এই লেখাটি প্রথমে আমি ভয়েস কমান্ডে বাংলায় একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে ভয়েস টু টেক্সট লিখিয়ে ফেলেছি। তারপর সেটাকে কপি করে জিপিটিকে দিয়ে পরিমার্জন ও সংযোজন করিয়েছি।
আচ্ছা, যদি প্রশ্ন করি, বিতাড়িত মরদুদ ইবলিশকে শয়তানে পরিণত করেছে কে?
ওয়েল, ধর্মীয় উত্তর সহজ। ঈশ্বর তাকে অভিশপ্ত করেছেন।
কিন্তু আমি অন্য প্রশ্ন করছি।
কী তাকে সেই পরিণতির দিকে ঠেলে দিল?
বলবেন, সে নিজেই। তার অহংকার। তার সিদ্ধান্ত। তার ভাগ্য।
আচ্ছা, যদি বলি অ্যাডামস?
যদি ঘটনাটাকে এভাবে দেখা যায় যে, অ্যাডামসের সৃষ্টি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছিল, যেখানে ইবলিশের ভেতরের অহংকার প্রকাশ পাওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল?
হা হা হা। ডোন্ট টেক দিস সিরিয়াসলি।
আমি এই প্রসঙ্গ টানলাম অন্য কারণে।
আসলে দানবকে দানবে পরিণত করে কে?
দানব নিজে?
নাকি তার চারপাশের দেবতারা?
আমার মনে হয়, অনেক সময় দানবকে দানবে পরিণত করে তার নিজের শক্তি নয়; বরং চারপাশের মানুষের নীরবতা।
আর সেই নীরবতার সবচেয়ে বড় কারণ—প্রশ্ন না করা।
আমরা প্রশ্ন করতে চাই না।
প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করি।
সন্তান বাবাকে প্রশ্ন করে না, “তুমি এত টাকা কোথায় পেলে?”-কারন, সম্পর্ক নষ্ট হবে।
স্ত্রী স্বামীকে প্রশ্ন করে না, “গয়নার টাকাটা কোথা হতে পেলে?”-কারন, অশান্তি হবে।
স্বামী বসকে প্রশ্ন করে না—ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বস মন্ত্রীকে প্রশ্ন করে না।
মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন তোলে না।
ছাত্র শিক্ষককে প্রশ্ন করে না।
কর্মী ম্যানেজমেন্টকে প্রশ্ন করে না।
আমরা প্রশ্ন করি না, কারণ আমরা সম্পর্ক বাঁচাতে চাই।
আমরা প্রশ্ন করি না, কারণ কেউ কষ্ট পেতে পারেন।
আমরা প্রশ্ন করি না, কারণ কেউ রেগে যেতে পারেন।
আমরা প্রশ্ন করি না, কারণ আমাদের কিছু হারানোর ভয় থাকে।
ফলাফল?
প্রশ্নহীনতার পরিবেশে ক্ষমতা ধীরে ধীরে প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে।
আর প্রশ্নাতীত ক্ষমতা খুব সহজেই নিজের সীমা ভুলে যায়।
কেউ প্রশ্ন তুললেই চারপাশ থেকে ফিসফিসানি শুরু হয়—
“চুপ।”
“এটা বলো না।”
“স্যার মাইন্ড করবেন।”
“তোমারই ক্ষতি হবে।”
এভাবেই প্রশ্নের মৃত্যু ঘটে।
আর অনেক সময়, প্রশ্নের মৃত্যুই দানবের জন্ম দেয়।
ছোটবেলা হতে আমাদের বেবি বুমার অথবা মিলেনিয়াল জেনারেশনকে নানারকম মিথকে সত্যি বলে বিশ্বাস করা শেখানো ও চর্চা করানো হত। এই যেমন ধরুন, সূর্য পূর্বদিকে ঊদীত হয় (ইউনিভার্সার ট্রূথ)। অথচ সূর্য কখনোই কোনো দিকেই ঊদীত হয় না। বড়দের সামনে কথা বলতে হয় না (তারা চরম অন্যায় কিছু বললেও।)
এরকমই মিথের একটা হল ভুল পজিটিভিটির চর্চা। আমাদেরকে সারাক্ষণই পজিটিভিটির বটিকা গিলতে বাধ্য করা হয়। সোশ্যাল বা প্রফেশনাল প্লাটফরমে একধরনের জোরজবরদস্তি পজিটিভিটি ন্যারেটিভ চালু আছে। একটু আউট অব বক্স, একটু ডিফারেন্ট, একটু নন-অর্থডক্স ভাবনা যারা ভাবেন, করেন, তাদের নেগেটিভ হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয়। আবার, কেউ একটা ঠোঁটকাটার মতো করে সত্য কথা বললে, সমালোচনা অথবা পর্যালোচনা দিলে, কর্পোরেটের গোঁমর, মেকি চরিত্র, ভন্ডামী নিয়ে তিক্ত সত্য প্রকাশ করলে তাকে সবাই মিলে-
”শ্শ্শ্শ্শ্…….এভাবে বলে না, এভাবে কথা বলে না, মানুষ হার্ট হয়, মানুষ খারাপ বলে, প্লিজ বি পজিটিভ, নেগেটিভিটি ছড়াবেন না”-এসব বলে বলে কোণঠাসা করে।
অদ্ভূৎ এক উল্টো পজিটিভিটির জয়জয়কার আমাদের পেশাজীবি কমিউনিটিতে।
এখানে আপনি সত্যি কথা খোলাখুলি বলতে পারবেন না। নানা অসঙ্গতি নিয়ে মতামত বা পর্যালোচনা লিখতে পারবেন না। লিখলে, বললে আপনি হয়ে যাবেন নেগেটিভ ও টক্সিক মানুষ। আপনি হয়ে যাবেন ভেজাইল্লা পাবলিক।
এখানে আপনি শুধু পুতু পুতু ভাল ভাল মিষ্টি কথা বলবেন। সাফল্যের গল্প করবেন। প্রশংসা করবেন। শাইনি বস্তুসমূহ পোস্টাবেন। চেকইন, কী-নোট আর ক্রেস্টের বন্দনা করবেন। সুশীল বচনে মিঠা মিঠা মিথ্যা বলবেন। ওহ, আপনি পজিটিভ। আপনি ক্রিয়েটিভ। আপনি কনসট্রাকটিভ।
সত্য শুনতে আমাদের এত আপত্তি কেন? আমাদের কালো দিকের বয়ান শুনতে আমাদের এত অনিহা কেন?
আমাদের টক্সিক হতে বাধা নেই, তাহলে টক্সিসিটির সমালোচনা শুনতে কষ্ট হবে কেন?
অপ্রীতিকর, অস্বস্তিকর ও অপ্রিয় প্রশ্ন যদি করতে না পারেন, তাহলে আপনার অনেক কিছুই করা হতে নিবৃত্ত থাকা উচিত। অন্তত প্রশংসা করা হতে। যাকে আপনি প্রশংসায় বা অভিনন্দনে ভাসাতে চান, তাকে আপনি অপ্রীতিকর, অস্বস্তিকর ও অপ্রিয় প্রশ্ন করতে পারেন কিনা, পারবেন কিনা-সেটা আগে ভেবে নিন।
আমাদের প্রোফেশনাল কমিউনিটিতে (ফেসবুক, লিংকডইন, হোয়াটসঅ্যাপ) প্রতিনিয়তই আমরা কাউকে না কাউকে তার বিগ অ্যাচিভমেন্ট অথবা গুড নিউজের জন্য কনগ্রাচুলেট করি। সেই সাথে অনেকে আবার তিনি যে কোনো না কোনোভাবে আমার কোরামের লেজুর-সেটা প্রমাণেরও চেষ্টা করি। প্রশংসায় কে কাকে ছাড়িয়ে যাব-সেই প্রতিযোগীতা করি।
অনেকে এটাকে সামাজিক সৌজন্য হিসেবে দেখেন। অনেকে আবার এটাকে তার নজরে থাকার, ভবিষ্যত গড়বার চুটকি হিসেবে দেখেও করেন।
করুন। না নেই।
কিন্তু, এই একই কমিউনিটিতে ওই বান্দার আকাজ, কুকাজ নিয়ে কথা বলা নিষেধ। আজকে যিনি ‘সরকার’ হয়ে প্রশংসার বন্যায় ভাসলেন, বা, আপনি ভাসালেন, কালকেই তিনি চুরির দায়ে দোষী হলে তাকে ‘দুয়ো ধ্বনি’ পোস্ট করে পঁচাতে আপত্তি কোথায়?
প্রশংসার বন্যায় ভাসা গ্রূপেই আবার অপ্রীতিকর, অস্বস্তিকর ও অপ্রিয় প্রশ্ন করা নিষেধ। আমলাদের গ্রুপে আমলাতন্ত্রের সমালোচনা করা নিষেধ। বিশ্ববিদ্যালয় বা সাবজেক্টের গ্রুপে ওই বিশ্ববিদ্যালয় অথবা সাবজেক্টের অথবা তার কোনো সদস্যের সমালোচনা নিষেধ। ব্রাহ্মনবাড়িয়ার গ্রুপে তাদের মারামারির স্বভাব নিয়ে কথা বলা নিষেধ। মোল্লাদের গ্রুপে মোল্লা সলট কিংবা কচুর দোষ নিয়ে কথা বলা নিষেধ। গারমেন্টসের গ্রুপে গারমেন্টস নিয়ে সমালোচনা করলেই আপনি শেষ। ডাক্তারদের গ্রুপে আপনি উকিল ও ওকালতি নিয়ে ফান করতে পারবেন, কিন্তু, ডাক্তারদের নিয়ে একটা নির্দোষ চুটকি বললেও আপনাকে গ্রুপে ব্যান করা হবে। মার্কেটিয়ার বা সেলস গ্রপে আপনি এইচ.আরকে তুলোধুনো করুন। বিপুল সমর্থন পাবেন। এইচ.আর গ্রুপে প্রোডাকশনকে পঁচান। আপনি পীরে পয়গম্বরের প্রনাম পাবেন। যেই না আপনি তাদের সমালোচনা, মানে আত্মসমালোচনা করবেন, আপনি ইবলিশ। আপনাকে গলাধাক্কা দেয়া হবে।
মার্চেন্ডাইজিংয়ের একটা গ্রুপে আমি আছি। একবার তার এক পান্ডাকে তার উটকো প্রশ্নের সোজা উত্তর দিলাম। সে ক্ষেপে গেল। গিয়ে আমাকে ইনবক্স করল, আমাদের মার্চেন্ডাইজার গ্রুপে আপনি এইচ.আর কীভাবে এলেন? বিষয়টা আমি দেখব। আমিও অ্যাডমিন। আমি উত্তর দিলাম, আপনার পয়গম্বর অ্যাডমিন আমাকে সেধে গ্রুপে ঢুকিয়েছেন। ব্যাস, মীন মীন শুরু হল।
শুধু প্রশংসা করতে পারবেন। কেউ নিষেধ করবে না। কেউ বলবে না, “তেল দিস না।” শুধু অপ্রীতিকর, অস্বস্তিকর ও অপ্রিয় প্রশ্ন করুন, আপনি খলনায়ক। আপনি নিমোকহারাম। আপনি জাতীয় দুশমন।
আমরা প্রায় সবাই কোনো না কোনো WhatsApp, Messenger কিংবা Telegram গ্রুপের সদস্য।
প্রায় প্রতিটি গ্রুপেই জয়েন করবার সময় একটি কথা বলা হয়—”এটি একটি খোলা জানালা, মন খুলে কথা বলুন।”
তারপরই আরেকটি কথা-“তবে Rules মেনে।”
অর্থাৎ মন খুলবেন, তবে Rules-এর ভেতরে।
আপনি কথা বলা শুরু করলেন।
যে কথাই বলুন না কেন—ঐশ্বরিক বাণী হোক, একটি পর্যবেক্ষণ হোক কিংবা একটি নিরীহ প্রশ্ন—কারও না কারও বিশ্বাস, স্বার্থ, পছন্দ কিংবা পরিচয়ের সঙ্গে সেটি সংঘর্ষে যাবেই। আপনি কোন একটি পেশা নিয়ে কথা বলবেন। দেশের কোন একটি অসঙ্গতি নিয়ে কথা বলবেন। একটি অনিয়ম নিয়ে কথা বলবেন। নির্দিষ্ট সমস্যা নিয়ে কথা বলবেন। সেটিতে কোন না কোনভাবে কোন না কোন ভোগ, কোন না কোন দল, কোন না কোন পেশা। যেকোনো angle থেকে যে কারো বিরুদ্ধে যাবেই। আপনি যদি সবাইকে খুশি রাখতে চান, তাহলে আপনি আসলে কী কী কথা বলতে পারবেন? আচ্ছা, একটি পেশাকে নিয়ে কথা বললে আমাদের ব্যক্তিগতভাবে সেটি গায়ে কেন লাগে? ধরুন, আমি ক্রিকেটার অথবা ক্রিকেট নিয়ে সমালোচনা করলাম।
একটি কমিউনিটিতে থাকা একজন ক্রিকেটার সেটিকে ব্যক্তিগতভাবে কেন নেবেন? এবার আমি যদি বলি, সকল পেশার মানুষকে সম্মান করুন।
সকল পেশাকে সম্মান করা যায়। পেশাজীবীকে সম্মান করা যায়।
কিন্তু সকল পেশার প্রতিটি মানুষকে কি সম্মান করা যায়? যখন আমরা একটি নির্দিষ্ট মানুষকে ইঙ্গিত করে তীর ছুঁড়ছি না, In general, সমালোচনা, আমরা সেটিকেও খুব দ্রুত থামিয়ে দিতে চাই কেন?
সংকোচ ও অশান্তির কল্পিত আগমনের ভয়ে তখন শুরু হয় অদৃশ্য সেন্সরশিপ।
“এই বিষয়টা না বলাই ভালো।”
“গ্রুপে রাজনীতি করবেন না।”
“এতে বিতর্ক হবে।”
“এতে পরিবেশ নষ্ট হবে।”
মজার বিষয়, এখানে ‘রাজনীতি’ অনেক সময় কোনো বিষয় নয়; একটি স্টপ সাইন।
আপনি যে কথাটিই বলুন, যদি সেটি কারও অস্বস্তির কারণ হয়, খুব সহজেই সেটিকে ‘রাজনীতি’ বলে থামিয়ে দেওয়া যায়।
তারপর কী হয়?
কেউ আপনাকে ব্লক করে না।
তারও আগে আপনি নিজেই নিজেকে থামিয়ে দেন।
আপনি Self-Censorship শুরু করেন।
আপনি লেখা কমিয়ে দেন।
প্রশ্ন কমিয়ে দেন।
শুধু Like দেন।
Love React দেন।
খুব বেশি হলে Angry ইমোজি দেন।
কিন্তু নিজের অবস্থানটা আর বলেন না।
কারণ আপনি নিরাপদ থাকতে চান।
নিজেকে সাদা রাখতে চান।
নিজেকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য রাখতে চান।
আর নিরাপদ থাকার এই সংস্কৃতিই অনেক সময় প্রশ্নের মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ। কখনো কখনো বিভিন্ন প্লাটফরমে আপনাকে শুনতে হবে, “এখানে পলিটিক্যাল আলাপ নিষেধ।” মনে পড়ে গেল, কিছু মাস আগে অভিনেতা মি. তাহসানের একটি মুভি রিলিজ হয়েছিল। খুব সম্ভবত যেটির নাম “এখানে রাজনৈতিক আলাপ করতে হবে”। তো, আমাদেরকে রাজনৈতিক আলাপ করতে নিয়ে উৎসাহিত করা হয়।
রাজনীতি আসলে কি? রাজনীতির বাইরে কিছু কি আছে? আমাদের দেশের এই যে বিশাল সংখ্যক মানুষের রাজনীতিতে অনীহা, রাজনীতিতে কথা বলতে অনীহা, রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে ভয়, এর কারণ কি? এটি কি স্রেফ মানুষের choice, নাকি এক ধরনের অদৃশ্য ভয়?
রাজনীতিকে ভয় না বলে রাজনীতিকদের ভয় কি বলা যায়? রাজনীতিক তথা নেতা ও তার চ্যালাদের ভয়ই কি রাজনীতিকে অ্যাভয়েড করবার কারন?
বিশেষ করে LinkedIn-এ রাজনীতিকে রীতিমতো হারাম ভাবা হয়। আমরা এই প্লাটফরমে বিশুদ্ধতম পেশাদারী মালসামানা ডাম্প করবার অ্যাডভোকেসি করি। একখানা ঝাক্কাস লিংকডইন প্রোফাইল বানাতে আমরা দিনরাত ঘাম ঝড়াই। কিন্তু, ভেবে বলুন তো,
এখানেও কি আমরা খুব সত্যিটা লিখি?
মনের মতো কিছু সৃষ্টি করি?
খুব অস্বস্তিকর সত্যগুলো বলি?
না।
আমরা মূলত আর্টিকুলেট করি।
ক্রাফট করি।
ড্রাফট করি।
এডিট করি।
পলিশ করি।
তারপর নিজের এমন একটি সংস্করণ পৃথিবীর সামনে হাজির করি, যেটি যতটা সম্ভব নিরাপদ, পরিমিত, সুশীল, প্রিয়ংবদ এবং সর্বজনগ্রাহ্য।
অনেক সময় মনে হয়, আমরা এখানে মানুষ কম; ব্র্যান্ড বেশি।
আমরা মানুষ হিসেবে যা ভাবি, তার সবটা লিখি না।
ব্র্যান্ড হিসেবে যা নিরাপদ, সেটাই লিখি।
আমরা পোস্ট করি না।
Positioning করি।
Opinion দিই না।
Impression Management করি।
Conversation তৈরি করি না।
Personal Brand তৈরি করি।
যেন কোনো CEO কষ্ট না পান।
কোনো সম্ভাব্য Employer বিরক্ত না হন।
কোনো ভবিষ্যৎ Client মুখ ফিরিয়ে না নেন।
কোনো Recruiter মনে না করেন—”লোকটা একটু বেশি প্রশ্ন করে।”
আমরা এমনভাবে লিখি, যাতে কারও গায়ে ফোসকা না পড়ে।
কেউ অস্বস্তিতে না পড়ে।
কোনো দরজা বন্ধ না হয়ে যায়।
কোনো সম্ভাব্য সুযোগ হাতছাড়া না হয়।
এবং এটাতে দোষও নেই।
প্রত্যেক মানুষেরই নিজের বাজারমূল্য বাড়ানোর অধিকার আছে।
কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়।
আমরা নিজেরাই একটি ধারণা তৈরি করি।
অসাধারণ LinkedIn Profile।
Optimized Profile।
AI Powered Profile।
Power Headline।
Personal Branding।
Executive Presence।
Professional Visibility।
এসব থাকলে নাকি ক্যারিয়ার সনসন করে উপরে উঠবে।
এমনকি অনেক সময় এমন একটা ধারণাও তৈরি হয়, LinkedIn-এ দুর্বল উপস্থিতি মানেই আপনি অদৃশ্য।
ঠিক আছে।
তাহলে একটা আনপপুলার প্রশ্ন করি।
বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল, সবচেয়ে প্রভাবশালী, সবচেয়ে উচ্চপদস্থ, সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষদের সবাইকে কি LinkedIn-এ দেখা যায়?
আমি এমন অনেককে চিনি, যারা কর্পোরেট জীবনের চূড়ায় পৌঁছেছেন।
কেউ কর্পোরেট সেলেব্রিটি।
কেউ ইন্ডাস্ট্রির কিংবদন্তি।
কেউ হাজার হাজার মানুষের স্বপ্নের ক্যারিয়ার গড়েছেন।
তাদের LinkedIn Profile দেখলে আপনারই হাসি পেতে পারে।
কেউ বছরের পর বছর আপডেট দেন না।
কেউ প্রায় নিষ্ক্রিয়।
কেউ আবার আছেনই না।
তাহলে সমীকরণটা কী?
ঝাঁ-চকচকে LinkedIn Profile না থাকলে কি সবকিছু শেষ?
নাকি ঝাঁ-চকচকে LinkedIn Profile ছাড়াও মানুষ আকাশে উঠতে পারে?
আজ যারা আকাশে উঠেছেন, তাদের অধিকাংশের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল LinkedIn জন্মানোরও আগে।
তারা উঠলেন কীভাবে?
হয়তো বলবেন—
আগে সম্ভব ছিল।
এখন পৃথিবী বদলে গেছে।
ঠিক আছে।
সেটাও ধরে নিলাম।
তাহলে আরেকটা প্রশ্ন।
বাংলাদেশে লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন।
আমাদের সচিবরা?
অতিরিক্ত সচিবরা?
মন্ত্রীরা?
প্রতিমন্ত্রীরা?
সিনিয়র আমলারা?
শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারকরা?
তাদের কতজনকে LinkedIn-এ নিয়মিত সক্রিয় দেখেন?
তাদের কি Professional Networking দরকার হয় না?
তাদের কি Professional Visibility দরকার হয় না?
তাদের কি Career Capital তৈরি করতে হয় না?
নাকি সাফল্যের রাস্তা একেকজনের জন্য একেক রকম?
আর যদি তাই হয়, তাহলে আমরা কি কখনো কখনো LinkedIn-এর গুরুত্ব নিয়ে এমন একটি Narrative তৈরি করি, যা বাস্তবতার চেয়ে বড়?
আমি LinkedIn-এর বিরুদ্ধে নই।
আমি নিজেও এখানে লিখি।
আমি Personal Branding-এর বিরুদ্ধেও নই।
নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করারও বিরোধী নই। আমি নিজেও আমার জুনিয়রদের সবসময় বলতাম, ফেসবুক ও লিংকডইন প্রোফাইল সাফসুতরো রাখবেন। কারন, আজকাল ওখানেও ব্যাকগ্রাউন্ড চেক হয়। কিন্তু, সেই অদৃশ্য সাফসুতরোর রেঞ্জ কী? নিজের স্বাধীন মতামতের গলাটা কতটা টিপে ধরব সেখানে?
আমি শুধু একটি প্রশ্ন করছি।
আমরা কি এখানে সত্যিই লিখি?
নাকি আমরা এমন একটি সংস্করণ প্রকাশ করি, যেটি কারও অস্বস্তির কারণ হবে না?
আমরা কি সত্যিই মত প্রকাশ করি?
নাকি সম্ভাব্য সুযোগের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করার ভাষা নির্বাচন করি?
প্রশ্ন করারও একটা মূল্য আছে।
প্রশ্ন না করারও একটা মূল্য আছে।
আমরা কোন মূল্যটা দিচ্ছি—সেটাই হয়তো আসল প্রশ্ন।
কারণ প্রশ্ন না করলে উত্তর আসে না।
আর অনেক সময়, উত্তরহীন বিশ্বাসই সবচেয়ে শক্তিশালী মিথে পরিণত হয়।
আর প্রশ্নহীন সমাজে দানবেরা খুব কমই জন্মায়।
তারা শুধু ধীরে ধীরে, নীরবে, প্রশ্নহীনতার নিরাপদ অন্ধকারে বড় হয়ে ওঠে।
প্রশ্নহীনতা শুধু উত্তরকে হত্যা করে না; অনেক সময় মানুষ, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—তিনটিকেই ভুলের ভেতর নিরাপদ বোধ করতে শেখায়।
#Leadership #CriticalThinking #Questioning #Psychology #OrganizationalCulture #PeopleManagement #LeadershipDevelopment #CorporateCulture #ProfessionalGrowth #ThoughtLeadership #QuestionEverything #CriticalThinking #SpeakUp #PsychologicalSafety #Leadership #PeopleManagement #OrganizationalCulture #WorkplaceCulture #ThoughtLeadership #HRLeadership PositivityNegativity