দূরদর্শনে মহামতি বঙ্কিমচন্দ্র’র কপাল কূন্ডলা উপন্যাসের নাট্যায়ন দেখছি।
যথারীতি কলকাতার দূরদর্শন চ্যানেল অন্যান্য নাট্যায়নের মতোই কপাল কূন্ডলার গুনগত ও শিল্পমানের দফারফা করে দিয়েছে। তা নাটক যেমনই হোক, নবকূমার বনে গেছে সবার জন্য কাঠ কাটতে। আর সবাই তাকে রেখেই চলে যাচ্ছে-সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে এই লেখা লিখছি। যুগে যুগে এভাবেই নবকূমাররা অন্যের জন্য আত্মত্যাগ করে আর সুবিধাভোগী গোষ্ঠী নবকূমারদের সমাজের স্বার্থে ‘মহামানব’ মূলা দেখিয়ে বলি দেয়।
শুধু অপেক্ষায় আছি, সেই মহান ডায়লগটি কখন আসবে-তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?”
বিবিজানকে নিয়ে একটা জরুরী কাজে ঠান্ডার মধ্যে বাইরে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে কোথাও একটা ধর্মীয় বক্তৃতা হচ্ছিল। বেশ কিছুদূর পর্যন্ত বক্তার কথা শুনতে শুনতে এলাম। সেটা করতে গিয়েই কয়েকদিন আগে ভাবা একটি বিষয় আবার মাথায় এলো। মহামতি ইসহাক নিউটন ও তার এনটারকোটিক মহাদেশ আবিষ্কারের কল্পকাহিনীকে নিয়ে যতই ট্রল করুন না কেন, পাঁকেচক্রে ভুলে থাকা বা নজরে না পড়া একটি অবাক সত্য আপনাকে আমি বলছি।
শীতকাল এবার অনেক আগেই বাংলাদেশে অবতরন করে ফেলেছে। তার বৈজ্ঞানিক কারন আর যাই হোক, আমাদের মৌসুমী ধর্মীয় আলোচকদের জন্য সেটা শাপেবর। বক্তৃতার মৌসুম অনেক দীর্ঘ হবার সুযোগ হয়েছে এতে।
আগামী দুই আড়াই মাস তাদের খুব ব্যস্ত যাবে। যতটা জানা যায়, উপরের সারির জনা বিশেক বক্তা আছেন, যাদের সিরিয়াল ও বুকিং নিতে হয় তিন চার মাস আগে। শীত না পড়লে তাদের মৌসুম খারাপ যায়। যাহোক। আমার মূল লক্ষ্য সেটা নয়। এই প্রথা ভাল, না খারাপ-সেটাও বিচার করার আমি কেউ নই। তাছাড়া, আমি এটাও মনে করি না, যে, সেই সত্য যামানার মতো ধর্মীয় মুরব্বীরা বাধ্যতামূলকভাবে ফকিরি দশায় থাকবেন আর সব সেবাই মুফতে বিলিয়ে যাবেন, যেহেতু সমাজে সবকিছুই এখন বদলেছে। জগতে সবই বানিজ্যিকীকরন হয়েছে।
এমতাবস্থায় শুধু একটি বিশেষ ঘরানার মানুষদের জোর করে চাপিয়ে দিয়ে ফকিরী জীবন যাপনে বাধ্য করার অধিকার সমাজের অন্তত নেই। যাহোক। যেটা ট্রলকারীদের বলতে চাচ্ছি, সেটা হল, যতই ট্রল বা ঠাট্টা মশকরা করেন না কেন, এই মৌসুমী ওয়ায়েজিনরাই কিন্তু বাংলাদেশের প্রায় একমাত্র জাতীয় বক্তা যাদেরকে আগে হতে শিডিউল দিয়ে আনাতে হয়। আর তারাই একমাত্র বক্তা, যাদেরকে হেলিকপ্টারে করে উড়িয়ে আনা নেয়া করা হয়। বাংলাদেশের তথাকথিত মূলধারার জ্ঞানী বা বক্তা কিংবা কোনো প্রোফেসরকে তার বক্তব্য দেবার জন্য বুক করে বা হেলিকপ্টারে উড়িয়ে আনার কোনো নজির আমি অন্তত শুনিনি। যাহোক আমি ভুলও হতে পারি।
ইসহাক নিউটনদের যতই ট্রল করুন, এই দিক দিয়ে কিন্তু তারা আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবি ও দামী দামী বক্তাদের টেক্কা দিয়েছেন। ঝামা ঘষে দিয়েছেন আমাদের দূরদর্শনের বাঘা বাঘা ‘টকমারানী’দের মুখে (টকমারানী শব্দটি ধার করা)। আর যেই সম্মানী বা হাদিয়া তাদের দেয়া হয়ে থাকে, সেটা যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাপ মারা (খন্ডকালীন) অধ্যাপক সাহেবদের চেয়ে ঢের বেশি। হ্যা, এই অনুচ্ছেদটুকুর সার্বিক বিচার নিয়ে আরও অনেক আপেক্ষিক আলোচনা করার সুযোগ আছে। আপাতত সেদিকে গেলাম না।
জাজমেন্টাল হয়ে পড়বেন না। কাউকেই ছোট করা বা কারও কাজের সমালোচনা আমার লক্ষ্য নয়। ভাষাগত চটুলতা দেখেই তীর্যক আক্রমনের খাড়াটা হাতে নেবেন না।
আজ বড়দিন। যদিও সত্যিকার অর্থে আজকের সৌরদিনটি তেমন বড় নয়। ইংরেজি ক্রিসমাস কীভাবে বাংলাতে বড়দিন হয়ে গেল, তার কিছু তত্ব তালাশ পড়ছিলাম সুহৃদ রিদওয়ান আকরামের লেখায়।
আমাদের রাজনীতিবীদ, সুশীল সমাজ, পেশাজীবি সমাজ, কর্পোরেট সমাজ মুখে যতই বলুক, “এই দেশ এক মহা অসাম্প্রদায়ীক দেশ”, কাজের বেলায় ঠনঠন।
বড়দিনে ছুটি ছিল। বড়দিনে বিশ্বাস করি আর না করি, ছুটিটা কিন্তু বেশ উপভোগ্যই। যাহোক, নেয়ামত ফেরত দিতে নেই। তাই (তথাকথিত ’বিধর্মী’) উৎসবে ছুটিটা ঠিকই নিয়েছি। তো, এই বড় বা ছোট দিনে শুভেচ্ছা বিনিময়ের তেমন ঘটা দেখিনি।
দেশের সার্বিক সাম্প্রতিক পরিবেশ বা পরিস্থিতিও হয়তো তার কারন। যেজন্যই হোক, সারাদিনে গোটা তিনেক শুভেচ্ছা বার্তা এসেছে। শুভেচ্ছা প্রেরকদেরও আমার ফিরতি শুভেচ্ছা। যেসব অনলাইন গ্রূপে লেজুরের মতো আছি, তাতেও খুব একটা ঘটা দেখিনি। উৎসব ও তার শুভেচ্ছা প্রকাশেও এদেশে যেখানে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু তত্ত্ব কঠোরভাবে মেনে চলা হয়, তারপরও কীভাবে অবলীলায় “এই আউল বাউল লালনের দেশ এক মহা অসাম্প্রদায়ীক দেশ” এই মিথ্যাচার করা হয়, তা জানি না।
যাহোক, গতবছর বড়দিনে কর্মক্ষেত্রে ছুটি ছিল না। অফিসে প্রথমবারের মতো আমি ও আমাদের টীম মিলে সংশ্লিষ্ট বিশ্বাসের কর্মীদের সম্মানে একটি আনন্দ আয়োজন করেছিলাম। তৎকালীন কর্মস্থলের ইতিহাসে সেটা ছিল অত্যন্ত অভিনব ও চমকপ্রদ। একটি গার্মেন্টস কারখানাতে চমকপ্রদ ও ছিমছাম আয়োজনে বড়দিনের আয়োজন, এমনকি আস্ত সান্টা ক্লজ নিয়ে বিভিন্ন বিভাগে শুভেচ্ছা বিনিময়-সে এক এলাহী কান্ড।
হ্যা, আমরা সারাবছরই বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসবেই সেটা সার্বজনীনভাবে করতাম।
বেশ কিছু বছর আগে মিরপুরের মনিপুরে থাকতাম। ওখানে একটি ব্লকের প্রায় সিংহভাগই যিশু (বা ইসা আঃ) এর অনুসারীদের বাস। ডিসেম্বর মাস জুড়ে তাদের বাসার বারান্দা, ছাদে রংবেরঙের বাতি, তারা, জরির সাজ। চমৎকার লাগত। বর্তমান আবাস্থলে অবশ্য তারা সংখ্যালঘু। তাই তেমন চোখে পড়েনি।
দুনিয়া জুড়েই উৎসব ও আনন্দ’র এক অভিন্ন ভাষা আছে। সেটা যারই হোক, যে বিশ্বাসেরই হোক। অন্তত আমাদের ছোটবেলায় তো তা দেখেছি। তখন আমরা আমাদের যার যার ধর্ম পালন করতাম। সবার জন্য বাঁচতাম। সবার সাথে লড়তাম। সবার উৎসবে আনন্দ করতাম। বাংলাদেশ সত্যি সত্যিই ধনী দেশ হয়ে গেছে বা যাবে কিনা-তা জানি না। তবে আমাদের সেই চার দশক আগের সুস্থ্য, সুন্দর, সৌহার্দ্যপূর্ন যে সামাজিক বিন্যাসটা ছিল, সেটা যে বহুলাংশেই বদলে গেছে, তা বোধহয় বুঝতে খুব অসুবিধা হয় না।
তবু ভাল থাকুক বাংলাদেশ। ভাল থাকুক মানুষ। ভাল থাকুক সব বিশ্বাসের, সব মতবাদের মানুষ। ভাল থাকুন-যারা আমার বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গীকে সমর্থন করেন, ভাল থাকুন-যারা আমার মতবাদকে ঘৃনা করেন, যারা আমাকে ঘৃনা করেন-তারাও। উত্তরে প্রচন্ড শীতে মানুষের জান নিয়ে টানাটানি চলছে। পঞ্চগড়ে তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রীতে নেমে গেছে। বাংলাদেশের প্রচন্ড রকম সুবিধাবাদী নাগরিক এই ঢাকার মানুষেরা
গত তিন চারদিন আগে যখন তাপমাত্রা ১৭ ডিগ্রীতে নেমেছিল, তখন হতে আজ পর্যন্ত শীত নিয়ে নানা ট্রল, মশকরায় মেতে উঠেছিলেন। আশা করি, তারা ৬ ডিগ্রীর মাহত্ম্যটা বোঝেন। খবরে দেখলাম, এই শীতের মধ্যেই একজন মহান কৃষক ক্ষেতে আলু চাষের যত্ন করছেন। আমাদের দেশের কৃষকরা বোধহয় পূর্বজন্মে সবাই দধিচী ছিলেন। না হয়, ক্ষুদিরাম। না হয় সবাই পাথরের সৃষ্টি। তা না হলে এটা সম্ভব হত না।
ভবিষ্যতে কখনো খাদ্য অপচয় করার আগে ভেবে নেবেন-৬ ডিগ্রীর শীতে একজন কৃষক আলুক্ষেতে কাজ করছেন-এই দৃশ্যটা। অত্যন্ত জটিল ও কঠোর একটি সময় পার করছি। লেখালিখির নদীতে প্রায় মরুর হানা। তবুও কীপ্যাড টানে।
গতবছরে কর্মস্থলের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় সহকর্মীদের সাথে মজা করার জন্য এই চানাচুরওলার মতো চোঙ্গাওলা টুপি পড়ে একটি ছবি তুলে তা ফেসবুকে দেয়ায় সুনাম ও কূনাম-দুয়ের হররা দেখেছিলাম। অবশ্য কূনাম নিয়ে কোনোকালেই তো স্বস্তিতে থাকতে পারলাম না। এক্ষেত্রেও না হয় তাই হল। হোক আরেক দফা সুনাম কূনাম।
এই দেশে সবকিছুতেই তো আমরা দুই ভাগ। মিল্ক ব্যাংক নিয়ে চলছে সবশেষ বিভাজন। মিল্ক ব্যাংক হলে বিয়ের বিশুদ্ধতায় সমস্যা হবে বলে। এমনকি আমার চাক্ষুস অভিজ্ঞতায় দেখা একজন মহান শুদ্ধাচারীও (যিনি তার ছাত্রজীবন ও তার পরবর্তি বেশ কিছু বছর বিশুদ্ধ ফেনসিডিল দিয়ে কুলি করতেন আর মাসে গড়ে চারবার মানুষ পেটাতেন, তিনিও) বলেছেন, “মিল্ক ব্যাংকের দুধ খাবার প্রচলন হলে ধর্ম অশুদ্ধ হবে”।
যদিও সচারাচর যেসব বিয়ে শাদি এদেশে হয়ে থাকে, (বিশুদ্ধ ধর্মীয় বিধানের ভিত্তিতে বিচার করলে) তার প্রায় ৯৯%ই অবৈধ বা ধর্মীয় আইনের খেলাপ করেই করা হয়। (কীভাবে তা হয়ে থাকে, তা যদি জানতে চান, তাহলে বিয়ের কথা বলা থেকে শুরু করে বাসরের পরের সকাল-এই পুরো ঘটনাপ্রবাহটি আবার মনে করুন।
কী? কতটা ধর্ম মেনে পুরোটা করা ছিল? তার পরেও হাজার হাজার নেটিজেন মিল্ক ব্যাংক হলে দুধভাই বা দুধবোনকে বিয়ে করে ফেলে পাপ করে ফেলবেন-সেই ভয়ে আতঙ্কিত হচ্ছেন দেখে ভাল লাগছে। যাক, এদেশে এখনও মানুষ পাপকে ভয় পায়।
সবাইকে ক্রিসমাস ওরফে বড়দিনের শুভেচ্ছা।
#Christmasday #communal #speaker #preaching #dividation #disunity #ReligiousFanatism #extremeism