ইদের অনাকাঙ্খিত লম্বা ছুটিতে বিরক্ত আমি ছুটি কাটাবার আর কোনো রাস্তা না পেয়ে শেষে গাবতলি টার্মিনালে ঘুরতে গেলাম। সেখানে কাউকে না পেয়ে গেলাম আমিন বাজার ব্রীজে।
গিয়ে দেখি, আমিন বাজার ব্রীজের কার্নিষের ওপর দুপা বাইরে ঝুলিয়ে বসে আয়েস করে পা দোলাচ্ছে নূরা পাগলা।
নূরা আমার সৃহৃদ জেলিসের ব্রেইনচাইল্ড। তার সাথে আমার দেখা হওয়ার কথা না। তবু হয়ে গেল।
আমি নূরার পাশে দিয়ে ভয়ে ভয়ে দাড়াই। নূরা তার আচুক্কা প্রশ্নের জন্য বিখ্যাত। আমি নূরার পাশে কার্নিশে বসি না। কারন আমার সেই ছোট্টকালের হাইট ফোবিয়া।
নূরা আমাকে দেখে একটা মলিন অথচ অর্থপূর্ন হাসি দেয়।
কী রে নূরা, বাড়িতে যাস নাই?
নাহ”, নূরার নির্লিপ্ত উত্তর।
কেন?
৩০ টাকার ভাড়া ১৫০ টাকা করছে। #বয়কটবাস করছি। তাই যাইতে পারি নাই।
তা, সেমাই টেমাই কিছু খাইছস? কেউ খাওয়ায় নাই?
নাহ, ৫০ টাকা কেজির সেমাই ৯০ টাকা করলে বয়কট না কইরা উপায় আছে। তাই #বয়কটসেমাই।
গোসলও তো করস নাই দেখি। ইদের নামাজ পরছস?
তাও পড়ি নাই। পড়মুও না। ইদের দিন বৃষ্টি। ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে ঠান্ডা লাগব বইলা পানি গরম করতে গেছি। বউ কইল, গ্যাসের দাম যে এক লাফে ১৩০% বাড়াইল, তুমি সেই গ্যাসে পানি গরম করবা? ভাইবা দেখলাম, কতা ঠিক। তাই #গ্যাসবয়কট করলাম। পানিও গরম করতে পারলাম না, গোসল ও না। নামাজও না।
তা, তোর পরনে তো দেখি ইদের জামা নাই। খালি গায়ে বইসা রইসস ইদের মধ্যে? কী হইল?
বস, জামা কিনি নাই। ক্যান? সারাদেশের মানুষ আমনেরা বয়কট বয়কট করতে থাকলেন। আমি আর ভয়ে ওদিক যাই নাই। তার উপরে গুলশান, বনানি, বারিধারায় সব দোকানে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী ডেরেসে সয়লাব। সব ৫০০ টাকার মাল ৫০০০ টাকা। আমি ভাবলাম, ওইগুলি কেউ বয়কট করে নাই ক্যান। করলাম #বয়কটবিদেশীপাঞ্জাবী। ফলাফল তো দ্যাখলেনই।
তা তোর হাতে এই লেবেনচুষ ক্যান?
বস, ট্যাপের ফিরি পানি বিনা পয়সায় বোতলে ভইর্যা ২০ ট্যাকা কইরা আধাকেজি বেঁচে। দেখলাম এতো ডাকাতি। আমনেরা ভড়ং না কী জানি বয়কট করছেন দেখলাম, ৭০০ তেরশো কইরা গলা ভাইঙা ফালাইতাছেন। আমি ভাবলাম তাইলে তো ফিরি পানি ২০ ট্যাকায় ব্যাঁচলেও বয়কট করা উচিত। #বয়কটপানি করতে যাইয়া শ্যাষ। ফলাফল তো দ্যাখলেনই। তাই লেবেনচুষ চুষি।
বললাম, আয় নূরা, একটা সেলফী তুলি।
ক্যান, ফেসবুকে দিবেন?
হ। আয়।
না, বদ্দা, সেলফী আপলোডামু না। আমার #ফেসবুকবয়কট চলতাছে।
ক্যান, ক্যান?
কী কন বদ্দা? ভারতে ১০ টাকা ১ জিবি ডাডা। আমাগো মোবাইল কোম্পানীর হেরা ডাডা কেনে স্পীড দেইখা, ব্যাঁচে কেজি দরে। জিবি জিবি কইর্যা। আমি হেই ডাডা দিয়া ফেসবুক চালামু? #বয়কটফেসবুক করছি হেই কবে।
দেখলাম নূরাকে নিয়ে বিপদ। কখন কী যে বলে বসে। সেলফীর আশা বাদ দিলাম।
নূরাকে বিদায় জানিয়ে ঢাকার ফাঁকা রাস্তায় আরেকটু হাঁটব বলে ওকে বললাম. আয়, কার্নিশ হতে নাম। কোলাকুলি করি।
নূরা কার্নিশ হতে এক লাফে নিচে নামে। এতক্ষণ দেখি নাই। এবার দেখলাম, নূরা এতক্ষণ দিগম্বর হয়ে বসে ছিল। শরমে আমি মরি।
কী রে , নূরা, পরণের কাপড় কই? নাকি তাও………………?
বস, একজনে একটা পায়জামা দিছিল। পুরান। আগে হ্যায় পিনছে। পরে আমারে ইদে পরতে দিছে। মনে মনে হ্যারে হেইদিনই বয়কট করচি। হালায় নিজের পুরান পায়জামা ইদে গিফট দ্যায়। আমারে পাগল ঠাউরাইয়া ঠগাইতে চায়।
হ্যারে দেখছিলাম ইদের আগের দিন #বয়কটভড়ং পালন করতে। ইদের দিন পায়জামা পরতে গিয়া দেহি, পায়জামাডা ভড়ঙের। তার লাইগা বঙ্গদ্যাশের জাগ্রত জনতারে সম্মান জানাইতে যাইয়া পায়জামা হাতে লইয়া বাসার থন হাইটা আইসা পড়ছি। ব্রীজে বইয়া নিচে তুরাগে ফালাইয়া দিছি।
আমি ব্রীজের কার্নিশে ঝুঁকে তুরাগের বুকে তাকাই। অনেক নিচে একটা পাজামা নজরে পড়ে। তার নেম লেবেলটা এত দূর হতে দেখা গেলনা।
আমি অতঃপর নূরাকে সেখানে রেখেই রওনা করি ঢাকার রাস্তায়। কিছুদুর এসে মনে হল, যেই ব্রীজে নূরা বসে আছে, সেই ব্রীজ তো ১ কোটি টাকায় বানানো যেত। বানিয়েছে ১০ কোটিতে। এইটা যদি নূরা জানে, তাইলে আবার #বয়কটব্রীজ করে ঝাঁপ না দেয়।
আমি দুঃশ্চিন্তা নিয়ে ঢাকার রাস্তায় হাঁটি। যেই রাস্তা অন্যদেশে প্রতি কিলোমিটার ১০ হাজার টাকায় বানানো হলেও এখানে বানানো হয়েছে ২৫ হাজার টাকা কিলো দরে।
যাহোক, তাতে আমার কী? আমি তো আর #বয়কট সাহেবকে #বয়কট করব না।
[নূরা চরিত্রটি সুহৃদ Jalis Khan জেলিস এর মহান লেখনী হতে একদিন জন্য ধার নিলাম।]
#Nurapagla #boycott #Aarong #pricehike #urbanlife #lifeinmetro #Corruption