বাসার কাছে একটা শানদার উপাসনালয়। বহুত চাকচিকান রোশনাই তার। ঈশ্বরের ঘরকে আড়ম্বরে পূর্ন করে ঈশ্বরকে খুশি করার একট উদগ্র প্রচেষ্টা উৎকটভাবে বিরাজমান সেই উপাসনালয়ের প্রতিটি পরতে।
ঈশ্বরের ভক্তরা তাদের সুদ, ঘুষ, প্রতারনার টাকায় উপাসনালয়ের সিড়িটাও মর্মর পাথরে মুড়ে দিয়েছে। উপাসনালয়ের প্রধান পুরোহিত, যিনি প্রচলিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সরকার, রাজনীতি-এই সবকিছুকে অহরহই তার বয়ানে তাগুত ও বেশরিয়তি বলে গালাগাল করতে পছন্দ করলেও, উপসনালয়ের জন্য তাগুত সরকারের রাজকীয় দপ্তরের বরাদ্দকুৃত কয়েক লাখ টাকার চেক দু’হাত পেতে নিয়ে তাগুত সরকারকে আশির্বাদ করেছেন। শত হোক, ঈশ্বরের ঘরকে আরো আড়ম্বরপূর্ণ, শানশওকতে মুড়ে দেয়া যায়- যাতে ঈশ্বরের দূতেরা উপসনালয়ের সিড়ি দিয়ে চলাচলের সময় আহ্লাদে আহ্লাদিত হয়, ভক্তদের ভক্তি দেখে অগনিত আশির্বাদ বিলায়।
ভক্তরা চাঁদা তুলে উপসনালয়ের জন্য সুউচ্চ এক স্তম্ভ নির্মান করেছে। উপসনালয়ের প্রধান পুরোহিত বিশেষভাবে ভক্ত ও সেবায়েতদের উত্তেজিত করেছিলেন, যেন, পুরো অঞ্চলের মধ্যে একখানা দেখবার মতো স্তম্ভ নির্মিত হয় এটা।
ভক্ত ও কমিটির সেবায়েতগণ অর্থ তুলতে ও ঢালতে কার্পণ্য করেননি। উদার হাতে তারা সবার টাকা নিয়েছেন। বস্তুত, এলাকার পাপী, তাপী, সুদখোর, ঘুষখোর, হক ঠকানো, প্রতারক, ভেজাল কারবারী, কালোবাজারি, পণ্যের দাম দশগুন হাকানিরা যদি তাদের কালো ও পাপের টাকার কিঞ্চিত এখানে ঈশ্বরের উপসনালয়ের কাজে লাগিয়ে কিঞ্চিত পাপ স্খলনের সুযোগ পায়, সেতো পূণ্য কর্মই হবে। তাগুত সরকারের দপ্তর হতেও আরেক দফা দক্ষিণা নেয়া গেছে। কমিটি প্রধান সেজন্য আগামী কয়েক বছর পদে নিশ্চিত থাকবেন।
তো, সুউচ্চ স্তম্ভ ওঠে। সেই স্তম্ভের চুড়া সুদূর চীন হতে না দেখা গেলেও অন্তত তিন কিলোমিটার দূর হতে নজর কাড়ে। আশপাশের মহল্লাগুলো ইর্ষায় পোড়ে। স্তম্ভের প্রতিটি ইঞ্চি দামী টাইলসে মোড়া। মর্মরে শোভিত তার চুড়া। ইতালিয়ান লাইটিং দিয়ে তার চুড়ায় সজ্জিত হয়েছে। নিকষ কালো রাতেও সেই আলোকসজ্জা ভক্ত, সেবায়েত, এলাকাবাসীকে গর্বের সুবাতাস দেয়।
বিশেষ বিশেষ উপাসনার দিনে উপাসনালয়ের বেতনভূক সেবায়েত আর কমিটির পান্ডারা নিশ্চিত করেন, যাতে, উপাসনালয়ের বহুমূল্য সিড়ি আর কম্পাউন্ড ছোটলোক ভিকিরি আর সাহায্যপ্রার্থীরা নোংরা করতে না পারে। উপাসনালয়ের ডান্ডাধারী সান্ত্রীরা উপাসনার আশপাশের সময়টাতে উপসনালয়ের ম্যাজেস্টী রক্ষায় ওসব ছোটলোকের দলকে লাঠির পিটুনিতে অনেক দূরে সরিয়ে রাখে। যাতে ভক্তরা পবিত্র মনে উপাসনালয়ে ঈশ্বরের সাথে যোগাযোগ স্থাপনে, ভক্তি নিবেদনে একটুও বাঁধা না পায়। আফটার অল, ভক্তরাই তো তাদের ট্যাকের পয়সায় ভক্তি নিবেদনের জন্য উপাসনালয়কে সাজিয়েছে মনের মতো। সেখানে ভিকিরিরা এসে জায়গাটাকে অপবিত্র করবে-তা তো হতে দেয়া যায় না।
শানশওকতে উপসনালয়টি আশপাশের দশ মহল্লার ইর্ষার পাত্র। উপাসনালয়টির প্রধান পুরোহিতও আশপাশের মহল্লায় ব্যপক আদৃত। শত হোক, তিনি এত বড় ও অভিজাত একটি উপাসনালয়ের প্রধান পুরোহিত। উপাসনালয়ের রয়েছে নিজস্ব তহবিল। প্রতি মাসে সে নিজস্ব এশটেটের দোকানপাট হতে ভাড়া পায় লাখ লাখ টাকা। তার ওপর আবার বিশেষ বিশেষ দিনে ভক্তদের দান দক্ষিণার জন্য প্রধান পুরোহিতের উদাত্ত আহবানে অনেক পয়সাকড়িই ওঠে।
দিয়ে অবশ্য ভক্তরা আত্মতুষ্ট থাকে। আফটার অল, ঈশ্বরকে নিবেদন করা হচ্ছে সব। উৎস তার যাই হোক। ঈশ্বর অবশ্য কতটা তুষ্ট-সেটি প্রশ্নের বিষয়। ভক্ত ও ঈশ্বরের চাওয়া যখন এক না-তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে।
ভাল লাগে এই আধ্যাত্মিক নিবেদনের প্রলয়। তবে একটাই হিসেব শুধু মেলে না। একদমই মেলে না।
বিগত ১৭টি মাস এই মহল্লা, এই উপাসনালয়ের আওতাভূক্ত মহল্লা এমনকি গোটা একটি দেশ এক মহা দুর্যোগের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। এই দেশে রোজ বাড়তে বাড়তে আজ প্রতিদিন আড়াইশো লোক মরছে বেঘোরে। রোজ আড়াইশ ঘরে হৃদয়বিদারী চিৎকার, রোজ আড়াইশো এতিম, রোজ আড়াইশো বিধবা, রোজ আড়াইশো মা হারা সন্তানের গগনবিদারী শোকের অশ্রু।
কিন্তু, খুব, খুব খুব আশ্চর্য’র বিষয়, এলাকার মানুষের পরম ভক্তি নিয়ে, ঈশ্বরের ভক্তিতে নিবেদন করে গড়ে তোলা উপাসনালয়টি এই ১৭ টি মাসে একটি বারের জন্যও তার সুউচ্চ স্তম্ভ আর তার ১৭ টি উচ্চগ্রাম শব্দযন্ত্র নিয়ে একটি বারের জন্যও এই মহল্লার কয়েক হাজার মানুষের তরে উচ্চারন করেনি একটি সামান্যতম সতর্কবার্তাও। এই ১৭ টি মাসে এই ধনী উপাসনালয়টি তার এলাকার দরিদ্রদের জন্য তার
অঢেল ভান্ডার হতে একটি ছটাক চাল, ডালও দিতে দেখা গেল না। তাদেরকে ঘরের নিরাপদ বলয়ে থাকতে যে সামান্য দুচার ছটাক চাল ও ডালের দরকার ছিল-সেটা দেবার দায় রাজ্যের তাগুত সরকারের ওপর দিয়ে হৃষ্টচিত্তে উপসনালয় ও তার সেবায়েতরা তৃপ্তির ঢেকুর তুললেন।
উপসনালয়ের প্রধান পুরোহিত, যিনি তার সুললিত কন্ঠে ভক্তদের ও স্রষ্টার মধ্যে ঐশ্বরিক বাণী আর সুরেলা বয়ানে ভক্তদের, এমনকি হয়তো ঈশ্বরের মর্মেও নাড়া দিতে পারেন, তাকে একটি বারের জন্যও কখনো তার সুরম্য খাসকামরা হতে বাইরে দেখা গেল না। একটি মুহুর্তের জন্যও না। মহল্লার গরীব, আক্রান্ত, মৃত, মৃতের স্বজনদের একটি বারের জন্যও সান্তনা দিতে, অন্তত এই দুর্যোগে যদি ঈশ্বর বিমুখ মানুষকে অন্তত ঈশ্বরের দিকে ফেরানো যায়-সেই নিয়তে তাকে, তার সেবায়েতবাহিনীকে একটি বার, মাত্র একটি বারের জন্যও বিগত ১৭ মাসে এলাকায় দেখা গেল না। অন্তত ঈশ্বরের দিকে ডাকার জন্যও না। তিনি ও তার সেবায়েত বাহিনী রয়ে গেলেন সুরম্য উপাসনালয়ের ভিতরে, তাকে ধুয়ে, মুছে, আতর লোবানে আরো পবিত্র করে ইশ্বর ও তার ভক্তদের জন্য উপাসনালয়কে আরো অভিজাত করে ধরে রাখাতে।
বিগত ১৭ মাসে সুউচ্চ স্তম্ভ হতে অসংখ্যবার কারো না কারো মৃত্যুর খবর ধ্বনিত হলেও সেখান হতে মানুষকে সতর্ক করার, স্বাস্থ্যবিধি মানবার, গরীবদের সাহায্য করবার, তাদের ঘরে ঘরে খাবার পৌছে দেবার, ঈশ্বরের কাছে সাহায্য ও ক্ষমাপ্রার্থনার কোনো আহবান সেই স্তম্ভ হতে একটিবারের জন্যও ধ্বনিত হল না।
ঈশ্বরকে খুশি করবার, ঈশ্বরকে পাবার এ কেমন ভুল পথ বেঁছে নিল একটি অভিজাত উপাসনালয়, তার হাজারো সেবায়েত, ভক্ত ও নিবেদকরা?
[এই কল্পকাহিনী কোনো বিশেষ উপাসনালয়কে নিয়ে রচীত নয়। তাই আপনার সদা উদ্যত বিশ্বাসদন্ড চেতনায় আরেকবার তড়াক করে উত্থিত হয়ে উঠবার কিছু নেই।]
#mosque #unostentetious #luxuriousmosque #socialobligationofreligion #religiousfanatism #extremeism #corruptedmoney #Godofblackmoney