এই লেখাটির বেশ কিছু অংশ আমি এর আগেও অনেক লেখায় বলেছি। সেই বিচারে এই দীর্ঘ লেখাটিকে আগের বক্তব্যের গভীরতর অধ্যয়ন বলা যেতে পারে। এই লেখাটির মূল অবয়ব আমার লেখা হলেও এটি অনুলিখন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন ও পরীক্ষণে আমি AI এর অনেকটা সহায়তা নিয়েছি। যেসব ডেটা ও তথ্য প্রদান করা হয়েছে, তার একশোভাগ অথেনটিসিটির নিশ্চয়তা দিচ্ছি না। ব্যক্তিবিশেষের ইনপুটও এই লেখায় ব্যবহার হয়েছে। তাদের সবাইকে ধন্যবাদ। সুবিশাল লেখাটি মূলত যারা কোনো কিছুর গভীরে গিয়ে পাঠে আগ্রহী, তাদের জন্য।
পর্ব ১: –
১.
উন্নয়নের গল্প, নাকি উন্নয়নের লুকোচুরি?
বাংলাদেশের অর্থনীতি আলোচনা উঠলেই দুটি বিপরীতধর্মী ছবি সবসময় আমাদের সামনে আসে।
একটি ছবিতে দেখা যায়—বাংলাদেশের শাইনি গ্রোথ এবং ব্যাঘ্রগতির ছটা। বিশাল জি.ডি.পি, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, অবকাঠামো উন্নত হয়েছে, রপ্তানি বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে, বড় বড় সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, অর্থনৈতিক অঞ্চল, ঝাঁ চকচকে বিমানবন্দর, সুউচ্চ সব রোশনাই ভরা টাওয়ার—সব মিলিয়ে উন্নয়নের দৃশ্যমান চিত্রকল্প।
আবার ছবিটার বিপরীত দিকে দেখা যায়-রাজধানী অভিমুখে বিপুল জনস্রোত, শিক্ষিত তরুণরা চাকরি পাচ্ছেন না, শিল্প প্রতিষ্ঠান দক্ষ মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না, হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হচ্ছেন, আবার একই সময়ে শত শত পদ দীর্ঘদিন শূন্য পড়ে থাকছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েও উপযুক্ত প্রার্থী পাচ্ছে না, অন্যদিকে লাখ লাখ মানুষ চাকরির জন্য আবেদন করেও সুযোগ পাচ্ছেন না।
প্রথম ছবিটিও সত্য। দ্বিতীয় ছবিটিও সত্য।
প্রশ্ন হলো—একই দেশের অর্থনীতিতে একই সময়ে এই দুটি বাস্তবতা কীভাবে বিদ্যমান থাকা সম্ভব?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটি মৌলিক ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
আমরা অর্থনীতিকে প্রায়ই শুধু GDP, Export, Foreign Reserve, Per Capita Income কিংবা Economic Growth-এর মতো সূচক দিয়ে বিচার করি। বা, আমাদের রাজনীতিক ও আমলারা আমাদের সেভাবেই চিত্রটি দেখাতে পছন্দ করেন। কিন্তু একটি দেশের অর্থনীতি কেবল উৎপাদনের গল্প নয়; এটি মানুষের গল্প। এটি কাজের গল্প। এটি দক্ষতার গল্প। এটি উৎপাদনশীলতার গল্প। এটি মানবসম্পদের গল্প।
একটি অর্থনীতি কত বড়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সেই অর্থনীতি তার মানুষের জন্য কী ধরনের কাজ তৈরি করছে, কী ধরনের দক্ষতা গড়ে তুলছে, কতটা উদ্ভাবন করছে এবং ভবিষ্যতের জন্য কতটা সক্ষমতা নির্মাণ করছে। আবার ডেমোগ্র্যাফিক ডিভিডেন্টের প্রিভিলেজের গল্পও আমরা শুনি। কিন্তু, সেই ডিভিডেন্ট কতটা ক্যাশ করা যাচ্ছে-সে প্রশ্নও খুবই ভ্যালিড।
এই জায়গাতেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি লুকিয়ে আছে।
২.
উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নয়, মানবসম্পদও:
আমরা উন্নয়ন বলতে সাধারণত দৃশ্যমান জিনিসগুলো দেখি—রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, রপ্তানি কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ।
কিন্তু উন্নয়নের আরেকটি স্তর আছে, যা চোখে দেখা যায় না।
সেটি হলো—একটি দেশের Human Capital।
কোনো দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার খনিজ সম্পদও নয়; বরং তার মানুষ। আর সেই মানুষ তখনই জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়, যখন তারা দক্ষ, উৎপাদনশীল, উদ্ভাবনী এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সক্ষম হয়।
এ কারণেই আধুনিক অর্থনীতিতে শুধু Physical Capital নয়, Human Capital Investment-কেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কারণ ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা হবে শুধু কে বেশি উৎপাদন করতে পারে, তা নিয়ে নয়; বরং কে বেশি জ্ঞান তৈরি করতে পারে, কে বেশি উদ্ভাবন করতে পারে এবং কে দ্রুত নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারে—তা নিয়ে।
বাংলাদেশের সামনে আজ ঠিক এই প্রশ্নটিই দাঁড়িয়ে আছে।
৩.
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বুঝতে হলে কোথা থেকে শুরু করতে হবে?
আমার মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বুঝতে হলে শুরুটা GDP দিয়ে নয়, Workforce দিয়ে হওয়া উচিত।
কারণ অর্থনীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের অর্থনীতি।
একটি দেশের মানুষ কী কাজ করেন, কোথায় কাজ করেন, কী ধরনের কাজ করেন, কতটা উৎপাদনশীল, কতটা দক্ষ এবং কতটা মূল্য সংযোজন করেন—এসব প্রশ্নের উত্তর না জানলে সেই দেশের অর্থনীতি সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের অধিকাংশ আলোচনায় এই জায়গাটিই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়।
আমরা প্রায়ই বলি—বাংলাদেশে চাকরি নেই।
আবার অনেক উদ্যোক্তা বলেন—বাংলাদেশে যোগ্য মানুষ নেই।
দুটি বক্তব্যই একই সঙ্গে কীভাবে সত্য হতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই আমাদের বাংলাদেশের Workforce-এর ভেতরে প্রবেশ করতে হবে।
সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে দেখতে হবে।
কারণ, বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো—আমরা পুরো Workforce-কে একটি একক Job Market হিসেবে কল্পনা করি।
বাস্তবে তা নয়।
বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, শ্রমশক্তি, কর্মসংস্থানের ধরন এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিত্র সামনে আসে।
আর সেই চিত্রটিই আমাদের পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি। বাংলাদেশকে বুঝতে হলে প্রথমেই আমাদের Workforce-এর একটি X-Ray দেখতে হবে।
৪.
বাংলাদেশের Workforce X-Ray: সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতা:
বাংলাদেশের চাকরির বাজার, বেকারত্ব কিংবা ট্যালেন্ট সংকট নিয়ে যেকোনো আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন—আসলে বাংলাদেশের Workforce দেখতে কেমন?
বাংলাদেশের শ্রমবাজার কাঠামো নিয়ে একবার একটা সিরিয়াস জরিপ হয়েছিল। জরিপটা হয় ২০২২ সালের আপডেটকে বেস ধরে। ওই সময়কার প্রেক্ষাপটে শ্রমবাজারের কিছু আগ্রহোদ্দীপক বিশ্লেষন দেখি:
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা: ১৬৯.৮ মিলিয়ন;
কর্মক্ষম জনসংখ্যা (১৫–৬৪ বছর): ১১৩.৭ মিলিয়ন;
১৫ বছরের কম ও ৬৫+ বয়সী (অকর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ): ৫৬.১ মিলিয়ন;
কর্মক্ষম এর মধ্যে যারা কাজ করছেন বা করতে আগ্রহী (শ্রমশক্তি) ৭২.০৬ মিলিয়ন ( ৬৩.৬%);
কর্মক্ষম এর মধ্যে যারা কাজ করেন না, বা করতে আগ্রহী নন (শ্রমশক্তি নয়) ৪১.৬ মিলিয়ন (৩৬.৪%);
কর্মক্ষম এর মধ্যে যারা কর্মজীবি, অর্থাৎ যেকোনো রকম আয়সূচক কাজ করছেন ও আয় করছেন: ৬৮.৩ মিলিয়ন;
কর্মক্ষম এর মধ্যে যারা বেকার, কিন্তু সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজছেন: ৩.৭৬ মিলিয়ন;
শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ: ২৬.৬ মিলিয়ন (৩৬.৯%);
শ্রমশক্তিতে পুরুষের অংশগ্রহণ: ৪৫.৫ মিলিয়ন (৬৩.১%);
নারী শ্রমশক্তির মধ্যে কর্মে নিয়োজিত নারীর সংখ্যা ২৫ মিলিয়ন (৯৪.৩%); যার মধ্যে formal jobs (সরকারি+প্রাইভেট): ২.৫–৩.১ মিলিয়ন নারী (সর্বোচ্চ ১২% এর মতো); Informal+Self-employed sector: ২০–২২ মিলিয়ন নারী;
কর্মক্ষম এর মধ্যে ১.৫ মিলিয়ন সরকারী চাকরিতে, ১১ মিলিয়ন প্রাইভেট সেক্টরে, ৩১ মিলিয়ন সেলফ এমপ্লয়েড, ২৪.৮ মিলিয়ন অনানুষ্ঠানিক খাতে;
কর্মসংস্থান ও আত্ম-কর্মসংস্থান সংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের “বিল্ডিং হিউম্যান ক্যাপিটাল হোয়্যার ইট ম্যাটারস: হোমস, নেইবারহুডস অ্যান্ড ওয়ার্কপ্লেসেস” শীর্ষক প্রতিবেদন ২০২৬ এর বরাত দিয়ে দেখা যায়: –
১. মাত্র ৪৭% শ্রমিক বেতনভিত্তিক চাকরি করে
২. ৫৩% শ্রমিক স্বনিয়োজিত
৩. স্বনিয়োজিতদের মধ্যে ৯৪% নিম্ন-দক্ষতার পেশায় কাজ করে
৪. স্বনিয়োজিতদের মধ্যে মাত্র ৬% উচ্চ-দক্ষতার ভূমিকায় আছে
কর্মক্ষেত্রে শেখার সুযোগ:
৫. ৭০% শ্রমিকের কাজের সময় শেখার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত
অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান:
৬. বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার ৮৪.০৭% (BBS ও ILO তথ্য)
৭. গ্রামীণ এলাকায় অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার ৯২% এর বেশি
প্রশিক্ষণের ঘাটতি:
৮. ৯৩.৪% শ্রমিক আগের তিন বছরে একদিনের জন্যও প্রশিক্ষণ পায়নি (ILO রিপোর্ট: “Lifelong Learning and Skills for the Future”)
৯. এই শ্রমিকদের ৫০% (অর্ধেক) স্বীকার করেছে তাদের কাজভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন
আঞ্চলিক তুলনা (দক্ষিণ এশিয়া ও অন্যান্য):
১০. ভারত: ৭৪% শ্রমিক স্বনিয়োজিত
১১. পাকিস্তান: ৯৫% শ্রমিক স্বনিয়োজিত (সর্বোচ্চ)
১২. নাইজেরিয়া: ৬৬% শ্রমিক স্বনিয়োজিত (নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন)
ওয়ার্কফোর্স এবং ডেমোগ্রাফির এই কাঠামোগত আলোচনার মধ্যেই সম্পূর্ণ নতুন ও ভিন্নধর্মী একটি কনসার্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে জেনারেশনাল ফ্যক্ট। বাজারের সবশেষ শ্রম শক্তির ক্যাটেগরি Gen-Z কে বলা হচ্ছে অর্গানাইজেশনের problem child! রিক্রুটমেন্ট স্পেশালিষ্টরা তাদের প্রধান তিনটা প্রবলেম আইডিন্টিফাই করেছেন-
১. Fickle: প্রথম চাকরি থেকে তাদের এভারেজ turn over রেট ১.১ বছর, যেকোন জেনারেশনের চেয়ে অনেক কম। ২. Entitled: ৩৫% Gen-Z মনে করে তাদের স্যালারি ছয় ডিজিটের হওয়া উচিত। ৩. Lacking Etiquette: তাদের workplace etiquette খুবই কম।
তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। প্রতিটি প্রজন্মই তাদের আগের প্রজন্মের কাছে কোনো না কোনো সময় “সমস্যা” হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। আজকের জেন-জেডও তার ব্যতিক্রম নয়। বাস্তবতা হলো, তারা এমন এক পৃথিবীতে বড় হয়েছে যেখানে তথ্য, প্রযুক্তি, বিকল্প সুযোগ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিমাণ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
তাই ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে সবচেয়ে সফল হবে না সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি ডিগ্রি অর্জন করেছে; আবার সেই প্রতিষ্ঠানও নয়, যার সবচেয়ে বড় কারখানা আছে। বরং সফল হবে তারা, যারা পরিবর্তনের গতি বুঝতে পারবে, প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে পারবে এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে।
দিনশেষে শ্রমবাজার, গার্মেন্টস, জেন-জেড কিংবা অটোমেশন—সব আলোচনার সারকথা একটাই: অভিযোজনই টিকে থাকার একমাত্র উপায়। আর, আমাদের খুব বেশি দরকার আপস্কিলিং-রিস্কিলিং আর অথেনডিট ডেটার স্মার্ট এনালিটিকস ভিত্তিক ডিসিশন মেকিং ও প্ল্যানিং।
আমরা প্রায়ই ১৭ কোটির বাংলাদেশকে একটি বিশাল শ্রমবাজার হিসেবে কল্পনা করি। বাস্তবে কিন্তু তা নয়।
ওপরের পরিসংখ্যানের বিস্তারিত বিশ্লেষনে গেলে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি হলেও, তাঁদের সবাই শ্রমবাজারের অংশ নন। বয়সগত কারণে প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষ (১৫ বছরের নিচে এবং ৬৫ বছরের ওপরে) কর্মক্ষম নন। অর্থাৎ দেশের কর্মক্ষম বয়সের (Working-age Population) মানুষের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি ৩৭ লাখ।
কিন্তু এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
কর্মক্ষম বয়সে থাকলেই কেউ শ্রমবাজারের অংশ হয়ে যান না।
কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেও প্রায় ৪ কোটি ১৬ লাখ মানুষ Labour Force-এর বাইরে। তাঁরা কেউ শিক্ষার্থী, কেউ গৃহিণী, কেউ অবসরপ্রাপ্ত, কেউ অসুস্থ, আবার কেউ কাজ করতে সক্ষম হলেও বিভিন্ন কারণে শ্রমবাজারে সক্রিয় নন।
ফলে বাস্তবে বাংলাদেশের Labour Force বা সক্রিয় শ্রমশক্তির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭ কোটি ২১ লাখ।
এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত, আর প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ কাজ খুঁজছেন কিন্তু কাজ পাচ্ছেন না।
প্রথম নজরে এই পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক মনে হতে পারে। কারণ বেকারত্বের হার তুলনামূলক কম।
কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে বোঝার সবচেয়ে বড় ভুলটি আমরা প্রায়ই করি।
কারণ Employment এবং Quality Employment এক জিনিস নয়।
৫.
স্বর্ণখচিত এ-প্লাস মাইনাসের বন্যায় টালমাটাল চাকরির বাজার আর বেকারের কান্না; এটা কি বেকারত্ব, নাকি স্বেচ্ছা বেকারত্ব?
অপ্রাসঙ্গিকভাবে একটু বলি, লেজ হচ্ছে এমন একটা বেয়াড়া অঙ্গ বা অংশ, যেটা চাইলেও লুকোনো যায় না। যেমন করেই হোক, সেটা প্রকাশ হয়ে বসেই। বিশেষ করে অস্থানে সেটা বেশি ঘটে।
সত্য হল সেরকম একটা লেজ, সে প্রকাশিত হবেই।
এই কিছুদিন আগেও উগান্দেশ ছিল একটি মধ্যম আয়ের খ্যানাডা দেশ। যার রাজধানী ছিল লস অ্যাঙ্গেলেস।
তো, এই উন্নত দেশ, মধ্যম আয়ের দেশ, উদীয়মান ব্যাঘ্রের মিথ্যা আস্ফালনটা ক্ষনে ক্ষনে প্রকাশ হয়ে পড়তই। তারই একটা লেজ ছিল জি.ডি.পি নামক বোগাসের বিপুল বৃদ্ধির বিপরীতে শ্রিংকেজ অব এমপ্লয়মেন্ট ঘটতে থাকা। গোটা বিশ্বের তাবৎ অর্থনীতিবীদ, সমাজবিজ্ঞানী ও এনালিস্টদের কাছে এ ছিল এক বিষ্ময়, যে, অর্থনীতি বাঘের মতো বাড়ছে, আর এমপ্লয়মেন্ট ঠিক সেই সময় কমছে। এ যেন প্রেগন্যন্সি পিরিয়ড বাড়ছে আর পেটের মাপ কমছে-সেরকম।
যাহোক, সবাই সবই বুঝত, কেবল বলত না। সেই সময় কে যেন সাহস করে ‘দেশে ২৬ লাখ বেকার’ এমন একটা বোগাস বো ছুড়ে মেরেছিল। যদিও সেই সময় ’নিঃস্বব্যাংক’ (বিশ্বব্যাংক) আবার বলেছিল, যে, ওটা ২৬ লাখ না, ৪ কোটি ৮০ লাখ। জিডিপির বিপুল বৃদ্ধি নামক বোগাস লেজ প্রকাশের মতো করে প্রকাশ হয়ে পড়ত ওই বেকারত্বের আজব হারের মধ্য দিয়ে।
বর্ণমালায় আছে আ-কার, ঈ-কার, বঙ্গ মেলায় আছে বেকার।
তো, নতুন করে আবার সম্প্রতি, কে বা কারা যেন রটিয়ে দিয়েছে যে, দেশে বেকার বেড়েছে। সে হবে হাজার বা লাখ খানিক। দৃশ্যমান ‘কড়িসংখ্যান’ হল ২৭.৪ লাখ।
তো, আমার কৌতুহল জাগছে অনেকগুলো খটকা নিয়ে-
১. বৃদ্ধিটা তুলনা করা হয়েছে কোন সময়কালের ’এশটাটিশটিকশে’র সাথে?
২. বেকারত্বের বিশুদ্ধতম সংজ্ঞা কি বাংলাদেশে আছে? (নেই)
৩. বাংলাদেশে যত জরিপ হয়, সেগুলোর সত্যতায় ও নিখূঁতত্বে কেউ বিশ্বাস করে? (মনে হয় না) বি.বি.এসের বেকার জরিপে সঠিক ডাটা পাওয়া, নেয়া ও দেয়ার ১% ভরসা কি কেউ করবে? মনে হয় না। কোরবাণীর সময় দেশে ১ কোটি ৭ লাখ, ২১ হাজার ৭ শো ২৯ টা গরু, ছাগল, পাঁঠা, খাসি ও ভেড়া আছে-এই স্ট্যাট দেখেই তো আন্দাজ মেলে।
৪. এই ২৭.৪ লাখ লোক রোজ কী করে? কেবল খায়, ফেসবুক করে, বাজারে যায়, লাল চা খায় আর টং দোকানে মাস্তি করে দিন কাটায়?
৫. এদের বয়স কত? কত বছর বয়স হতে কারো কর্মহীনতাকে বেকারত্ব বলা যাবে? কেউ যদি ১৭ বছর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, কাজও না করে, তাকে কি বেকার ধরা হবে? কেউ যদি ১২ বছরের হয়, কিন্তু, পড়াশোনাও করে না, কাজও না, সে কি বেকার বলে তকমা পাবে? আবার, বেকারত্বের সংজ্ঞায় একটা বয়স রেঞ্জ ধরা হয় (ধরুন ২৫-৪৫ বছর), যে বয়সে কর্মহীন থাকলে বেকার বলা হবে। তো, সেই বয়সের রেঞ্জ যখন বানিয়েছে, সেই সময় কি ১১ বছরের বালকরা মানুষ খুন বা রেপ করবার মতো ছিল? ছিল না তো। তাহলে আজকের ১৩ বছরের বালক, যে, পড়াশোনা করে না, আবার আয়ও করে না, তাকে বেকার ধরা হবে না কেন?
৬. চাঁদাবাজি, সুপারি ভিত্তিক কিলিং, যৌনব্যবসা, টিউশনী, দালালি, ফাপরবাজি করে ১৬ বছর বয়সী কেউ টাকা আয় করলে কি তাকে তবুও বেকার বলা হবে? ৩৫ বছরের কেউ ওভাবে আয় করতে পারলে সে কি বেকার? সরকারের বালাম কী বলে?
৭. তালিকাভূক্ত বা জরিপভূক্ত বা সংজ্ঞায়িত বেকাররা কতদিন বসে বসে খানা খেলে বেকার ধরা হবে?
৮. এই ২৭.৪ লাখের মধ্যে কত জন গ্রাজুয়েট, কতজন এইচ.এস.সি, কতজন এস.এস.সি, কতজন আন্ডারমেট্রিক, কতজন পি.এইচ.ডি, কতজন মাদ্রাসা পাস, কতজন নারী, কতজন পুরুষ, কতজন মিক্সড জেন্ডার, কতজন ধনী, কতজন গরীব?
৯. এই ২৭.৪ লাখ কি কোনোরকম কাজকাম জানে? নাকি ভাত খাওয়া, ফেসবুক করা আর চুগলি করা বাদে কিছুই পারে না?
১০. ৪.৬৩ % সংখ্যাটা সম্ভবত বেকারত্ব বৃদ্ধির হার। কথা হল, মোট কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যার মধ্যে কত সংখ্যক বেকার সেটা দিয়ে পারসেনটেজ হয়। কথা হল, ’কর্মক্ষম’ এর মানদন্ড কী? স্রেফ বয়স? স্রেফ আয় না করাই বেকারত্ব?
১১. সবশেষ প্রশ্ন হল, এই ২৭.৪ লাখকে কি আগামী দিনে রাজনৈতিক নাটকের ডামাডোলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মিছিল, মিটিং, রোডব্লক, দাঙ্গা, শো-অফে ভাড়ায় খাটানো যায় না? তাদেরও উপকার হয়, দলগুলোরও।
উঈদ অল রেসপেক্ট টু এভরি হিউম্যান সোউল। লেখাটা বেকার ও বেকারত্বকে পরিহাস করে নয়, সেটাকে নিয়ে তৈরী ন্যারেটিভ ও রাষ্ট্রীয় তামাশাকে ফোকাস করে।
৬.
রেখেছ বেকার করে, কমপিটেন্ট করোনি:
আমার ফেসবুক ও লিংকডইন নেটওয়ার্কের একটা বড় সংখ্যক মানুষ হলেন ফ্রেশার বা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চাকরিখোঁজক (Jobseeker)। তাদের একটা বড় সংখ্যকই বিপদে পড়া প্রার্থী। ছোটোখাটো বিপদ না, অমানবিক রকমের বিপদ। আমার নিজেরই নিজের জন্য অসহায় লাগে। আমি নিজে খুব বড় হাস্তি কেউ না। তার উপর আমার নেটওয়ার্কটা খুব ছোট। সময়টাও সত্যি খুব খারাপ। চাকরির বাজারের ভয়াবহতম অবস্থা। বলতে গেলে নতুন কোনো এমপ্লয়মেন্ট তৈরী হচ্ছে না অনেক দিন ধরেই। বরং, কিছু বছর ধরে সেটা নামছে আর নামছে।
পরিচীতরা মনে করে, আমাদের হাতে কত চাকরি। চাইলেই আমরা কিছু করতে পারি। MBA করা প্রার্থীর পিয়নের চাকরি চাইবার ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ চাকরি হারিয়ে বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে/বিদেশে শিফট হয়ে, মাথা গরম করে চাকরি ছেড়ে, বড় কিছুর আশায় নতুন কোথাও জয়েন করে আসল চেহারা টের পেয়ে ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তায় পড়ে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
চরম ফ্রাস্ট্রেশনে ফ্রেশাররা। কোথাও ডাক পর্যন্ত পাচ্ছেন না। বিপদে পড়া মানুষগুলোর জন্য কিছু করতে ইচ্ছে করে, চেষ্টা করি বিভিন্ন সুযোগের সাথে ওনাদের লিংক করিয়ে দিতে। কিন্তু চাকরিদাতা, লিংকার, মিডলম্যান ও ইন্টারভিউয়ারদের অযৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রতিষ্ঠানের সেঁকেলে ও ভুল সিস্টেম আর চাকরিদাতাদের খামখেয়ালী ও আন্তরিকতার অভাব এই প্রার্থীদের হতাশার অতলে ডোবাচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে বড় বড় পজিশনে থাকা কিছু মানুষের সাহায্য করার অনীহা আর পায়াভারি হয়ে বড়শিতে খেলার মেন্টালিটি।
পাশাপাশি (কিছু কিছু) প্রার্থীদের সীমাহীন অদক্ষতা, অযোগ্যতা, ক্ষমার অযোগ্য সিরিয়াসনেসের অভাব আর টপ ক্লাস চাকরির প্রতি তীব্র টান তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে দিচ্ছে না।
দেশে ২৭.৪ লাখ বেকার>চাকরি নেই- এটা যেমন সত্যি, তেমনি, দেশের বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠান যোগ্য ম্যানপাওয়ারের অভাবে ধুঁকছে, লস করছে। অফিসার হতে ডিরেক্টর-উপযুক্ত ম্যানপাওয়ারের তীব্র হাহাকার।
তবে হ্যা, আমার একযুগের HR শিক্ষা বলে, আমাদের দেশের একটা বড় সংখ্যক প্রতিষ্ঠান (সবাই না) ট্যালেন্টেড ও স্মার্ট এমপ্লয়ী পাবার অধিকার রাখেন না। কারন তারা স্মার্ট লোক হায়ার করতে চান নাকি অন্য কিছু চান-সেটা নিজেরাই জানেন না। ১০০ লোক ইন্টারভিউ করে একজন পাওয়া যায়না প্রায়ই।
অনেক আগে একবার একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ডিরেক্টর সোর্স করতে গিয়ে রাগে চুল ছেঁড়ার অবস্থা হয়েছিল। ভাবি, কী রকম মানুষ নিয়ে কোম্পানীগুলো চলছে। স্যরি, আমি বলতে চাচ্ছি না, আমি কোনো বিরাট আবদুল্লা হয়ে গিয়েছি। কিন্তু আমার মতো অযোগ্যর চেয়েও যদি আরো অযোগ্য একদলকে দেখি বড় পদ বাগিয়ে বসে আছেন তবে কী করা উচিৎ? ওঁদের চেয়ার দখল করে রাখার কারনে নিচের দিকের বা বাইরের মার্কেটের ট্যালেন্টেড মানুষেরা বড় পদে যেতে পারছেন না। এ এক অসহ্য অচলাবস্থা।
বেশ কিছু বছর আগে ফেসবুকে একটা নিউজ ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। আমাদের তথাকথিত জিপিএ-৫ ধারীদের সত্যিকারের অবস্থাটা সবাই এতদিন বলাবলি করত, ফিসফিস করত, চুপচাপ কানাকানি করত, অনেকে আমতা আমতা করে পাশ কাটাতো।
সেইবার ওই সাংবাদিক একবারে লুঙ্গী টান মেরে খুলে জিপিএ-৫ এর দোদুল্যমান সতিত্ব একবারে ঘুঁচিয়ে দিয়েছিলেন। একজন মহান বুদ্ধিজীবি সাংবাদিক আবার বলে বসলেন, এরকম সাংবাদিকতা নৈতিকতা বিরোধী, এরকম তাদের চেহারা দেখানো ঠিক হয়নি, প্রশ্নগুলি যথাযথ নয়, এসব প্রশ্ন না পারা মানেই তারা লেখাপড়া করেনি-তা ঠিক নয় ইত্যাদি ইত্যাদি। হ্যা, নীতি পুলিশিং, সিটিজেন জার্নালিজম, পপুলিজম-এসব নিয়ে কথা বলবার অবশ্যই অবকাশ আছে। ওগুলোও বাড়াবাড়ি রকম হচ্ছে-ঠিক। আবার, মেধার অবনমন যে হয়েছে-সেটা অতি অবশ্যই সত্যি।
যাহোক সাংবাদিকতার মান আমার ভাবনার বিষয় নয়। দেশের শিক্ষার মান কেমন-সেটা বলার আমি কেউ নই। আমি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা বা পর্যালোচনা কোনটাই করব না। সেটা বিশেষজ্ঞদের কাজ। আমার এই ভিডিও দেখে আলোড়িত হবার কারণ ভিন্ন।
অনেক দিন আগে একজন তথাকথিত উচ্চ ডিগ্রিধারী গবেটকে নিবিড়ভাবে যথানিয়মে মেধাযাচাই করে তার অন্তঃসারশুন্যতা অনুধাবন করে অতঃপর তাকে অধঃস্তন একটা পদে নিয়োগ করায় তখন আমার এইচ আরে দক্ষতা, আমার মেধা, আন্তরিকতা, উজবুকতা, বুদ্ধিবৃত্তির জোর, আমার সার্বিক বিচক্ষণতা-এসব নিয়ে ব্যপক প্রশ্নের মুখে পড়ি।
ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী একজন বিজ্ঞ লোককে নিম্নশ্রেনীর পদে নিয়োগ করাটাই ছিল এতকিছুর কারন। তিনি সার্টিফিকেটধারী ইঞ্জিনিয়ার-এটাই ছিল তার একমাত্র যোগ্যতা আর আমার একমাত্র ভুল। এমনকি আমিও আমার যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের মধ্যে পড়ি যে সত্যিই আমি উজবুক কিনা।
GPA-5 দের নিয়ে নিউজ ভিডিওটি দেখে আমার সেই ক্ষতে সেবার একটু হলেও মলম লেগেছিল। আর আমি কিছুটা হলেও আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলাম, যে, না আমি হয়তো ভুল ছিলাম না। সার্টিফিকেট মানেই শিক্ষিত নয়।
সেই বৃটিশ আমল হতে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে শাসকের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বিনয়াবনত ও ভারবাহী কেরাণী সৃষ্টি ও যোগান নিশ্চিত করবার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। তার ফলস্বরূপ আমরা কেরাণীর উমেদার তৈরী করে চলেছি, আর তার ফল হিসেবে বেকারত্বের বাড়বাড়ন্ত দেখছি। এর কুফল বৃটিশের সময়ও দেখা হয়েছে।
সেই সময়কার একটা শোনা কথা, কথাটা বেশ হাস্যরসের জন্ম দিয়েছিল।
বৃটিশের শেষ দিকে ভারতের কলকাতা কেন্দ্রিক বাবু সমাজের তরুণদের একটা বড় গোষ্ঠি লেখাপড়া জানা বেকারে পরিণত হয় যেহেতু এই কেরানী সৃষ্টির পড়াশোনার সিস্টেমে ব্যাঙের ছাতার মতো যতো গ্রাজুয়েট বের হত তত চাকরিতো ছিলনা। তো কলকাতা কেন্দ্রীক বেকার যুবকদের একটা বিরাট জনগোষ্ঠী তৈরী হল।
সমস্যা এতটাই প্রকট হয়ে উঠল যে, বেকার যুবকেরা দলবেধে শ্মশান গেটে দাড়িয়ে থাকত। যখনই দেখত মোটামুটি ধনী কারো লাশ আসত তখনি তারা দৌড়ে যেত। লাশের সাথের লোককে জিজ্ঞেস করে জেনে নিত কোন অফিসের কর্মচারী ছিল এই লাশ।
ব্যাস, তার অফিসের নাম ও পজিশান জেনে নিয়ে পরদিনই তারা একটা চাকরির দরখাস্ত পাঠাতো সেই অফিসের বড় বাবু বরাবর। তার ভাষা ছিল-
Dear Sir, learning from the burning ghat, that a post has been vacant, I am a jobless applicant, roaming like a vagabond, will be obliged if the job is grant……….
আজকাল যেই হারে সোনার এ- প্লাস বের হচ্ছে তাতে অচীরেই এদেশেও এরকম শুরু না হয়। বা বলতে পারেন, শুরু হয়ে গেছে। বৈশ্বিক বাজারের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে যে জনগোষ্ঠীকে, তাদের হাতিয়ার যদি হয় কেবল আবেগ আর উগ্র জাতীয়তাবাদ, তাহলে বিশ্বমঞ্চে হাস্যস্পদ হওয়া ছাড়া আর কিছু পাবার নেই। আমাদের মানুষেরা যে যায়গাটাতে পিছিয়ে আছেন, আমার মতে, তার সবচেয়ে প্রকট যায়গাটা হল কমিউনিকেশন ও প্রেজেন্টেশন। আর, সেই সাথে ন্যাশনাল কনফিডেন্স। ওই তিনের বিপুল ব্যাকআপই একটি বিশেষ দেশের মানুষদের বৈশ্বিক কোম্পানীগুলোর বড় বড় পদ বাগাবার অন্যতম কারন। আমাদের দেশের একশোভাগ মানুষের রেজ্যুমেতে কমোন স্কিল হল কমিউনিকেশন ও প্রেজেন্টেশন, অথচ, প্রায় একশোভাগ মানুষই ওই দুয়ে জিরো শর্ট। লেভেলটা বোঝাতে আমি একটা গল্প বলি।
ওবামা প্রেসিডেন্ট হবার পর জাপানি প্রধানমন্ত্রী তার সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হতে ওয়াশিংটন যাবেন। কিন্তু তিনি ইংরেজী পারেন না।তো প্রধানমন্ত্রীর দোভাষীরা তাকে দু’টো ইংরেজি শিখিয়ে দিয়ে বললেন আপনি এই দুটো কথা শেষ করে চুপ করে যাবেন বাকিটা আমরা চালিয়ে নেব।
আপনি যখন ওবামার সাথে প্রথম হ্যান্ডশেক করবেন তখন জিজ্ঞেস করবেন “How are you” আর যখন ওবামা এর উত্তর দেবেন তখন আপনি বলবেন “Me too”। ব্যাস আপনার কাজ শেষ।
যাহোক নির্দিষ্ট দিনে ওবামার সাথে জাপানি প্রধানমন্ত্রির মোলাকাত হল।
বাট প্রধানমন্ত্রী একটা ছোট ভুল করে ফেললেন। তিনি “How are you” এর বদলে ওবামাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“Who are you”?
প্রশ্ন শুনে ওবামা তো আকাশ থেকে পড়লেন। যাহোক তিনি প্রধানমন্ত্রীকে লজ্জায় না ফেলে কিছুটা কৌতুক করে বললেন,
“Well, I am Michel’s husband”.
প্রধানমন্ত্রী মনে করলেন তিনি ঠিক পথে আছেন। উত্তরে তিনি শিখিয়ে দেয়া দ্বিতীয় বাক্যটি ঝাড়লেন
“Me too”.
অতঃপর ওবামার হার্টফেল।
ইংরেজি নিয়ে এরকম কৌতুক আরও আছে। কৌতুকের পাত্র স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী বদল হয়।
আরেকটা গল্প বলি। এই গল্পে পাত্র হল জনৈক ক্রিকেট ক্যাপ্টেন।
তো কোনো এক ম্যাচে বাংলাদেশ জিতেছে। ক্যাপ্টেন ——– ও সেঞ্চুরী করেছেন। তো কমেন্টেটর ম্যাচ শেষে তার কাছে আসলেন ম্যাচ জয় ও সেঞ্চুরির প্রতিক্রিয়া নেবার জন্য। ঘটনাক্রমে ক্যাপ্টেন সম্প্রতি বাবা হয়েছেন। তাকে কমেন্টেটর ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন “কংগ্রাচুলেশান ক্যাপ্টেন, হোয়াট ইজ ইওর রিঅ্যাকশান বিইং এ প্রাউড ফাদার”?
ইংরেজিতে অকাট মুর্খ ক্যাপ্টেন ——- ভাবলেন নিশ্চই তাকে ম্যাচ উইনিং নিয়েই প্রশ্ন করেছেন। তিনি উত্তর দিলেন ”মি অ্যান্ড মাই টীম ইজ সো হ্যাপী। ইনফ্যাক্ট ইট ওয়াজ এ টীম ওয়ার্ক।” স্পেশালি দি ওপেনারস ডিড ভেরী গুড।” কমেন্টেটর অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন।
গল্প দুটো অনেক পুরানো এবং অবশ্যই হুবহু বলতে পারলাম না বিধায় মোটামুটি করে বললাম। দয়া করে ভাববেন না অশ্লীল কমেডি হচ্ছে কিনা। না, ঘটনা তা না। গল্প দুটো প্রায়ই আমি ব্যবহার করি ইংরেজীতে দখল থাকার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে। ইংরেজী না পারলে অবস্থা কি হয় সেটাতো দেখলেনই। ইংরেজীতে দক্ষতা ছাড়া বর্তমানে কোনো প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া বা পেলেও সেটা ভালভাবে করার কথা ভাবাও যায় না।
সেখানে কিযে ভয়ঙ্কর দুর্বল লোকেরা প্রতিনিয়ত চাকরির জন্য আসেন তা সত্যিই না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। মাস্টার্স করা ছেলেমেয়েরা আসছে এমনকি কেউ কেউ নিজের ডিগ্রির নামটা ইংরেজিতে লিখতে পারেন না।বিবিএ করা ছেলে। গরুর উপরে ১০ টা সেনটেন্স লিখতে দিলে পারছেন না। কি ভয়ঙ্কর অবস্থা।
কেউ কেউ বলতে পারেন না না, আপনি সারাদেশের শিক্ষিত মানুষকে এই সামান্য দু’চারজনকে দিয়ে মেজার করছেন কেন?
না ভাই, আমি সবার মূল্যায়ন করছি না। আমি শুধু আমার প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি। আর সমস্যার গভীরতা ও ধরনটাকে কানেক্ট করবার চেষ্টা করেছি।
৭.
তৃণভোজি জনগোষ্ঠীর হাতহদাই:
সিরিয়াস আলাপটাকে একটু নিত্যবাজারে নিয়ে যাই। কেন, সে কথা পরে বলছি।
ঘিয়ের কেজি দুই হাজার,
গরুর মাংসের কেজি ৮০০ টাকা,
দুধের কেজি ১১০ টাকা (তা ও আধা পানি, সিকি কেমিক্যাল),
ডিমের ডজন ১৫০ টাকা (প্লাস্টিকের জুজুসহ),
আলুর কেজি ৭০-৮০ টাকা,
ভাতের কেজি ৬০-৮০ টাকা (নানা ক্যাঁচালসহ),
বিষের কেজি (জানা নাই)।
উন্নত ভূ-খন্ড উগান্দেশে বিগত বহু মাস ধরে সদাইপাতির দাম খ্যানাডা, লসএঙ্গেলেস বা টুকিওর কাছাকাছি। ফলে, আমাদের আদি পুরুষ বান্দরের মতো ঘাসপুছ খাবার উপক্রম হয়েছে অনেকেরই। বিশেষত খাদ্যতালিকার সবচেয়ে দামী ও দরকারী বস্তু আমিষ কাটআপ করে জীবন বাঁচাবার লড়াইয়েই বেশি ন্যাস্ত হতে হচ্ছে। ঘটনা সত্য। (যদিও বানিজ্য মেলা বা অ্যানিম্যাল দেখবার লাইন দেখে মাঝে মধ্যে আমার মনে হয়, এসব সবই ছ্যাড়কাড় বিরোধী প্রচারনা মাত্র।)
প্রোটিনের অভাবে কিডনী মাথায় না উঠলেও আমাদের মাথার মগজ যে ঠিকই কমে ও কমছে-তা নিয়ে আমার বেশ নিশ্চিত একটা ধারনা জন্মেছে। এখন আপনি বলতেই পারেন, যে, জগতে এত এত নিরামিশাষী মানুষ আছে। এমনকি এই যে, আমাদের পরম আরাধ্য ও প্রিয় ’মুদীর ভাই’ও নাকি নিরামিশাষী। তিনি স্রেফ শাকপাতা খেয়েই তো এতবড় সালতানাতের মোটামুটি লাইফটাইম সুলতান বনে গেছেন। তাহলে আপনার এত চিন্তা কী নিয়ে?
বঙ্গীয় ভূখন্ডে এই জিনিসের একটা সাইড এফেক্ট বা ফিউচার কনসিকুয়েন্স নিয়েই আমার যত দুশ্চিন্তা।
এমন করে আর বছর দশেক চলবার পরে কী হবে?
দেশের অর্ধেক মানুষ মরে যাবে? জানি না। বিদেশ পালিয়ে যাবে? সম্ভব না।
তাহলে কী হবে?
হবে হল, যদি এই হারে উচ্চমূল্য বহাল থাকে, তাহলে গড়পড়তা প্রতিটি শিশু, প্রতিটি কিশোর, প্রতিটি শিক্ষার্থী, প্রতিটি তরুণ প্রোটিন ঘাটতি নিয়ে বাড়তে থাকবে। অন্যান্য খাদ্য উপাদান আর অবশ্যম্ভাবিভাবে তার সাথে বোধ ও শিক্ষার ঘাটতি তো আছেই-নিয়ে বাড়তে থাকবে।
ফলে, ভবিষ্যত তো পরে। আগে আজকে কী হচ্ছে তাই বলি।
১. পোস্ট গ্রাজুয়েট ফ্রেশার চাকরি প্রত্যাশী। “আমাকে একটি চাকরি পেতে সহায়তা করুন।” এতটুকু ব্যক্তিগত চাওয়াকেও সঠিকভাবে আরেকজনের কাছে পেশ করতে অক্ষম। চাকরির আবেদন করতে একটি পূর্ণাঙ্গ কভারমেইল লিখতে পারে না। একটা ছোট গুগল ফরম পূরণ করতে দিলে অর্ধেক তথ্যই দেবে না। বাকিটা আবার পড়ে বুঝতে না পেরে ফাঁকা রাখে।
২. এক বছরের চাকরিজীবি। এখনই ম্যানেজারের পজিশন পেতে আগ্রহী। বেতন চাই ৭০ হাজার। ম্যানেজারের দায়ীত্ব কী-জিজ্ঞেস করলে একটাই উত্তর দিতে সক্ষম-”টিম চালাতে হবে।” টেক্সটাইল এঞ্জিনিয়ারের সাথে কথা বলি। জিন্স ও ডেনিমের ভেদ জানে না। ফ্যাশন ডিজাইনারের সাথে বসি। ৫ জন দেশী বা বিদেশী ফ্যাশন ডিজাইনারের নাম জানে না। অভিজ্ঞ ও পশ কংলোমারেটের HR অফিসার। ৫০ হাজার টাকা বেতন চাই। একজন ক্যানডিডেটকে ঠিক করে ইন্টারভিউ কল করতে পারে না।
আপনি হয়তো ভাবছেন, এ তো নতুন জেনারেশনের সমস্যা। ‘শিখখিৎ’ মানুষদের ইস্যু। বাদবাকি সব ঠিক আছে। তাছাড়া গরীব দেশে এত গ্রাজুয়েট দরকারই বা কী? আমাদের দরকার বৃত্তিমূলক শিক্ষা। তাহলে আপনাকে বৃত্তিবাজদের অবস্থাও দেখাই।
৩. একটা কাপড়ের দোকানের সেলসগার্ল। সামান্য ত্যানা বেচার জন্য যতটা জ্ঞান, বুদ্ধি ও দক্ষতা থাকা লাগে-সেই সামান্যটুকুও নেই। কথাটা তক বলতে পারে না। কাস্টমারের কাছে নিজেদের অক্ষমতা ও দুর্বলতা ঢাকবে-সেটাও স্মার্টলি করতে পারে না। শুধু কাষ্ঠপুত্তলিকা। মুদী দোকানের ছোকরা। সে বসে থাকে ম্যাকবুক নিয়ে। কাস্টমারকে জিনিস দেখাতে অনীহা। মুরগীর দোকানের সার্ভিস বয়। মুরগীটা পিস তক করতে পারে না। প্রসেস করে বাসায় আনলে দেখা যাবে পেটের মধ্যে নাড়িভুড়ি রয়েই গেছে।
আমাদের নীতিনির্ধারক, ভাগ্য নির্ধারক, রাজনীতিক, আমলা, কামলা, নেতা, ত্রাতাদের প্রভূত ধন্যবাদ।
আপনারা খুব খুব সফলভাবে আমাদের শিক্ষা, শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনাটাকে ধ্বংস করেছেন। অত্যন্ত সুচারুভাবে। সেই ধ্বংসের স্বরুপটা নিয়ে লিখতে হলে কলমে কালি ফুরিয়ে যাবে। একদা আমি লিখেছিলাম কিছুটা। যাহোক।
ধ্বংসের একটা শাখা হিসেবে শিক্ষাক্রমের হাত ধরে মেধার বিকাশ, বুদ্ধির উৎকর্ষতা, দক্ষতার প্রকাশ তো জিরো। বাকিটা যা থাকতে পারত, তারও জানাজা দেয়া সারা। ফলে কী হয়েছে বলি।
১৭ বছরের অ্যাকাডেমিক জীবন শেষ করা, মানে, এই সুদীর্ঘ, চ্যালেঞ্জিং, কষ্টকর ও ব্যয়বহুল যাত্রা শেষ করা একজন শিক্ষার্থী যদি ধরুন ডিগ্রি শেষ করতেও না পারেন, যদি তার বিশেষ কোনো দক্ষতা না-ও তৈরী হয়, যদি তার জ্ঞানের বহর খুব কমও হয়, তবুও, তার মধ্যে যদি অন্তত মৌলিক বুদ্ধিমত্তা, সৃষ্টিশীলতা, ভিশন, স্বপ্ন, ডেসপারেশন, সিরিয়াসনেস, ক্যারিয়ারিস্টিক ভাবনা, দায় ও দায়ীত্ববোধ আর কিছু লাইফ স্কিল অন্তত তৈরী করে ছেড়ে দেয়া হত, তবুও তাকে এমপ্লয়াররা গড়েপিটে নিয়ে উপযুক্ত মানুষ করে তুলতে পারত। বিশেষত মৌলিক বুদ্ধিমত্তা আর সৃষ্টিশীলতাটুকু থাকলেও।
আপনারা অত্যন্ত হাই সাকসেস রেটে ওটুকুও তাদের মগজ ও সিস্টেম হতে গায়েব করে দিতে পেরেছেন। ফলত, তাতে করে আমার ভাই ও বোনেরা আস্ত ৪টা ডিগ্রি নিয়ে পথে পথে ঘুরছেন, অথচ সামান্য একটা A-4 কাগজের বিজ্ঞাপন কীভাবে দেয়ালে সাঁটাতে হয়, সেটুকু বুদ্ধি তক তার ঘটে নেই।
একজন মাস্টার্স পাস (দেশের প্রচন্ড ব্যয়বহুল একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী) মানুষকে একটি দুই লাইনের A-4 সাইজের কাগজে সাদাকালো নোটিশ কোনো একটা স্থানে সাময়িকভাবে লটকাতে দেয়ায় ভদ্রলোক বোথ সাইড টেপ দিয়ে পুরো দেয়াল মাখিয়ে সেটাতে কাগজ লটকেছেন। ওই আঠা দেয়াল হতে ওঠাতে হলে পুরোটা আবার ডিসটেম্পার করাতে হবে। পাশেই কাঁচের দেয়াল, সেখানে স্কচ টেপ দিয়ে লটকালেই হয়ে যেত।
এইটুকুতে তার অযোগ্যতা প্রমাণ হয় না। আমার ফোকাস হল, এই সামান্য ভাবনা ও বুদ্ধিটা করবার মতো চিন্তা তার মাথায় যে আসে না, বা সে করে না-সেটা অ্যালার্মিং।
বাসার সামনে দুটো নারকেল গাছ। সেটা হতে নারকেল পাড়বার লোক মেলে না। বাসায় দারোয়ান দরকার পড়েছিল। বিশ্বব্রহ্মান্ড খুঁজেও দারোয়ান মেলেনি। ড্রাইভার চাকরি ছাড়লে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, ড্রাইভার নেই দেশে। বাসার ডিসটেম্পার করাতে হলে রং মিস্ত্রীর দীর্ঘ বিলম্বিত শিডিউল পেতে বর্ষা এসে পড়ে। রং মিস্ত্রী নেই। দর্জি দোকানে কাপড় দিলে আটবার ডেলিভারী পেছায়। সেলাই করার পর্যাপ্ত কারিগর নেই। আবার যারা আছে, তাদের সেলাই দক্ষতা ও গুনাগুন যাচ্ছেতাই। রাজমিস্ত্রীর দেখা পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। বাসার বুয়া তো ডুমুরের ফুল। যারা আছেন, তারা বিল গেটস। মর্জি না হলে আপনার বাসায় থু ফেলতেও আসবে না। রেস্টোর্যন্ট দিন, সার্ভ করবার জন্য মাস্টার্স পাশ পোলাপান পাবেন কিছু। খাবার বানাবার কারিগর পাবেন না। মায় খেজুর রসের সিজনে গাছ কাটবার গাছি দশ গ্রাম খুঁজে আনতে হয়।
দেশে নাকি ১৮ কোটি মানুষ, আর নাকি ১৯ কোটি বেকার। তাহলে মানুষগুলো গেল কই? কী করে তারা খাচ্ছেন? যারা বেকার, তারা সারাদিন তাহলে সময় কাটায় কী করে? (সম্ভবত টিকটক, রিলস, গাইস, প্রেন্ডস, চিলস, মাস্তিস, স্লিপস-এর মতো অতি উৎপাদনশীল ও ইনকাম জেনারেটিং কাজে মত্ত থেকে।)
৪. রান্নার কুক বুয়া। পোলাও রান্না করতে অক্ষম। শুধু ভাত রাঁধতে পারবে।
৫. ড্রাইভার ক্যানডিডেট। গাড়ির মেকানিজম সম্পর্কে কোনো বেইসিক আইডিয়াও নেই। শুধু চালাতে পারে।
৬. অভিজ্ঞ পিওন। চা বানানো বা ফটোকপি চালানোতেও অক্ষম।
আমার খুব সিরিয়াসলি ভয় হয়, আর বছর দশেক পরে অফিস পিওন, রান্নার বুয়া, দারোয়ান, মেসেঞ্জার, ড্রাইভার, মুচি, রাইডার, কেরানি, আরদালি-এসব মানুষও বন্ধু দেশ হতে আমদানী করতে হয় কিনা।
এমনিতেও অবশ্য আমরা তখন বিশ্বের এক নম্বর ধনী দেশ হয়ে যাব। তখন আমরা আরব শেঠদের মতো নিজেরা কাজ করব না। গরীব প্রতিবেশী দেশের গরীবসকে দিয়ে ওসব ছোট কাজ করাবো। আর আমরা মাস্তি করব।
৭. পে-রোল অফিসার। কোনো সফটওয়্যারে কাজ করতে অক্ষম। ইন্টারভিউ কল করা হয়েছে। দেশের বাড়িতে যাচ্ছে ‘বার্ষিক ডাঙ্গুলি টুর্নামেন্ট’ অ্যাটেন্ড করতে। শেষ না করে আসতে পারবে না।
৮. সঙ্গীত শিল্পী। সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা জানেন না। শুধু গাইতে পারেন।
৯. ম্যাথের হাউস টিউটর। শুধু পাটিগণিত পারেন। এলজেবরা পারবেন না।
১০. অ্যাডমিন ম্যানেজার প্রার্থী। গুগল করে একটা তথ্য বের করতে অক্ষম।
১১. নার্স। ওষুধ খাবার গাইডলাইন বাংলায় লিখে দিতে অক্ষম।
১২. ক্লাস নাইনের বাচ্চা। স্কুলের নাম, নিজের নাম, বাপ ও মায়ের নাম শুদ্ধ বাংলা ও ইংরেজিতে লিখতে অক্ষম।
১৩. জি.পি.এ গোল্ডেন বাচ্চা। ইংরেজি ভর্তি ফরম পড়তে অক্ষম।
১৪. দুই বাচ্চার মা। সন্তানের জামার সাইজের স্টিকার/ল্যবেল পড়ে দর্জিকে বলতে অক্ষম।
১৫. চার সদস্যের পরিবারের কর্তা। ১ লিটার দুধ যে ১ কেজি দুধ না-সেটুকু বুঝতে অক্ষম।
১৬. বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের প্রফেসর। সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় নির্ধারন যে পিতার ক্রোমোজমের ওপর নির্ভর করে (মায়ের না), সেটা জানেন না। দলবাজিতে সুদক্ষ, অথচ চোথা ও মোথার বাইরে গবেষনা বা পড়াশোনা করতে বা করাতে পারেন না।
১৭. আঠারো বছরের টিন বা লোহার বাচ্চা। ধান গাছে যে তক্তা হয় না-জানে না। FOOD VLOG চেনে, BLOG চেনে না, DOGGY STYLE পারে, অথচ Dog চেনে না। কনডম চেনে, কনট্রাসেপটিভ পিল চেনে, মেনসট্রুয়াল সাইকেল যে কোনো অসুস্থ্যতা না, সেটা জানে না। প্রজন্ম রিসর্ট চেনে, রিসর্টের রেট জানে, রিসর্টের টাকা কীভাবে নিজে আয় করতে হয় জানে না। অবশ্য ‘শুয়ে’ টাকা আয় করবার রাস্তা তারা খুব দারুনভাবে রপ্ত করেছে। লাভ রোডে দামী বাইকে খাটোকেশী ও এলোকেশীদের আধিক্যের বহরে সেটা বোঝা যায়। প্রজন্মের সিনিয়রকূল শুতে জানে, কনসিভ করতে বা করাতে জানে, শোয়ার ইমপ্যাক্টে জন্মানো অফস্প্রিংটাকে কীভাবে মানুষ করতে হয় জানে না। সেগুলো বড় হয় পশুত্বের গ্রুমিং নিয়ে।
১৯. ষোলো বছরের টিন বা দস্তার কন্যা। পোচের জন্য ডিমটাও ভাঙতে পারে না।
আর কত বলব? (এই রে, এখনো আপনার একবারও মনে হল না, এই যে বেটা এত কথা বলছে, শালা নিজেকে কী মনে করে? দিগগজ? আইনস্টাইন? আল্লামা?)
২০. CSE Graduate. ChatGPT’র মুখদর্শনও করে নাই কখনো।
২১. C-suit কর্তা। কারো ফোন কীভাবে এটেন্ড করতে হয়-পারে না।
২২. ফেসবুক ফাটিয়ে ফেলা জাগ্রত বিপ্লবী। “চাকরি প্রার্থী নয়, চাকরি দাতা খুঁজছি”-এই মেসেজটা যে জব ক্যানডিডেট খোঁজার জন্য নয়-এতটুকু মেসেজও বুঝতে অক্ষম। (ইনবক্স করে বলে, ভাইয়া, আপনার একটা জব অ্যাড দেখলাম।)
এতকিছুকে দেখে যদি চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যায়, তাহলে আসল বিপদের ঠাওর এখনো করে উঠতে পারেননি।
একটা দেশে কনজিকিউটিভলি জেনারেশন আফটার জেনারেশন তৈরী হচ্ছে, যেখানে বিজ্ঞানী তৈরী হচ্ছে না, গবেষক তৈরী হচ্ছে না, শিল্পী তৈরী হচ্ছে না, শিল্প তৈরী হচ্ছে না, সাহিত্যিক তৈরী হচ্ছে না, দার্শনিক তৈরী হচ্ছে না, বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা গবেষনা প্রতিষ্ঠান বা থিংকট্যাংক তৈরী হচ্ছে না, বিশ্বমানের ডাক্তার, এঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, টেকনোলজিস্ট তৈরী হচ্ছে না। কেবল প্রশাসক ও কেরাণী বাড়ছে।
ওসব তৈরী যে দরকার-সেই বোধটা পর্যন্ত হারিয়ে যাচ্ছে। প্রোটিনের দাম যদি হয় স্বর্ণের দামের সমান, তাহলে যথাযথ পুষ্টি যে পেটে যাচ্ছে না বিশাল জনগোষ্ঠীর, ভিটামিন, মিনারেল, ফ্যাটের ঘাটতিতে পেটে যে যাচ্ছে কেবল স্টার্চ, তার পরিণতিতে মেধা ও প্রতিভার অবনমন হতে বাধ্য। মেধা তো বাতাস আর পানি খেয়ে গ্রো করে না। হল্লিক্স আর কমপেলান খেলে অবশ্য কৃত্রিমভাবে বাড়তেও পারে। যদিও পানির দামও এখন আর সস্তা না। (অবশ্য সার্বিক যে সামাজিক পঁচন ও মেধার অবমূল্যায়নের মড়ক, তাতে প্রোটিন গিলিয়েও কিছু হবে না।)
আস্তে আস্তে যেটা হচ্ছে, তা হল পঁচনটাকেই উন্নতি হিসেবে বিশ্বাস তৈরী হওয়া, মুঢ়তাকেই প্রজ্ঞা হিসেবে সার্টিফায়েড করার চর্চা গড়ে ওঠা, অন্যায়টাকেই বীরত্ব বলে প্রতীয়মান করবার চর্চা, অধঃপতনকেই উন্নয়ন ভাবার অবিমৃশ্যকারীতা, গুঁয়ের গন্ধকে গোলাপ ভাবার প্রবণতা। টিকটক সম্রাট ও ভাইরালদেরকে জাতীয় বীরের আসন দেবার অপদার্থতা। ভিউ সম্রাজ্ঞীদের জাতির মাতার সিংহাসনে বসাবার চেষ্টা। এবং, শুধু মাস্তি ও শোয়াকেই মানব প্রজাতির জন্মলক্ষ্য ভেবে নেবার গণবিশ্বাস।
প্রোটিনের অভাবে এমনিতেও নিরামিষ ও নিরামিষাশী জনগোষ্ঠী এই দেশে বাড়ছে। তার বাইরেও অবশ্য অন্য কারনে তৃণভোজী একটি প্রাণীর পুরুষ প্রজাতিরাও (আদর করে পাঁঠা ডাকা হয়) মাত্রাতিরিক্ত হারে বাড়ছে। হতে পারে সেটা আয়োডিনের অভাবে। অথবা, শাসক ও রাজন্যদের শাসন ও শোষণ প্রক্রিয়াকে অমরত্ব দানের অভিলাষেই।
৮.
কর্মরত মানেই কি মানসম্মত কর্মসংস্থান?
বাংলাদেশে কর্মরত প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ মানুষের সবাই একই ধরনের কর্মসংস্থানে নেই।
অনেকেই স্থায়ী চাকরিতে আছেন।
অনেকেই অস্থায়ী কাজ করেন।
অনেকে নিজের ছোট ব্যবসা চালান।
অনেকে কৃষিকাজ করেন।
অনেকে দিনমজুর।
আবার অনেকে এমন কাজ করেন, যার কোনো লিখিত চুক্তি নেই, সামাজিক নিরাপত্তা নেই, চাকরির নিশ্চয়তা নেই, এমনকি আগামী মাসে কাজ থাকবে কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়।
অর্থাৎ, কর্মসংস্থানের সংখ্যা আমাদের বলে কতজন কাজ করছেন, কিন্তু বলে না কেমন কাজ করছেন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিয়োগকর্তা কে?
এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকেই হয়তো বলবেন—সরকার।
অনেকে বলবেন—Garments Industry।
কেউ বলবেন—বড় বড় Corporate Group।
বাস্তবতা ভিন্ন।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিয়োগকর্তা সরকার নয়, কর্পোরেটও নয়।
সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে Self-employment এবং Informal Economy।
সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, কর্মরত মানুষের মধ্যে আনুমানিক—
- সরকারি চাকরিতে আছেন প্রায় ১৫ লাখ মানুষ।
- Private Formal Employment-এ আছেন প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ।
- প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ Self-employed।
- আর প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ Informal Sector-এ কাজ করছেন।
এই একটি পরিসংখ্যানই বাংলাদেশের অর্থনীতির চরিত্রকে নতুনভাবে চিনতে শেখায়।
বাংলাদেশ মূলত একটি চাকরিনির্ভর অর্থনীতি (Employment Economy) নয়।
বাংলাদেশ মূলত একটি Self-employed এবং Informal Economy।
৯.
নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণ আমাদের কী শেখায়?
বাংলাদেশের Labour Force-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণের পার্থক্য।
বর্তমানে সক্রিয় শ্রমশক্তির মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ৫৫ লাখ পুরুষ, আর প্রায় ২ কোটি ৬৬ লাখ নারী।
অর্থাৎ কর্মক্ষম বয়সে বিপুলসংখ্যক নারী থাকলেও তাঁদের একটি বড় অংশ এখনও Labour Force-এ প্রবেশ করছেন না।
এটি শুধু একটি সামাজিক বাস্তবতা নয়।
এটি একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও।
কারণ, কোনো দেশ তার মোট Human Capital-এর একটি বড় অংশকে যদি উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে না পারে, তাহলে সেই দেশের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সীমিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আসলে কোন খাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে?
কর্মসংস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশকে সাধারণভাবে তিনটি বড় খাতে ভাগ করা যায়—
- কৃষি (Agriculture)
- শিল্প (Industry)
- সেবা (Services)
কিন্তু এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
যে খাত সবচেয়ে বেশি মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়, সেই খাতই যে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
আবার যে খাত সবচেয়ে বেশি রপ্তানি আয় করে, সেই খাতও সবসময় সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না।
এই পার্থক্যটি বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ এখান থেকেই শুরু হয় Productivity, Value Addition, Industrial Structure এবং Talent Economy-এর আলোচনা।
এই পরিসংখ্যান আমাদের সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা দেয়:
বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনায় আমরা প্রায়ই একটি মৌলিক ভুল করি।
আমরা ধরে নিই, বাংলাদেশের Workforce মানেই Job Market। বাস্তবে তা নয়।
৭ কোটির বেশি মানুষের Labour Force-এর মধ্যে Private Formal Job-এর সংখ্যা মাত্র এক কোটির কিছু বেশি।
অর্থাৎ আমরা যে “Job Market” নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করি, সেটি আসলে বাংলাদেশের পুরো Workforce-এর একটি ছোট অংশ মাত্র।
আর এখান থেকেই শুরু হয় একটি আরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।
যদি বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় অংশই আনুষ্ঠানিক চাকরি না হয়, তাহলে Job Market এবং Talent Market কি একই জিনিস?
নাকি এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা?
১০.
HR Economics-এর দৃষ্টিতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার:
বাংলাদেশের Workforce-এর এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু শ্রমবাজারের একটি চিত্রই তুলে ধরে না; বরং আমাদের অর্থনীতির চরিত্র সম্পর্কেও একটি গভীর সত্য জানিয়ে দেয়।
২০২৬ সালের সর্বশেষ অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপি (GDP)-র মোট আকার প্রায় ৫১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (Nominal)। আমাদের জিডিপির এই বিশাল অঙ্কে কোন খাতের শেয়ার কত, আর কর্মসংস্থানেই বা কার অবদান কতটুকু, তা দেখলে আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর স্পষ্ট হয়:
সেবা খাতের অবদান (Services) ৫১% শিল্প খাত (Industry) ৩৮% কৃষি খাত (Agriculture) ১১%
অর্থনীতির খাত ভিত্তিক GDP-তে অবদান বনাম কর্মসংস্থানে অবদানের তুলনামূলক চিত্র:
কৃষি (Agriculture) ১১% বনাম ৪৫%-বিপুল কর্মসংস্থান, কিন্তু তুলনামূলক কম উৎপাদনশীলতা ও কম মূল্য সংযোজন।
শিল্প (Industry) ৩৮% বনাম ২১%-কম মানুষ, কিন্তু বেশি মূল্য সৃষ্টি; এর মধ্যে RMG প্রধান চালিকাশক্তি।
সেবা (Services) ৫১% বনাম ৩৪%-GDP-এর সবচেয়ে বড় নিয়ামক; ব্যাংকিং, ICT, টেলিকম, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহন, বাণিজ্যসহ বহুমুখী খাত।
বাংলাদেশের GDP-এর সবচেয়ে বড় অংশ আসে সেবা খাত থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিল্প, আর কৃষির অবদান তুলনামূলক কম। কিন্তু কর্মসংস্থানের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কৃষিতে GDP-র অবদান মাত্র প্রায় ১১%, অথচ এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ এই খাতে কাজ করেন।
অন্যদিকে শিল্প খাত, বিশেষ করে RMG, রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হলেও মোট কর্মসংস্থানের একটি অংশকে ধারণ করে। অর্থাৎ, কোন খাত কত মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়, আর কোন খাত কত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে—এই দুটি বিষয় এক নয়।
GDP-এর অবদান আর Employment-এর অবদান কখনোই সমান নয়। এই পার্থক্যই Labour Productivity, Human Capital এবং Talent Economy বোঝার প্রথম ধাপ।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিকে GDP, রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা মাথাপিছু আয়ের মতো সূচক দিয়ে মূল্যায়ন করেছি। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতিতে আরেকটি বিষয় ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—Human Capital Allocation।
অর্থাৎ, একটি দেশের মানুষ কোথায় কাজ করছে, কী ধরনের কাজ করছে, তাদের দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার হচ্ছে কি না, এবং তারা অর্থনীতিতে কতটা মূল্য সংযোজন করছে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও আজ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক।
এখান থেকেই HR Economics-এর আলোচনা শুরু হয়।
HR Economics আমাদের শেখায়, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার জনসংখ্যা নয়; বরং সেই জনসংখ্যার দক্ষতা (Capability), উৎপাদনশীলতা (Productivity) এবং মূল্য সৃষ্টির ক্ষমতা (Value Creation Capacity)।
অর্থাৎ, একই সংখ্যক মানুষ নিয়ে দুটি দেশ সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক ফলাফল অর্জন করতে পারে। পার্থক্য তৈরি করে মানুষের দক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষা, উদ্ভাবন এবং কাজের গুণগত মান।
এই কারণেই ১০ লাখ মানুষের একটি Workforce সব সময় আরেকটি ১০ লাখ মানুষের Workforce-এর সমান অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করে না।
১১.
বাজার অর্থনীতির যুগে আমাদের বাজারের স্বাস্থ্য কেমন যাচ্ছে?
”চাকরির বাজার খারাপ”-এরকম একটি কথা আমরা প্রায়শই শুনে থাকি। যদিও কথাটি আমি বিগত ১৮ বছর ধরেই, যখন হতে আমি নিজেই চাকরির বাজারের উমেদার হয়েছি, তখন হতেই শুনে আসছি।
একটা বড় সংখ্যক মানুষ মনে করেন, আসলে, চাকরির বাজার কখনোই ভাল ছিল না। মজার বিষয় হল, র্যান্ডম আলোচনায় আমি প্রায় কখনোই এবং কারো কাছেই শুনিনি, যে, চাকরির বাজার ভাল যাচ্ছে। ঠিক যেরকম, আজ হতে ৩০ বছর আগেও আমার বাবা যখন বাজারে যেতেন, তখনো রোজ এসে বলতেন, বাজারে আগুন, কিছুতে হাত দেয়া যায় না। আজ ৩০ বছর পরে, তার সন্তানও একই কথা বলছে-বাজার গরম। ব্যবসায়ীরা যেমন কখনোই বলেন না, যে, ব্যবসা ভাল যাচ্ছে।
চাকরির বাজার কি আসলেই কখনো ভাল ছিল? বা, চাকরির বাজার কি আসলেই ইদানিং খারাপ যাচ্ছে?
এই ধরুন, ২০২৪ সাল। এখন কি চাকরির বাজার খারাপ? কী মনে হয় আপনার? বা, ধরুন, ২০২০ সালে যখন কোভিড হানা দেয়, তখন হতে ২০২৩ সাল-তিন বছর। এই সময়টা অনেকেই অহরহ বলতেন, চাকরির বাজার খুব খারাপ, খুব টাফ, খুব কমপিটিটিভ। কতটা সত্য আর কতটা কাল্পনিক বিষয়টা?
হ্যা, কোভিডের ৩ বছর প্রচুর জব কাট ও পে কাটের খবর আমার কানে এসেছে-সত্যি। নতুন জব সৃষ্টি হয়নি-তা ও অনেকটা সত্যি। তবে বাদবাকি বছরগুলো, বা, অন্তত আমাদের স্মরনের মধ্যে থাকা সময়টা? বাজার কি সত্যিই শুকনো ছিল?
অধিকাংশ মানুষ অবশ্য ‘বাজার খারাপ’ ন্যারেটিভকে সমর্থন করেন। কিন্তু, খুব ছোট একটা দল মনে করেন, যে, বাজার খারাপ বলে কিছু নেই। বাজার আজীবনই আসলে কমপিটিটিভ ছিল। সেই কমপিটিশন দিনকে দিন আরো টাফ হয়েছে।
এখন হতে ৪ দশক আগে যদি অবস্থাটা থেকে থাকে সারভাইভাল ফর অল, দুই যুগ আগে ২০০০ সালে বাজার যদি থাকে সারভাইভাল ফর দি ফিট, সেটা এখন দাড়িয়েছে সারভাইভাল ফর দি ফিটেস্ট, টাফেস্ট, বেস্ট। এখন সে-ই সারভাইভ করবে, সুযোগ করে নেবে, যে যুগের চাহিদার সাথে একদম হাড্ডাহাড্ডিভাবে ফিট।
খেয়াল করে দেখুন তো, প্রতিদিন লিংকডইনে আপনি মোট কতগুলো নতুন জবে জয়েন করবার মিষ্টি পোস্ট দেখতে পান? চোখ বন্ধ করে একটু গুনে নিন তো। আমি তো অন্তত ডজনখানেক দেখিই।
প্রশ্ন হল, এত খারাপ অবস্থার মধ্যে এঁরা কীভাবে নিজেদের প্রোভাইড করছেন?
অবস্থা ভাল না খারাপ-সেই জরিপ করা টাফ। যদিও বেশ কিছু জরিপ বলছে, দেশে ৪.৮ কোটি বেকার, ২৬ লাখ গ্রাজুয়েট বেকার, ২ কোটি বেকার, শিক্ষিতরা গণহারে বেকার ইত্যাদি। আরেকটা প্রনিধানযোগ্য আশঙ্কা হল, খুব আনইউজুয়ালি এবং আনকনভেনশনালি, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিপরীতে আমাদের এমপ্লয়মেন্ট বাড়ছে না। যেটা খুবই অস্বাভাবিক। এই সত্যটা মাথায় রেখে আলোচনা চলুক। বুঝতে সুবিধা হবে।
কিন্তু, তার মধ্যেও, আমি বলব, আপনার যদি সত্যিকারের ড্রিম ও ডেসপারেশন থাকে, চেষ্টা ও পারসিভারেন্স থাকে, তুমুল প্রস্তুতি থাকে, আপনি যদি নিজেকে জিনিয়াস হিসেবে প্রস্তুত করে নেন, আপনার জন্য বাজার আজীবনই দারুন। কারন, আপনার বাজার শুধু দেশে না, বিদেশেও আছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি: আমরা কোন বাজার নিয়ে কথা বলছি?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন চাকরি সৃষ্টি নয়; বরং কম উৎপাদনশীল খাত থেকে মানুষকে ধীরে ধীরে বেশি উৎপাদনশীল, বেশি দক্ষতা-নির্ভর এবং বেশি মূল্য সংযোজনকারী খাতে স্থানান্তর করা। কারণ একটি দেশের সমৃদ্ধি শুধু কত মানুষ কাজ করছে, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই মানুষগুলো কত অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করছে, তার ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশে কর্মসংস্থান নিয়ে আলোচনার সময় একটি বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।
আমরা “চাকরির বাজার” বলি, কিন্তু খুব কমই ভেবে দেখি—আসলে কোন বাজারের কথা বলছি?
যদি বাংলাদেশের প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ কর্মরত মানুষের মধ্যে মাত্র এক কোটির কিছু বেশি মানুষ আনুষ্ঠানিক বেসরকারি চাকরিতে থাকেন, তাহলে আমরা যে Job Market নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা করি, সেটি আসলে দেশের সামগ্রিক Workforce-এর একটি ছোট অংশ মাত্র।
অথচ সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ক্যারিয়ার আলোচনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুতি, এমনকি অধিকাংশ HR আলোচনাও প্রায় পুরোপুরি এই Formal Job Market-কেন্দ্রিক।
ফলে আমাদের বিশ্লেষণও অনেক সময় অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ গড়ে উঠেছে—
- স্বনিযুক্ত মানুষ,
- ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা,
- কৃষক,
- অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক,
- ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী,
- গিগ কর্মী,
- ফ্রিল্যান্সার,
- পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত মানুষ,
—যাঁদের অধিকাংশই প্রচলিত Job Market-এর অংশ নন।
তাহলে প্রশ্ন হলো—
বাংলাদেশের Workforce-এর এত বড় অংশ যদি চাকরির বাজারের বাইরের বাস্তবতায় অবস্থান করে, তাহলে কি তাদের জন্য Talent-এর প্রয়োজন নেই?
অবশ্যই আছে।
বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য দক্ষতা আরও বেশি প্রয়োজন।
কারণ একজন উদ্যোক্তা, একজন কৃষি উদ্যোক্তা, একজন ফ্রিল্যান্সার বা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সাফল্যও শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তাঁর জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতার ওপর।
১২.
Job Market ছোট, Talent Market অনেক বড়:
এখানেই এই লেখার কেন্দ্রীয় ধারণাটি উঠে আসে। Job Market এবং Talent Market এক নয়।
Job Market মূলত চাকরিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি অর্থনৈতিক বাজার।
কিন্তু Talent Market অনেক বড়। এটি শুধু চাকরিজীবীদের বাজার নয়।
এটি এমন একটি বাজার, যেখানে প্রতিযোগিতা হয় দক্ষতা, জ্ঞান, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, উদ্ভাবন এবং উৎপাদনশীলতা নিয়ে।
এই Talent Market-এর অংশ—
- সরকারি কর্মকর্তা,
- বেসরকারি চাকরিজীবী,
- উদ্যোক্তা,
- স্বনিযুক্ত মানুষ,
- গবেষক,
- শিক্ষক,
- কৃষি উদ্যোক্তা,
- প্রযুক্তিবিদ,
- ফ্রিল্যান্সার,
- স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠাতা,
- এমনকি ভবিষ্যতের কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়া শিক্ষার্থীরাও।
অর্থাৎ, Job Market-এর সীমানা শেষ হয় কর্মসংস্থানে; কিন্তু Talent Market-এর সীমানা শুরু হয় মানবিক সক্ষমতা থেকে।
এই পার্থক্যটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু কতটি চাকরি সৃষ্টি হলো, সেটির ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই দেশের মানুষ কতটা সক্ষম, কতটা উৎপাদনশীল এবং কতটা উদ্ভাবনী হয়ে উঠল—সেটির ওপরও সমানভাবে নির্ভর করে।
এখান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের আসল গল্প।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বোঝার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আমরা প্রায়ই Workforce, Labour Market, Employment, Job Market এবং Talent Market—এই পাঁচটি ভিন্ন ধারণাকে একই অর্থে ব্যবহার করি।
ফলে সমস্যার সঠিক উৎসও অনেক সময় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।
সম্ভবত এই কারণেই একই সময়ে আমরা দুটি বিপরীতধর্মী বাক্য শুনি—
“চাকরি নেই।” এবং “যোগ্য মানুষ নেই।”
বাস্তবে এই দুটি বাক্য একে অপরের বিরোধী নয়।
বরং তারা একই অর্থনীতির দুটি ভিন্ন বাস্তবতার প্রতিফলন।
এই দুই বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য কোথায়, কীভাবে তৈরি হয়, এবং কেন এই ব্যবধানই বাংলাদেশের শ্রমবাজার, শিল্পায়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে
পর্ব-২: –
১৩.
চাকরির বাজার আর ট্যালেন্টের বাজার—এক নয়
বাংলাদেশে কর্মসংস্থান, বেকারত্ব কিংবা দক্ষ জনবলের সংকট নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা প্রায়শই একটি মৌলিক ভুল করি। আমরা ধরে নিই Job Market এবং Talent Market একই জিনিস। অথচ বাস্তবে এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাজার, ভিন্ন নিয়মে পরিচালিত হয়, ভিন্ন ধরনের চাহিদা তৈরি করে এবং ভিন্ন ধরনের সংকটের জন্ম দেয়।
এই দুটি বাজারের পার্থক্য না বুঝলে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বাস্তবতা, শিল্পখাতের দক্ষ জনবলের সংকট কিংবা শিক্ষিত বেকারত্ব—কোনোটিই পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
জব মার্কেট কী?
Job Market বা চাকরির বাজার হলো সেই অর্থনৈতিক ক্ষেত্র, যেখানে চাকরি একটি পণ্য, আর নিয়োগদাতা ও চাকরিপ্রার্থী তার প্রধান অংশগ্রহণকারী।
এই বাজারে মূল প্রশ্নগুলো হলো—
- কতটি চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে?
- কোন খাতে চাকরি বাড়ছে?
- কোন খাতে চাকরি কমছে?
- কোন অঞ্চলে নিয়োগ বেশি?
- বেতন কত?
- বেকারত্বের হার কত?
অর্থাৎ Job Market মূলত Employment-কেন্দ্রিক।
এখানে সাফল্যের সূচক হলো—কত মানুষ কাজ পেলেন।
ট্যালেন্ট মার্কেট কী?
Talent Market সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ধারণা।
এখানে প্রতিযোগিতা চাকরির জন্য নয়; দক্ষতা, সক্ষমতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা এবং সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা নিয়ে।
এই বাজারে মূল প্রশ্নগুলো হলো—
- প্রতিষ্ঠান কি প্রয়োজনীয় দক্ষ মানুষ পাচ্ছে?
- বিশ্ববিদ্যালয় কি শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী মানুষ তৈরি করছে?
- ভবিষ্যতের প্রযুক্তি মোকাবিলার মতো Talent তৈরি হচ্ছে কি?
- একটি দেশের Human Capital কতটা প্রতিযোগিতামূলক?
অর্থাৎ Talent Market মূলত Capability-কেন্দ্রিক।
এখানে সাফল্যের সূচক শুধু চাকরি নয়; বরং উৎপাদনশীলতা (Productivity), উদ্ভাবন (Innovation), নেতৃত্ব (Leadership) এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা (Competitiveness)।
একই দেশে চাকরি থাকতে পারে, কিন্তু ট্যালেন্ট নাও থাকতে পারে
এই কথাটি প্রথম শুনলে অনেকের কাছে পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—
একটি প্রতিষ্ঠানে হয়তো ২০০টি পদ খালি রয়েছে। একই সময়ে হাজার হাজার মানুষ চাকরি খুঁজছেন।
তাহলে প্রশ্ন হলো—চাকরি আছে, মানুষও আছে। তবুও নিয়োগ হচ্ছে না কেন?
উত্তরটি সংখ্যার মধ্যে নয়; উত্তরটি দক্ষতার মধ্যে।
প্রতিষ্ঠান মানুষ খুঁজছে না। প্রতিষ্ঠান খুঁজছে সঠিক মানুষ।
অন্যদিকে চাকরিপ্রার্থীরা চাকরি খুঁজছেন, কিন্তু বাজার যে ধরনের দক্ষতা চাইছে, তাদের অনেকের সেই দক্ষতা নেই।
এই বিচ্ছিন্নতাকেই বলা হয় Skill Mismatch। আর যখন এই Skill Mismatch দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তখন সেটি Talent Crisis-এ রূপ নেয়।
আবার উল্টো ঘটনাও ঘটে
শুধু প্রতিষ্ঠান Talent না পাওয়ার সমস্যায় পড়ে, তা নয়। অনেক সময় অসাধারণ দক্ষ মানুষও উপযুক্ত কাজ পান না।
কারণ অর্থনীতি হয়তো এখনো সেই ধরনের উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্প (High Value Industry) তৈরি করতে পারেনি।
ফলে একজন দক্ষ গবেষক, Data Scientist, Semiconductor Engineer, Biotechnologist কিংবা AI Specialist-কে হয় বিদেশে যেতে হয়, নয়তো নিজের যোগ্যতার তুলনায় কম মূল্য সংযোজনকারী কাজে যুক্ত হতে হয়।
এটি শুধু Brain Drain নয়। এটি Brain Underutilization।
অর্থাৎ, একটি দেশ তার নিজের মেধাকেই পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না।
এই দুই বাজারের Players কারা?
Job Market-এর প্রধান অংশগ্রহণকারী:
- নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান
- চাকরিপ্রার্থী
- সরকার
- চাকরির প্ল্যাটফর্ম
- নিয়োগ সংস্থা
- শ্রমবাজার
এখানে সম্পর্কটি তুলনামূলকভাবে সরল—চাকরি ↔ নিয়োগ ↔ কর্মসংস্থান
Talent Market-এর প্রধান অংশগ্রহণকারী: Talent Market অনেক বেশি জটিল। এখানে যুক্ত থাকে—
- পরিবার
- স্কুল
- কলেজ
- বিশ্ববিদ্যালয়
- Technical Institute
- Training Provider
- Corporate Learning
- HR Department
- Industry
- Professional Association
- Government
- Innovation Ecosystem
- Research Institution
- উদ্যোক্তা
- Mentor
- Technology Platform
অর্থাৎ Talent Market-এর শুরু চাকরিতে নয়। এর শুরু শৈশবের শিক্ষা, শেখার সংস্কৃতি এবং দক্ষতা উন্নয়নে।
১৪.
Talent তৈরি হয় না, গড়ে তোলা হয়:
এটি সম্ভবত পুরো আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাক্য। Talent জন্মগত হতে পারে। কিন্তু Competitive Talent কখনো জন্মগত হয় না।
এটি তৈরি হয়—
- শিক্ষা দিয়ে
- প্রশিক্ষণ দিয়ে
- কাজের অভিজ্ঞতা দিয়ে
- ভুল থেকে শেখার সুযোগ দিয়ে
- নেতৃত্বের মাধ্যমে
- গবেষণা দিয়ে
- উদ্ভাবনের সংস্কৃতি দিয়ে
যে দেশ এই Ecosystem তৈরি করতে পারে, সেই দেশই দীর্ঘমেয়াদে উচ্চমূল্যের অর্থনীতি গড়ে তোলে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোথায়?
আমাদের দেশে ডিগ্রিধারী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
কিন্তু একই গতিতে বাড়ছে না—
- Employability
- Productivity
- Innovation
- Leadership Capability
- Problem Solving
- Digital Competency
ফলে আমরা একটি অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছি।
একদিকে প্রতিষ্ঠান বলছে—”যোগ্য মানুষ পাওয়া যাচ্ছে না।”
অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ তরুণ বলছে—”চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না।”
দুই পক্ষই সত্য বলছে। কারণ তারা একই বাজারের কথা বলছে না।
একপক্ষ কথা বলছে Job Market নিয়ে। অন্যপক্ষ কথা বলছে Talent Market নিয়ে।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় অদৃশ্য Gap, আমার পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট চাকরির ঘাটতি নয়। আবার শুধু দক্ষতার ঘাটতিও নয়।
সবচেয়ে বড় সংকট হলো—Job Market এবং Talent Market-এর মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা।
একদিকে শিক্ষা ব্যবস্থা এমন মানুষ তৈরি করছে, যাদের বড় অংশের দক্ষতা শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে শিল্পখাতও এখনো পর্যাপ্ত উচ্চমূল্য সংযোজনকারী কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি, যেখানে সেই দক্ষতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে।
এই দ্বিমুখী সংকটই একই সঙ্গে সৃষ্টি করছে—
- শিক্ষিত বেকারত্ব,
- দক্ষ জনবলের সংকট,
- Skill Mismatch,
- কম উৎপাদনশীলতা,
- Brain Drain,
- এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির প্রতিযোগিতামূলক দুর্বলতা।
১৫.
কর্মসংস্থান আর মূল্য সংযোজন—দুটি এক বিষয় নয়:
আমরা প্রায়ই কর্মসংস্থানের সংখ্যা নিয়ে গর্ব করি।
অবশ্যই করা উচিত।
কিন্তু অর্থনীতির আরেকটি প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ—প্রতিটি কর্মী গড়ে কত মূল্য সৃষ্টি করছেন?
একজন সফটওয়্যার স্থপতি, একটি সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন টিম, একটি বায়োটেক গবেষণা দল কিংবা একটি AI কোম্পানির শতজন কর্মী যে পরিমাণ অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারেন, অনেক সময় তা হাজার হাজার নিম্নমূল্যের শ্রমঘন চাকরির সম্মিলিত মূল্যকেও অতিক্রম করে।
তাই ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে শুধু Employment Growth নয়, Productivity Growth-ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের Talent Crisis আসলে কোথায়?
আমি জানি না, কতজন একমত হবেন, বা, এই বক্তব্যটি কতটা জেনারেলাইজড মনে হবে। Talent অথবা, Innovation এর যেকোনো একটির বা দুটিরই ওপর সম্ভবত একটি বা একাধিক বিশ্ব র্যাংকিং হয়, যেখানে সাম্প্রতিক জরিপে বাংলাদেশ অনেক পেছনে আছে বলে দেখানো হয়েছে।
Global Innovation Index (GII) 2024–ইউনাইটেড নেশনস (WIPO) অনুসারে:
Innovation Ranking: বাংলাদেশ 132টি দেশের মধ্যে 106 তম;
Human Development Index: বাংলাদেশ 193টি দেশের মধ্যে 130 তম;
Innovation Inputs (Institution, Human Capital, R&D ইত্যাদি): 114তম;
Innovation Outputs (Technology, Creative Outputs): 89তম;
Human Capital & Research: 128 তম;
আরেকটি (আনঅফিশিয়াল) জরিপ বলছে IQ Ranking: বাংলাদেশ199টি দেশের মধ্যে 150 তম;
ইন জেনারেল বা ওভারঅল মেধার স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে-এমনটাই ওই রেটিংয়ে দৃশ্যমান। এই দেশে মেধাশূন্যতার ভয়াবহ অভিঘাত আপনি টের পান কি? আমি তো পাচ্ছি। না পেলে আপনি হয় বোকা, নয় তো অতি সরল বান্দা। হ্যা, অবশ্যই তাহলে আপনি সুখী মানব।
তবে, সত্যি করে ভাবুন তো, মেধার উন্মেষ ঘটাবার কয়টা প্রক্রিয়া আমরা সৃষ্টি, বিকাশ ও বিস্তার করেছি? অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হল, আমাদের একাডেমিক শিক্ষা কার্যক্রম (কোর্স, কারিক্যুলাম, সিস্টেম, প্রাকটিস, কালচার, প্রসিডিওর সবকিছু মিলে) বুদ্ধিমত্তা ও মানবিকতাকে প্রমোট করছে না।
বরং, আমার মনে হয়, পারিবারিক বিন্যাস, কার্যক্রম, লাইফস্টাইল এবং তার সাথে একাডেমী-আমাদের শিক্ষার্থীদের জাতিগত সমষ্টিক বুদ্ধিমত্তা দিনে দিনে কমিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রায়ই বলা হয়—”যোগ্য লোক পাওয়া যাচ্ছে না।”
অন্যদিকে তরুণরা বলেন—”চাকরি নেই।”
এই দুই বক্তব্যের কোনোটিই পুরোপুরি ভুল নয়।
বরং দুটিই একই বাস্তবতার দুটি ভিন্ন দিক।
সমস্যা হলো, আমরা এখনো এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারিনি, যেখানে—
- শিক্ষা ব্যবস্থা শিল্পের ভবিষ্যৎ চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে,
- গবেষণা ও শিল্পের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ থাকে,
- বিশ্ববিদ্যালয় নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে,
- এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে Talent তৈরি ও ধরে রাখে।
ফলে ডিগ্রি বাড়ছে, কিন্তু Competency সেই হারে বাড়ছে না।
১৬.
Innovation ছাড়া Talent Economy তৈরি হয় না:
আজকের বিশ্বে সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক দেশগুলোকে যদি বিশ্লেষণ করা হয়, একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে-তারা শুধু পণ্য উৎপাদন করে না।
তারা জ্ঞান উৎপাদন করে। তারা প্রযুক্তি তৈরি করে। তারা গবেষণায় বিনিয়োগ করে।
তারা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পকে একসঙ্গে কাজ করায়। তারা উদ্ভাবনের জন্য ঝুঁকি নেয়।
বাংলাদেশ এখনও সেই জায়গা থেকে অনেক দূরে। সাম্প্রতিক Global Innovation Index-এ বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থানই তার সাক্ষ্য বহন করছে । বিশেষ করে Human Capital & Research, University–Industry Collaboration, Business Sophistication এবং Science & Engineering Talent—এই সূচকগুলোতে আমাদের অবস্থান উদ্বেগজনক।
অন্যদিকে শ্রম উৎপাদনশীলতার উন্নতিতে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি থাকলেও তা এখনও একটি পূর্ণাঙ্গ Innovation Ecosystem গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট নয়।
এটি শুধু একটি র্যাংকিংয়ের বিষয় নয়। এটি আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির সক্ষমতার প্রশ্ন।
Talent Crisis মানে শুধু দক্ষ কর্মীর সংকট নয়।
আমরা Talent বলতে প্রায়ই শুধু দক্ষ কর্মী বুঝি। আসলে Talent Economy অনেক বড় একটি ধারণা।
এখানে প্রয়োজন-দক্ষ প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, উদ্ভাবক, ডিজাইনার, Data Scientist, AI Specialist, উৎপাদন ব্যবস্থাপক, বিশ্বমানের HR Leader, উদ্যোক্তা,
- এবং এমন নেতৃত্ব, যারা ভবিষ্যৎকে কল্পনা করতে পারে।
এই মানুষগুলো কোনো একদিনে তৈরি হয় না।
তাদের জন্য প্রয়োজন বহু বছরের বিনিয়োগ, শিক্ষা, গবেষণা, শিল্পনীতি এবং শেখার সংস্কৃতি। কিন্তু এখানে তৈরী হচ্ছে কিছু প্রশাসক, কিছু আমলা, কিছু নিয়ন্ত্রক, কিছু চাকরিজীবি, কিছু অতিরিক্ত সহকারী সচিব।
পর্ব–৩: –
১৭.
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড RMG—কিন্তু ভবিষ্যতের ইঞ্জিন কী?
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করলে Ready-Made Garments (RMG)-এর কথা না বললে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। স্বাধীনতার পর গত চার দশকে দেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, নারীর কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য হ্রাস এবং বৈশ্বিক উৎপাদন শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান তৈরিতে RMG শিল্পের অবদান অনস্বীকার্য। বর্তমানে দেশের পণ্য রপ্তানির বড় অংশই এই শিল্প থেকে আসে এবং এটি এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জীবিকার উৎস।
কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে—যে শিল্প অতীতের উন্নয়নের প্রধান চালিকা শক্তি ছিল, সেটি কি ভবিষ্যতের উন্নয়নেরও প্রধান চালিকা শক্তি হতে পারবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আবেগ নয়, অর্থনীতির কাঠামো দিয়ে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই শিল্পের অবদান ঐতিহাসিক।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, RMG মূলত একটি Labour-intensive Industry।
অর্থাৎ এর প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে এসেছে তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়, বৃহৎ শ্রমশক্তি এবং উৎপাদন সক্ষমতা থেকে।
সমস্যা এখানেই।
বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে Labour Economy থেকে Knowledge Economy-তে রূপান্তরিত হচ্ছে।
প্রতিযোগিতা এখন শুধু কে কম খরচে উৎপাদন করতে পারে, সেটি নয়; বরং কে বেশি উদ্ভাবন করতে পারে, কে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে, কে অধিক মূল্য সংযোজন করতে পারে এবং কে বিশ্বমানের Talent তৈরি করতে পারে—সেটিই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে।
গার্মেন্টস কি আসলেই অর্থনীতির প্রধান মেরুদণ্ড? একটি জনপ্রিয় মিথ বনাম বাস্তবতার বি্শ্লেষন দেখা যাক।
আমাদের মগজে গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে তৈরি পোশাক খাত বা আরএমজি (RMG)-ই বাংলাদেশের অর্থনীতির একমাত্র লাইফলাইন। কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় কস্ট-বেনিফিট অ্যানালিসিস করলে এই সত্যের পেছনের তুলনামূলক সত্যটা দৃষ্টিগোচর হবে।
বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে মাসে গড়ে প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের (বছরে প্রায় ৪৫ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলার) তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। দেখতে বিশাল মনে হলেও, এই আয়ের ৪৫% থেকে ৬০% টাকাই ‘ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি’ (Back-to-Back LC)-র মাধ্যমে সুতা, তুলা, কাপড়, কেমিক্যাল ও অ্যাক্সেসরিজ আমদানির খরচ হিসেবে বিদেশে চলে যায়। অর্থাৎ, নেট ভ্যালু অ্যাডিশন আর নেট লাভ অর্ধেকেরও কম। উল্লেখ্য, গারমেন্ট সেক্টরের মোট উৎপাদন, মোট রপ্তানী, মোট ভ্যালু অ্যাডিশন, মোট এলসি ক্লিয়ারেন্স এমাউন্ট তথা আমদানি ব্যয়-এ সংক্রান্ত ডেটা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও ইপিবি’র সংকলিত ডেটার মধ্যে একবার বড় রকম গড়মিল বা সামঞ্জস্যহীনতার জেরে বেশ কিছু মাস মাসিক ডেটা প্রকাশ বন্ধ রাখা হয়।
পরবর্তিতে ডেটা সমন্বয় করে আবার প্রকাশ করা হতে থাকে। তারপরও, এলসির মূল্য হিসেবে আমদানি মূল্য হিসেবে বাইরে কতটা চলে যায়, স্থানীয় বাজার হতে লোকাল ভ্যালু অ্যাডিশন বা লোকাল ইমপোর্ট কতটা, আবার, শুধুমাত্র এক্সপোর্ট করে যেসব ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ কারখানা, তাদের উৎপাদনের কত অংশ এক্সপোর্ট, কতটা স্থানীয় সেল, আবার, স্থানীয় সেলের কাঁচাপণ্য যদি বন্ডের অধীনে এক্সপোর্টার কারখানায় সেল হয়, সেটিকে এক্সপোর্ট হিসেবে দেখা হবে, নাকি লোকাল ভ্যালূ অ্যাডিশন-এই নিয়ে আমাদের পুরো সেক্টরের ডেটা ইকোসিস্টেম নিয়ে আরও গভীরে কাজ করবার আছে।
রিয়েলটাইম ডেটা গ্যদারিং, এনালিসিস ও ডিসিশন মেকিং করতে না পারলে দিন দিন প্রতিষ্ঠানগুলোর কমপেটিটিভনেস কমে যাবে নিশ্চিতভাবে। দুর্বলরা ঝরে পড়তে থাকবে। সত্যি বলতে, গারমেন্ট নিয়ে সবচেয়ে গভীর ও দরকারী গবেষনাটা আসলে খুব একটা হয় নাই। রিয়েল টাইম ফ্লো মনিটরিং, সেগমেন্ট টু সেগমেন্ট ট্র্যাকিং ও এনালিসিস। আমাদের হাতে ডেটা ও তার এনালিসিস খুব একটা নেই। অনেকটা আন্দাজেই সব চলে। অথচ, সত্যিই, কত কিছুতে হাত দেবার স্কোপ ছিল।
রেমিট্যান্সের সলিড শক্তি:
অন্যদিকে, আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ মাসে গড়ে প্রায় ২.৫ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার (অর্থবছর ২০২৪-২৫ এ যা রেকর্ড ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে)। এই রেমিট্যান্স হলো ১০০% সলিড ক্যাশ! এর জন্য কোনো কাঁচামাল আমদানি করতে হয় না, কোনো ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি লাগে না।
তাহলে সত্যিকারের বড় খাত ও দেশের অর্থনীতির আসল সলিড মেরুদণ্ড কে?
নিছক ব্র্যান্ডিং জায়ান্ট গার্মেন্টস, নাকি গায়ের ঘাম রক্ত জল করা রেমিট্যান্স যোদ্ধা? উত্তরটা সংখ্যার ভেতরেই স্পষ্ট।
হ্যা, প্রবাসী কর্মী বিদেশে উপার্জন করছে; দেশে উৎপাদন করছে না। তাই অর্থনীতিবিদরা রেমিট্যান্সকে “net foreign exchange inflow” বলবেন, “free money” বলবেন না।
আবার, গারমেন্ট সেক্টরের অবদানের বিষয়টা কি তাহলে স্রেফ মিথ?
না, অবশ্যই না। পপুলার ন্যারেটিভে গারমেন্ট খাতকি নিয়ে যেসব অতি নেগেটিভ ও অতি পজেটিভ চিত্র প্রদর্শন হয়, সত্যিটা তার চেয়ে অনেক বেশি রিলেটিভ। গারমেন্টের বিশাল এক্সপোর্ট আর্নিং বা ফরেন কারেন্সি ইনফ্লো তো মিথ্যা নয়। আবার, শুধুমাত্র সলিড বা নেট ইনকাম তত্বের ওপর ম্যাক্রো ইকোনমি চলে না। তার হিসেব নিকেশ আরও বিস্তৃত ও জটিল। তার চেয়েও বড় কথা হল, আমাদের মোট রপ্তানী আয়ের ৮২% এরও বেশি আসে গারমেন্ট এক্সপোর্ট হতে। RMG কে বলা চলে আমাদের প্রধান রপ্তানি মেরুদণ্ড। বিশেষ করে পাট শিল্পের পতনের প্রেক্ষাপটে যখন আমাদের সামনে কিছুই ছিল না, সেই শূন্যতার প্রেক্ষাপটে গারমেন্ট উদ্যোক্তা ও এ খাতের বিপুল কর্মীবাহিনী নিরবে ও আনসাঙ মোডে একটা বিশাল শূন্যস্থান পূরণ করেছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি মানুষকে প্রোভাইড করেছে এই খাত। বিগত দুই আড়াই দশক যেখানে অন্য যেকোনো ম্যানুফ্যাকচারিং খাত খুব বেশি বাড়েনি, সেখানে এই একটা খাতই ম্যানুফ্যাকচারিং-এক্সপোর্ট দুটি দিককেই সামলেছে, বিশাল গ্যাপ পূরণ করেছে। সেই ক্রেডিট সে পাবেই।
মূলত বিশাল রপ্তানী আয়, রেশিও স্টেকে দৈত্যাকার শেয়ার আর বিপুল কর্মসংস্থানই গারমেন্ট খাতের সপক্ষের ন্যারেটিভের মূল। আর, উন্নয়ন অর্থনীতিবীদ ও সমাজবিজ্ঞানীদেরও মত হল, বাংলাদেশের মতো প্রচন্ড জনবহুল দেশগুলোতে উন্নয়ন হতে হবে পিপল এনগেজিং। মানে, এমন খাত উন্নয়ন, যেখানে প্রচুর মানুষ এনগেজ করা যায়। হাইটেক ইন্ডাস্ট্রি, যেখানে অল্প মানুষ অধিক দামী পণ্য বানান, সেটার চেয়ে প্রচুর মানুষ যে কাজে এনগেজ করা যায়-সেটাই জনবহুল দেশের জন্য বেশি কাম্য। বিভিন্ন মন্দাকালীন সময়ে সরকারকে যে দেখবেন, চাল-ডাল বা কাবিখা কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে বাঁধ মেরামত, রাস্তাঘাট মেরামতের কাজ ম্যানুয়ালি করানোর স্ট্রাটেজি নিতে। ওর ভেতরেও এই সূত্র লুকোনো আছে-মানুষকে এনগেজ রাখতে হবে।
১৮.
গার্মেন্টস খাতের অভ্যন্তরীণ জ্যামিতি ও কারখানা বন্ধের পেছনের দৃশ্য:
বাংলাদেশ থেকে মূলত ওভেন (Shirt, Pants, Denim) এবং নিটওয়্যার (T-shirt, Polo shirt) প্রডাক্ট রেঞ্জ বেশি এক্সপোর্ট হয়, যার সাথে যুক্ত আছে সোয়েটার। তৈরি পোশাক খাত বলতে কেবল একটি সেলাই কারখানা বোঝায় না। এর ভেতরে রয়েছে বিশাল এক ইকোসিস্টেম ও কারখানার প্রকারভেদ:
কারখানার বৈচিত্র্য: ওভেন, নিট, সোয়েটার, ডাইং অ্যান্ড ওয়াশিং, এক্সেসরিজ (বোতাম, জিপার, কার্টন), এবং টেক্সটাইল (ফ্যাবরিক প্রোডিউসার) বা স্পিনিং (সুতা উৎপাদক)’র মতো ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ কারখানা—সবগুলোই এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। তবে আমাদের সামাজিক গণমানষে খুব পপুলারলি গারমেন্ট বলতেই কেবল কাট টু প্যাক সুইং কারখানাগুলোকেই ধরে নেয় সবাই। বেতন দেয় না-গারমেন্ট, বোনাস মেরে দেয়-গারমেন্ট, নারী শ্রমিকের ওপর বৈষম্য বা হয়রানি করে-গারমেন্ট। অথচ, ওই দলে কত জন আছে, সত্যি সত্যি কতগুলো ঘটনা ঘটে, সেটা কোন ধরনের কারখানা-কে জানতে চায়? মনগড়া ডেটা আর টেবিল মেড রিপোর্টের সাথে যখন ক্লিকবেইট ও ফুটেজ পাবার ধান্দা যোগ হয়ে গণমাধ্যম চলে, তখন সত্য কিছু পাওয়ার আশা কঠিন।
শ্রেণিবিভাগ: এই খাতে তিন ধরনের কারখানা দৃশ্যমান—শতভাগ কমপ্লায়েন্ট এবং রেজিস্টার্ড’এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড জায়ান্ট’, মাঝারি মানের সাব-কন্ট্রাক্টিং ও ‘নন-এক্সপোর্ট’ কারখানা, এবং এককালের অন্ধকার ও অস্বাস্থ্যকর’সোয়েট শপ’ (Sweat Shop)।
কারখানা বন্ধের মিথ বনাম রিয়েল ডাটা:
প্রায়ই পেপারে হেডলাইন হয়—”হতাশায় গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, লাখো শ্রমিক বেকার”। কিন্তু বিজিএমইএ (BGMEA)-র তথ্য (জানুয়ারি ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫—এই ১৫ মাস) বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন এক ‘ক্লিনজিং প্রসেস’ বা রূপান্তর চোখে পড়ে:
এই ১৫ মাসে ১১৩টি গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়েছে, যার ফলে প্রায় ৯৬,১০৪ জন শ্রমিক সাময়িকভাবে চাকরি হারিয়েছেন।
কিন্তু ঠিক একই সময়ে ১২৮টি সম্পূর্ণ নতুন আধুনিক কারখানা বিজিএমইএ-র সদস্যপদ নিয়ে চালু হয়েছে, যা নতুন করে ৭৪,০৮১ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে।
এর মানে কী? এর মানে দাড়ায়, এই খাতের আকার সেই অর্থে কমছে না, বরং রূপান্তরিত হচ্ছে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর থেকে গত এক দশকে কমপ্লায়েন্সের চাপ নিতে না পেরে ছোট, অনুন্নত, ভাড়াবাড়িতে চলা এবং নন-কমপ্লায়েন্ট সোয়েট শপগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেছে। কোভিড ও পরবর্তি সময়ের ধাক্কায় এরা আরও বড় আকারে ফেইজ আউট হয়েছেন। কিন্তু এই খাতের বড় জায়ান্টরা (যেমন: হা-মীম, এনভয়, ডিবিএল, প্যাসিফিক জিন্স) কিন্তু ছোট বা বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে তারা কেন আরও উল্লম্বভাবে (Vertically) ডাইভারসিফাইও করেনি? বা, বিগত ২৫ বছরে প্রথম বিশ বছরের মতো বিদ্যুৎ গতিতে সেক্টরের আকার বাড়েনি। এটাও একটা লক্ষনীয় ট্রেন্ড।
খুব সম্ভবত এ খাতে বিনিয়োগ বা শিল্পের আকার কমেনি; বরং খাতটি এখন অল্প সংখ্যক কারখানায় বেশি এক্সপোর্ট, বেশি দক্ষতা এবং বেশি অটোমেশনের দিকে ঝুঁকছে। আগে যে কাজ করতে ১০ জন শ্রমিক লাগত, আধুনিক জ্যাকার্ড, অটো-স্প্রেডার, অটো-কাটার কিংবা অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে এখন সেই একই কাজ ৩ জন মানুষ দিয়েই সম্পন্ন করা সম্ভব। যেখানে আগে ৫ হাজার কারখানা মিলে যে পরিমাণ ব্যবসা পরিচালনা করত, আজ হয়তো ৪ হাজার কারখানাই একই ভলিউমের ব্যবসা পরিচালনা করছে। অথবা, ব্যবসাটা অধিক সংখ্যক কোম্পানীর বদলে অল্প সংখ্যকের হাতে গেছে। বছর বছর কারখানার সংখ্যা ও শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে বলেই অধিকাংশ তথ্যের সোর্স বলছে। তবে তার বিপরীতে উৎপাদন ও রপ্তানীর ভল্যিউম বেড়েছে। এই বৈপরীত্যের পেছনে অনেকগুলো ফ্যক্টর দায়ী হয়ে থাকতে পারে-
ক. কারখানার সংখ্যা কমেছে কিন্তু, মোট সুইং বা মেকিং ক্যাপাসিটি বেড়েছে। হয় লাইন বেড়েছে অথবা কারখানার ইফিশিয়েন্সিতে বুম হয়েছে।
খ. ওভারঅল কর্মঘন্টা বেড়েছে। সেটা ওভারটাইমও হতে পারে, আবার, ওয়েস্টেজ সময়ও কমে থাকতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিরতা কম থাকরে উৎপাদন সময় বাড়ে।
গ. শ্রমিক সংখ্যা হয়তো কমেছে, অটোমেশন বেড়েছে। ঘ. আবার, রপ্তানীর ভল্যিউম ওভারঅল বেড়েছে। আবার, কখনো কখনো রপ্তানী কমলেও রপ্তানী আয় বেড়েছে। তাতে আবার প্রতীয়মান হয়, যে, ওভারঅল বেশি দামের প্রোডাক্ট উৎপাদনের ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশের লেবার ডেমোগ্রাফি ও জব মার্কেটের নানা ডেটার প্রবল ঘাটতির বাস্তবতার মুখেও একটি ধারনা আমার খুব প্রবলভাবে মনে হয়।
খুব শিগগীরই, দেশের বিপুল বেকারত্বের বাস্তবতা সত্ত্বেও, কর্পোরেট হাউসগুলো, এবং গারমেন্টসগুলো যথেষ্ট সংখ্যক জব সিকার বা জব অ্যাপ্লিক্যান্ট পাবে না। মানে অ্যাপ্লিক্যান্ট খরা যাকে বলে। শুনতে উদ্ভট শোনালেও আশঙ্কা একদম উড়িয়ে দেবেন না।
শুধুমাত্র টিকটক, রিলস, কনটেন্ট ক্রিয়েট করে, অথবা রাজনৈতিক ধান্দাবাজি হতে যদি পয়সা আয় করা যায় বেশুমার, তাহলে তরুণ জনগোষ্ঠী পড়াশোনা কেনই বা করবে, আর, করুক না করুক, কেন এসব ফরমাল জবে আসতে আগ্রহ পাবে?
অলরেডি কর্পোরেট হাউসগুলো পিওন, মেসেঞ্জার, রানার, অপারেটর, ক্লিনার টাইপের মানুষ পাচ্ছে না। গারমেন্টসগুলো অপারেটর পাচ্ছে না। ড্রাইভার পাওয়া যাচ্ছে না মনমতো। পেলেও তারা উড়ছে দ্রূত। কারন, বাজারে জব আছে।
গারমেন্টস, যেখানে সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে বলে আসা হয়েছে, যে, এখানে ৮০% মেয়েরা কাজ করে, বাস্তবতা হল, ২০২৬ সালে, সেখানে প্রায় ৫০/৫০ ছেলে ও মেয়ে। এই বাকি ৩০% মেয়ে কোথায় গেল?
আবার, গারমেন্টসের কর্মীর ওভারঅল ওই ৫০/৫০ রেশিও হলেও, স্টাফ লেভেলে তাদের রেশিও ১-২%। মানে, গারমেন্ট স্টাফরা একচেটিয়াভাবে ছেলে বা পুরুষ। তাহলে, ওই ৫০% নারী কর্মীরা যাচ্ছেন কোথায়? একই জবে থাকছেন? তাদের গ্রোথ হচ্ছে না? নাকি তারা একটা সময় পরে সিনিয়রশিপ এনরোল না করে ঝরে যাচ্ছেন?
সব মিলিয়ে আমাদের শ্রমবাজারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি শুধুমাত্র কর্মসংস্থানের সংখ্যা নয়; বরং কর্মসংস্থানের প্রকৃতিও। বাজার এখন ধীরে ধীরে “More Jobs” থেকে “Better Skills” এর দিকে সরে যাচ্ছে। যে ব্যক্তি পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারবে, তার জন্য সুযোগ থাকবে। আর যে পারবে না, তার জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়বে।
১৯.
Automation কি RMG-এর জন্য হুমকি?
অনেকেই মনে করেন, Automation মানেই কর্মসংস্থান কমে যাবে।
বাস্তবতা আরও জটিল।
Automation কিছু কাজ কমাবে, আবার নতুন ধরনের কাজও তৈরি করবে।
কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—
যে দেশ শুধু সস্তা শ্রমের ওপর প্রতিযোগিতা করবে, সেই দেশের জন্য Automation বড় চ্যালেঞ্জ।
আর যে দেশ দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের ওপর প্রতিযোগিতা করবে, Automation তার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি RMG থাকবে কি থাকবে না—এটি নয়।
প্রশ্নটি হলো—RMG-এর পাশাপাশি আগামী ২০ বছরে বাংলাদেশের দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ Growth Engine কী হবে?
যদি সেই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজি, তাহলে কর্মসংস্থান বাড়লেও উচ্চমূল্যের Talent Economy তৈরি হবে না।
আর যদি Talent Economy তৈরি না হয়, তাহলে Job Market বড় হলেও দেশের সামগ্রিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা সীমাবদ্ধই থেকে যাবে।
এই কারণেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন কারখানা নির্মাণে নয়; বরং নতুন জ্ঞান, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন Talent তৈরির ওপর নির্ভর করবে।
পর্ব–৪: –
২০.
বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়নের রূপরেখা: চাকরি নয়, সক্ষমতা তৈরির সময়
এই লেখার শুরুতে আমরা একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলাম—
কেন একই সময়ে বাংলাদেশে একদিকে হাজার হাজার মানুষ চাকরি খুঁজছে, অন্যদিকে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান বলছে তারা যোগ্য মানুষ খুঁজে পাচ্ছে না?
চারটি পর্বের আলোচনার শেষে হয়তো এখন বলা যায়—এটি কোনো পরস্পরবিরোধী বাস্তবতা নয়।
বরং এটি একই অর্থনীতির দুটি ভিন্ন সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
একদিকে Job Market পর্যাপ্ত মানসম্পন্ন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না।
অন্যদিকে Talent Market শিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত Competency তৈরি করতে পারছে না।
আর এই দুই সংকটের মাঝখানেই আটকে আছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: আগামী দশ বছরে বাংলাদেশ কেমন অর্থনীতি হতে চায়?
একটি স্বল্প মজুরিভিত্তিক শ্রমনির্ভর অর্থনীতি? নাকি একটি দক্ষতা, জ্ঞান ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কী শেখাবে। আমাদের শিল্প কী ধরনের মানুষ নিয়োগ করবে। HR বিভাগ কীভাবে Talent তৈরি করবে। সরকার কোন খাতে বিনিয়োগ করবে।
এবং সবচেয়ে বড় কথা—আমাদের তরুণরা আগামী বিশ বছরে নিজেদের কীভাবে প্রস্তুত করবে।
আমাদের শিক্ষা, চাকরির বাজার এবং ট্যালেন্ট মার্কেট যেন বিচ্ছিন্ন তিনটি জগতের গল্প।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বর্তমান সংকটের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হয়তো দক্ষ মানুষের ঘাটতি নয়; বরং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ জগতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা।
প্রথমটি—শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ তৈরি হওয়ার কথা।
দ্বিতীয়টি—Job Market, যেখানে মানুষ কাজ খুঁজতে আসে।
তৃতীয়টি—Talent Market, যেখানে প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা ও শিল্পখাত ভবিষ্যতের সক্ষমতা খোঁজে।
দুঃখজনকভাবে, এই তিনটি জগত প্রায়ই আলাদা আলাদা পথে হাঁটে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাঠ্যক্রম তৈরি করে অনেক সময় বাস্তব শিল্প ও শ্রমবাজারের পরিবর্তন সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছাড়াই।
অন্যদিকে উদ্যোক্তা ও নিয়োগকারীরা প্রায়ই অভিযোগ করেন—যোগ্য মানুষ পাওয়া যায় না; কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই তাঁরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলেন বা ভবিষ্যতের দক্ষতার চাহিদা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেন।
ফলে একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে, অন্যদিকে শিল্পখাত হাজার হাজার দক্ষ কর্মী খুঁজছে। এই দুই বাস্তবতা পরস্পরের বিপরীত নয়; বরং একই বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থার দুটি ফল।
তবে এই সমস্যার শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়। এর শুরু আরও আগে।
আমাদের স্কুল শিক্ষায় শিশুকে খুব ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়—ভালো ফলাফল করো, ভালো কলেজে ভর্তি হও, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো, তারপর একটি “ভালো চাকরি” খুঁজে নাও।
খুব কম ক্ষেত্রেই তাকে শেখানো হয়—
কীভাবে সমস্যা চিহ্নিত করতে হয়।
কীভাবে নতুন কিছু তৈরি করতে হয়।
কীভাবে ঝুঁকি নিতে হয়।
কীভাবে একটি উদ্যোগ শুরু করতে হয়।
কীভাবে মূল্য (Value) সৃষ্টি করতে হয়।
অর্থাৎ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ এখনও চাকরি খোঁজার মানসিকতা (Job-Seeking Mindset) গড়ে তোলে; কাজ সৃষ্টি করার মানসিকতা (Job-Creating Mindset) নয়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এটি কোনো শিক্ষক, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়। এটি একটি System Design Problem।
যেখানে—
শিক্ষা নীতি একদিকে এগোয়,
শিল্পনীতি আরেকদিকে,
মানবসম্পদ পরিকল্পনা তৃতীয়দিকে,
আর উদ্যোক্তাদের বাস্তব চাহিদা চতুর্থদিকে।
ফলে জাতীয় পর্যায়ে এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না, যেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত, উদ্যোক্তা, নিয়োগকারী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকেরা নিয়মিতভাবে একসঙ্গে বসে ভবিষ্যতের দক্ষতা, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের রূপরেখা নির্ধারণ করেন।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে দক্ষ পরীক্ষার্থী, দক্ষ কর্মকর্তা, দক্ষ আমলা, কিংবা দক্ষ ম্যানেজার** তৈরির দিকে বেশি মনোযোগী।
কিন্তু আগামী অর্থনীতির জন্য আমাদের আরও বেশি প্রয়োজন—
উদ্যোক্তা,
উদ্ভাবক,
গবেষক,
প্রযুক্তিবিদ,
সমস্যা-সমাধানকারী,
ডিজাইনার,
পণ্য নির্মাতা,
এবং এমন মানুষ, যারা শুধু বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানে কাজ করবে না; বরং নতুন প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলবে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই Labour Economy থেকে Talent Economy-তে রূপান্তরিত হতে চায়, তাহলে শুধু পাঠ্যবই বদলালেই হবে না।
বদলাতে হবে শিক্ষা দর্শন।
বদলাতে হবে সাফল্যের সংজ্ঞা।
আর সবচেয়ে বেশি বদলাতে হবে শিক্ষা, শিল্প এবং রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের এই বিচ্ছিন্ন সম্পর্ক।
শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন কোথায় হওয়া উচিত?
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে আমরা শিক্ষাকে চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখেছি।
কিন্তু ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে শিক্ষা হবে সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা তৈরির মাধ্যম।
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু Degree Factory হতে পারে না।
তাদের হতে হবে—
Knowledge Creator Research Hub Innovation Centre Leadership Incubator Industry Partner
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু কতজন গ্র্যাজুয়েট বের হলো, সেটি দিয়ে বিচার করা উচিত নয়।
বরং বিচার করা উচিত—কতজন নতুন ধারণা তৈরি করল। কতজন উদ্যোক্তা তৈরি হলো। কতজন বিশ্বমানের গবেষক তৈরি হলো। কতজন শিল্পকে বদলে দিল।
শিল্পখাতেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের কর্পোরেট জগতও অনেক সময় একটি বড় ভুল করে।
আমরা প্রায়ই বলি—”যোগ্য মানুষ পাওয়া যায় না।”
কিন্তু খুব কম প্রতিষ্ঠান প্রশ্ন করে—আমরা কি যোগ্য মানুষ তৈরি করছি?
বিশ্বের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু Talent Recruit করে না। তারা Talent Build করে।
Leadership Build করে। Capability Build করে। Learning Culture Build করে।
আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে সফল প্রতিষ্ঠানগুলো Training-এ খরচকে Cost হিসেবে দেখে না।
Investment হিসেবে দেখে।
সরকারের ভূমিকাও বদলাতে হবে। শুধু শিল্প তৈরি করলেই হবে না। শুধু রাস্তা, সেতু কিংবা অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করলেই হবে না।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে—
তার Human Capital।
তার Innovation Capacity।
তার Research Ecosystem।
তার উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষমতা।
তার শিক্ষা ব্যবস্থা।
তার নীতি।
এবং সবচেয়ে বেশি—
তার মানুষের শেখার সংস্কৃতি।
২১.
তরুণদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা:
আজকের তরুণদের কাছে আমার সবচেয়ে বড় অনুরোধ—
শুধু চাকরি খুঁজবেন না।
নিজেকে এমন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন, যাকে বাজার খুঁজবে।
কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে Degree-এর চেয়ে Skill বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
Skill-এর চেয়ে Learning Ability বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আর Learning Ability-এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে—
নিজেকে পরিবর্তন করার ক্ষমতা।
যে মানুষ শেখা বন্ধ করবে, সে পিছিয়ে পড়বে।
যে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলবে, ভবিষ্যৎ তারই।
২২.
বাংলাদেশের পরবর্তী উন্নয়ন কোথায়?
বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিতীয় প্রজন্মের অর্থনৈতিক রূপান্তরের সময়।
প্রথম রূপান্তর ছিল—কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্পনির্ভর অর্থনীতিতে যাত্রা।
দ্বিতীয় রূপান্তর হবে—Labour Economy থেকে Talent Economy-তে যাত্রা।
প্রথম যাত্রায় আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সস্তা শ্রম।
দ্বিতীয় যাত্রায় সবচেয়ে বড় শক্তি হবে—
দক্ষতা। জ্ঞান। প্রযুক্তি। উদ্ভাবন। নেতৃত্ব। এবং মানবসম্পদ।
২৩.
HR-এর নতুন পরিচয়:
আমার বিশ্বাস, আগামী দশ বছরে HR-এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হবে তার পরিচয়ে।
HR আর শুধু Recruitment Department থাকবে না।
HR হবে—
Business Architect
Capability Builder
Culture Designer
Leadership Developer
Change Catalyst
Human Capital Strategist
যে প্রতিষ্ঠানের HR এখনও শুধুমাত্র Leave, Attendance, Payroll এবং Recruitment-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেই প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
উপসংহার:
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো বেকারত্ব নয়।
সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো দক্ষ জনবলের ঘাটতিও নয়।
আমার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট হলো—
অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প, প্রযুক্তি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের অভাব।
যতদিন পর্যন্ত Job Market এবং Talent Market আলাদা দুই জগৎ হয়ে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত একই সঙ্গে দুই ধরনের সংবাদ আমরা শুনতেই থাকব—
“চাকরি নেই।”
এবং
“যোগ্য মানুষ নেই।”
এই দুই বাক্য পরস্পরবিরোধী নয়।
বরং তারা একই বাস্তবতার দুটি মুখ।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কোন প্রশ্নের উত্তর আগে খুঁজি তার ওপর।
আমরা কি শুধু আরও চাকরি তৈরি করতে চাই?
নাকি এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই, যেখানে চাকরি, দক্ষতা, উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা এবং মানবিক সম্ভাবনা—সবকিছু একে অপরকে শক্তিশালী করবে?
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার অবকাঠামোও নয়।
একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার মানুষ।
আর সেই মানুষ তখনই জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়, যখন শিক্ষা তাকে দক্ষতায়, দক্ষতা তাকে উৎপাদনশীলতায়, উৎপাদনশীলতা তাকে উদ্ভাবনে এবং উদ্ভাবন তাকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত করে।
বাংলাদেশের সামনে আজ সেই রূপান্তরেরই সবচেয়ে বড় আহ্বান।
#Bangladesh #BangladeshEconomy #EconomicDevelopment #DevelopmentRhetoric #CosmeticDevelopment #GDPGimmick #LabourEconomics #HREconomics #HumanCapital #Workforce #WorkforceStatistics #WorkforceDynamics #WorkforceDevelopment #WorkforcePlanning #IdleWorkforce #LabourMarket #Employment #Unemployment #JobMarket #JobHunting #JobSeeker #TalentMarket #TalentCrisis #TalentDeviation #SkillMismatch #Employability #FutureOfWork #FutureSkills #Skills #Reskilling #Upskilling #Qualification #Education #EducationReform #EnglishProficiency #GPA5 #APlus #Productivity #Innovation #ResearchAndInnovation #KnowledgeEconomy #Competitiveness #NationalCompetitiveness #IndustrialDevelopment #JobMarketSituation #FactoryClosure #Industry #RMG #GarmentIndustry #StrategicHR #HR #HRLeadership #Leadership #OrganizationalDevelopment #BusinessStrategy #Policy #DigitalTransformation #AI #SustainableGrowth #DemographicDividend #EconomicCrisis #PriceHike #LabourCrisis #LabourShortage #ScarcityOfLabour #LackOfTalent #DecliningTalent #Malnutrition #LackOfProtein #BeefPrice #ReluctanceToWork #Carnivorous #Herbivorous