আমার একজন ফিলিপিনো সহকর্মী ছিলেন। আমরা অনেক বছর ভিন্ন দুটি টীমে এক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। তো, তিনি খুব সামান্য বাংলা বলতে পারতেন আর বুঝতেন আরও কম। তো, তার সাথে দেখা হলে বা তিনি কোনো কাজ নিয়ে এলেই আমাকে বলতেন, ”ওয়ালি, ওয়ালি, সোমোসা, দেকো, ওনেক সোমোস্যা।” মানে, অনেক সমস্যা। আমিও মজা করে বলতাম, ”ইয়া ইয়া, উই লাইক সমুচা।”
প্রবলেম সলভিংকে কর্পোরেট জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা বা দক্ষতা হিসেবে মনে করা হয়। ম্যানেজার বা টীম লিডারদের জন্য এই দক্ষতার উন্মেষ ও প্রয়োগ খুবই প্রত্যাশিত হয়ে থাকে। ব্যক্তি জীবনেও সমস্যা আসে, সামাজিক হতে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনেও সমস্যা থাকে। সমস্যা মোকাবেলা ও সমাধান তাই আমাদের জন্য একটি অপরিহার্য বাস্তবতা। দেখুন, আমি কিন্তু তিনটি দিক বলছি-সমস্যা ও তার স্বরুপ, সমস্যা মোকাবেলা ও সমস্যা সমাধান। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র-যেটাই হোক, সমস্যার জেনেরিক চরিত্র কিন্তু ইউনির্ভার্সাল। সমস্যার উৎস, বিন্যাস, প্রভাব ও সমাধানের পথ-এগুলোর মধ্যে যেকোনো প্রেক্ষিতই হোক, একটি মিল আছে।
সেটি হল-সমস্যা উৎপত্তির মৌলিক উৎস একই। সমস্যার প্রভাবের জেনেরিক চরিত্র এবং সমাধানের সার্বজনীন তরিকাও অভিন্ন। সমস্যাকে মোকাবেলা করবেন-অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতা দিয়ে, ধৈর্য নিয়ে। এড়িয়ে যাবেন না বা ছুপা রাখবার চেষ্টা করবেন না। অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না। এসকেপিস্ট হবেন না। মোকাবেলারই একটি পর্যায় হল সমাধান।
তো, সমস্যা নিয়ে যদি আপনি জেরবার হন, সমস্যা মোকাবেলা করতে চান, সমাধান চান বা আপনাকে একজন পেশাজীবি হিসেবে অফিসের কোনো সমস্যা দূর করতে দায়ীত্ব দেয়া হল, তাহলে আপনি কোন পথে এগোতে পারেন?
প্রথমে; নির্ধারন করুন, সমস্যাটির অস্তিত্ব-অর্থাৎ, এটি কি সত্যিই একটি সমস্যা? (নাকি ঝামেলা বা উৎপাত?) মানে হল, এটি কি আমলে নেবার ও গুরুত্ব দেবার মতো কোনো সমস্যা? বাতাস আর ভূতের সাথে তো লড়াই করা যায় না। তাই, সমস্যার অস্তিত্ব আগে নির্ধারন করুন, তার স্বরুপ বিচার, বিন্যাস করুন। তার পরে দেখুন, এটি সত্যিই আমলে নেবার, এর পেছনে সময় দেবার সত্যিই কোনো গুরুত্ব আছে কিনা। প্রতিটি কাজই তো কসট-ইফেকটিভ হতে হবে, তাই না? মশা মারতে তো আর কামান দাগা যায় না?
দ্বিতীয়ত; ভাবুন, যে, সমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নেয়া ভাল হবে, নাকি জিইয়ে রাখা? হাসবেন না। এরকম প্রেক্ষিত হয় কখনো কখনো। তবে বড় কারন হল, সময় অনেক কিছুকেই সহজ করে দেয়। অন্তত ধর পেরেক, মার তক্তা-সমস্যা সমাধানের এত তড়িত পথে হাঁটবেন না। দুর্মুখেরা বলে, ঢাকার যে যানজটের সমস্যা, সেটি নাকি পরিকল্পনা করেই জিইয়ে রাখা হয়। কেউ কেউ আবার এক কাঠি সরেস হয়ে বলেন, কিছু কিছু সিগন্যালে ইচ্ছে করে জট লাগিয়ে রাখবার জন্য নাকি স্থানীয় সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারী, ভিক্ষুক, হকাররা মিলে কত্তিপক্ককে হালকা খরচাপাতি দেন। যাতে করে ওখানে জট থাকে আর তাদের ধান্দা করতে সুবিধা হয়। তাই আগে সেটা ভাবুন, যে, সমস্যাটি কি এখনই সমাধান করতে হবে? নাকি এটিকে জিইয়ে রাখবেন-পরে সমাধা করলে ভাল হবে, নাকি সমাধা না করে ফেলে রাখলেই ভাল হবে-সেই চিন্তা করে নিন।
তৃতীয়ত; সমস্যাটি সমাধান যোগ্য কিনা-তা নির্ধারন করুন। বলবেন যে, সমস্যার গোড়াতেই কী করে জানব, সমাধানযোগ্য নাকি অযোগ্য? হ্যা, সত্যি সেটা। তবে তবুও, কান পাতলে অনেক কিছুই শোনা যায়, চোখ বুজেও অনেক কিছু দেখা যায় (আধ্যাত্মিক ভাব ধরলাম।)। জগতের সকল সমস্যর সমাধান বা মুশকীল কোষা কিন্তু নেই। সমাধানের অযোগ্য সমস্যাও আছে। তাই সমাধানে সময় দেবার আগেই ভেবে ঠিক করুন, এটি কি সমাধানের কোনো সম্ভাবনা আছে, নাকি নেই। নেই হলে ক্ষান্ত দিন। অন্য কোনো মূল্যবান কাজে সময় দিন।
যেমন ধরুন, আপনাকে যদি আপনার বস দায়ীত্ব দেয়, আপনি যে আপনার বউকে ভয় পান-সেই সমস্যার সমাধান করুন। আপনি হিমালয়ে ১২ বছর তপস্যা করলেও এই সমস্যার সমাধান হবে না। তবে কানে কানে বলি, সমাধান আছে। খুব সিম্পল। একদিন শুধু সাহস করে তার মুখের সামনে দাড়িয়ে বলুন-আমি তোমাকে ভয় পাই না। তারপরে আপনার আর কিছু করতে হবে না। সমস্যার তাৎক্ষণিক কিন্তু চিরস্থায়ী সমাধান তিনিই করে দেবেন।
চতুর্থত; আপনি এই সমস্যাটি সমাধানের জন্য ম্যান্ডেটেড কিনা। মানে, এটির মধ্যে আপনার সংশ্লেষ সত্যিই ঠিক হবে কিনা আর আপনি এটা সমাধানের উপযুক্ত ব্যক্তি কিনা। হ্যা, যদি আপনি শুধু উদ্যোক্তা হন, তাহলে আবার তৃতীয় নম্বরে যেতে পারেন।
তো যা বলছিলাম, আপনি এই সমস্যাটি সমাধানের ক্ষমতা ও সক্ষমতা-উভয়ই রাখেন কিনা-তা বিবেচনা করে নিন। উত্তর নেগেটিভ হলে উপযুক্ত এজেন্টের দারস্থ হন আর আপনি কেটে পড়ুন। যেমন ধরুন, স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মতের অমিল। আপনি তৃতীয় ব্যক্তি-কখনোই তার সমাধানের ম্যান্ডেট পেতে পারেন না।
পঞ্চমত; সমস্যার এ প্রান্তে এবং ও প্রান্তে কয়টি পক্ষ আছে-তা খুঁজে বের করুন। সমাধানের জন্য সবগুলো সম্ভাব্য পক্ষকেই একত্র ও সংশ্লিষ্ট করুন। একপাক্ষিক সমাধান নতুন সমস্যার জন্ম দেবে। এবং একমুখী সমাধানও। দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই সমাধানের চেষ্টাই হবে আদর্শ। এবং সমাধান জোড়াতালি দেয়া হবে না, সেটা হতে হবে উইন-উইন সমাধান। নিখূঁত সমাধান বলে কিছু নেই।
ষষ্ঠত; সমস্যার গোড়া খুঁজুন। সমস্যার চরিত্র বিশ্লেষণ করুন, এর ধরন ও আপেক্ষিকতা বিচার করুন। এর পেছনে কী কী সাইকোলজিক্যাল আসপেক্ট জড়িত, জড়িতদের মানসিক, সামাজিক, পেশাগত বিন্যাস ও ইতিহাস এবং সবার মনঃস্তাত্বিক প্যাটার্ন মাথায় গেঁথে নিন।
সপ্তমত; সমস্যার উৎস খুঁজুন। কবে, কোথায়, কীভাবে, কোন ঘটনাচক্রে এর সূত্রপাত-সেই ইতিহাস ট্র্যাক করুন। তথ্য নিন, এই পর্যায়ে মতামত নেবেন না, তথ্য নেবেন। ডাটা নেবেন।
অষ্টমত; সমস্যার গতিপ্রকৃতিকে আরো বিস্তৃত করুন। অর্থাৎ, ঠিক কী কী ঘটনা ঘটেছে, সমস্যা তৈরী হওয়ায় তার ইমপ্যাক্ট কী কী হচ্ছে-তা জানুন। সেই সাথে সমস্যাটির উদ্ভব হবার ফলে কী কী ভাবে, কে কে প্রভাবিত বা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে-তার একটি বর্ননা নিন।
নবমত; সমস্যার এ্যাডভানটেজ (খুব রেয়ার) ও ডিসএ্যাডভানটেজগুলো সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করুন। এগুলো কনভিনসিংয়ে কাজে দেবে। সমস্যার যে শুধু ডিজএ্যাডভানটেজই থাকে, তা কিন্তু নয়। কিছু কিছু বাই প্রোডাক্ট বা ট্যাকটিক্যাল এ্যাডভানটেজ অথবা নতুন সম্ভাবনাও কিন্তু সমস্যা হতে উঠে বা বের হয়ে আসে। যেমন ধরুন বোর্দো মিক্সচার আবিষ্কার কিংবা নিউটনের মাথায় আপেল পড়বার ঘটনা। নিউটন যদি মাথায় আপেল পড়েছে-সেই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ভাবতেন, আপেল মাথায় পড়া একটা সমস্যা, আর সেটার সমাধান হল, গাছটিতে নেটিং করে দেয়া-তাহলে পৃথিবী শত শত বছর ধরে তার ওই থিওরী অব গ্রাভিটি হতে বঞ্চিত হত। মাথায় আপেল পড়বার সমস্যা হতে জগৎখ্যাত থিওরীর আবিষ্কার-ভাবা যায়। তাই বলেছি, সমস্যার এ্যাডভানটেজও ভাবুন আর সমাধানের বিকল্প বা ট্রান্সফরড রিয়েলিটিও ভাবুন। বলাতো যায় না, কীসে কী পেয়ে যান।
দশমত; সমস্যার প্রতিটি ফ্যাক্ট ও উৎসের বা রেডিক্যালের বিপরীতে তার ইমপ্যাক্ট, তার দায়, তার পেছনে খরচ বা বিনিয়োগ-এগুলো নির্ধারন করুন।
একাদশত; সংশ্লিষ্ট সবাইকে উইন-উইন নীতি অনুসরনে উজ্জিবিত করুন। তারপরে সবার কাছে সমস্যার আগের ১০ টি পয়েন্ট বর্ননা করুন। তার পরে তাদের কাছে একাধিক বিকল্প মতামত (মূলত সমাধানের) চান। তাদের মতামত লিপিবদ্ধ বা শ্রেনীবদ্ধ করুন। সেগুলোকে এনালাইজ করুন।
দ্বাদশত; সংগৃহিত বিকল্পগুলোর মূল্য, ইমপ্যাক্ট, মেরিট ও ডিমেরিট এনালাইজ করুন। যে বিকল্পটির সংখ্যাতাত্বিক পাল্লা ভারী সেটিকে প্রাথমিকভাবে সমাধান হিসেবে নির্বাচন করুন। সেটির মেরিট, ডিমেরিট এবং সেটিকে সবার কাছে ACCEPTABLE করতে হলে তার যেসব লজিক থাকতে হবে, সেটি নির্ধারন করুন। এবার সেটিকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সামনে পেশ করুন। তাদের একমত বা দ্বিমত থাকলে আবার একটু ডিসকাস করুন।
ত্রয়োদশত; সর্বজনগ্রাহ্য, সবার মনের মতো, সবার জন্য সমান-এমন কোনো সমাধান বের করা বলতে গেলে অসম্ভব, দুস্প্রাপ্য। তাই মোটামুটি সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে-সেই নীতি অনুসরন করে, উইন-উইন একটি সমাধান চুড়ান্ত করুন এবং তার পরে তা সবাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিন।
চতুর্দশত; উৎপাত, ঝামেলা আর সমস্যাকে গুলিয়ে ফেলবেন না। প্রতিটিকে আলাদা আলাদ সিগনিফিকেন্স দিয়ে ট্রিট করুন। সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে জরুরী কনসিডারেট হল, সমস্যা হতে দূরে থাকুন। কম্প্রোমাইজ করুন, যথাসম্ভব। এড়িয়ে যেতে বলিনি, সমস্যার জন্মের আগেই সমস্যা নিরোধক বড়ি খান। সমস্যার ধারে কাছে গেলে বা যাবার উপক্রম হলে তাকে নিরোধক পরান। তারও পরে, যদি সমস্যা কনসিভই করে, তাকে এবোর্ট করান। তারও পরে, যদি সমস্যার ঘোট পাকিয়েই যায় আর আপনি জড়িয়েই জান, তাহলে এক নম্বর হতে আবার শুরু করুন।
আমাকে অনেকে বলে থাকেন, আপনার মাথা এত কুল রেখে চলেন কীভাবে? (আমি Cool boy নাকি কূলটা-সেটা শুধুই আমি জানি।) তবে প্রোফেশনাল দিকটা আমি মাথা ঠান্ডা রেখে অনেকটাই হ্যান্ডেল করতে পারি-সেটি সত্যি। আমার এক প্রিয় সহকর্মী আছেন-যিনি আমাকে খুব ডেলিবারেটলী রাগানোর (মানে তাতিয়ে দিতে) চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হয়ে একদিন বলেই ফেললেন, “নাহ, আমি চেষ্টা করেও আপনাকে তাতাতে পারি না। তাই আর ওপথে যাব না।” আপন গুনকীর্তন থাক। ছেলে খেলে ভাল, মাঠে গেলে বল পায় না। কুল থাকবার রহস্যটা বলি।
খুব ছোটবেলায় আমার বাবা ঘরে ফিরবার সময়ে তার স্ত্রী মানে আমার আম্মাকে ভালোবেসে এবং তার জন্য স্নেহবশত প্রায়ই টেক্সটাইল ঝুট-মানে দলাপাকানো সুতার গোছা/লাড্ডু নিয়ে আসতেন-তার কাঁথা সেলাইয়ের উপাচার যোগান হিসেবে। আম্মা কাঁথা সেলাই করতে পছন্দ করতেন। তিনি তার কাঁথা সেলাইয়ের নকশাদার অংশের জন্য শাড়ির পাড় হতে রেশমি সূতা সংগ্রহ করতেন। আর ওই দলাপাকানো সুতার লাড্ডু হতে তিনি নিতেন সাধারন সেলাইয়ের সূতা।
কীভাবে?
তিনি ও আমি ওই কাজে হাত পাকাই। সুতার দলাপাকানো গোছাটা খুব বিতিকিচ্ছিরিভাবে জড়ানো থাকত। আমি সেটাকে নিয়ে খুব ধীরে, ঠান্ডা মাথায় আসল মাথাটা খুঁজে বের করতাম আর আস্তে আস্তে সুতাটার প্যাঁচ এড়িয়ে একটু একটু করে সূতো বের করে আনতাম। কাজটা খুবই ধৈর্যের আর অধ্যবসায়ের। তাড়াহুড়া করলে আরো প্যাঁচ লেগে যেত। ওই কাজে আমি আম্মার যোগ্য স্যাঙ্গাত ছিলাম।
সুতার লাড্ডু হতে ওইভাবে সূতা বের করে আনার চর্চা ছোটবেলায় করতে করতে হয়তো অগোচরেই আমার মধ্যে গুছিয়ে ও খুঁটিয়ে সমস্যা হ্যান্ডেল করবার বা সমাধানে কাজ করবার চরিত্র প্রোথিত হয়ে গিয়ে থাকবে। সেই সাথে আমার আম্মার সাথে ওই কাজে নিবিড়ভাবে জড়িত থাকবার মধ্য দিয়ে তার ওই কুল ব্রেনের স্বভাব আমার মধ্যে ঢুকে থাকবে। এই আত্মপ্রশংসার মাজেজা হল, সমস্যা আমাদের জীবনে ওই সূতার লাড্ডুর মতোই জট পাকিয়ে থাকে। তাকে আস্তে আস্তে প্যাঁচ ছাড়িয়ে সেখান হতে জীবনকে বের করে আনতে হয়। শুধু সেটুকুই বোঝানো আমার লক্ষ্য ছিল।
#problemsolving #soliciting