ইদানীং দেখছি, বহুকালের আক্ষেপের অবসান ঘটিয়ে, দীর্ঘ অচলায়তনের ছেদ ঘটিয়ে, কিছু নারী ও পুরুষ লিখিয়ে সমাজে নারী ও পুরুষ-উভয়ের সমভাবে নির্যাতিত হওয়া এবং উভয়ের স্বাধীকার বিষয়ে হালকা করে গলা খাঁকারি দিচ্ছেন। যেটা বিগত অনেক দশক ধরে নারীর প্রতি একচেটিয়া সহানুভূতি প্রকাশে ভুল ভাবে আটকে ছিল। আমিও এই নিয়ে বছর পাঁচেক আগে লিখেছিলাম। তবে, আজ আর সেটা নিয়ে বলব না। আজ একচেটিয়াভাবে, একপেশেভাবে নারীর অগ্রাধিকারকে সমর্থন করে-এমন একটি বিষয়ে বলব । এই বলার ইচ্ছেটি তৈরী হয়, গত মাসে, যখন আমার একজন পরিচীত ভদ্রলোকের (কিংবা শুধু লোকের) একটি রম্য লেখা নজরে আসে, যেটার ভাষ্য ছিল, ”বাচ্চা জন্ম হলে শুধু মায়েরা কেন মাতৃকল্যাণ সুবিধা পাবে? বাবাও তো অন্তত এক রাত ঘন্টাখানিক এফোর্ট দিয়েছিল।” [অত্যন্ত কুরুচীপূর্ণ কৌতুক।]
ঠিক এর বিপরীতেই নারীদের তরফেও একটি উত্তর রেডি থাকে। সেটি সঙ্গত মনে করায় এখানে একটু উল্লেখ করছি। সেটা ছিল,”পানি ঢাললাম আমি, চিনি মিশাইলাম আমি, গোলাইলাম আমি, তুমি খালি এক ফোটা লেবু চিপ্পা দিয়াই শরবতের মালিক হইয়া গেলা?” [ততোধিক অশ্লীল কিন্তু যুৎসই উত্তর।]আপেক্ষিক এই জগতে একচেটিয়াভাবে কোনোকিছুই সত্য ও প্রমাণিত বলা যায় না। তবে আজ যেহেতু বলেই নিচ্ছি, যে, ওই বিশেষ লেখাটি পড়বার পরে একটু একপেশে হবার ইচ্ছেই হল। তাই বলছি, জাতি হিসেবে নারীকে নিখাঁদ ও একচেটিয়াভাবে জগতের সকল পুরুষের মান্যতা, সম্মান ও সমীহ করা কেন উচিত-তার সপক্ষে যদি যুক্তি চাওয়া হয়, তাহলে আমি এই তিনটি দিতাম: -১. একজন নারীকে তার নারীত্ব (যা পুরো বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রাণ বিস্তারের এখনো একমাত্র পথ) অর্জনের মূল্য হিসেবে ও বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রাণ বিস্তারের দায়ীত্বপ্রাপ্ত হিসেবে, যদি তিনি পঞ্চাশ বছর বাঁচেন, তাহলে প্রথম ১২ বছর বাদ দিলে ও শেষের ৫ বছর বাদ দিলে কমবেশি মোট ৩৩ বছরে প্রতি মাসে ১ বার করে মোট ৩৯৬ বার মাসিক বা রজঃনিঃসরন বা মেনসট্রুয়েশন সাইকেলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এখানে তার কোনো চয়েস নেই।
Menstruation একটি ভয়ানক যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা। আদিকাল হতে রজঃনিঃসরনকে অপবিত্র আখ্যা দিয়ে আসা হলেও এখনকার বিজ্ঞান ইদানীং আমাদের জানাচ্ছে, যে, পিরিয়ডের ফ্লুইড আদৌ অপবিত্র বা জীবানুযুক্ত কিনা তা নিয়ে দ্বিতীয় চিন্তার অবকাশ আছে। যাহোক। পুরুষকে ঠিক একই প্রাণের বিস্তারের অংশ হবার দায়ে জীবনে শুধু একবারই circumcision বা খৎনার ‘ঝামেলা’র মুখোমুখি হয়। আমি একে ঝামেলা বলছি। কারন, খৎনা এখন আর যন্ত্রণাদায়ক হয় না বলেই জানি। তদুপরি, সেই আদিকাল হতে (মানে বঙ্গদেশ স্বাধীন হওয়ার আগ-পর সময়) পুরুষ সন্তানের খৎনা উৎসব ঘটা করে পালিত হয়। মানে, এটি কষ্টদায়ক যেটুকুও ছিল, উৎসবের আমেজ দিয়ে তাকে মহিমামন্ডিত করে আসা হয়েছে। বিপরীতে, নারীর রজঃস্বলা হবার অতি যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতাকে লজ্জা, সংকোচ, ফিসফিসের ঘেরাটোপে বন্দী করা হয়েছে; যেটি প্রতি মাসে হয়, তাকে আরাম দেবার, তাকে মহিমা দেবার কোনো উৎসব তো দূর, তাকে সামান্য ত্যানার বদলে প্যাড এনে দেবার প্রচলনও এখনও সর্বত্র হয়নি।
Cervical cancer, জরায়ুর cancer, breast cancer নামের তিন তিনটা specialized cancer শুধু তাদের একার সম্পদ। এককভাবে গোটা বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রাণ বিস্তারের জন্য এহেন একক দায়ীত্ব বহনের কৃতজ্ঞতায় নারীর প্রতি আমাদের নত হওয়াই উচিত। ২. প্রজনন ও বংশগতির প্রবাহে নারীকে ৯ মাস ১০ দিন কার্যত একটি Bombshell হয়ে থাকতে বাধ্য হয়। যদি ২টি সন্তান থাকে, তাহলে তার জীবনের মোট কমবেশি ৫৬০ দিন সে গর্ভাশয়ের মধ্যে (আমরা পেট বলি) আস্ত একটি মানব সন্তান বহন করে বেড়ায়। গর্ভধারন ও গর্ভ খালাস-পুরো ৯ মাস ১০ দিন যে কীরকম ভয়ানক বিপজ্জনক একটি বিষয়-সেটি বিস্তারিত এখানে বলছি না। আজ তক বাচ্চার জন্ম দিতে গিয়ে কোনো বাবা মারা যায়নি-তাই তো?
তো, এহেন অত্যন্ত ভয়ানক বিপদটিকে যারা অবলীলায় একতরফাভাবে ঘাড়ে নিচ্ছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, (আজতক কোনো নারী তো মনে হয় conceive করতে অস্বীকৃত হয়নি-ছোটখাটো ব্যতিক্রম ছাড়া), যা আবার গোটা মানব জাতির প্রাণ বিস্তার ও বাংলাদেশের পুরুষদের ‘বংশরক্ষা’র এখনো একমাত্র পন্থা, তার জন্য তাদের আজীবন Priority প্রদানসহ সেলাম দিয়ে যাবার দাবী কি খুব অযৌক্তিক? ৩. আমরা জানি, আমাদের দেশে, বা বিশ্বের এখনো সিংহভাগ ক্ষেত্রেই, পুরুষ সদস্যরা পরিবারের আর্থিক দায়ীত্ব নিয়ে থাকেন। আমরা বিষয়টাকে দেখি, ”ব্যাটা income করে, বেটি খায়”-এভাবে। কিন্তু এখানে একটি twist আছে। একজন নারী তার পুরুষ সঙ্গীকে প্রধান income earner হিসেবে দাড়ানোর সুযোগ করে দিতে নিজেকে কাজ ও পেশা হতে দূরে সরিয়ে তার সংসার আগলানোর দায়ীত্ব নেয়। দায়ীত্বটি মহান।
তবে, এর বিনিময়ে, সে নিজেকে অকর্মণ্য, non-employable ও vulnerable করে তোলে। তার কর্মদক্ষতা ও কর্ম পাবার সম্ভাবনাকে সে পুরুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও তাকে নির্বিঘ্ন রাখতে কোরবাণী করে। নারী কর্মক্ষেত্রে ভাল career গড়লেও, বিয়ের পরে বাচ্চা-কাচ্চা বা পারিবারিক অন্য যে কোনো কারনে দু’জনের একজনকে চাকরি ছাড়তেই হবে-এমন পরিস্থিতি হলে, কোনো কথা ছাড়াই নারীকে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। মানে, কার্যত পুরুষের কর্মযোগ্যতা বাঁচাতে নারীর কর্মক্ষমতাকে বিসর্জন দিতে হয়। বউয়ের চাকরি বাঁচাতে জামাই job ছেড়ে দিয়ে ঘর আগলাচ্ছে-এই ঘটনা আজ তক ঘটেনি, বা ঘটলেও সংখ্যা অতি নগন্য। এহেন কোরবাণী যারা করে-তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় নতজানু হবারই কথা।
একটি ৩ সদস্যের নিম্ন-মধ্যবিত্ত একক পরিবারের গৃহবধূ নারীর বোধহয় ২১টি হাত, ২৩টি মাথা আর অসূরের মতো শক্তি থাকে।
পরিবারের জন্য টাকা কামাতে গিয়ে জীবন কালি করে ফেলেছেন বলে যদি আক্ষেপ করেন, তাহলে, একদিন অফিস ছুটি নিয়ে ওই দশভূজা দূর্গা ও দশানন রাবণের সাথে সারাদিন নিবিড়ভাবে থেকে দেখুন। মাথা ঘুরাবে।
মেকানাইজড রুটীনের কিছুটা বলি-
>বাচ্চার হাগা মুতা ডিল করা দিনে ১৭ বার। তার পরিধেয় সব একশো বার ধোয়া, শুকোনো আবার গোছানো।
>সকালে বুড়ো বাবুকে অফিস যেতে প্রস্তুতিতে সহায়তা। নাস্তা ও লাঞ্চের হ্যাপা নেয়া।
>সন্ধ্যার নাস্তা, রাতে বুড়ো বাবুর পছন্দের ডিশ। সে আবার সব গরম ছাড়া খায় না।
>ঘর পরিষ্কার করো, ঝাড়ো, মোছো, ধুলা পরিষ্কার করো। ক্লিনারকে সময় মতো ময়লা দাও। সে আবার আসবে দুপুরে একটু চোখ বুজলে।
>কাপড় ধোও। ছাদে শুকাও। বৃষ্টি এলো কিনা খেয়াল রাখো। রাতে ছাদে থাকলে শিশিরে নষ্ট হবে। সে খেয়াল রাখো।
>লন্ড্রীতে ছোটো। কাপড় দাও। কাপড় আনো। যার যার ক্লসিটে গোছাও। বুড়ো বাবুকে আবার হাতে তুলে না দিলে কিছু খুঁজে পায় না। হাতে তুলে দিয়েও রক্ষা নেই। তার ঘড়িতে ব্যাটারি থাকে না। জাঙ্গিয়া যাতে মোবাইল গুতাতে গুতাতে প্যান্টের ওপর দিয়ে পরে চলে না যায়-সেটাও নজর রাখতে হয়।
>ছোটোখাটো বাজার আনো। বাবুর দুধ শেষ। আবার ছোটো। মাসের বাজারে সাহেবের সাথে সঙ্গ দাও। তা না গেলে তিনি রসুন কিনবেন ১০ কেজি, চাল আনবেন ৩ কেজি। মুড়ি আর খই তিনি আলাদা করতে পারেন না। সুতরাং উপায় কী?
>বারান্দা বাগানের গাছের পরিচর্যা করো।
>শীতের পিঠা করো। চাল গুড়ো করো, শুকাও, সংরক্ষণ করো, পিঠা বানাও, একে তাকে একটু দিয়ে এসো।
>বাবুর ডাক্তারের হ্যাপা তো আছেই। খাটতে খাটতে নিজের যখন একটা কিছু হয়ে যায়, তখন নিজেকে নিয়েও ছোটো।
>আত্মীয় স্বজনকে খুশি করো। ভাইবোন, বন্ধুদের ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধান করো।
>বড় বাবুর বন্ধুরা আসবেন। তাদের আতিথেয়তা করো। তোমাকে দেখতেও যেন আবার গর্জিয়াস লাগে।
>ব্যাংকে যাও। বিল দাও।
> পার্টি আছে। তার জন্য পার্লার করো। না করলে বাবুর প্রেসটিজ নষ্ট হবে।
>১০০ বার ফোন এটেন্ড করো। তার ভিতরে বুড়ো বাবুর একটাও না। তার সময় হয় না।
>সব শেষ করে আবার বুড়ো বাবুকে রাতে ’দাম্পত্য’ দাও।
আমি একদিন একটু গবেষনা করতে বসেছিলাম। মাথায় জট লেগে গেল। আমি কেবল গিয়েছিলাম আলু ভর্তা বানিয়ে সহায়তা করতে। ভর্তা করে দিয়েছি ঠিকই, তার বিনিময়ে ওই মহিয়সীর উপকার তো হয়ই নি, উল্টো লন্ডভন্ড রান্নাঘর সামলাতে তার রাত ১১ টা বেজে গেছে।
এই পুরো বিষয়টা কেবলমাত্র মেয়ে মানুষরা ’মেয়ে মানুষ’ বলেই সম্ভব। ঘরের লক্ষীরা আসলেই অতিমানব।
কর্পোরেট আমাদেরও মেশিন বানিয়ে দিচ্ছে। আরবান লাইফ ওঁদেরও অতিমানব হতে বাধ্য করছে।
[এই লেখাকে নারীবাদি ও পুরুষবাদী ভাবধারায় বিচারের চেষ্টা বৃথা। শুরুতেই বলেছি, এটি একটি বিশেষ দিক নিয়ে একপাক্ষিকভাবে লেখা। নারীবাদ ও পুরুষবাদ নিয়ে আমার চিরাচরিত আপেক্ষিক বিশ্লেষণ পড়তে হলে এই আঙ্গিকে আমার বিস্তারিত লেখা আছে। সেটি পড়ুন।]
#feminism #masculinism #bentbeforewomen #womenasgodess #96/98