এক;
ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং যদিও এখন এক প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা।
#SelfLearned #SelfMade আমার প্রয়াত স্বল্পশিক্ষিত পিতা তার কর্মজীবনে (আজ হতে ৩০-৪০ বছর আগে) একজন স্বশিক্ষিত সুপারস্কীলড কর্মী ছিলেন। তাকে কখনো নিজের পসার ও প্রচার নিয়ে ভাবতে হয়নি। নিজের স্কীল তথা দরকারী সব কমপিটেন্স নিয়ে কনফিডেন্সের সাথে শুধু কাজ করে গেছেন। এর বাইরে নেটওয়ার্ক, পিয়ারগ্রূপ, লিংকডিন কানেকশন, পারসোনাল ব্র্যান্ডিং করার ক্যারিয়ার চিন্তা নিয়ে কখনো ভাবিত হবার দরকার পরেনি। ফেসবুকে নিজের মার্কেটিং করতে হয়নি। কিন্তু, আমি দেখতাম, মানুষ তার সার্ভিস নেবার জন্য বহু আগে হতে বুক করে রাখতে হত। তিনি কাজকে খুঁজতেন না, কাস্টমার ঢুঁড়তে হত না, কাস্টমার বাড়িতে আসত পায়ে হেঁটে। (আজও অবশ্য চাকরি কারো কারো কাছে পায়ে হেঁটে আসে; যাহোক, তারা সুপারম্যান।)
কিন্তু, তার সন্তান আমাকে আজকের পৃথিবীতে টিকে থাকবার জন্য প্রতি মুহূর্তে, প্রতিটি পলে, প্রতি ক্ষণেই হিসাব রাখতে হচ্ছে, TRP কমে গেল কিনা, নেটিজেনরা আমাকে ভুলে গেল কিনা, নাইক-কমান্ড কতগুলো জমল, কানেকশন কতগুলো হল, পোস্ট রিচ কত হল, ভাইরাল হতে পারলাম কিনা-কত কী। প্রতি মুহূর্তে সামাজিক মাধ্যমে এসে জানান দিতে হচ্ছে, আমি কিন্তু আছি দাদারা।
হালের প্রফেশনাল আমি বা আমার মতো যে কেউই, নিজের কাজ ও যোগ্যতা নিয়ে ভাবার সাথে সাথে, বাধ্যতামূলকভাবে ভাবতে হয় ওইগুলো নিয়ে, যা আমাদের বাবাদের না ভাবলেও চলত। কাজ বাদ দিয়ে বরং নেটওয়ার্ক আর TRP নিয়ে বুঁদ থাকতে অনেকটা বাধ্যই হতে হচ্ছে এখনকার বাস্তবতায়।
একটা ঘামাচির দানা গজালেও এখন যেমন ফেসবুকে দেবার নিয়ম, তেমনি প্রফেশনাল হিসেবে ’ক আকারে কা’-এতটুকু করলেও সেটা দশগুন ইনিয়েবিনিয়ে ফেবু, লিংকিতে না দিলে TRP শেষ। আত্মপ্রচারের নাম এখন হয়েছে পারসোনাল ব্র্যান্ডিং। ম্যানিপুলেশনের নাম এখন হয়েছে কনভিন্সিং পাওয়ার। আগে যেটাকে আমরা বলতাম ‘মার্কা মারা’, সেটাই এখন ব্র্যান্ড। কাজ করব কখন, TRP সামলেই তো সময় শেষ।
দুই;
এটি একটি “দাগ হতে যদি ভাল কিছু হয়” পোস্ট। আমাদের একটা বন্ধু গ্রূপে বিভিন্ন ঘটনায় ও পোস্টের কমেন্টে একে একে ৩টা জোকস মন্তব্য লিখেছিলাম। ভাবলাম, যারা পড়ে চক্ষু শীতল করেনি, তাদের জোর করে আরেকবার ক্যাস্টর অয়েল গিলাই। নেগেটিভ মন্তব্য হতে যদি ভাল কিছু হয়, তবে দাগ (মন্তব্য) ভাল।
জোক-১:
এক বাসায় পুরুষ ভদ্রলোক তার স্ত্রীকে ডেকে বলল, “ওগো, কোথায় গেলে? আমার ঘড়িটা কোথায় রাখলে?” স্ত্রী রেগেমেগে বলল, “সারাক্ষণ আমার ওটা, আমার এটা, আমার আমার না করে আমাদের বলতে পারো না?” স্বামী মেনে নিল। একটু পরে স্বামী অফিসে যাবে। সে ডাক দিয়ে তার স্ত্রীকে বলল, ওগো, কই গেলে, আমাদের জাঙিয়াটা দিয়ে যাও না।”
জোক-২:
একবার আমি ও নিটোল বাড়ি হতে ঢাকা ফিরছি। দারুন একটা বাসে করে। মনে মনে অসংখ্যবার শুকরিয়া। মনও ফুরফুরে। কিন্তু ঘন্টা তিনেক মৌজের পরেই আসল আসল মুসিবত। বাসে এক বৃদ্ধা কাপড় নষ্ট করে ফেলেছেন। তো বাসের মধ্যে গন্ধ, নোংরা, ধৌতকরন, গন্ধমাদন নিক্ষেপ, উহার ব্যর্থ প্রয়াস সবমিলে বাসের মধ্যে ধুন্দুমার ঘটে গেল। আমার গিন্নী মুহুর্মুহু বমি করতে লাগলেন সেই পরিবেশ ও পরিস্থিতি দেখে। তাকে সামলাতে আমি জেরবার। নারকীয় হয়ে গেল মধুর যাত্রা। অতঃপর আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। কী, জোক বলে মনে হল নাতো এটাকে? তবে দ্বিতীয় অংশ শোনো।
আমি এই গল্পটা আমার গাড়িমেটদের যখন চা খেতে খেতে বললাম, এক জুনিয়র প্রশ্ন করল, ”ভাই, উনি পানি ব্যবহার (শৌচ) করেছিল কীভাবে?” আমি দুঃখে হাসি। এত ডিসএসটারের মধ্যে তার মনে আসল, পানি ব্যবহারের কথা।
জোক-৩:
এক ভদ্রলোকের স্ত্রী তার এক ছেলেকে রেখে মারা যাবার পর তিনি আবার বিয়ে করলেন। সেই মহিলারও আগের পক্ষের একটা ছেলে আছে। তো বিয়ের পরে তাদের দু’জনের সম্মিলিত সংসারে আরেকটা ছেলে হল। একদিন ভদ্রলোক অফিসে গেছেন। বাসা থেকে বউ ফোন করলেন, ”ওগো, তাড়াতাড়ি বাসায় এসো। এক্ষুনি।” ”কেন, কী হয়েছে?” ”’তোমারটা’ আর ’আমারটা’ মিলে ’আমাদেরটা’কে পিটাচ্ছে।” বউয়ের উত্তর।
জোক-৪:
আশির দশক। দেশ তখন উত্তাল। মওলানা ভাসানী তখনো বেঁচে আছেন। তো একদিন এক হকার সকালবেলা পত্রিকা হাতে অপিস পাড়ার ব্যস্ত মোড়ে জোরে জোরে হাঁকতে লাগল, ”গরম খবর, গরম খবর, গরম খবর। ভাসানী আর নাই। ভাসানী আর নাই।”
মানুষ প্রিয় নেতার অকাল প্রয়ান ভেবে আকূল হয়ে দ্রূত পত্রিকা কিনতে লাগল ঝাপিয়ে পড়ে। পরে খবর পড়ে দেখে, “মওলানা ভাসানী বলেছেন, তিনি আর এই সরকারের সাথে নাই।” মাঝে মাঝে অনলাইন নিউজপোর্টালগুলো চটকদার হেডলাইন করে পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করে আর TRP বাড়াতে চেষ্টা করে। তারই আদিম ভার্সন ছিল এটা।
তিন;
ছাঁটাই একটি খুব বিতর্কিত শব্দ। যার নানা রকম অর্থ হতে পারে। মানুষ ছাঁটাই হতে গোঁফ ছাঁটাই। বরিশালে আবার কারো মাসল বা ভেইন পুল হলে তারা বলে, “ম্যাবাই, পায়’র মদ্যে ছাঁডায়।” যাহোক, মাঝেসাঝেই অনেককে দেখতে পাই, ফ্রেন্ডলিস্ট ছাঁটাই করেন। অনেকে ঘোষনা দিয়ে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনায় নামেন। যদিও, ’ফেসবুক ফেরেন্ড’ দিয়ে ঝাড় বানানোর সময়ে কাউকে বিজ্ঞাপন দিতে দেখা যায় না, কিন্তু ওই ঝাড় নানা কারনে ছাঁটাই করার সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিজ্ঞাপন কেন দিতে হয় তা জানি না। যাহোক, নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে। তো, এই ছাঁটাই ক্রিয়ার একটা বড় অংশ ঘটার কালে ঘটনকারী ব্যক্তি অভিযোগ করেন, “এমন বন্ধু ফেসবুক তালিকায় রেখে কী লাভ, যে কখনো একটা লাইক, কমেন্ট দেয় না।” যদিও, আমার খুব ইচ্ছে করে, ওনাকেও জিজ্ঞেস করি, “তা, আপনি আপনার হাজার পাঁচেক ফেসবুক ফ্রেন্ডের কতজনের পোস্টে লাইক কমেন্ট করেন? আপনি নিজে কি পারেন ৫ হাজার ফ্রেন্ডকে নিয়মিত রেসপন্ড করতে?” সাধু সাধু। নিশ্চয়ই পারে। আজকের প্রশ্ন সেটা না। আজ বড় দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বদনপুস্তকে একটা প্রশ্ন করতে এসেছি। সেটা হল, ওইসব কাঙ্খিত লাইক, কমেন্ট বা যেকোনো রেসপন্স না করা সত্ত্বেও আপনার ফ্রেন্ডলিস্টটা যদি ৫ হাজার হয়, তাহলে আর কোনো ধরনের বিশেষ কৌশলগত সুবিধা বা লাভ কি টেকনিক্যালী বা থিওরেটিক্যালী হওয়া সম্ভব? যেমন ধরুন, রেসপন্ডার না হলেও ওই ৫ হাজার বন্ধু থাকার কারনে এই ব্যক্তির পোস্টের রিচ ও ইমপ্যাক্ট বেশি হবে? এমন কিছু? [আমিও ফাঁসবই, মানে ফ্যাচবুক ফেরেন্ড ছাঁটাই করি। মানুষ ফেরেনড বাড়ায়, আর আমি কমাচ্ছি। সেই কমানোর জন্য আমার কিছু ঘ্যাঁচাং ফুঁ নিজস্ব তরিকা ও থিওরী আছে। সেই তরিকা ও থিওরীতে ফিল্টার করে ঘ্যাঁচাং করি। রোজই কিছু কিছু করি। গোপন সেই ফিল্টারে কারা ঘ্যাচাং হয়, সেটা বলে দিলে পাবলিক আমাকেই ঘ্যাঁচাং করে দেবে। তাই মুখে কুলুপ আটলুম। তবে বিগত কয়েকদিনে যদি কেউ ঘ্যাচাং হয়ে থাকেন, ধরে নিতে পারেন, আমি আপনার সাথে কানেকটেড থাকার যোগ্য নই। বিধায় নিজে দূরে গিয়ে মরার চেষ্টাতেই আপনাকে…………………]
চার; #কন্ঠ্যযোদ্ধা #awardbusiness #sellingyoursoul #sellingofvoice #paidaward #seasonofaward #stardom #celebrityaholic #publicfigure #paidpreaching
জনপ্রিয়তা, স্টারডম, মব রিভল্ট, মবোক্রেসি, মব জাস্টিস-এই সবকিছুই পপুলার মেজরিটি ও মাস ইউনিটির ওপর ভর করে জন্ম নেয়। তো, তার জন্ম যেখানে, তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে তার প্রাণ ভোমরা।
জনপ্রিয়তা ও মবোক্রেসির প্রাণভোমরা তাই তার জন্মজঠর (পাবলিক সেন্টিমেন্ট) এর মধ্যেই একটা কৌটোয় লুকোনো। যে প্রক্রিয়ায় তার জন্ম ও বিস্ফোরণ, সেই একই জঠরের মধ্যেই লুকোনো থাকে তার প্রাণ হরণকারী বিষ। যেখানে জন্ম, সেখানেই বিনাষ।
যেই উজবুক পাবলিক সেন্টিমেন্টের হাত ধরে stardom & মবোক্রেসির জন্ম, সেই পাবলিকের উজবুকিতেই আবার তারই বিনাশ অনিবার্য। ব্র্যান্ড নামক ফক্কা গড়েই ওঠে পাবলিক সেন্টিমেন্ট, পারসেপশন, থট প্রসেসকে রিড, রিচ ও ক্যশ করে (আসলে সত্যি বলতে ম্যানিপুলেট করে), সেই ব্র্যান্ডের হায়াত নির্ভর করে সেই পাবলিক সেন্টিমেন্টের টলটলায়মান অস্তিত্বের ওপর। যে পথে উত্থান, সে পথ ধরেই তার পতন। মাস ও পাবলিক চয়েজকে নানাভাবে বুস্ট করে, ইনফ্লুয়েন্স করে, তার অন্ধ ইমোশনের সুবিধা নিয়ে, পাবলিকের উন্মাদ মাতামাতিকে ক্যাশ করে ব্র্যান্ড যেমন আকাশে ওঠে, সেই পাবলিকের উন্মত্ত ক্রোধের পথ ধরেই তার অবনমন ঘটে।
মবোক্রেসি হল এমন এক প্যানডোরার বাক্স, যেটার ডালার মুখ একবার খুললে আর বন্ধ করবার উপায় থাকে না। তখন, যে খুলেছে, তাকেও সাপে খায়, যারটা খুলেছে, তাকেও খায়।
আদব-লেহাজ ও সমীহ হল প্যানডোরার বাক্সের মতো। একবার যদি বেয়াদবির ঝাঁপি কোনো কারণে খুলে দেন, তাকে আর বন্ধ করতে পারবেন না। বেয়াদবকে কান মলা দেয়া তো দূর, বেয়াদব বরং আপনার কান ধরে টানবে। বিপ্লবীদের আজীবনই মানুষ ‘বেয়াদব’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, বেয়াদবরা আজীবনই নিজেকে ‘বিপ্লবী’ হিসেবে দাবী করে এসেছে।
ফেসবুক আজকাল ন্যায় পাইয়ে দেবার একটা বড় ভরসার স্থান। তবে, নিয়ন্ত্রণ অযোগ্য মাস পিপলের প্লাটফরম ফেসবুক মাসকে একবার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা দিলে সেটার মরণ কামড়ও শিগগীরই ভোগ করবেন। ফেসবুক কোর্টও একটা প্যানডোরার বাক্স। মব জাস্টিসও একটা প্যানডোরার বাক্স।
স্টারডম (নাকি স্টারডাস্ট?) এই দেশে নতুন নয় মোটেই। সেই ঐতিহ্যের সাথে মিল রেখে, কর্পোরেট পাড়ায়ও স্টারডাস্ট ব্যাপক আদৃত। আজকাল তার আবার ডিজিটালাইজেশন হয়েছে।
কর্পোরেটের পরতে পরতে স্টারডাস্টের (আসল শব্দটা বোধহয় Mazhar Milon জানে) পূজা ও প্রণয়। শিক্ষণ, প্রশিক্ষণ, বয়ান-সবকিছুতেই স্টার বক্তা ও প্রবক্তার জয়জয়কার। বকতে ও বকাতে স্টার ‘রিসোর্স পারসন’ না হলে পসার নেই।
ছোটবেলায় পাড়ার পাঞ্জেগানা মসজিদের ইমাম সাহেবরা হতেন একটু লো প্রোফাইল। মহল্লার কারো বাচ্চার পেটে ব্যথা কিংবা পশ্চাতে ব্যথা-যাই হোক, হলে যেতেন তার কাছে। তার পানি পড়াই ছিল ওষুধ।
কিন্তু, যখন কোনো ‘বাজা বেডি’র বাচ্চা হচ্ছে না-তার চিকিৎসা তদবীর চাই, তখন আর ওই পাঞ্জেগানায় হত না। তখন যেত বড় জামে মজজিদের খতিবের দরবারে। পানি পড়া আসত, বাচ্চা আসত কিনা জানি না। দরকার
যখন আরো বড় হত, যেমন ধরুন, ইলেকশনে জিততে হবে, তখন মানুষ যেত শশসিনা, ধরমো-নাই, কাকের মঞ্জিলের হুজুরের দরবারে। যত বড় নীড, তত বড় পীর ধরো।
পাড়ার ওয়াজমফেলে বক্তা রাখা হত সেই পাঞ্জেগানা হুজুরকে, আর বড়জোর অমুক পাড়ার মসজিদের পেশ ইমাম। নোটের ঝনঝনানি নাই, মফেল শেষে এক পেট খানা। শ্যাষ। রিক্সা ভাড়াটা দিয়ে দিলে সেটাই অনেক।
বড় মসজিদের ওয়াজমফেল হলে কথা ভিন্ন। ভিন জেলা হতে কূ-যুক্তিবাদী হুজুর, টুমচরি, বালুচরি হুজুর, আগুনবর্ষী বক্তা ভাড়া করা হত। টঙ্কার জোগান খারাপ না। কাচ্চি চড়ত উনুনে। যাবার সময়ে খাম, হাজি রুমাল, মোটা চালের বিরানীর প্যাকেট-সবই হত।
আন্তর্জাতিক বক্তা নামে একটা জিনিস আছে-সেটা আমি শিখেছি ঢাকায় এসে। এখানে এসে দেখি, এখানে অনলবর্ষীদের ভাত নেই। এখানে ভাড়ায় খাটেন যারা, তারা সব আন্তর্জাতিক মানের। তারা আবার এজেন্ট রেখেছেন মেসী-রোনালদোর মতো। তারাই নেগোসিয়েশন ও শিডিউল করেন। হেলিকপ্টার ওড়ে, ইউটিউব গরম হয়।
তারই ছোঁয়াচ আজ কর্পোরেটে।
যত বড় আয়োজন, তত বড় স্টার বক্তার আবির্ভাব। নামের পাশে ৫ স্টার না থাকলে পাড়ার মোড়ের বক্তা ও প্রশিক্ষকদের বেইল নাই। শীতকাল শো-অফের অত্যুপযোগী মৌসুম। চারিদিকে সাজসাজ ধ্বনি কান পাতলেই শোনা যায়।
এরকম মৌসুমেই দেশে দেশী ও বিদেশী মৌসুমি পাখিদের আনাগোনা বাড়ে। সভাসমিতি, ‘লিভটুগেদার’, কনফারেন্স, ’পুষ্কুরনি বিতরণ’, অজমফেলের মচ্ছব চারিদিকে। এমন মোলায়েম আবহাওয়াতেই ঈশ্বর ও নশ্বর-উভয়কে চাঁদা বা ডোনেশনের বিনিময়ে বিক্রী করার ধূম পড়ে। যারা এপাড়ের নশ্বর বিক্রী করবার কাবেলিয়াত রাখে না, তারা ওপাড়ের ঈশ্বর ও তার স্বর্গ সওদা করতে পাড়ায়,মহল্লায় খ্যাপ দিতে শুরু করেন। ঘন্টাখানেক ক্যানভাজ করলেই উভয় পক্ষের সওদা ভালই হয়।
একদল এক ঘন্টায় কানের পরিশ্রমে স্বর্গ কেনে। আর বিক্রেতা মাড়োয়ারীরা এক ঘন্টা গলা বিক্রী করে জাগতিক টঙ্কা কেনে। বিকিকিনির মফেলে আবার জাগতিক সুখের তাবিজ, কবজ, মাদুলিও হাত বদল হয়।
ওদিকে, যারা নশ্বর জগতের নাজ নেয়ামতের ফেরিওলা, তারা তকমা, খেলাত, টোরোফি, মেঠেল নিয়ে ফেরী করে। সামান্য বা চড়া-উভয় রকম চাঁদা দিলেই ক্রেতাকে প্রকাশ্য জনসম্মুখে ধুমধামের সাথে খেলাত পরিয়ে দিয়ে উভয় পক্ষই হৃষ্টচিত্ত হয়। দর্শকরা কেউ আমার মতো হিংসিত, কেউ আহাউহায়িত।
এতকাল এই খেলাত বেঁচাকেনাটা দেশী পরিসরে সীমিত থাকলেও এখন তো দেশ উন্নত হয়ে গেছে। তাই শীত মৌসুমে বিদেশী মাড়োয়ারি ও বণিকরাও আসেন। আরো চকচকে ব্রান্ডেড তকমা ও খেলাত বিক্রী করতে। খুব জমেছে বেঁচাকেনা, খুব জমেছে বেঁচাকেনা; যাঁচাই করে দেখো না। ট্যালেন্টের বাজার ভাল না। শুনছি, বক্তা ও প্রবক্তা হিসেবে আপনাকে ৫স্টার জেনারেলের সার্টিফিকেট দেবে-এমন সার্টিফিকেশন বডিও এসে গেছে এদেশে।
তার আবার কয়েকটার মালিক নাকি আবার খোদ স্টার বক্তারা নিজেই। আমার মতো, যারা এখনো স্টার হয়ে ওঠেন নাই, কিন্তু হব হব খাহেশ, তারা আমরা নানা ঘাঁই কিচিং করে স্টার হবার ধান্দা করি। ঘরে বউয়ের সামনে গলার স্বর না ফুটলেও মাইকের সামনে খই ফোটাই। বউয়ের কাছে লুপ্ত বাকস্বাধীনতা ও বাকশক্তির ঘাটতি মাইকে পুষিয়ে নিই। ভবিষ্যত স্টার হয়ে ওঠার খাহেশে বিনা পয়সায় মাগনা খাটি। ভাড়ায় যাই। বকবক করি।
পয়সা না আসুক, অন্তত মার্কেট তো বাড়ে। কত রঙ্গ, কত যাদু।
পাঁচ; সাহিত্যে TRP যুগ:
ছোটবেলায় এলাকায় কিছু চটকদার পত্রিকা বের হত। তার শিরোনাম হত, “রাজ্জাকের সাথে পালিয়ে গেল কবরী”। ছোটবেলায় বলছি কেন, এখনো আমাদের প্রথিতযশা পত্রিকার অনলাইন সংস্করনে হরহামেশাই “বুবলি বাদ, অপু ইন” কিংবা “দুই হাজার বছর পুরোনো কবরে আইফোন” এমন হেডলাইন দিয়ে নজর কাড়া হয়। একবার এক হকার বাসে উঠেই চিৎকার করে বলতে শুরু করল, ”গরম খবর, জবর খবর। ভাসানী আর নাই।” শ্রোতারা তাড়াহুড়া করে ভাসানীর প্রয়ানের দু”শ্চিন্তায় পত্রিকা কেনে। পড়ে দেখা গেল, ভাসানী বলেছেন, তিনি আর পাকিস্তানের সাথে নাই। TRP নামক বস্তুর জন্ম আসলে সেই সময়ে। সময় বদলেছে। পদ্মায় অনেক জল গড়ায়নি, তবে তার ব্রীজে অনেক স্প্যান বসেছে। কিন্তু TRP নিয়ে বাঙালীর ক্ষুধা কমেনি। TRPর আশায় আমাদের পেশাজীবিরা আজকাল কী না করছেন? যিনি হয়তো একজন অফিস ম্যানেজার, তিনিই আবার, শিক্ষক, নেতা, প্রণেতা, দাতা, সংগঠক, বক্তা, ক্রেতা, হিরো, প্রেষক, প্রেরক, প্রেমিক, পরকীক, কবি, লেখক, প্রকাশক, মাড়োয়ারি, অভিনেতা, অভিনেত্রী, উদ্যোক্তা সব। কোনো আলাদীনের চেরাগই ছাড়ছি না আমরা। একজনই এত এত ভূমিকায় সমানে ছক্কা মারছি। মাগনা সাহিত্য ও লেখালেখি পড়ার জন্য আমি ফেসবুকে বেশ কিছু সাহিত্য পাতার সদস্য। সময় পেলে নতুন লেখা পড়ার জন্য ঢুঁ মারি। তো, সেই ঢুঁ মারার অভিজ্ঞতা হতে আমাদের সমসাময়িক হুমায়ুন সাহেবদের (দুর্মুখেরা বলেন, হুমায়ুন নাকি TRP লেখক ছিলেন।) TRP বাড়ানোর জন্য লেখা কোনো চটকদার লাইন দিয়ে শুরু করার ভয়াবহ এক মচ্ছব প্রত্যক্ষ করলাম। আপনারা জানেন, ফেসবুকে বড় লেখা দেখলে একদম খোর পর্যায়ের পাঠকও সটকে পড়েন। তাছাড়া বড় লেখা পাতায় দিলে সেটির মাত্র কয়েক ছত্র মাথা তুলে থাকে। বাকিটা কন্টিনিউ রিডিং দেখিয়ে লুকিয়ে থাকে। তো, TRP ও পাঠকের নজর কাড়তে লেখকরা ওই দুই লাইনেই পাঠককে ভিতরে টানতে যা করেন, তার কয়েকটা নমুনা বলি।
তবে তার আগে বহু বছর আগে উন্মাদ পত্রিকার একটি গল্প বলি। যেখানে, সংসদে স্পিকারের নজর কাড়ার জন্য একজন সাংসদ কী কী অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারেন, তার একটা নমুনা হিসেবে দিয়েছিল, “সংসদ কক্ষে মাথায় ক্যাপ না পরে অন্তর্বাসের একাংশ পড়ে ঢুকুন।” অশ্লীলতা ভাববেন না, কোট করলাম। এবার আসুন, নমুনা দেখি:
এক: রাত বারোটার সময়ে কাজের মেয়েটা আমার রুমে ঢুকেই দরোজা বন্ধ করে দিল। ব্যাস, পাঠক সাসপেন্সের আশায় লাইনের পর লাইন পড়ে যাবে। অতঃপর দেখা যাবে, গল্পের পরের অংশে আছে, কাজের মেয়েটা দরোজা বন্ধ করে মশার স্প্রে দিল। তারপর চলে গেল। পাঠকের আধা লালসা মাখা সাহিত্যাগ্রহ মুহুর্তে অতৃপ্ত কামের মতো নেতিয়ে যায়।
দুই: ভাবিকে এভাবে একা একা পেয়ে যাব ভাবিনি। গল্প পড়লে দেখা যাবে, লেখক বলছেন, ভাবিকে একা পেয়ে দুশো টাকা চেয়ে নিলাম, ব্যাংক ড্রাফট করতে।
তিন: সেদিন পতিতালয়ে আমার সাবেক প্রেমিককে ঢুকতে দেখে অবাক হলাম। ব্যাস, পাঠক উত্তেজক কিছু পড়তে মুহূর্তে কন্টিনিউ রিডিং ক্লিক করে বসে।
চার: ”এই, তুই মিলিকে কী করেছিস?” পাঠক, বিশেষত পুরুষ পাঠকদের মনে এক নিষিদ্ধ গল্পের দোলা লাগে। তারা তাড়াহুড়া করে বাসের হ্যান্ডেলে ঝুলে হলেও পড়া শুরু করে দেন।
পাঁচ: ”আমার বাসর রাতটা এমন হবে কখনো ভাবিনি।” ব্যাস, পাঠকের চোখে আঠার মতো লেগে যায় পোস্ট। বাসর রাত নিয়ে বাঙালীর ফ্যান্টাসীর শেষ নেই এমনিতেই।
ছয়: ”আমার স্বামী যখন আমাকে বলল, এসো, ঘুমিয়ে পড়ি, আমার খুব অবাক লাগল……।” শেষ পর্যন্ত পড়লে দেখা যাবে, লেখক বলছেন, টিভি সিরিয়াল দেখে বউ কাঁদছিল। স্বামী তাকে ঘুমাতে ডেকেছে।
সাত: ”জগতের সব পুরুষ মানুষ বোধহয় এমনই হয়”। ব্যাস, হয়ে গেল। মুহুর্তে নারীবাদি পুরুষবাদি সবার চোখ ওই পোস্টে।
আট: “তৃণা গত এক ঘন্টা ধরে দরদর করে ঘামছে। ছিনতাই হওয়া মোবাইলের চেয়েও ওটার মেমোরী কার্ডটার জন্য বেশি দুঃচিন্তা হচ্ছে।” পাঠক রসালো ছবির গল্পের আশায় গল্পে আটকে যায়। বাস্তবে গল্পটা হল, মেমোরী কার্ডে তার রিজুমী, সার্টিফিকেট কপি করা ছিল।
সুড়সুড়ি ও টোকা দিয়ে পাঠক টানার এই TRP প্রবাহ সবাইকেই বশ করেছে। কি পাঠক, কি লেখক সবাই। আজকাল নাকি ‘ভিউ’ খুবই মূল্যবান বস্তু। কী করছি, কী বলছি-তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, কতজন দেখছেন। আসলে দেখাও মূল লক্ষ্য না। টাকা। হ্যা, যত ভিউ, তত টাকা। ইন ফ্যাক্ট টাকা হল ২০২৪ সালের বাংলাদেশে সবচেয়ে হাইপড, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে দামী, সবচেয়ে কাঙ্খিত দেওতা। ভিউ বানিজ্য করে টাকা কামানোই হয়তো হতে যাচ্ছে বিচিএচ এর পরে সবচেয়ে আরাধ্য পেশা। ভিউ পাবার জন্য মানুষ করছে না-হেন কাজ নেই। পারলে পশ্চাতের লুঙ্গি উদলা করে দেখিয়েও ভিউ পেতে হবে।
ছয়; সেলেব্রিটি হোন:
একটা সময় ছিল যখন মানুষকে কেবল জ্ঞানী হলেই চলত। জ্ঞানপিপাসুরা বিজ্ঞ প্লেটোর টোলে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকত, শেখার জন্য। একটা সময় এসেছে, যখন শুধুমাত্র জ্ঞানী সক্রেটিস হলেই হবে না। আপনাকে সেলেব্রিটি সক্রেটিস হতে হবে। আপনার ইউটিউব চ্যানেল থাকতে হবে। সেখানে লাখে লাখে ঝাঁকে ঝাঁকে সাবসক্রাইবার থাকতে হবে। ইন্সটায় আপনার তিন কোটি ফলোয়ার থাকতে হবে। আপনার ছয়শো আওয়ার এয়ারটাইম বা টিভি টকশো’র হিট থাকতে হবে। এর সাথে আপনি যদি টুকটাক চিকা মারা কবিতাও লেখেন কিংবা হালকা গাঁধার ছবি টবি আঁকতে পারেন অথবা পারেন শিং মাছের ঝোল রাঁধতে, তাহলে সোনায় সোহাগা। যাই করুন, যাই পারুন, আলোচনায় থাকুন।
একবার মোটামুটি সেলেব্রিটি না হোন, ব্রেক ইভেন পার হলেই হয়ে যাবে। এরপর জ্ঞানপিপাসু ভক্তরাই আপনাকে আকাশে তুলে দেবে। এবং, সেই উর্দ্ধযাত্রার সময় আপনাকে আর কিছু করতে হবে না। ভক্তরাই তখন আপনার অমরত্ব লাভের যাত্রায় সব দায়ীত্ব পালন করবে। ব্রেক ইভেনের পরে, আপনার কাঁশখাগড়াকেই লেডিগাগা করে দেবে। আপনি হাসলে সেটা খবর হবে। আপনি কাঁশলেও খবর হবে। হাগলে খবর, হাগা বন্ধ হলে খবর। আপনি বিয়ে করবেন-ফ্যান হাইপ উঠবে, আপনি তালাক দেবেন-ভক্তরাই হাইপ তুলে দেবে।
আপনার জল পড়ে পাতা নড়ে তখন দামী সাহিত্য পেজে পিন পোস্ট হবে। আপনার বায়োগ্রাফির লাখ লাখ কপি বিক্রী হয়ে যাবে আগাম। পৌনঃপুনিকভাবে আপনি তখন এমএলএম ব্যবসার মতোই উপরে উঠতে থাকবেন মুরীদদের ঘাড়ে চড়ে।
নিজেকে নিজে বেঁচুন:
একটা সময় ছিল, যখন একজন ট্যালেন্ট, একজন শিল্পী, একজন সুরস্রষ্টাকে কেবলমাত্র নিজ মেধা ও শিল্পী সত্তাকে লালন, ধারন, চর্চা,. সমৃদ্ধ করার সাধনায় লিপ্ত থাকলেই হত। এখন, শিল্পী বা যেকোনো রকম জিনিয়াসকে, নিজের গুণ আর মেধার লালন, চর্চাকে দূরে সরিয়ে রেখে, সবার আগে তার ভক্ত, Follower base, celeb image সৃষ্টি, ধারন, লালন আর Grow করার পিছনে মনপ্রাণ ঢেলে দিতে হয়। TRP না থাকলে এ যুগে রবী দা’র ও ভাত নেই।
আদিকাল: বামুন হইয়া চাঁদের পানে হাত বাড়াইও না।
২০২১: কম TRP লইয়া সেলেবদের সাথে লিংক করিতে যাইও না। আর তাই, ২০২১ সালের বঙ্গদেশে, আপনি কেবলমাত্র আইনস্টাইনের মতো তুখোড় মেধাবী হলেই হবে না, আপনাকে সেই সাথে বাজার পেতে হলে ফিলিপ কোটলারও হতে হবে। অন্যথায় বাড়ির পাশের আমেনাও আপনার রিলেটিভিটি থিওরীও বুঝবে না, রিলেশনও করবে না।
শুধু স্টিফেন হকিং এর মতো বিজ্ঞানী হলেই হবে না, আপনাকে রাজনৈতিক চ্যাতনাও মগজে ও হস্তে ধারন করতে হবে, না হলে, আপনার আবিষ্কার একটাও গাছে ধরবে না। Showoff, Branding, Networking, Capitalizing-এই চার অস্ত্র চালনা ও ব্যবহারে সুপার না হলে আপনার যাবতীয় যোগ্যতা নিয়েও বিপদে পড়তে পারেন। যষ্মিনদেশে যদাচার।
আপনি যত এক্সট্রাঅর্ডিনারী বিদ্যায় বিদ্যা সিনহা হয়ে থাকুন না কেন, ফেসবুক লিংকডইনে আপনার লাখ লাখ ফলোয়ার না থাকলে আপনি নিতান্তই ধইঞ্চা।
শুধু তানসেন বা মোজার্ট এর মতো স্বর্গীয় সৃষ্টিতে মাস্টার হলেই হবে না, পাবলিকের কাছে পৌছাতে হলে আপনার নিজের বা আপনার জামাইয়ের টিভি চ্যানেল থাকতে হবে।
আপনি শুধুমাত্র মিজ. অরুন্ধতীর মতো জ্বালাময়ী লেখা লিখতে জানলেই হবে না, পত্রিকায় আপনার জ্যাক থাকতে হবে। বিশেষ পত্রিকার সুনজরে না আসতে পারলে আপনি গড অব স্মল থিংগস না, আপনি তখন স্মল গড অব অল থিংস হয়ে থাকবেন।
আপনি যতই গান্ধীজির মতো মহান ব্যক্তিত্ব হন না কেন, যতই দেশের জন্য জীবনদান করেন, বিশেষ চ্যাতনায় না চ্যাতলে আপনি গাদ্দারই রয়ে যাবেন।
আপনার ভেতরে যতই স্টিভ জবস, টীম কুক, বিল গেটস বসবাস করুক না কেন, রাজকীয় দপ্তরে যায়গামতো কোথায় হুক করতে হবে-সেটা না জানলে আপনি এ্যাপল বানানো তো দূরে, আপনি ঝুড়িতে করে আপেলও বেঁচতে পারবেন না।
আপনি যতই শেরে বাংলা বা ড. কামালের মতো দুঁদেঁ উকিল হন, আপনার ভাত নেই। আপনাকে ভাত পেতে হলে ব্যারিস্টার লাইভের মতো চোস্ত লাইভ করতেও জানতে হবে।
আপনি যতই ডাক্তার এন্থনী ফাউচি হন না কেন, আপনার পসার বাড়বে না। পসার পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই ফেসবুকে আজগাই কোনো প্রেসক্রিপশন চালু করে ভাইরাল হতে হবে। অন্যথায় আপনার আর মন্তাইজ্যা কবিরাজের মধ্যে বিরাট কোনো হেরফের হবে না।
ঢাকা শহরে মানুষ বিক্রী হয়-জানেন?
জ্বি, প্রতিদিন সকালে শহরের কিছু কিছু কানেকটিং কী পয়েন্টে বালতি, কোদাল, ঝুড়ি নিয়ে বড় বড় ঝাঁক ধরে দেখবেন মানুষগুলো তিনমাথা হয়ে হাটুতে মাথা গুজে বসে থাকে। বিক্রীর আশায়। কখন একজন ক্রেতা এসে তাকে কিনে নিয়ে যাবে সারাদিনের জন্য। বিক্রী হলে সারাদিন কাজ করবে, তবেই মিলবে সেদিনের রাতে চাল, ডাল, মরিচ, লবণ, দুটো বেগুন, সামান্য ডিম কিনে বাসায় বিবি-বাচ্চা-বৃদ্ধা মায়ের জন্য খাবার কিনে ফেরার দিশা। বৃষ্টির দিনে, অতি দুর্যোগের দিনে বিক্রী হয় না অনেকেই। ভাঙা মনে ঘরে ফিরতে হয়।
ঠিক তেমনি বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামলেই সংসদ, বিজয় সরনী, পল্টনের মতো শহরের কিছু কিছু পয়েন্টে প্রকাশ্যে উগ্র ও সস্তা মেকআপে নিজেকে একটু মেরামত করে পাংশু মুখের কিছু মানুষ ল্যাম্পপোস্টের নিচে এসে দাড়ায়। বিক্রীর আশায়। অনেকক্ষন দাড়িয়ে থাকার পরে কেউ একজন চরিত্রহীন, লম্পট, স্ত্রী পরিত্যক্তা, বিধবা অথবা বিবাগী-যাকে মনুষ্য সমাজ ঘৃনা করে, তেমন অস্পৃশ্য কেউ এসে তাদের কিনে নিয়ে যায়। এক রাত বা কয়েক ঘন্টার জন্য। বিক্রী হলে তবেই পরদিনের খাবারের পয়সা আসবে হাতে। বাসা ভাড়া, মেকআপের খরচ, স্যানিটারি প্যাড, কুৎসিত রোগের আপাত চিকিৎসা, বাড়িতে মা-বোনকে কিছু পাঠানোর যোগান হবে। বিক্রী না হলে সব খরা। মজার বিষয় হল, সন্ধ্যার বিক্রেতাদের মধ্যে সুন্দরীদের কদর কম। কদর বেশি আকর্ষনীয় ও ছলাকলায় পটুদের।
এই উন্নত ও স্বাধীন শহরে আজও মানুষ বিক্রী হয়। ছলাকলা কদর পায়। যোগ্যতা পায় না।
এই শহরেই রূপক মেসি, রোনালডো টুকরি, কোদাল হাতে অবিক্রীত রয়ে আকাশের দিকে একটা অনুযোগ জানিয়ে পরের ক্রেতার অপেক্ষা করে। অথচ, তারই পাশ হতে মন্তাজ, কদম, জোলেখারা দিব্যি কর্পোরেট কাস্টমারের কাছে বড় মাহিনাতে বিক্রী হয়ে যায়। শুধু মেসি ও রোনালডোর টুকরিটাকে একটা অতি যোগ্য রেজুমে হিসেবে কল্পনাটা একটু বদলে নিন। মিলে যাবে। এই শহর যোগ্যতা চায় না। চায় ছলাকলায় পটু চকচকে পোর্টফলিও। যোগ্যতাহীনতায় চাকরি পাওয়া যাবে না, যোগ্যতা আপগ্রেড করতে না থাকলে প্রতিযোগীতায় পিছিয়ে পড়তে হবে-এই ন্যারেটিভ তো আমরা সবাই জানি ও মানি।
কিন্তু, যোগ্যতা (কিংবা যোগ্যতাজনিত স্টাটাস বা ক্যাপাসিটি) যদি অত্যধিক হয়ে পড়ে, সেটাও যে কারো বিপদের কারন হয়ে বসতে পারে-এই দৃষ্টিকোণটি আমাদের ভাবনার অংশ হবার সময় হয়েছে?
বিষয়টা কিছুটা ভাবতে এমন, যে, আপনি ভুরুঙ্গামারি গ্রামের একটা হাঁটে ম্যাকবুক বিক্রী করার জন্য দোকান দিয়ে বসলেন। দোষ আপনার প্রোডাক্টের না, দোষ আপনার বাজার চয়েসে অথবা, বাজার অনুপাতে প্রোডাক্ট চয়েসে।
তো, জব মার্কেটে যদি আপনি ঘটনাচক্রে ওভার কোয়ালিফায়েড হয়ে বসেন, আপনি অবিক্রীত কিংবা ইগনোরড হবার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। শুনতে খুব আজগুবি ও অতি কল্পনা মনে হতেই পারে। আপনারও কি সেটা মনে হচ্ছে? নাকি বিপরীতটা?
’যোগ্যতা’ ও ‘পারফরম্যান্স’কে আমার প্রায়শই মনে হয়, যাস্ট একটা মিথ, অথবা ইউটোপিয়া। কিংবা একটা মিসজাজড ফেনোমেনন।
কেন তা বলি।
আমি অসংখ্যবার দেখেছি, একটা খুব ভাল কোম্পানীর খুব ভাল ইন্টারভিউ সিস্টেমে একজন ক্যানডিডেট একেবারেই বাজেভাবে ব্যর্থ হলেন। আরও দু’চার যায়গায়ও তাই। অথচ, এই মানুষটাই চতুর্থ কোম্পানীতে জব উইন করলেন। আর, তারপর একদিন তার কোম্পানীতে, তার পরের কোম্পানীতে পারফরম্যান্সে ফাটিয়ে ফেললেন।
আবার, জনৈক ভাংচুর ক্যানডিডেট। দুই দুইটা লো-প্রোফাইল কোম্পানীর খুব সাদামাটা ইন্টারভিউও উইন করতে পারল না। সেই একই লোক তৃতীয় একটা বহুজাতিক, জায়ান্ট কোম্পানীর জাঁদরেল ইন্টারভিউ জয় করে ভি-সাইন দেখালেন আগের দুটোকে। (না, দীর্ঘ গ্যাপে নিজেকে সুপারম্যানে বানিয়ে এসে জয় করেছেন-তাও না।)
আরেক কেসে, জনৈক ক্যানডিডেট। কর্পোরেটের দরোজায় দরোজায় ভাগ্য পরীক্ষা করে ব্যর্থ হলেন। অতঃপর বিরক্ত হয়ে ৩৫ বছর বয়সে নিজের ব্যবসা দিলেন। সেখানে ফাটিয়ে দিলেন।
এই যে ব্যর্থ লোকের উত্থান, কোম্পানী এক্স এ অযোগ্য কেউ কোম্পানী ওয়াইতে বেস্ট হওয়া, সি গ্রেড কোম্পানীতে রিজেক্ট হয়ে তার পরদিনই এ+ গ্রেডের কোম্পানীতে চেয়ার বাগানো-এসব প্রচুর দেখেছি। দেখে দেখে ধন্দে পড়েছি। চাকরির ইন্টারভিউ দেবার পরে যাদেরকে নেয়া হয় তাদেরকে ’যোগ্য’, আর, যাদের নেয়া হয় না, তাদের ‘অযোগ্য’ বলা বন্ধ করার সময় হয়েছে। #Compatibility
যাদের নেয়া হয়নি, তাদের বড়জোর ‘অনুপযুক্ত’ বলা চলে, যারা আপনার প্রতিষ্ঠানের ভিশন ও রিকয়ারমেন্টের বিপরীতে আনম্যাচড, নন-কমপ্যাটিবল। তার মানে এটা নয়, যে, তিনি অযোগ্য। তাকে বড়জোর আপনার জন্য অনুপযুক্ত বলা চলে। দেখবেন, আপনার রিজেক্ট করা ক্যানডিডেটই অন্য কোনো এক অফিসে একদিন ফাটিয়ে দিচ্ছেন।
Branding জিনিসটি যেদিন হতে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে, সেদিন হতে যেকোনো বস্তুর বস্তুগত মূল্য ও গুরুত্বের চেয়ে তার ভাবের গুরুত্ব বেড়ে গেছে, খাদ্যের ক্ষুধা নিবৃত্তি ক্ষমতা ও স্বাদের চেয়ে তার নাম খাওয়া বেশি হাইপ পেতে শুরু করেছে; সেদিন থেকে খাদ্যের চেয়ে বস্ত্র বেশি কদর পেয়েছে; নিরাপত্তার চেয়ে কমফোর্ট সেদিন হতে দামী; ওষুধের চেয়ে কসমেটিকস বেশি ভাইটাল; কৃষির চেয়ে ক্রিকেট বড়; শিক্ষকের চেয়ে নায়ক সম্মানিত; ডাক্তারের চেয়ে ভাড়ের বেশি দাপট।
ব্র্যান্ডিং আমাদেরকে বস্তুর ভৌত মূল্য ও উপযোগিতার চেয়ে তার নাম, বাজার কাটতি ও স্বত্ব অর্জনের গৌরবকে বেশি প্রাধান্য দেবার শিক্ষা দেয়।
ব্র্যান্ডিং আমাদেরকে স্বর্ণের থেকে কয়লার কদর বেশি দিতে শিখায়। যদিও খোদ স্বর্ণের অতি কদর ইটসেল্ফ একটা হাইপ মাত্র। প্রকৃত অর্থে মাটির ঢেলা তবু কুলুখ হিসেবে বস্তুগত উপযোগ দেয়, স্বর্ণ দিয়ে সেটাও হয় না। (চিপ তৈরীর কাজ বাদে)
আমার চারপাশে চেনা জগতে বেশ কিছু জুনিয়র ও সিনিয়র প্রফেশনাল আছেন। যারা আমার জানামতে, অত্যন্ত যোগ্য, মেধাবী ও গুড সোল। কিন্তু, এই ভদ্রলোকদের কেউ কেউ বেশ কিছুদিন ধরে জবলেস। চাকরি পাওয়া তো দূর, ডাক পাচ্ছেন না, বা, ডাক পাবার সুযোগ করে নিতে পারছেন না।
সেই সাথে আছেন কিছু চাকরিরকত জুনিয়র। যারা নিজ নিজ কাজে অত্যন্ত দক্ষ, যোগ্য, মেধাসম্পন্ন এবং সৎ। অথচ, এই ভদ্রলোকেরা তাদের যোগ্যতার তুলনায় যে জবে আছেন, সেটি বেশ কমপ্রোমাইজড লেভেল। তারা আরও অনেক ভাল পজিশন ও স্ট্যাটাস ডিজার্ভ করেন। শুধুমাত্র চোস্ত স্মার্টনেস, হামবড়াই স্টাটাস আর ছ্যাবলামো মথিত জ্যাক ও গ্যাং মেইনটেইন করতে না পারায় তারা পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে পারছেন না।
ওদিকে আমারই জানামতে, তাদের থেকে যোগ্যতায় অনেক অনেক পিছিয়ে থাকা প্রচুর স্টারকেও চিনি বা দেখি, যারা শুধুমাত্র শো-অফ, জ্যাক ও ধূর্ততাকে পুঁজি করে ছক্কা পেটাচ্ছেন। ছয় মাস, নয় মাসে গন্ডায় গন্ডায় চাকরি বদল করছেন।
গালগল্প করছি না। এরকম মাকাল ফলদের চাক্ষুস করবার, সরাসরি বাজিয়ে দেখারও সাক্ষী হয়ে বলছি।
এই মাকাল ফলদের নিয়ে আমার কোনো ব্যক্তিগত রোষ, আক্রোশ বা পছন্দ নেই। আমি অনেস্টলি, এই মাকালরা কীভাবে নিজেদের রদ্দি এমপ্লয়েবিলিটি বাজারে বিক্রী করবার দুঃসাহস ও আত্মবিশ্বাস ধারন করেন, সেই ম্যাজিকটি এবং, কীভাবে বাজারের ক্রেতা তথা এমপ্লয়ারদেরকেও কী যাদু দিয়ে তাদেরকে কিনবার মতো বশ করেন-সেই যাদুটা শিখতে আগ্রহী। বিশ্বাস করুন, আমি তাদের ভাল-মন্দ বলতে চাই না, শুধু চাই তাদের ম্যাজিকটা শিখে নিতে। দে আর রিয়েলি দ্য ম্যাজিশিও।
অবশ্য শো-অফ ও জ্যাক মেইনটেইন করতে পারা যদি যোগ্যতার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হয়, তাহলে প্রথম ক্যাটেগরীর লোকেরা অযোগ্য বটেন।
ভদ্রলোকদের জব ম্যানেজ করে দিতে পারি না। জবলেস যারা, তাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। আর্থিক ও পেশাগত অবনমন তো আছেই, মানসিক হতাশাও চরমে। অথচ, চোখের সামনে মাকাল ফলরা বড় বড় মেওয়া খাচ্ছে।
আমার সন্মন্ধে অনেকের উচ্চ অথচ ভুল ধারনা আছে, যে, আমার বিশাল একটা নেটওয়ার্ক আছে। আমি বোধহয় লাখ লাখ প্রভাবশালী প্রফেশনালদের সাথে দহরম মহরম খাতিরে আছি। আমি একটা ফোন করে দিলেই আমার নিজের বা যে কারো চাকরি পাওয়া সেকেন্ডের বিষয়।
ভুল। সবই ভুল।
আর ’ল্যাখক’ ও ’এইছাঢ়’ মানে HR প্রোফেশনাল তথা মেনটর কোচদের জন্য বলি।
আপনি যত বড় লেখকই হোন, বিশেষ একটা পত্রিকা অথবা বিশেষ একটা প্রকাশনা হতে যদি আপনার লেখা বই বা সম্পাদকীয় ছাপা না হয়ে থাকে, তাহলে আপনি চটি লেখকের চেয়ে বেশি কিছু নন।
যত বড় মেনটর, কোচ, এইছাঢ় হন, বিশেষ কোরামের সদস্য না হলে, বিশেষ কিছু জার্গন/Jargon মিশ্রিত বক্তব্য দিতে না জানলে আপনি জনতার চোখে স্রেফই একজন কামলা।
সময় বদলেছে।
দ্রৌপদির যুগে যেটা ছিল লীলা, সেটাই আজকে কলা।
আদিম কালে যেটার নাম ছিল ব্যভিচার, সেটা আজ এ্যাফেয়ার।
আগে যেটা ছিল ঘুষ, এখন সেটা স্পিড মানি।
সুদ হয়ে গেছে প্রোফিট। আবার ইসলামী সুদও আছে। ইসলামী ব্যভিচার চালু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। বাহ। যাহোক, একসময়ে যেটা ছিল আত্মপ্রচার, আত্মগরিমা, নিজের ঢোল নিজে বাজানো, আজকেই সেটার নাম কমিউনিকেশন, নেটওয়ার্ক, ব্র্যান্ডিং, সেলফ প্রমোশন। যুগ বদলেছে। পরিবর্তিত যুগে তাই এখন আর শুধু প্রতিভাধর হলেই হবে না, আপনার কাস্টমার আপনাকেই জোগাড় ও বাগাড় দিতে হবে। না হলে ভাত নাই। তবে আমি ভাবি, ঠিক এই প্রত্যাশা যদি নিউটনের মাথায় চাপানো হত, তাহলে পৃথিবী কী ভয়ানক রকম পশ্চাৎপদ থাকত আজও। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি যদি জানতেন, যে, তার নিজের প্রতিভাকে নিজেই মার্কেটাইজ করতে হবে, ফেসবুক পেজ খুলতে হবে, ভাইরাল হতে হবে, তাহলে মোনালিসা নয়, আজকে আমরা নায়িকা মোনা আর লিসার ন্যুড পিকটাই শুধু পেতাম। মোনালিসা আর ক্যানভাসে হাসত না। তবে যে যাই বলেন, TRP অর্জনের চাইতে, TRP রক্ষা করা কঠিন
সাত; সামাজিক নামের অসামাজিক মাধ্যম:
সন: ২০৯১ সাকিন: গ্রহের একমাত্র অর্থনৈতিক পরাশক্তি উগান্ডা। একটি ফেসবুক পোস্ট, “অদ্য প্রভাত ১১ ঘটিকার কালে আমার মম স্বর্গের গ্রীনকার্ড পেয়েছেন।” উগান্ডাবাসী নেটিজেনদের পুতিকরিয়া: ১। কনগ্রাটস ভাইয়া। কোন ক্যাটাগরীতে পেলেন? ২। আশা করছি, আপনিও শিগগীরই আন্টির কাছে সেটল করবেন। ৩। ভাইয়া, ফিউনারেল সেরেমনিটা আমাদের করতে দিন। অর্ধেক চার্জে করে দেব। সাথে ফেসবুক বুস্ট ফ্রি। ৪। বস, ছিঁচ কাঁদুনে কি পেয়েছেন? না পেলে নক দিয়েন। আমার ড্যাডের সময় একটা গ্রূপকে ভাড়া করেছিলাম। সবাই খুব মজা পেয়েছিল। ৫। তা, আপনারা ফিউনারেলে কী পরবেন-তা ঠিক করেছেন তো ভাইয়া? আজকাল সাদা কিন্তু আর চলে না। ৬। ভাইয়া, আগামী তিনদিন ফুডগুন্ডা হতে আপনাদের বাসায় খাবার ফ্রি। শত হলেও এসময়টা আপনাদের নানা আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত থাকতে হবে। ৭। ভাইয়া, গ্রেভইয়ার্ডে যাবার আর দাফনের ঝামেলায় না গিয়ে ডেডবডি আমাদের কাছ থেকে মামি করে নিতে পারেন। বাসা হতে বডি নিয়ে যাব, আবার ঘরে পৌছে সুন্দর করে ইন্টেরিয়রে সেট করে দেব। ৮। ভাইয়া, ৪০ শায় কিন্তু পাক্কিভাইতে লিভটুগেদার হবে। ৯। ভাইয়া, আংটির ইন্সটা একাউন্টটা কি বিক্রী করবেন? ভাল কাস্টমার আছে। ১০। অফিসের বস: শোনো উগেন, জরুরি শিপমেন্ট আছে। তুমি কিন্তু কালকেই চলে এসো। সেলিব্রেশন সেরেমনি আমরা পরে বড় করে করব। **কালপোনিক
আট; ওপাড়ের ডাক যদি আসে:
আজ হতে মাত্র বছর পাঁচেক পরেই দেখবেন, বঙ্গদেশে কেউ কারো জানাযায় যাবার আগে মৃত ব্যক্তির ডিজিটাল লাইফ ডাটাবেজ হতে ওই লোকের TRP কত-তা জেনে তারপর যাবে। হাই TRP না হলে শোনামাত্রই অন্য প্রসঙ্গে চলে যাবে লোকে। লো- TRPর লোকের জানাযায় লোক আনতে চাইলে তখন ভাড়া করে লোক আনতে হবে। কমার্শিয়াল পৃথিবীতে কে যায় বিনা লাভে জানাযায়?
বন্ধুত্ব তখন হবে TRPর সাথে TRPর। ৯০ এর দশকের সিনেমার চৌধুরী সাহেবেরা তখন ডায়লগ দেবে, “তুই জানিস আমার মেয়ের TRP কত?” নায়িকা বাবাকে বলবে, “বাবা, TRPই কি জীবনে সব?”
TRP জগতের খোঁজখবর যারা রাখতে চান, তারা জেনে রাখলে ভাল, নেগেটিভ থ্রাস্ট এর মাধ্যমেও TRP বাড়ানো যায়। এই ধরুন,
>”ভাই, আমি কিছুই জানি না। আমি এই লাইনে একজন ছাত্র।” [আসলেই সে কিন্তু শিশু। কিন্তু মুখে বলায় লোকে তাকে মহাবিনয়ী ভেবে তাকে বিনয়ে ১০/১০ TRP রেটিং দিয়ে দিল।]
>”আমাদের ছোটবেলা প্রচন্ড অভাবে কেটেছে। রোজ ভাত জুটত না। আমরা ভাইবোনেরা এক জামা-কাপড় ভাগ করে পড়তাম।” [বাস্তবে ছোটবেলা হতেই বাবা-মাকে জ্বালিয়ে খেলেও লোকে শুনে তাকে সংগ্রামী ব্যক্তিস্বত্তা হিসেবে ৯/১০ TRP বাড়িয়ে দিল।]
>”অমুক বিষয়ে আমার কোনো একাডেমিক নলেজ নেই। আমি নিতান্তই অজ্ঞ। (এইটা আমি করি।) [শুনে লোকে তাকে সব্যসাচী TRP দিয়ে দেয়। ১০০/১০০।
>”ভাই আমার মতো অসামাজিক লোককে ডেকে এনে এত সম্মান দিলেন!” (পুরোটাই আমার কপি।) [লোকে পড়ে সত্যভাষীতায় সুপারহিট TRPতে ভরে দেয় টাইমলাইন।
আজকে অবশ্য TRP নিয়ে পড়িনি। পড়েছি মউতের পরের সমস্যা নিয়ে। সকালে অফিসে আসতে আসতে ভাবছিলাম, আমি যদি হঠাৎ করে মরে যাই (আজব, মরে তো হঠাৎ করেই যাব), দুনিয়ার কোথায় কে কোন সমস্যায় পড়বে জানি না। সত্যি বলতে, কারো সমস্যায় পড়ার চেয়ে, আমার মনে হয়, সমস্যা দূর হবার সম্ভাবনাই বেশি। জিন্দা থাকায় প্রচুর উপদ্রব উৎপাদন করেছি, তা জানি। আপনজন ও পরজন-সবার কাছেই। আমার পিতা (ও মাতাও) আমার বকবকানীতে শৈশবে অত্যন্ত ত্যক্ত বিরক্ত ছিলেন। জীবনে খাওয়া সমস্ত কানমলা ও কানপট্টি গরম করা থাপ্পরের বিশাল অংশই কথা বলার অপরাধে খেয়েছি। যাহোক, সবই লো TRPর কাজ। তাই আর ও নিয়ে বেশি ঘাঁটাই না।
তবুও, আমি মরলে যদি কেউ কোনো সমস্যায় পড়েও, (আমার ধারনা মতে) সেটা হবে , আমার সাথে তোলা যৌথ ছবি ফেসবুকে দিয়ে শোক প্রকাশ করতে পারবেন খুব কম লোক। [খুব কম মানুষের সাথে আমার ছবি আছে।] তার মানে কী? আমি ছবি তুলি না?
ভাবছেন, ব্যাটা রোজ প্রোপিক বদলায়। সে এই কথা বলে! হ্যা, তা গোটা কতক ঠাকুরমার ঝুলি আমলের সুদিনে তোলা ছবিই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিই। কোথাও গেলে, কারো সাথে দেখা হলে,
”ভাই, একটি ছবি তুলি”
-বলতে জিহবা জড়িয়ে আসে। ফলে ছবি তোলা হয় না। কেউ মেহেরবানী করে ছবি তুলতে ডাকলে বর্তে যাই। কিন্তু তাতে ফলাফল, সেই একই। মরার পরে কারো সাথে আমার তোলা ছবি দিয়ে শোক জানাতে পারব না। আমাকেও কেউ শোক জানাতে পারবে না। সমানে সমান। হিসাব বরাবর।
https://youtu.be/jZMyyXsUFt8 ”মরিলে কান্দিস না আমার দায়। ও যাদুধন মরিলে কান্দিস না আমার দায়।” [সম্ভবত হুমায়ুন স্যার, হিমুর স্রষ্টা]
নয়;
‘UNO‘-এই নাম বা এক্রোনিমটি যে বাংলা-ইংরেজি ও এক্রোনিমের গ্রামার মিলে খিচুড়ি টাইপ একটি অত্যন্ত ভূল টার্ম-সেটি কেউ কি একটু যায়গামতো বলে দেবেন? কিংবা, ধরুন, ’বুয়েট’-এটাও যে ভুল উচ্চারন-সেটা? না দিলেও ক্ষতি নেই। এই ভুলের জন্য পদমা ব্রীজ ভেঙে পড়বে না। আজকে সেটা নিয়ে মরিও নাই।
আমি এখন আছি TRP নিয়ে। আমি প্রায় সুনিশ্চিত, যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, সুকান্ত হতে শুরু করে গ্যালিলিও, সক্রেটীস, প্লেটো হয়ে মহাবীর আলেকজান্ডার, ভেনাস, আফ্রোদিতি কিংবা হেলেন অব ট্রয় যদি এই যুগে জন্মাতেন, তাহলে অত্যন্ত পুওর TRPর ফ্রাস্টেশনেই মরে যেতেন। রবি দা তো TRPর অভাবে তার পাড়াতেই মুখ দেখাতে পারতেন না।
নো’বেল’ তো দূরে, মহল্লার মোড়ের হকারের হতে একটা কদ’বেল’ও তো ধারে পেতে পারতেন না। ব্র্যান্ডিং এর অভাবে বেচারা আইনস্টাইন তার থিওরি অব রিলেটিভিটির খাতাটা বৃথাই মাঝে মাঝে ট্রাঙ্ক হতে বের করে রোদে শুকাতেন। কোথাও কাউকে দেখাতে গেলেই ঝাড়ি খেতেন, “আরে রাখেন মিয়া, কত বড় বড় স্যারেরা, লিজেন্ডরা বসে আছেন, আর আপনি আসছেন থিওরী অব রিলেশন নিয়া।” TRP আর ব্র্যান্ড ভ্যালুর অভাবে ভোগা হেলেনকে নিয়ে হেকটর-প্যারিস আর একিলিসের দ্বৈরথও হত না। ট্রয় নগরও ট্রোজান ঘোড়ার দেখা পেত না।
পারসোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য সুকান্ত তখন ১৮ বছর বয়স নিয়ে তার মহাকাব্যটি না লিখে টকশো করে বেড়াতেন। TRP বাড়ানোর চাপে পড়ে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি মোনালিসার হাসিকে বিক্রী করে দিতেন ইনস্টায়। TRPর অপুষ্টতায় ভোগা কীটস, জীবনানন্দ, রুদ্র শহীদুল্লাহ কবিতার পান্ডূলিপি বগলে করে প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেন-পাত্তা পেতেন না। ফেসবুকে শত শত লোককে ট্যাগ করে পোস্ট করতেন-লাইক-কমেন্টের খরা তবু কাটত না। TRP নেই? আপনার গুচির শার্ট আর টাইটানের ঘড়ি পরিহিত পিকে তখন লাইক পড়বে তিনটা।
আপনার TRP হাই হলে আপনার লুঙ্গী বা নেংটি পড়া ছবিই হয়ে যাবে ইন্টারন্যাশনাল আইকনিক ফ্যাশন স্টাইল। TRP কম থাকলে আপনি জাভেদ হাবিবই হোন আর নাওমি ক্যামবেল, কিচ্ছু আসে যায় না-বাসে ঝুলে ঝুলে চলবেন, পাবলিক পেছন হতে ধাক্কাবে-ওই মিয়া, পিছে খালি না? মিরপুরের রাস্তায় হেঁটে গেলে তখন কিম কার্দিশিয়ান অখবা জুলিয়া রবার্টস ট্রলের শিকার হতে পারেন-চামড়ায় শ্বেতির অপবাদে। TRP থাকলে জর্জ ফ্লয়েডের কালো চামড়াই তখন টাইসনের মতো দাম পেতো। TRPর আধিক্য না থাকলে রোনালডো আর মেসি ঢাকা ওয়ান্ডারার্সের বল বয় হয়েই জীবনটা কাটিয়ে দিতেন।
TRP পড়ে গেলে ডোলান টেরামপ মিরপুর এক নম্বরের মক্কা হোটেলেও ভাতের প্লেট পেতো না। TRP আমাদের ললাট ভাগ্য এখন। পারসোনাল ব্র্যান্ডিং ছাড়া এখন একটি সিঙারা খাবার কথাও ভাবা যায় না। এটাই ভবিতব্য। যতই মজা করি না কেন, যতই আত্ম-তিরষ্কার করি, এটাই এখন সত্য। শো অফ-লবি-নেটওয়ার্ক- TRP-ব্র্যান্ডিং-এই পঞ্চপান্ডবকে মাথার তাজ করে রাখুন। পকেটে রেখে চলুন। বালিশের তলে রেখে ঘুমান। তাবিজ করে গলায় ঝোলান। এই অষ্টধাতু, থুরি পঞ্চবটিকা ছাড়া বাঁচন নাই। বিষয়টা সিরিয়াস কিন্তু।
#selfbranding #selfpromotion #selfmarketing #personalbranding #medal #crest #apprciation #position #status #ranking #showoffatitsbest #exhibitionism #TRPaholic #fameseeker #attentionseeker #stardom #popularity #bangali #socialhype #exposing #celebrityaholic #ReligiousFanatism #extremeism #jargon #buzzwords #multipletalent #multiplerole #catchy #viral #freak #newspaper #mediadomination #mediamanipulation #mediadestruction #mediahype #mediaaholic #mediatrial #mediatrial #attraction #ArroganceRebel