Skip to content

নীতি পুলিশের পৌরহিত্য

  • by

বাংলাদেশের ঢাকা শহরের ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ কোনো সড়কে কখনো সখনো হঠাৎ দেখবেন, গাড়ি, রিক্সা, মানুষ মিলে একটা মোড়ে প্যাঁচ লেগে গেছে। ট্রাফিক পুলিশ নেই। প্যাঁচ না কমে বাড়তে লাগল।

সবাই সবাইকে গালাগাল, হুমকি, আহাজারি করে কাটাচ্ছে। কেহ কারে নাহি ছাড়ে। সমস্যা আরও জট লাগছে।

এমন সময়, হঠাৎ করে, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবার মতো কয়েকজন মানব দেবতা আবির্ভূত হন। এনারা কেউ কেউ আটকে পড়া জনতা। কেউ আবার রাস্তার পাশের হকার। কেউ কিচ্ছু না, যাচ্ছিলেন, প্যাঁচ দেখে স্বেচ্ছায় দাড়িয়ে পড়েন। সবাই মিলে জট ছাড়াবার চেষ্টায়।

এনারা একে বকে, ওকে ধমকে, তাকে হাত ধরে, কাউকে ভয় দেখিয়ে, কাউকে বাবা-সোনা বলে, কাউকে থামিয়ে, কাউকে বাইপাস করিয়ে বেশ কিছুক্ষণের চেষ্টায় প্যাঁচ ছাড়ান।

এই দক্ষযজ্ঞে অধিকাংশ মানুষ তাদের বাহবা দিলেও কয়েকটা উটকো থাকবেই, যারা সবার আগে এদের জিজ্ঞেস করবে, “আমনে কিডা? আমনেরে ট্রাফিক সামলাইতে ক্যাডায় দায়ীত্ব দিছে?”

এই দেবদূতদের যেমন কেউ ডেপ্লয় করে নাই। নিজেরাই নিজেদের যেমন ডেপ্লয় করে ফেলে।

একই প্রক্রিয়ায়-বাংলাদেশে নিজে নিজেই অনেক কিছু ঘটে যাওয়াটাই যেন রীতি।

যেই দেশে ইন্টারনেট নিজে নিজে বন্ধ হয়ে যেতে পারে, সেখানে নিজে নিজে কিছু ঘটা নিয়ে আর আশ্চর্য কী?

তবু আশ্চর্য হতে পারেন।

যেমন দেখুন-

ঈশ্বর এই মাটির পৃথিবীতে কাউকে তার ব্রোকার বা দালাল হিসেবে নিযুক্ত করেননি। অথচ, কিছু ধান্দাবাজ নিজেই নিজেকে ঈশ্বরের নিযুক্ত এজেন্ট কবির অথবা NYPD শেরিফ দাবী করে ঈশ্বরের মান মর্যাদা রক্ষা অথবা তার আনুগত্য মানাবার দায়ীত্ব নিয়ে নেয়।

যেমন দেখুন-

বঙ্গেশ্বর সরকার কাউকে, অথবা, বঙ্গের জনতাও কাউকে তাদের তোলা ওঠাবার দায়ীত্ব দেয়নি। অথচ, এই বঙ্গের কিছু বঙ্গসন্তান নিজে নিজেই রাস্তা ও তার ফুটপাথ ইজারা দেবার ও তোলা তুলবার দায়ীত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে।

যেমন দেখুন-

বঙ্গল্যান্ডের কোনো প্রয়াত বুজুর্গ কামেল কাউকে তার কবরকে কেন্দ্র করে বানিজ্যিক ইকোলজি গড়ে তুলবার দায়ীত্ব দিয়ে যান নাই। কিন্তু, তার চ্যালাচামুন্ডা, মায় তাদের তিন পুরুষ পরবর্তী নাতি নাতনিরা আজও কামেলের কবরকে কেন্দ্র করে বিপুল বানিজ্যিক ইকোলজি চালিয়ে যাচ্ছে।

আরও মজা পাবেন, যদি দেখেন-

প্রয়াত লালন সাঁইজি নিজে ছিলেন ফকির, বিশ্বাস করতেন অনাড়ম্বরতায়। কিন্তু, তার তিরোধানের বহু বছর পরে যখন ’লালনিজম’ একটা প্রচন্ড দামী কনজ্যুমার কমোডিটি হিসেবে ধরা দিয়েছে, তখন লাখে লাখে ঝাঁকে ঝাঁকে আদম প্রয়াত লালন ফকিরকে ‘লালন’ হিসেবে বিক্রী ও বিনিময়ের রমরমা ব্যবসার ফ্রাঞ্চাইজি নিজেই নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। আরও মজা, বঙ্গ ছ্যাড়কারও আজকাল রাষ্ট্রীয় আয়োজনে ‘লালন’ মৃত্যু ফেস্ট করে।

এই দেশটাতে কেউ যদি একবার বুঝে ফেলে, যে, বাজারে কোনো কিছুর বানিজ্যপ্রাপ্তি আছে, তাহলে তার ফ্রাঞ্চাইজি দাবী করতে সময় নেয় না। যুগ যুগ ধরে এমনিতেও এই ভূগান্ডায় আধ্যাত্মিক ‘ঈশ্বর’ একটি খুব দামী পণ্য। সবাই তার ফ্রাঞ্চাইজির দাবীদার। এর পাশাপাশি জাগতিক নানা চেতনার ফ্রাঞ্চাইজিও বিকোয়। সেগুলোর সহিহ মালিক শুধু তারা, যাদের বাহুবল, রাজনৈতিক বল অথবা অর্থবল আছে। চাপার বল অথবা আরও কোনো ‘বলস’ থাকলেও ফ্রাঞ্চাইজি মেলে।

কেউ মানুক না মানুক, কেউ চাক বা না চাক, কেউ তাদের বলুক না বলুক, নিজেকে নিজেই ঈশ্বরের দূত অথবা এজেন্ট হতে নানাবিধ চেতনার ফ্রাঞ্চাইজি দাবী থেমে থাকে না। এমনিতে বঙ্গের ভন্ড দূতে কামেলরা এ যাবত নিজেদের সর্বোচ্চ ইমাম মাহদী দাবী করা তক যেতে পেরেছে। কেউ এখনো নিজেকে খোদ ‘ঈশ্বর’ দাবী করে উঠতে পারেনি। যদিও শক্তির প্রকাশে তাকে তেমন দাবীদারই লাগে।

মোরাল পুলিশিংয়ের মাত্রা ও দৌড় একটা সময় তক বক্রকটাক্ষে অগ্নিদৃষ্টি হানা পর্যন্ত সীমিত থাকলেও, ডিজিটাল বাংলাদেশে, এই তথাকথিত ‘অসাম্প্রদায়িক’, ‘চেতনাজীবি’, ‘গণতান্ত্রীক‘, ’ধর্মনিরপেক্ষ’ প্রজাতন্ত্রে সেটি সরাসরি তরবারি চালনার দম্ভ ও ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে বহুদিন থেকেই।

মব ট্রায়াল, মব জাস্টিস, মাস সেন্টিমেন্ট, পপুলার মেজরিটি, মেজরিটি পাওয়ার, চিপ পপুলারিটি অব স্টেট পাওয়ার গেম-এসবের চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয় শুষে মোরাল পুলিশিং আজ সশস্ত্র, উদ্যত ফণা ও সহিংস। মব জাস্টিস (আসলে মবোক্রেসি বা মব এনার্কি) হল সবথেকে জনপ্রিয় ও কার্যকর সামাজিক ওষুধ। আবার, একইসাথে সবথেকে ধ্বংসাত্মক ওষুধের একটা।

নীতি পুলিশ আজ ঠিক করে দিচ্ছে-

কার নাম কী হবে।

কোথায় কোন ভাস্কর্য বসবে।

কোথায় কে কার সাথে শুবে।

কোথায় কে কী বলবে ও বলবে না।

কে কাকে সম্মান দেখাবে ও দেখাবে না।

মোরাল পুলিশের রেজিমেন্ট এখন ঠিক করে দিচ্ছে-

শিল্পী কোন গান গাইবেন বা গাইবেন না,

নাট্যকার কোন নাটক বানাতে পারবেন,

ঠিক করে দিচ্ছে রেডিও টিভিতে কী দেখানো যাবে ও যাবে না।

ঠিক করে দিচ্ছে কবিতায় কী লেখা যাবে ও যাবে না।

ঠিক করে দিচ্ছে কার কবিতা পাঠ করা যাবে বা যাবে না।

নীতি পুলিশ সতেজে সাজিয়ে দিচ্ছে আমাদের একান্ত বাসর। সেখানে ঘেঁটু ফুল সুগন্ধ ছড়াবে, নাকি মরিয়ম-নীতি পুলিশ তাতেও নাক গলাচ্ছে।

এই সবই করতে দেয়া হয়েছে, আশকারা দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলে তাদেরকে করবার ক্ষমতায় তেজি করা হয়েছে।

এই নীতি পুলিশ, যে, এখনও কে কী কাপড় পরবে ও কীভাবে শুবে-তার মধ্যে মত্ত থাকলেও; খুব শীগগীরই সে দানবে পরিণত হবে।

আর সেদিন সে হয়তো ঠিক করে দিতে চাইবে-

আমাদের মানচিত্র কেমন হবে।

আমাদের পতাকায় লাল সবুজ থাকবে, নাকি তাদের পছন্দের কিছু।

আমরা সোনার বাংলা গাইব? নাকি অন্য কিছু।

আমরা বাঙালি ও বাংলাদেশী হব, নাকি অন্য কিছু।

আমাদের দেশটার নাম বাংলাদেশ হবে, নাকি অন্য কিছু।

মিডিয়া ট্রায়াল/মব ট্রায়াল/পপুলার মেজরিটি জাস্টিস/জাজমেন্টাল জাস্টিস-রঙ্গে ভরা বঙ্গদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রচলিত কিছু বেটাগিরির নাম।

অনেকটা বন্যার পানিতে আশ্রয় নেয়া শেয়ালের বাচ্চাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মারার মতো বেটাগিরি এগুলো। বাঙালী রাজকীয় কত্তিপক্ক আর আম বা জাগ্রত জনতার এই বদ খাসলতের প্রেক্ষাপটেই এই দেশে ধর্ষক বা তথাকথিত ধর্ষকদের নিকাশ করতে হারকিউলিস মাঠে নামে। সেই হারকিউলিসরা দেবতার আসন পায় জাগ্রত অথচ অশিক্ষিত জনতার মন মানসে। একারনেই রবিনহুড এই দেশে দেবতা, হারকিউলিস দেবতা।

তা দেবতারূপে বসান না, যাকে মনে চায় তাকে আপনার হৃদয় সিংহাসনে। খালি, প্রয়াত মি. রাশেদ সিনহা বনাম প্রদীপ-লিয়াকত গং ঘটনাপ্রবাহটা মনে রেখে ভবিষ্যতে মিডিয়া ট্রায়াল/মব ট্রায়াল/পপুলার মেজরিটি জাস্টিস/জাজমেন্টাল জাস্টিসের আকামটা করিয়েন। অথবা ভিকটিম মিন্নি ভার্সাস আসামী মিন্নি-এই ঘটনার পুরোনো কাসুন্দীও একটু ঘেঁটে নিতে পারেন। ওই কালো রাতের পরদিন সকাল পর্যন্ত মি. রাশেদ ছিলেন ভিলেন। প্রদীপ গংরা একজন (তাদের মামলা নাটকের ভাষ্যমতে) শয়তানকে শুইয়ে দিয়েছেন-এটাই ছিল সত্য। গণেষ উল্টে যাবার পরে এখন আবার প্রদীপ গংরা ভিলেন, মি. রাশেদ একজন দেবতা। মামলার বাদী আজ আসামী, আর আসামী আজ বাদী। কী রঙ্গ, কী রঙ্গ।

করোনা নাকি বঙ্গদেশের সব ইবলিশ শয়তানকে ওয়ায়েস করোণীর মতো পরিশুদ্ধ বুজুর্গে পরিণত করে ফেলেছিল। মনে হয়, বন্যার পানিতে সেই ভালমানুষী ধুয়ে গেছে। কে যে অপরাধী আর কে দেবতা-সেই বিচারটা ভবিষ্যতে ফেসবুকের পোস্ট দেখেই করে না ফেলে একটু তলিয়ে দেখে, বিচার বুদ্ধি ও মাথার ঘটের অতীত স্মৃতির প্রেক্ষিতে বিশ্লেষন করে করলে ভাল করবেন।

জানেনই তো, আজ শত শত বছর পরেও ইতিহাস বদলাচ্ছে। পাশ্চাত্যে এক ফ্লয়েডের রক্তদানের ধাক্কায় সেই তিনশো বছর আগে হতে দেবতা হিসেবে পূজিত সব পশ্চিমা ঈশ্বররাও আজকাল পতিত বা পতিতা হিসেবে অভিহিত ও অভিসংশিত হচ্ছেন। বীর ও বিজেতা লর্ড ক্লাইভদের মূর্তি আজকাল পাবলিক গলায় কলঙ্কের রশি বেঁধে টেনে হিচড়ে দরিয়াতে নিক্ষেপ করছেন।

তাই বলি কি, দেবতা ও পতিতার বিচারটা একটু বুঝে শুনে করুন।

[আরেকটা কথা। বঙ্গদেশে হজ্ব করলে নামের শেষে হাজি লাগানোটা রেওয়াজ। যদিও নামাজ পড়লে নামাজি টাইটেল কেউ লাগায় না। তেমনি করে, পিএইচডি করবেন আর নামের আগে ড. লাগাবেন না-তা কি হয়? দেশের কোন কোন পেশার মানুষ অবসর নেবার পরেও নামের আগে তার পেশার টাইটেল ব্যবহার করতে পারবে-তার কি কোনো আইন আছে? আমার ধারনা, এই সংক্রান্ত আইন রাজকীয় মহাফেজখানা খুঁজলে ঠিকই পাওয়া যাবে।]

#popularmajority #majoritypressure #popularitypressure #mobjustice #mobtrial #mobocracy #moralpolicing #domination #breakofprivacy #ethics #mediadomination #mediamanipulation #mediadestruction #mediahype #mediaaholic #mediatrial #judgementalattitude #CognitiveBias #ConfirmationBias #inferioritycomplex #SuperiorityComplex #SupremacySyndrome #evaluation #populartrial

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *