কোম্পানি কী? এটি কি শুধুই একটি প্রতিষ্ঠান? নাকি একটি টিম, একটি সত্তা, একটি কর্মযজ্ঞ?
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম তো আমরা সবাই জানি। একটি কোম্পানি সুদূর বিলেত হতে এসে এমনকি একটি বিশাল মহাদেশকে ধীরে ধীরে দখল করে নেয়। টাটা একটি কোম্পানি। যার উদ্যোক্তা রতন টাটা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুরে তারা একটি ন্যানো গাড়ির কারখানা স্থাপন করে। পরবর্তীতে ব্যাপক আন্দোলনের মুখে এই বিশাল কারখানাটিকে মাত্র ৬-৭ মাস সময়ে বিশাল বিশাল ৪০-৫০টি কন্টেইনার ক্যারিয়ারে করে সুদূর গুজরাটে স্থানান্তর ও পুনঃস্থাপন করা হয়। এ কাজের আঞ্জাম দিয়েছেন টাটার সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী। পুরো প্রতিষ্ঠানটি একটি কোম্পানি হিসেবে এখানে টিউন করেছে যা ছিল অবিশ্বাস্য।
কোম্পানি মানে একটি অফিস, ফার্নিচার, কর্মচারী, মেইল, ইন্টারনেট, বস, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, বার্ষিক সাধারণ সভা, লভ্যাংশ—এসবই নয়। কোম্পানি মানে “লিমিটেড কোম্পানি” মর্মে কতগুলো ছাপানো কাগজ নয়। একটি কোম্পানি শুধুই একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা। কোম্পানি একটি ম্যাচিউরড ও স্ট্রাকচারড প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান যার মূল শক্তি হল তার সুসংগঠিত/সুপ্রতিষ্ঠিত/সুদক্ষ/সুনিয়ন্ত্রিত কর্মীবাহিনী, এর আধুনিক কর্পোরেট কালচার, সুস্পষ্ট পরিচালনা নীতি, আর্থিক সক্ষমতা, কাঠামোগত সক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা, ভিশনারি ম্যানেজমেন্ট, কোয়ালিটি অব ম্যানেজমেন্ট, পার্টিসিপেটিভ ম্যানেজমেন্ট, ডাইনামিজম, পেশাদারিত্ব চর্চা, মেধার চর্চা, বিশ্লেষণাত্মক কর্মপরিকল্পনা ইত্যাদি। সুদীর্ঘকালব্যাপী সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠান কোম্পানি হিসেবে পরিপক্কতা অর্জন করে। কোম্পানি হল একটি কনসেপ্ট যা ধারণ ও লালন করতে হয়।
একটি প্রতিষ্ঠানকে কোম্পানি হয়ে উঠতে হয় কেন? একটি প্রতিষ্ঠানকে একটি কোম্পানি হয়ে উঠতে হয় এর নিজের স্বার্থেই। অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হল ‘সাসটেইনেবিলিটি’। বর্তমান পৃথিবীতে বহুল আলোচিত একটি টার্ম হল এই সাসটেইনেবিলিটি। অস্তিত্ব রক্ষা বিশেষত এই ২০১৪ সালের পৃথিবীতে এবং ভবিষ্যৎ পরিবর্তনশীল ব্যবসায়িক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে নিজ অস্তিত্ব রক্ষা হল “প্রতিষ্ঠান” হতে “কোম্পানি”তে রূপ নেবার প্রধান বাস্তবতা। সাদা চোখে দেখলে বলা যায়, একটি কোম্পানি তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ শক্তিতে চলবে। এটি কখনো একটি পার্টিকুলার ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিচালনায় চালিত হবে না। মোদ্দা কথা একটি ফুটবল টিম যেমন ব্যক্তি নির্ভর হলে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয় না যেমনটি আমরা সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপেও দেখলাম, তেমনি একটি প্রতিষ্ঠান এক বা স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তির একক নির্ভরশীলতায় দীর্ঘপথ চলতে পারে না। ব্যক্তি নির্ভরতার প্রধান অসুবিধা হল ব্যক্তি যখনই প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যায়, পুরো সিস্টেম কলাপ্স করে।
কোম্পানিকে কোম্পানি হয়ে উঠতে হলে তার কর্পোরেট কালচারকে প্রমোট করতে হবে। একটি কোম্পানি কতটা ম্যাচিউরড তার অন্যতম নির্দেশক হল কোম্পানির মৌলিক পরিচালনা নীতিতে আধুনিক কর্পোরেট কালচারের ব্যাপক চর্চা। প্রতিষ্ঠানে কর্পোরেট কালচার না থাকলে কী হয়? আমাদের দেশে রাস্তার মাঝে স্পিড ব্রেকার দেখেছেন নিশ্চই? একজন এসে বলে স্পিডব্রেকার দাও, অ্যাকসিডেন্ট কমে যাবে। ব্রেকার বানানো হয়। কিছুদিন পর আরেকজন এসে বলে, না, এতে রাস্তার গড় গতি কমে যায়, সুতরাং ভাঙতে হবে, ব্যাস ভাঙ্গা হয়। কর্পোরেট কালচার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও প্র্যাকটিসের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে, এটি কোনো আইন পাশ বা অফিস অর্ডার ইম্পোজ করার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। কর্পোরেট কালচারের অন্যতম র্যাডিক্যাল হল প্রফেশনালিজম। প্রফেশনালিজম কোম্পানির অত্যাবশ্যক উপাদান।
প্রফেশনালিজম কী? আক্ষরিক সংজ্ঞায় না গিয়ে আমি যদি বলি, একজন অভিনেতা যখন তার বাবার প্রযোজিত ছবিতেও অভিনয় করেন তখনও শুটিং শেষে তার পারিশ্রমিক কড়ায় গন্ডায় বুঝে নেন—এটা প্রফেশনালিজমের অন্যতম রূপ। প্রতিষ্ঠানকে তার পরিচালনায় প্রফেশনালিজমের চর্চাকে প্রাধান্য দিতে হবে। এই প্রফেশনালিজম অ্যাপ্লাই হবে প্রফেশনাল কর্মী, প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচ ও প্রফেশনাল ওয়ার্কিং প্রসিডিউর-এর মধ্য দিয়ে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রতিটি কাজ, প্রতিটি উদ্যোগ, প্রতিটি পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত, অ্যাকসেপ্টেন্স, রিজেকশনস, বিনিয়োগ, মুনাফা অর্জন/বণ্টন, কর্মী নিয়োগ, বদলি, বরখাস্ত, পুরস্কার, তিরস্কার—সর্বক্ষেত্রে।
প্রতিষ্ঠানকে চলতে হবে তার আপন গতিতে, আপন শক্তিতে। কোম্পানি স্পিরিট হবে এর মূল চালিকাশক্তি। ব্যক্তি নির্ভর নয়, কোম্পানি হবে সিস্টেম নির্ভর। ব্যক্তির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে কোম্পানিকে সব কাজের, সব প্রক্রিয়ার একটি সুনির্দিষ্ট সিস্টেম আবিষ্কার ও তার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা চালু করতে হবে। এতে করে ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান তার আপন গতিতেই চলতে থাকবে, থেমে যাবে না কোনো কাজ, কোনো উদ্যোগ, পড়ে থাকবে না কোনো জরুরি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। নিত্যনতুন বসের নানান এক্সপেরিমেন্টের গিনিপিগ হবে না প্রতিষ্ঠান।
এটি কোনো ব্যক্তির একক প্রতিষ্ঠান নয়, তখন এটি হবে সকলের সম্মিলিত একটি প্রতিষ্ঠান। এর উন্নতি-অবনতি, সুখ-দুঃখ, সমৃদ্ধি-নিম্নগতি, গতিপ্রকৃতি—সবকিছুর অংশীদার হবে এর সকল স্টেকহোল্ডাররা। আর তখনই একটি সামান্য দোকান, ছোট অফিস, বিশাল কারখানা, পারিবারিক ব্যবসা, সরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যাই হোক এটি একটি কোম্পানিতে রূপান্তরিত হবে। মনে রাখতে হবে কোম্পানির স্বার্থেই একে কোম্পানি হয়ে উঠতে হবে।
#managementapproach #corporateculture #entrepreneurship #formationofCompany #determination #vision #professionalism