বিশাল এই লেখাটি আপনি পড়বেন না হয়তো। পড়লে কিছু ভাববার উপকরণ পাবেন। বিশাল লেখা হওয়ায় আমার ওয়ালে একই দিনে তিনটি পর্ব করে পোস্ট করেছি। একইসাথে পুরোটা আবার একসাথে একবার দিয়েছি। যার যেরকম পছন্দ, পড়ুন। যেহেতু বাসায় বসে আছেন, হয়তো সময় কাটাবার জন্য হলেও এত বড় লেখাটাকে পড়বেন। করোনায় আমাদের দেশের সার্বিক জনমানস ও চিত্রটা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে ১১ই মার্চে প্রথমবার কিছু লিখি।
এবারের এই লেখাটি প্রথম লিখতে বসি আজ হতে আরও ১০ দিন আগে। প্রতিবারই একটু লেখার পরে মুছে ফেলেছি। মুছবার কারণ-এক ধরনের ফ্রাস্ট্রেশন অথবা, ঘনায়মান দুর্দিনের সুস্পষ্ট নিশান দর্শন। আমি জানি না, কে কী ভাবছেন। আমি চোখ বুজলে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে কেবল একটা সরলরৈখিক সাদা রেখাকে দেখি। দেশের অবস্থা, পরিণতি, সরকার ও জনগনের চরিত্র, বিপদের সত্যিকার স্বরুপ এবং এই দুর্যোগ চলে যাবার পরে পৃথিবীর কল্পিত নবজন্ম নিয়ে কল্পনার মনিটরে কেবল একটিই সরল রৈখিক যাত্রা। মাফ করবেন।
আমি অনেকভাবে চিন্তা করেও আজ হতে ৬ মাস পরে একটি নবগঠিত ও পুনর্জন্ম নেয়া বিশ্বব্যবস্থা ছাড়া কল্পনার চোখে কিছুই দেখতে পাইনি। আর সেই কল্পিত পৃথিবীতে চারপাশের প্রচুর চেনা মানুষ নেই। হয়তো আমিও নেই। সবচেয়ে বড় কথা, খুব সম্ভবত আজ হতে ৬ মাস পরে যদি আমরা আবার জীবনে ফিরিও, সেই নতুন পৃথিবী হবে একটি এতিম পৃথিবী। যেখানে পৃথিবীর অগণিত পরিবারের (বিশেষত বাংলাদেশের) বাবা বা মায়েরা বিদায় নিয়েছেন আমাদের থেকে। হয়তো অতি কল্পনা বা আমার স্বভাবজাত নেগেটিভ চিন্তা। কিন্তু পরিসংখ্যান ও সায়েন্স আমাকে এর চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে আপাতত দিচ্ছে না। (খোদা না করুন।) আরমাগিডন মূভিটা কিংবা দ্যা জাজমেন্ট ডে মূভিটার কিছু দৃশ্য চোখে ভাসে।
আজ ২৯ মার্চ অনেক সাহস সঞ্চয় করে এবং বিশেষ কিছু চিন্তা হতে লেখাটা লিখতে বসেছি। পুরো লেখাটি সুবিশাল (২৭ পৃষ্ঠা) করতে বাধ্য হয়েছি। কারন, এখানে আমি চলমান করোনা মহামারি বাদেও অনেক সংযুক্ত ও অবশ্যম্ভাবি ইস্যূ নিয়ে আমার এলোমেলো ভাবনাকে লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করব। আশা করছি, যারা ইতিবাচক ও সাহসী লোক, তারা আমার এই লেখাটি পড়বেন না। যারা আমার নিয়মিত সমালোচক, পাঠক ও যারা আমার ওপর বিরক্ত, তারা পড়বেন। আরেকটি কথা।
লেখার বাইরে আমি বলতে গেলে কিছুই পারি না। আমি একদমই অর্গানাইজার নই, সমাজ সেবক হবার কোনো যোগ্যতাই আমার নেই। সাহসী বা দেশপ্রেমিকতো নইই। এই ভয়ানক দুর্যোগে বহু দেবতাসমতূল্য মানুষ নানা মানবতাবাদী উদ্যোগ নিয়েছেন। নিয়ে যাচ্ছেন। আমি তাদের দূর হতে সালাম ও প্রণতি জানাই। আমি একজন নিম্নমধ্যবিত্ত ছা-পোষা বাঙালী ও সংসারী পুরুষ। চাচা আপনা জান বাঁচা নীতিই আমার সম্বল।
গত দেড়টি মাস আমার এ্যাজমা আক্রান্ত স্ত্রী এবং ৭০ বছর বয়স্ক মা’কে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করতে করতে আমি আমাকে নিয়ে কিংবা বাকি পৃথিবীকে নিয়ে ভাবতে ভুলে গিয়েছি। কারন এরাই আমার জীবন ও জগত। আমার জীবন রথের নানা গতিতে চলার একমাত্র কারন এরা দু’জন। তার গহীনের কথা আরেকদিন হবে, যদি বেঁচে থাকি। হ্যা, আমি স্বার্থপর। আমি পলায়নপর বা এসকেপিস্ট। ক্ষমা করে দেবেন আমার এই অক্ষমতা।
আপনারা যারা আমার বকবকানি নিয়মিত পড়েন, তারা হয়তো খেয়াল করেছিলেন, মাজহারের মতো কেউ কেউ ফোন করে জানতেও চেয়েছিলেন, “তুমি ইদানিং মৃত্যু নিয়ে এমন করে বারবার কথা বলছ কেন?” হাসতাম। আমিও জানতাম না কেন? তবে একটা যোগসূত্র বলি। বুঝ হবার পর হতেই কোনো একটা অনাগত দুর্যোগের সম্ভাবনা দেখা দিলে কেন যেন আমি বেশ আগে হতে একটা অকারন বিষন্নতায় আক্রান্ত হতাম। একদমই কোনো বৈজ্ঞানিক কারন নেই তার। কুসংষ্কারই বলা চলে একে। বিগত অনেকগুলো মাস সেই অনুভূতিই ছিল আমার। জানি না, এটাই কি ছিল সেই কালো ভবিষ্যত?
আজ ২৯ মার্চ আমি যখন চৈত্রের এক অনাকাঙ্খিত ছুটির নিদাঘ দুপুরে বসে বসে লিখছি, তখন বাংলাদেশ একটি শ্বাসরুদ্ধ অবস্থার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। একাত্তর টিভিতে IEDCR এর প্রতিদিনকার ’পেশাদারীত্ব’ শুরু হয়েছে। অত্যন্ত অবিশ্বাস্যভাবে জানানো হল, বাংলাদেশে একাদিক্রমে দ্বিতীয় দিনও নতুন করে কেউ করোনা ’সনাক্ত’ হয়নি। [খেয়াল করুন, সরকারী আমলাতন্ত্রের সুনিয়ন্ত্রীত ভাষা-‘সনাক্ত’ হয়নি বলেছে। কেউ নতুন করে ‘আক্রান্ত’ হয়নি-বলেনি।]
যদিও একাধিক চ্যানেলে দেখাচ্ছে, সন্দেহভাজন শ্বাসকষ্ট নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু মারা যাবার ঘটনা ঘটেছে কাল ও আজ। বাংলাদেশের করোনা স্ট্রাটেজী ঠিক এই মুহূর্তে যা মনে হচ্ছে আমার কাছে, তা হল, ”কাদম্বিনীকে মরিয়া প্রমান করিতে হইবে, যে, সে করোনায় মরিয়াছে।”
১. আমাদের জনগণকে দিয়েই প্রথম কথা বলা শুরু করি। আমাদের এই জনগন কি এখনো মহাবিপদের স্বরুপটি উপলব্ধি করতে সত্যিই পেরেছে? না। এখনো পারেনি। পারবেও না। আজ হতে ১ মাস আগে বঙ্গ জনগন করোনার মহাবিপদ নিয়ে হাস্যরস, ফাজলামো, ট্রলিং আর তুচ্ছতাচ্ছিল্যতে ব্যস্ত ছিল। আজকেও তার ব্যতিক্রম নেই। আমার চেনা জগতের প্রচুর মানুষকেই দেখছি, তারা তাদের ট্রলিং আর চিলিং নিয়ে এখনো আছে। আপনি যদি শুধু ফেসবুক আর ঢাকা শহরকে গোটা বাংলাদেশ ভেবে থাকেন, তাহলে আমার কথাকে বালখিল্যতা মনে হবে। আর যদি মনে করেন, এই দেশে ৮৫ হাজার গ্রাম আছে আর সেখানে দেশের প্রায় ৭৫ ভাগ লোক বাস করে, তাহলে জানুন, ঢাকার মতো বড় বড় শহরেও এমনকি অলিতে গলিতে, মহল্লায়, বড় বড় এপার্টমেন্ট কম্পাউন্ডে এই মাগনা ছুটিতে ব্যাপক সামাজিক ’সঙ্গম‘ চলছে। ২৬ ও ২৭-দুই দিন ঘরে থেকেই বাঙালী হাপিয়ে গেছে। তারা ফাঁকা ঢাকায় রাস্তায় চিল করতে বেরোনোর জন্য মুখিয়ে আছে। ৩১/১ তারিখের দিকে দেখবেন, কী ঘটে।
আর গ্রামে এই মুহূর্তে যদি নিজে যান, বা গ্রামে যদি আপনার কেউ থাকে, তাহলে খবর নিন। গ্রামগুলোতে এতদিন পরে শহর হতে আত্মীয় স্বজন গেছে। বিদেশ হতে জামাই এসেছে। গোটা বঙ্গদেশের গ্রামসমূহে এই মুহূর্তে জামাই ষষ্ঠী উৎসব চলছে। একটু আগেই দেখলাম, এক গ্রামে দিঘীতে মাছ মারার উৎসব চলছে। দোকানপাটের চায়ের আড্ডা তো আছেই। আচ্ছা, ধরে নিলাম, আমার এগুলো সব মিথ্যা কথা। আপনাদের খুব ছোট একটা জিনিস বলি। গত তিনদিনে যতগুলো টিভি রিপোর্টিং দেখলাম, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ্যাকশন দেখলাম, টিভির টকশো দেখলাম, মন্ত্রী বা IEDCR এর ব্রিফিং দেখলাম, রাস্তায় মানুষের যে সীমিত চলাচলের চিত্র চাক্ষুষ দেখলাম, তাতে দেখলাম, ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখার যে আন্তর্জাতিক মানদন্ড, তার তোয়াক্কা কেউ করেন নাই। না ডাক্তার, না জনগন, না মন্ত্রী, না সাংবাদিক, না পুলিশ। ম্যাজিস্ট্রেট এক বাড়িতে এক প্রবাসীকে সাইজ করতে গেছেন। তার পুরো টীম রীতিমতো জঙ্গলের মতো করে একত্রে দাড়িয়ে। কোথায় কোথাও ত্রাণ বিতরণ বা অর্গানাইজ হচ্ছে। ভলান্টিয়াররা গলাগলি করে কাজ করছেন বা চলছেন। টিভি সাংবাদিক একই মাইক্রোফোন সারাদিনে শত শত লোকের একদম মুখের কাছে ধরছেন, তাদের মুখের লালা, সোয়াব, ড্রপলেট, এরোসল মাখাচ্ছেন, তারপর নিজের মুখের কাছে নিচ্ছেন, তারপর সেটা একজন পুলিশ অফিসার বা আর্মি অফিসারের মুখের কাছে ধরছেন। বাহ। আপনি এরপরও যদি বলেন, বাঙালী অনেক সচেতন হয়ে গেছে, আমি লাচার।
হ্যা, আপনি বলবেন, ভাই, এত পারফেক্ট তো হবে না। জ্বি। তা হবে না। তবে মুশকীল হল, এই করোনা দুর্যোগটি এমন একটি অভিনব ঘটনা, যার মোকাবেলায় সবকিছু ১০০ ভাগ নিশ্চিত/পারফেক্ট না হলে পুরোটাই জলে যাবে। এই রোগে গণমৃত্যু আটকানোর এখনো পর্যন্ত একমাত্র রাস্তা হল, মানুষ হতে মানুষকে বিচ্ছিন্ন রাখা। সেটা যদি ১০% লোকও ভঙ্গ করে, তাহলে বাকি ৯০% এর এফোর্ট কাজ লাগবে না। রোগটি এক্সপোনেনশিয়ালী বাড়তে থাকবে।
২. মানছি, রোগটি নতুন এবং গোটা পৃথিবীর তাবৎ ডাক্তার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরাও বিষয়টা নিয়ে গবেষণা ও থিওরী দাড়া করানোর জন্য খুবই সামান্য সময় পেয়েছেন। কিন্তু তারপরও অনেকেই দায় এড়াতে পারবেন না। বিশেষত বাংলাদেশের মন্ত্রী, নেতা, বিশেষজ্ঞ, সুশীল, মিডিয়া। এরা কিছু না জেনেই, না বুঝেই, নিজেরা নিশ্চিত না হয়েই আন্দাজে, আধা জেনে, লক্ষণ বিচার করে, অন্যের দেয়া বক্তব্য ধার করে নির্বিচারে জ্ঞান ফলিয়েছে। যেটা গোটা দেশকে, দেশের বিশ্বাস ও প্রস্তুতিকে বিভক্ত করে ফেলেছে। বিভ্রান্ত করেছে। সতর্ক হবার বদলে গা ছাড়া হতে বাধ্য করেছে। তাছাড়া, এটা তো জানা কথাই। এদেশের নেতা ও সরকারকে জনগন কোনোকালেই বিশ্বাস করে না। আমার মনে হয়, শুরু হতেই যেই ন্যাশনাল মিসটেক আমরা করেছি, সেটা হল, করোনা নিয়ে একটা ন্যাশনাল পলিসি, স্ট্যানড পয়েন্ট ও স্ট্র্যাটেজি ঠিক করা হয়নি, তৈরী হয়নি ডেটাবেস, ডিফেন্স, টেকনিক। যে কারনে, ব্যখ্যাগুলো যে যেভাবে পেরেছে, সেভাইবেই করেছে।
সরকার হতে এটা ব্যপকভাবে প্রচার করা উচিত ছিল, যে, একজন মানুষ যদি ভাইরাসটি কোনোভাবে শরীরে ঢুকিয়ে ফেলে, তারপরের ১৪ দিন তিনি যদি সুস্থও থাকেন, এমনকি কখনো অসুস্থও না হন, তাহলেও ওই ১৪ দিনে dkdb যাদের ক্লোজ কনটাক্টে এসেছেন, তাদের তিনি সংক্রমিত করতে পারেন। যে কারনে, আপাতদৃষ্টে সুস্থ লোককেও ঘরে থাকতে হবে, বিশেষত বিদেশ হতে আসা লোকদের। এই জিনিসটাই প্রচার হয়নি। খালি গলা ফাটানো হয়েছে, হোম কোয়ারেন্টাইন করো। আরে, ’হোম কোয়ারেন্টাইন’ কথাটাইতো ভুল। জিনিসটা হবে ’রুম কোয়ারেন্টাইন’। মানে বিদেশ হতে আসলে আপনাকে বাড়িতে না, একটি একা রুমে আটক বা একা থাকতে হবে। হোম মানে তো বাড়ি। আপনি বাড়িতে বাবা-মা, বউ নিয়ে আবদ্ধ থাকলেন, বাইরে গেলেন না, কিন্তু তাতে আপনার বাবা-মা আক্রান্ত হতে পারেন। বিষয়টা ছিল, বিদেশে হতে আসা মানুষটি একদম বিমান হতে নেমে পরের ১৪ টি দিন একজন মানুষেরও ধারে কাছে যাবেন না। অথচ হোম কোয়ারেন্টিনের ওয়াদা করা বা করানো লোকটি এয়ারপোর্ট হতে বাড়ি গেল সবার সাথে কোলে বসে, গাড়ির ড্রাইভারও একসাথে অরক্ষিতভাবে গেল। তারপরও নাকি সে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকবে। হাস্যকর। আর কবে হতে এদেশের মানুষ এত এত সচেতন হয়ে গেল, যে, এয়ারপোর্ট হতে ওয়াদা করে এসে তা ঘরে ফিরে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবে? সরকার কি জানত না তা? জানত। ভালভাবেই জানত। গা করেনি। আর সবচেয়ে বড় কথা, বিগত ৩ মাসে, বিশেষত গত ৩০ দিনে সবচেয়ে সংক্রামিত দেশ হতে যারা এসেছেন, তাদের ১০০ ভাগকেই নিবিড়ভাবে চেক করাতো দূরের কথা, অনেককে কোনো জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি। তাদের ট্রেসব্যাক করার জন্য পারফেক্ট ঠিকানাও রাখা হয়নি। পুলিশ আজ তাদের গরু খোঁজার মতো খুঁজছে। এমনকি আমাদের ’নবাবজাদারা’ বিদেশ হতে আসার সময় কেউ কেউ প্লেনে প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর লুকিয়েছেন। যাতে এয়ারপোর্টে না আটকান। এই অত্যন্ত হাস্যকর গর্তগুলো পাবলিক বোঝে, অথচ সরকার, ইমিগ্রেশন, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর বোঝে না। অবশ্য এমপিথ্রি গাইড পড়ে সরকারী চাকরী হওয়াদের এর চেয়ে বেশি মেধা থাকার কথাও না। তাছাড়া, কে না জানে, বাংলাদেশের সরকারী কর্মকর্তারা একেকজন ভয়ানক মেধাবী ও করিৎকর্মা। এয়ারপোর্টটা লক করলেই বা অন্তত ওখান দিয়ে ঢোকা লোকগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে রাখলেও দেশটা বেঁচে যেত। আর, এমনকি ভারত যখন বাংলাদেশ হতে স্থল বন্দর দিয়ে বাংলাদেশীদের ঢোকা বন্ধ ঘোষনা করল, তখনও, অন্তত সাহস করে এর বিপরীতে ভারতীয়দেরও বাংলাদেশে ঢোকা নিষিদ্ধ করতে পারেনি। বন্ধুত্বের দায়, কিংবা স্বামী-স্ত্রীত্বের দায়।
আমরা শুরু হতেই ভুলের রাজ্যে ছিলাম। ডিসেম্বরে যখন চায়না অফিশিয়ালী করোনার প্রাদুর্ভাব এবং ভয়াবহতা স্বীকার করে, তখন আমাদের টিভি ও সরকার বলছিল, “আমরা সতর্ক নজর রাখছি।” যদিও ’নজর’ দিয়ে করোনা আটকানো যায় না। তারপর জানুয়ারীর শেষের দিকে বলা শুরু হল, “আমরা প্রস্তুত আছি।” যদিও ওই প্রস্তুতিটা ঠিক কী-সেটা তারা নিজেরাও জানতেন না। জানতেন না, কারন, সরকারী কর্মীদের সার্বিক যোগ্যতা, মেধা, তৎপরতা, আন্তরিকতা এবং সিস্টেমেটিক্যালী সরকারী ম্যানেজমেন্ট ও এশট্যাবলিসমেন্টের ক্রিয়েটিভ কাজ করার প্রতিবন্ধকতা। জানেন কিনা, সরকারী রাজকীয় প্রশাসন সত্যিকারেই, এমনকি একটি প্রাইভেট কোম্পানীর মতো ইফিশিয়েন্সী ও ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে কাজ করতে অক্ষম। সিস্টেম্যাটিক্যালীই অক্ষম। এটা কর্মীদের দোষ না। সরকারের দোষ না। সিস্টেমটাই এভাবে সৃষ্টি করা। যে কারনে, দেখুন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রস্তাবিত কীট নির্মানের মতো এত ভয়ানক জরুরী একটি ইস্যূতে সরকারী সিস্টেমের রেসপন্ড করতে যুগের পর যুগ লাগে। যেখানে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ন। আবারও বলছি, সরকারী সিস্টেমটাই এমনি।
শুরুতে আমাদের বলা হয়েছিল, এটি অত্যন্ত মামুলী একটি জ্বর, সর্দি রোগ হবে। একদমই চিন্তিত হবার কিছুই নেই। আজ আমরা জানি, এটি মামুলী জ্বর সর্দি তো নয়ই, এটি ভয়ানক এক ধরনের নিউমোনিয়ার সূত্রপাত করে রোগী মেরে ফেলে। আমাদের বলা হয়েছিল, মাত্র ১% লোক এতে মারা যেতে পারে। [ভাবখানা এমন, ওই ১% মরাটা কোনো বিষয়ই না।] আজ দেখা যাচ্ছে, ১% তো নাই না, আদতে এই মহামারি মেডিক্যাল সায়েন্সের চেনাজানা সমস্ত জ্ঞানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেশের পর দেশ ছারখার করে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ অসহায় এবং সামর্থ্যের সমস্তটা দিয়েও জিততে পারছে না। মানুষ সমানে মরছে। হ্যা, এখন পর্যন্ত যত মানুষ সারা দুনিয়াতে মারা গেছেন, সেই সংখ্যাটা (প্রায় ৩৮ হাজার), এক বছরে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রে নরমাল/রেগুলার ফ্লূতে মারা যাওয়া মানুষের চেয়ে খুব বেশি না। বিভিন্ন রোগে এর চেয়ে বেশি মানুষ, প্রতিবছর সারা দুনিয়াতে মারা যায়। কিন্তু ওহে পরিসংখ্যানবীদগন, ওই মারা যাওয়াটা হয় ১২ মাসে। করোনায় তো তিন মাসেই মরে শেষ। তাও, এখনো তো কোনো ফেরেশতা এসে বলে যায়নি, মরা ধরা শেষ। আর কেউ মরবে না, মরার কোটা শেষ। ফলাফল, মরতেই থাকবে। আর আগামী ৩ মাসে আরও কত মানুষ মরে দেখুন। শালার স্ট্যাটিসটিকস! আজ স্ট্যাটিসটিশিয়ানরা কই? আজ ডাক্তার জাকির কই? আজ ইব্রামোভিচ কই? আজ সামান্য সর্দি জ্বরের পীর সাহেবরা কই?
করোনা ভাইরাস প্রতি মুহূর্তে বিজ্ঞানীদের বোকা বানাচ্ছে। আর যুগের পর যুগ কল্পিত শত্রূকে দমন করতে, ক্ষমার অযোগ্য কাজ হিসেবে রাষ্ট্রনায়কেরা সমর শক্তি, মহাকাশ বিদ্যা, এমনকি খেলাধুলার পেছনে যেই অঙ্কে টাকা ঢেলেছে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষনা, কৃষির পেছনে তা ঢেলেছে কি? ফলাফল? আজকে ক্রীকেট কিংবা সিনেমা করোনার ওষুধ দিতে পারছে না। আমাদের প্রবল প্রতাপান্বিত এ্যাডমিন ক্যাডার রোগীর সেবা করতে পারছে না। ফ্রন্ট লাইনে বলির পাঁঠা, সেই ডাক্তাররা, যারা মাত্রই সেদিন ডেঙ্গু রণাঙ্গন হতে ফিরল। আমাদের বলা হয়েছিল, আমরা প্রস্তুত। বাংলাদেশে জানুয়ারীর ১ তারিখ হতে আপডেট থাকা শুরু, ৮ মার্চে প্রথম অফিশিয়াল সংক্রমন। আজ আমরা দেখছি, ঠিক কোন কোন হাসপাতালে করোনার চিকিৎসা দেয়া হবে, তা নিয়ে হাসপাতাল ও সরকারের খেলা। কেউ জানত না, একই সময়ে যে ইনফ্লূয়েঞ্জার মৌসুম শুরু হবে, সেই রোগীদের কী হবে? তাদের হতে করোনার রোগী পৃথক হবে কী করে? আউটডোর, এমার্জিন্সী ও করোনা হাসপাতালে মোট কতজন ডাক্তার কাজ করবে? তাদের কতগুলো পিপি, মাস্ক লাগবে অন্তত ৩ মাসে-তার কোনো হিসাব পর্যন্ত করা হয়নি। জোগাড়তো পরে। রোগীরা কীভাবে হাসপাতালে যাবে-তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই। কী চমৎকার! রোগী নিজে গাড়ি ম্যানেজ করে রাস্তায় আরও ১০ জনকে ইনফেক্টেড করে হাসপাতালে ভর্তি হবে। তাও যদি হাসপাতালে ঠাঁই পায়-তবেই। ঢাকায় সম্ভাব্য রোগীরা কীভাবে হাসপাতালকে রীচ করবে-কেউ জানে না। হটলাইন নম্বর দেয়া হয়েছে। সেখান হতে কেউ কোনো সার্ভিস পাচ্ছে না। মানুষ সারারাত হটলাইন গুঁতিয়ে অতঃপর সকালে বিনা চিকিৎসায় মরে পরে থাকছে। অন্যদিকে হটলাইনে এই দেশের অসভ্য, ইতররা নিজেদের যৌনবিকৃতির পরিচয় দিয়ে ’হট’ আলাপের চেষ্টা করছে।
হটলাইনের ওপারের কর্মীরা নিজেরাও প্রশিক্ষিত না। তারাও জানে না, কাকে কী পরামর্শ দেবে। তাদেরকে জানানো হয়নি, কীভাবে সম্ভাব্য রোগী কী করবে, কোথায় যাবে? কাকে বলবে? কীভাবে তাকে হ্যান্ডেল করা হবে। রোগ এখনো জেঁকে বসার আগেই পুরো সিস্টেম হযবরল। এরপর যেটা হবে, সেটার নাম লন্ডভন্ড। তখন কে যে কার মাথায় পানি দেবে, কে সচেতনতার কাজ করবে, কে কোয়ারিন্টিন নিশ্চিত করবে, কে চিকিৎসা দেবে, কে খবর সংগ্রহ করবে, কে টিভি চালাবে, কে পানির সাপ্লাই বা পাওয়ার প্ল্যান্ট সচল রাখবে, কে আইন শৃঙ্খলা সামলাবে, কে রোগী পরিবহন করবে, কে ওষুধ বানাবে, কে পিপিই বানাবে, কে খাবার বেঁচবে, কে কবর খুঁড়বে, কে জানাজা পড়বে-জানি না। আজ একটা ফিচার পড়লাম। যেখানে লেখক বলেছেন, বাংলাদেশই সেই বিরল দেশ হতে যাচ্ছে, যারা টেলিফোনে করোনা চিকিৎসা ও মহামারি মোকাবেলা করতে নিয়ত করেছে।
৩. বঙ্গদেশের কেরেন্টিন রঙ্গ দেখে উহান আর লোম্বার্ডির মানুষ হাসতে হাসতে মরে গেছে। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ব্লাফ ছিল, বিদেশ ফেরত বাংলাদেশীরা সবাই সুবোধ বালকের মতো নিয়মতান্ত্রিক সেলফ কোয়ারেন্টাইনে থাকবে। উহান হতে যখন প্রথম ব্যাচের শ’দুয়েক মানুষ এলেন, তাদেরকে খুব চমৎকারভাবে কোয়ারেন্টাইন করা হল আশকোনায়। তাদের একজনও কিন্তু ইনফেকটেড হননি, কাউকে করেনওনি। তারপর এলেন ইতালী হতে মহান কিছু ‘নবাবজাদা’। ওই ১৪২ জনের কোয়ারেন্টিনে যাওয়া নিয়ে মহান আচরন দেখেই রাষ্ট্রের আন্দাজ করা উচিত ছিল, যারাই বিলাত হতে আসবেন এবং রাজবাহাদুরের ভাষ্যমতে,” সুবোধের মতো স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনে ঘরে থাকবেন” তারা আসলে কী চমৎকারভাবে সারা গ্রামে কোয়ারেন্টিন করে বেড়াবেন। রাষ্ট্র তা ফিরেও দেখেনি। একজনতো I **love this country system গালিতে তার চমৎকার ইংরেজির বহরও প্রকাশ করে ফেললেন। আমার মনে হয়, সেই হতে আমাদের পতনের শুরু। তার পরে আর সরকার কাউকে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে পাঠাবার সাহস বা গরজ না করে সবাইকে খোদা ভরসায় বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেন। যেখানে আবার তারা বাড়ি যাবার পুরো রাস্তা পরিবারের সবার সাথে জড়াজড়ি করে যাবে। বাহ কি কেরেন্টিন! বিদেশ ফেরতদের যখন বাড়ি বাড়ি রেইড দিয়ে বলা হল, ঘরে থাকতে। তারা বললেন, “আমি তো সুস্থ। আমার কেন ঘরে থাকতে হবে?
করোনার সংক্রমন যখন প্রথম দিকে, তখন শরিয়তপূরের এক ইতালী ফেরত হিরোর মটোরসাইকেলে বউ নিয়ে মিষ্টি খেতে যাবার খবর দেখেছিলাম। দেখেছিলাম, দাঁত কেলিয়ে হাসতে। সেদিন এক লন্ডন ফেরত বুড়াকে দেখলাম, হাজারো বিনীত অনুরোধ উপেক্ষা করে বেয়াদবের মতো কথা বলতে। এর আগে আরেকটা বেয়াদব বিদেশ ফেরতের সাক্ষাতকার দেখেছিলাম। হোম কোয়ারেন্টাইনে নাই কেন-জানতে চাইলে বলেছিলো, “আমি তো সুস্থ। আমি কেন ঘরে থাকব। আরেক হারামজাদা বলেছিল, “এতদিন পরে দেশে আসছি। বউ ছাড়া একলা থাকব?” ব্যাটার বালিকা বউ আবার মুখে আঁচল দিয়ে লাজুক স্বরে বলছে, “এদ্দিন পর দ্যাশে আইছে, একটা ময় মহব্বত আচে না?” আমি অন্তত এই তিন অসভ্য’র করোনায় আক্রান্ত হবার খবর দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। স্যরি, একটি গোটা দেশকে ধ্বংসের মুখে ফেলবার মতো এই ছাগলদের জন্যে মার্জিত ভাষায় লিখতে পারলাম না। আবারও দুঃখিত।
এরপর সারাদেশে যখন করোনা রোগী ১০ জনে পৌছালো, তখনও সবগুলো রোগীই ছিল প্রবাস ফেরত কিংবা তাদের পরিবারের লোক। এরপরও এদের হুশ হয়নি। গাড়লগুলো নিজেরাও মানেনি, কেউ তাদের বলেওনি, ওই দেশ হতে টেস্ট করুক, এই দেশে আসার পরে টেস্ট করুক, তাতে সুস্থ্য পাওয়া গেলেও তার ভিতরে জার্ম নিয়ে তারপরও সে পরের দিনগুলোতে অসুস্থ্য হতে পারে। এমনকি যখন সুস্থ্য ছিল, তখনও যাদের সাথে মিশবে, তাদের ভিতরে ভাইরাস সংক্রামিত হতে থাকবে। এরপরও প্রবাস হতে আসা মানুষ বুক ফুলিয়ে বলে বেড়িয়েছে, ”আমি তো সুস্থ্য। কেন কোয়ারেন্টিনে থাকব? ”মুসলমানদের এই রোগ হয় না।” ”এতদিন পরে দেশে আসছি, লোকজনের সাথে দেখা করব না?” ”এই সব ভাইরাস টাইরাস সব ভূয়া।” ইতালী ফেরত যেই মহান যুবক টিভি ক্যামেরার সামনে বারবার ” I *love this country system” বলে গালি দিচ্ছিল, তাকেও বাকি ১৪২ জনের সাথে “বাড়িতে সুবোধ বালকের মতো স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টিনে” থাকতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। আমার খুব জানার ইচ্ছে ছিল, এই বালক বাড়িতে গিয়ে কী নিদারুন কোয়ারিন্টিন করেছিল। আমি চোখ বুজে দেখতে পাই, সে দুপুরে বাড়ি গেল। গ্রামের সমস্ত ময়-মুরব্বি, ছেলেবুড়ো দল বেঁধে বাড়ি উপচে তাকে দেখতে এলো। সেও চোখ বড় বড় করে থুতু ছিটিয়ে ‘বেইমান বন্দরে’ জালিম আমলিগ সরকারের ঠোলা বাহিনীকে সে কীভাবে সাইজ করেছে, তার গল্প করেছে। ময়-মুরব্বীরা বাকশালের যুগ স্মরন করে আমলীগকে আরেকবার গালি দিয়েছে অতঃপর এই বালক লুঙ্গী পরে সারাগ্রামে আশির্বাদ বিতরন করেছে। আমাদের মেধাবী সরকারী স্বাস্থ্য প্রশাসন তো ইতালীর একখানা বাসনাওলা সাবান দিলেই বূঁদ। আর ঢাকার জাদরেল পুলিশ যার সাথে পারে নাই, গ্রামের পান্তা খাওয়া পুলিশ তো তার ফূ তেই উড়ে যাবে। যেই দেশে ৯ বছরের পোলাকে মুসলমানি দিলে সে আধাকাটা শিশ্ন নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ায়, সেই দেশের মানুষ স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টিনে থাকবে? তাও আবার এই বালকের এই দুর্দান্ত শো এর পরেও!! সেলুকাস!!
৪. গৃহবন্দী অবস্থায় অতি জরুরী খাদ্য কিনতে বাজারে গিয়েছি ২৭ তারিখ। তার বাইরে মাটিতে নামিনি। তো বাজারে গিয়ে যে চিত্র দেখলাম, তাতে নিজের ভঙ্গুর মানসিক অবস্থা একদম ভেঙে পড়ল। একজন বুড়ো ভিক্ষুক। ভিক্ষা পাচ্ছেন না। কারন বাজারে লোক নেই। করুণ চোখে তাকিয়ে আছেন। একজন সবজি বিক্রেতা। মাথায় ডাস্টবিন হতে কুড়িয়ে পাওয়া বাবুর্চিদের হেড কভার পেঁচিয়ে পরেছে, শতছিন্ন। মুখে একটা মাস্ক, গেঞ্জি কাপড়ের। সেটাকে প্রতি মিনিটে ধরছেন, খুলছেন, বিড়ি টানছেন, আবার পরছেন, কথা বলছেন। আমি ওনাকে দোষ দিই না। এই পোড়ার দেশে এর চেয়ে বেশি কিছু করা সম্ভবও না। ওনার পক্ষে সবজি না বেঁচে ঘরে থাকা সম্ভব না। দামী কার্যকর মাস্ক কেনাও সম্ভব না। পারলেও সেটা মেইনটেইন করা সম্ভব না। আর উনি ঘরে আবদ্ধ থাকলে আমাদের মতো বাবু সাহেবদের বাঁচা সম্ভব না। কাউকে বাঁচতে হলে কাউকে এই মহামারিতে মরতেই হবে। নিষ্ঠূর বাস্তবতা। যশোরে মাস্ক না পড়ায় দুই মুরব্বীকে এসি (ল্যান্ড) কান ধরিয়ে ওঠবস করিয়েছেন। যদি ওই বৃদ্ধরা তাকে প্রশ্ন করতেন, মা জননী, মাস্ক কোথায় পাব, আপনার সরকার কত পিস মাস্ক বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন, সবতো আপনারা ৮ তারিখের রাতেই স্টক করে ফেলেছেন, ওই এসি (ল্যান্ড) বা তার সরকারের কী উত্তর থাকত? তাকে প্রত্যাহার নামক মহাহাস্যকর এক সাজা দেয়া হয়েছে। ওই মহিলা বরং উপকৃতই হয়েছেন। এখন আর বনে বাদাড়ে ঝুঁকি নিয়ে বের না হয়ে আরামে অফিসে বসে থাকতে পারছে। সরকারী চাকরীতে শাস্তি নামের এই হল মজা। ছুটি কাটাতে চাও, কোনো একটা অপকর্ম করো। ব্যাস, সরকারই তোমাকে ছুটিতে পাঠিয়ে দেবে, যার নাম ’প্রত্যাহার’, ‘ক্লোজড’, ‘সংযুক্ত’। হ্যা, ওনার কাজের বিনিময়ে আবার আমাদের ফেসবুক ক্রূসেডাররা তাকে যেই ভাষায় আক্রমন করেছেন, সেটাও ভদ্রলোকেরা করে না। একজন ব্যাংকার চুড়ান্ত অশ্লীল ভাষায় ফেসবুকে তাকে রেপ করার হুমকী দিয়ে গ্রেফতারও হয়েছেন।
এই দুর্যোগের মধ্যেই এক ওসি সাহেব জনগনের জন্য মাগনা মাস্ক বিতরনের মহান ব্রত পালনে ফান্ড জোগাড়ের মহান নিয়তে এক আসামীকে ঘুষ চেয়ে না পেয়ে মেরে রশিতে ঝুলিয়ে দিয়েছেন। ওসিকেও ‘প্রত্যাহার’ ও ‘সংযুক্ত’ করা হয়েছে। সরকারী সিস্টেমটাই একটা মজা। হুমায়ুন আহমেদের একটি গল্পে পড়েছিলাম। ঘরের কর্তা একদিন অফিসে গিয়ে রাতে আর ফিরলেন না। দুই দিন পার হবার পরে বাসা হতে থানায় গেল। থানার অফিসার একটি জিডি করতে বলল। করার পরে বলল, ”আপনারা এবার বাসায় যান। আমরা ’ব্যবস্থা নিচ্ছি।” তা ১৪ দিন পার হয়ে যাবার পরও ভাইকে না পেয়ে ছোট ভাই একদিন দারোগাকে রেগেমেগে জিজ্ঞেস করল, “আপনারা না বললেন, ব্যবস্থা নিচ্ছেন। তাহলে ভাইকে কেন পেলেন না?” দারোগা তাকে বলল, ‘ব্যবস্থা বলতে আপনি কি বুঝেছেন? আপনি জিডি করলেন, আর আমরা আপনার ভাইয়াকে রাস্তায় রাস্তায় ছবি নিয়ে খুঁজব? আরে আমাদের ’ব্যবস্থা’ মানে হল, আপনি একটা জিডি করবেন। তারপর আমি সেই জিডির কাগজটার কোণায় লিখে দেব, এস.আই অমূক, ’ব্যবস্থা’ নিন। ব্যাস, তিনি ওই জিডিটি তার বালামে তুলবেন আর তারপর ফাইলে সুন্দর করে গুছিয়ে রেখে দেবন।” এটাই হল ব্যবস্থা। আমরা তো সেটা করেইছি।
তো, রাজকর্মচারীদের করোনা নিরোধী ‘ব্যবস্থা’টাও ছিল এমনই। পাবলিক কেবল বুঝতে ভুল করেছে। IEDCR বলেছে, নতুন করে কেউ ‘সনাক্ত’ হয়নি। পাবলিক ভুলে শুনেছে, নতুন করে কেউ ‘আক্রান্ত’ হয়নি। পাবলিক ভুল বুঝলে তার দায় তো আর IEDCR এর না। শুনেছি, ইরাক ও আরও কিছু দেশে একসময় একটা বর্বর প্রথা চালু ছিল। তা হল, বাসর রাতে বিছানায় সাদা চাদর বিছানো থাকবে। প্রথম সহবাসে নববধূর সতিচ্ছেদ পর্দা (আসলে হাইমেন নামের অতি পলকা একটি তুচ্ছ জিনিস) টুটে গিয়ে বিছানায় রক্তপাত হবে আর তার পরদিন সকালে সেই রক্তাক্ত সাদা বিছানার চাদর লগিতে বেঁধে ঘরের ছাদে উড়িয়ে এলাকার সবাইকে সগর্বে জানান দেয়া হবে, যে, নববধূ কুমারী। আমাদের আসলে সার্বিক উৎসব উৎসব পরিবেশ ও লাইফস্টাইলে মনে হচ্ছে, আসলে আমরা কিছু একটা দেখানোর চেষ্টায় বেশি মত্ত আছি। এবার বলি আমাদের অতি সচেতন ও দেশপ্রেমিক রাজনাগরিকদের কথা। বলেছিলাম, বিংশ শতাব্দির সবচেয়ে বড় ব্লাফ হল, আমাদের হাজার হাজার নাগরিকদের স্বেচ্ছা কেরেনটিন। এই কেরেনটিনের নমূনা তো দেখেছেনই। আমাদের বিদেশ ফেরতরা শপথ করেছিলেন, তারা আর ঘরে আবদ্ধ থাকবেন না। তারা এবার সারাদেশটা ঘুরে দেখবেন। মুসলমানি হলে সারা এলাকার মানুষ যেমন ওই সদ্য শিশ্ন কর্তিত অর্বাচিনকে দেখতে আসে, আর এসে তার কর্তিত শিশ্ন দেখে ১০০ টাকার নোট দিয়ে যায়, তেমনি কয়েকদিনের মধ্যে খবর পাবেন, করোনা আক্রান্ত বা বিলাত ফেরত হবু করোনাকে দেখতে এসে পুরো ৫০ টাকার নোটই দিলেন বরিশালের ক্যাতুর আলি।
একবার একটা লেখায় বলেছিলাম, বাংলাদেশে জীবন দান না হলে কোনো কিছুই অর্জিত হয় না। করোনায় কতজন মরলে আমরা কোনো কার্যকর কিছু ব্যবস্থা নেব কে জানে। হয়তো এবারও কাদম্বিনিকে মরিয়া প্রমান করিতে হইবে, যে, সে মরিয়াছে।
৫. একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন। একটা আস্ত পৃথিবী, এর সমস্ত দেশ, সমস্ত কর্মযজ্ঞ, উৎপাদন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, যুদ্ধ, রাজনীতি, ক্রীড়া-এক কথায় পুরো পৃথিবী থমকে আছে, থাকবে অনেক মাস। এর পরিণতি কী হবে-তা কল্পনারও বাইরে। যদি মহাকাশ হতে দেখতাম, হয়তো দেখতাম, পৃথিবীটা তার গতি হারিয়ে স্থীর হয়ে দাড়িয়ে আছে এক জায়গায়। কক্ষপথে তার আবর্তন বন্ধ। এই মহামারির কিছু ডোমিনো এফেক্ট বলি।
এক; করোনায় যত লোক সরাসরি মারা যাবে, তারও চেয়ে বেশি লোক (হয়তো) অর্থনীতির পতনে। সারা বিশ্বের (চীন বাদে) অর্থনীতি ধ্বসে না পড়লেও প্রতিটি রাষ্ট্রের জিডিপির বিশাল অংশ পতন ঘটবে।
দুই; চাকরি হারাবে অকল্পনীয় সংখ্যক মানুষ। শুধু হারাবে না। সহসা চাকরী পাবেও না। কারন প্রতিটি কোম্পানীরই করুন দশা। বাংলাদেশে তার সাথে আগে হতেই ৪.৮ কোটি বেকার আছে।
তিন; দুর্ভিক্ষ দেখা দেবার সমূহ সম্ভাবনা আছে। যা জাতিসংঘও আশঙ্কা করেছে।
চার; খুব ব্যতিক্রম বা মিরাকল কিছু না ঘটলে, বাংলাদেশে ৫ম হতে ১০ম সপ্তাহের ভবিষ্যদ্বানী যদি ধরি, তাহলে, একটা টোটাল কলাপ্স ঘটতে পারে। কারন, ভাইরাসটির বাস্তবতা হল, প্রতিজন আক্রান্ত হলে তার সংস্পর্শে আসা প্রত্যেককে কোয়ারেন্টিন করতে হচ্ছে। যে হারে ডাক্তাররা সংক্রামিত বা রোগীদের কারনে কোয়ারেন্টিন হওয়া শুরু করেছে, আর তাদেরকে যেভাবে কোনোরকম প্রোটেকশন ছাড়া রোগীর সামনে তথা বাঘের খাঁচার সামনে ফেলে দেয়া হচ্ছে, তাতে দাবানল শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের ১ লক্ষ ডাক্তারের ৫০%ই বিনা কারনে কোয়ারেনটাইনড হয়ে যেতে পারে। পুলিশ, সেনাবাহিনী আক্রান্ত হলে তারাও ঘরে পরে থাকবে। মন্ত্রী, আমলা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হাসপাতাল, ওয়াসা, খাদ্য চেইন, ওষুধ সরবরাহ ও উৎপাদন, সিকিউরিটি সিস্টেম, মিডিয়া-প্রত্যেক স্থানেই তো সংক্রমন হবে। আর তারা আবার তাদের সাথের লোকদের সংক্রমিত করবে। ফলাফল-পুরো দেশের সব সিস্টেম ফ্রিজ। [হয়তো হবে, হয়তো না।]
পাঁচ; আমাদের সবেধন নীলমনি গার্মেন্টস সেক্টর অলরেডি ২৮০ কোটি ডলারের মতো অর্ডার লস করে ফেলেছে। আরও করবে। আর সেটাতো কেবলমাত্র ইউরোপ, আমেরিকার মার্কেটে এখন মহামারি হওয়ায়। এরপর যতক্ষণে ওরা স্বাভাবিক হবে, তখন তো তাদের প্রোডাক্ট লাগবে। তখন আবার আমাদের কারখানা মহামারিতে বন্ধ। সব মিলিয়ে কত মাস কারখানা বন্ধ রাখতে হতে পারে? আপনার কি মনে হয়? এই লস কাটিয়ে ফেরত আসার মতো ক্ষমতা আমাদের আছে? তাছাড়া, ওই আমাদের অক্ষমতার সময়টাতে অর্ডার বাগাবে চায়না, ভিয়েতনাম, বার্মা, ক্যাম্বোডিয়া। ইয়ে, ওখানে কিন্তু তেমন ইমপ্যাক্ট হয়নি। তারা রেডি।
ছয়; আমরা যতদিনে দুর্যোগ কাটিয়ে ফিরব, ফেরার পরে খোদা না করুন, দেখব, বাংলাদেশে যেমন ৭১ সালের যুদ্ধের পরে প্রতিটি বাড়িতে একজন তরুন শহীদ ছিল, তেমনি, আজ ২০২০ সালে প্রতিটি পরিবার এতিম, প্রতিটি ঘরের বাবা-মায়েরা সবাই পরপারে। এতিম হব আমরা জাতিগতভাবে। রিজভান ভাই বলছিলেন, ইতালী হয়তো ইচ্ছে করেই তার বয়োজেষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে মরতে দিল। যাতে পেনশনের বিশাল বাজেট সাশ্রয় করা যায়। অসম্ভব না।
৬. চীন একটি গুটি চালল কিনা-তা নিয়ে বিস্তর জল ঘোলা হচ্ছে। শুরুতে যেসব মর্দে মুমিন করোনাকে চীনের প্রতি আল্লহ’র গজব বলেছিলেন, তারা মাঝখানে একটু দমে গেলেও নতুন এই কনসপিরেসি থিওরী ফিরে পেয়ে নতুন উদ্যমে নেমে পড়েছেন। ট্রাম্পের আম্রিকা তার সিআইএ কে দিয়ে কোনো ষড়যন্ত্র করল কিনা-সেই কনসপিরেসি থিওরীও হালে পানি পাচ্ছে। বেইজিং ও সাংহাইয়ে কাতারে কাতারে কেন লোক মরল না, কেন জিনপিংয়ের করোনা হলনা-সেটা একদলকে ভাবাচ্ছে। আবার ট্রাম্প কী করে ট্রিলিয়ন ডলার ইনসেনিটিভ দিল-তাও ভাবাচ্ছে।
শুরু হতে আজ পর্যন্ত পুরো দুর্যোগটিতে চীনের ভূমিকা ও ইনটেনশন নিয়ে গুঞ্জন ও রহস্য থামছে না। একদল মানুষ তো নাকি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে রীতিমতো ক্ষতিপূরনের মামলা ঠুকে দিয়েছেন চীনের বিরুদ্ধে। একটা কথা তো সত্যি। চীনে একদম প্রথম যখন ভাইরাসটি সনাক্ত হয়, একজন ডাক্তার সেটি কর্তৃপক্ষের নজরে আনার চেষ্টা করলেও কর্তৃপক্ষ উল্টো তাকেই হয়রানি করে। তারপর যখন বিষয়টি দিনের আলোর মতো অপ্রতিরোধ্য সত্য আকারে দেখা দেয়, তখনও চীনা সরকার ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। গুরুত্ব দিয়েছে বেশ দেরী করে। উহান হতে সারা বিশ্বে এই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার দায় চীন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কিন্তু সত্যি সত্যিই চীন এই ভাইরাসটি ইনটেনশনালি সৃষ্টি বা ছড়িয়ে দিয়েছে কিনা-সেটা গবেষনার বিষয়। ইতোমধ্যেই ভাইরাসটি যে ল্যাবে সৃষ্ট না-সেটি প্রায় নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র’র বিজ্ঞানীরা। যদিও চীনকে এমন এক হাত নেবার সুযোগ কেন ট্রাম্প হাতছাড়া করল জানি না। হতে পারে, নিজের মোজার গন্ধ দ্রূত ঢাকা দিল। তবে ল্যাবে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট না হলেও, সেটি যে বিনা ইনটেনশনে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াতেই সংক্রমন ও প্রসারন হয়েছে-সেটি পৃথিবীবাসী বোধহয় কখনোই বিশ্বাস করবে না। না করার কিছু খটকাও আছে। ইতোমধ্যেই করোনা দুর্যোগের ভয়াবহতা, গোটা বিশ্বের তুমুল অর্থনৈতিক বিপর্যয়, মানবিক পরাজয়, আর তার বিপরীতে মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই সূতিকাগার চীনের একদম ধুয়ে মুছে গোটা বিশ্বকে পাদ্রি বাবার মতো করে সাহায্যের হাত বাড়ানোর ঘটনা সংশয়বাদীদের সন্দেহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। খবর যা জানা যাচ্ছে, করোনা পরবর্তি বিশ্বে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ইস্যূতে চীন বিশ্বমোড়লে পরিণত হতে পারে-এমন ধারনাও ডালপালা মেলছে। গোটা বিশ্ব যখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন এই ৯০ দিনে চায়নার অর্থনীতির প্রায় অটল থাকার সুখবরও মানুষকে সন্দিহান করছে। যদিও আসলে এমন একটি ভয়ঙ্কর খেলা কোনো সভ্য দেশ করবে বা করার মতো সাহস করবে-সেটি এত সহজে বিশ্বাস করা কঠিন। সত্যাসত্য সময়ই বলে দেবে।
৭. যুক্তরাষ্ট্র, ইতালী ও ব্রাজিলের মাথামোটা নেতাদের দায় নিয়ে একটু বলি। পৃথিবী জুড়েই বিগত অন্তত ১০ বছরে দেশে দেশে এক্সট্রিমিস্ট বা উগ্র জাতীয়তাবাদপন্থিদের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার হার বেড়েছে। উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আজ হুমকীর মুখে। তদুপরি গতানুগতিক কল্যান রাষ্ট্র, গণতান্ত্রীক সরকার পরিচালনার ধারনা হতে সরে এসে সরকারগুলো গণতন্ত্রের ছদ্মাবরনে স্বৈরতান্ত্রীক সরকার চালানোয় বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। জনগনের সাথে তাদের সম্পৃক্ততা, জনগনের সেন্টিমেন্টকে শ্রদ্ধা করা এবং জনমতকে প্রাধান্য দিয়ে সরকার চালানোর টেনডেনসি অনেক কম। জনগন, মিডিয়া ও রাষ্ট্রের অন্যান্য সেফগার্ডকে পাশ কাটিয়ে নিজ নিজ খেয়াল মতো রাষ্ট্র পরিচালনার প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে দৃশ্যমানভাবেই সরকারের সাথে জনগনের দূরত্ব বাড়ছে। সরকারের প্রতি জনগনের আস্থা, বিশ্বাস, ভরসা কমছে। শুধু ইতালীর কথাই যদি বলি, চীনের চলমান ভয়াবহতা হতে ইতালী সরকার বিন্দুমাত্র শিক্ষা নেয়নি। যথেষ্ট সময় পাওয়া সত্ত্বেও নেয়নি কোনো আগাম প্রস্তুতি। বরং সবদিক দিয়ে করোনার হুমকীকে একরকম তুচ্ছতাচ্ছিল্যই করে গেছে ইতালীর ক্ষমতাসীন সরকার। জনগনকেও তারা আশকারা দিয়ে গেছে ড্যামকেয়ার হয়ে চলতে। ফলাফল আজকে ইতালী হাতে হাতে পেয়েছে। করোনার ছোবলে ইতালী শশান হবার যোগাড়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই কয়েকদিন আগেও বুক চাপড়ে বলেছিলেন, “লকডাউন হবার জন্য আমেরিকার জন্ম হয়নি।” আজকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট রোগীর সংখ্যা চীনকেও ছাড়িয়ে গেছে। সেদেশের জনস্বাস্থ্য প্রধান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, মৃতের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
৮. রাজকীয় কর্তৃপক্ষের মেধা, প্রস্তুতি ও সক্ষমতা: ৮ তারিখের অফিশিয়াল সংক্রমণ হতে আজ ২৯ তারিখ। এই ২২ দিনের পরে, গত ৯০ দিন ধরে সরকার যে বলে এসেছে, “আমরা প্রস্তুত”, তার নমুনা হল, এক, ডেডিকেটেড করা হাসপাতালের ৩টি গতকাল বলেছে, তারা রেডি না, বা কেউ কেউ রাজি না। দুই, যদি অন্তত ২৫,০০০ ডাক্তার ও সমসংখ্যক স্টাফ মানে ৫০,০০০ জন মেডিক্যাল কর্মী আগামী ৯০ দিন করোনার জন্য ডেডিকেটেডলি কাজ করতে হয়, তাহলে প্রতি ১ দিনে তাদের পিপিই লাগবে ৫০ হাজার পিস, মাস্ক ৫০ হাজার পিস ও অন্যান্য সব আইটেম সমান সংখ্যায়। এভাবে ৯০ দিনে প্রতিটি আইটেম লাগবে ৫০,০০০ X ৯০ = ৪৫,০০,০০০ পিস। তা, কত পিস বর্তমানে মজুদ আছে? কত সপ্তাহ চলবে সেটায়? বাকিটা কত দ্রূত আনতে সক্ষম সরকার? ’পিপিপি’তেই তো ডাহা ফেল। বেসরকারী উদ্যোগে কিছু ’পিপিপি’ না বানালে তো ডাক্তার বন্ধুরা আজও পলিথিন গায়ে দিয়ে রনাঙ্গনে থাকতেন। তিন, আক্রান্ত বা লক্ষণাক্রান্ত রোগীরা ঠিক কীভাবে টেস্ট করানোর সুযোগ পাবেন, বা তিনি বেশি অসুস্থ্য হলে কীভাবে হাসপাতালে ঠাই পাবেন, এখনো কেউ জানে না। রোগী মরে যাবার পরে ফেসবুকে তোলপাড় করে তারপর IEDCR এর কানে পানি যাওয়াতে হচ্ছে। কালও মোহাম্মদপুরে এক নারী মারা যাবার ১৭ ঘন্টা পরে IEDCR কে গরম লাইনে রিচ করা গেছে আর তারপর তারা মৃত ব্যক্তির স্যাম্পল নিয়েছে। করোনা আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা গেছেন কি যাননি, সেই সন্দেহে তার জানাযা বা স্বজনরা দাফনে অংশ নিতে পারেননি। ১৭ ঘন্টা পঁচেছে লাশ। কাল হয়তো জানা যাবে, তিনি করোনায় মারা যাননি। মাঝখান হতে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা তো ঘটেই গেল। জীবিতরা সুযোগ না পেলেও, মরে গেলে খুব দ্রূত সুযোগ হচ্ছে টেস্টের। সম্ভাব্য রোগীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। একবার হটলাইন, একবার হাসপাতাল, একবার IEDCR যাচ্ছেন। কেউ টেস্ট করার দায়ীত্বও নিচ্ছে না, ভর্তিও নিচ্ছে না। আর এই ফাঁকে হয় সে মরছে, নয় রাস্তায় ঘোরার সময় আরও ৫০ জনকে ইনফেক্ট করছে। পাশের বাসায় কারও জ্বর শুনলে কেউ এখন উঁকি দিয়েও দেখছে না। IEDCR বলেছে, করোনায় মারা যাওয়া সবাইকে তারা দাফন করবে। তা যদি ইতালীর মতো হাজারে হাজারে মরতে শুরু করে, IEDCR এর সক্ষমতা কতটা আছে সামাল দেবার? আর গ্রামে গঞ্জে তো IEDCR নেই। সেখানে কে দাফন করে দেবে? কার কাছে যাবে মানুষ? কালকে দেখলাম, সিলেটে রাস্তায় অন্য রোগে পড়ে থাকা এক ফিনল্যান্ড নাগরিককে পাবলিক ধরে এ্যাম্বুলেন্সে ওঠাতে চাইছে না। পুলিশ ঠেলছে ড্রাইভারকে, ড্রাইভার ঠেলছে পাবলিককে, পাবলিক ঠেলছে পুলিশকে। আহা বাংলাদেশ।! এখনই এই অবস্থা। খেলাতো এখনো শুরুই হয়নি। আসলে আমাদের দেশের সরকারগুলো ’৭১ সালের পরে বিগত ৪৯ বছরে এমন অভিনব ও অদৃষ্টপূর্ব কোনো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি। এবং সত্যি সত্যিই এবার সরকারের সার্বিক সক্ষমতাকে সত্যিকারের কোনো পরীক্ষায় নামতে হয়েছে। এর আগে সরকারকে কখনো এতটা খোলাখুলিভাবে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করেনি কোনো ইস্যূ। এবারই প্রথম। এবং এটাই চরম ও অদৃষ্টপূর্ব। যার সাথে পরিচয় নেই সরকারেরও।প্রতিদিন IEDCR ও সরকারের মন্ত্রণালয় যা বলছে, তাতে মানুষ বিন্দুমাত্র আস্থা রাখতে পারছে না। কথা মানাতো দূর কি বাত। তার কারনও আছে। একে তো, গত ৯০ টি দিন “আমরা প্রস্তুত আছি” বলার পরে তার প্রমাণ জাতি হাতেনাতে দেখছে। কীট নেই, ওষুধ নেই, মাস্ক নেই, হাসপাতাল রেডি নেই, কে কী করবে, কোথা হতে খাদ্য যোগান কাকে দেয়া হবে, কিছুর ঠিক নেই। বিশ্বাস তো আর আকাশ হতে আসবে না। তদুপরী, দুনিয়াতে কেউই রাজনীতিবীদদের বিশ্বাস করে না। এর ফলে, আমাদের নেতারা, রাজনীতিকরা, আমলারা চাইলেও জনগন তাদের কথায় আর নাচবে না। তাদের দিকনির্দেশনা শুনবে না। যতটা শুনছে, তা নেহায়েত ডান্ডার ভয়ে। ফলে, চায়নার মতো লকডাউনও এদেশে হবে না। জাপানের মতো আত্মনিয়ন্ত্রণও হবে না। রাজনীতিকরা নিজেদের হীন স্বার্থে অনাস্থা, অনৈক্য, বিভেদ ও অবিশ্বাসের যেই বিষবৃক্ষ লাগিয়েছেন, তার ফল ফলছে। আবার বিপরীতে, আমাদের দেশের জনগনের যে ভয়াবহ জাতিগত কোয়ালিটি ও নীতি, তাতে এমন সরকারই আমাদের ভবিতব্য হওয়া উচিত। আমরা তো আর ট্রূডোর মতো প্রধানমন্ত্রী আশা করার অধিকার রাখি না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাই দশ হাত দিয়ে সামলাচ্ছেন অসম এই যুদ্ধ।
৯. প্রতিদিন অনুরোধের আসরের মতো করে অত্যন্ত হাস্যকর সংখ্যক টেস্ট করে IEDCR করোনাকে ভালই সামাল দিচ্ছে। টেস্ট নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হেঁদিয়ে মরলেও তারা মনে হচ্ছে কানে তুলো দিয়েছেন। বদ লোকেরা একটা গল্প বলে। কাক যখন সাবান চালের ভিতরে লুকায়, নিজের চোখ বন্ধ করে রাখে। ভাবে, এতে কেউ সাবানের খোঁজ পাবে না। কিন্তু অন্যরা পাক বা না পাক, যখন সে নিজেই সেই সাবার খুঁজতে যায়, তখন নিজেই আর খুঁজে পায় না। ডাটা ম্যানিপুলেট করে কি আসলে কেয়ামত আটকানো যাবে? অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না। একটা ভুলভুলাইয়া বা বুবি ট্র্যাপের গল্প বলি। মনে করুন, আপনার জ্বর, সর্দি, মাথাব্যথা, কাশি শ্বাসকষ্ট হয়েছে। আপনি মোটামুটি বুঝতে পারলেন, আপনার কোভিড১৯ পজেটিভ হবার প্রবল সম্ভাবনা। এখন আপনি প্রথমেই নিশ্চই IEDCR এর ‘হট’ লাইনে ফোন দেবেন। ২৫০ বার চেষ্টার পরে তাদের পাবেন। তারা আপনাকে যথারীতি ধুনপুন বোঝাবে। বড়জোর কিছু ওষুধ সাজেস্ট করবে। বাসায় থেকে রোগ আরো সিরিয়াস হবার অপেক্ষায় থাকতে বলবে।
ধরুন, ৭ দিন পরে আপনার অবস্থা খারাপ হল। ’হট’ লাইনে ফোন দিয়ে আর পেলেন না। পাশের বাসার বা দারোয়ানকে বললেন, একটা রিক্সা ডেকে দিতে বা এ্যামবুল্যান্স। ব্যাস। সারা পাড়ায় ছড়িয়ে গেল। আপনার করোনা। ব্যাস লোক জমে গেল। পুলিশ খবর পেয়ে এসে বাড়ি লক ডাউন করে দিল। ব্যাস, আপনি আর বাড়ির বাইরে হাসপাতালে যেতে পারবেন না। ডাক্তার দেখানো বা ওষুধ কেনা বন্ধ। কে কিনে দেবে? পুলিশ? তারাতো তালা দিয়ে শেষ। এলাকাবাসী? তারাতো দাড়িয়ে থেকে এনশিওর করবে, এই গজবপ্রাপ্ত বাড়ি হতে যাতে কেউ আগুন লাগলেও বেরোতে না পারে। প্রতিবেশী? সে তো বহু আগে আপনার সাথে মুখ দেখা বন্ধ। IEDCR কে ফোন করবেন? ‘হট’ লাইনের চক্করে আপনার ধৈর্য শেষ। কেউ ফোন ধরবে না। ভাগ্য ভাল হলে মরার ১৭ ঘন্টা পরে ধরতেও পারে (লালমাটিয়া কেস)। IEDCR ও ঘরে নিল না, কোনো ব্যবস্থা করল না, কোনো হাসপাতালে যেতে পারবেন না, কেউ আপনাকে বের করে নিয়ে যেতে পারবে না। তো আপনি করবেনটা কী? তাহলে? ঘরে আরও অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষ কী করবে?
ছোটবেলা হতেই আমরা একটা কথা শুনতাম। সেটা হল, কোথাও লঞ্চডুবি হলে, বা বাস খাদে পড়ে লোক মরলে, ডুবুরিরা পানির তলায় গিয়ে নাকি লাশের পেট কেটে দূরে ভাসিয়ে দেয়, যাতে লাশ কম দেখানো যায়। মাত্র হাজার খানেক টেস্ট করে ৪৮ জনকে সনাক্ত পেয়ে, তার মধ্যে আবার ম্যাজিকের মতো ১৫ জনকে অলরেডি সুস্থ করে বাসায় ফেরত পাঠানো দেখিয়ে সরকার ঠিক কী করতে চাইছেন-তা আল্লহ আর সরকারই জানে। নো টেস্ট নো করোনা-এই যদি হয় নীতি, তাহলে অন্তত জনগনকে সেটা পরিষ্কার করে দিলে, আর কিছু না হোক, আমাদের এ্যাম্বুলেন্সে করে ঘুরতে হয় না, আর লিখে লিখে আমাদের এমবিও অপচয় করতে হয় না। সারাটা দেশ, এমনকি WHO পর্যন্ত হেঁদিয়ে মরছে টেস্ট বাড়াতে। IEDCR নির্বিকার। যাহোক। একটা বিপরীত ভাবনা। সেটা হল, সরকার যদি সত্যিই ডাটা ম্যানিপুলেট ও টেস্ট সেন্সরড রেখে রোগী ও এপিডেমিক কম দেখাতে চাইত [খুব স্বাভাবিক, কারন সারা পৃথিবীতেই সরকার ডাটা ম্যানিপুলেট করে। আর জানাই তো আছে, স্ট্যাটিসটিকস ইজ দ্যা বিগেস্ট লাই।]
তার বিপরীতে, গত আট মার্চ যদি সত্যিই প্রথম সংক্রমন হয়ে থাকে, তাহলে এই বাইশ দিন পরে কিন্তু ভাইরাসের ডিম ফুটে যাবার কথা আর তাহলে কিন্তু হাসপাতালগুলোতে করোনা সনাক্ত না হোক, হাজার হাজার নিউমোনিয়ার রোগী আসত, একিউট শ্বাসকষ্ট নিয়ে, আর চিকিৎসার জন্য বা চিকিৎসা না পেয়ে হাজারে হাজারে কেস মিডিয়া ও ফেসবুকে আসত। অন্তত এই যুগে ফেসবুকের কল্যানে এই খবরগুলোতো আসত। সেটা কিন্তু ঘটতে দেখছি না। সেটাতো সত্যি। [তবে এই বিষয়ে পারফেক্ট কথা বলার সময় এখনো হয়নি। করোনার ট্রেন্ড/সাইকেল বিবেচনায় নিলে, সিভিয়ার সংক্রমন হবার কথা এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ হতে। ২৮ ও ২৯ মার্চ খবরে দেশের কয়েকটি স্থানে অজ্ঞাত শ্বাসকষ্টে রোগী মরার খবর বেড়েছে দেখলাম। সুহৃদ মাযহারের লেখায়ও আজ পড়লাম, হাসপাতালগুলোতে অন্যান্য বছরের চেয়ে নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে রোগী আসার হার বেড়েছে। যদিও এই লেখাতে অন্যত্র আমি বলেছি, সেটা হতে পারে নানা কারনেই। মানুষ বেশি সচেতন ও খবর এ বছর বেশি রাখা হচ্ছে-সেটাও হার বৃদ্ধির কারন হতে পারে। কিংবা আবার মানুষ পাবলিকের ঘৃনাজনিত সহিংসতার ভয়ে হাসপাতালে কম আসছে বিধায় প্রকৃত সংখ্যা আরও কম দেখা যাচ্ছে-সেটাও হতে পারে। আসলে ওই যে বললাম না? মিথ্যার চোরাবালি একবার পয়দা করলে, সেটাতে পয়দাকারী ও শিকার-উভয়েই আটকা পড়ে।]
হ্যা, দেশে করোনা রোগীকে যেভাবে নেগেটিভলি সিফিলিস বা এইডস রোগীর মতো ভীতিকর ও ঘৃন্য করে প্রচার করা হয়েছে এবং জনমানুষের কাছে যেই থীম, প্যানিক ও হেটারড সৃষ্টি করা হয়েছে, তাতে পাবলিকের পিটুনি, বাঁধা, সোশ্যাল ভায়োলেন্সের ভয়ে অনেকে হয়তো করোনার লক্ষণ নিয়ে ভয়েও হাসপাতাল যাচ্ছে না বা ডাক্তারকে বলছে না।
১০. ভাবছেন, আমি সরকার বিরোধী হয়ে গেলাম কিনা। নাহ, আমি মোটেই তা করতে চাই না। চলমান পরিস্থিতির দায় সরকারের একার না। আর আমি কখনোই কোনো একক সত্বার সমালোচনা করিনা। সেটা আমার চরিত্রে একদম নেই। তাছাড়া, দুনিয়ার সব দেশই সমস্যা সামলাতে খাবি খাচ্ছে। আমাদের সরকার নিশ্চই কোনো যাদুর চেরাগ নিয়ে বসে নেই। তদুপরি আমরা একটি গরীব দেশ। সীমাবদ্ধতা থাকবেই। আমি এই লেখায় আসলে আমাদের সবার দায় নিয়ে কথা বলছি। দেশের সব স্কুল ছুটি দিতে দাবী উঠল। প্রধানমন্ত্রী কিছুটা সময় নিলেন। তারপর ছুটি হল। পাবলিক সুন্দর করে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে করোনা অবকাশ কাটাতে গেল। টিভির পর্দায় তথাকথিত শিক্ষিত এক পুরুষ আর তার স্বামী গর্বে গর্ভিত বউয়ের ক্যালানো হাসি এখনো চোখে ভাসে। [ওদের কি করোনা ছুঁতে পারবে?] রোগ আরও ছড়ালো। পাবলিক অফিস ছুটি চাইল। অচীরেই প্রধানমন্ত্রী খুব যৌক্তিক একটা উপলক্ষ্য করে কসট ইফেকটিভভাবে ছুটি দিলেন ১০ দিন। পাবলিক সব করোনাকে বুড়া আঙুল দেখিয়ে ঝাঁক বেঁধে বাসে, লঞ্চে, ট্রেনে ঈদ যাত্রা করে করোনাকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিল। করোনা মোকাবিলায় সরকারের ছুটি ঘোষণার পর ১ কোটি ১০ লাখ মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ঢাকা ছেড়েছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন ৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষ, যাঁরা বিদেশ থেকে দেশে ফিরছেন। মোবাইল ফোন অপারেটরদের তথ্যের ভিত্তিতে ন্যাশনাল টেলিকম মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষ নিজেদের এলাকায় যেয়ে পুরো কমিউনিটি সহ করোনা ঝুকিতে ফেলেছেন । তাহলে ভাবুন একবার, পরিস্থিতি কি হতে পারে সামনের দিনগুলোতে?
ঢাকা হতে বাড়ি যেতে যেতে এরা লক্ষ লক্ষ সংক্রমন ছড়িয়ে দেবার ও শহর হতে সংক্রমন দ্রূত গ্রামে নিয়ে যাবার সব ব্যবস্থা করল। কিছু করার নেই। কিন্তু সরকারের মেকানিজমে ভুল যেটা ছিল, তা হল, আগে গণপরিবন লক না করে ছুটি দেয়া। আমার চিন্তা হল, ৪ এপ্রিল ১০ দিনের প্রাথমিক সাধারন ছুটি শেষ হবে। যদি ৫ তারিখ হতে অফিস খোলা হয়, তাহলে ৩ ও ৪ তারিখে আবারও ১.৫ কোটি মানুষ দলে দলে গ্রামের করোনাকে এবার ঢাকায় নিয়ে আসবে। ষোলোকলা পূর্ন হবে। তাই এখনই ঠিক করতে হবে, ৫ তারিখ অফিস খোলা হবে? গ্রাম ও শহর একাকার হতে দিয়ে? জানি না, সরকার কী সিদ্ধান্ত নেবে। [*১১ তারিখ পর্যন্ত বাড়ানো হল আজ।] গার্মেন্টস কেন ছুটি হচ্ছে না-তা নিয়ে ছুটির আগের কয়েকদিন খুব ঝড় হল। বিজিএমইএ বসে ছিল, সরকার কিছু বলে কিনা, কিছু দেয় কিনা-সেই আশায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রনোদনা ঘোষনা দেবার পরদিন ছুটির সিদ্ধান্ত হল। গার্মেন্টস বন্ধ হল। আপাতত ৪ তারিখ পর্যন্ত। যদিও সবাই বন্ধ না। এখানে কয়েকটা কথা বলার আছে।
এক; আমাদের যে আগামী তিন মাসে লক্ষ লক্ষ পিপিই ড্রেস ও উপযুক্ত মাস্ক, টেন্ট লাগবে সেটাতো নিশ্চিত। বিদেশ হতে এগুলো এত পরিমানে পাওয়া যাবে না-তাও নিশ্চিত। এখন পিপিই কে বানাবে? বানাতে হলে গার্মেন্টস তো খোলা রাখতে হবে। হ্যা, ইনটেনসিভ প্ল্যান ও সমন্বয় করলে অনেকগুলো গার্মেন্টস কারখানায় সীমিত শ্রমিককে অনেক দূরত্বে দূরত্বে বসিয়ে সাবধানতার সাথে এই কাজটা করা যায়। পুরো সেক্টর খোলা না রেখেও।
দুই; এমনিতেই এই সময়ে প্রায় ২৮০ কোটি ডলারের অর্ডার লস হয়েছে। আরও হবে। এই লসের মধ্যে বেতনের অংশের কিছুটা সরকার হতে হয়তো মিলবে। কিন্তু এলসির বিপরীতের যে লোন, সেটা পুরোটাই লস। যার পরিমান অচিন্তনীয়। এখন যদি গার্মেন্টস বন্ধ করে দিতে হয়, তাহলে রানিং সামান্য যে অর্ডার আছে, সেটাও গেল। আগেরগুলো তো গেলই। কতটা লস টানতে সক্ষম একটা কারখানা? যারা গার্মেন্টস ব্যবসার গভীরটা জানে না, তারা বুঝবে না।
তিন; গার্মেন্টস বন্ধ হলেও কিন্তু আরও অন্যান্য সেক্টরের অনেক কারখানা খোলা থাকবে। সুতরাং শুধু গার্মেন্টস বন্ধ করে পুরো আইসোলেশন ও ফিজিক্যাল ডিসট্যান্স নিশ্চিত হল না।
চার; এত কিছুর পরও, আমি ব্যক্তিগতভাবে কারখানা বন্ধ ঘোষনার পক্ষের মানুষ। মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা সবার আগে। এই শ্রমিকরাই আমাদের জান। শিল্পের প্রাণ। আমরা ডুবলেও তাদের দিয়েই আবার ভাসতে হবে। তদুপরি কারখানা খোলা রেখে সারাদেশকে ঝুঁকিগ্রস্থ করা হত। হ্যা, এইচআরের সর্বোচ্চ পজিশনে থেকে আমরা সিনিয়ররা চাইলেই সব কথা পাবলিকলি ও পাবলিক সেন্টিমেন্টের আবহে বলতে পারি না। বলা ঠিকও না। আমাদের যথেষ্ট দায়ীত্ব নিয়ে কথা বলতে হয়, স্টেটমেন্ট দিতে হয়। অনেক কিছু ভাবতে হয়।
১১. আমরা ট্রুডোর মতো প্রধানমন্ত্রী চাই। কিন্তু কানাডার নাগরিকদের মতো নাগরিক হব না। ফেসবুকে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বাজার ট্রুডো, ট্রাম্প, ক্রন্দনরত ইতালীর ভূয়া প্রধানমন্ত্রী (যিনি আসলে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট) এবং শি জিনপিং। উন্মাদ শেয়ারিংয়ের এই বাঙাল জাতি পাগলের মতো ট্রুডোর এক কাল্পনিক বক্তৃতা শেয়ার করছে, যেখানে নাকি ট্রুডো বলেছেন, তিনি জাতিকে দয়ার সাগরে ভাসিয়ে দেবেন। আর ইতালীর প্রধানমন্ত্রীর নাম করে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের ক্রন্দনরত ছবি দিয়ে বলা হচ্ছে, ইতালীর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এখন আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। অনলাইনে, অফলাইনে কিছু গাঁজাখোর ও নির্বোধ ছাগল সবসময়ই থাকবে। সেটা অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক যেটা, তা হল, দেশের ডিগ্রীধারী গ্রাজুয়েট ও কোট টাই পড়ে ঘুরে বেড়ানো এত এত ছাগলও আছে, সেটা ফেসবুক না আসলে জানা যেত না। এই ছাগলেরা যা পায়, তাই গেলে। আর শুধু গেলে না, অন্যদের গেলানোর চেষ্টা করে। যাহোক, বলছিলাম, বাঙালরা ট্রুডোকে হিরো মনে করে। কেন? কারন, ট্রুডো স্টেশনে পাবলিকের সাথে সেলফী তোলে, ট্রুডো তার দেশের সব ট্যাক্স মাফ করে দেয়, সবাইকে ফ্রি খাবার দেয়, সে পাবলিকের পায়ের কাছে বসে কথা বলে। বাহ বাহ বাহ।
আমি মহাপবিত্র কুরআনের একটি বানীর ভাবার্থ বলি (ভুল হলে খোদা মাফ করুন), “খোদা কোনো জাতির জন্য সেই রকম শাসকেরই ফয়সালা করেন, যেই ধরনের শাসক তারা ডিজার্ভ করে।” তা যারা বাঙাল মুলুকে ট্রুডোকে কামনা করেন, তারা নিজেরা কানাডার নাগরিকদের মতো হতে আবার প্রস্তুত না। প্রমান তো এক বুড়া কাকার ভিডিও হতে দেখলেনই। বুড়া খাটাশ ২৭ বছর লন্ডনে ছিল। পয়সা কামিয়েছে। করোনা হামলা করা মাত্র দেশে চলে এসেছে। (শোনা কথা, ভুল হলে ক্ষমাপ্রার্থী) তারপর বুক ফুলিয়ে রাস্তায় বের হয়েছে। একজন ভলান্টিয়ার তাকে মাস্ক পড়তে বলায় কতটা ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, সেটা আর বললাম না। তো, ২৭ বছর লন্ডন থেকেও তাদের সিভিক সেন্সের কিছুই শেখেনি। শেখার বা মানার ইচ্ছাও করেনি।
বিশ্বের অনেক দেশেই অভিবাসীদের একসেপ্ট করতে স্থানীয় নেটিভদের নারাজি বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারন এটা। এই অভিবাসীরা যুগ যুগ ওই দেশে থাকবে, ওই দেশের জল হাওয়া অর্থ সুবিধা কনজিউম করবে, নাগরিকত্বও নেবে, কিন্তু ওই দেশের সাথে একাত্ম হবে না। বাংলাদেশ হতে যাবে, ২৭ বছর থাকবে, পাসপোর্ট নেবে, কিন্তু নিজেকে বাঙালী পরিচয় দেবে আর বৃটিষ সংস্কৃতিকে গালি দেবে। অনেকটা আমারটা খাবে, পরবে, কিন্তু আমাকেই গালি দেবে-ওরকম। ১২.দেশে করোনা নিয়ে তীব্র বিদ্বেষ, ঘৃনা, প্যানিক ভায়োলেন্স লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রোগী ও রোগের ব্যবস্থাপনা এতে বাঁধাগ্রস্থ ও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। উদাহরন:-একজন এ্যাম্বুলেন্স চালক, যিনি এতদিন অতিমানবিকভাবে করোনা রোগীকে বহন করে এসেছেন, তিনি অসুস্থ্য হয়ে পড়ায় গ্রামবাসীর বাঁধায় চিকিৎসা নিতে পারেননি। হাসপাতাল ঘেরাও করেছে জনতা। সেই জনতা, যারা এই দিন দশেক আগেও বলেছে, করোনা ফরোনা সব ভূয়া। তো সেই ভূয়া করোনার ভয়ে কেন একজন অসুস্থ্য লোককে হাসপাতাল হতে তাড়িয়ে দেবার দাবী করে জানি না। চরিত্রহীন বাঙাল। করোনা নয়, অথচ করোনা হতে পারে-এই আন্দাজে বিভিন্ন স্থানে অন্য রোগের রোগীর চিকিৎসা ব্যহত করছে উন্মত্ত জনতা। কোথাও কোথাও পরিবারকে হেনস্থা করা হচ্ছে। একজন অসহায় স্ত্রী তার স্বামীর জন্য সারারাত সাহায্য চেয়েও পাননি। পাবলিকের ভয়ে। কোথায় যেন দেখলাম, করোনার লাশ বহন করা হচ্ছে-এই আতঙ্কে ট্রলারে হামলা করা হয়েছে। কোথাও কোথাও ডাক্তারদের বাড়ি ছাড়া করছে জনতা, বাড়িওলা। বিকারগ্রস্থ হয়ে যাচ্ছে জনতা। জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, সর্দিতে আক্রান্ত হওয়া মানেই করোনার রোগী নয়। সচেতনতা ভাল, মিথ্যা আতঙ্ক ভাল না। এমনিতেই এই সময়ে সর্দি, জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্টের প্রকোপ বাড়ে। বাড়ে নিউমোনিয়া।
দয়া করে নিজের হলে বা কারো হলে একটু ভালভাবে করোনার সিম্পটমগুলো WHO এর ওয়েবসাইটে পড়ে নিন। আর কোথাও শ্বাসকষ্টে রোগী মারা গেলেই সে করোনায় মারা গেছে-এই আতঙ্ক ছড়ানো বন্ধ করুন। মিডিয়াকে আরেকটু দায়ীত্বশীল হতে হবে। TRP বাড়াতে প্যানিক বুম তৈরী করবেন না। কাল হতে টিভিতে দেখছি, কোথাও কেউ মারা গেলেই করোনা সন্দেহ করা হচ্ছে। তা সে যে কারণেই হোক। পরশু হতে ৪ টি কেস ট্রেইল করে দেখেছি। চারটাই অন্য কারনে মৃত্যু। মানুষ ধরেই নিচ্ছে, মৃতের শ্বাসকষ্ট ছিল মানেই তার করোনা ছিল। তাই বলছি, সচেতন হোন, বাক্য চয়নে দায়ীত্ববান হোন। অবস্থা যা দাড়াচ্ছে, তাতে সামান্য সর্দির রোগীয় জনতার অত্যাচারেও মারা যাবে। বাংলাদেশে করোনা এমন একটি সময়ে হানা দিয়েছে, যখন মৌসুমটি হল ইনফ্লুয়েঞ্জা, হাম, সর্দির। এমনিতেই এই সময়ে প্রচুর লোক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। যদিও আমার কাছে সঠিক তথ্য নেই, প্রতিবছর স্বাভাবিক সময়ে ঠিক এই মৌসুমে কত মানুষ ইনফ্লুয়েঞ্জা বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে আসে। তাই বিষয়টা তুলনা করা গেল না। তবে একটা আনুমানিক পারসেপশন যদি দাড়া করানো হয়, তাহলে বলা যায়, অন্যান্য বছরে আক্রান্তদের হাসপাতালে আসার হার কম থাকে। বাংলাদেশের মানুষ নিজে নিজে ডাক্তারি করে অভ্যস্ত। কিন্তু চলমান আতঙ্কে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই মানুষ হাসপাতলে বেশি আসছে। আবার অন্যান্য বছর সেটা নিউজে না এলেও এখন কিন্তু খবর দেয়া নেয়া, তথ্য বিনিময়, ফেসবুক শেয়ারিং বেশি হচ্ছে। সব মিলিয়ে অন্যান্য বছরের তুলনায় বিষয়টি অনেক অনেক বেশি হাইলাইটে আছে। বিধায় হঠাৎ করে মনে হতে পারে, প্রচুর লোক হয়তো করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। আবার টেস্টিংয়ের ক্ষমাহীন অপ্রতুলতা এই কনফিউশন দূরে করছে না। ফলে সরকার যতই করোনায় আক্রান্ত হার কম দেখাচ্ছেন, পাবলিক তা এ কারনেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। যেখানেই জ্বর, শ্বাসকষ্ট, সেটাকেই করোনা কেস ধরে জনমানসে ভীতি বাড়ছে। গুঞ্জন ডালপালা মেলছে।
১৩.সারাদেশে কিছু মহামানব গরীব ও প্রান্তিক মানুষ, যারা আয় রোজগার হারিয়েছেন, তাদের জন্য জরুরী খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরনের কাজ করছেন। মুশকীল হল, বাংলাদেশে গণমানুষের জন্য কিছু করার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হল পরিসংখ্যান ও তথ্যের অপ্রাপ্তি। এই ত্রাণগুলোকে সুষ্ঠূ সমন্বয় ও যথাস্থানে সুষমভাবে বন্টন করা যাবে না। কারন ওই, তথ্যের অভাব। দেশে কোনো অথেনটিক ও নির্ভূল ডিজিটাল ডাটাবেইস নেই। ১৭ কোটি নাগরিকের কোনো একক তথ্য নির্ভর ডাটা নেই। আছে কেবল সবেধন নিলমনি ভোটার আইডির বেস। তাও ভুলে ভরা আর অপর্যাপ্ত তথ্য। কে গরীব, কে মধ্যবিত্ত, কে কোথায় থাকে, কাকে কীভাবে হিট করা যাবে-কোনো ধারনা নেই। সবই হবে আন্দাজে। ফলাফল-কেউ পাবে, কেউ পাবে না। কেউ তিনবার পাবে, কেউ না পেয়ে মরবে। কারও দরকার খাবার, সে পাবে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। দরকার পড়বে প্যারাসিটামল, সে পাবে সাবান। বাসার পাশের বস্তিতে দশবার পাবে, পাহাড়ে কেউ দেবে না। পিপিই লাগবে ডাক্তারের, বিতরন হবে ব্যাংকের ম্যানেজারকে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং নিজেদের আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও কিছু মহামানব জরুরী ত্রাণ কর্মকান্ডে ডোনেট করছেন, ভলান্টিয়ার করছেন।
আমার প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কয়েকজন মহাত্মা আটকে পড়া অসহায় কুকুর বিড়ালদের জন্য খাবার নিয়ে গিয়েছেন। এই মহাত্মাদের একটি বড় অংশই হলেন, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা। খুব দুঃখজনক হলেও সত্যি, যদি, হ্যা, যদি কোনোভাবে দৈবক্রমে আগামি ৩০ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ তার অর্থনীতির চাকা, উৎপাদন, কর্মকান্ড অন্তত শুরু করতে না পারে, যদি লকডাউন বহাল থাকে, তাহলে আজকে যারা দান, অনুদান দিয়ে মহাগরীবদের বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, এই এরাই অর্থকষ্টে রিলিফের ট্রাকের লাইনে দাড়াবেন। অলরেডি, যারা একটু সচ্ছল, মানে বাস ড্রাইভার, ছোট দোকানী, গার্মেন্টস কর্মী, যারা মোটামুটি আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার মতো আয় করত, তারা না পারবেন হাত পাততে, না পারবেন ক্ষিধের জ্বালা সইতে। বাংলাদেশের ঠিক কতজন মানুষ বেকার হবেন-তা আমার মাথায় ধরছে না। শুধু বেকার হওয়া না, অর্থনীতি সচল হবার পরেও তারা চাকরী পাবেন-সেই সুযোগ কম। কারন প্রতিষ্ঠানগুলো লোক নেবে না। আগে হতে ৪.৮ কোটি বেকার তো আছেই।
১৪.মানবিকতার আশাব্যঞ্জক ঝলকানির মধ্যেও, এই কেয়ামতের মধ্যেও বাঙালীর চিরাচরিত খাসলতে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। গতকাল একজনকে দেখলাম, মাস্কটা একটু নামিয়ে পিচিক করে থু থু ফেললেন রাস্তায়, তারপরই মাস্ক তুলে হাঁটতে লাগলেন। বিটিভিতে স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য ভিডিও টিউটোরিয়াল প্রচার করবে, যেটা শুধু বানানোর জন্য বাজেট ধরেছে ১৬ কোটি টাকা। ওই টাকায় টাইটানিকের মতো মূভি বানিয়ে ফেলা যায়। দর্শনার কেরু এ্যান্ড কোং দেশের কথা চিন্তা করে বড় ভলিউমে ও সস্তায় হ্যানড স্যানিটাইজার উৎপাদন শুরু করল। বাজারে আসতে না আসতেই কেরুর এম.ডিকে বদলি করে দেয়া হয়েছে, যখন তার অবসরে যাবার বাকি মাত্র ২৪ দিন। বেসরকারী উৎপাদকরা যে কলকাঠি নেড়েছেন, তা নিশ্চিত। সরকারী বড় কর্তারা এই কেয়ামতের সময়ও মানুষ হতে পারল না। টিভিতে খবরে দেখলাম, উত্তরবঙ্গের কোনো এক জেলায় তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণ করে গ্রেফতার হয়েছে একজন বীরপুঙ্গব। কলিজা এদেরই আছে। এরই মধ্যে করোনা নিয়ে গুজবে থাককুনি পাতা, আদা চা, কালিজিরা পর্ব শেষ। কাল রাতে নিটোলকে বলছিলাম, দেখো, এমন না হয়, অচীরেই মহামারি মাত্রা ছাড়ালে কেউ হয়তো গুজব রটিয়ে দেবে, নাবালিকা ধর্ষণ করলে করোনায় মারা যাবে না। আর পরের ৭ দিনে বাঙালী মানবতার সমস্ত জারিজুরি ভুলে গণধর্ষণে নেমে না পড়ে [আফ্রিকার কিছু দেশে এইডস নিরাময়ে নাবালিকা বালিকাদের সাথে যৌন সম্পর্ক করার কুবুদ্ধির মুখে এমন ঘটনা ঘটেছিল।]
আমি হয়তো অসুস্থ লোকের মতো কথা বলছি। কিন্তু আমাদের ইতিহাস এবং অতীত বিবেচনায় নিলে আপনার আর অসুস্থ মনে হবে না। এই দুর্যোগেও মাস্ক নাকি মাক্স, করোনায় মরেছে কি মরেনি, তা নিয়েও খুনোখুনি চলছে। হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষ বাইক এ্যাকসিডেন্ট করছে। করোনাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়া জনগোষ্ঠীই আবার এলাকায় করোনার মৃতকে দাফনে বাঁধা দিচ্ছে। করোনার মৃত লাশ পরিবহনের গুজবে ট্রলারে হামলা করছে, এলাকায় হাসপাতাল করতে বাঁধা দিচ্ছে। আপনার কি মনে হয়? এই দেশ অত্যন্ত মানবিক ও সংবেদনশীল? জ্যাক মা মাস্ক ও কীট ডোনেট করায় তাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দেয় এই জাতি, সাহায্য পাঠানোয় চীনকে ভূয়সী প্রশংসা করা এই জাতি মাত্রই এই জানুয়ারীর শেষ পর্যন্ত চায়নাকে উঁইঘুর ইস্যূতে গজবের নিপতিত জাতি আখ্যা দিয়ে মজা নিয়েছে, আত্মশ্লাঘা অনুভব করেছে, খোদাকে খুশি রেখেছে, ধর্মীয় দায়ীত্ব বা জেহাদের সওয়াব কামিয়েছে। আবার এখনকার প্রশংসার পরেই, চায়নার একটি বেসরকারী কোম্পানীর সংবরাহকৃত কীটে করোনা সনাক্তে ভুল রিপোর্ট আসছে-এই ফেসবুকীয় সংবাদে আবার চায়নাকে ধুয়ে দিয়েছে।
আজ সকালে নিটোলকে বলছিলাম, আসলে বাঙালী জাতির কোনো চরিত্র ও প্যাটার্ন নেই। এরা রাবারে নির্মিত। চরম এলাস্টিসিটি এই জাতির। এদের কোনো বুক পিঠ নেই। অবস্থা অনুযায়ী ভোল পাল্টায়। ঠিক যেমন এই মুহূর্তে ডাক্তার জাকির, ইব্রামোভিচরা হাইবারনেশনে চলে গেছে।
১৫. মনে পড়ে? আশির দশকেও এদেশের ‘পুরুষ’ মানুষ এবং ‘মেয়েমানুষ’রা বলত, “মুখ দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি।” ফলাফল? একেকজনের ১২ জন করে সন্তান। তখনকার তেতুল হুজুররাও পালে বাতাস দিত। এই পুরুষ ও মেয়ে মানুষদের মিলেনিয়াম সংষ্করনরাই আজ ২০২০ সালে বলছে, “করোনা সংক্রমন আটকাতে জুমা পরিহার করলে খোদা গজব দেবেন।” “খোদায়ী এই গজব হতে বাঁচার চেষ্টা করে লাভ নেই। দরকারও নেই।” দেখার ইচ্ছা, এরা রোগ হলে ডাক্তার দেখায় কিনা। আমাদের পাবলিকের নির্বুদ্ধিতা তো আগে হতে ছিলই। তাকে আরও বাতাস দিয়েছে কাঠমোল্লাদের বদমায়েসি ফতোয়া। তারা আযহারি (দেলু সাইদী বা চান্দু সাইদীর চেলা), ইব্রামোভিচ (এন্টারকোটিক মোল্লা), তারেক মনোয়ার (হার্ভার্ড টপার) এদের আফিমে আগে হতেই বুঁদ। আশ্চর্য হল, আমাদের মসজিদের/মাদ্রাসার আলেমরা ইসলামের প্রকৃত সত্যটা জেনেও আজতক নিজেদের হতে একটা ঘোষনা দিতে পারল না, যে, মহামারির মধ্যে মসজিদে আসা বাধ্যতামূলক না এবং ইসলাম বুনিয়াদিভাবে সবার আগে নিয়তের ওপর দাড়িয়ে। কেউ যদি সহিহ নিয়ত ও মনোঃবেদনা থাকে মসজিদে যাবার আর কোনো ওজরের জন্য যেতে না পারে, তাহলে সে মসজিদে যাবার সওয়াবই পাবে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন চিঁ চিঁ করে দুর্বল গলায় ‘আহবান’ জানালেও আমাদের জাগ্রত মর্দে মুমীনরা ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে থোরাই বিশ্বাস করে। বিশেষত ফাউন্ডেশনের কর্তারা যখন সরকারী আমলা হন আর দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত হন। নামাজিরা মসজিদে যেতে বদ্ধপরিকর। যদিও, মসজিদে যাওয়া ও মসজিদে জামাত বন্ধ করা নিয়ে যারা জিহাদ করছেন, তাদের সর্বাধিক উপস্থিতি শুধু জুমায়।
সত্যিই যদি বাংলাদেশে বিশাল সংখ্যক এই বিরোধীরা নিবিড়ভাবে ইসলামের অনুসারীই হতেন, তাহলে ফজর ও জুমায় সমান সংখ্যক মুসল্লী হত। সেটা হয় না। জিহাদ শুধু জুমায়। গত সপ্তাহের জুমায় মসজিদে যাইনি। ঘরে যোহর পড়ে বারান্দায় দাড়ালাম। সামনের গলির মুখে ৫ জন যুবক কাঁধে জায়নামাজ নিয়ে দাড়ানো। সবার হাতে সিগারেট জ্বলছে। তখনো মানুষ সুন্নাত পড়ে মাত্র ঘরে ফিরছে। এই মর্দে মুমীনরা নিশ্চই ফেসবুকে মসজিদে জুমা পড়ার পক্ষে জিহাদ করে ফেলেছেন। তারপর জুমার ২ রাকাত পড়েই গলিতে একসাথে দাড়িয়ে বিড়ি টানছেন। যেখানে, বিড়ি টানা হারাম, সরকারীভাবে ৬ ফুট দূরত্ব বজায়ে দাড়ানোর নিয়ম। আমি বুঝলাম না, আমি জুমা না পড়ে ঘরে যোহর পড়ে কি পাপ করলাম? ওনারা জুমার সওয়াব কামিয়ে, হাজারো লোককে ইনফেকটেড করার ঝুঁকি তৈরী করে, বিড়ি খেয়ে, সরকারী নির্দেশ অমান্য করে কি সওয়াব হাসিল করলেন? জানি না। আমি মওলানা নেই।
দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমরা ফেসবুকে যতই বিপ্লব করি না কেন, সরকার যেটাই বলুক না কেন, এই কাঠমোল্লারা দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তি। তাদের অনুসারী লক্ষ লক্ষ। বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা তাদের হাতেই বাঁধতে দিলে মানুষ শুনত। কেউ সেই চেষ্টার ধার দিয়েও গেল না। অবশ্য এই দেশের সরকার কখনোই পাবলিক এটাচমেন্ট, পাবলিক পারটিসিপেশনে বিশ্বাস করে না। এখনো পর্যন্ত দেশের এক্সপার্টদের মতামত, সাহায্য নেবার কোনো উদ্যোগ সেজন্যেই দেখিনি। আমার খালি মাথায় ঢুকছে না, দুনিয়ার সব মুসলমান দেশের চেয়ে কি আমরা বেশি বেশি মুসলমান হয়ে গেলাম? যে অন্যরা মসজিদে জামাত সাময়িক বন্ধ রাখলেও, এমনিক মক্কা মদীনার দুই সর্বোত্তম মসজিদ বন্ধ রাখলেও আমরা সেটা করাকে হারাম মনে করি? আমাদের আলেমরা এই যে সত্য গোপন করছেন, মিথ্যা মাছায়েল দিচ্ছেন, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোকের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে তারা যে পাপ করছেন না-সেটা কি তারা নিশ্চিত? আমি শুধু মুসলমানদের কথা কেন বলি। দেশের কোনো মন্দীর, প্যাগোডা, গির্জা বন্ধ রাখার কোনো ঘোষনা আমার চোখে পড়েনি। এতদিন গার্মেন্টস ও মসজিদ পাল্লা চলছিল। মসজিদ বলে, গার্মেন্টস খোলা থাকতে পারলে মসজিদ কেন নয়? গার্মেন্টস বলত, মসজিদে লক্ষ লোকের জামাত করতে দিলে, গার্মেন্টস কী দোষ করল। এখনতো সবই বন্ধ। এখন সবাই চুপ।
মসজিদে জামাত চালু রাখার যারা সমর্থক তাদের হাতে কোনো যুক্তি নেই। আছে আবেগ। সেই আবেগকে আমি সম্মান করি। তবে ইসলাম শুধু আবেগ নির্ভর ধর্ম নয়। যুক্তি ও কানুন নির্ভরও। যুক্তি ও ইসলামী জ্ঞান বলে, ওজর ও বৈধ কারন থাকলে মসজিদ বন্ধ পর্যন্ত রাখা যায়। আরেকদল মনে করেন, মসজিদ আল্লহ’র ঘর। এখান হতে রোগ ছড়াতে পারে না। মুশকীল। দেখুন তো, টোলারবাগে যেই মুরব্বী মারা যান, তার পরেই তার পাশে বসে মসজিদে নামাজ পড়া মসজিদ সেক্রেটারীও পরে মারা গেলেন করোনায়। মালয়েশিয়ায় করোনা মারাত্মকভাবে ছড়িয়েছে তাবলীগের এক মজলিস হতে, যেখানে বাধাদান সত্বেও লোকেরা অংশ নিয়েছিল। পাকিস্তানের সিন্ধুতে ৩৬ জন তাবলীগার মসজিদ হতে এক চীনা তাবলীগারের মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছেন। ভারতের তেলেঙ্গানায় (আজ ৩১ তারিখ) ৭ জন মারা গেছেন একসাথে, যারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তাবলীগের সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। একই ভারতে এক শিখ ধর্মগুরু নিষেধ অমান্য করে অনেকগুলো ধর্মীয় মজলিস আয়োজন করে নিজেতো করোনায় কাত হয়েইছেন, তারপর ওখানকার ৪০ হাজার গ্রামবাসীকে ঘরে বন্দী করার ব্যবস্থাও করেছেন। নিশ্চই এতে তার খোদা খুশি হননি।
১৬. কিছু কিছু কুলাঙ্গার আছে, যারা হাশরের মাঠেও ছাতা, মিনারেল ওয়াটার আর সিরিয়াল বানিজ্য করবে। করোনার এই সুযোগে ইউনিলিভার তাদের হ্যান্ডওয়াশের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারের মুদী দোকানদার হতে রাস্তার মাস্ক বিক্রেতা-কেউই দুর্যোগে কামিয়ে নেবার, দুইয়ে নেবার সুযোগ হাতছাড়া করছেন না। এটা নিয়ে যারা আবার ফেসবুকে ক্রূসেড লড়ছেন, তারা আবার দেখছি করোনার ওপরে অনলাইন পিএইচডি করে তার সার্টিফিকেট শেয়ার করছেন। যদিও করোনার গজব শেষ হলে দেশে যে সীমাহীন বেকারত্ব সৃষ্টি হবে, তাতে এই সার্টিফিকেট কাজে আসবে না। ব্যবসায়ীদের নরপশুত্ব এই দেশে নতুন না। মাত্র সেদিনই পেঁয়াজ নিয়ে যেই অধর্ম তারা করলেন, তার জবাব হাশরের মাঠে নিশ্চই দিতে হবে। কি মুসলমান, কি হিন্দু, কি খ্রীষ্টান-সবাই। এই কসাই গোষ্ঠীকে কেউ কসাই বলে না। অথচ ডাক্তারদের কসাই বলে। আজ যাদের হাতেই আল্লহ মানুষের জীবন ঝুলিয়ে রেখেছেন। এই কসাই ও নীতিহীন গোষ্ঠী ১৯৭৪ সালেও দুর্ভিক্ষ আয়োজন করে লক্ষ লক্ষ লোককে মেরে ফেলেছিল। এদের এই চরিত্র নতুন না। ব্যবসার স্বার্থে এদেশে সবাই অন্ধ।
টিভিতে দেখলাম বিজ্ঞাপন দিয়েছে, মুরগী ও ডিমে করোনা নেই। NOAB বলছে, নিউজপেপার হতে ভাইরাসটি ছড়ায় না। WHO ও নাকি তাই বলেছে। আবার সেই WHOই বলছে, টাকা হতে ভাইরাস ছড়ায়। লাগে যেন, টাকা তেজপাতা দিয়ে তৈরী। ৮ তারিখে ’অফিশিয়ালি’ বাংলাদেশে করোনা আক্রমণের শুরু। সেই দিনে সারা দেশে যেসব মাস্ক ও স্যানিটাইজার বিক্রী হয়েছে, সেগুলো ব্যবসায়ীরা কমপক্ষে ১৫ দিন আগে কিনে দোকানে রেখেছেন। ৮ তারিখে যখন সবাই হামলে পড়ল, তখন, সেই রাতেই মাস্কের দাম ১০ টাকারটা ১০০ টাকা, ১০০ টাকারটা ৩০০ টাকা, স্যানিটাইজার ৫০ টাকারটা ৩০০ টাকা যে তারা রাখলেন, তারাতো অন্তত ওই দিনে বিক্রী হওয়া পণ্যগুলো আগের কম দামেই কিনেছেন। ৭ তারিখেও কম দামে কেনা জিনিস কম দামে বেঁচেছেন। তাহলে ৮ তারিখে যদি চাহিদায় বুম হয়, তাতেতো তাদের কেনা দাম মোটেও ইফেক্টেড হয়নি। অন্তত ৮ তারিখ তো নয়ই। তাহলে জিনিসটা অত্যন্ত পরিষ্কার, যে, ৮ তারিখে তারা মওকা বুঝে ৫ গুন লাভ তুলে নিতে ধান্দা করেছেন। বাড়তি দামে কিনতে হয়েছে-এই ওযুহাত শুনলে তাই খোদ শয়তানও লজ্জা পাবে। তা ব্যবসায়ীরা? এই টাকা খেয়ে মরতে পারবেন তো?
১৭. ব্লেম গেম বিষয়টা বাংলাদেশে নতুন না। সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে, যেখানে মানুষের ওভারঅল জীবনবোধ, শিক্ষা, রুচী, চিন্তাধারা, লাইফস্টাইল বদলে গেছে অনেক গুন, সেখানে ব্লেম গেমটাও বাড়ছে। কারো দোষকীর্তন করার আগে আরেকটু ভেবে নিন। নিজেকে আরেকটু যাচাই করে নিন। বহু মানুষই নিজের দুর্গন্ধযুক্ত ’পশ্চাৎদেশ’ সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে সেটা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতেই অন্যদেরকে দুর্গন্ধের জন্য গাল পারে, ”ওই, তুই কি …দ দিছস?” নিজে কিছু করি না করি, নিজের দোষ যতই থাকুক, সেটাকে ছাপিয়ে অন্যের পশ্চাৎদেশের দুর্গন্ধ খোঁজার বদ খাসলত এই বাঙাল মুলকে অনেক আগে হতেই ছিল। ফেসবুক এসে সেটাকে আরও উস্কে দিয়েছে।
আসলে, ফেসবুককে এদেশের মানুষ অনেকটা পানের পিকদানের মতো ব্যবহার করে। যখন যা মনে হল, পিচিক করে পিক ফেলার মতো করে ঢেলে দিল। আরেকটা কারন হল, ফেসবুককে এদেশের মানুষ একটা নিরাপদ গুলতি ভাবে। যেখানে যা মনে চায় বলা যাবে, করা যাবে। কোনো দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহীতার বালাই নেই। এই জেহাদিরা সাকিবকে ক্রিকেট শেখায়। এই জেহাদিরা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের জলপাই টি-শার্ট নিয়ে বিদ্রুপ করে। এই জেহাদিরা টুইটার মালিকের আম্বার হার্ডের সাথে পরকিয়ার প্রতিবাদ করে ফেসবুক স্টাটাস দেয়। স্থান, কাল, পাত্র, আপেক্ষিকতা, প্রেক্ষাপট নিয়ে ভাববার ও উপলব্ধি করবার সামান্যতম যোগ্যতা ও ইচ্ছা না থাকা এই জেহাদিরা ব্যক্তিগতভাবে ভীরু ও সুবিধাবাদি হয়ে থাকে।
এদের যাবতীয় জেহাদ ফেসবুকে। এই টনটনে নীতিবোধের কাপুরুষগুলো নিজ অফিসে বিড়াল হয়ে চললেও, ফেসবুকে অন্যের কোম্পানীর বিষয়ে সিংহ সাজে। এই গ্রুপটাই ফেসবুকে গালি দেবে, “পুলিশ কেন ঘুষ খায়?” ঠিক এরাই আবার ফেসবুকে পোস্ট দেবে, “পুলিশে কোনো বন্ধু আছো? একটু জরুরী দরকার।” তারই ধারাবাহিকতায়, দেখবেন, দেশে বড়সড় কিছু একটা ঘটনা হলে, যেটার পাবলিক এটাচমেন্ট বা হাইপ আছে, কয়েকদিনের ভিতরেই ঢ়ি ঢ়ি পড়ে যাবে, কেন এখনো ড. জাফর, সুলেমান ভাই, আয়মান, ড. সুলতানা কামাল কিছু এখনো বললেন না। যেন, তারা দেশের যাবতীয় পাবলিক হাইপের জন্য অফিশিয়াল মুখপাত্র।
কারো কাছে রিভিউ, বুদ্ধি অথবা জাজমেন্ট চাইবার আগে বা, কারো রিভিউকে পাত্তা দেবার আগে নিজে নিশ্চিত হয়ে নিন, যে, ওই ব্যক্তির রিভিউ দেবার মতো যোগ্যতা আদৌ আছে কিনা।
বাসার কাজের মেয়েকে যদি জিজ্ঞেস করেন, “বল তো, রাশিয়ার কি ইউক্রেনে হামলা করা ঠিক হইছে?”-তাহলে বিশ্লেষণটা কোন মাত্রায় পাবেন-সেটা ভেবে নিন।
রিভিউ যদি দরকারই পড়ে, যদি সেটি নেয়া হয়, আর, যদি সেটাকে বেস করে কিছু সিদ্ধান্ত নেবার বিষয় থাকে, তাহলে খুব সতর্কতার সাথে, সবার আগে বিচার বিশ্লেষণ করা উচিত, যে, রিভিউটা কার কাছ হতে নেয়া হচ্ছে।
মাতালের কাছে যদি জানতে চান, “ওয়াইন খেতে কেমন?”
সুদের মহাজনের কাছে যদি জানতে চান, “সুদ কি হারাম?”
মেসির কাছে যদি জানতে চান, আর্জেন্টিনা সেরা, নাকি ব্রাজিল?
দশ বছরের শিশুর কাছে যদি জিজ্ঞেস করেন, “বাবাজি, করল্লা কি সুস্বাদু খাবার?”
মোল্লার কাছে যদি শুধান, “মিলাদ কি বেদাত?”
পাড়ার মন্তাজ পাগলাকে যদি প্রশ্ন করেন, “আচ্ছা, বলতো, অফহোয়াইট শার্টের সাথে ব্লু শার্ট নাকি ক্রিম কালার শার্ট বেশি মানাবে?”
হালের কোনো নাট্যকারকে যদি আশির দশকের টিভি নাটকের বিপরীতে বর্তমানের নাটকের মান নিয়ে রিভিউ চান।
কিংবা, কার্ল মার্কসের কাছে যদি আমেরিকান পুঁজিবাদী অর্থনীতির ইথিকস নিয়ে জানতে চান, তাহলে আপনার প্রাপ্ত রিভিউ বা বিশ্লেষনের অন্তর্গত গুনাগুন নিয়ে বেশি ভাবা দরকার পড়ে না। রিভিউ নেয়া ভাল। তবে, রিভিউটা কার হতে নিচ্ছেন, সেটা ম্যাটার করে। বাঙালির রিভিউ জগতের সবচেয়ে বায়াসড রিভিউ। আর, সবচেয়ে মারাত্মক রিভিউ হল ফুড ব্লগারদের রিভিউ।
এমনিতে, বাঙালীর রিভিউ ক্ষমতার ধরন হল, কাউকে যদি জিজ্ঞেস করেন, অমুক যায়গাটা কতদূর? সে অবলিলায় বলে দেবে, ওই তো, ওই দেখা যায়। বাস্তবে দেখবেন, স্থানটা দশ মাইল দূরে। এরকম ধরা জীবনে বহুবার খেয়েছি। ফুড ব্লগারদের রিভিউতে মজে কোথাও খেতে গেলে টাকা গচ্চা যাবার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যাবেন। এমনিতে, কুল, ডুড, টিকটক প্রজন্মের কাছে আপনি তো মানুষই নন, আপনি, আমি হলাম গায়েজ। তো, এই গাইদের জন্য তারা ভুড়ি ভুড়ি দায়ীত্বশীল রিভিউ অনলাইনে আপ করে রেখেছেন-ভাবলে ধরা খাবেন।
আবার, ভাবলেন, ঠিক আছে, আমি সবসময় জ্ঞানী, বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ, পক্ক কেশ মানুষদের হতে রিভিউ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব। তারপরও বিপদ আছে। বাঙালির মতো বায়াস জাতি খুব কম আছে। মজার বিষয়, যে যত বায়াসড, সে নিজেকে ততটাই নিরপেক্ষ দাবী করবে। আর জানেন তো, বাঙালিকে এক গাল পান খাওয়ালেই লেবুর স্বাদ মিঠে লাগতে শুরু করবে। তদুপরি, নিজের জানা ও ভাবনাকে গঠনমূলক ও ক্লাসিফায়েডভাবে বিবৃত করতে সবাই সমান পারঙ্গম না।
আবার, রিভিউ দিতে হয়তো সক্ষম, কিন্তু, আপনি রিভিউটা নিচ্ছেন কীভাবে, আর, সেটাকে কীভাবে একসট্র্যাকট করছেন, সেটারও ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে। ধরুন, আপনি একজন প্রাচীন ব্যক্তিকে যদি সবচেয়ে সেরা গায়ক কে, নায়ক কে-সেই রিভিউ দিতে বলেন, বা, ধরুন, তাকে টিকটক হৃদয় সম্পর্কে রিভিউ দিতে বলেন, আবার, ওদিকে GenZ এর কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, দেশের সবচেয়ে বড় নায়ক কে, এই মুহূর্তের ন্যাশনাল হিরো কে-তা নিয়ে; উভয় ক্ষেত্রেই যে রিভিউ পাবেন, সেটা হাইলে বায়াসড। ধরুন, মদ সম্পর্কে যদি আপনি একজন বার টেন্ডারের কাছে জিজ্ঞেস করেন, তার রিভিউ আর, যদি একজন মোল্লাকে জিজ্ঞেস করেন, তার রিভিউ-দুটোই যার যার স্থানে শক্ত রিভিউ, কিন্তু, আপনি যদি একজনের রিভিউকে বেজ ধরে আপনার সিদ্ধান্ত পাকা করেন, সেটা ভুল হবে। কারন, প্রতিটি রিভিউই যার যার মতো। আপনি যদি একটাকে গ্রহন করেন, সেটা হবে খোলাখুলিভাবে বায়াজড। জরিপ ও রিভিউয়ের ক্ষেত্রে স্যাম্পল সিলেকশন ক্রূশিয়াল।
জ্ঞানী হওয়া আর জ্ঞান বিতরণ করতে পারা এক বিদ্যা নয়। ঠিক যেমন গ্রেট প্লেয়ার হওয়া মানেই গ্রেট কোচ নয়, শচীন যেমন গ্রেট ক্যাপ্টেন কখনোই হতে পারেননি। অধিকন্তু, বাংলাদেশে আপনি আপনার রিভিউ কলে ঠিক কী বোঝাতে বা বুঝতে চাইছেন, একটি বড় সংখ্যক ক্ষেত্রে রিভিউ দাতা সেটা না বুঝেই রিভিউ দিয়ে দেন। আপনার জানার আগ্রহের কনটেক্সট নির্ভুলভাবে রিভিউ দানকারীকে বোঝাতে পারাও সঠিক রিভিউ পাবার একটি করণীয়।
একবার এক ভদ্রমহিলা অফিসের অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজে মেসেজ দিয়েছেন, “……কুম্বানি আগের থোন অনেক বেশি খারাব অয়া গ্যাচে।”
অসীম ধৈর্য নিয়ে তার মেসেজ পড়লাম, পাঠোদ্ধার করলাম। তারপর তার কাছে তার অভিযোগের বিস্তারিত জানতে চেয়ে উত্তর দিলাম। তাকে অভয় দিলাম।
দুই দিন তার প্রতিউত্তর দেখার জন্য বারবার ইনবক্স দেখলাম। তৃতীয় দিন তার উত্তর এলো,
”কুম্বানি এহন পরতেক বছর অর্কার পিকনিক করে না। হগল কুম্পানি করে।”
ব্যাস, এই হল তার অভিযোগ। পিকনিক করে না-এই জন্যই কোম্পানি খারাপ হয়ে গেছে। (মজার বিষয়, কোম্পানির ইতিহাসে পিকনিক হয়েছেই মোট ২-৩ বার, যার সবশেষটা হয়েছে মাত্রই গত বছর।)
একইভাবে, অন্য কারো কাছে কারো ব্যাপারে ভাল বা মন্দ মতামত শুনলে দশবার ভেবে নেবেন। কারন, বাঙালির বুদ্ধিমত্তা ও বিবেচনা বোধের ইতিহাস বলে, যে, এমনকি কেউ চুলে লাল রং করেছে, অথবা, কেউ চুল খাটো করে রেখেছে-শুধুমাত্র এতটুকুর কারনেই কেউ তাকে অবলিলায় সনদ দিয়ে বসতে পারে,
”আরে, ব্যাটা বিরাট চোর। ফালতু একটা।”
আপনি জানেন কি, পরের মুখে তামুক খাওয়া একটি উগান্ডান জাতীয় চরিত্র?
আমরা প্রায়ই পরের মুখে তামুক খাই। তামুক খেতেও মন চায়, কিন্তু মুখে গন্ধ হবে-সেই ভয়ে অন্যের মুখে খাই। আবার, আমরা অন্যের মতামতকেই নিজের মতামত, অন্যের কাছে পাওয়া তথ্যকেই নিজের তথ্য হিসেবে চালিয়ে দিই।
অন্যের রিভিউকেই নিজের রিভিউ ধরে নিয়ে নিজেদের মতামত ও সিদ্ধান্ত দাড়া করিয়ে ফেলি। অন্যের কথাকে নিজের কথা বলে চালাই। এবং, সবচেয়ে মারাত্মক হল, নিজেই আবার সেটাকে বিশ্বাসও করি।
কারো কাছে জিজ্ঞেস করুন, ভাই, অমুক সাবানটা কেমন? ওই লোক কালবিলম্ব না করে বলে দেবে, “জঘন্য”। কারন, হয়তো, তার বউ তাকে একবার বলেছিল, ওই সাবানটা জঘন্য। যদি বলেন, আপনি শিওর? সে বলবে, ”শিওর শিওর। আমি নিজে দেখছি।”
একইভাবে, মানুষ বিচার করে ফেলে, অমুক জিনিসটা জাস্ট মারভেল, তমুক লোকটা তুখোড়। সিম্পল ম্যাথ। সবই পরের কথায়।
আবার, এই উগান্ডাবাসীকে শুধু জিজ্ঞেস করবেন, ভাই, অমুক কোম্পানীটা কি ঢাকায় নাকি চট্টগ্রাম?
সে শুরু করবে-”ভাই, ওই কোম্পানীতে যাবেন না। ওটা অমুক নেতার বানানো। ওদের বিল্ডিংটা জঘন্য লাল রঙের। ওখানে সময়মতো বেতন দেয় না। ওখানে সেমাইয়ের প্যাকেট দেয় না। ওখানে নাইট ডিউটি করতে হয়। ওখানে প্রত্যেক বছর আনরেস্ট হয়। ওরা গ্রীন ফ্যাক্টরী হলেও বাগানে একটা গাছও নেই। ওই কোম্পানী পিকনিক করতে নেয় না। …………………………………………………… এই সবের অনেক অনেক পরে…………………………..ওহ, ভাই, ওটা ঢাকায়।”
আর সুখের বিষয়, এই পুরো রিভিউটাই তার অন্যের কাছে শোনা। কিন্তু, বলবে এত কনফিডেন্টলী, যে, আপনার মনে হবে, তিনি নিজে থ্রিডি চশমায় সব দেখে এসেছেন।
যাহোক, সেই ট্রেন্ডই পাবলিককে নির্বিচারে দেশের বড় বড় কর্পোরেট ও নামকরা ধনী ব্যক্তিদের উপরে যাবতীয় জাতীয় দুর্দিনে অঢেল টাকা পয়সার বস্তা নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে রেসপন্ড করার দায় চাপায়।
করোনায় লক ডাউন হবার এক দুদিনের মধ্যেই ট্রলে ছেয়ে যায় দেশ-কেন এখন বড় বড় ধনীরা কিছু দান ছদকা করল না। অনেকে আবার ঠিক করে দিয়েছে-বসুন্ধরার কী দিতে হবে, বেক্সিমকোকে কী করতে হবে, প্রধানমন্ত্রী জোর করে স্কয়ারের কাছ থেকে কী নেবেন-সেই নসিহত। দেশের ধনীদের নিয়ে পাবলিকের খোঁচা মারা ও অপমানজনক ইঙ্গিতের বিপরীতে দেশের প্রায় সব বড় বড় কর্পোরেটরা ইতোমধ্যেই অনেকগুলো বড় বড় উদ্যোগ নিয়েছেন। হাসপাতাল নির্মান হতে কোটি কোটি টাকার সরঞ্জাম, খাদ্য সেবা-সবই। সেই মিছিলে বিদ্যানন্দ’র মতো সুমহান এক ফাউন্ডেশনও আছে। সবাইকে বুঝতে হবে, আপনার উদ্বেগ ও সেন্টিমেন্ট সবই ঠিক আছে। কিন্তু একটা বড় কর্পোরেটতো আর আপনার মতো, করে উঠ ছুড়ি তোর বিয়ে করতে পারে না। আর তাছাড়া, এই দেশে ধনীদের প্রতি একধরনের সুপ্ত বিদ্বেষ কাজ করে জনমনে। ভাবখানা এমন, তোমার এত টাকা থাকবে কেন? তুমি কেন সব টাকা বিলিয়ে দাও না। আর তার ফলে কথায় কথায় বড়লোকরা কেন এখনও কিছু করল না-সেই গালাগাল শুরু হয়। বিষয়টা অত্যন্ত নিচ ও জঘন্য মানসিকতার পরিচয়। এদের নাকে ভাল করে মরিচ ঘষে দেয়া হয়েছে ইতোমধ্যেই।
১৮. তবে আলো দেখারও আশা আছে কিন্তু। কাল রাতে আমার সুহৃদ আলী ভাই ফোন করেছে। আজ রিজভান ভাই। দু’জনের সাথেই দীর্ঘক্ষণ আলাপ হল। আলী জানতে চায়, “ওয়ালিদ, তোমার নিজস্ব একটা মূল্যায়ন বা ভবিষ্যত বাণী দাও। এই দুর্যোগ কতটা যাবে? আর কবে শেষ হবে?” রিজভান ভাই জানতে চান, “আপনার কি মনে হয়, আল্লহ এই ছোট ও অসহায় দেশটাকে ইউরোপের মতো অমন কঠিন গজব দেবেন?” আমি দু’জনকেই আমার স্বভাবমতো প্রচুর নেগেটিভ কথা শুনিয়ে দিলাম। তার সাথে আবার বললাম কিছু আশার কথাও। তবে দু’জনকেই বললাম, দেখুন, আমরা বাংলাদেশের মুসলমানরা ইসলামের প্রকৃত মাহত্ম হতে অনেক দূরে। এ্যাজ এ হোল, কানাডা বা ডেনমার্কের ক্রিশ্চিয়ানরাও ইসলামের মূল শিক্ষা যতটা মেনে চলে, তারও চেয়ে আমরা কম মানি। অন্তত, এতবড় একটা মহাবিপদ চলছে-আপনি ফজরের জামাতের লোকসংখ্যা গুনুন। তাই খোদার রহমত পাওয়া আমরা ডিজার্ভ করি না। আর প্রকৃতি মায়ের কথা যদি বলেন, তাহলে বিগত ৪৯ টি বছরে, সরকারগুলো প্রকৃতিকে নির্বিচারে ধ্বংস করেছে। সরকারগুলো তথাকথিত ‘দৃশ্যমান’ উন্নয়ন ঘটাতে গিয়ে শিক্ষা, গবেষনা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ, প্রতিবেশ-এই মৌলিক সত্যকে ধ্বংস করেছে। তাই প্রকৃতির রহম হবারও কারন নেই। আমি খুব করে বিশ্বাস করি, এই বৈশ্বিক গজব প্রকৃতির একটি অবশ্যম্ভাবি রিবর্ন প্রসেস।
তবুও, আমি আশাবাদী। আশাবাদী, কারন, আল্লহ রহমানুর রাহীম। আসলে, এই দুর্যোগটি এতটাই ইউনিক, যে, অতি অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞরাও জানেন না, ঠিক কী হবে, কী বলতে হবে, কী ঘটতে যাচ্ছে। যা বলা হচ্ছে, পুরোটাই আন্দাজ। আমি তবু একটা নিজস্ব বিশ্লেষণ বলছি। আপনারা মিলিয়ে নিন। মনে রাখতে হবে, এটা স্রেফ আন্দাজ ও কিছুটা বায়াজড কল্পনা। মোটেই কোনো বিশেষজ্ঞ মতামত না।
এক; আপনি যদি আল্লহ বিশ্বাসী হন, বা যেকোনো ধর্মে বিশ্বাসী হন, তাহলে ভাবুন, কেয়ামত যেহেতু আসেনি, তাই এই দুর্যোগ অবশ্যই শেষ হবে। আল্লহ তায়ালা/ঈশ্বর/ভগবান [যার যার বিশ্বাসমতো]
আমাদের হটকারি নেটিজেনবর্গ কর্তৃক ‘কাফের’ তকমা পাওয়া চায়নাকে মাত্র ৩ মাসে অব্যহতি দিয়ে থাকলে আমাদের মতো ক্ষুদ্র জাতিকে নিশ্চই বেশিদিন ভোগাবেন না। দুই; গরমের প্রভাব নিয়ে ডা. জাকির সাহেবের ফতোয়া খুব একটা সত্য প্রমান হয়নি। তবে হ্যা, ভদ্রলোকের কথা একদম মিথ্যেও হয়নি। আমি নিজস্ব ব্যখ্যায় গেলাম না। শুধু সুহৃদ Mohidus Samad Khan এর একটা নিজস্ব বিশ্লেষণ বলছি (উনি ভাইরলজি নিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন)। তিনি যা বলছেন, তা হল-”৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তুলনায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে কভিড-১৯ এক হাজার গুনের চেয়েও বেশি দুর্বল। সুতরাং শীত প্রধান দেশের তুলনায় গ্রীষ্মকালীন দেশে কভিড-১৯ এর সংক্রমণ ’ধীর’ হবে। Survival and propagation are two different issues. We are more concerned about the propagation. At 70 deg C COVID-19 barely can survive; at 56 deg C a large population survives for few minutes; at 37deg C a large population deteriorate 1000 times and denatured within 24 hrs. The time would be faster for trace amount virus. Thermal denaturing depends on protein structure not RNA sequence (COVID-19 has four protein layers).”
আমি সেই সাথে ভারতকে দেখে একটু আশা পাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত একই দিনে (২১ শে জানুয়ারী) প্রথম সংক্রমন দেখে। আজ ৬৮ দিন পরে যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমন ১ লক্ষ+ অথচ ভারতে ১০০০। (হ্যা, হতে পারে, ভারতও আমাদের মতো পরীক্ষা না করেই ফার্স্ট বয়।) তবে খেয়াল করুন, এমনিতেই ভাইরাসটি একেক দেশে একেক রকম আচরন করছে। তাই ক্রান্তীয়, আফ্রিকী ও দক্ষিণ এশিয় দেশগুলোতে এর অপেক্ষাকৃত কম সংক্রমন বাংলাদেশকে আশা দেখাতেই পারে।
তিন; পৃথিবীর সকল মহামারির ইতিহাস বলে, তার আক্রমন শুরু হয় দামামা বাজিয়ে, তবে প্রতিটারই একটা লাইফ সাইকেল থাকে। একটা চক্র ধরে মহামারি এগোয়। চক্র শেষে সে থামে। ইজরেলি বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভাইরাসের চক্রটা ৬-৮ সপ্তাহের। তারপরই সে নামতে শুরু করে। আবার অনেক বিজ্ঞানী বলছেন, একটা বিরাট সংখ্যক লোকের মধ্যে সংক্রমনটি ছড়িয়ে গেলে একসময় সে নিজেই ডিফেন্সের মুখে পড়ে। মানুষের বডিতে সৃষ্ট ন্যাচারাল এ্যান্টিবডির প্রতিরোধে। যুক্তরাজ্য কিন্তু এই থিওরী মেনে প্রতিরোধের স্ট্রাটেজি বানিয়েছে।
চার; বাংলাদেশ সরকার খুব সময়মতো ১০ দিনের অঘোষিত লক ডাউন ঘোষনা করেছে। ২৬ মার্চ হতে ৪ এপ্রিল সময়টি কিছু বৈজ্ঞানিক ও কৌশলগত কারনেই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ন বলা হচ্ছে। এই মোটামুটি (অনেক ত্রূটি সত্বেও) লকডাউনটি বাংলাদেশকে অনেকটা সুরক্ষা দেবে বলে অনেকেই মনে করছেন।
পাঁচ; IEDCR তথা সরকারের প্রতিদিনকার ঘোষনাকে আপনি যতই মিথ্যা, মনগড়া ও ত্রূটিপূর্ন মনে করেন না কেন, ৮ তারিখ হতে ২৯ মার্চ মাত্র ৪৮ জন আক্রান্ত যদি আপনার কাছে ভূয়া মনে হয়, সেই অবিশ্বাসেরও যথেষ্ট যৌক্তিকতা আছে-আমি জানি। তবে আবার আরেকটা জিনিসও সত্যি। বাংলাদেশ কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশকে টেক্কা দিয়েই অনেক বৈশ্বিক মহামারি জয় করেছে। যা অনেকেই পারেনি। আমাদের ICDDR’B কিন্তু বিশ্বস্বীকৃত। আমাদের অত্যন্ত সীমিত সামর্থের অনেক সরকারী প্রতিষ্ঠানই কিন্তু অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। আমাদের একজন খুবই জুনিয়র ডাক্তার কিন্তু অত্যন্ত সস্তায় ও খুবই সুলভ উপায়ে বাচ্চাদের নিউমোনিয়ার জন্য ভেন্টিলেশন বানিয়েছেন। সরকারকে আপনার আস্থায় নিতে হবে। বিশেষত, আমি আর কিছু না হলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তি শেখ হাসিনার বুদ্ধিমত্তা, মেধা, সততা, আন্তরিকতা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বের সত্যিই প্রশংসা করি। এখন পর্যন্ত কিন্তু গত ১১ বছর তিনি কামাল করেছেন। মনে করে দেখুন, যেই মুজিব বর্ষের অপবাদ দিয়ে সরকারকে এত গাল দিলেন, সরকার কিন্তু সব অনুষ্ঠান বাতিল হবার কষ্ট বুকে নিয়েও ৮ তারিখে IEDCR কে সংক্রমনের ঘোষনা ঠিকই করিয়েছে। তদুপরি, একটা ছোট্ট লজিক বলি। ৮ তারিখ হতে ২৯ তারিখ-২২ দিনে যদি সত্যিই হাজার হাজার করোনা রোগী তৈরী হত, তাহলে টেস্ট হোক না হোক, সনাক্ত হোক বা না হোক, হাসপাতালগুলোতে কিন্তু হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ নিউমোনিয়ার রোগী আসত, মরত। ফেসবুকের কল্যানে কিন্তু সেটা গোপন রাখতে পারত না, সরকার চাইলেও। সেই দিকটা কি আমরা দেখছি? এমনকি, এই নিউমোনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জার ভরা মৌসুমে? না তো!
[হ্যা, অনেকে বলছেন, রোগীরা ভয়ে হাসপাতালে যাচ্ছে না। সেটা হলেও, এত বিশাল সংখ্যক কেস থাকলে সেটা ফেসবুকে অন্তত ছড়াতো।]
১৯. ভাইরাসটি কীভাবে ছড়ায় তা নিয়ে বহুত নাটক হয়েছে। সেগুলো আর বলছি না। নানাদিক চিন্তা করে আমার ব্যক্তিগত ধারনা হয়েছে, হাত ধোয়া নিয়ে আমরা তোলপাড় করলেও, আসলে হাতের মাধ্যমে ছড়ানো, বা পড়ে থাকা ভাইরাস হতে সংক্রমণ হয়তো হবে অত্যন্ত সীমিত। এমনটা ভাবার কারন হলেন মিসেস ট্রুডো, প্রিন্স চার্লস ও বরিস জনসন। তারা তিনজন নিশ্চই ১৩ নম্বর বাসের হ্যান্ডেলে হাত রাখেননি, কিংবা বাজারের জুম্মন কসাইয়ের পশ্চাৎদেশ ছুয়ে যাওয়া জীবানুযুক্ত টাকা হাত দিয়ে ধরেননি। আমার মোটামুটি মনে হচ্ছে, মূলত, একজন ভাইরাসবাহীর (লক্ষণ প্রকাশিত হোক বা না হোক, ৬ ফুট দূরত্বের মধ্যে চলে এলে তার শ্বাস, হাঁচি, কাশি ও লালার সাথে ছড়িয়ে পড়ে যে ড্রপলেট বা এরোসল কণা, সেটাই ওই ক্লোজ কনটাক্টে আসা লোক বা লোকজন নিঃশ্বাসের সাথে গ্রহন করে আক্রান্ত হতে পারে। মূলত একারনেই ডিসট্যান্সিং নিয়ে এত সতর্ক করা হচ্ছে। কিন্তু বাঙালী ধরেই নিয়েছে, মাস্ক মুখে দিয়ে রাখলেই কেল্লা ফতে। করোনার বাপও কিছু করতে পারবে না। যদিও ফ্যাক্ট হল, মাস্ক মুখে দিয়েও আক্রান্ত হতে পারেন। কীভাবে?
এখন পর্যন্ত আমাদের পাবলিক জানেন, যে, শুধুমাত্র যার জ্বর, কাশি, সর্দি হয়েছে-এমন লক্ষন প্রকাশিত ব্যক্তিই কাউকে সংক্রামিত করতে পারেন। (সম্ভবত স্বাস্থ্যমন্ত্রীও তাই বিশ্বাস করেন, তা না হলে, তিনি ঘাড়ের ওপর শ’খানেক লোক নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতেন না।) জ্বি না। আপনি যদি আজ যেকোনো প্রকারে আপনার শরীরের ভিতরে (শ্বাসতন্ত্রে) ভাইরাসটি নিয়ে ফেলেন, তাহলে আগামী কমপক্ষে ১৪ দিন আপনার অসুখ প্রকাশ পাক বা না পাক, আপনার ক্লোজ কনটাক্টে (৬ ফুট) যারাই আসবে, তাদের মধ্যে সংক্রামিত হতে পারে। আপনার নিঃসৃত ড্রপলেট যেখানে পড়বে, সেখানে কেউ টাচ করলেও তার হাতে, কাপড়ে ভাইরাস চলে যাবে। তারপর মুখে, নাকে সে হাত দিলেই শ্বাসতন্ত্রে চলে যাবে। বুঝলেন। ডিসট্যান্সিং এবং হাঁচি কাশির আদাব রক্ষা নিয়ে এত কথা এজন্যই বলা হচ্ছে। আর যারা মুখে মাস্ক লাগিয়ে তারপর সেই মাস্কে ঘন ঘন হাত দিচ্ছে, মাস্ক নাকের নিচে নামিয়ে কথা বলছে, মাস্ক লাগিয়েও গণ কাপে চা খাচ্ছে, শেয়ারড সিগারেট খাচ্ছে, দোকানের লাইটার দিয়ে মুখের সিগার জ্বালাচ্ছে, তেনারা রেডি থাকুন। আর মাস্কের কোয়ালিটি আশা করি ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন। বাজারের শুধুমাত্র N95 ও সার্জিক্যাল মাস্কই যা কিছুটা সুরক্ষা দেবে। বাকিগুলো স্রেফ আইওয়াশ। যাস্ট আইওয়াশ ও মনের সান্তনা। হ্যা, মোটা সূতি কাপড়ের তিন পরতের ঘরোয়া মাস্ক আপনাকে সামান্য কিছুটা সুরক্ষা দেবে। বিশ্বাস না হলে আরও পড়াশোনা করুন।
২০. হাত ধুয়ে ধুয়েই বাঙালরা করোনার মহামারি পার পেয়ে যাবে কিনা জানি না। হাত ধুতে ধুতে চামড়া উঠে যাবার যোগাড়। যেই জাতি মল ত্যাগ করে হাত ধোয় না, সে নাকি কোনো কারন ছাড়াই অদৃশ্য এক ছাড়পোকার ভয়ে হাত ধোবে। হাত ধোয়া নিয়েও ডিলেমা। মনে করুন, আপনি ময়লা হাত দিয়ে (যাতে ভাইরাস থাকার কথা) কল ছাড়লেন। কলে তো ভাইরাস লেগে গেল। আপনি সাবান নিয়ে হাত কচলে কচলে ধুয়ে নিলেন। হাত জীবানুমুক্ত হল। তারপর কল বন্ধ করতে যেই আবার নবে হাত দিলেন, আপনার সদ্য পরিষ্কার হাতে জীবানু আবার লেগে গেল। লাভটা কী হল? হাত ধোয়ার সবকদাতারা এই ভুলভুলাইয়া নিয়ে ভাবেননি, কাউকে কিছু বলেনওনি। শেয়ার পাগল জাতি শেয়ার করেই খালাস। [আমি যেটা করছি, সেটা হল, প্রতিদিন সকালে একবার ঘরের সমস্ত সম্ভব স্থান ব্লিচ পানি স্প্রে করি। তারপরও, প্রতিবার হাত ধোয়ার সময়ে কলটাকেও সাবানে ধুই।] ঘটনার গভীরে যেতে সবার অনীহা। [শুধু ধর্ষকাম এই জাতির একটা গভীরত্বেই আগ্রহ, সেটা হল, পর্ণ দেখে দেখে অবাস্তব আকারের পুরুষাঙ্গের অধিকারী হওয়া আর তা দিয়ে যৌনসঙ্গীর যৌনসুরঙ্গের একদম গভীরতম প্রদেশে আঘাত করে পুরুষত্বের গৌরব হাসিল করা। দুঃখিত, কীসে কোন প্রসঙ্গে এসে পড়লাম।]
বাজারে আরেকটা পোস্ট খুব বিক্রী হচ্ছে। পাবলিক খাচ্ছে। সেটা হল ডিসইনফেকট্যান্ট বানানো। আমি এটারও গভীর গবেষনা করার চেষ্টা করলাম। আমার গুরু রিজভান ভাইয়ের সাহায্য নিলাম। ডিলেমাটা বলি। বেশিরভাগ অথেনটিক প্রতিষ্ঠান, আমেরিকান স্বাস্থ্যবীদদের পরামর্শ হল, সারফেস, এপ্লায়েন্সেস জীবানুমুক্ত করতে ৩.৭৮ লিটার পানিতে ৫ টেবিল চামচ ব্লিচিং পাউডার গুলে সেটা ছিটাতে হবে। আমাদের মহান SHITEE কর্পোরেশনের একটা পোস্টার সমানে শেয়ার করছেন জনদরদী ফেসবুকাররা। যেটাতে দেখানো হয়েছে, ওই একই কাজে ২০ লিটার পানিতে ১ টেবিল চামচ ব্লিচ দিলেই ধন্বন্তরি কমন্ডলু জল তৈরী। ওটা যত্রতত্র ছিটালেই করোনা পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে পালাবে। তা আমাদের শিটি কর্পোরেশনে কতজন ভাইরলজিস্ট কাজ করেন, যারা এটা স্বপ্নে পেয়েছেন? তারপর আসুন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও WHO যেখানে বলছে, ব্লিচ লিকুইড বানাতে, স্প্রে করতে হলে, হাতে হ্যান্ড গ্লাভস পড়তে, মাস্ক পড়তে, সেখানে বঙ্গদেশে এই কমন্ডলু জল গায়ে ছিটিয়ে জাতিতে পাপমুক্ত করা হচ্ছে। করোনায় যদি আমরা বেঁচেও যাই, এরপর ক্যান্সারে মরা নিশ্চিত। আরেকটি মহান পোস্টে দেখলাম, ব্লিচ মিশ্রন থিতিয়ে গেলে ওপরের স্বচ্ছ তরল ব্যবহার করবেন। আবার আমাদের হিল্লোল ভাই ও নওশীন আপা আমেরিকা হতে জানিয়েছেন, না, বারবার ওই জল ঝাঁকিয়ে নিতে হবে। যাহোক, শেষ খবর পাওয়া তক আমি এই ডিলেমার সমাধান পাইনি। তাই আপাতত ৩.৭৮ লিটার বা ১ গ্যালন পানিতে ৫ টেবিল চামচ ব্লিচ পাউডার মিশিয়ে সেটা ১ ঘন্টা থিতিয়ে যেতে দিয়ে তারপর প্রতিবার ঝাঁকিয়ে নিয়ে স্প্রে করছি। গায়ে বা কাপড়ে না। চাবি, দরোজা, ছিটকিনি, জুতার তলা, প্লাস্টিক এগুলোতে। সোফায়, পর্দায় করলে ওগুলো ১ সপ্তাহও টিকবে না। জ্বলে যাবে। শেষ কথা: ভারতের ৩৮ বছর বয়সী এক দিনমজুর দিল্লীতে লকডাউনে আটকা পড়ে কাজ হারিয়ে ৩০০ কিলোমিটার দূরে তার বাড়িতে রওনা হন পায়ে হেঁটে। ২২০ কিলোমিটার হাঁটার পরে মারা যান পথে। এতবড় হৃদয়বিদারক অমানবিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করছে বিশ্ব। অসহায়ভাবে। একটা লেখায় বলেছিলাম, এই দুর্যোগ কেটে যাবার পরে পৃথিবীর একটি পুনর্জন্ম হবে। সবকিছু নতুন করে ভাবতে, বলতে, বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে মর্ত্যের মানুষেরা। এই স্টেটমেন্টটি একটি ব্যপকভিত্তিক স্টেটমেন্ট। আজ ২৯ মার্চ এর সামনে দাড়িয়ে সেই লেখাটার যৌক্তিকতা খুঁজে পাচ্ছেন কি? মনে না পড়লে আবার বলি:-[……..
জানি না কেন। বিশ্বব্যাপী একটা ভয়ানক ওলটপালট বোধহয় অতি আসন্ন। এই করোনা আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়ে যাবে। অনেক সত্য সামনে নিয়ে আসবে। অসেক কিছুই নতুন করে ভাববার রাস্তা খুলে দেবে মনে হচ্ছে। দয়া, মায়া, মহব্বত, ভাতৃত্ব, পরিবার, বন্ধন, দায়ীত্ব, মানবতা, সম্পর্ক, নৈতিকতা-অনেক কিছুই নতুন করে ভাববার কারন ঘটার সমূহ সম্ভাবনা আছে। মহামারীতে কতজন মরবে আর মরবে না-তারও চেয়ে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক এখন অর্থনীতি। এই অপ্রতিরোধ্য ডিপ্রেশন সামলানোর ক্ষমতা কার আছে? এতটা অসহায় কি পৃথিবী কখনো হয়েছে? কেউ আক্রান্ত হলে তাকে সেবা করা বা নিদেনপক্ষে হাসপাতালে নেবার মতো কাউকে পাওয়া যাবে কিনা জানি না। মরলে তার কাফন দাফন করতে কেউ কি এগোবে? সর্বময় প্রভূর রহম ছাড়া কেউ, কোনো কিছুই যথেষ্ট মনে হচ্ছে না।] ”গত ৪৮ ঘন্টায় নতুন কেউ সনাক্ত হয়নি” এবং “পুলিশ যেন বাড়াবাড়ি না করে, সরকার লকডাউন করেনি, ছুটি দিয়েছে”-এই দুটি মহান বাণী প্রচার পেলে পাবলিক যে সব রাস্তায় বের হয়ে পড়বে-এতটুকু বোঝার মতো মানুষেরও এদেশে অভাব পড়েছে। করোনার ভয়ও নেই, পুলিশের প্যাঁদানির ভয়ও আর নেই-পাবলিক কেন বাসায় থাকবে? তারা ৪ দিন ধরে মালাই চা খায় না। তার উপর মুরব্বীদের কান ধরানোয় মিসেস সাইয়েমাকে যেভাবে জাগ্রত জনতা ও ‘কত্তিপক্ক’ সাইজ করেছে, তার পরে আর পাবলিককে কে ঠেকায়? ফলাফল-রাস্তায়, গলিতে, বাজারে মানুষে সয়লাব। মাত্র ৩ দিনের লক ডাউনের পরেই। ৩৭ ডিগ্রীর গরম যদিওবা করোনাকে কিছুটা আটকায়, বঙ্গদেশের রঙ্গপ্রিয় উশৃঙ্খল জাগ্রত জনতা সেটার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে রাস্তায় হোলি উৎসবে নেমেছে। দুর্ভাগ্য, যে, যারা সচেতন ও নিরীহ, তারাও ভুগবেন এই আহাম্মকদের সাথে। গোটা বাংলাদেশ একটা মিরাকল ঘটবে-এই আশায় বসে আছে। এই মিরাকলের স্বপ্ন দেখবার একমাত্র যু্ক্তি হল, ”আমাদের লড়াকু অতীত ইতিহাস। বঙ্গবন্ধুর অভিভাবকত্বে আমরাই খালি হাতে পাকিস্তান নামক দানবকে বধ করেছিলাম।” আমি যৌক্তিক মানুষ হলেও অন্তত এই অবাস্তব মিরাকলের আশাটি পূরন হবার খুব কামনা করছি।
#corona #covid19 #epidemic #pandemic #disease #disaster #humanity #government #publicreview