আমাদের এই উল্টো নগরে সবই কেমন পাল্টাউল্টো। যেটা যেমন হবার কথা, হয়ে আছে সেটা তার বিপরীত। যেটা যেমন থাকার কথা, বাস্তবে সেটাকে দেখতে পাবেন ১৮০ ডিগ্রী বিপরীত। একদম যেন, মিউনিসিপ্যালিটির ডাস্টবীনের মতো।
ডাস্টবীনটার কাছে গেলে দেখবেন, ওর মধ্যে কুত্তা আছে, বিলাই আছে, দু’চারটা গরু আছে। আছে দোপেয়ে কিছু ছোটলোক মানুষও। শুধু ডাস্টবিনে যেটা থাকার কথা, সেটাই নেই-ময়লা। ময়লাটার স্থান হয়েছে রাস্তায়।
ভদ্দরনোকরা তাদের রোজকার নাগরিক উচ্ছিষ্টকে আঙুলের ডগায় ধরে অতি ঘৃনা সহকারে চুপসে যাওয়া ব্যবহৃত কনডমের মতো ছুড়ে মারে রিক্সা বা স্কুটির ওপর হতে। ঘৃন্য ময়লার প্যাকেট ডাস্টবিনের বাইরে লুটায়। স্বচ্ছ পলিথিনের প্যাকেটের ভিতর লাউ কুমড়ার ছোকলার ভাঁজ থেকে উঁকি মারে ডিউরেক্সের প্যাকেটও। রাস্তার চ্যাংড়া টোকাইরা ময়লা হতে তাদের জীবন সংগ্রহের সময় সেই প্যাকেট দেখে কত চুটকি ইয়ার্কি মারে। কেউ কেউ সেই জীর্ন কনডম তুলে ধুয়ে নেয়। মুখে ফুলিয়ে বেলুন নিয়ে খেলার চেষ্টা করে। তার কাছে বার্থডে বেলুন আর কনডম নামক রাবারের টুকরোর বেলুনের ঐশ্বর্য একই।
কনডম বাঙাল সমাজে এক নিষিদ্ধ বস্তু। নিষিদ্ধ কিন্তু আরাধ্য। এক ভয়ানক ট্যাবু। তা এই সমাজে অনেক কিছুই ট্যাবু। একটা জিনিস আছে, সবাই খায়, মাথায় দেয়, বুক পকেটে রাখে, পান্তাভাতে লবণের মতো মাখে, বগলদাবা করে ঘরে ঘরে নেয়, তবু বলতে গেলেই গাল গোলাবি আর মুখে ফিসফিস-এমন জিনিসের নামই ট্যাবু। না মশাই, কানে কম শুনলে কানে সুরেশ সরিষার তেল ঢালুন।
আমি চিনি কম টাবুর নাম করছি না। বলছি ট্যাবুর কথা। এই বাঙাল সমাজে ট্যাবু নিয়ে কথা বলা মানে নিজেকে টার্গেটেড করে ফেলা। নিজেকে ভদ্দর সমাজ হতে ধুলোয় লুটানো।
বিশেষত আপনি যদি সমাজে, তা সে মনুষ্য সমাজই হোক, কিংবা ফেসবুকের ছায়াসমাজেই, একজন দশজনের একজন হয়ে থাকেন, তাহলে আপনাকে খুব সমঝে কথা বলতে হবে। খুব খিয়াল করে, খুব তমিজের সাথে, কয়েকবার গলা খাকারি দিয়ে তবেই কিছু নিয়ে কথা বলতে পাবেন আপনি। ভাবমূর্তি বলে একটা জিনিসতো আছে। আপনি তো ট্যাবু নিয়ে কথা বলে নিজের জগত জোড়া ভাবমূর্তির সাথে বেঈমানি করতে পারেন না।
কিন্তু আমার তো আর সেই বালাই নেই। ভদ্দর সমাজে ব্রাত্য তো সেই কবে। তাই ট্যাবু নিয়ে কথা বললে কে আটকায়? আফটার অল, আমাকে তো আর মেয়ে বিয়ে দিতে হবে না। আমাদের বাঙাল সমাজে ট্যাবু আছে অসংখ্য। কয়টার কথা বলব? এই দেশে সোশ্যাল ট্যাবুর ভয়ে ফুটপাত হতে শুরু করে দামী মলে তক নিজের একান্তই জরুরী পরিধেয় জাঙিয়া কিনতে গেলে, অতি সাহসী পুরুষও কেমন চোরের মতো করে।
যতটা দেখেছি, আজকাল বড় বড় মলে (মানুষের মল নয় কিন্তু-সেটাও এক ট্যাবু) সবরকম পোষাকই কেনার আগে ট্রায়াল দেয়া যায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত জাঙিয়া ট্রায়াল দিয়ে কিনতে দেখিনি। যদিও ট্রায়াল দেবার মতো প্রয়োজনীয়তা বলে যদি কিছু থাকে, সেটা জাঙিয়ার ক্ষেত্রেই সর্বাধিক হবার কথা।
আমার এক সুহৃদ একবার মশকরা করে একটা জোক লিখেছিল, ”করোনার লকডাউনে সবচেয়ে কষ্টে আছে, সেই নতুন জামাই, যে প্রথমবার শশুরবাড়ি গিয়ে লকডাউনে পড়েছে, আর গ্রামের একমাত্র ওষুধের দোকানটা তার তার শশুরেরই।” আজও মানুষ অতি সন্তর্পনে, দোকানে গেলে চারদিক দেখে, দোকানীকে চোখের ইশারায় ’জিনিস’ দিতে বলে। দোকানীও কোনো রা কাড়ে না। দামাদামি নেই। কোয়ালিটি চেক নেই। এক্সপায়ারি দেখা, ব্রান্ড চয়েস কিচ্ছু নেই। দোকানী চোরাই মালের মতো বের করে একটা কাগজের প্যাকেটে মুড়ে গছিয়ে দেয়। কাস্টমারও ওই রাবারের টুকরোর প্যাকেটটা অবিশ্বাস্য দ্রূততায় পকেটস্থ করে।
আমার খালি মাথায় আসে না, এত জরুরী একটি কনজ্যুমার প্রোডাক্ট কেন ওষুধের দোকানে বিক্রী হবে? এটা তো কোনো ওষুধ না। মুদী দোকানে কিংবা সুপার শপে বিক্রী হতে বাঁধা কোথায়? বাঁধা আছে-ওই যে, ট্যাবু। না মশাই, ট্যাবু কে যেমন আপনি টাবু পড়েছেন, তেমনি এখন আবার ভাববেন না, আমি কনডম নিয়ে কথা বলতে এত বিতং করছি কিনা। না, আমার সেই ইচ্ছে নেই। কনডম আপাতত বাদ দিলাম। যাবার আগে আরেকটা গল্প।
এক লোক নতুন বিয়ে করেছে। ডাক্তারের কাছে কিছুদিন পরিবার পরিকল্পনা করার ব্যাপারে বুদ্ধি চাইলে ডাক্তার তাকে এক প্যাকেট কনডম দিয়ে সেটাকে ভালোবাসাবাসির সময় ব্যবহার করার উপদেশ দিলেন। ওই লোক কিছুদিন পরে ডাক্তারে চেম্বারে গিয়ে লাগাল মহা ক্যাঁচাল। সমস্যা হল তার বউ প্রেগন্যান্ট। ডাক্তার জানতে চাইল, কেন, আপনি ওই কনডমগুলো ব্যবহার করতেন না? লোকটা বলল, “হ্যা, করেছি তো,। ২৪ ঘন্টাই পরে থেকেছি।” “তাহলে তো এমন হবার কথা নয়। আচ্ছা, আপনি ২৪ ঘন্টা কনডম পরে থাকলে হিসু করতেন কী করে?” ডাক্তার শুধোলেন। “জ্বি, আমি কনডমের ডগায় ছোট্ট একটা ছিদ্র করে নিয়েছিলাম।”
না, এই লেখাটা উদ্দেশ্যহীনভাবে শুরু করেছিলাম। দুপুর বেলা। ছুটিতে। কাজ কাম নেই। বসে বসে গুলতানি মারতে মারতে লেখা। ট্যাবু নিয়ে লেখার ইচ্ছে অনেক দিনের। তবে সত্যিই কাজটা রিস্কি। জেল হতে শুরু করে চাপাতি-অনেক ঈদ উপহারই কপালে জুটবে-যে এই বঙ্গদেশের কাতারে কাতারে সোশ্যাল ট্যাবু নিয়ে লিখতে যাবে। তবু নিয়ত রইল। হয়তো কোনোদিন জীবনের মায়া আরও কমে যাবে। তখন হয়তো সাহসটা বাড়বে। ততদিন পর্যন্ত আমি আপনাদের ত্যানা কাপড়ের নেংটির আবছায়ায় আড়াল থাকা ট্যাবু তথা চোরা লজ্জাটাকে আর টান মারব না।
বলতে যাব না, প্রশ্ন করব না, যে, এই যে, বঙ্গদেশে প্রকাশ্যে ‘সেক্স’ শব্দটা উচ্চারন করলেও চারপাশ হতে অন্তত দশটি কান খাড়া হয়ে যায়। এই যে বঙ্গদেশে প্রেম এক নিষিদ্ধ গন্ধম, অথচ এদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি-তা নিয়েও কোনো কবিতা লিখব না। চেপে রাখব। আপনিও চাপিয়ে রাখুন। হয় নিজের অবদমিত কামনাকে, না হয় অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহসকে।
(সম্ভবত) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ”ভালোবাসা নিম্নগামী।” বঙ্গ ভূখন্ডের এপাড় ও ওপাড়ের মানুষের মধ্যে একটি অদ্ভূৎ মিল আছে। সেটা মানুষে মানুষে সম্পর্ক নিয়ে। বঙ্গবাসী বাঙালদের ভাবনায় মানুষের সাথে মানুষের যাবতীয় সম্পর্ক বা মিথস্ক্রিয়ার ভাবনাটা শেষতক কেন যেন Physical Intercourse এ গিয়েই পর্যবসিত হয়। এঁদের মানস জগতে, মানুষে মানুষে, বিশেষ করে নারী ও পুরুষের সাধারন সম্পর্ক, বিশেষ গাঢ় সম্পর্ক, ভাব, ভাব বিনিময়, যৌথবাস, বন্ধুত্বপূর্ণ পৃথকবাস, বন্ধুত্ব, পরিচয়, সঙ্গদান, এমনকি হাসিমুখে নারী ও পুরুষকে কথা বলতে দেখা-এর সবকিছুই কেন যেন ঠেলতে ঠেলতে গিয়ে শেষতক একটাই ইঙ্গিতে গিয়ে শেষ হয়, যেটার নাম, “শরীর”। যেন শরীর বিনিময় ছাড়া মানুষের আর কাজ নেই, আর কোনো রকম সম্পর্ক হতে নেই, হবার নেই, হবার সম্ভাবনাই নেই।
দু’জন মানুষকে, বিশেষত যদি সেখানে একজন হয় নারী (সে যে বয়সীই হোক,) বাঙাল দর্শক ও ‘সমাজ’ নামক গণদর্শকের কাছে সেটি ঘুরেফিরে ‘ফিসফাস’সুলভ বিশেষ একটি কাজ (সোজা ভাষায় যৌনতা)র ইঙ্গিতে গিয়েই শেষ হয়। নানা কথায়,নানা ভাষায়, নানা ইঙ্গিতে, ঘুরিয়ে, ফিরিয়ে, রং চড়িয়ে নারী ও পুরুষের (এমনকি আজকাল পুরুষ-পুরুষ বা নারী-নারীও) যে কোনো সুসম্পর্ক বা বন্ধুত্বকে নিয়ে কৃত যাবতীয় গুনগুন, ফিসফাস, কানাকানি, চোখ টেপাটিপি-সবকিছুর একটাই ইঙ্গিত-”ওঁরা নিশ্চয়ই শোয়।” ’যৌনতা’ নিয়ে চরম ট্যাবুতে ভোগা এবং অত্যন্ত লজ্জাশীলা এই জাতির জনসংখ্যা কী করে ২০ কোটি হয়, সেটি অবশ্য আরেক রহস্য।
সম্ভবত বাংলা ছায়াছবিতে দুটো গোলাপ ফুল স্লো মোশানে আলো কমার সাথে সাথে ধীরে ধীরে কাছে আসার পরের সীনে যেভাবে শাবানা বমি করতে শুরু করতেন, সেভাবেই। [ঈদের আগের রাতে, মানে চান রাতে ঈদ নিয়েই কিছু লিখতে হবে-এমন মাথার কিরা কেউ যেহেতু দেয়নি, তাই লেখাটা দিলাম। আপনার ট্রল মেসেজ ফরোয়ার্ড করে দায়সারা ঈদ শুভেচ্ছা জানানোর ফাঁকে ফাঁকে সময় হলে এটা পড়তে পারেন।
ঈদ শুভেচ্ছা জানানো বা ভাববার মতো অবস্থায় আমরা নেই। তবু কামনা করি, ভাল থাকুন। সবাইকে নিয়ে। করোনা কালে নিজের ভাল নিজের হাতে। অন্যের ভালটাও আপনার হাতে। অন্যকে ও নিজেকে নিরাপদ রাখতে নিয়ম মানুন। পোলাউ কোর্মা যাই খান, ঘরে থাকুন।]
#eidcelebration #condom #sextaboo #physicalintercourse #lust #kissing