Skip to content

পরচর্চার তীর্থভূমে সুপ্রিমেসি চিন্তার জয়জয়কার

  • by

১. নাক উঁচু জনগোষ্ঠীর জন্য তাবিজ:

তোমার মনে মনে মনকলা খাওয়ার নিজস্ব বদ খাসলতের কারনে, যদি নিজে নিজেই ঠিক করিয়া লও, যে, তোমার একটি উচ্চমার্গীয় সুশীল সত্বা রহিয়াছে, তুমি অত্যন্ত উঁচু তবকার পিলেয়ার, বিশুদ্ধ রক্ত তোমার গতরে প্রবাহমান, তাহা হইলে তুমি কূশীলদের গতরের কটূ গন্ধ হইতে নিজেই নিজের চেষ্টায় দূরে রহো। যদি তুমি যথেষ্ট নাক উঁচা হইয়া থাকো, তাহা হইলে বোঁচা নাসিকাধারীদের সৃষ্ট গন্ধমাদন যাহাতে নাসিকায় প্রবেশ না করে, তাই সর্বদা নিজেই তফাতে রহো। ছোটলোকের বস্তিতে আসিয়া নাসিকা কুঞ্চিত করা কেন? তুমি উচ্চনাসিকা সুশীল, তুমি সর্বদা আসমান দিয়া চলো, তোমার জমিনের কর্দমে পদচারণা কেন? মনে রাখিও, তুমি তোমার বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান, ক্লাস, রুচি লইয়া যদি গর্বিত হইয়া থাকো আর ক্ষণে কূ-ক্ষণে যাহাকে তাহাকে তাহার বুদ্ধি, বিবেক, বোধ, বিশ্বাস, পছন্দ, রুচি, অথবা সিদ্ধান্ত/কাজ লইয়া অকাতরে তাহাকে ‘বেওকুফ’ লেবেল লাগাইয়া হাস্য-পরিহাস করিতে থাকো, তাহা হইলে তোমাকেও স্মরন রাখিতে হইবে, জগতে তোমার হইতেও কেরেদদার কেহ কোথাও রহিয়াছে, আর সেও ওইরুপ করিয়া তোমার বুদ্ধিবৃত্তি আর রুচি লইয়া ঠা ঠা করিয়া হাসিতে পারে। তুমি কে হে, অন্যের বিচার করিবার? নিজেকে লইয়া তুমি তোমার স্টূপিড কল্পনা ও উচ্চধারনার মনকলা যত মনে চাও খাইতে থাকো। কিন্তু, সেই মনকলার কষ অন্যের গায়ে ছুড়িও না।

২. তুমি কোন তালেবর? #criticismatitsbest #relativityoflife

বাবারও বাবা থাকে। কথাটা সবসময় মনে রেখে চললে নিজেরও ভাল, পরেরও। দশেরও মঙ্গল।

আপনি যে সময়টাতে কারো ফ্যাশন সেন্স নিয়ে হাসাহাসি করছেন, হতে পারে, ঠিক সেই সময়টাতেই, আপনাকে ‘ক্ষ্যাত’ আখ্যা দিয়ে কেউ বন্ধুদের আড্ডায় খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছে। বাকিরা মাথা দুলিয়ে সমর্থন করছে। আপনার মাত্রই সেদিন কেনা মান্যভরের শেরওয়ানীটা, যেটা পরলে আপনি মনে করেন, আপনাকে অভিষেক বচ্চনের মতো লাগে, ঠিক সেই শেরওয়ানীটাই হয়তো আপনার বস গেল সপ্তায় মান্যভরে নেড়েচেড়ে দেখে সস্তা ও থার্ড ক্লাস মনে করে রিজেক্ট করে এসেছেন।

এমনকি, যেই রমনীকে আপনি বিশ্বসুন্দরী বিবেচনা করে ঘরে নিয়ে এসেছেন, সেই সুস্মিতা সেনকেই এর আগে হয়তো ৮ জন পুরুষ ও তার পরিবার ‘জাতের না’ বিবেচনা করে রিজেক্ট করে ফেলেছেন। আপেক্ষিকতা, যাস্ট আপেক্ষিকতা।

আপনার ননদের বিয়েতে যে বেনারশিটা পরে গিয়ে আপনি আপনার বড় জায়ের পরনের ঢাকাই শাড়িটা নিয়ে মুখ টিপে তাড়িয়ে তাড়িয়ে হেসেছিলেন, আপনার সেই বেনারশি পরা ছবি দেখে হয়তো আপনার ছোট জা’ই আবার আপনার রুচি নিয়ে তার জামাইয়ের সাথে হেসে কুটি কুটি হয়েছে।

আপনি যখন বান্ধবির ’শ্যামলা’ ও টাকমাথা জামাইকে নিয়ে হাসেন, তখন জেনে রাখতে পারেন, হয়তো এমা ওয়াটসন আপনাকে দেখলে ‘বেলাক’ বলে নাক কুঁচকাতেন। (যদিও তিনি সেটা করতেন না, বলার জন্য বলা।)

আপনি যখন কাউকে বেকুব, মফিজ, গাঁইয়া বলে পরিহাস করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই হয়তো কেউ না কেউ খোদ আপনাকেই গাধা, ছাগল, রাসকেল বলে গাল দিচ্ছে মনে মনে। অন্য কারো মেধা, বিচার, বিবেচনা, চয়েস, রুচি, বিশ্বাস, বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে হাস্য-পরিহাস, অথবা দাঁত কেলানো ফেসবুক মন্তব্য করে ফেলবার আগে আরেকবার ভাবুন, বাবারও বাবা আছে।

আপনি যদি মেধায় মেধা পাটকর কিংবা নানা পাটকরও হন, তাহলে আইনস্টাইনও তো একজন ছিলেন। তার সামনে আপনি হয়তো রীতিমতো পাটখড়ি। আপনি দিগগজ, স্টাইলিশ, চৌকশ, চোস্ত যতই হোন, আপনার চেয়েও ওপরে কেউ না কেউ আছে। সে আবার আপনাকে দেখলে বলত, “এই ’আবালটা’ কোত্থেকে আসছে রে?” স্টাইল, রুচি, চয়েস, বুদ্ধিমত্তা-সবকিছুই ম্যাটার অব প্রিভিলেজ।

যে যতটা প্রিভিলেজে জন্ম নেয়, বড় হয়, ওগুলোর ওপর একসেস তার ততটাই বেশি। ঢাকা শহরে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। বয়স তিন কুড়ি হল। সেদিন গ্রাম হতে আপনার কাজিন শহরে আপনার বাসায় থাকতে এলো। তার পোশাক আশাকের ফ্যাশন নিয়ে আপনি উঠতে বসতে খূঁত ধরেন। ভেবে দেখেছেন, তিনি যদি আপনার মতো শহরে বড় হতেন, ঢাকার হাওয়া খেতেন, তাহলে তিনি আপনার চেয়েও বড় খিলাড়ি হতে পারতেন?

ওভার প্রিভিলেজড আপনি হয়তো ফ্যাশনে জড়িমনিরও বস। কিন্তু, ভাবুন তো, নাওমী ক্যাম্বেলের সামনে পড়লে তিনি কি আপনাকে কিম কার্দেশিয়ান মনে করে সালাম দেবেন? সূরত, রুচি, পছন্দ, চয়েস, স্টাইল ও বুদ্ধিমত্তা নেহাতই আপেক্ষিক বস্তু। ওগুলোর কোনো শেষ কথা বলে কিছু নেই। আপনার চোখে যাকে জরিনা লাগে, তাকেই অন্য কারো রোজিনা লাগে। আপনার পছন্দের জন এব্রাহামকেও কারো কাছে আদম আলীর মতো লাগতে পারে। নিজের এপ্রোচ নিজের জন্য, কেবলই নিজের জন্য রিজার্ভ রাখুন। নিজের কালা চশমায় অন্যের রং মাপতে যাবেন না। নিজের নিক্তিতে অন্যের পাপ ওজনও। প্রত্যেকের কপালের ওপরে দুটো চোখ দেয়া আছে। তাকে তারটা সেই চোখ দিয়ে বেঁছে নিতে দিন না।

[এই লেখার জন্ম কোনো বিশেষ ব্যক্তি, বস্তু, ঘটনা বা প্রেক্ষিতকে কেন্দ্র করে নয়। সম্প্রতি গুলিস্তান হতে গুলশান যাচ্ছিলাম। সাথে গাঁটছড়া বাঁধা শশুরকন্যা। পথে যেতে যেতে ‘স্যামসোনাইট’ আউটলেট দেখে আমার পার্টনার নিটোলের পুরোনো এক রসবোধ জেগে উঠল।

বহু আগে, নিটোল যখন আমাকে বিয়ে করতে চাইল, তখন দু’জনের চিন্তা করে একটা সুবিশাল ও ক্যাটকেটে লাগেজ ব্যাগ কিনি। সেটা আমাদের রসরঙ্গ করার অন্যতম ইস্যু। কথাপ্রসঙ্গে আমাদের অতি প্রিয় বিষয় রুচি, পছন্দ, ফ্যাশন জ্ঞান, বিবেচনাবোধ নিয়ে কথা উঠল। অনেক আগে, তখন আমরা স্বামী-স্ত্রী নই, নেহাত প্রেমিক-প্রেমিকা, তখন, তার মন জোগাতে আমি একটা পাঞ্জাবি কিনি। একা একা।

বেকার ও ছাত্র তখন আমি অত্যন্ত সস্তায় কেনার জন্য গুলিস্তান হকার্স মার্কেটকে বেঁছে নিই। দাম নিয়ে ইস্যু না হলেও, তার কথামতো নীল পাঞ্জাবী কিনে আনি। কিন্তু, সেই সাধের পাঞ্জাবী পরে দেখে তিনি হেসে কুটি কুটি হয়েছেন আর সারাজীবন আমাকে কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন। কথা হল, ওই পাঞ্জাবী নাকি আদৌ নীল রং না। সেটা নাকি ছিল ’পেস্ট’ নামের এক কালারের। সেই হতে তিনি আমাকে কথা শুনান-আমার কালার সেন্স নিয়ে।

আমি গুলিস্তান, স্যরি, গুলশান যেতে যেতে তাকে এই ১৫ বছর পরে স্বীকার করি, ওহে, তুমি কি জানো, লাল, নীল, সবুজ আর হলুদ-এই ক’টার বাইরে যে কোনো রং আছে, সেটাই আমি জানি না। তোমাদের কাছে যেটা ’বটল গ্রীন’, সেটা আমার কাছে গ্রীন? নিটোল আমার কালার সেন্সের অবস্থা শুনে মরে যায়। “তুমি এই ৪৩ বছর বয়সে রংও চেনো না? আল্লাহ, তোমাকে নিয়ে কী করব?”

আমি পাল্টা তাকে বলি, ”তুমি কি জানো, মৌলিক রং মাত্র ৪ টা (মিজ. Rrumana Basher পরে আমাকে সংশোধন করে দেন, যে, মৌলিক রং তিনটা-লাল, হলুদ, নীল।)? তুমি কি জানো, সাদা ও কালো কোনো রংই না?” নিটোলের বিষ্ময় বাড়ে-সে জানে না। আমি যা জানি, তা আপনি জানেন না। আবার, আপনি যা বোঝেন, তা আমি বুঝি না। আপনি ভাবেন, “আল্লাহ, এই সামান্য জিনিসটাও সে বোঝে না?” সে আবার ভাবে, “বাপরে, এত সামান্য জিনিস না জানায় এত বিষ্ময়ের কী আছে?? তফাৎ এতটুকুই। আরো শুনবেন?

আমি দেশী ও চাষের কৈ মাছের ভেদ ধরতে পারি না। তেলাপিয়া ও নাইলোটিকা যে দুটো আলাদা মাছ-তা জানি না। আমার কাছে নাইলোটিকা হল ’বিশাল’ তেলাপিয়া। আমি ফিরোজা ও সবুজের তফাৎ ধরতে পারি না। লাল আলু ও সাদা আলুর স্বাদের তফাৎ ধরতে পারি না। খাশির মাংস যে বিফের চেয়ে বেশি অভিজাত-সেটা হৃদয়ঙ্গম করতে পারি না। আটা ও ময়দার নিখূঁত পার্থক্য কী-সেটাই এই সেদিনই জানলাম। ৪২ বছর বয়সে। শার্ট কীভাবে ইন করতে হয়-সেই বিদ্যা আমি ইউটিউবে দেখে শেখার চেষ্টা করেছি জীবনে প্রথম-৪১ বছর বয়সে। অথচ, এতটাই ক্ষ্যাত এই আমি যদি বলি, ’জিন্স’ ও ‘ডেনিম’ যে এক না, গ্যাভাডিন নামে যে আদতে কোনো কাপড় নেই, আর শার্ট প্যান্ট যে কাপড় দিয়ে না বানিয়ে ‘ফ্যাবরিক’ দিয়ে বানানো হয়-সেটা আমি জানি, অথচ আপনি জানেন না!!

দেখুন, আপনি যা পারেন, জানেন, বোঝেন-তা হয়তো আারেকজন পারে না। আবার, সে যা জানে, হতে পারে না, যে, সেটা আপনি জানেন না? পারসপেকটিভ, প্রিভিলেজ ও রিলেটিভিটি ম্যাটারস। পরশু, আমাদের অফিস সহকারীকে নাস্তার জন্য নারকেল দিয়ে রাঁধা বুটের ডাল আনতে বলেছি। তিনবার বলে দিয়েছে, শুধু ডাল, হ্যা, শুধু বুটের ডাল আনবেন।” খেতে বসে দেখি, রেস্তোরাঁর সেই তথাকথিত ‘ডাইলভাজি’ মিক্স। যথারীতি আমি শেষ।

আমার জুনিয়রকে ঘটনাটা বললাম। তিনি বললেন, ”ও এত বোকা?”  আমি তাকে বলি, “ভাই রে, ও যদি আপনার লেভেলের বুদ্ধিমানই হত, তাহলে কি ও পিওন হত? ওতো তখন সিনিয়র অফিসারই হত? আর, সেটা সত্যিই যদি সবাই হত, তাহলে কি আপনি অফিস চালাবার জন্য পিওন পেতেন?

যে যেমনটা আছে, তাকে তেমনটাতেই ভালোবাসুন, মেনে নিন।

৩. পরের কাঁথায় নিজের শীত, পরের কন্ঠ্যে নিজের গীত: #judgementalattitude #CognitiveBias #ConfirmationBias #inferioritycomplex #SuperiorityComplex #SupremacySyndrome  

অন্যের কথা, কাজ, অর্জন, বিশ্বাস, বোধ, লক্ষ্যকে তোমার লক্ষ্য, বিশ্বাস ও trademark বানালে তুমি কখনো নিজেকে সফল ভাবতে পারবে না। অন্যের জামায় নিজেকে fit করতে যেও না। অন্যের কাজলে নিজের চোখ রঞ্জিত করো না। অন্যের চশমায় নিজেকে দেখো না। একইভাবে, নিজের চশমায় অন্যকে বিচার করো না। নিজের চোখের সুরমায় অন্যের চোখকে রাঙাতে চেয়ো না। নিজের রুচি, পছন্দ, বোধ, বিশ্বাস, দৃষ্টি, কাজ দিয়ে অন্যকে মাপতে যেয়ো না।

৪. চোখ যে মনের আয়না, চোখের ভাষা পড়তে পারা সেয়ানা:

“ব্যাডার চেহারা দ্যাকলেই বোজা যায়, হালায় একটা লুইচ্চা।” “ছেমড়ির সুরত দ্যাকচেন, এক্কেরে গারমেনসের মাইয়াগো মতো।” “ওই, তোরে দ্যাকতেই খুনির মতো লাগে।” “দেখেছ, ওই বাসার ভাবির মধ্যে একটা গেঁয়ো গেঁয়ো লুক আছে?” “চেহারাটাকে এমন ফকিন্নীদের মতো করে রেখেছ কেন?” “বেডা বেডির ঠাটবাটেই বুঝতেছি, দুই নাম্বার।” সরলিকরণ, জাজমেন্টাল ও মার্জিনালাইজেশন প্রিয় আমাদের বাণী অমৃত। কারো দোষকীর্তন করার আগে আরেকটু ভেবে নিন। নিজেকে আরেকটু যাচাই করে নিন। বহু মানুষই নিজের দুর্গন্ধযুক্ত ’পশ্চাৎদেশ’ সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে সেটা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতেই অন্যদেরকে দুর্গন্ধের জন্য গাল পারে, ”ওই, তুই কি …দ দিছস?”

৫. গোঁফ দেখে যায় চেনা:

বৎস্য, তুমি আপনাকে কিরূপ রুচি, বিশ্বাস ও বোধের মানুষ হিসাবে পরিচিত করাইবে, তাহা নিতান্তই তোমার সিদ্ধান্ত। তোমার সামাজিক মাধ্যমের উপস্থিতির চরিত্তির যদিও তাহারই প্রকাশক। আবার তুমি অন্যের রুচি, পছন্দ, বিশ্বাস, বাক্য, কর্ম ও চিন্তার ধারা দিয়া নিজের জীবন, বোধ, কর্ম ও বিশ্বাসকে ruin করিবে কিনা-তাহাও তোমার choice ।

৬. লোকে কী ভাববে?

এই দ্যাশে আমাদেরকে উঠতে, বসতে, শুতে-সারাক্ষণই মাথায় রাখতে হয়, “পাবলিক কীভাবে নেবে”-দিকটা। পাবলিক কী ভাববে-সেটাও আমাদেরকেই ভেবে রাখতে হয়। একজন ডার্মাটোলজিস্ট দেখাবেন, ভাল ডাক্তারের খোঁজ করবেন-মাথায় রাখতে হবে, পাবলিক কোনো গোপন যৌন রোগ ভেবে খিক খিক হাসবে না তো? অথচ তিনি চর্মরোগের রোগীও হতে পারেন। একজন কলোরেকটাল সার্জন খোঁজা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, পাবলিক আবার আমার ‘পশ্চাতদেশটা’কেই ক্ষতবিক্ষত ধরে নেবে না তো? সেটা হলে তো লজ্জা লজ্জা। একজন গাইনোকলজিস্ট খোঁজা হচ্ছে। খুব খিয়াল করে কোয়েরি করতে হয়। কারন, পাবলিক ধরেই নেয়, গাইনোকলিস্ট মানেই হয় ব্যাটা GF এর এবোরশন করাবে, আর না হয় ডেলিভারীর জটিলতা। একজন হারনিয়ার রোগী। তাকে দশবার ভাবতে হবে, কাউকে বলবেন কিনা, খোঁজখবর করবেন কিনা। কারন, পাবলিকের মনে মনে আছে, হারনিয়া মানে ‘একশিরা’ নামক কোনো এক কাল্পনিক যৌনাঙ্গ-অসঙ্গতি ধরনের রোগ। এই রোগ হওয়া মানেই লজ্জা।

একজন এইচআইভি রোগী। সে ভুলেও কাউকে জানাতে পারবে না, যে, সে এইচআইভি পেশেন্ট। পাবলিক বাই ডিফল্ট ধরে নেবে, এই ব্যাটা গণিকাভোগী ছিল। অথচ, একজন প্যাথোলজিস্ট বা সামান্য কম্পাউন্ডারের ভুলেও রোগটি হতে পারত। ওদিকে, কারো মেয়ে যদি গুম হয়, কিডন্যাপও হয়, সেটা পাবলিককে জানানো যাবে না। পাবলিক ধরেই নেবে, “মাইয়া ভাগছে, পুরুষের লগে রাইত কাডাইছে আর নষ্ট হয়ে ফেরত এসেছে।” রিক্সার হুড তুলে পর্দা টেনে যাচ্ছেন মানেই, ঘেরাটোপের মধ্যে ‘চুমাচুমি’ করছেন। আমরা একটি লজ্জাশীল ও পর্দা-পুশিদার জাতি। তারপরও এই দ্যাশের জনসংখ্যা ১৯ কোটি। মুশকীল এই দ্যাশে।

এমনকি, এই দ্যাশে উত্তম পুরুষ (First person) বয়ানে কোনো গল্প লিখলেও পাবলিক প্রশ্ন করে, ”ভাই, আপনার অমুন কবে কী হইল, কিছুই জানলাম না। একটাবার বলতে পারতেন।”

৭. গেস করতে করতে গেজ:

বাংলাদেশের অলিতে, গলিতে, দেয়ালে, বাসে, ট্রেনের দেয়ালে অর্শ্ব-গেজ রোগের এত এত এত বিজ্ঞাপনের সয়লাব কেন জানেন?  আমরা বাঙালরা গেজ (Guess) করতে ওস্তাদ। গেজ করতে করতে করতে করতে আমরা গণহারে গেজ রোগের রোগী হয়ে গেছি। কোনো ছেলে বিয়ে করেনি? গেজ-ব্যাটার নিশ্চয়ই সমস্যা আছে। কোনো মেয়ে বিয়ে করেনি? গেজ-মহিলার না জানি কত জায়গা-বেজায়গায় যাতায়াত আছে। কোনো মেয়ের অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে? গেজ-নিশ্চয়ই মেয়েটা ভাগার ধান্দায় ছিল, টের পেয়ে……কোনো ছেলের বেশি বয়সে বিয়ে হয়েছে? গেজ-নিশ্চয়ই আগেও ব্যাটার আরেকটা সংসার ছিল। কোনো নারী বমি করছে? গেজ-নিশ্চয়ই মহিলা প্রেগন্যান্ট। কোনো দম্পতির সন্তান হয় না?

গেজ-কাহিনী কী? কেন সন্তান নেয় না? কোনো দম্পতির বিয়ের পর দ্রূত সন্তান লাভ? গেজ-নিশ্চয়ই আগেই পেট ছিল। কোনো দম্পতির বুড়ো বয়সে বাচ্চা হল? গেজ-নিশ্চয়ই আসল না। দত্তক নিয়েছে। কোনো নারীর সন্তান হয়নি? গেজ-নিশ্চয়ই মহিলা বাঁজা। কোনো নারীর সংসার ভেঙে গেছে? গেজ-নিশ্চয়ই মহিলা নাক উঁচা , চরিত্রহীন। কোনো পুরুষের সংসার ভেঙে গেছে? গেজ-নিশ্চয়ই ব্যাটার আরেকটা লাইনঘাট ছিল।  কোনো ছেলের চাকরি হচ্ছে না?

গেজ-নিশ্চয়ই একটা অপদার্থ। বাপের ঘাড়ে বসে খায়।

কোনো মেয়ে দেরী করে বাসায় ফেরে?

গেজ-নিশ্চয়ই ছেমড়ির হাজার হাজার বফ।

কোনো পুরুষ দেরী করে বাসায় ফেরে?

গেজ-নিশ্চয়ই আরেকটা সংসার আছে।

কোনো বিধবা বিয়ে করছে না?

গেজ-নিশ্চয়ই গোপন গোপনে……..।

গেজ গেজ গেজ গেজ আর গেজ।

পাড়ার নেড়ি কুত্তাটাও পাড়ার একা থাকা নারী বা পুরষটাকে নিয়ে গেজ করতে করতে শেষ।

আর এই এত এত এত এত গেজ করতে গিয়ে অর্শ্ব-গেজ হয়ে গেছে বঙ্গদেশের জাতীয় ব্যামো। পাড়ায়, মহল্লায়, দেয়ালে, চিপায় অর্শ্ব-গেজের বিজ্ঞাপন, চিকিশশা আর ডাক্তার।

অন্যের লাইফ নিয়ে এত ’গেজ’ কেন এই জাতির?

৮. বাঙালির পরচর্চা, পরাগ্রহ আর অতি কৌতূহলের কয়েকটা নমুনা বলি।

মনে করুন আপনি একটি লোকাল বাসে উঠেছেন। একহাতে বাসের হ্যান্ডেল ধরা। হেলপার ভাড়া চাওয়াতে আপনি একহাতে কোনমতে মানিব্যাগ খুলে টাকা বের করবেন। পাশের তিনজন যাত্রী খুব আগ্রহ করে আপনার মানিব্যাগের হা করে থাকা কম্পার্টমেন্টের ভেতরে নজর বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করবেন, ওখানে কত টাকা আছে। আহ বাঙাল বাঙালি!

কিংবা ধরুন, রাস্তায় বাসে দাড়িয়ে বা বসে থেকে থেকে গরমে সিদ্ধ হচ্ছেন, পাশেই কালো গ্লাসের গাড়িতে বসা দুই নর ও নারী। একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসা। আপনার ও আমার সকৌতুক চাউনি, কৌতুহলি উঁকিঝুঁকি, ওরা এর বেশি ঘনিষ্ঠ হয় কিনা, আরো এগুলো কিনা। ওয়াসা বা টিএন্ডটি রাস্তা খুঁড়ে কাজ করছে। কয়েকশো লোক উঁকি মেরে দেখছে। না, কী হয়েছে, ক্যাবল, পাইপ ঠিকমতো দিচ্ছে কিনা তা দেখছে। এক চাচা মন্তব্য করেন, ” আরো মোটা পাইপ দরকার ছিল।”

নয়াপল্টনে, সংসদ ভবনের সামনে, চন্দ্রিমার পাশে রাত নামলে (যৌন)পেশাজীবি নারী ও পুরুষরা জীবিকার জন্য ফুটপাতে দাড়ান। ভীরু, সলাজ, কামুক পুরুষ ও নারীরা তাদের সাথে ত্রস্তে দরদাম করেন। হুম। কিন্তু আরেকদল নারী পুরুষ কৌতূহলে ফেটে পড়ে সেই দরদামে নজর রাখে। পাশে দাড়িয়ে নিশ্চিত হতে চায়, মেয়েটা খদ্দেরের কাছ থেকে বেশি নেয় কিনা। বা ছেলেটার বা মেয়েটার রুপের তুলনায় দর বেশি পড়ল কিনা। দেখা শেষ হলেই বাসে উঠে সীটে বসতে বসতে আগের যাত্রীকে একটা মোক্ষম ধাক্কা দিয়ে বসেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, “দেশটার কী যে হবে?”

বিজয় স্মরনির ঝুপড়িগুলো এখনো আছে কিনা জানি না। একদল মানুষ ঝুপড়িতে টানে, একদল সেই টানে ট্যান হয়ে ঝুপড়িতে ঢোকে। আরেকদল তীব্র কৌতুহলি হয়ে ঝুপড়ির আধোভৌতিক অভ্যন্তরে নজর বোলায়। কৌতুহল। ভিতরের ঘটনাপ্রবাহে। মনে মনে হাজারটা গালি দেয় খুপড়ির সেলার ও কাস্টমারকে। কিন্তু অমোঘ আকর্ষনে নিজেকে ওখান থেকে সরিয়েও নিতে পারে না। কৌতুহলি বঙ্গ জনতাকে আমি দেখি বেঁদে বহর দেখতে রাস্তায় গাড়ি থেকে নেমে মোবাইল দিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য ভিডিও করার বাহানায় বহরের দিকে নজর রাখতে। কৌতুহল। ওরা কীভাবে এতটুকু ঝুপড়িতে সন্তান পয়দা করার মওকা পায়, কীভাবে এতটুকু বয়সের মেয়েরা বেদে পুরুষদের বউ (আসলে সঙ্গীনি) বনে যায় সেই কৌতুহল। মনে আফসোস, কেন তবে সরকার সমতলের জনপদে বাল্য বিবাহ নিষেধ করে। আড়চোখে বিশেষ কায়দায় শাড়ি পড়া বেদে মেয়েদের উন্মুক্ত দেহে নজর। কৌতুহলই, আর কিছু নয়।

তেজগাঁও এর ঘিঞ্জি সাবেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও হালের উঠতি কমার্শিয়াল এলাকা। অফিসগামী মানুষ বাইকে, পায়দল, রিক্সায় দ্রূত চলে। ইএনটি হাসপাতালের ফুটপাতে কয়েকটা পর্দাঘেরা টং দোকান। চা, বিস্কিট, পান, বিড়ি। বাইক, গাড়ি, রিক্সার প্যাসেঞ্জাররা কৌতূহলী চোখে পর্দার ওপাড়ে কারা কারা বসে বিড়ি টানে তা দেখার সশ্রম চেষ্টায় রত। কৌতুহল যখন ফেটে বেড়িয়ে পড়তে চায়, তখন বাঙালি নগরের রাস্তায় নেড়ি কুকুর ও কুকুরীর কষ্টকর প্রকাশ্য নির্লজ্জ সঙ্গম দাড়িয়ে দাড়িয়ে অবলোকন করে। উপভোগ করে একরকম অক্ষমের তৃপ্তি। আবার নজর রাখে, তাকে কেউ দেখছে কিনা। আফটার অল, সেও তো ভদ্রলোক।

[হেটাররা লেখাটা পড়েই ভাবতে বসবেন, এই ব্যাটা এত কিছু জানে কীভাবে? নিশ্চই সেও…….. হতেই পারে। বাঙাল ঐতিহ্য মেনে আমিও অমন না করলে আপনারাই বলবেন, আমি চিরায়ত বঙ্গ সংস্কৃতি ভঙ্গ করছি। কেউ ভাবেন, ব্যাটা নিজের দেশ আর জাতিকে নিয়ে খালি সমালোচনা করে কেন? এত যখন সমালোচক, তখন ট্রাম্পের দেশে চলে গেলেই তো পারে।]

৯. রুচীকর-অরুচীকর

ভাল-মন্দ

ন্যায়-অন্যায়

সত্য-মিথ্যা

উচিত-অনুচিত

সুন্দর-অসুন্দর

সাদা-কালো

শ্লীল-অশ্লীল

—জগতের ইত্যকার সকল বিশেষণ পদীয় শব্দই আপেক্ষিকতার ভাবশিষ্য।

সর্বজনসম্মত, বিশ্বজনীন কোনো বিশেষণীয় শব্দ নেই। উপরোক্ত শব্দাবলীর কোনো সার্বজনীন মানদন্ডও নেই। আমার কাছে যা ‘সু’, সেটাই আরেকজনের কাছে ‘কু’।

আমার চোখে যেটা স্টাইল, সেটাই আরেকজনের চোখে ‘খ্যাত’।

#JudgingHuman ভাল বা মন্দ, ন্যায় বা অন্যায়, ঠিক বা বেঠিক, উচিত বা অনুচিত-এই বিবেচনা ও বিচারগুলো খুব বেশি বাইনারি জাজমেন্ট। আপেক্ষিকতার এই জগতে সরাসরি ভাল আর খারাপ বলে কিছু হয় না।

আমি তাই ভাল না মন্দ-কোনো কিছুকে নিয়ে বা কোনো কাউকে নিয়ে এরকম বাইনারি জাজমেন্টের ধন্দে পরি না।

আমার ওয়ে অব থিংকং হল সে আমার যে কনটেক্সট ও রিকয়ারমেন্ট, তার সাথে কমপ্যাটিবল কিনা। ব্যাস। সে ভাল না খারাপ-সেই জাজমেন্টেই যাই না। কমপ্যাটিবল হলে তার সাথে ডিল করি, না হলে বিদায়।

তারপরও, যদি প্রশ্ন হয়, বলুন তো, লোকটা কেমন, বা জিনিসটা কেমন অথবা এই ঘটনাটা কেমন-আমি তখন নির্দিষ্ট কমপ্যাটিবিলিটি ফ্যাক্টরের বিপরীতে সেটাকে যাচাই করি। শুধু সেই ট্রেইটটার রেজাল্ট দেখে মন্তব্য করি।

মানুষকে যাচাই করতে হলে আমি যেই ফ্যাক্টর বা ট্রেইটগুলোর নিক্তিতে তাকে মেজার করি সেগুলো বলি: –

ক. তিনি মিথ্যা কথা বলতে অভ্যস্ত কিনা।
খ. তিনি চিন্তার অসততায় অভ্যস্ত কিনা।
গ. তিনি লোভী, নাকি নির্লোভ।
ঘ. তিনি গণতান্ত্রীক, নাকি স্বৈরাচার।
ঙ. তার চিন্তার প্রক্রিয়া ও ধরন সুষ্ঠু কিনা।
চ. তিনি বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কিনা।
ছ. তিনি পারভার্ট কিনা।
জ. তিনি কপোট কিনা, মানে ভান করেন কিনা।
ঝ. তিনি বুদ্ধিমান কিনা।

এগুলোর কোনোটায় তিনি নেগেটিভ হলে সেটার ইমপ্লিকেশন যেখানে আছে, সেগুলো বিষয়ে তাকে এড়িয়ে যাব।

ধরুন, দেখা গেল তিনি লোভী। তখন আমি শুধু বলব, লোকটা লোভী (লোকটা মিথ্যুক ভাবব না)। আর তার কাছে তখন ১ লাখ টাকা জামানত রাখব না।

বা, যদি জানি লোকটা মিথ্যা বলে, তাহলে বাকিগুলোতে তাকে পজিটিভ ধরে নিয়ে শুধু বলব, লোকটা মিথ্যাবাদী, আর তখন তার কাছে কোনো ক্রূশিয়াল তথ্য বা সত্য জানতে চাইব না, বা, তার কথায় আমল করব না। ব্যাস, এতটাই।

মানুষটা ‘ভাল’ বা ‘খারাপ’-এই বাইনারি জাজমেন্ট করব না। বলব না।

ভাল মানুষ, বা, খারাপ মানুষ না, মানুষ আসলে নির্ধারিত কনটেক্সটে কমপ্যাটিবল বা নন-কমপ্যাটিবল মাত্র।

সুতরাং, আজ হতে আর কোনো সৃষ্টি, কোনো মানুষের কাজ বা বোধ নিয়ে একমুখী ধারনা আর নয়।

আজ হতে, একজন ব্যক্তি বা বস্তুর যে কোনো ডাইমেনশন, যা অন্যকে ক্ষতিগ্রস্থ বা বাঁধাগ্রস্থ করে না, তার কোনো বিচার নয়।

আজ হতে আর, ‘আমাকে কেমন লাগছে’, কিংবা ‘এটা কেমন হবে’ আর নয়।

আজ হতে, ‘তুমি এটা কী করেছ?’ আর নয়।

ফেরদৌস ওয়াহিদ সাহেবের পিঙ্ক ব্লেজার পরিহিত আসল ছবিটা পেলাম না। পিঙ্ক নাকি মেয়েদের রং। সেই ’মেয়ে মানুষের রং’ পরবার বোল্ডনেস থাকতে হলে বুকের পাটা লাগে। সেটা তার আছে দেখে দারুন লাগে তাকে।

তুমি আমি স্রেফ আয়না ও কায়ার মতো।

তোমার কাছে যেটা ডান, সেটাই আমার বাম।

১০. ছবিটি নিয়েছি মিজ. Priyeteniya Pia’র ক্যানভাস – Canvas এ প্রকাশিত লেখা হতে।

জ্বি, এটি তার বিয়ের শাড়ির সাথে পরিহিত কেডস পায়ে ছবি। আজ ঘুম ভেঙে উদর খালি করার আগেই ওনার সাহসী ও চমৎকার একটি লেখা পড়ে, ওনার এই ছবিটি ধার করেছি। না বলেই। দুঃখিত। পরে অবশ্য জানিয়েছি, যে ছবিটি চুরি করেছি। রুচী, পছন্দ, স্বাদ, সৌন্দর্যজ্ঞান, স্টাইল, ফ্যাশন-এর বৈচিত্র নিয়ে বহুবার বলেছি। আজ আর বলব না। কেবল আবার নিজেকে মনে করিয়ে দিতে চাই, যে, রুচী, পছন্দ, স্বাদ, সৌন্দর্যজ্ঞান, স্টাইল, ফ্যাশন-এসব নেহাতই আপেক্ষিক ও ব্যক্তিপছন্দ। এসবের কোনো সর্বজনগ্রাহ্য ও সার্বজনীন ব্যকরণ নেই। এই দেশে যা পাপ গণ্য, আরেক দেশে পূণ্য তা। বেনারশির সাথে কেডস, লুঙ্গীর ওপরে ব্লেজার, পুরুষের গোলাপি শার্ট, মেয়েদের ছোট চুল, ছেলেদের হাই হিল এসবের হাত ধরে, ছেলেরা যদি লিপস্টিক পরা শুরু করে, মেয়েরা যদি টাইট জিন্স পরে বিস্ট বাইক দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করে, ছেলেরা হাতি চুড়ি, মেয়েরা ব্রেসলেট, পুরুষ তেতুলের চাটনী আর নারী যদি বেনসন ফোকা শুরু করে, তাতে কার কী?

কে কেয়ামত তক নির্ধারন করে দিল, যে, লাল বেনারশির সাথে লাল হিল, লাল পেটিকোট, লাল ব্লাউজ, লাল অন্তর্বাস, লাল লিপস্টিক, লাল নখপালিশ, লাল হ্যান্ডব্যাগ না পরলে সেটা ‘ফ্যাশন’ হবে না, কিংবা, শেরওয়ানীর সাথে ২৫ টাকার স্যান্ডাল পরলে সেটা খ্যাত লাগে-বলার মতো বাপকা বেটাটা কার সন্তান? কার বলার সুযোগ আছে, যে, এটা মেয়েদের, ওটা ছেলেদের, এটার সাথে ওটা যায়, ওটার সাথে এটা যায় না? কে সাদা জুতার সাথে সাদা বেল্ট পরা, কালো জুতার সাথে কালো বেল্ট পরাকেই দেবতাদের ফ্যাশন হিসেবে সার্টিফিকেট দিল? ম্যাচিং, ফ্যাশন, স্টাইলের মুখে আগুন। পেন্নাম মিজ. Priyeteniya Pia যদিও আমি জানি, I am in my best form, in my highest efficiency, when I am in my T-shirt & jeans, কিন্তু, আমাকে পরতে হবে ফুল স্লিভ ফুলেল শার্ট, চিনো ড্রেস প্যান্ট, টাকড ইন, চকচকে পাম্প শু। আমার মেনটর রিজভান বলবেন, ভাই, যস্মিন দেশে যদাচার। আমি বলব, এসব দেখি সবই অনাচার।

১১. কে তোমারে এ বেশ ভূষণ,  পরাইল বলো শুনি—লালন

বাসার কাছের ছোট একটা কাঁচা বাজারে গিয়েছি। উদ্দেশ্য, গরীবের টার্কি ব্রয়লার কেনা।

মুরগীর, sorry, ব্রয়লারের দোকানের চারপাশের পরিবেশ তো মধ্যবিত্ত মাত্রই জানেন। তার ঠিক কোলঘেঁষে একপাশে একটি গণশৌচাগার। তার অবস্থাও তথৈবচ।

গণশৌচাগারের প্রবেশমুখে দরদামের দুটো তালিকা ত্রিশঙ্কূ হয়ে ঝুলছে-

পেচছাপ-৫ টাকা >>>>>> ব্রয়লার-১৮০ টাকা

পায়কানা-১০ টাকা >>>>>> কক মুরগী-২৭৫ টাকা

বুঝিনি, কক আবার মুরগী হয় কী করে। আর যেভাবে মূল্য তালিকা লেখা, তাতে ‘পায়কানা’ও ১০ টাকা দরে বিক্রি হয় কিনা বুঝলাম না।

পায়খানার প্রবেশদ্বারে গণশৌচাগারের শেরিফ কাম চীফ একাউনট্যান্ট বসে আছেন।

আমি ঠাহর করে দেখি, ওই CFO সাহেব পরনে লুঙ্গি, উর্দ্ধাঙ্গে একটি সেন্ডূ গেঞ্জি, তার ওপরে পাঞ্জাবী, তার ওপরে একটা জাম্পারের মতো, তারও উপরে চড়িয়েছেন ফিট এলিগেন্সের ১ বোতামের ব্লেজার। গলার মাফলার দিয়ে কোমর শক্ত করে বাঁধা। পান চর্চিত রাঙা মুখের কোণ দিয়ে পিচিক করে একটু পর পর পানের পিক ফেলছেন। ওহ, পায়ে একজোড়া রাবারের মোকাসিন।

ভদ্রলোককে দেখে নজর ফেরানো মুশকিল।

নাহ, শেখ সাদী’র গল্পের মতো পোষাকের বিচারে নামব না। পরুক, যার যা খুশি। যে যেটাতে সুখ পায়। যার যেটাতে স্টাইলিশ লাগে, পরুক না। অন্যের রুচীর বিচার করার আমি কে?

আমার আগ্রহের জায়গাটি অন্য। দেখে ইর্ষা হয়, এঁরা অনেক স্বাধীন। কে কী ভাববে-সেই দুঃশ্চিন্তায় ঘুম খোয়াতে হয় না। যা খুশি করতে পারে, যা খুশি পরতে।

এর বিপরীতে, আমাদের সময় কাটে এটা ভেবে ভেবে-

”হালায় এইডা কী পিনছে”,

অথবা,

”আমার পোষাক কি সবার ভাল লাগবে?”

১২. এই লেখাটির অন্তর্নিহিত লক্ষ্য খুব বিচিত্র। গানটি শুনুন। লেখাটা পড়ুন। তারপর যা করার করুন।

https://www.facebook.com/56faisal/videos/656516107828913/?t=1

দ্বিচারী এই বাঙাল জাতির দ্বৈত মুখোশের কথা তো জানাই আছে। মুখের কথা আর মনের ভাষা আমাদের চিরকালই দুইরকম। বাড়িতে মেহমান এলে, গৃহস্থ উঁচু গলায় মেহমানকে শুনিয়ে গৃহভৃত্যকে ডাকবেন,

“কই রে, আবুল, মেহমানকে চা নাস্তা দে।”

মনে মনে বলছে, ব্যাটা, লজ্জায় পড়ে আমাকে আটকাক।

মেহমান আবার দেখানো লজ্জা দেখিয়ে তড়িঘড়ি বলে, “না না না না না আমি কিছু খাব না। খাব না। এসবের কোনো দরকার নেই। আসুন দুই দন্ড গল্প করি।”

কিন্তু মনে মনে বলে, ইস, কেন বলতে গেলাম। যাহোক।

আমার আবোল তাবোল লেখা যারা পড়েন বা যারা উপেক্ষা করেন-সবাইকে সবসময়ই একটি উন্মুক্ত অনুমতিপত্র দেয়াই থাকে, আমার লেখা ও কাজ নিয়ে যথেচ্ছা যৌক্তিক পর্যালোচনা করুন, মন্তব্য করুন, পরামর্শ দিন। এগুলোর কোনোটাই আপনার প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে না।

ঠিক তেমনি, আপনি আমাকে যতটাই মধু কথায় ভিজান না কেন, আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে না। বলতে পারেন, যে, বললেই হল, মিঠা কথায় পাথরও নরম হয়। হতে পারে। কিন্তু, এটাও সত্যি, রাবারের টুকরো যতই চিবান, সেটা নরম হয় না। আমি বোধহয় সেই অর্থে রাবারের টুকরোই।

এবার বলি মূল গপ্প। ফেসবুকে ও অন্যান্য উন্মুক্ত মাধ্যমে আমরা ‘জ্বি ভাই, সহমত ভাই, দারুন ভাই, এক্সেলেন্ট ভাই, কঠিন ভাই, অস্থির ভাই, ফাটায়া ফেলছেন ভাই, চমৎকার ভাই, ওয়াও ভাই, আহা ভাই, উহু ভাই-এসব শুনে, দেখে অভ্যস্ত।

আমি নই। আমি যদি আপনার লেখা পড়ি বা আপনার কোনো কাজ দর্শন করি, আমি সেটা নিয়ে নিজস্ব ধারনা খুব সহজভাবে বলতে অভ্যস্ত। আপনি খারাপ লিখলে খারাপ, ভাল লিখলে ভাল, আপনি পঁচা লিখলে পঁচা, ওঁচা লিখলে ওঁচা। আশা করছি, আপনি সেটা সুন্দর ও সহজভাবে নেবেন। একচেটিয়া প্রশংসা আমি নিতেও পারি না, দিতেও পারি না। আমার একজন প্রিয় শিক্ষকের একটা গল্প দিয়ে শেষ করি।

তিনি বলতেন, আজকাল কবিতা লেখার নতুন একটা ধারা বের হয়েছে (মূলত গদ্য কবিতা নিয়ে তার বিরাগ)। সেই কবিতার ধরনটা অনেকটা এমন-

”নদীর ওপাড় দিয়ে যাও গো বন্ধু, বাঁশ ঘাড়ে নিয়ে,

আমার বাড়ি আসো না তুমি, তোমার সমস্যাটা কী?”

আপনি এমনতরো কাব্য বা কপাল কুন্ডলার মতো কালজয়ী উপন্যাস-যেটাই লিখুন, আপনার সেই স্বাধীনতা আছে। তেমনি, আপনি যখন সেটা উন্মুক্ত মাধ্যমে দর্শক বা পাঠকের জন্য লেখেন, তখন তা নিয়ে আমার নিজস্ব ভাবনা যৌক্তিক ও সুচিন্তিত ভাষায় প্রকাশের অধিকারও আমার আছে।

[উপমা হিসেবে আমার ব্যবহৃত গানের এই ভিডিওটির https://www.facebook.com/56faisal/videos/656516107828913 গায়িকা কে জানি না। তার এই

সঙ্গীত আমার ভাল লাগেনি। কিন্তু তাই বলে, ওনাকে নিয়ে নিম্নশ্রেনীর ট্রল করা বা কৃত ট্রলে অংশ নেয়াও আমার রুচীর বাইরে। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি মানুষেরই নিজের মতো করে বাঁচার, হাসার, নাচার, কাঁদার অধিকার আছে। সেটাকে বাঁধাগ্রস্থ বা শরবিদ্ধ করার অধিকার কারোর নেই।]

১৩. জুতো ও কোমরবন্ধনী একই রঙের,

পান্তালুনের রঙের সাথে মিল রেখে সুসমন্বিত জামা,

কালো জুতোর ভেতরে কালো মোজা,

লিঙ্গভেদে আলাদা আলাদা সমন্বিত অন্তর্বাস,

সার্বিক অবয়বের উপযুক্ত রোদ চশমার বিন্যাস,

কে করে দিয়েছে এই নিয়ম? কে বলে দিল, এটাই রীতি, এটাই সেরা গীতি?

কে আমাদেরকে এই মিথ্যে সমন্বয়, মিথ্যে মিলমিশ, মিথ্যে সৌন্দর্যের চোরাবালির ফাঁদে আটকে দিলো? কে করে দিলো এতসব নিয়ম?

বিশেষত, যখন আমি দেখি, মিথ্যে কায়ার পেছনে মিথ্যে ছায়া, ভুল মায়ার পেছনে ভুল আবছায়া, ভুল শরীরে ভুল হৃদয়, অমিলের অন্ধকার বুকে বিষম গরমিলের ধুকপুক? ।।–।।

১৪. আপনি শুধুমাত্র বব মার্লের গান শোনেন, পন্ডিত রবিশংকর ব্যতিত অন্য কারো সেতার বাদন আপনি কান দিয়ে শোনেন না,

আপনি কেবলমাত্র রাহুল দেব, কিংবা জগজিৎ সিং অথবা রবীন্দ্রনাথের ধ্রূপদী গানই শোনেন;

এবং, এসবের সুবাদে আপনি যদি মনে করেন, যে, আপনি একজন প্রকান্ড সংগীতজ্ঞ, এবং, সঙ্গীত নিয়ে আপনার ভাবনাই চুড়ান্ত, তাহলে ভুল ভাবছেন।

আপনি হয়তো নিজেকে নিজে ক্লাসি তকমা দিতেই পারেন। ছোটজাতের লালন, ভজন, কীর্তন, মমতাজ, ডলি বা বেত্তমিজ হাবিব-হৃদয়ের গান আপনি শোনেন না। বিশুদ্ধতম স্বরলিপি আপনার ধ্যানজ্ঞান। তার মানেই আপনি, হ্যা, আপনি এক ও একমাত্র সঙ্গীতবোদ্ধা, আর বাকিরা সব ধইঞ্চা-ভাবলে ভুল ভাববেন।

মেথর-মুচির কাছেও আপনার এমন কিছু শেখার সুযোগ আছে, যা আপনাকে হারভার্ডের ডক্টররাও শেখাতে না ও পারে।

উঠতে বসতে, মানুষকে নিয়ে ট্রল আর “যত্তসব বেকুবের কাজ” বলে নাক সিঁটকোনোটা এবার তাহলে বদলান।

১৫. #intellectualsupremacy #domination

ইনটেলেকচুয়াল সুপ্রিমেসি এবং ডোমিনেশন আমাদের চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট।  অন্যের চিন্তা, বিশ্বাস, কথা ও জ্ঞানকে নিজের তুলনায় নেহাতই তুচ্ছ ও নিম্নবর্গীয় বিবেচনা করবার এবং তাকে Inferior দেখাবার উদগ্র বাসনা আমাদের সবার মনে। যে কাউকে কথায় হারিয়ে দেবার তীব্র ক্ষুধা আমাদের মধ্যে প্রকট। এই সিনড্রোম  আমাদের মনে  পরম গোপনে সুপ্ত থাকে। নিজেরাও হয়তো তার খবর রাখি না। ঘোপেঘাপে সেই খাসলত প্রকাশ হয়েই যায়।

নিজের সংগ্রামী জীবন ও সফলতার গল্প বয়ানের নিরীহ ছুরতেও তার নিরব অনুরনন থাকে। কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না। এমনকি জগতের বিশুদ্ধতম নিঃস্বার্থ কাজটিরও একটি স্বার্থ আছে, সেটি হল, নিঃস্বার্থ স্বীকৃতির সুপ্ত লোভ। নিজের সংগ্রামী অতীত বা শৈশবের দারিদ্রের গল্প শোনানোও এক ধরণের নেশা বা অবসেশন। 

ইনটেলেকচুয়াল সুপ্রিমেসি এবং ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স-একটি বঙ্গীয় মহা-মড়কের নাম। ইনটেলেকচুয়াল ডেলিকেসির অবনমনও এক বাস্তবতা।

আপনি মানতে না পারলেও সত্য, যে, ২০২৩ সালের ‘স্মার্ট’ বঙ্গভূমে জার, সম্রাট, কিং, জমিদার, তালুকদার, রাজা, নবাবরা দিব্যি বেঁচে আছে।

তবে, আমাদের মনের মধ্যে। মানে, ‘ভাবনায়’ ও ‘ভাবনেয়’ রাজা।

এই নবাব মন এখনো আশা করে, আমার প্রজা ও গোলামরা আমার সামনে নত হোক, কুর্নিশ করুক, অস্টপ্রহর সালাম দিয়ে মুখে ফেনা তুলুক, আমার স্তব করুক, আমার নামে জয়ধ্বনি দিক, আমার সামনে ‘নতমস্তক পশ্চাৎহস্তক’ হয়ে দন্ডায়মান থাকুক।

তাইতো এক প্রাচীন বৃদ্ধ দরবেশঠাকুর কবি বলেছিলেন, আমরা সবাই রাজা।

ইনফেরিওরিটি ইভলভড সুপ্রিমেসি কমপ্লেক্স আমাদের জাতীয় রোগ।

একটা সময় আছিল, অভিজাতরা বাঘ, হরিণ, হাতি, লাঠিয়াল, বাঈজী পুষিতেন। সময় বদলাইয়াছে। এখন অভিজাতরা প্রগতিশীলতা, উদারতাবাদ, সুশীলতা আর POWER পুষিয়া থাকেন।

[আমার লেখা পড়ে যদি কেউ তব্দা মেরে ভাবতে বসেন, এই কাব্যটা কি বেটায় আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলল-তাহলে বলব, প্লিজ, আমি কখনোই কাউকে মাথায় রেখে বলি না। আমি ঝিকে মেরে বউকে শেখাই না।]

সবাই (কিংবা সবাই না) এখানে নিজেকে বুদ্ধিস্ট (বুদ্ধভক্ত না, বুদ্ধিমানের সুপারলেটিভ) ও জ্ঞানিস্ট ভাবে। আর নিজের মতের সাথে না মিললে তাকে ভাবে একুব (বেকুবের বাঙাল ভারসন।)

এই বাঙালই আবার নিজেকে ভাবে সবচেয়ে কাঙাল, সবচেয়ে বঞ্চিত, ক্ষুদ্র। বৃহতের মোকাবেলায় সবসময়ই সে থাকে কুঞ্চিত। বৃহৎ সবসময় তার আক্রমণের টারগেট। কিন্তু, সময় বদলালে, সেই আবার সবাইকে ভাবে আবাঙাল।

১৬. #majority #personalchoice

রুচি, Fashion, style, class, norm, সবই হল মেজরিটি সিনড্রম। মেজরিটি যা করে, সেটাকেই আমরা অবচেতনে কাঙ্খিত মানদন্ড হিসেবে মনকে program করে দিই। মেজরিটির সাথে না মিললেই, “এহ, ব্যাটা ক্ষ্যাত।” আচ্ছা, কেমন হবে বলুন তো? যদি একদিন ঘুম ভেঙে দেখি আমাদের সবার টেস্ট ও রুচির প্যারামিটারটা উল্টে গেছে? ধরুন, তেতুল পরম মিষ্ট আর রসগোল্লা তেতো বা টক লাগা ধরল? অথবা, সব মানুষ লবণ খেতে দারুন ভালোবাসা শুরু করে দিল, আর চিনি দিলে ওয়াক করে থুহ? কিংবা, ধরুন, রুচির বদলের ফলে, শ্রদ্ধেয় রাণু মন্ডলের গান সবার কাছে লতা মাঙ্গেশকারের মতো লাগা ধরল, আর প্রয়াত লতা-জির গান কাকের কর্কশ ধ্বনির মতো? সেদিন কী হবে? মিজ ঐশ্বর্য রাই বাজার হারাবেন, সেনেগাল বা ইথিওপিয়ার কৃষ্ণসুন্দরীরা বাজার মাতাবেন? সেদিন হতে কি মানুষ গোলাপ ফুলকে ঘৃনা করবে? বনের ঘেঁটুফুল দিয়ে অতিথীকে বরণ করা হবে? লাসভেগাসে কি সেদিন বিশ্বদ ইজতেমার আয়োজন হবে? নাকি তাজমহলের গেটে আনাজ কঁচুর দোকান? না, বেশি কিছু না। অন্তত আপনি যা ভাবছেন-তেমন কিছু না। সেদিনও সূর্য পশ্চিম দিকেই উঠবে। পূবে অস্ত যাবে। সেদিন লিচু লেখার বানান ৯চু হয়ে যাবে না। সেদিন পানিতে আগুন ধরবে না, পেট্রোল দিয়ে আগুন নেভানো হবে না। নারীরা সব হিসেবী আর পুরুষরা চরম বেহিসেবী খরুচে হয়ে যাবে না। এই রে, কী পাল্টাউল্টো! ইয়ে, আপনি আসলে কী ভেবেছিলেন-সেটা শুনি। নিশ্চয় ভাবেননি, সেদিন মানুষ গোবরের মজাদার চাটনি দিয়ে কচুর লতির ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়া শুরু করবে?

১৭. #newyear #culture #heritage #boishakh #freedomofspeech #freedomofopinion #personalfreedom #definitionoffreedom #definitionofindependence

যে কোনো কিছুর ধারক বাহক হবার জন্য একাডেমিকস একটা বড় ফ্যাক্টর। তবে মাস্ট নয়।ব্যক্তি স্বাধীনতা সভ্যতা গড়ে উঠবার, বিবর্তনের অন্যতম প্রধান ডেলিভারেবলস। তাকে অস্বীকার করবার প্রবণতা নতুন করে পশ্চাতগমনের শামিল।

প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ ও কোরবাণী এলেই দেশে কিছু স্ববিরোধী গোষ্ঠীর ম্যাৎকার শুরু হয়। পহেলা বৈশাখের যাবতীয় আচার বা উদযাপন নিয়েই এদের আপত্তি। তবে সবচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র হল মঙ্গল শোভাযাত্রাকে টার্গেট করা। কারন, ওটাকে ধর্মের বিপরীতে দাড়া করবার চেষ্টায় কষ্ট কম, সাফল্য’র সম্ভাবনা বেশি।

পহেলা বৈশাখের আচার-অনুষ্ঠান (যাবতীয়) এর বিরোধীতাকারীরা দুই ভাগ-একদল স্পষ্টতই নব্য ধর্মীয় উৎকর্ষ ও বেনামাজি অসৎ ধার্মীক। এরা ফেসবুক মোল্লাদের কাছে দ্বীন শিখে ধর্ম ধর্ম করে ম্যাৎকার করে। আরেকটা দল আছে। তাদের বিরোধীতার অস্ত্র হল “সাংস্কৃতিক আগ্রাসন”। এরাও সৎ নন। কারন, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন নিয়ে তারা সত্যিই ভাবিত নন। তারা শুধু বৈশাখের আচারগুলোতেই নিমগ্ন। নিজেরা হাজারটা আরও আগ্রাসনের সেনানী ও লাভার হলেও তাদের আপত্তি শুধু এই একটা বিষয়ে।

ঠিক যেমন, কোরবাণী এলে কিছু মানুষ পশুপ্রেমি হয়ে যায়। সারাবছর সমানে হ্যামবার্গার ও চিকেন ফ্রাই খেলেও এই সময়ে তারা পশুপ্রেমি। এদের স্টান্সটাও ভন্ডামী।আপনার কোনো কিছু ভাল না লাগতেই পারে। আপনি সিগারেট খান না। তাই বলে যারা খায়, তাদের সব হারামজাদা বলে গাল দিতে পারেন না। আপনি বিয়ার খান, তাই বলে সব কোক পানকারীকে বেকুব বলতে পারেন না। এটাই ব্যক্তি স্বাধীনতা। স্বাধীনতার খুব চমৎকার একটা সংজ্ঞা আছে। আমি ওটা প্রিন্ট করে সামনে লটকে রাখি।

আমার চোখে গণতন্ত্র, আমার কাছে গণতন্ত্র, আমার নিজস্ব দর্শনে গণতন্ত্র হল -আমি যা বিশ্বাস করি, আমি যেভাবে চিন্তা করি, আমার কাছে যেটা যেমন, সেই বিশ্বাস ও ভাবনাকে নিজের মধ্যে ধারণের মুক্ত অধিকার, চাই সেটি যেমনই, বা যা-ই হোক। একইসাথে, আমার সেই বিশ্বাস, চিন্তা, ভাবনা বদলাতে বাধ্য হবার; কিংবা আমি যা বিশ্বাস করি না-তা বিশ্বাস করে নেবার দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান চাপ বিহীন পরিবেশ; এবং অবশ্যই, আমার সেই বিশ্বাস, ভাবনা ও চয়েজকে নির্ভয়ে প্রকাশ (এবং নিজের চৌহদ্দিতে পালনের) অধিকার ও পরিবেশ।

গণতন্ত্র নিয়ে দুটো সত্যি আছে।

এক-গণতন্ত্র হল সবচেয়ে দুর্বল ও মূর্খ ব্যবস্থা।

দুই-গণতন্ত্র হল বেস্ট এভেলেবল।

মানে হল, এই দুটো সত্যকে মাথায় রেখেই চলতে হবে আপনাকে। যেহেতু এখনো কোনো বিকল্প হাতে নেই। হ্যা, বিকল্প আছে। সেটা অনেক ব্যয়বহুল। সেটা হল নিয়মিত গণঅভ্যত্থান ও আত্মদান। অবশ্য আরেকটা দীর্ঘমেয়াদী পথও আছে। খুব সরু। সেটা হল, ধীরে হলেও সময়ের সাথে সাথে প্রতিষ্ঠান তৈরী, জনগণকে তৈরী।

আর স্বাধীনতা হল-একজন ব্যক্তি মানুষের একান্ত নিজস্ব ইচ্ছা, অনুভূতি, বোধ, বিবেচনা, চয়েজ, টেস্ট, চাহিদা অনুযায়ী নিজের ডিসকোর্স নির্ধারনের এবং নিজের ইচ্ছাকে বাস্তবায়নের ও উপভোগ করবার অ্যাবসলুট ও এক্সক্লুসিভ অধিকার;যেই উপভোগ ও প্রতিপালন অন্য একজন ব্যক্তি মানুষ বা মানুষদের একই রকম অধিকার উপভোগে বাধা হয়ে দাড়ায় না। আশা করছি বোঝাতে পেরেছি।

আপনার যেমন বিশ্বাস করবার, সেই বিশ্বাস প্রকাশ করবার ও সেই অনুযায়ী নিজের জীবন চালাবার পূর্ণ স্বাধীনতা ও অধিকার আছে, যে, সূর্য পূর্বদিকে ওঠে; ঠিক তেমনি দুনিয়ার বাকি যে কারো বিশ্বাস করবার, বিশ্বাস প্রকাশ করবার ও সেই অনুযায়ী চলবার পূর্ণ অধিকার ও স্বাধীনতা আছে, যে, সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে না। মেজরিটি হওয়া কোনো কিছুর অথেনটিসিটি ও এপ্রোপ্রিয়েশনের ডিফলট নিশ্চয়তা দেয় না। আরেকজনের কী বিশ্বাস করা, ভাবা ও জানা উচিত-সেটা আপনি বলে দেবার, নির্ধারন করে দেবার কেউ নন। যাস্ট কেউ নন। সেই বিষয়টা যা নিয়েই হোক। আপনি বড়জোর কাউকে যুক্তি দিতে পারেন। দ্যাটস এনাফ। সেটাও তিনি চাইলে পরে। গায়ে পড়ে না।

আই রিপিট, কেউ যদি বিশ্বাস করেন যে, সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে না-তাকে চেপে ধরার, ট্রল করার, হুমকি দেবার, হামলা করবার কোনো বৈধ অধিকার আপনার নেই। যাস্ট নেই। কুকুর, বিড়াল, পেঁচার প্রপস নিয়ে রাস্তায় কতক্ষণ রোদের মধ্যে ভাজা ভাজা হওয়াকে আপনার ফালতু মনে হতেই পারে। আবার, কারো কাছে সেই অর্থহীন কাজকেই পরম শান্তির মনে হতে পারে। এই যে, আপনি তার কাজটা করেন না-তিনি কি আপনাকে কখনো বলেছেন, আপনি বেকুব, এমন মজার জিনিস এনজয় করছেন না। বা, আপনি অপদার্থ? বলছেন না। কিন্তু, আপনি ঠিকই তার কাজকে সারাক্ষণ অপদার্থের কাজ বলে গালি দিচ্ছেন। এটা ব্যক্তি স্বাধীনতার লঙ্ঘন।

বিশেষত, একটা কাজ যখন বিশাল একটা জনগোষ্ঠী পালন করে, তাদের সেই কাজকে আপনি চট করেই ফালতু, ধর্মহীনতা, পাগলের কাজ বলে ট্রল করতে পারেন না। অন্যের মতামত, চয়েজ, টেস্ট, বিবেচনা ও সিলেকশনকে পারস্পরিক সম্মান দেবার শিক্ষা সভ্যতা আমাদের শিখিয়েছে। এরকম অনেক মৌলিক বিষয়ের ওপরই সভ্যতা দাড়িয়ে আছে।

১৮. #artofcriticismanalysis প্রগতি ও মুক্তমত চর্চার এক নরকে:

আমরা কি দিনকে দিন কুপমন্ডূক, জড়ভরত, রিজিড কূয়োর ব্যাঙ হয়ে যাচ্ছি? বা যাওয়াকে আপন করে নিচ্ছি?

কিছু একটা লিখব বা বলব-বড় একটি গ্রুপ সেটির কনটেক্সট, থীম বা ব্যাকগ্রাউন্ড না বুঝে, কিংবা, বুঝবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করেই,

”তাইলে কি আপনে ………ডা বুজাইতে চাইলেন?”; “তার মানে কি আমনে………………….?”-বলে হামলা করবে। রিসেশন নিয়ে সামান্য লিখেছি। লিংকডইনে একজন মন্তব্য করেছেন, “তার মানে, রিসেশন না আইলেও আমনে হেতেরে টাইনা দইরা লই আইবেন, না?”

কীসের মধ্যে কী? পান্তা ভাতে ঘি।

জ্ঞান, প্রজ্ঞা, শিল্প, সাহিত্য, প্রগতি, বিজ্ঞান চর্চার জন্য এক জীবন্ত চিতা এই প্রিয় উগান্ডা। এখানে যা কিছু নিয়ে কথা বলতে চাইবেন, সাথে সাথে বিপুল সংখ্যক পাঠক (যারা এমনিতে কোনো লেখায় রেসপন্ড করেন না) ঝাঁপিয়ে পড়ে আপনাকে জানান দিতে থাকবেন-

-”এইডা নিয়া লিকলেন ক্যাঁ, এইডা তো হেই ১৭০০ বচ্চর আগেই ফিকশ হই গ্যাচে।”

-”এই বিতর্ক তো সেই ২০২২ বছর আগেই সমাধা হয়ে গেছে। নতুন করে কেন বিতর্ক বাড়াচ্ছেন?”

-”এই কথা তো সেই ৫১ বছর আগেই চ্যাতোনা প্রাপ্ত হয়ে গেছে।” আবার কেন বেহুদা খোঁচান?”

-”এই কতা তো বহু আগেই জাতি মানি লইচে।”

-”এইডা তো হাজার বচ্ছরের ঐতিহ্য। এইডা লই হইরচেন ক্যাঁ?”

-”আমনে অধম্মের আইনের বিরুদ্দে কইতাছেন?”

-”আপনের কি মাতা মুতা গ্যাছে গা?”

-”আমনে কি হূরতাদ?”

-”আমনেরে এই টোপিক লইয়া কতা কওয়ার অদিকার ক্যাডায় দিচে?”

-”আমনে ক্যান বেগুন লইয়া গোবেচনা করলেন, কেন ঝিঙ্গা নয়?”

পর্যালোচনা ও সমালোচনাকে যে জাতি গুলিয়ে ফেলে, তাদের জন্য ‘বিষাদ সিন্ধু’ই হল ইতিহাস। শাহনামাই হল ‘ক্যাতাব’।

আপনার বাকস্বাধীনতা, নিজস্ব মতামত, নিজস্ব বিশ্বাস, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ধারনের অ্যাবসল্যুট ও স্বাধীন অধিকার আছে। স্বাধীনতা আছে স্বর্গ বা নরক-যেকোনো একটা বেছে নেবার। স্বাধীকার আছে যে কোনো বিষয় নিয়ে নিজের মতো কথা বলবার। রেশনাল পর্যালোচনা করবার। অধিকার আছে ইগনোর করবারও। ব্যাস।

যে অধিকার বিন্দুমাত্র আপনার নেই, সেটা হল-

সমালোচনা করবার।

মিথ্যা বলবার।

ডিসইনফরম করবার।

টুইস্ট করবার।

লেখকের বা শিল্পীর ইনটেনশন নিয়ে কথা বলবার।

ব্যক্তি আক্রমণ করবার।

যুক্তি ছাড়া গোয়াড়ের মতো হামলে পড়বার।

লেখক বা শিল্পীকে কী নিয়ে লেখা উচিত ও কী নিয়ে লেখা উচিত না-সেই উপদেশ দেবার।

লেখক বা শিল্পীকে কোথায়, কীভাবে বলা বা লেখা উচিত-তা ঠিক করে দেবার।

কনটেক্সট বোঝায় চেষ্টা না করে, বা ব্যর্থ হয়ে জাজমেন্টাল মন্তব্য করার।

কনটেক্সটের বাইরে আবোলতাবোল মন্তব্য করার।

যেকোনো পোস্টে গিয়ে নিজের পণ্যের মার্কেটিং করবার।

লেখা বা সৃষ্টি যেমন একটি আর্ট, তেমনি পর্যালোচনাও একটি আর্ট। ওটা কেবল মন্তব্য করলেই রপ্ত বা সিদ্ধ হয়ে যায় না। কোনটা সমালোচনা আর কোনটা পর্যালোচনা-আগে শিখতে হবে। সমালোচনা করবার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। পর্যালোচনার উন্মুক্ত আমন্ত্রণ সবাইকেই দেয়া থাকে। পর্যালোচনাও ঢালাও না, তারও একটা গ্রামার থাকে। পর্যালোচনার গ্রামার জানুন ও মানুন। আবারও বলি, সমালোচনার অধিকার নেই, যেটার অধিকার আছে, সেটার নাম পর্যালোচনা।

যারা মনে করেন, জগতের সবকিছুই সমাধা হয়ে গিয়েছে, সব বিষয়ই ফিক্সড হয়ে গিয়েছে, সব কিছুই চিরস্থায়ীভাবে সমাধা ও নির্ধারন হয়ে গিয়েছে, তাদের জন্য সমবেদনা। চর্চা, প্রশ্ন, বিতর্ক, যুক্তি, নতুনত্ব, বিবর্তন, পরিবর্তন, পরিমার্জন, নবায়ন-জগতের চিরাচরিত নিয়ম। আর জেনে রাখবেন, খোদ পৃথিবী বা ধরিত্রি নিজেও এখনও তার নিজের পেটের ও গাত্রের গঠন শেষ করেনি। তার পেটের ভেতরে এখনো নিয়ত ভাঙাগড়া চলছে। তারই কিছু জঠর যন্ত্রনার বহিঃপ্রকাশ মাঝে মধ্যে ভূমিকম্প বা অগ্নুৎপাতের সময় আমরা দেখি।

যেখানে পৃথিবী নিজেই এখনও অস্থীর, তখন জগতের সবকিছু স্থীর হয়ে বসে থাকে ‘ক্যামনে’?

১৯. সমালোচনার সীমানা, পর্যালোচনার ব্যাকরণ:

একটি অপরাধ আরেকটি অপরাধকে legitimate করতে পারে না। একটি অপরাধের বিচারহীনতা আরেকটি অপরাধকে legitimate করতে পারে না। একটি ভাল কাজ একটি অপরাধকে legitimate করতে পারে না। একটি অপরাধ একটি ভাল কাজকে Illegitimate করতে পারে না। প্রতিটি ভাল কাজ ও প্রতিটি অপরাধই একক একেকটি ঘটনা। একটি আরেকটির ঢাল বা প্রতিবন্ধক হতে পারে না। মতপ্রকাশ এবং সামাজিক প্রতিবাদ কোনো খতনার মতো না, যে, মোল্লাবাড়ির ছোট পোলার খৎনা দিলে তালুকদারের বড় পোলার খৎনাও দিতেই হবে। কোনো ইস্যুতে কথা বললে এটা জরুরি না, যে, অন্য একইরকম দশটা নিয়ে কথা বলতেই হবে। কিংবা এটা নিয়ে বললে আর সেটা নিয়ে বলা নিষেধ। সামাজিক প্রতিবাদের কোনো ফরজ, ওয়াজিব নাই। না বুঝে থাকলে, ভারত নিয়ে কথা বললে পাকিস্তানকে নিয়ে বলতেই হবে, কিংবা শাহেদকে নিয়ে বলতে হলে সাবরিনা খলিফাকে টানতেই হবে-এমন কোনো মাথার কিরা তো সক্রেটিস দিয়ে যান নাই।

২০. সস্তা মিথ্যা: #lie #flattering #criticism

দুনিয়াতে দুইটা অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রচলিত মিথ্যা কথা আছে।

এক: সবাই বলবে আমি প্রশংসা একদম পছন্দ করি না। মিথ্যা কথা। মুখে বললেও সবাইই প্রশংসায় বিগলিত হয়। মনে মনে খুশি হয়। প্রমান চান? তাহলে খেয়াল করেন, কারো প্রশংসা করলে কখনো দেখছেন তা অস্বীকার করতে? বা তার ব্যখ্যা দিতে? প্রশংসা করার পর গালের রংটা দেখছেন?

দুই: সবাই বলবে আমি সমালোচনা অত্যন্ত পছন্দ করি। আমার সমালোচনা কর। ডাহা মিথ্যা কথা। দুনিয়াতে কেউ নিজের সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। সামনে যাই বলুক। মনে মনে সমালোচকের গুষ্টি উদ্ধার করতে ছাড়ে না। আর আপনি সমালোচনা করলে তার ব্যখ্যা দিতে যায় না এমন কাউরে দেখছেন? হাচরাইয়া পাচরাইয়া একটা ব্যখ্যা দেবেই। আর তখন চোখের দৃষ্টিটা খেয়াল করে দেখবেন। শালার দুনিয়া। বাঙালি সমালোচনা সহ্য করতে পারে না।  ইন ফ্যাক্ট, বাঙালি শুদ্ধভাবে সমালোচনা করতেও পারে না।

২১. আপনি বলবার কে?

পাড়া মহল্লায়, একই কমিউনিটিতে কারো অপত্য সন্তান যদি কোনো অন্যায় করে, তাহলে তার বাবা-মাকে সেটি জানাতে গেলে প্রায়শই শুনতে হয়, “তোমার তো  নিজের পোলাপান নাই, তুমি বাঁজা মানুষ, পোলাপান মানুষ করার তুমি কী জানো?” মানে হল, ন্যায্যতা বা বাচ্চাদের ভুল নিয়ে কথা বলতে হলে আপনাকে অবশ্যই আগে বাবা-মা হয়ে নিতে হবে। নিজের ভুল বা অন্যায়কে যায়েজ করার নয়া স্টাইল এটা। মানে, আপনি একজন উকিলের ভুল, অন্যায় নিয়ে কথা বলতে চাইলে আগে উকিল হতে হবে। ড্রাইভারের ভুল ধরিয়ে দিতে পারবেন না, যদি আপনি ড্রাইভার না হোন। একই ফিলোসফি ও যুক্তিতে, আপনি দেশের অর্থনীতি নিয়ে কথা বলতে হলে আপনাকে চেতনাধারী ইকনোমিস্টই হতে হবে। অন্যথায়, আপনি কিছুতেই প্রশ্ন করতে পারবেন না, যে, কেন প্রকল্প ব্যায় বাড়ল বা বাড়ে। এই ইল-লজিকের গোড়াপত্তন বহু আগে। আমাদের গড়পড়তা সবার মধ্যে সেটার বীজ বুনে দেয়া হয়েছে শৈশবেই। আমরা কম-বেশি সবাইই কিন্তু এই ফিলসফিতে বিশ্বাস করি-চেতনে, বা অবচেতনে। আমাদেরকে এই ভুল লজিকের পাঠ দেয়া হয়েছে শৈশবে, যখন আমাদেরকে বাগধারা পড়ানো হত-”আদার ব্যাপারী জাহাজের খবর”। হ্যা, আদার ব্যাপারীও জাহাজের খবর রাখতেই পারে। ঠিক যেমন, ক্রিকেটের ক’ও না জানা আমি প্রশ্ন করতেই পারি, যে, ৯০০ কোটি টাকা জমা করা বেশি জরুরী, নাকি ৬৪ জেলায় ৬৪টি ক্রিকেট একাডেমি করা জরুরী। [সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অত্যন্ত দামী কথা মনে হওয়ায় আমি জনাব আব্দুল্লাহ মাহমুদের লেখার কিয়দাংশ মাঝে যোগ করলাম: ইউরোপ সহ পশ্চিমা বিশ্বে ওয়াইন এর স্বাদ পরিক্ষা করা একটি পেশা। নামী দামী বার রেস্টুরেন্টে এরা ওয়াইন খেয়ে পরীক্ষা করে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন, ওয়াইনটি কতটা ভাল ছিল তা নির্ধারণ করেন। তাদের মাসিক বেতন তিন চার লাখ টাকা। ওয়াইন প্রস্তুতকারক কোম্পানীগুলো আবার ভিন্ন মানের টেস্টার নিয়োগ করেন, তাদের বেতন মাসিক বিশ ত্রিশ লাখ টাকাও হয়। এরা কি জানেন ওয়াইন কিভাবে তৈরী করতে হয়? এরা নিজেরা কি ওয়াইন বানাতে পারেন? উত্তর হলো “না” এবার চিন্তা করুন ফ্রান্সে একজন টেস্টার, যে বড় কোম্পানিগুলোর ওয়াইন খেয়ে মতামত দেন, যার বেতন হয়ত পনের বিশ লাখ টাকা, সে ওয়াইন টেস্ট করে বললেন, নাহ ওয়াইনটি ভাল হয় নি। ওয়ানারীর মালিক বলল, পারলে এর চেয়ে ভাল বানিয়ে দেখান? ডাস্টিন হফম্যান কিংবা টম হ্যাংকস এর ছবির সমালোচনা লিখেন এমন কিছু লোক যারা জীবনে কখনও অভিনয় করেন নি, কিন্তু অভিনয় বুঝেন। আমিতাভ বচ্চন কখনোই নাসিরউদ্দিন শাহ এর মুভির সমালোচনা লিখেন না। কারন তারা দুজনেই অভিনেতা, সমালোচক নন। তারা সমালোচনা লিখতে পারবেন না তা নয়, কিন্তু পেশাদার সমালোচকদের হাতেই দায়িত্ব দেয়া হয়। সে সব সমালোচক কে কেউ বলেনা, আসেন আমার মত অভিনয় করে দেখান। আমাদের দেশে ক্রিকেটারদের খেলার মুল্যায়ন করেন কখনও প্রাক্তন খেলোয়াড়রা, কখনও ক্রীড়া সাংবাদিকরা। সমালোচকদের মতামত যে সর্বদা সঠিক হয় তা না, কিন্তু তার নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষন অবশ্যই থাকে, তার সাথে কেউ এক মত হতেও পারে, নাও পারে। কিন্তু এর বাইরেও সাধারন দর্শকরা সমালোচনা করে। সোশ্যাল মিডিয়াতে তাদের সমালোচনাই বেশী। এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, এরকম আম জনতার কি সমালোচনা করার অধিকার আছে? আমাদের ক্রিকেটাররা লাখ লাখ টাকা বেতন পান, অনেকের বাৎসরিক আয় কোটি টাকা। আমাদের ক্রিকেটাররা হেলিকপটারে যাতায়াত করে। এসব টাকা কে দেয়? তাদের বেতন কিংবা বিজ্ঞাপন থেকে যে আয় করেন সে অর্থের যোগানদাতা কে? কোন মন্ত্রী কিংবা বিসিবির পরিচালক কি নিজের পকেট থেকে ক্রিকেটারদের বেতন দেন? সবই সাধারন জনগনের পয়সা প্রতক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে। আপনি আমাকে টাকা দেন না, সুতরাং আমাকে চার মেরে দেখাতে হবে না। আমি আপনাকে টাকা দেই, এজন্যই আপনি আমার আশা পূরণের চেস্টা করবেন।] প্রশ্ন করা ও প্রশ্ন তোলার অধিকার কখনো রহিত হয় না। প্রশ্ন করা ও প্রশ্ন করতে দেয়া-নিজের স্বার্থেই দরকার। এটি পৃথিবীর আদিমতম লজিকগুলোর একটি।

২২. ব্রেক অব প্রাইভেসি:

আপনার ভাল লাগুক, বা না লাগুক, আপনার বিশ্বাস হোক, বা না হোক, আপনি মানেন, বা, না মানেন, আপনি যদি কোনো প্রথাগত রাষ্ট্রব্যবস্থায় বসবাসরত থেকে থাকেন, তাহলে- >যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আদালত কাউকে ”অপরাধী সাব্যস্ত করে রায় না দিচ্ছে”, ততক্ষণ তাকে অপরাধী হিসেবে অভিহিত করাও অপরাধ। >অন্যের জীবন, চরিত্র, কর্মকান্ড, স্ক্যান্ডাল, অপরাধ নিয়ে প্রকাশ্যে বা গোপনে (তার অবর্তমানে) কথা বলা গীবত (ও ধর্মীয় অপরাধ)। >প্রকাশ্য মিডিয়াতে নিজের বা যে কারো ব্যক্তিগত আচার, গোপন জীবন, স্ক্যান্ডাল বা তার প্রমাণ নিয়ে আলাপচারিতা, মকারী অসুস্থ সংস্কৃতির লক্ষণ। >(যতটা জানি) বিবাহ বহির্ভূত শারিরীক সম্পর্ক (সার্ভিস রূলসে) শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। তাই ”নৈতিক স্খলনের দায়ে” কারো চাকরি খেতে হবে-দাবী তোলার এখতিয়ার আইনে নাই। বলতে পারেন, এহেন কাজ প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করলে তখনতো তাকে ফায়ার করাই যায়। কথা হল, অন্যের ’যৌনজীবন’ অফিসের অন্যদের কীভাবে ক্ষতির কারণ হয়? >এই তীব্র প্রতিযোগীতার যুগে স্ক্যান্ডালের মতো বিষয় নিয়ে কথা বলার বা পড়ার মতো সময় আপনার হাতে আছে, মানে হল, আপনি মোটামুটি বিপদে আছেন। >যেই অপরাধের কোনো না কোনো ধরন আপনি নিজের জীবনে গোপনে ধারন করেন, তারই আরেকটি ফর্ম নিয়ে অন্যকে পঁচানো আপনাকে ভন্ড ও তুচ্ছ একজন মানব হিসেবে পরিগণিত করায়। >কেউ অপরাধী হোক, বা নিরপরাধ, তার ব্যক্তিগত জীবনের কোনো গোপন তথ্য বা ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করা বা শেয়ার করা রুচিহীনতা ও অপরাধ। >এমনকি অপরাধীরও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে গসিপিং বা ট্রলিং করা সামাজিক ও আইনগত অপরাধ।

২৩. অপরাধ ও অনৈতিকতার ভেদ: #whitecolorcrime #classstatus #classconflict #classdiscrimination #corporatecult

ইংরেজিতে Mistake ও Wrong দু’টো শব্দ আছে। এক অর্থে দু’টোরই মিনিং এক-ভুল। তবে ভাল করে দেখলে দেখবেন, দু’টো দু’রকমের ভুল। Mistake হল অনিচ্ছাকৃত ভুল বা কাজ করতে গিয়ে হঠাৎ হওয়া বিচ্ছিন্ন ভুল যার পেছনে কোনো ইনটেনশন কাজ করেনি। আর Wrong হল সেই ভুল যা ইনটেশনালি করা বা বারবার একই ভুল করা বা ইচ্ছা করে কোনো ভুল করা। সোজা কথায় বললে, Wrong মানে ভুল না, অন্যায়। ব্লু করার জব ও হোয়াইট কলার জব নামক দুটি অধরা বস্তু আছে। দুটির জন্যই সদ্য পাশ করা টগবগে স্নাতক হতে শুরু করে রানিং কর্পোরেট দাস সবাই লালায়িত। কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে আবার দুই কলারের মালিকরা ক্লাস মেিনটেইন করে তফাতে থাকেন। সবকিছুতে একটা প্রকাশ থাকে যে তারা হোয়াইট। বুলু (ব্লু) আর হোয়াইট তো আর এক কাতারের নাগরিক বা মানুষ না। ব্লু) আর হোয়াইট তো আর এক কাতারের নাগরিক বা মানুষ না। কলারের রং যাই হোক, একপদের প্রানীকে কলার দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। কলারে বেধেই ভাতের ফ্যান দেয়া হয়। কলারে দড়ি বেঁধে ঘুরাতে নিয়ে যাওয়া হয়। বুলু আর হোয়াইটের মারামারি দেখলে সেই প্রানীটার নাম মনে পড়ে। পৃথিবীতে লিগ্যাল ও এথিক্যাল এবং ইলিগ্যাল ও আনএথিক্যাল এই চারটি বিষয় আছে। অনেক বিষয় আছে যা লিগ্যাল কিন্তু আনেএথিক্যাল। আবার অনেক কাজ ইলিগ্যাল কিন্তু এথিক্যাল। আবার হোয়াইট কলার জব ও ব্লু কলার জব যেমন আছে তেমনি হোয়াইট কলার ক্রাইম ও ব্লু কলার ক্রাইম আছে। দুইরকম ভুল আছে-ভুল করা আর……… ভুল করা। একটা হল ভুলক্রমে কোনো কাজ করা যেমন-আমি ভুলে আমার ব্যাগটা ফেলে গেছি। আর আরেকটা হল অন্যায়স্বরুপ কোনো কাজ করা-যেমন-আপনি এতিমের হক নষ্ট করছেন, আপনি ভুল করছেন।

২৪. আপনি আচারি ধর্ম: #maturity

তুমি নিজের বাদে অন্য যে কারো কথা, কাজ, আচরন, বিশ্বাস ও বুদ্ধির বহর দেখে হাস্যরস, পরিহাস, বিরক্তি, ক্রোধ, ঘৃনা পোষণ ও উদগীরন করার আগে,

ভেবে নাও, সমস্যা তার? নাকি তোমার?

অন্যের সমালোচনার আগে ভেবে দেখো, তুমিই বরং তার কাজ ও কথাকে না বোঝার মতো Immature কিনা।

রাস্তাঘাটে, পাড়ামহল্লায় পোলাপানের কাজ বা অকাজ দেখে ঢ়ি ঢ়ি করে ওঠার আগে বুঝে নাও, হয়তো তুমিই ব্যাকডেটেড ও ইমম্যাচিওর। তোমার নাবালেগত্বের জন্য তো তুমি দায়ী। অন্য কেউ না। We earn maturity at the cost of our innocence.

#judgementalpeople #judgementalattitude #CognitiveBias #ConfirmationBias #inferioritycomplex #SuperiorityComplex #SupremacySyndrome #privacybreak #underestimate #CriticismAnalysis #comparativechoice #classconflict #classicalvsordinary #freedomofspeech #freedomofopinion #personalfreedom #personalchoice #respecttodisagreement #backbiting #gossip #curiosity #breakofprivacy #bangali #criticism #LegitimacyOfCrime #Justifying #socialdemonstration #crime #voiceagainstcrime #voiceraising #indemnity #exemption #crime #পাছেলোকেকিছুবলে #পরচর্চারছলে #চালুনবলেসুঁই #লোকলজ্জা #সমালোচনা #পর্যালোচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *