যেকোনো কারনেই হোক, বিগত ৯০ টি দিন ধরে গোটা বাংলাদেশ আর ১৫০ দিন ধরে গোটা পৃথিবীই কোভিড১৯ রোগের ছোবলে পর্যুদস্ত। কেউ বলেছেন, এটি একটি ভয়াবহ রোগ। কেউ বলছেন, এটি আমলে নেবার মতো কিছুই না।
আপনি যাই ভেবে থাকেন, আপনার চারপাশে যেহেতু একটি মুভমেন্ট চলছে এবং সবাই আপনার মতো দুরন্ত সাহসীও নয়, তাই রাষ্ট্রীয় নাগরিক ও সামাজিক প্রাণী হিসেবে আপনি চাইলেও বিন্দাস হয়ে ঘুরতে পারবেন না। আপনাকে নিজের জন্য না হোক, অন্যের জন্য, নিজের বৃদ্ধ পিতামাতার জন্য, প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য, আদরের ধন সন্তানের মুখ চেয়ে কিছু নিয়ম মেনে চলতেই হবে। আর এই মেনে চলাটা দুয়েক দিন বা দুয়েক মাস নয়, হয়তো কয়েক বছরও করতে হতে পারে। কারন, অবস্থাদৃষ্টে যা বোঝ যাচ্ছে, করোনার সাথে সহাবস্থানই আমাদের ভাগ্য।
তবে একটা কথা বলি, যে যেমনটাই বলুক, যে যত হালকা করেই দেখাক, নভেল করোনা একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাস আর এর ছোবল ভয়াবহ প্রাণঘাতি। বিশ্বাস না হলে একে শরীরে নিয়েই দেখুন। খুব সাধারন দৃষ্টি দিয়ে ভাবুন, রোগটা খুব সাধারন হলে গোটা দুনিয়াতে প্রায় কোটিখানেক লোক সংক্রামিত হত না, টাইট লকডাউনের পরও ভারতে সংক্রমন হু হু করে বাড়ত না, সামান্য সর্দির মতো রোগ হলে যুক্তরাষ্ট্রে সোয়া লাখ লোক মারা যেত না। আর মর্টালিটি রেটের কথা বলবেন? ওটা যদি ১% ও হয়, আপনি নিজে বা আপনার পরিবারের কেউ ই যে ওই ১% এ পড়বেন না তার গ্যারান্টি কোথায়?
কোভিড১৯ সংক্রমন হতে নিজেকে, চারপাশের মানুষকে এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সুরক্ষা দিতে ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আমরা বিভিন্নভাবে কাজ করছি, নানা উদ্যোগ নিয়েছি। আমার এই লেখাটির উদ্দেশ্য হল, আমরা যে যেটাই এ পর্যন্ত করেছি, তার চুম্বক অংশগুলো একটি স্থানে নিয়ে আসা। লেখাটি প্রতিনিয়ত এডিট ও আপডেট হবে। যাতে যে কেউ রিয়েল লাইফ অভিজ্ঞতা যদি জানতে চান বা জানাতে, সেটা এখান হতে কিছুটা পেতে পারেন। আপনার নিজের জীবনে, পরিবারে, গৃহে, অফিসে, সমাজে নেয়া নানা পদক্ষেপ, উদ্যোগের কথা শেয়ার করতে পারেন এখানে। ব্যক্তিগত সুরক্ষার নানাদিক:
১.
নিজ বাসার দরোজার বাইরে যাওয়া মাত্রই মনে করবেন, আপনার নিজের শরীরের প্রতিটি অংশ, পরিধেয় ও অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিস সবই সম্ভাব্য কনটামিনেটেড ও ক্যারিয়ার। সুতরাং ঘরে এসে পরিচ্ছন্ন হওয়া পর্যন্ত মাস্ক পরে থাকুন আর টি জোনে (চোখ, নাক, মুখ) হাত বা যেকোনো জিনিস ছোঁয়ানো হতে বিরত থাকুন। নিজের অপরিষ্কার হাত, মাত্রই পরে বের হওয়া পাঞ্জাবী আর বাইরে থাকা টিস্যু পেপার>একই কথা। কারন, ভাইরাসটি বাতাসে কিছুটা হলেও বাহিত হয় আর বাইরে বের হলে আপনার পরিচ্ছন্ন কাপড়ে সেটা লেগে যাওয়া বিচিত্র নয়। গাড়িতে থাকা টিস্যুতে থাকতেই পারে। আপনার ড্রাইভার যে গাড়িতে তেল নিতে গিয়ে হাঁচি দেন নাই, কে গ্যারান্টি দিচ্ছে? কোন সারফেসে সার্সকোভ২ কতক্ষণ টিকে থাকে>সেই হিসেব করে লাভ নেই। কারন, ঠিক কতক্ষণ আগে আপনার টাচ করা সারফেসে কেউ হেঁচে গেছে, কে জানে।
২.
নিরাপদ বলে কেউ নেই। ড্রাইভার, পিওন, বাসার দারোয়ান, টীমমেট>সুস্থ মনে হচ্ছে, তারপরও দূরত্ব ও মাস্ক মাস্ট। ঘরে ফিরে নিজে পরিচ্ছন্ন হওয়া পর্যন্ত ঘরের কারো কাছে যাবেন না। ঘরের কিছু ছুঁবেন না। নিজ ঘরে অন্তরীন মানুষগুলো ব্যতিত যতটা সম্ভব কম মানুষকে মীট করুন। অফিসের রুমে আড্ডা, মিটিং পরিহার করুন। অনলাইন কাজে দক্ষতা বাড়ান। মোবাইলে পর্যাপ্ত ক্রেডিট ও ডাটা ব্যালেন্স রাখুন। দোকানে ফ্লেক্সি না করে কার্ড বা বিকাশের মতো সার্ভিসের সাহায্যে ডিজিটালি করুন। অফিস আর বাসা বাদে কোথাও যাওয়া বন্ধ রাখুন। আপদকালীন সময়ে মসজিদে, মন্দিরে যাওয়াও ফরজ না। সেখানে চায়ের দোকান, বাজার বা শপিংয়ের তো প্রশ্নই আসে না। আত্মীয় স্বজনের সাথে ডিজিটাল মাধ্যমে যোগাযোগ রাখুন। যতটা পারুন, অন্যকে আর্থিক, সামাজিক, মানসিক সাপোর্ট দিন। মানসিক অবস্থা ভাল রাখতে যা ভাল লাগে, তাই করুন। কনসট্রাকটিভ কিছু করুন। টিভি নিউজ দিনের শেষে একবার দেখাই যথেষ্ট। মৃতদেহ সৎকারের সময় যেই যুদ্ধ প্রস্তুতি কিংবা পালানোর ঘটনা ঘটছে, সেটা নেহাতই আবলামো।
ভাইরাসের বাস্তবতা যদি বলি, তাহলে একটি যেকোনো জড়বস্তু ও মৃতদেহ>উভয়ের ঝুঁকি সমান। অন্যান্য জড় বস্তুকে যেভাবে ট্রিট করেন, মৃতদেহ ধরতে বা দাফন করতে তার চেয়ে বেশি ঝুঁকি আছে বলে আমি মনে করি না। হ্যা, দাফন কাফনে আগত অন্যান্য মানুষদের সাথে দূরত্ব ও সুরক্ষা বজায় রাখতেই হবে। মৃতদেহ হতে জীবিত মানুষ থেকে আপনার সত্যিকারের ভয় বেশি। হ্যা, সংস্পর্শ নিয়ে যতটা জানতে পেরেছি, তা হল, বিষয়টা এমন না, যে, পাশ দিয়ে একজন লোক সাঁই করে চলে গেল আর তার থেকে আপনি প্রেগনেন্ট হয়ে পড়লেন, মানে করোনা আক্রান্ত হলেন। কনটাক্ট বিষয়টা বলতে বোঝানো হয়,
ক. মাস্ক ব্যতিত যেকোনো বাইলেটারাল বা পাবলিক মিট (পজিটিভ বা সাসপেক্ট বা জেনারেল পাবলিক;
খ. মাস্ক ব্যতিত দূরত্ব বজায় রেখে হলেও ক্লোজ ডোরে মিট;
গ. মাস্কসহ কিন্তু ৬ ফুটের কম দূরত্বে পজিটিভ বা সাসপেক্ট কারো সাথে মিট;
ঘ. হাসপাতালে নরমাল প্রস্তুতিতে যে কারো সাথে মিট;
ঙ. বিপজ্জনক দূরত্বে বা ক্লোজ ডোরে রোগি/সাসপেক্ট কারো সাথে ১০ মিনিট বা তার বেশি অবস্থান।
৩.
মনে রাখবেন, বাইরে থাকাকালীন, যাই স্পর্শ করবেন-কলম, রুমাল, টেবিল, কীবোর্ড, জুতা, গাড়ির হ্যান্ডেল, ফাইল, পানির গ্লাস, চায়ের কাপ-প্রতিটাকেই সন্দেহপূর্ন হিসেবে ট্রিট করুন ও একশন নিন। পিওন যতই বলুক, ঘন্টায় ঘন্টায় হাত ধোয়, তবু ভাবুন, আপনাকে চা দেবার আগে সে কোনো ড্রপলেট টাচ করেনি-কে গ্যারান্টি দিচ্ছে? মোবাইল ফোনটি স্পিকারে দিয়ে কথা বলুন, যখন আপনি বাসার বাইরে এবং মোবাইলটি এক্সটারনাল টাচড। অফিসে চা খাওয়া বন্ধ করুন। চা, পানি বাসা হতে নিয়ে যান। আমাকে পিওন হাত ধুয়ে হালকা গরম পানি দেয়। কিন্তু আমি তবু যখন পানি খাই, বোতলের তলায় ধরি, আর এক হাতে মুখ খুলে সরিয়ে বোতলে মুখ না লাগিয়ে খাই। ভাত মাছ বাদ দিয়ে একটা বক্সে শুকনো খাবার বা চামচ দিয়ে খেয়ে নেয়া যায়-এমন কিছু ক্যারি করুন।
সম্ভব হলে রোজ একটি কাগজের শপিং ব্যাগ ব্যবহার করুন। ব্যাগ হতে যখন বক্স বের করবেন, আগে হাত পরিচ্ছন্ন করুন। সে জন্য আগে ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধোবেন, তারপর রুমে এসে বক্স খোলার আগে আরেকবার স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিচ্ছন্ন করুন। ব্যাগটি হতে বক্স বের করতে যথাসম্ভব ব্যাগটির স্পর্শ এড়িয়ে চলুন। ডায়নিং পরিহার করুন। পারলে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট পরিহার করুন।
রাবার গ্লাভস আর খোলা হাতের মধ্যে নিরাপত্তাজনিত কোনো পার্থক্য বা বাড়তি সুরক্ষা নেই। বরং গ্লাভস ছাড়া হাত কিছুটা হলেও ভাল।
৪.
বাইরে যেতে কম দামী এবং গোড়ালি ঢাকা (শু টাইপ) জুতা পরুন, যেটা ঘরের বাইরে রেখে দিলে নিরাপদ থাকবে। ঘরে আনতেই হলে, ভেতরে আনার আগে ব্লিচ পানি স্প্রে করুন, ১ মিনিট অপেক্ষা করুন, তারপর আনুন। ঘরের কলিং বেলের ওপর একটা পলিব্যাগের বা সেলুলয়েডের কভার পরান। যাতে ওটার ওপর রোজ ডিসইনফ্যাকট্যান্ট স্প্রে করতে গেলে শর্ট সার্কিট না হয়। ঘরের কার্পেট ও দরোজার ম্যাট সরিয়ে রাখুন কিছুদিন। বাইরে হতে ঢোকার আগে জুতা খুলুন, মোজা খুলুন, দরোজার কাছে ভিতরে রাখা স্যান্ডাল সরাসরি পায়ে গলিয়ে ঘরে ঢুকুন।
যদি টী বা পলো শার্ট পরে থাকেন, তবে ঘরে ঢুকে সেটা খোলার পরে মাস্ক খুলুন। তা না হলে পোলো শার্ট মাথার ওপর দিয়ে খোলার সময় সেটা হতে জীবানু আপনার মুখে, চোখে লাগতেই পারে। আর যদি শার্ট পরেন, তবে আগে মাস্ক/গ্লাভস খুলে বাইরে রাখা নির্দিষ্ট কভারড পাত্রে মাস্ক খুলে রাখুন। তারপর ঢুকুন। কভারড পাত্র হতে পারে পলিব্যাগ, কিংবা কোনো লকড বক্স। সপ্তাহ শেষে সব মাস্ক, গ্লাভস পুড়িয়ে ফেলুন। ঘরে ঢুকে সব পরিধেয় খুলে হয় ধুয়ে দিন, কিংবা ওখানে দাড়িয়েই পলিব্যাগে বা বক্সে লক করুন। পরিধেয় বস্ত্র ৩ দিন পরে এমনিতেও নিউট্রাল হয়ে যায়। কিন্তু তাতে থাকা প্লাস্টিক বা মেটাল বাটনে আরও বেশিদিন ভাইরাস একটিভ থাকে। যদি না ধুয়ে পরতে চান, তবে ৩ দিনের গ্যাপ দিন আর পরার সময় বাটন ও জিপার সাবান পানি বা হ্যান্ড রাব দিয়ে মুছে নিন। আর এমনিতেও, আপনি যদি মাস্ক পরিধান ও টিজোন নিরাপদ রাখেন, স্পর্শ না করেন, তবে ভাইরাস সম্বলিত পোষাক আপনার কোনো ক্ষতিতো করছে না।
৫.
ভাইরাস কেবলমাত্র চোখ, নাক, মুখ দিয়ে ঢোকে। চামড়া ভেদ করে না। একই কাপড় সেক্ষেত্রে পরের দিনও পরা যায়-তাত্ত্বিকভাবে এবং যদি আপনি সাহসী হন। ভাবুন তো, আপনি একদম নতুন এক সেটা কাপড় পরে বের হলেন। বাসে উঠলেন। বসলেন। আপনার নিরাপদ পোষাক তো তখুনি জীবানুযুক্ত হয়ে গেল। তাহলে রোজ ধোয়া কাপড় পরে কী লাভ? হ্যা, পরিধান করা কাপড় যদি নিরাপদ স্থানে লক না করে রাখেন, তাহলে ঘরে ছড়ানোর বিপদ হতে পারে। তবে সেটাও ঘরের কেউ স্পর্শ করলে বা বাতাসে উড়িয়ে নিলে। স্যান্ডেল পায়ে গলিয়ে সোজা বাথরুমে যান। কাপড় ধোবার হলে একটি বালতিতে ফেলুন। হাত কনুই পর্যন্ত ধুয়ে নিন সাবান দিয়ে। যখনি হাত ধোবেন, মনে করে কলের নবেও ২০ সেকেন্ড সাবান লাগিয়ে রাখবেন এবং তারপর হাত ধোবার সময়ে ধুয়ে নেবেন।
আরেকটি বালতিতে ডিটারজেন্ট দিন, পানি দিন, ফেনা বানান, তারপর সেই ডিটারজেন্ট পানির কিছুটা পায়ের গোড়ালি ও স্যান্ডেলটা পরিষ্কার করতে ঢালুন। ২০ সেকেন্ড অপেক্ষা করুন। পায়ের সাথে পা ঘষে ধোবেন। এবার বাকি পানিটা কাপড়, মাস্ক ও অন্যান্য ধোয়ার জিনিস রাখা বালতিতে ঢেলে ওগুলো ভেজান। এবার মুখমন্ডল, গলায় সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধরে ধুয়ে নিন। তারপর হাতে অল্প শ্যাম্পু নিয়ে তাতে অল্প পানি নিয়ে মাথায়, ঘাড়ে, কানের কাছে শ্যাম্পু করুন। ২০ সেকেন্ড ধরে মাথায় মাখান। তারপর গোসল করুন। গায়ে সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড অপেক্ষা করুন। গোসল শেষে একটি পাত্রে আগে হতে বানানো কিংবা এখন বানিয়ে সেই ডিসইনফেকট্যান্ট (বেটার হল ব্লিচ পানি) বাথরুমের সর্বত্র, কমোড, ঘরে ঢোকার দরোজার আশপাশে ছিটিয়ে কিছুক্ষণ পরে মপ দিয়ে মুছে নিন। মপটি সাবান পানিতে কিছুক্ষণ রেখে নিংড়ে রেখে দিন।
কলিং বেল, দরোজার নব, তালা, লক হ্যাচবোল্ট জীবাণুমুক্ত করুন। যাই করবেন, মনে রাখবেন, আপনি কোনো ফোকড় রেখে দিলেন কিনা। কী রকম?
মনে করুন, আপনার অফিসের সব দরোজা, ফ্লোর প্রতি ঘন্টায় ডিসইনফেকট্যান্ট দিয়ে মোছা হয়। আপনি খাবার আগে ওয়াশ রুমে গিয়ে হাত ধুলেন। আসার সময় দরোজা খুলতে হল ২ টা। ওই দরোজার নব যে কেউ অপরিচ্ছন্ন হাতে ছোঁয়নি-কে তার গ্যারান্টি। তাই বলি, টী জোনে নো টাচ। সেটা মানতে যদি কষ্ট হয়, নাক চুলকাতে না পারলে জান বেরিয়ে যায়, তখন হাসপাতালের বাইরে অক্সিজেনের নল নাকে ঢুকিয়ে হুইল চেয়ারে মরে পরে থাকা লোকটার ছবিটা মনে মনে কল্পনা করুন। এই নির্মমতার চেয়ে নাক চুলকাতে চুলকাতে ধ্বংস হয়ে গেলেও ভাল।
বাইরে হতে আসার পরে যেসব স্থানে আপনি গোসলের আগে যান, কিংবা বাইরের জিনিস/বাজার এনে প্রথমে যেখানে রাখেন, বাথরুম যেখানে গোসল করেন, এগুলো রোজ ব্লিচ পানি দিয়ে পরিচ্ছন্ন করুন। ঘরের দরোজা জানালা খুলে আলো বাতাস চলতে দেবেন। বিছানার মাথার কাছের জানালা বন্ধ রাখা সেফ। সপ্তাহে অন্তত একদিন ঘরের মেঝে, সাবান পানি বা ব্লিচ পানিতে মপ করুন। ঘরে ধুলা ঝাড়লে মাস্ক পরুন। ঝাড়ু দেবার চেয়ে মপ করা বেশি নিরাপদ। আমি আমার বেল্ট, ল্যাপটপ, চাবি-এগুলো রোজ পরিচ্ছন্ন করি না। বাইরে হতে ঢুকে ওগুলো ল্যাপটপের ব্যাগে ভরে দরোজার কাছেই একটা বদ্ধ স্থানে রেখে দিই, যেখানে কেউ যাবে না। যখন পরের দিন বাইরে যাই, ওগুলো হাতে নেবার পরে আর ঘরের কোনো জিনিসে হাত দিই না। অন্য কেউ দরোজা খুলে দেয়। আমার চিন্তা হল, চাবিটা কেবল রাতের জন্য ডিসইনফেক্ট করে লাভ কী? সেটা কাল সকালেই তো বের হওয়া মাত্র ইনফেক্ট তালিকায় ঢুকবে।
আমি শুধু নিশ্চিত করি, আমি টাচড হাতটা কোনোভাবেই টি জোনে নেব না।
হ্যা, ঘরে ঢুকে মোবাইলটি দরোজার পাশের সেই যায়গা, যেখানে আমার পরিধেয় পোষাক বক্স লক করি, সেই বক্সের ওপর একটি নির্দিষ্ট ফ্যাবরিক বিছিয়ে তার ওপর রাখি। গোসল শেষে যখন দরোজার সংলগ্ন স্থান ও বাথরুম ডিসইনফেক্ট করা হয়ে যায়, তারপর মোবাইলটি ডিসইনফেক্ট করি। কীভাবে? প্রথমে পরিষ্কার হাতে হেক্সিসলের বোতলের মুখ খুলি আর এক টুকরো তুলো নিই। বাম হাতের তিন আঙুলে মোবাইলটি ধরে প্রথমে পেছনের পাশে সামান্য হেক্সিসল ঢেলে তুলা দিয়ে ডান হাতে মোবাইলের পেছনটা মুছি। তারপর সেটাকে টেবিলে চিৎ করে রেখে ওপরে সামান্য হেক্সিসল ঢেলে তাতে তুলো ভিজিয়ে ওই তিনটি আঙুল মুছে নিই। তারপর আবার হেক্সিসল ঢেলে তুলো দিয়ে ডান হাতে মোবাইলের সামনের অংশ ও সাইড মুছি। তারপর আবার সামান্য হেক্সিসল দিয়ে ডান হাতের আঙুল, যেটা এতক্ষণ কাজে লাগিয়েছি, সেগুলো মুছি।
ভেবে দেখুন, হেক্সিসলের বোতলটা যদি আপনি নোংরা হাতে ধরেন, সেটাই তো ভাইরাস ছড়াতে যথেষ্ট। একটু বেশি বেশি মনে হতে পারে। তবে আমার দর্শন হল, যেই স্থানটাই বাইরের যেকোনো বস্তুর সংস্পর্শে এসেছে, সেটাই অনিরাপদ ও পরিষ্কারযোগ্য। গৃহপালিত প্রাণীকে বাইরে যেতে দেবেন না। দিলে আপনার মতোই ডিসইনফ্যাক্ট করুন। প্রাণীরা নিজেরা করোনা ছড়ায় কিনা-তা নিশ্চিত না হলেও তারা তাদের শরীরের বাইরের অংশে ভাইরাস বহন করতেই পারে।
৬. ডিসইনফেকট্যান্ট হিসেবে কী কাজ করে>-তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ও খোঁজাখুঁজি করেও সবগুলোর একশোভাগ সমাধান পাইনি। তাই যেটা আমি মেনে চলছি, তা হল, ব্লিচ মেশানো পানি (৪ লিটার পানিতে ৬ টেবিল চামচ রেশিওতে আধাঘন্টা গুলে রাখতে হবে। আধাঘন্টা পরে শুধু থিতানো পানি ব্যবহার করবেন। ১২ ঘন্টা পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে। ত্বকে, মুখে, চোখে, নাকে স্পর্শ করানো যাবে না বা ত্বকে লাগতে পারে-এমন কোনো ব্যবহার করা যাবে না। ব্লিচ পানির বাইরে আইসোপ্রোপাইল এ্যালকোহল (60.6 % রেশিও), সাবান, সোপি ওয়াটার (পরিমাণ: ১.৫ লিটার পানিতে ৪ টেবিল চামচ ডিটারজেন্ট) কার্যকর। সাবান বা সোপি ওয়াটার ২০ সেকেন্ড স্থায়ী হতে হবে। এলকোহল হলে নির্দিষ্ট মাত্রা হতে হবে আর ব্যবহারের পর শুকিয়ে নিতে হবে। আগুনে নির্দিষ্ট তাপ (৭০ ডিগ্রী সম্ভবত) অনেকক্ষণ দিলেও ভাইরাস মরে যায়। তবে সেটা কেবল রান্না বা কোনো টুল ডিসইনফেক্ট করার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
আপনি নিশ্চই পরনের কাপড় আগুনে পোড়াবেন না। অনেকেই মনে করেন, গরম পানি ঢেলে দিলে কিংবা আগুনে ধরলেই ভাইরাস মরে যায়। অনেকের ধারনা স্যাভলন বা ডেটলও ভাইরাস মারে। স্যরি, তা নয়। স্যানিটাইজার যেন কোনো অবস্থাতেই আগুনের কাছে না যায়।
মাস্ক নিয়ে গবেষনা করে যতটা জানতে পেরেছি, তা হল, মোটামুটি N95/KN95/Surgical/2 Layer knit fabric>এই মাস্কগুলো আপনাকে অনেকটা সুরক্ষা দেবে। যদি আপনি মাস্ক পরার নিয়ম মেনে চলেন। কী নিয়ম? মাস্ক থুতনীর কাছে ঝুলিয়ে রাখা বা বারবার খোলা যাবে না। হাত দেয়া যাবে না, পুনর্ব্যবহার করলে নিয়ম মেনে তা করতে হবে। আউটার বা ভালব আছে-এমন মাস্ক যতই ভাল হোক, সেটা আপনার ভাল করলেও অন্যদের ক্ষতি করবে। তাই মাস্ক হতে হবে লীকপ্রূফ। এন৯৫ মাস্ক আপনি খুব বেশিক্ষণ পরে থাকতে পারবেন না। যতটা পড়েছি, সার্জিক্যাল মাস্ক সর্বোচ্চ একবার রিইউজ করা যেতে পারে, যদি সেটা একদম অক্ষত থাকে। তেমনটা করতে চাইলে, ইন্টারনেটে দেখে নিন, কীভাবে করতে হবে। নির্ভরযোগ্য সাইটে দেখবেন। ফেসবুকে না।
নীট কাপড়ের দুই স্তরের মাস্ক ধুয়ে বারবার পরা যায়। যে মাস্কই পরুন, মান যাঁচাই করে নেবেন। ভুয়া জিনিসে বাজার ভরা। আমি যখন অফিস করি, তখন নিচে একটি দুই স্তরের কাপড়ের মাস্ক পরি, তার ওপর দিয়ে একটি সার্জিক্যাল মাস্ক পরি। দিনের মধ্যভাগে এক ঘন্টার জন্য পরিষ্কার হাতে খুলে বাইরের স্তরটি নিচে দিয়ে একটি টিস্যুর ওপরে লকারে রাখি। রিবনগুলো যাতে ভিতরে টাচ না করে তা লক্ষ্য রাখি। এই একঘন্টা কাউকে রুমে আসতে দিই না। একঘন্টা পরে আবার হাত পরিষ্কার করে মাস্ক পরি। যখন বাসা হতে দোকানে বা ভ্যানে বাজার করতে যাই, তখন তিন স্তরের নীট কাপড়ের একটি মাস্ক পরি। অন্যদের হতে দূরে থাকি।
যখন বাসার দরোজায় দারোয়ান বা কেয়ারটেকারকে কোনো কারনে মীট করি, তখন দুই স্তরের একটি কাপড়ের মাস্ক পরি। যতবারই বা যতটা সময়ই পরি, সাথে সাথে ধুয়ে দিই। মাঝে মাঝেই কাপড় ধোয়ার বালতি, স্প্রে গান, কাপড় লক করার বক্স>এগুলোও ব্লিচ পানিতে বা সাবান পানিতে পরিচ্ছন্ন করি।
৭. বাইরে হতে আনা যেকোনো পণ্য সম্ভব হলে সাবানযুক্ত পানি (পরিমাণ: ১.৫ লিটার পানিতে ৪ টেবিল চামচ ডিটারজেন্ট) দিয়ে মুছে নিন বা ডিটারজেন্ট পানিতে ৫ মিনিট ডুবিয়ে রেখে পানিতে ধুয়ে নিন (তবে সেটা যেন খাবার বস্তু না হয়)। ব্লিচ পানি নয়, কারন সেটা ত্বক বা খাবারের জন্য বিষাক্ত। খোলা পণ্য কেনা এভয়েড করুন, মেশিন প্যাকড পণ্য কেনার চেষ্টা করুন। কাঁচা সবজি বা ফল জাতীয় জিনিস হলে কেবল কলের প্রবাহমান পানিতে স্ক্রাবার দিয়ে ঘষে ধুয়ে শুকিয়ে নিন। সেটাই যথেষ্ট। মাছ বা মাংস হলে যদি ফ্রিজে রাখতেই হয়, সেটা কয়েকবার পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিন। তারপর আরেকজনের সহায়তায় পরিচ্ছন্ন এয়ারটাইট বক্স কিংবা পলিথীনের গায়ে আপনার হাতের ছোঁয়া বাঁচিয়ে সাবধানে ভরুন। সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন। এবার সবগুলো পলিব্যাগ একটি বড় পলিথীনে একইভাবে ছোঁয়া বাঁচিয়ে ভরুন। সাহায্যকারীকে এবার বলুন, টাইট করে গেরো দিয়ে ফ্রিজের এক সাইডে ফাঁকা স্থানে রাখতে। যখন রান্না করতে নামাবেন, পুরোটা একবারে রাঁধুন।
পলিব্যাগ সাবান পানি/ডিটারজেন্টে আধাঘন্টা ধুয়ে আবার ব্যবহার করতে পারেন। ফ্রিজে সংরক্ষিত এসব কাঁচা জিনিস বা যেকোনো বাইরের জিনিস টাচ করা মানেই ২০ সেকেন্ড ধরে সাবানের ফেনা তুলে হাত ধুতে হবে। খাবার রান্না বা সেদ্ধ করলে তার ভাইরাস মরে যায়। কাঁচা সবজি বা সালাদ না খাওয়া ভাল। খেতে হলে নিয়ম মতো ধোবার পরে ওপরের খোসা ছাড়িয়ে নিন। পিলার বা বটি ব্যবহার করলে সেটা সাবান পানিতে ধুয়ে রাখুন। যেসব পণ্য ধোয়া যাবে না (যেমন ম্যাচের বক্স, খোলা মুড়ি) সেসব ৭ দিন নিরাপদ স্থানে রাখুন, যেখানে কারো যাবার দরকার পড়ে না বা যেন কেউ স্পর্শ না করে। নিজেই নিউট্রাল হয়ে যাবে।
বাইরের জিনিস প্রোসেস করার পরে নিজের হাত ধুয়ে নিন। বাইরে হতে আনা যেকোনো জিনিস যতটা সম্ভব পরিচ্ছন্ন না করা পর্যন্ত মূল ঘরে ঢুকাবেন না। বাইরের জিনিস ঘরে এনে যেখানে প্রথম রাখলেন, সেখানটা ডিসইনফ্যাক্ট করুন। ফ্লোর বা ঘরের দরোজা, দরোজার নব, তালা, চাবি, চেয়ার-এসব ডিসইনফ্যাক্ট করার জন্য সাবান পানি ভাল। তবে টাইলসের ঘর হলে সাবান পানি পিচ্ছিল করে দেয়। তাই সেখানে ব্লিচ পানি স্প্রে করা ভাল। ন্যাকড়া দিয়ে মুছতে যাবেন না। হাতে ব্লিচ পানি লাগানো যাবে না।
৮.
বাসার ছাদে গেলেন। ভাবলেন, আমি তো একাই, মাস্কের দরকার নেই। তাছাড়া এমন খোলা হাওয়ায় ভাইরাস কোথা হতে আসবে। একটু পরে আরো দুই ভাড়াটে এলো। তারাও আপনার মতো চিন্তা করেছেন। আপনারা শেষ। আবার কেউ এলো না, কিন্তু আপনি বের হবার আগে কেউ একজন সিড়িতে হাঁচি দিয়ে নেমে গেছে। আপনি তখনও শেষ। মাস্ক পরুন। ওই যে, বললাম, ঘরের বাইরে গেলেই মাস্ক। আমি রিলিজিয়াসলি পরি। ঘরের বাহির হতেই পরি। বাসার দারোয়ান যদি কিছু দিতে আসে, তখনও একটা মাস্ক পরি। হ্যা, অফিসে গেলে প্রথমে একটা কাপড়ের মাস্ক, তার ওপর একটা সার্জিক্যাল-মোট দুটো পরি। দারোয়ান বা বিলম্যানদের মিট করতে ১ টাই কাপড়ের মাস্ক পরি। যখনই বা যতক্ষণই মাস্ক পরি, মাস্ক ধুয়ে দিই। কেউ মিট করতে এলে ৬ ফুট দূর হতে কথা বলি। কিছু দিতে এলে সে এগিয়ে এসে একটা স্থানে তা রাখে। আমি দূরে যাই। সে সরে গেলে আমি এগিয়ে নিই। মানে> ৬ ফুট। রুফটপে বাসা। ছাদে গেলেন, চিলেকোঠার তালা আপনি ছাড়া কেউ স্পর্শ করেনি>তাতো গ্যারান্টেড নয়। ছাদে গিয়ে নাক ঝাড়লেন। নিরাপত্তা থাকল? নিরাপত্তা একটি ফুলপ্রূফ, ইন্টিগ্রেটেড ও কোর্ডিনেটেড ইফোর্ট।
৯.
প্রথম দিকে লকডাউন থাকাকালীন আমি নিজে ড্রাইভ করতাম। ড্রাইভারকে ছুটি দিয়েছিলাম। এখনকার লকওপেনে ভীড় ও ট্রাফিকে ব্যাপারটা আর সম্ভব হয় না। আপনার সম্ভব হলে নিজে ড্রাইভ করুন। বাইক বা সাইকেল ব্যবহার করুন। ড্রাইভার যদি রাখতেই হয়, তাকেও আপনার মতোই প্রোটেকশন নিশ্চিত করুন। প্রোটেকশন মানে হল তার নিজস্ব লাইফস্টাইলে প্রোটেকশন, ডিসট্যান্স, নো গ্যাদারিং, মাস্ক, গগলস। একই এসি গাড়িতে সংক্রমনের ঝুঁকি অনেক। ফেস শীল্ড এবং হেড কভার পরলে ভাল করবেন। মেডিক্যাল স্টাফ ব্যতিত কারোরই পিপিই গাউন বা কভারঅল পরবার দরকার নেই। কারন, জামা কাপড়ে লাগা ভাইরাস আপনাকে কামড়ে দেবে না বা শরীরে বেয়ে বেয়ে নাকে যাবে না।
ভাইরাসের ডানা বা হাত পা নেই। আপনি যদি মুখমন্ডলে হাত দেয়ার ব্যাপারটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে আপনার শরীরে ভাইরাস মাখামাখি হলেও আপনি খুব বিপদে নেই। আর যদি মানসম্মত মাস্ক পরেন এবং দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন। সারফেসে থাকা ড্রপলেট টাচ হতে সংক্রামিত হতেই পারেন, তবে সেটার ফ্রিকোয়েন্সী অনেক কম। গাড়িতে কথা বলবেন না কেউ। হাঁচি কাশি দেবার প্রশ্নই নেই। এলে কী করবেন>-তা সেব্রিনা আপা অসংখ্যবার বলেছেন। ড্রাইভারকে সচেতন করুন। সন্দেহ হলেই কাজে আসতে না করুন। সে আক্রান্ত হলে নিজেকে আইসোলেট করুন। আমরা আমাদের অফিসের জন্য পজিটিভ রোগী, সন্দেহভাজন রোগী আর রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তি-এনাদের অফিস ফেরত আসার একটা প্রোটোকল বানিয়েছি। চাইলে সেটা নিতে পারেন। এখানে আর বললাম না।
বুয়াকে ছুটি দিন। বাজারে না গিয়ে ভ্যানে বাজার করুন। অতি জরুরী নয়>এমন পণ্য কেনা বন্ধ করুন। রেস্টোর্যান্ট’র খাবারকে না বলুন, টঙ দোকানকে না বলুন। ঘরের বাইরে কেবল একজনই যাবেন। বাকিরা ঘরে থাকবেন। হ্যা, খুব ভোরে উঠে সক্ষমরা রাস্তায় হাঁটতে পারেন মাস্ক পরে। বয়স্করা বাসার ছাদে। ঘরে অনেক সদস্য কিংবা বাড়িটাতে একাধিক প্রতিবেশী থাকলে সবাইকে নিয়ে বসুন। একই নিয়ম সবাইকে পালন করতে সচেতন করুন।
তাছাড়া কোভিড১৯ একা মোকাবেলা করা সম্ভব না। একটি এপার্টমেন্টের সবাই একযোগে কাজ করুন। ভলান্টিয়ার বানান। কে কখন ছাদে এক্সারসাইজ বা হাঁটাহাঁটি করবেন-তার রুটিন করে নিন, যাতে ক্রসফায়ার না হয়।
করোনাকালীন প্রচুর ফ্রড ও ধান্দাবাজ বেরিয়েছে। ঘরবাড়িতে ডাকাতি হচ্ছে ছদ্মবেশ ধরে। সাবধান হোন। বাড়ির দারোয়ানকে সমান প্রোটেকশন দিন। তাকে নিরাপত্তা ঝুঁকি বুঝিয়ে দিন। যখন তখন যে কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেবেন না। হকার, বুয়া, খবরের কাগজওলা, বিলওলা, ময়লার গাড়ির যুবক>এরা তো নয়ই। ড্রাইভারকেও গ্যারাজে বসতে বলুন। নিজে চাবি নিয়ে নামুন। তাকে ঘর পর্যন্ত যতটা কম নেয়া যায়।
১০.
ডাক্তারের সরাসরি কনসালটেশন ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না। ফেসবুকের টোটকা ও শেয়ারড প্রেসক্রিপশন ভুলে যান।
উপযুক্ত ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন যতই ফেসবুকে যা কিছুই লেখা থাকুক। ইমিউনিটি রাতারাতি বাড়িয়ে নেবার জিনিস না। তবু পুষ্টিকর খাবার খান, পানি খান, টক জাতীয় ও সবুজ সবজি খান। আক্রান্ত হোন বা সুস্থ, রোজ সকালে ব্যায়াম করুন, ঘুম হতে উঠে ও ঘুমানোর আগে পরিচ্ছন্ন হয়ে লবন গরম পানিতে গরগরা করে নিন। রোজ ৩ বার ইষদুষ্ণ গরম পানি খান। মধু, রসুন ও কালিজিরা খান। এত করোনা মরে যাবে না। আক্রমন বন্ধ হবে না। আক্রান্ত হলে কিছুটা সুবিধা পাবেন।
যে যাই বলুক, এইসব করলেই করোনা চিৎপটাং হয়ে যাবে-সেটা ডাহা মিথ্যা কথা। বাসায় নেবুলাইজার ও পালস অক্সিমিটার রাখতে পারেন। অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখা বর্তমান পরিস্থিতির দাবী। তবে এভাবে সবাই আগাম মজুদ করলে হাসপাতালে প্রকৃত রোগীদের শর্ট পড়বেই। এতে করে আপনার আশঙ্কা হতে মজুদ সত্যিকারের দরকার হওয়া লোকটির মৃত্যুর কারন হতে পারে। তবু যদি রাখেন, পুরো ভবনে একটি রাখুন। যাতে সমবায় করে ব্যবহার করা যায়। তাছাড়া অক্সিজেন নিজেই কিন্তু প্রাণ সংহার করতে পারে।
রোগের যেকোনো ভ্যালিড লক্ষণ-জ্বর, শুষ্ক কাশি, শ্বাসকষ্ট, গলা ব্যথা, মাসল পুল, লাল চোখ, স্বাদ গন্ধ রহিত হওয়া>এর যেকোনোটি দেখা দিলেই ধরে নিন, আপনি আক্রান্ত হতে পারেন। ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। তাৎক্ষণিক অন্যান্য ব্যবস্থা নিন। টেস্টের চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে বাসায় থেকে স্যাম্পল দিন। রিপোর্ট না পাওয়া তক সাসপেক্টকে আইসোলেট রাখুন। পজিটিভ হলে আতঙ্কিত হবেন না। আতঙ্কিত হলে রোগ কমবে না, বরং অন্য ঝামেলা বাড়বে। পজিটিভ ও সচেতন হলে কিছুটা সুবিধা পাবেন। অবহেলা বা দেরী করবেন না। অন্তত কিছু কাছের লোককে পজিটিভ হবার কথা জানিয়ে রাখুন। গোপন করার কিছু নেই।
কোভিড১৯ কোনো গোপন যৌনবাহিত রোগ নয়। অভিশাপের ফলও নয়।
অফিসসমূহে যেসব সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা নেয়া যায়:
১. অফিসে যতক্ষণ একজন মানুষও অফিস করবে, মাস্ক বাধ্যতামূলক থাকবে। অবশ্যই ন্যুনতম কোয়ালিটি মাস্ক>N95/KN95/Surgical/Two layer fabric mask। মাস্ক ছাড়া দেখা গেলে পানিশ করতে হবে। অফিসে ডায়নিং হলে সবাই মাস্ক খুলে খাবে। তাই ভীড় প্রচুর কমাতে হবে। ডায়নিং এভয়েড করতে পারলে আরও ভাল। ওযুখানায় সবাই মাস্ক ছাড়া থাকে। তাই একজনের বেশি একবারে যাবেন না।
২. অফিসে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে ন্যুনতম ৩ ফুট দূরত্বে থেকে কথা বলবে, কাজ করবে। কাউকে স্বল্প দূরত্বে দেখা গেলে সতর্ক করতে হবে। ব্যক্তিগত চেম্বারে কেউ অতি জরুরী না হলে বসে মিট করবে না। বাইরে হতে দ্রূত কথা সেরে চলে যাবে। ফোন বা স্কাইপ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করতে হবে।
৩. ডায়নিং হলে সীট কমিয়ে শিফট করে দেয়া যায়, যাতে একসাথে সবাই না যায়। ডায়নিং এ যেহেতু মুখে মাস্ক থাকে না, তাই, ওখানে কেউ কারও সাথে কথা বলবে না। শিফট ডিউটি চলাকালীন ডায়নিং বন্ধ রাখাই ভাল। তবু যদি খোলা থাকে, তাহলে ডায়নিংয়ের সীটে কেউ যেন কারো মুখোমুখি না থাকে, সেটা ব্যবস্থা করা দরকার।
৪. টী রুমে চা না দিয়ে ডেস্কে পৌছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পিওনরা দূরত্ব বজায় রেখে চা, পানি দেবে।
৫. রোজ সকালে ঢোকার আগে তাপমাত্রা চেক করতে হবে। ব্লিচ পানি রাখা একটি স্পঞ্জি ট্রেতে জুতার তলা ভিজিয়ে ও হাত ধুয়ে/স্যানিটাইজ করে ঢোকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এন্ট্রি পয়েন্টে একটি হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে। থার্মাল মিটারটি স্ট্যান্ডে বসালে ভাল হবে। প্রতিটি এন্ট্রি পয়েন্টে স্যানিটাইজার রাখা ভাল।
৬. প্রতি ২ ঘন্টায় একবার টয়লেট, ফ্লোর ও দরোজার সব নব ব্লিচ পানি দিয়ে মুছতে হবে। গাড়িগুলোও পরিচ্ছন্ন করতে হবে রোজ। কমোডের থেকে ড্রপলেট ছড়ানো এড়াতে ওয়াশরুমে সোপি ওয়াটার স্প্রে গান রাখতে হবে। কেউ যদি কমোড ব্যবহার করে, তবে প্রথমে স্প্রে করে ফ্ল্যাস করে তারপর টিস্যু দিয়ে মুছে বসবে।
৭. ভিজিটরদের মূল ফ্লোরে না আনা উচিত। তাদের বাইরের একটি রুমে মীট করার ব্যবস্থা করুন।
৮. করিডোরে হাঁটার সময় দুই পাশ দিয়ে চলা, যেন কেউ কারও কাছে চলে না আসে।
৯. মিটিং না করা, করলে সংক্ষেপ করা। সকল মিটিং রুমের দরোজা খুলে রাখা, যেন দরোজায় হাত দিতে না হয়।
১০. প্রতিদিন দুই শিফটের শেষে দু’বার এসি বন্ধ করে ভেন্টিলেশনের জন্য জানালা খুলে দেয়া।
১১. আক্রান্ত বা সন্দেহজনক কেউ হলে অফিসে না আনা/না আসা। আমরা আক্রান্ত, সন্দেহজনক ও কনটাক্ট-তিন ধরনের লোককে ফের অফিসে আসবার নিয়ম ঠিক করতে একটি প্রোটোকল করে দিয়েছি। চাইলে দেখতে পারেন।
১২. রান্নার বুয়া, পিওন, ক্লিনার, এদের যথাসম্ভব ডিসইনফ্যাক্ট করতে হবে বারবার। পার্সেল ডিউটিতে একজন নির্দিষ্ট পিওনকে ব্যবহার করতে হবে।
১৩. অফিসের সব কর্মীকে সম্ভব হলে দুই শিফটে আনা কিংবা অলটারনেটিভ অফিস ডেটে ভাগে ভাগে আনা যেতে পারে। যাতে অন্তত একটি টীম পড়ে গেলে আরেকটি টীম অফিস চালাতে পারে।
১৪. যথাসম্ভব সবাইকে ল্যাপটপ দেয়া, মোবাইলে কাজ করতে শেখানো যেতে পারে। সবাইকে স্কাইপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার, জুমের ব্যবহার করতে বাধ্য করতে হবে।
১৫. আক্রান্তদের সাহায্যের জন্য অফিস হতে ব্যবস্থা করতে হবে। আপদকালীন সময়ে অন্তত অফিস ট্রান্সপোর্ট দেয়া যেতে পারে।
১৬. প্রতিনিয়ত সব কর্মীকে সচেতন করার জন্য কাউন্সেল করতে হবে। যাতে অফিসে এত আয়োজন সব সে ভন্ডূল করে দিয়ে টং দোকানে চা খেতে না যায়।
১৭. একটি ভিজিল্যান্স কমিটি রাখা। যারা সার্বক্ষণিক এইসব যাবতীয় উদ্যোগ আপডেট, মনিটর ও রিপোর্ট করতে থাকবে।
১৮. এই ভিষণ দুঃসময়ে যতটা সম্ভব কর্মীদের পাশে থাকুন। ছাঁটাইয়ের মতো নির্মম পন্থায় না গিয়ে যতটা সম্ভব অন্য ব্যবস্থা নিন। প্রয়োজনে এক্সপার্টের সহায়তা নিন। সবার বেতন কমিয়ে সবার থাকার একটা ব্যবস্থাও হয়তো নেয়া যায়। সবশেষে বলি, যদিও বিজ্ঞানীরাও এখনও নিশ্চিত নন, ঠিক কীভাবে চললে রোগটি আপনাকে একদমই ছুঁতে পারবে না।
তবু, আমার পড়াশোনা ও বিশ্লেষণ আমাকে ব্যক্তিগত বিশ্বাস দিচ্ছে, কয়েকটা থাম্ব রুল মেনে চললে আপনি আমি অনেকটা নিরাপদ থাকব-
১. উভয়ে মাস্ক পরে থাকা অবস্থা ব্যতিত কোনো মানুষের সাথে মীট নয়।
২. ঘরের বাইরে থাকাকালীন বা ঘরে এসে পরিচ্ছন্ন হওয়া পর্যন্ত গলার ওপরের অংশে হাত বা যেকোনো বস্তুর ছোঁয়া হারাম।
৩. সম্ভব হলে ৬ ফুট, না হলে অন্তত ৩ ফুটের মধ্যে কাউকে আসতে না দেয়া বা না যাওয়া।
৪. বাইরে হতে আনা পণ্য পরিচ্ছন্নতার নিয়ম না মেনে গ্রহন না করা।আর আপনি নিজে যদি একটু মাথা খাটান, আর সবসময়ই ভেবে কাজ করেন, যে, আপনার কোন কাজটির সত্যিকারের পরিণতি কী, আপনার নেয়া পদক্ষেপগুলো টোটালিটি ধারন করে কিনা-তাহলে আপনি নিজেই অনেক কিছু ভেবে নিতে পারবেন। ভাল থাকুন, ঘরে থাকুন, বাইরে সুরক্ষিত থাকুন, সুস্থ থাকুন,সুস্থ রাখুন।
#corona #pandemic #covid19 #fightingcovid #FightingCorona