবচেয়ে দরিদ্র। আপনি কি শুধু তাকে টাকা দিয়ে সাহায্য করবেন, নাকি করবেন না?
ঈশ্বর একচোখা।
ঈশ্বর পক্ষপাতদুষ্ট।
ঈশ্বর বেঁছে বেঁছে ভক্তদের বর দেন।
ঈশ্বরও বৈষম্য করেন।
বলছি মাটির দুনিয়ার কিছু মানবেশ্বরের কথা।
আমি আগে ভাবতাম, তাঁরা ঈশ্বরতুল্য। সময়াভাব আর ভাবগাম্ভীর্যের জন্য সাধারন্যে দেখা দেন না। ছোটজাতের উপসনালয় ফেসবুকে বেশি বিরাজ করেন না। তাই একতরফা দূর হতেই পেন্নাম করতাম।
আজ দেখলাম, না, তাঁরাও ধরাধামে আসেন, মাটিতে নামেন, ভক্তদেরও দেখা, ধরা দেন। তবে সেটা মুখ চিনে চিনে। সবাইকে না।
ঈশ্বরও তাহলে ক্লাস মেনে চলেন। কদাচিত ধরায় নামলে ওই ওপাড়ার ভদ্রপল্লীতেই থাকেন।
একজন অত্যন্ত বোদ্ধা প্রফেশনালের রেওয়ায়েত খুব মনে ধরায় এখানে একটু কুচুত করে শেয়ার করি,
“আপনি যখন নতুন কোথাও চাকরি নিয়ে চলে যাবেন, তখন, পুরোনো সংসারের ম্যাজিকাল কুরসীখানায় সবসময় আপনার অনুগত ও বিশ্বস্ত কাউকে রেখে যাবেন।”
অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানগুলোও কোরাম ও সিন্ডিকেটের নির্ধারিত পরম্পরা ও ঘরানার শিকার। অনেকটা গুলাম আলি ঘরানার গজল শোনা প্রতিষ্ঠান কখনো জগজিৎ সিংয়ের গজল গাঈয়ে পাবেন না। কারন, মহান, মহিয়ান ও পবিত্র কোরাম হতে যা উৎসারিত হবে, তারাতো সেটির উরশজাত কাউকেই পাবেন। ফলে ডাইভারসিটির বাপ্পি কো মাম্মি।
দুঃখজনক, হতাশাজনক ও বিরক্তিজনক হলেও এটা বাস্তব, যে, শক্ত জ্যাক ছাড়া ফার্স্ট ক্লাস জবগুলো বাগানো আজকাল প্রায় অসম্ভব।
এককালে যা ছিল মামু-খালু, তারপর সেটা হয়েছে নেটওয়ার্ক। এখন সেটা জ্যাক।
জ্যাক কী?
এমন একজন বা কয়েকজন ‘ভাইয়া/আপ্পি’, যিনি বা যারা, আপনাকে দু’হাতে ধরে একটি লোভনীয় চাকরির সিংহাসনে বসিয়ে দেবেন।
আপনি যদি বাস্তবতাকে মেনে জ্যাক বানাবার পথে হাঁটতে চান, তাহলে কী করতে পারেন?
>ফেসবুক ও লিংকডইনে মুরগী টার্গেট করুন। টার্গেটের মুরগীদের উঠতে, বসতে, ঘুমাতে, স্বপ্নেতে বিপুল মাত্রায় রেসপন্স দিন, লাইক, কমেন্ট, ইমোজি, মেনশন, ট্যাগ দিন।
>নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়, সাবেক অফিস, নিজ প্রফেশন, এইচ.আর প্রফেশন, বিভিন্ন সমিতি, বিভিন্ন কমিটি, বিভিন্ন লীগ/দল, ক্লাব, ফোরাম, কোরাম, এলামনাই-এর সদস্য হোন, নিয়মিত যাতায়াত করুন, ভাইয়া/আপ্পিদের সাথে নিয়মিত লেনদেন (মন/টাকা/উপহার/মেয়ে মানুষ) করুন।
>বাদ যাবে না একটি শিশুও-এই নীতি অনুসরন করে সব টারগেট করা ভাইয়া/আপ্পিদের জন্মদিবস, মৃত্যুদিবস, মুসলমানি দিবস, আকিকা দিবস, বিবাহ দিবস, ডিভোর্স দিবস, ডেটিং দিবস, লুচ্চা দি বস-সব দিবসে উপহারসহ সহমদ ও রঙিন মদ উপহার দিন। উপহার তার দরবারে পৌছে দেবেন কিন্তু। দিয়ে ছবি তুলতে ও সে ছবি ফেসবুকে ঝুলাতে ভুল করবেন না।
>ক্লাব, পাব, সোসাইটি জীবনে অভ্যস্ত হোন। পরিবারকে সময় দেবার কথা ভুলে যান। ওসব পরে হবে। আগে সামাজিক যোগাযোগ ও জ্যাক তৈরী হোক। গভীর রাতে বাসায় ফিরলে আপাতত ক্ষতি নেই। আরে নিজে বাঁচলে সংসারের নাম।
>আমজনতার ট্রেন্ড বুঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দিন। স্রোত যেদিকে, সেদিকে বাদাম তুলুন।
>পীর ও পয়গম্বরদের পোস্ট কপি করে, শেয়ার করে নিজেকে ঘামিয়ে নিন। মুখে ফেনা তুলে ফেলুন।
>বারো হাত কাঁকরোলের তেরো হাত বিচি হয়ে সামর্থ্যে থাকুক বা না থাকুক, লাক্সারি ও ল্যাভিস জীবনযাপনে নামুন। চেকিন, টেকিন, ডেটিং-সব ডাইমেনশনে ঝাকমারি আনুন। মানুষকে জানতে দিন, যে, আপনি একজন উদীয়মান স্টার, ভবিষ্যত পীর ও গুরু। আপনার লাইফস্টাইলের রোশনাইতে ভক্তকূল তৈরী হবে, তাদের চোখ ধেঁধে যাবে। ফলশ্রুতিতে আরও আরও ভক্ত বাড়বে। এক সময়ে দেখবেন, বড় বড় গরুরাও আপনার সোহবত পেতে মুখিয়ে থাকবে।
>শহরে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনার, অকশপ, কনভেনশন, কনফারেন্স, লিভ টুগেদারও বাদ দেবেন না। অফিস পরে করবেন। আগে ক্যারিয়ার বানান। ওহ, চেকিন ও গরুভাইদের সাথে চেলফী তুলতে ও ঝুলাতে ভুল হয় না যেন। আরে, এগুলো তো আয়োজনই হয় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে।
>নিয়মিত সহমদ ভাই, সহবত আপিদের অফিসে যাবেন, সময় দেবেন, সময় নেবেন, কফি খাবেন, তোহফা হস্তান্তর করবেন। কাওরান বাজার হতে কিনে আনা ‘বাড়ির বিরুই চাল’, ‘গ্রাম হতে আনা আন্ডা’ ভাইয়াদের নান্নুমুন্নু বাচ্চাদের জন্য গেফোট করুন।
>বলতে ভুলে গিয়েছি, ফেসবুক, লিংকির প্রোফাইল নামের আগেপাছে আঠারোটা ডিগ্রী লাগান। যত স্থানে পারেন, নিজের বশংবদ ও স্তাবকদের পজিশনিং করে দিন। তাতে করে স্পারসোতে যদি কৃষিবীদও বসাতে হয়, হোক।
>নিজ নিজ গ্রাম ও ‘অ্যালাকা’র কেউকেটাদের খুঁজে বের করুন। তাদেরকে নিয়মিত সালাম, কালাম, বালাম, চাটাম, বাটাম-সব দিয়ে ব্যতিব্যস্ত রাখুন। দুই চারটা (হোক ভূঁইফোড়) ফোরামের সভাপতি হোন। মেনটর ও উপদেষ্টা হোন আরো দশটার। বছরে দুইটা পেইড ক্রেস্ট ও ’আঁউ’য়ার্ড হাসিল করুন। ইন্ডিয়ান বা শ্রীলঙ্কান এ্যাওয়ার্ড হলে ভাল।
মোট কথা, আপনার টার্গেটদের সাথে আঠার মতো লেগে থাকুন। আর, সবরকম টার্গেট ও সম্ভাব্য ভক্তকূলের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিন। আপনাকে ইগনোর করবার সাহস কেড়ে নিন। স্টারডম, ক্রেইজ ও হাইপ ব্যবহার করে নিজেকে নজরে পড়ান, নজরে পড়াদের হাতে নিন।
এভাবে, আস্তে আস্তে এগোন। যখন মোটামুটি ব্যাটা হয়ে গেছেন মনে হবে, তখন নিচের দিকের, বা, কনিষ্ঠদের শুধু স্তাবক ও সহমদ ভাই হিসেবে যায়গা দিয়ে আস্তে আস্তে বড় বড় হাস্তিদের কাতারে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। কোম্পানীর মালিক, সি.ই.ও ছাড়া কারো সাথে কফি খেতে গিয়ে তখন আর সময় নষ্ট করবেন না।
যতটা ঘটবে, রটান তার দশগুন।
এভাবে পরিকল্পনামতো এগোলে আপনার টারগেট জ্যাকরা আপনার হাতের মুঠোয় এসে যাবে। আবার, আপনিও অনেক মানুষের কাঙ্খিত জ্যাক রেবিট হয়ে উঠতে থাকবেন।
মনে রাখবেন, নারী, গাড়ি, বাড়ি, সারি ও টাকা কাড়ি কাড়ি-এগুলো দিয়ে সবই কেনা যায়। সব মানুষকেই কেনা যায়। আপনি কালো, না ধলো; হলদে, নাকি বাদামী-তাতে আসলে কারো কিছু যায় আসে না। কেউ আপনাকে মার্ক করে না। যদি না…………
হ্যা, যদি না, তাদের স্বার্থ অথবা নজর কাড়বার মতো কিছু আপনাতে না থাকে।
আপনাকে কেউ মার্ক করছে না, নজর দিচ্ছে না, রেসপেক্ট দিচ্ছে না, স্বীকৃতি দিচ্ছে না, খাতিদারি করছে না-এই পীড়ন নিশ্চয়ই আপনাকে পোড়ায়?
না পুড়ুুন। আপনি আপনাকে নিয়ে থাকুন। নিজের সম্ভাবনা, নিজের সৃষ্টিশীলতা, নিজের বিশ্বাসের বাস্তবায়ন নিয়ে থাকুন।
আর যদি মানুষের নজর আপনার তবুও কাম্য হয়, তাহলে নিজেকে এমন একটা ব্র্যান্ডে পরিণত করুন, যে, আপনাকে ইগনোর করতে হলে যে কাউকে দশবার ভাবতে হয়।
এবং, আপনি তাদের ডেকে বলতে পারেন, ‘মুড়ি খান’।
কোরাম ও ইজম- দুটোই বিলেতি শব্দ। আগে ও দুটো কেবল বাস্তব জগতে বিদ্যমান থাকলেও সেটা আজকালকার যামানার রীতি অনুসরন করে ভার্চুয়ালেও এসে গেছে। ফেসবুক বা লিংকিতে কোরাম ও ইজমের জয়জয়কার। এখানে ব্যক্তি টু ব্যক্তি, ফেবু ফ্রেন্ড টু ফেবু ফ্রেন্ড, গ্রূপ বা পেজের সদস্যদের মধ্যে কোরাম ও ইজম মারাত্মক। এই কোরাম আবার পিঠ চুলকানো নীতিতে অপারেট হয়।
নিজ নিজ কোরামের কাজে লাইক বন্যা, কমেন্ট হাইপ। আবার অপজিট কোরাম হলে সব স্পিকটি নট। বিশেষত গ্রূপ হলে। তা সে যতই সুশীল গ্রূপ হোক, বিশুদ্ধ ভাষা চর্চা, বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গ্রূপ, মায় ধ্যানের গ্রূপ তক। কাহিনী কমোন। এখানে, এক কোরামের সদস্যরা তার কোরামের লোকেদের কাজ, লেখা, পোস্ট ও ক্রিয়েশনে দলবেঁধে হাইপ তুলবে, লাইক, কমেন্ট, আহা, উহু, মরে গেলাম, কঠিন, জটিল, অস্থির, বাহ, সহমত ভাই, সহবাস ভাই হতে শুরু করে তেলবাজির অর্গাজম ঝড় তুলবে।
একটা সময় ছিল, মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যক্তিগত পর্যায়ে চাটুকারিত্ব বা তোষামোদিত্ব করত। এখন সময় পাল্টেছে।
ব্যক্তিগত মোসাহেবি ও তৈল প্রদান তো আছেই। তার সাথে যোগ হয়েছে দলগত, গোষ্ঠীগত, কোরামগত এবং কর্পোরেট মোসাহেবি ও চাটুকারিত্ব।
এই শেষ দলটা দলেবলে মিলে এখন গোবরের পায়েসকেও মহামূল্যবান কোহিনূরের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। নিয়ে যায়। এদের গোয়েবলসিয় প্রচারনা নির্দিষ্ট মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করে দেয়। তুমি সত্য বলতে চাও বা মিথ্যা, যেটাই হোক, তারপরও, তোমাকে আগে সত্যটা জানতে হবে। সত্য বলতে হলে তো সত্যটা জানতেই হবে। মিথ্যাও যদি বলতে চাও, তাহলেও আগে তোমাকে সত্যটা জানতে হবে। তা না হলে, মানে, সত্যটা না জেনে যদি তুমি মিথ্যাটা বলো, সেটা আর মিথ্যাও থাকে না, সেটা তখন বিভ্রম হয়ে যায়। যা মিথ্যার চেয়েও খারাপ।
দল বেঁধে এরা চাটুকারিত্বের সিন্ডিকেট করে পরস্পরের পিঠ চুলকায়। আর তা দেখে দেখে নেটিজেন বা ফেসবুকাগ্রনতা (ফেসবুক+জাগ্রত+জনতা) গোবরের পায়েসকেই মহাভোগ মনে করে গেলে, কিংবা গেলার জন্য লাইন দেয়।
ঠিক তার বিপরীতে, এক কোরামের লোক আরেক কোরামের কারো লেখা, পোস্ট, কাজে-দলবেঁধে পঁচাবে, একত্রে প্ল্যান করে ঘোঁট পাঁকাবে, দলবেঁধে নেগেটিভ হামলা করবে, ব্যক্তিআক্রমণ করবে। একজন গুড়ের, মানে সাইজ করার মতো ভিন্নমতাবলম্বী কাউকে পেলে সে হরি হরি বলে ট্যাগ ও মেনশন করে তার কোরামের বাকিদের ডেকে আনবে গালাগাল দিতে। ওই যে, এক ঝাঁকের কুকুরকে কিছু বললে সে গিয়ে বাকিদের ডেকে নিয়ে এসে সবাই মিলে ঘেউ ঘেউ করার মতো। কিংবা কউয়া কা কা করার মতো।
রান্নাবান্না, বেঁচাকেনা ও রমনী নির্ভর গ্রূপগুলোতে এই ধুন্দুমার আরও মশহুর।
বিশেষত, যেসব নারীবাদী ও পুরুষবাদীরা একচেটিয়াভাবে বিশ্বাস ও প্রচার করেন, যে, নারীরাই কেবল অবলা ও নির্যাতিত, তাদের জ্ঞাতার্থে জানাব, সাইবার বুলিংয়ে মেয়েরা সংখ্যায় হয়তো পুরুষের সমান এখনো হতে পারেনি, তবে ধারে ও বিষাক্ততায় তারা মেডাল পাবার পর্যায়ে চলে গেছেন।
চিয়ার্স।
নারী স্বাধীনতা ও নারী মুক্তি জিন্দাবাদ।
নারীবাদ জিন্দাবাদ।
সুশীল সমাজ হতে ওয়ালিদবাদ।
আজকাল বন্ধু হতেও যোগ্যতা লাগে, কোটা লাগে, কোরাম লাগে, হ্যাডম লাগে-পকেটের, সকেটের। তা না হলে কেউই পুঁছবে না। তেলাপোকা আর ডাউনোসরের বন্ধুত্ব বাবা আদমের যুগে হলেও এই জুকারবার্গ যুগে সেটা হবার নয়।
যদি পারতাম, আমিও একটা আন্দোলন শুরু করতাম। ’কোরামমুক্ত’ বা ‘ব্লকমুক্ত’ বন্ধুত্ব আন্দোলন।
এটা এমন একটি স্বপ্ন যেখানে বন্ধুত্বে থাকবে না, কোরাম, ব্লক, কমিউনিটি, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ’এ্যালাকা’, ‘অমুক প্রজন্ম’, ‘তমুক ব্যাচ’, ”ওই বিশ্বাসের’, নির্দিষ্ট বলয়ের, সীমিত ঘরানার, ”নিজের কোলের”, “আমাদের মতো আমরা”-টাইপের কোনো সীমানা বা গন্ডি।
বন্ধুত্ব হবে ওপেন, সবার সাথে সবার। কোনো ফিল্টারিং থাকবে না। নিজেদের ঘরের ছিটকীনি দিয়ে নিজেরা বন্ধু থাকব, বাকিদের সাথে বন্ধু বন্ধু কুতকুত খেলব-দারুন তামাশা।
খুব কি অসম্ভব সেটা? এই লেখার সাথে আপনি যদি কোনো চলমান হাইপের সম্পর্ক খোঁজেন, তার দায় আপনার। আর যদি এটা পড়ে আপনার মনে হয়, “হালায় কি আমারেই কইলো?”-তাহলে কোষ্ঠ্যকাঠিন্যের চিকিৎসা করান।
#quorum #ism #ally #alliance #syndicate #axisofevil #stant #flattery #pampering #networking #OverQualified #OverRated #BeyondReach