Skip to content

কর্পোরেট কালচার ও কর্পোরেট ইমেজ: টেকসই বানিজ্য উদ্যোগের পথে বাঁধা কোথায়? কর্পোরেট ইমেজ কেন চাই

  • by

(ক্যারিয়ার কথন-বাংলার প্রকাশন-বইমেলা ২০১৯ এ প্রকাশিত)

আপনি কোনো সদ্য গজিয়ে ওঠা শপিং মলে একটি অতি উচ্চমূল্যের দোকান কিনলেন। পয়সা খরচ করে সেটার ডেকোরেশন করলেন, চকচকে ঝকঝকে করলেন, চৌকস বিক্রয়কর্মী নিয়োগ করলেন, দোকানের জন্য বিল, ভাউচার, ক্যাশমেমো ছাপালেন, দোকানের বিজ্ঞাপন দিলেন। কী মূল্যে কোন প্রোডাক্ট বিক্রি হবে বিক্রয়কর্মীদের তার ধারণা দিলেন। ভবিষ্যতে কতদিনে আপনার বিনিয়োগ কিভাবে তুলে নেবেন তার হিসাব করলেন। এসব কিছুই হচ্ছে একটি ছোট্ট প্রতিষ্ঠান শুরু করতে আপনার পূর্ব প্রস্তুতি। এটা আপনি কেন করেন? নিঃসন্দেহে আপনার মুনাফা < প্রোডাক্টের অধিক বিক্রি < প্রোডাক্টের ক্রেতাশ্রেণী বৃদ্ধি < প্রোডাক্টের আকর্ষণ বৃদ্ধি।

প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা (মালিক নয়, আমরা মালিক বলতে অভ্যস্ত) হিসেবে সবাই তার প্রতিষ্ঠানকে একটি প্রোডাক্টের মতো করে ক্রেতার কাছে রেডি করে উপস্থাপন করেন ক্রেতার আকর্ষণ তৈরির জন্য। এটা বিক্রির আদিম ও মৌলিক মেথড। ক্রেতা নয়, বিক্রেতাকেই প্রথমে তার পণ্য আকর্ষণীয় করে ক্রেতাদের কাছে উপস্থাপন করতে হবে তার মুনাফা তথা অধিক মার্কেট অ্যাকসেসের স্বার্থে। (বর্তমানে ক্ষুদ্র অর্থে “মুনাফা” বা “বিক্রি”-র চেয়ে আমার কাছে “মার্কেট অ্যাকসেস” কথাটিকে অনেক যুক্তিযুক্ত মনে হয়।) বিক্রেতারই প্রথম দায়িত্ব তার প্রোডাক্ট/সার্ভিস/কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে ক্রেতার কাছে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা। তা দেখে ক্রেতারা আকর্ষণবোধ করবেন সেই বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কিনতে। ক্রেতা নয়, এখানে বিক্রেতার ভূমিকা প্রথমে।

এই মূলনীতিটি একটি ক্ষুদ্র দোকানের ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি তা সমভাবে প্রযোজ্য একটি বড় ফরমাল প্রতিষ্ঠান বা আরও বৃহৎ পরিসরে একটি দেশের বিনিয়োগ আকর্ষণের মতো ক্ষেত্রেও। একটি প্রতিষ্ঠানকে স্মার্ট, মডার্ন, এডুকেটেড, ভিশনারি, প্রোঅ্যাকটিভ—এককথায় সুযোগ্য কর্মীবাহিনী দিয়ে সাজাতে ও তাদের ধরে রাখতে হলে কোম্পানীকেই সবার আগে উদ্যোগী হতে হবে, সম্ভাব্য কর্মীদের নয়। প্রথমে কোম্পানীকেই নিজেকে সম্ভাব্য কর্মীদের (যারা জব মার্কেটের দৌড়ে আছে) কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। কোম্পানিকে তার ক্যারিয়ার অপর্চুনিটি বা কর্পোরেট স্বরূপ এমন ইমেজে উপস্থাপন করতে হবে যাতে চাকরি প্রার্থীরা আগ্রহ বোধ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ পেতে।

অনেক উদ্যোক্তা বলে থাকেন কর্মীরা আনস্টেবল (অল্প দিনেই চাকরি ছেড়ে যায়) বিধায় তারা প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট প্র্যাকটিসে তেমন মডিফিকেশনে আগ্রহী নন। আগে কর্মীরা সেটল হোক, প্রতিষ্ঠানকে তারা লাভবান করুক, নিজেদের নিবেদিত হিসেবে প্রমাণ করুক—তারপর প্রতিষ্ঠান প্রতিদানে নিজেকে “মডার্ন কর্পোরেট” স্বরূপে রূপান্তরে উদ্যোগ নেবে। বিপরীতক্রমে, কর্মীদের অভিযোগ—প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট প্র্যাকটিস অপছন্দ, ক্যারিয়ারিজম না থাকা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কারণে তারা সেই প্রতিষ্ঠান হুটহাট ছেড়ে যান।

এখন আমরা কোন পক্ষে যাব? উদ্যোক্তার ভূমিকা আগে, না জব সিকারদের? অবশ্যই উদ্যোক্তাদের (আবারও বলছি, “উদ্যোক্তা”, “মালিক” নয়)। সেই যে আদিম তত্ত্ব বলেছিলাম দোকান মালিকের, সেই একই নীতি—উদ্যোক্তাকেই তার প্রতিষ্ঠানকে নিজ উদ্যোগে জব মার্কেটে কর্মীবান্ধব, ভবিষ্যতমুখী, আধুনিক, ডায়নামিক, ফ্লেক্সিবল তথা চমৎকার কর্পোরেট কালচারসমৃদ্ধ একটি আকর্ষণীয় কর্মক্ষেত্র হিসেবে সম্ভাব্য ক্রেতা (জব সিকার)-এর কাছে উপস্থাপন করতে হবে। যাতে তারা তাদের ক্যারিয়ার পাথ সুস্পষ্টভাবে খুঁজে নিতে পারে এবং এই প্রতিষ্ঠানটিকে ভবিষ্যতের নির্ভরতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আস্থায় নিতে পারে।

কর্মীদের দিক থেকে রেসপন্স আসবে পরে—আগে বিক্রেতা তথা উদ্যোক্তাকেই এগিয়ে আসতে হবে। কিছু কর্মী সবসময়ই সুইচিংয়ের মধ্যে থাকবে, কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডের ওপর বিচার করে প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিকল্পনা, কর্পোরেট কালচারের মূলনীতি নির্ধারণ করা আধুনিক প্রতিষ্ঠানের জন্য উচিত নয়। আপনি একটি আধুনিক, ফ্লেক্সিবল ও উদার প্রতিষ্ঠানের সওদা নিয়ে জব মার্কেটে আসুন না হে কারবারি—দেখুন যোগ্য, নিবেদিত আর হ্যাঁ, অবশ্যই “লং লাস্টিং” কর্মী পান কিনা—চ্যালেঞ্জ।

একটি কোম্পানিকে সত্যিকারের কোম্পানি হয়ে উঠতে হলে তার কর্পোরেট কালচারকে প্রমোট করতে হবে। একটি কোম্পানি কতটা ম্যাচিউরড, তার অন্যতম নির্দেশক হলো কোম্পানির মৌলিক পরিচালনা নীতিতে আধুনিক কর্পোরেট কালচারের ব্যাপক চর্চা। প্রতিষ্ঠানে কর্পোরেট কালচার না থাকলে কী হয়? আমাদের দেশে রাস্তার মাঝে স্পিড ব্রেকার দেখেছেন নিশ্চয়ই? একজন এসে বলে—স্পিডব্রেকার দাও, দুর্ঘটনা কমবে। কিছুদিন পর আরেকজন এসে বলে—না, এতে রাস্তার গড় গতি কমে যায়, সুতরাং ভাঙতে হবে। ব্যাস, ভেঙে ফেলা হয়।

কর্পোরেট কালচার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও প্র্যাকটিসের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। এটি কোনো আইন পাশ বা অফিস অর্ডার ইমপোজ করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। কর্পোরেট কালচারের অন্যতম র‌্যাডিকেল হলো প্রফেশনালিজম। কর্পোরেট কালচারের কিছু অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলো—(১) রুল অব ল: প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইঞ্চি বিষয় পরিচালিত হবে নির্ধারিত নীতি ও আইনের বলে, কোনো ব্যক্তির মর্জিতে নয়। (২) গুড গভর্নেন্স: সার্বিক ম্যানেজমেন্টে সুশাসনের ছাপ থাকা। (৩) প্রফেশনালিজম। (৪) ইমপার্সোনালিজম। (৫) ইমপার্শিয়ালিটি। (৬) প্রমোটিং মেরিট। (৭) ডিসিপ্লিনড ম্যানেজমেন্ট। (৮) লিখিত সংবিধান ও সার্ভিস রুলস। (৯) প্ল্যানড ম্যানেজমেন্ট। (১০) কমিটমেন্ট টু এমপ্লয়িজ।

আরও অনেক কিছু নিশ্চয়ই আছে। কালচার কোনো আইন নয়, এটি একটি প্র্যাকটিস, একধরনের কমিটমেন্ট। কর্পোরেট জগতে “ব্র্যান্ড প্রোমোশন” নামক একটি কনসেপ্টের কথা প্রায়ই বলা হয়। অনেকের ধারণা, ব্র্যান্ড প্রোমোশন মানে শুধু বিজ্ঞাপন দেওয়া, আর এটা দরকার শুধু তাদের, যাদের প্রোডাক্ট বিক্রির বিষয় আছে। আসলে ব্র্যান্ড প্রোমোশনের প্রথম কারণ হলো সারভাইভাল—টিকে থাকা। ব্যবসায়ের তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে টিকে থাকতে হলে, একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সেটা যেই ধরনেরই হোক না কেন, তার ব্র্যান্ড প্রোমোশন আবশ্যক।

ব্র্যান্ড প্রোমোশনের যত পদ্ধতি আছে, তার অন্যতম হলো কোম্পানিতে কর্পোরেট কালচার প্রতিষ্ঠা করা। কর্পোরেট কালচার মানে স্যুট পরে অফিস করা বা দেয়ালে অয়েল পেইন্টিং টানানো নয়। কর্পোরেট কালচার অফিস অর্ডার তথা আইন প্রণয়ন করে প্রতিষ্ঠা হয় না। এটি দীর্ঘ চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। যুগোপযোগী আইন ও আধুনিক সংস্কৃতির সমতাভিত্তিক প্রয়োগের মাধ্যমে কর্পোরেট কালচার সৃষ্টি করতে হয়। কর্পোরেট কালচার সৃষ্টিতে দরকার ইচ্ছা, ভালো মানসিকতা, একদল সুশিক্ষিত ও স্মার্ট কর্মীবাহিনী। পাশাপাশি দরকার গুড গভর্ন্যান্স ও রুল অব ল।

কর্পোরেট কালচার থাকলে কী হবে? অনেক কিছুই। সবচেয়ে ভালো যা হবে, তা হলো—কোম্পানি ব্যক্তি নির্ভর না হয়ে সিস্টেম নির্ভর হবে। ফলে ব্যক্তির পরিবর্তন হলেও সিস্টেম চলমান থাকবে, সিস্টেম ভেঙে পড়বে না। কর্পোরেট কালচার কী, কেন দরকার, আর কিভাবে আসবে—সেটা নিয়ে বেশ কিছু কথা বলেছি। এখন বলব, কর্পোরেট কালচার গড়ে না ওঠার পেছনে কোম্পানি কী কী ভুল করছে বা কোন অভাব সেই কালচার গড়ে উঠতে দিচ্ছে না।

  1. দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা
  2. পুরোনো কর্মীদের বাধা
  3. সুশাসনের অভাব
  4. আইনের শাসনের অভাব
  5. ডিসেন্ট্রালাইজেশন ও এমপাওয়ারমেন্টের অনিচ্ছা
  6. মাইগ্রেশন না থাকা
  7. ডাইনামিজমের অভাব
  8. স্টাডির অভাব
  9. পুরস্কারের অভাব
  10. স্বজনপ্রীতি
  11. স্মার্ট কর্মীর অভাব
  12. পার্টিসিপেটরি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের অভাব
  13. কমিটমেন্টের অভাব
  14. খরচ ও কর্তৃত্ব হারানোর ভয়
  15. কর্পোরেট কালচার সম্পর্কে ধারণার অভাব
  16. চাকরির নিরাপত্তা
  17. বিজনেস সাসটেইনেবিলিটি ও এক্সপানশনের অনিহা
  18. ফর্মালিটি ও লিখিত এসওপির অনুপস্থিতি

এতক্ষণ যা কিছু বললাম, সবটাই সাধারণ চিত্র। এগুলো কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত নয়—একজন প্রফেশনালের দৃষ্টিতে দেখা। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। অত্যন্ত আধুনিক কর্পোরেট কালচারে সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানও আছে। আমি শুধু বৃহত্তর ও সার্বিক পরিস্থিতির একটি ধারণা দেবার চেষ্টা করেছি মাত্র।

#managementapproach #corporateculture #entrepreneurship #formationofCompany #determination #vision #branding

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *