(ক্যারিয়ার কথন-বাংলার প্রকাশন-বইমেলা ২০১৯ এ প্রকাশিত)
আপনাকে যদি অর্ধেক পানিপূর্ণ একটি গ্লাস দেওয়া হয়, তবে আপনি কী বলবেন? অর্ধেক খালি, নাকি অর্ধেক ভরা? এটা হল অ্যাপ্রোচ। আপনি যদি ২০২০ সালে হংকং, সিঙ্গাপুর ও নিউইয়র্কে কোম্পানির ৩টি শাখা অফিস খোলার একটা স্বপ্ন মনে মনে দেখেন — এটা আপনার ভিশন।
কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট কে বা কারা? আমাদের দেশে ম্যানেজমেন্ট বলতে অধিকাংশ মানুষ “মালিক”কে বুঝে থাকে। একটি রেজিস্টার্ড কোম্পানির মালিক বলতে কোনো কনসেপ্ট থাকে না, থাকে উদ্যোক্তার উপস্থিতি। তবে ম্যানেজমেন্ট মানে শুধু এই মালিক বা উদ্যোক্তাকেই বোঝায় না। এককথায়, ম্যানেজমেন্ট হল কোম্পানির সবরকম কর্মপ্রক্রিয়া ম্যানেজ করেন — এমন ব্যক্তিবর্গ, এটি একটি বডি। তারা সিদ্ধান্ত নেন, নীতি প্রণয়ন করেন, পরিকল্পনা বানান, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকেন, মনিটরিং করেন — এককথায় কোম্পানিকে ম্যানেজ ও পরিচালনা করেন। তবে আপাতত আমি ম্যানেজমেন্ট বলতে “মালিক” পর্যায়ে বা তাদের মনোনীত টপ অফিসিয়ালদের বোঝাচ্ছি।
খুব সাদামাটাভাবে বলতে গেলে মালিক কেন একটি কোম্পানি তৈরি করেন? উত্তর হল — সুসংগঠিতভাবে তার ব্যবসা পরিচালনার জন্য। অন্যদিকে কর্মীরা চাকরি কেন করেন? এককথায় — টাকার জন্য। উভয়ের স্বার্থরক্ষার জন্য উভয়কে প্রয়োজন। একজন মালিককে কোম্পানি চালাতে কর্মী প্রয়োজন, আবার চাকরিজীবীকেও চাকরি করতে কোম্পানি প্রয়োজন।
মালিক বা উদ্যোক্তা কোম্পানি তৈরির পূর্বে অনেকগুলো বিষয় নির্ধারণ করে নেন, অনেক প্রস্তুতি নেন, অনেক পরিকল্পনা সাজিয়ে নেন। এসবের মধ্যে তিনি বা তারা কোম্পানিটিকে কেমন দেখতে চান, বা কোম্পানির কোন ইমেজটি এর সকল স্টেকহোল্ডারের কাছে তুলে ধরতে চান, সেটিও নির্ধারণ করার বিষয় থাকে। তিনি কি একটি হাই-হাই টাইপের কোম্পানি বানাতে চান? নাকি শুধুই মুনাফাখোর কোম্পানি বানাতে চান? সমাজকল্যাণধর্মী কোম্পানি চান নাকি মুনাফা আর সমাজকল্যাণ দুটোই চান? পুলিশি শাসননির্ভর কোম্পানি নাকি মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভিত্তিক কোম্পানি?
যে রকমই হোক না কেন, একটা বিষয় সর্বজনস্বীকৃত — তা হল একটি কোম্পানির নেচার/মোড/ইমেজ/গতিপ্রকৃতি নির্ভর করে মালিক তার কোম্পানিকে কেমন দেখতে চান তার উপর। মালিক তার কর্মীকে কী চোখে দেখবেন — শুধুই কর্মী নাকি কোম্পানির একজন অংশীদার হিসেবে? (অংশীদার মানে আবার শেয়ারহোল্ডার নয়)। কর্মী আবার তার কোম্পানিকে কী চোখে দেখবে — শুধুই চাকরিস্থল, নাকি তার রুটি-রুজির পরম ভরসাস্থল হিসেবে? নাকি তার নিজের একটি প্রতিষ্ঠানের মতো?
এসব কিছুই অ্যাপ্রোচ ইস্যু। কোম্পানির সার্বিক চরিত্র নির্ভর করে মালিকের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভিশনের উপর। তিনি তার প্রতিষ্ঠানকে কেমন দেখতে চান, তার উপর ভিত্তি করেই কোম্পানির গতিপথ প্রবাহিত হয়। মালিক কোম্পানিকে যেমনটা চাইবেন, আলটিমেটলি কোম্পানি সেটিই হবে। কোম্পানির সামষ্টিক সক্ষমতা, আর্থিক সমৃদ্ধি, সুনাম, মার্কেট অ্যাকসেস, প্রফিট ভলিউম, স্থিরতা, টিকে থাকার সম্ভাবনা — এককথায় কোম্পানির আদ্যোপান্ত নির্ভর করে মালিকের কোম্পানি চালানোর দৃষ্টিভঙ্গির উপর।
দৃষ্টিভঙ্গি বা অ্যাপ্রোচ এবং ভিশন শুধু মালিকের একতরফা ইস্যু নয়। মালিক অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট ভিশন ও অ্যাপ্রোচ নিয়ে কোম্পানি শুরু করেন, তবে একইসাথে তার অ্যাপ্রোচ ব্যাপকভাবে কর্মীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়। অনেক পুরোনো একটি প্রবাদ আছে — পথ পথিকের সৃষ্টি করে না, পথিকই পথ তৈরি করে। তবে আমি বলি — পথও পথিক সৃষ্টি করে, আবার পথিক পথ তৈরি করে।
প্রতিষ্ঠানে প্রতিভাবান ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মীদের সমাবেশ হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত যেমন পজিটিভ, মডার্ন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচ, তেমনি প্রতিভাবান ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মীরাও ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচ ও ভিশনকে ইতিবাচকভাবে বিনির্মাণ ও প্রভাবিত করতে পারে। কর্মীদের সক্ষমতা মালিকের সিদ্ধান্ত নেবার সাহস, সক্ষমতা, গতি, প্রকৃতি, নির্ভুলতা ও সূক্ষতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
আপনি যদি একজন মালিক হন এবং আপনি সবসময় একদল উদ্যমী, যোগ্য, আধুনিক, ভিশনারি কর্মী দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকেন, তবে অন্যান্য চমৎকারীতার পাশাপাশি আপনি একদল পরামর্শকও পাবেন, যারা আপনাকে নিত্যনতুন আইডিয়া ও কনসেপ্ট দিয়ে সমৃদ্ধ করবেন। বিপরীতক্রমে, একটি আধুনিক, গতিশীল, মেধাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অন্যতম সুবিধা হল — এরকম প্রতিষ্ঠান কর্মীদের মেধা, আইডিয়া, যোগ্যতা, ভিশন ও অ্যাপ্রোচকে আরও শানিত করার চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি করে।
যে প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের আইডিয়া, অ্যাপ্রোচ, মতামত, সৃষ্টিশীল চিন্তার সমাবেশ, সমন্বয়, সংযোগ ও মূল্যায়ন নেই, সেখানে কর্মীরাও প্রোঅ্যাকটিভ হয়ে কোম্পানিকে আইডিয়া দেবেন না। (মূল্যায়ন মানে শুধু বেতন নয়; এর মধ্যে তাদের আইডিয়ার যৌক্তিক বাস্তবায়নও অন্তর্ভুক্ত)। এখানে তাদের মেধার অপচয় হয় বলে দীর্ঘদিন তারা এমন প্রতিষ্ঠানে থাকেন না।
অনেক সময় কর্মীরা অভিযোগ করে থাকেন ম্যানেজমেন্টের ভুল পলিসি, বস্তাপচা সিদ্ধান্ত, একতরফা রীতি ইত্যাদি বিষয়ে। এক্ষেত্রে কর্মীদেরও করণীয় রয়েছে। ম্যানেজমেন্টের অ্যাপ্রোচকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার দায় কর্মীদেরও রয়েছে। ম্যানেজমেন্টের ভুল অ্যাপ্রোচ শুধু তার একার দায় নয়, প্রতিষ্ঠানের কর্মী — বিশেষত সিনিয়র কর্মীদের এক্ষেত্রে ব্যাপক দায়িত্ব আছে।
আর এটি সর্বজনস্বীকৃত যে প্রতিষ্ঠানে কর্মীরা যত সিনিয়র হবেন, তারা ততই দৈনন্দিন ক্লারিক্যাল কাজ থেকে নিজেদের সরিয়ে জুনিয়রদের ইনভলভ করবেন, আর নিজেরা কোম্পানিকে আইডিয়া সরবরাহ করবেন। সিনিয়ররা কোম্পানিতে শারীরিক শ্রম নয়, আইডিয়া বিক্রির বিনিময়ে মূল্যায়িত হবেন। সিনিয়রদের কারিশমা শারীরিক শ্রমের ভলিউম নয়, বরং আইডিয়া সেলার হিসেবে তার অবদান কতটা — সেটাই মূল। কতগুলো ক্রিয়েটিভ, মডার্ন আইডিয়া তিনি দিলেন, সেটাই তার ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য।
যাহোক, ভিশনারি মালিক ও ভিশনারি মেধাবী কর্মী — উভয়ই উভয়কে প্রভাবিত করার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করে। আর এরকম দুটি পক্ষ একত্র হয়ে গড়ে ওঠে আধুনিক ম্যানেজমেন্ট। ঐযে বলেছিলাম, ম্যানেজমেন্ট মানে শুধু মালিক নয় — এটা মালিক ও কর্মীর সুষম সমন্বয়।
#managementapproach #corporateculture #entrepreneurship #formationofCompany #determination #vision #branding