কাকে যেন একবার বলেছিলাম, কর্পোরেট আপনাকে এমন একটি লোভনীয় মূলা (মানে মাইনে ও অন্যান্য আর কি) দেবে, যেটা দিয়ে আপনি তৃপ্ত স্ত্রী, বন্ধুমহল, আড্ডা, বিদেশ গমন, একটি চার চাকার যন্ত্রশকট, ছো্ট্ট মুরগীর খোপ-এসব নিয়ে সমাজের দশজনের একজন হয়ে নিজেকে হৃষ্ট পুরুষ হিসেবে সুখী করতে থাকবেন। শান্তি না থাকলেও, সেখানে সুখ আছে। এই আরামের লোভ ছাড়বার মতো সাহস আপনার হবে না।
আবার কর্পোরেট আপনাকে এতটা বেশিও দেবে না, যা থেকে মোটা একটি অংশ বাঁচিয়ে অচীরেই আপনি কর্পোরেটকে যেকোনো সময় বিদায় বলার মতো ঘাড় মোটা করতে পারবেন। ফলাফল? কর্পোরেট সুখের চোরাবালিতে আজীবন ”দিন যায় কথা থাকে।” কর্পোরেট কখনো কর্পোরেটের দাসত্ব হতে বেরিয়ে যাবার সাহস করবার সুযোগ দেবে না। শো-বিজ জগতের মতো কর্পোরেটের এই চাকচিক্যময় জগতের হাতছানি আসলে একটা চোরাবালির মতো।
এই কর্পোরেট চোরাবালির আপাত চকচকে অবয়ব, ঠাটবাট, চকচকে শানশওকত মানুষকে একটা অলীক প্রাপ্তির মোহে আটকে ফেলে। অন্যের অনুগ্রহের গলগ্রহ নিয়ে নিজে দেওয়ালির বাজির মতো ঝলমল করে পুড়তে থাকার উচ্ছাসে বুঁদ করে রাখে।
এই চোরাবালির মোহ কখনো মাথা উঁচু করতে দেবে না। এই চকচকে ভাড়াটে আভিজাত্য ছাড়বার সাহস করতে দেবে না। ম্যাড়মেড়ে অথচ সাবলম্বি কোনো এভাটারে ট্রান্সফর্ম হতে বাধা দেয় এই কর্পোরেট চোরাবালি।
শো-বিজের মানুষেরা যেমন আজীবন কখনো এই রূপালী জগতটার মোহ হতে বের হতে পারে না, ঠিক তেমনি, নীল কর্পোরেটের ফাঁদে আটকে পড়ে কর্পোরেট পতঙ্গরা।
ফলাফল……………..রেখো মা দাসেরে মনে।
আপনার অঘোষিত #valueproposition কী-জানেন? মানে, আপনাকে পে করা হয় কেন জানেন? #whyareyoupaid মানে আপনাকে কীসের জন্য মাইনে দিয়ে বায়না করা হয়েছে-তা জানেন?
আপনি হয়তো ভাবছেন, যে, আপনার পণ্য, বা মেধা বা শ্রমের দাম হিসেবেই কেবল আপনাকে পে করা হয়। আদতে, আরও অনেক কিছু আছে।
১. বিজনেস করার জন্য। আপনার ’কফিল’ এর বিজনেস ইন্টারেস্ট পাহারা ও পালবার জন্য আপনাকে মজুরী দেয়া হয়।
২. সাম্রাজ্য সাম্রাজ্য ফিলিং দেবার জন্য। প্রত্যেক কফিলের জন্য তার প্রতিষ্ঠান একটি এমপায়ার। সেই এমপায়ারে তিনিই স্বঘোষিত সম্রাট। সেখানে তাকে একটা সাম্রাজ্যবাদী প্রভূর মতো উচ্চাসনে বসিয়ে নতমস্তকে কুর্নিশ করে তাকে এমপায়ারের থ্রিল অনুভব করানোর জন্য আপনাকে রাখা হয়েছে। আপনি সেই আয়োজনের কুশিলব হওয়ায় পেমেন্ট পান।
২. প্রতাপ দেখানোর জন্য। ওই যে বললাম, এমপায়ার। সেই এমপায়ারে আপনার ওপর রাগ, গোস্বা, হুহুঙ্কার প্রয়োগ করে নিজ নিজ প্রতাপ প্রমান ও ধার দিয়ে নেবার জন্য আপনাকে বিলিগোট হিসেবে ব্যবহার করা হবে। তার বিনিময়ে আপনাকে সামান্য কড়ি দেয়া হয়।
৩. ফ্রাস্ট্রেশন উগড়ে দেবার জন্য। এমপেরর বাহাদুর ও তার উচ্চবর্ণীয় লেঠেল, বরকন্দাজ, রাজন্যবর্গের ব্যক্তিগত ফ্রাস্ট্রেশনের ভেন্টিলেশন আপনার ওপর প্রয়োগ করে প্রশমিত করা হবে। মানে আপনি পিকদান। সেটাও আপনার মাইনে পাবার কারন।
৫. প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য। কত্তাদের মনের মধ্যে জমা প্রতিহিংসার আগুন, বিশেষত গৃহরমনীর ওপর সঞ্চিত প্রতিহিংসা উগড়ে দেবার জন্য আপনি আছেন। তাইতে……
৬. এক্সপিরিমেন্ট করবার জন্যও। আপনাকে অভাবনীয় সব কল্পনার ল্যাবের বিলিগোট বানানো হবে। তার জন্য সামান্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে আপনি সামান্য কড়ি পাবেন।
৭. বিনোদন ও একটা দাসানুদাস পালবার খাহেশ চরিতার্থ করবার জন্যও আপনার কদর আছে। মহান অধিপতি কফিলকে বিনোদন যুগিয়ে যাওয়া এবং একটা কর্পোরেট দাস পালবার যে আজন্ম খাহেশ আমাদের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে, তাকে চরিতার্থ করবার মালমশলা তো হলেন আপনি। তাই………………
কথা বলতে বলতে একটা ছাঁই চাপা আগুন মনে পড়ল। সেটা দাসত্বকে মহানত্ব দেয়া নিয়ে। আপনি কি জানেন, ”তৃণমূল হতে উঠে আসা”-নামের একটি খুব পপুলার মিথ প্রচলিত আছে এই দেশে। বিষয়টাকে চোখ বুজে বিশাল মান্যতা ও আবেগ দেখানো হয়। প্রশ্ন হল, কর্পোরেটের আসপেক্টে আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
ধরুন, এক্সট্রিম কেসে, আপনার ড্রাইভার। সে যদি একদিন আপনার কোম্পানীর পেইড সি.ই.ও নিযুক্ত হয়, এর সার্বিক ফলাফল কতটা ইতিবাচক ও কতটা নেতিবাচক হতে পারে? কোন কোন দিক দিয়ে? ভাবতে থাকুন, বলতে থাকুন।
তবে মজার কথা হল, এই দাসানুদাস হবার বিষয়টি আমাদের রক্তেই আছে। জাতি হিসেবেই আমরা দাসত্ব প্রিয় জাতি। দাস পালবার, দাসের প্রভূ হবার স্বপ্ন আমরা দেখি। দাস হতেও আমরা পছন্দ করি। বর্তে যাই আমাদের কেউ আদরের দাস বানালে। অনেক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানেই দেখবেন, দাসানুদাস থাকে। এবং, তারা খুশি হয়েই এই ভূমিকাতে অভিনয় করে। দাসত্ব বাঙালির রক্তে মিশে আছে বললে আপনি হয়তো একটু মাইন্ড করতে পারেন।
তবে, প্রভূত্ব কামনা বাঙালির রক্তে মিশে আছে বললে হয়তো ততটা ঘেন্না করবেন না আমাকে।
হ্যা, দুটোই-দাস মনোবৃত্তি আর প্রভূত্ব করবার মনোবৃত্তি আমাদের রক্তে আছে।
তারই ঐতিহ্য ধরে রেখে, কর্পোরেটেও প্রভূত্ব ও দাসত্বের লিগ্যাছি চলে এসেছে।
কর্পোরেট নিজেকে মনে করে সম্রাট, জার, বাদশাহ, সুলতান, ডন। আর কর্মী, বা, সম্ভাব্য কর্মী বা জব সিকার হল দাস। যাদেরকে সে করুণা করে ধন্য করবে।
ওদিকে, কর্মী, সম্ভাব্য কর্মী, জব সিকারদের মধ্যেও অতি আনুগত্য ও দাসত্ব বাসা বাঁধে। প্রভূর সামান্য দয়া, করুণা, সামান্য হাসি, কিঞ্চিত সাবাসি পেলে দাস বর্তে যায়।
তারই হাত ধরে প্রভূদের অমরত্ব ও মহানত্ব প্রদানসহ প্রভূর অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য পাহারা ও সমৃদ্ধ করণই হয়ে ওঠে দাসের জীবনব্রত।
দাসত্ব ও প্রভূত্বের এহেন স্বর্গে দাসদের মাথায় কেবল সকাল বিকেলের চায়ে বাড়তি একখানা বিশকুটের আইডিয়া ছাড়া আর কিছু পয়দা না হওয়াই স্বাভাবিক।
অনেকটা আগের দিনের সিনেমায় দারোয়ান রহমত, ড্রাইভার হাসমত, মালি বরকতদের মতো। আজীবন দাসত্ব করেই খুশি। প্রভূ সামান্য কৃপা দেখালে, বা, পিঠ চাপড়ে দিলে কুঁই কুঁই করে, চোখ ভিজিয়ে ফেলে। হয়তো প্যান্টও। প্রভূ কখনো স্বর্গ হতে নেমে তাদের কাতারে ভাত খেতে বসলে তারা আবেগে মরে যায়। আহ, ঈশ্বর এসেছেন ধরায়।
এদেরই একটা শ্রেনী থাকে, যারা কোম্পানীতে নতুন কেউ এলেই দেখবেন, তাকে দেখায়, এই যে দেখছেন জমিজিরাত, বাগান, ইমারত, দশতলা দালান, পুস্কুনি, সব আমার নিজ হাতে করা।
এই শ্রেনীটা তাদের কফিল তাদের তুই তুই করে ডাকে-সেটাও দেখবেন খুব গর্ব ভরে আপনাকে জানাবে প্রথম দিনই। অনেকে আবার চোখ বড় বড় করে আপনার কর্ণকুহর ভারী করবেন অথবা, আপনার কানে সূধা বর্ষণ করে নিজের বুক গর্বে ভরে তুলবেন এই বলে, “জানেন, আমি না এখানে পিয়ন হয়ে এসেছিলাম, আজকে অ্যাডিশনাল পিয়ন পদে পদায়িত হয়েছি।”
দাসত্ব যখন রক্তে মিশে যায়,
স্বপ্ন দেখার আকাশটাতেও বেড়ি পড়ে যায়।
ইচ্ছেগুলো মুখ লুকোয়, বাস্তবতার ঠিকানায়।
আমাদের জীবন ও যাবতীয় কর্মের মঞ্জিলে মকসুদ ঘুরে ফিরে কেন যেন সেই একটা narrow zone এই আটকে যায়।
একটা চার চাকা,
পারলে আরেকটা দুই চাকা,
একটা ১৫শ স্কয়ার ফিট,
একটা ৬ ডিজিট,
বেশ ক’টা FD, Share,
একটা প্রচুর ছাপ্পর যুক্ত পাসপোর্ট।
একটা সুন্দরী ঘরে, দশটা বাইরে।
স্বপ্ন কেন এত ছোট্ট একটা ঘরে আটকে যায়?
স্বপ্ন, ইচ্ছে, বাসনা, চাওয়া, সবই ফিকে। শুধু জানি, সকাল হলেই কড়ির সন্ধানে, পেটের টানে শহরের মাঝখানে কর্পোরেট পাড়াটার পানে ছুটতে হবে। উর্দ্ধশ্বাসে।
ঠিক এই মুহূর্তে বনেদি ও অভিজাত কর্পোরেট পাড়া গুলশানের মোড়ে দাড়িয়ে আছি। শশবস্তে কাঁচকি মাছের ঝাকের মতো মানুষ মুখে ফেনা তুলে দৌড়াচ্ছে। কিলবিল মানুষের ঝাক। রুজির টানে শহরতলি হতে নগরের প্রাণকেন্দ্রে, কর্পোরেট সোনাগাছি পাড়ায় দায়ীত্বের ভাড়ে ন্যুজ্ব মানুষগুলো।
আহা। আহা।
আহা জীবন। আহা স্বপ্ন।
যখন কেউ আমার সামনে বলে, ”কর্পোরেটে আমরা সহকর্মীরা ও আমাদের অফিস একটা পরিবারের মতো”-তখন বুকে একটা চাপ চাপ ব্যথা অনুভব করি। পেটে কিছু একটা সহ্য না হলে পেট সেটাকে এবোর্ট করে দেয় ডায়রিয়া ঘটিয়ে।
মাথায়, তথা চিন্তায় কিছু হজম না হলে সেটা তো ডায়রিয়া ঘটিয়ে এবোর্ট করা যায় না, তাই বুকে চাপ চাপ ব্যথা করে।
কর্পোরেট আর সহকর্মীরা যে কতটা ফ্রেন্ড, কতটা পরিবার-সেটা আমি আমার প্রথম কর্পোরেট আর প্রথম প্রেম, থুক্কু, প্রথম চাকরির সহকর্মীদের ছেড়ে আসার ১৬ বছর পরেও ফিল করি।
যতদিন ছিলাম, মনে হত আহ, এটাই তো সেকেন্ড হোম, এটাই তো পরিবার হারিয়ে পাওয়া পরিবার। আহ কী প্রেম, আহ কী মায়া, আহ কী যতন, আহ কী বাঁধন। একদম মাখো মাখো।
১৬ বছর কেটেছে বিচ্ছেদের। কত চাকরি বদলালাম।
ছেড়ে আসার ১৬ বছরে একটি সিঙ্গেল দিন, একটি সিঙ্গেল মোমেন্ট, একটি সিঙ্গেল ইনসিডেন্ট-সেই মাখো মাখোর শরমে, চক্ষু লজ্জায়ও অন্তত ওই তরফ হতে একটা খোঁজ, নক, হাই এক্সপিরিয়েন্স করার সৌভাগ্য হয়নি। হতভাগা!
একইভাবে সব। একই রকম সবাই। একই রকম পরের প্রেম, থুরি চাকরিগুলোতেও। কেউ এককভাবে কিছু না। সবাই ও সবগুলোই এক।
আমার কাউকে নিয়েই আফসোস হয় না। কাউকে নিয়েই ক্ষোভ জন্মে না। আমার নিজের কাছে বাদে বাকি দুনিয়া ও দুনিয়ার যে কারো কাছে আমার প্রত্যাশা জিরো।
আমি কার, আমি কার,
কে তোমার?
কিন্তু, ওই যে, বললাম, দেড় যুগ কামলা দেবার পরে ওই মাখো মাখোর পরিণতি দেখার পরে, যখন কেউ সামনে আবার উচ্চারন করে, “আমরা অমুক পরিবার”-কামড়ে দিতে ইচ্ছে করে। কাঁচা ঘাঁ খুঁচিয়ে দিলে কার না কামড়াতে ইচ্ছে করে-বলুন?
পরিবার।
আমরা প্রায়শই নিজ নিজ কর্মস্থলকে আবেগের টানে ‘পরিবার’ তকমা দিয়ে নানা কিছু বলি। এই যেমন ধরুন, Welcome to ……………family. আমি নিজেও যে এই ‘ফ্যমেলি’ প্রচারনা জীবনে করিনি-তা নয়।
কর্মস্থলকে ফ্যমেলি ভাবানোর বা বিশ্বাস করানোর একটা প্রচ্ছন্ন চেষ্টা অনেক স্থানেই করা হয়। কর্মস্থলে এনগেজমেন্ট বাড়াবার কতশত প্রচেষ্টাই না হয়।
অথচ, অফিশিয়ালদের পরিবারকে অফিসের ইকোলজি ও কালচারের মধ্যে সংযুক্ত করবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা কখনো করা হয় না। বরং, পরিবার হতে কর্পোরেটদের যতটা বেশি সম্ভব বিচ্ছিন্ন রাখারই চেষ্টা হয়, প্রোডাকটিভিটি ও মনোঃসংযোগের নামে।
কোম্পানীকে ফ্যমেলি ভাবানোর চেষ্টা হয়, আবার, নিজের ফ্যমেলিকে ইগনোরড রেখেই। হাস্যকর।
আমাদের কর্পোরেট ইকোলজিতে কর্মীদের পরিবারকে আরও বেশি আত্মীকরণ করার ভাবনাকে সিরিয়াসলি নেয়ার সময় সম্ভবত হয়েছে। যদিও আমার কাছে মনে হয়, দিনে দিনে আধুনিকতা বৃদ্ধির বিপরীতে অফিসগুলোতে কর্মীদের পরিবারস্থ সদস্যদের আনাগোণা বোধহয় উল্টো কমেছে।
বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরে একটা মীথ প্রচলিত আছে। তা হল-’চাকরী কচুপাতার পানি, বিয়ানে মধু, বিয়ালে হানি (পানি)।’ কর্পোরেটদের একটা অত্যাবশ্যকীয় অনুসঙ্গ হল সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম। এই হাস্যকর ও বিরক্তিকর ইভেন্টগুলোর একটি বড় অংশ আয়োজিত হয় রাতের বেলা। দিনে রাতে যখনি হোক, তার সাথে লাঞ্চ বা ডিনার যোগ থাকে। ওই সেমিনার, সিম্পোজিয়ামগুলোর বেশিরভাগই একদল মানুষের টাকা কামানোর ও সময় কাটানোর মচ্ছব।
ফাইভ স্টার হোটেলের একটা লেট নাইট সেমিনারে গিয়েছিলাম। রাত ১০ টা বাজে। আমি উপস্থিত নারী ও পুরুষ কাউকেই দেখলাম না সামান্যতম উশখুশ করতে। বাড়ি ফেরার কোনো তাড়া আমি তাদের মধ্যে দেখলাম না। কর্পোরেট আমাদের এমনই অভ্যস্ত করে নিয়েছে। আর উপস্থিত বোদ্ধাদের একটা বড় অংশই মোবাইলে ফেসবুকে ব্যস্ত থাকেন সেমিনার চলাকালে। সেমিনার করার সাথে দেশ উদ্ধারের কী সম্পর্ক-সেটা আজও আমি বের করতে পারিনি। সেমিনার ওয়ার্কশপ ঠিক কিভাবে আমাদের কোনো কাজে আসে আজও জানি না।
এক্সপ্লয়টেশন কর্পোরেটের অনুসঙ্গ। অধুনা আমাদের কর্পোরেটগুলোতে পদ, পদবী, স্ট্যাটাস, উন্নতির জন্য মেন্টাল ও ফিজিক্যাল এক্সপ্লয়টেশনের ভুড়ি ভুড়ি উদাহরনতো দেখতেই পান। বিশেষত মহিলা কর্মীদেরকে প্রোলোভন, ভয়, প্রতারনা, প্ররোচনা, চাপ দেয়ার ঘটনাতো অহরহ। একটা বিরাট সংখ্যক কর্পোরেটে মেয়েদের পণ্য ও সোস্যাল গার্ল হিসেবে ট্রিট দেবার নোংরা পলিটিক্স নিয়ে ইদানিং খুব লেখালেখি হচ্ছে। ক্যারিয়ার উন্নতির চোরা ফাঁদে পড়ে নারীরা এমনকি পুরুষেরা পর্যন্ত বিপদগ্রস্থ বা বিপথে যাচ্ছে। কর্পোরেটের সাথে পার্সোনাল লাইফের চির আড়ি।
আপনি কর্পোরেটে তরতর করে উপরে উঠতে চান, তো আপনাকে ব্যক্তিগত জীবনে কম্প্রোমাইজ/স্যাকরিফাইস করতে হবে। জায়া ও পতি দু’জনেই চাকরী বা ব্যবসা করেন-এমন জুটিদের সিনিয়র সিটিজেন হবার পরে কী রকম দৃষ্টিকটু রকমের ফর্মাল ও নিয়মরক্ষার দাম্প্যত্য কাটান সেটার নমুনা মাঝেমধ্যে দেখতে পাই। বাইরে হাসিখুশি, ভেতরে ভেতরে বঞ্চনার জ্বলন। কর্পোরেটে ওপরে ওঠার দুরাশায়, কখনো কখনো স্রেফ ওই জগতের রঙ্গীন নেশায় নারী ও পুরুষরা হয়ে ওঠেন স্রেফ পার্টনার। ওয়ার্ক লাইফ ব্যালেন্স এখনো এক দূরাগত কল্পনা।
২৪ ঘন্টার জীবনের একটা বড় অংশই নিয়ে নেয় কর্পোরেট। তার উপর ব্যক্তিগত সময়েও অফিসের কাজের ফলোআপ হানা দেয় প্রায়ই। সিনিয়র কর্পোরেটদের তো ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু বজায় রাখাটাই কঠিন। রাত নেই, দিন নেই, কর্পোরেট ক্লায়েন্ট নিয়ে মিটিং, আউটিং, টি পার্টি, ডিজে-আপনার ব্যক্তিগত জীবন তেজপাতা করে দেবে। কর্পোরেট জীবনে যেসব সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা বা বঞ্চনার মুখোমুখি হই আমরা তা জানতে চেয়েছিলাম অনলাইনে। যেসব ফিডব্যাক পেয়েছি বিভিন্ন ফোরাম হতে তার সামারি শেয়ার করলাম। অবশ্যই মন্তব্যকারীদের নাম উহ্য রেখে। এগুলো আমার মতামত নয়। স্রেফ পাবলিক সার্ভে:
১.কমিটমেন্ট ব্রেক: চাকরীতে ঢোকার সময়ে বা চাকরীতে বেশি বেশি ইফোরট দেবার জন্য কিন্তু পরে সেই প্রতিশ্রুতি রাখেন না।
২.স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্ব’র শিকার হন কর্মীরা।
৩.সিনিয়ররা কোনো কিছুর দায়ীত্ব নিতে চান না। তারা ক্রূশিয়াল সিদ্ধান্তগুলোতে জুনিয়রদের উপরে চাপিয়ে দেন।
৪.কর্পোরেট পলিটিক্স খুব কমোন।
৫.অফিসে দেরিতে গেলে বেতন কেটে ফেলা।
৬.অনেক দিন জব করার পর কোনো কথা ছাড়াই জব থেকে বের করে দেওয়া।
৭.কাজের স্বাধীনতা না পাওয়া।
৮.নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা না থাকা। ম্যানেজার রাত ১০ টা পর্যন্ত অফিসে স্টে করে। যার প্রভাবে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক ওভারটাইম করতে হয়। অফডে’তে ডিউটি করতে হয়।
৯.চাকরির নিশ্চয়তা নেই, নির্দিষ্ট কোন কমর্ঘন্টা নেই, অতিরিক্ত কাজের কোন মজুরী নেই আর অবসরের কোন সুবিধা নেই।
১০.সময়ের সাথে সাথে সার্বিক পরিবেশের উন্নতি না হয়ে অবনতি হচ্ছে। সুবিধা না বাড়িয়ে বরং কমে যাচ্ছে।
১১.সিনিয়র লেভেলে গেলে তাদের সরিয়ে দিয়ে কম বেতনে নতুন কর্মী আনছে।
১২.বেতন ও ইনসেনটিভ সময়মতো দেয়া হয় না।
১৩.স্বৈরাচারি নেতৃত্ব। প্রচন্ডরকম কর্তৃত্বপূর্ন অফিস।
১৪.বস ও সাবোর্ডিনেটের মধ্যে অথবা একাধিক শেয়ার হোল্ডারের মধ্যে স্বার্থ সংঘাত। মাঝে পড়ে জুনিয়রদের বা কর্মীদের ভাগ্যহীনতা।
১৫.রেজিগনেশন দিলে হয়রানি করা।
১৬.যৌক্তিক কারন ছাড়াই বা সময় না দিয়ে/ক্ষতিপূরন না দিয়ে চাকরীচ্যূত করা।
১৭.কোনো স্যালারী স্ট্রাকচার অনুসরন না করে যখন যেমন, তখন তেমন করে কর্মী হায়ার করা যা বৈষম্য তৈরী করছে।
১৮.চেইন অফ কমান্ড ব্রেক করে চলা।
১৯.কালচারাল ল্যাগ। বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড হতে ব্লেন্ড করার ফলে কালচারাল সংঘাত হয়।
২০.সদা পরিবর্তনশীল সিদ্ধান্ত। ফলে কর্মীরা সারাক্ষন কনফিউজড থাকে।
২১.বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের ভিতরে এবং আন্তপ্রতিষ্ঠান র্যাংক ও ডেজিগনেশনে কোনো কনফরমিটি নেই। ফলে একেক প্রতিষ্ঠান একেকভাবে পদবী নির্ধারন করে। এতে বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয় কর্মীরা।
২২.চাকরী কনফার্ম করার পরে জয়েন করার আগ দিয়ে চাকরী ক্যানসেল করা।
২৩.বন্ড দেবার বাধ্যবাধকতা।
২৪.মহিলা কর্মীদের পুরুষ সহকর্মী বা বস কর্তৃক এমনকি পুরুষদেরও মহিলা বস কর্তৃক হয়রানি।
২৫.এপয়েন্টমেন্ট লেটার না দেয়া।”
আপনি যদি আপনার প্রতিষ্ঠানের রিমডেলিং এর জন্য গুড প্রাকটিসের খোঁজে থাকেন, তবে এগুলো বিদায় করলেই হবে।
এতসব দেখে মনে হচ্ছে কী? জব করবেনই না? নাকি সব বিসিএস দিবেন? স্যরি, বিসিএস বছরে দুবছরে হয় হাজার দুই তিন। বাকিরা তবে কই যাবে?
অনেক ফ্রাস্টেটেড কর্মী সক্ষেদে বলে থাকে, আমার কোম্পানীর এই দোষ, সেই দোষ। অমুক ভাল কাজটা করে না, তমুকটা খারাপ করে। তাদের বলছি, আপনার জন্য কোম্পানীর এই স্বরূপটাই যথার্থ। কোম্পানী এর চেয়ে ভাল আপনার জন্য ভাল হত না। কেন? কোম্পানী যদি পিওরলি গুগল বা মাইক্রোসফটের মতো হতো, ভেবে দেখুনতো ওরকম একটা কোম্পানীতে চাকরী পাবার মতো সবরকম যোগ্যতা আপনার আছে কিনা।
তার চেয়ে এই কি ভাল না, যে আপনি মোটামুটি একটা কোম্পানীতে কিছু একটা করে বেঁচে বর্তে আছেন? আর কোম্পানীর হাজারো খারাপ দিক যদি আপনার নজরে পড়েই থাকে, তাহলে সেটা সমাধানের জন্য জান না লাগিয়ে শুধু নিরাপদ দুরত্বে থেকে সমালোচনা করাটা কি প্রবঞ্চনা নয়? তাই বলি কী, কমপারেটিভ চয়েজে যান। কমপেয়ার করে তুলনামুলক ভাল যেটা সেটা করুন।
চাকরি পাওয়া, আর, চাকরি করা-দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি যোগ্যতা। #GettingJobDoingJob
কেউ একজন কোথাও চাকরি পাচ্ছেন না, অথবা, কাউকে আপনি চাকরিতে নিলেন না (এমনকি ডাকলেন পর্যন্ত না)-এমন একজন মানুষও আপনার ওই চাকরি করে শাইন করার সমূহ সম্ভাবনা আছে। হ্যা, এর মানে এই নয়, যে, আমি প্রপার ইন্টারভিউ করবার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করছি। আমি প্রপার ইন্টারভিউ’র পক্ষে।
অধিকাংশ, কিংবা বিপুল সংখ্যক চাকরিতে, যে কাজ করতে হয়-সেটা রেপ্লিকেবল। ওই চাকরির যাবতীয় দায়ীত্ব পালনের সক্ষমতাও রেপ্লিকেবল। কাউকে ওই পজিশনে বসিয়ে তাকে যথাযথ গ্রুমিং, ট্রেনিং, রোল প্লে করতে দিলে সেটা তার পক্ষে অ্যাচিভ ও ক্যাপচার করা অসম্ভব না।
মজার বিষয় হল, জে.ডি, বিশেষত জে.আর, যেটা সাইজে সাধারনত বিশাল আকারে হয় একেকটা চাকরির বিজ্ঞাপনে, একটি বড় সংখ্যক ক্ষেত্রে চাকরি দিতে/পেতে যেসব বিশাল স্কিলের তালিকা ঝোলে, সেগুলো ছাড়াই ওই জবে দিব্যি কাজ করে যাওয়া যায়।
আরও মজা হল, আজকাল চাকরির জব ডেসক্রিপশনে একটি বড় সংখ্যক ক্ষেত্রেই জে.আর টা জাস্ট কপিড। যারা বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, তারাও শিওর নন, ওই জবে রোল প্লে করতে হলে কী কী স্কিল সত্যিই দরকার। বিশেষ করে #ProxiSignal #SurfaceSignal #SignalTrait #SurfaceTrait #SurfaceGlamour কেই কমপিটেন্সি বলে অন্ধের মতো ভাবা চাকরির বিজ্ঞাপনদাতা কম না। চাকরির বিজ্ঞাপনগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে প্রায়ই ধরতে পারবেন।
হ্যা, রেপ্লিকেবল ক্যাপাবিলিটি একটা ক্ষেত্রে সম্ভব না, যদি ওই পজিশনের দায়ীত্ব পালন করা বা কাজ করাটা ক্রিয়েটিভ, স্ট্রাটেজিক, ইনোভেটিভ, থিংক ট্যাংকজনিত হয়। এই বিষয়গুলো রেপ্লিকেবল না।
কর্পোরেটে কাজ করতে জানা ও চাকরি করতে জানা দুটো ভিন্ন ধরনের কাম্য যোগ্যতা।
এখানে চাকরি করতে জানার পুরোটাই ২০% ইনফরমাল লারনিংয়ের অংশ। কাজ করতে জানা ৭০% অন দি জব ও ১০% ফরমাল লারনিংয়ের অংশ।
চাকরি করতে জানার অন্যতম একটি ক্যারিশমা হল ডিপ্লোম্যাটিক হতে পারা। এখানে সবকিছুতে ডিপ্লোম্যাসি বজায় রাখুন। রাখতে শিখুন।
আর, এখানে কাজের দুটো স্টাইল-সরকারী ও বেসরকারী, তথা, বু্রোক্রেটিক ও লিবারেলাইজড। এখানে আপনার সহকর্মী ও সহযোদ্ধারা তাদের যেমনটা করার কথা, যেটা করার কথা, যেভাবে করার কথা সব সেভাবেই করবেন, আর আপনার সাথে ইনটার্যাকট করতে যেভাবে কোর্ডিনেট ও কোপারেট করবার-তেমনটাই করবেন-এমনভাবেও কাজ করতে পারেন। হলে করলেন, না হলে নিরস্ত থাকলেন। এটা হল বুরোক্রেটিক স্টাইল।
আরেকটা পথ হল, আপনার সাথে যা হবার-তা হবে না। কিন্তু, আপনি প্রো-অ্যাকটিভ হয়ে আগ বাড়িয়ে, আগে গিয়ে সমন্বয় করবেন। কোনোকিছুই নিয়মতান্ত্রীকভাবে হচ্ছে না-দেখে আপনিও চুপচাপ থাকলেন, অন্যরা যখন তাদের প্রত্যাশিত দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে, তাদের করণীয়কে মূল্য দিয়ে আপনার কাছে আসবেন-কেবল তখনই আপনি নড়বেন-এমন না হয়ে বরং আপনি এগিয়ে যান। ইগো ও ডিপ্লোম্যাসির, কমপ্রোমাইজ আর স্ট্রাটেজিক ব্যাক অফ এর ব্যবধান মনে রাখুন।
প্রাইভেট কর্পোরেটে আপনাকে কেউ যায়গা করে দেবে না। আপনাকেই একে একটি প্রচন্ড ভীড়ের বাস কল্পনা করে কোনোমতে এক চিপায় জায়গা করে নিতে হবে। ভাঁজ হয়ে গিয়ে হলেও।
মনে রাখবেন, রিঅ্যাকটিভ লোকদের স্থান প্রাইভেট কর্পোরেট না। অভিমানীদের যায়গা না। বুরোক্রাটদের যায়গা না।
কর্পোরেট হল একটি বিচিত্র জায়গা। এখানে আপনি শুরু করবেন একজন ইনোসেন্ট মানুষ হিসেবে, কিন্তু আপনার কাছে এক্সপেক্টেশন থাকবে ম্যাচিউরড হবার। ধীরে ধীরে আপনি ইনোসেন্ট হতে একজন ম্যাচিউরড মানুষ হয়ে উঠবেন।
আপনার অজান্তেই বিভিন্ন প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে গিয়ে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে খুব সন্তর্পনে আপনার অজান্তেই ওয়ান ফাইন মর্নিং, আপনি দেখবেন আপনি একজন ইনোসেন্ট মানুষ হতে কখন যেন একজন ম্যাচিওরড কর্পোরেট হয়ে গেছেন।
কিন্তু আপনার এই ম্যাচিউরিটি অর্জনের সমানুপাতিক বিপরীতে আপনি আপনার ইনোসেন্স হারাবেন। ইনোসেন্স এবং ম্যাচিউরিটি একসাথে প্রাইভেটে চলতে পারে না। You earn maturity at the cost of innocence.
#corporateslavery #corporateexploitation #corporatedeceit #corporatehypocrisy #corporatemockery #employeevalueproposition #harassment #personallife #worklifebalance #narrowdream #GettingJobDoingJob #WhyAreYouPaid