আমি ইদানিং মেজরিটির দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে কিছু বলতে বা লিখতে বেশ ভয়ে ভয়ে থাকি। কারনটা খুবই পরিষ্কার। বাংলাদেশ মেজরিটির বিরুদ্ধে যাওয়া পছন্দ করে না সহ্য করে না। কেউ কেউ আবার বলেন, ব্যাটা সবসময় ডিফারেন্ট সাজার একটা ভান করে। সমস্যা হল, আমি মানুষটা যদি ডিফারেন্ট হই, তবে আমার যেকোনো কিছুই তো ডিফারেন্ট হতেই পারে।
তবু বলছি, ডিফারেন্ট সাজার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আমি খুব সাধারন একজন ভেতো বাঙালী পরিচয়েই বাঁচতে চাই। তবে প্রথমেই বলে নিই আমার লেখাটি যদি পড়েন দয়া করে উদ্দেশ্যটিকে ভালভাবে বুঝবার চেষ্টা করবেন।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত, সমালোচিত, বিতর্কিত কিংবা জনপ্রিয় তিনজন মিডিয়া সেলিব্রেটি কে বলুন তো?
আমার রেটিং এ অনন্ত খলিল, হিরো শাহআলম এবং ডাক্তার. আহফুজ। নামগুলো ফ্যাব্রিকেটেড করলাম কিছু টেকনিক্যাল জটিলতার জন্য। জনপ্রিয়তা কিংবা দর্শকপ্রিয়তার বাইরে ইদানিং মিডিয়া জগতের মার্কেট একসেস কিংবা পজিশন বোঝাতে আরেকটা টার্ম ব্যবহার করা হয়-TRP। সমালোচিত হোক বা আলোচিত, TRP রেটে কিন্তু তিনজনই বহু এগিয়ে।
অনেকটা নেগেটিভ মার্কেটিং এর মতো। আহফুজ সাহেবের গান আপনার ভাল লাগুক বা না লাগুক, তার অনুষ্ঠানের TRP কিন্তু আকাশ ছোঁয়া। কারন এই আমাদের অজ্ঞাতেই আমরা ব্যাপকভাবে তার প্রচারের কাজটি করে দিয়েছি বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায়। ফলে ওই দিন ৪ তারিখের রাত সাড়ে দশটায় এদেশের বিপুল সংখ্যক দর্শক তাদের যাবতীয় কাজ বন্ধ রেখে, অন্যসব জনপ্রিয় চ্যানেল বাদ দিয়ে এটিএম চ্যানেল হা করে দেখেছে। এখনো দেখছে ইউটিউবে। হিট রেটটা দেখে নেবেন একবার।
একেকটা গান হাজার হাজারবার হিট করেছেন দর্শকরা। তো ভাইজানেরা, এই পুঁজিবাদের যুগে, আমাদের ভাল বা মন্দ লাগায় কিন্তু টিভির বানিজ্য নির্ভর করে না। করে ওই TRP রেটে। আমাদের বুদ্ধু বানিয়ে তিনি কিন্তু তার চ্যানেলের বিশাল মার্কেটিং করিয়েই ছেড়েছেন। মার্কেটিং গুরুদের তার কাছ হতে শেখা উচিৎ। তবে আমার উদ্দেশ্য মার্কেটিংয়ের পাঠ না।
আজ ৬ তারিখ যখন এই লেখাটি লিখছি তখন টিভিতে একটা নাটকের এ্যাড দিচ্ছে যার নাম সেলফি কিং হিরো যেখানে নায়িকার সাথে একটি ছাগলের প্রেমের কাহিনী নাকি দেখানো হবে। নায়ক আমাদের বেশ পপুলার ও সিনিয়র আর্টিষ্ট। অত্যন্ত কুরুচীপূর্ণ ট্রেইলার। ক্ষিপ্ত নামক যে চ্যানেলে এই নাটকটি দেখাবে সেটাতে ২৪ ঘন্টায় শুধুমাত্র একটি বিদেশী সিরিয়ালই দর্শক দেখে। বাকি সময় একনাগাড়ে কতগুলো অদ্ভুৎ নাটক বা সিরিয়াল দেখায় যেগুলো হুবহু ইন্ডিয়ার সিরিয়ালের নকল।
ওগুলোর একেকটা যদি ভুলেও দেখতে বসি তবে বমি এসে যায়। আমি ফেসবুকে ওই নাটকগুলোকে নিয়ে সেই অর্থে নিন্দার মহামারী দেখিনি। বাদবাকি চ্যানেলগুলোতে যা দেখায় সেগুলোর মানও জঘন্য। বিশেষত সর্বজন ঘৃনিত বিটিভির ৮০-৯০ সালের অনুষ্ঠানের সাথে তুলনা করলে তো বটেই। আমি কখনো সেই অর্থে ঝড় উঠতে দেখিনি আমাদের টিভির জাহান্নামে গমন দর্শন করে। মেইনস্ট্রীম টিভিগুলো প্রায় সবাই সকালে একটা গানের প্রোগ্রাম করে। মাঝে মাঝে অফিস যাবার সময় একনজর বুলোই। ওই। কোয়ালিটিতে বমি এসে যায়। গানের কোয়ালিটি মানে তো হল-সুর, মিউজিক, কন্ঠস্বর, উপস্থাপনা আর তাল।
কোনোটাতে আমার মতো কেরানী দর্শক দেখার মতো কিছু খুঁজে পায়না। কিন্তু আমি কখনো ওই ৪ তারিখের মতো একটি মিডিয়া ঝড় উঠতে দেখিনি ফেসবুক বা অন্য মাধ্যমে। ডাক্তার আহফুজ/অনন্ত খলিল/হিরো শাহআলম-এই তিনজনকে আসলে এদেশের দর্শক পজিটিভলি জনপ্রিয় হিসেবে দেখেনা (আমি যদিও একমত নই)। যদি আমি খুব ভুল না করে থাকি, তিনজনের ব্যপক মিডিয়া কভারেজের কারন হল পাবলিক তাদের হাসির খোরাক হিসেবে দেখে। ফলে ভারতে যেমন রজনিকান্তকে নিয়ে ব্যপক ট্রল হয় বাংলাদেশে তেমনি একা ফেরদৌসি, হিরো শাহআলম, হনন্ত কিংবা হালের ডাক্তার আহফুজ।
দেশে বিগত ৪ তারিখ রাত হতে আজ ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সবার ফেসবুক ওয়ালে শুধু একজন ডাক্তার আহফুজ আর তার চেহারা হতে গলা-সবকিছু নিয়ে ভয়ঙ্কর গা গুলানোর মতো গীবত। কয়েকজন ব্যতিক্রমবাদে এসংক্রান্ত সবগুলো পোষ্টের কোনোটিতে তার গায়কি, সুর, তাল, কোরিওগ্রাফি নিয়ে কোনো বিশ্লেষন না দিয়েই ওপেনলি তার চেহারা, বডি মুভমেন্ট, বেসুরো গায়কী, কাপড় চোপড়, টাকার গরম, এয়ার টাইমের অন্যায্য ব্যবহার, আত্মপ্রচার-এসব নিয়েই মেতে ছিলেন। সবার মেন্টালিটি তো জানা সম্ভব না, আমি সবার পোষ্ট হতে, সবার লেখার ধরন এবং এদেশের দর্শকের জেনারেল ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করে এই ব্যপক সামাজিক ঘৃনার ও গীবতের একটা ব্যখ্যা দাড় করানো চেষ্টা করেছি।
১.
প্রথমেই আমার মনে হয়েছে, মাহফুজুর রহমানকে নিয়ে এদেশের দর্শকদের এই তীব্র শ্লেষাত্মক প্রচারনার সবচেয়ে বড় কারন একটা অলিখিত অপ্রকাশ্য নোংরা সোস্যাল প্রিজুডিস। সেটা হল তার একজন গ্লামারাস(!) তরুনী স্ত্রীর পাণি গ্রহন। তার স্ত্রীও গান করেন। সে গানের গুনগত মান বিচারের মতো আব্দুল্লাহ আমি হতে পারিনি। কিন্তু সমস্যা হল তার বয়স কম এবং সুন্দরী। এদেশের মানুষের মধ্যে ইর্ষাকাতরতার একটা তীব্র স্রোত আছে। তিনি কেন একজন বয়সি মানুষ হয়ে তরুনী সুন্দরী স্ত্রীর মালিক হলেন সেটাই অন্যায্য বিদ্বেষ ও ইর্ষার সূক্ষ চোরাস্রোত আমাদের মন মানসে চুপটি করে লুকিয়ে আছে। সেটার রিএ্যাকশন হল ব্যক্তির কাজকে বাদ দিয়ে ব্যক্তিকে পঁচানো চেষ্টা। ওই একই ঘটনার রিপিট হয়েছে আমাদের জেলমন্ত্রী ও প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের ক্ষেত্রেও।
২.
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সেনসিটিভ একটি ঘটনায় বেশ বড় সংখ্যক মানুষ তার একধরনের সংশ্লিষ্টতার আভাস অনুভব করেন। মুশকীল হল সেটার ন্যুনতম কোনো প্রমান কোথাও আজও হয়নি। মুশকীল হল কি, আমাদের সিভিলাইজড জগতে আপাতভাবে ভাল না লাগলেও আমাদের কিছু ফর্মালিটি মেনে চলতে হয় বৃহত্তর স্বার্থে। তারই একটি হল বিচারাধীন/তদন্তাধীন বিষয়ে মন্তব্য না করা। কিন্তু পাবলিকের মনমানস তো আর যুক্তি মানে না। আনরিজলভড অথচ অত্যন্ত ব্যথাতুর ও চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনাটিতে কাউকে না কাউকে অভিযুক্তের আসনে বসাতে পারলে পাবলিকের ক্রোধ ও হতাশাবোধের একরকম প্রশমনের রাস্তা হয়। সেই অবুঝ ক্রোধ ও প্রিজুডিস স্বাভাবিকভাবেই তার যাবতীয় কাজের প্রতি ঢালাওভাবে নেগেটিভ প্রচারনার বিষবাষ্প ঢেলে দেয়।
৩.
তার প্রতি অভিযোগ, তিনি নিজের চ্যানেল ব্যবহার করে নিজের ও স্ত্রীর ব্যক্তিপ্রচারনা চালান। ওয়েল, এই কাজটা বাংলাদেশের কোন চ্যানেল মালিক করে না? টিভি চ্যানেলকে স্রেফ একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাবলেই ভাল হয়। আর কমবেশি আমরা সবাই চান্স পেলে একটু আধটু অমন করি। ফেসবুকে, ইউটিউবে হাজার হাজার ভিডিও দেখি গান বা অভিনয় চেষ্টার। অনেকে নিজের চ্যানেল খুলে সেখানে নিয়মিত দিয়ে যাচ্ছেন। ওগুলোর পেছনে ইচ্ছাটাকে দেখুন। কোয়ালিটিও দেখুন।
৪.
ওই দিনের একক সঙ্গিতানুষ্ঠানটি দর্শকের ভাল লাগেনি কারন গানের কোয়ালিটি, লিরিক, সুর, তাল, যন্ত্রসংগীত, উপস্থাপন, কোরিওগ্রাফি, সার্বিক অনুষ্ঠানের মেকিং-যেকোনোটির কোয়ালিটির খুব অভাব ছিল।
৫.
যতটা জানি অনন্ত খলিল সিনেমার পাশাপাশি একজন অত্যন্ত সফল ব্যাবসায়ি। পাশাপাশি তার বাকি পরিচয় হল সমাজসেবক, সেলিব্রেটি, পপুলার ক্যারেক্টার আর সিনেমা পার্সন। তার তৈরী বা অভিনীত কোনো সিনেমা আমি দেখিনি। তবে যতটা ট্রেইলার দেখেছি তাতে ওগুলোর কোয়ালিটি সিনেমার বিচারে খুবই নিম্নমানের। পাশাপাশি তিনি নিজে বেশ খানিকটা অতি নাটুকে ক্যারিশম্যাটিক মিডিয়া এ্যাপিয়ারেন্স পছন্দ করেন বোঝা যায়, যার অধিকাংশই খুব কাঁচা চিন্তার। কিন্তু তার প্রতিক্রিয়ায় তাকে গণহারে পঁচানোর বা ট্রল বন্যার অযুহাত তৈরী হয় না। নাটুকে এ্যাপিয়ারেন্স কিন্তু আমাদের টাকার কুমির মিঃ প্রিন্স উষা সাহেবেরও খাসলতে আছে। তাকে কিন্তু আমরা কখনো সেজন্য দুয়ো দেই না।
৬.
হিরো শাহআলম নামক ছেলেটা তেমন কিছু করেনি। সে নিজের এলাকায় নিজের তৈরী ও অভিনীত সস্তা ও মানহীন মিউজিক ভিডিও নিজের ডিশ নেটওয়ার্কে প্রচার করে। সেগুলোর নিজস্ব গ্রাম্য মার্কেট আছে। সে ওভাবেই গ্রামে পপুলার হয় (নেগেটিভলি পজিটিভলী-দুভাবেই)। সে কিন্তু আমাদের ঢাকা শহরে এসে আমাদের মেইনস্ট্রীম মিডিয়াতে কোনো ভাগ বসাতে চায়নি। আমাদের শহুরে মিডিয়াই তাকে টেনে এনেছে নানারকম হাস্যরস ও ব্যাক্তিগত অপমান করতে। যার দায় কিন্তু আলমের না।
৭.
অনন্ত বা শাহআলম বা মিঃ আহফুজ-তাদের যার যার কাজের স্পেসিফিক সমালোচনা হতে পারে, কোয়ালিটি নিয়ে পূঙ্খানুপূঙ্খ বিচার হতে পারে। কাজটির/প্রোগ্রামটির দোষ গুন আলাপ হতে পারে, উইক পয়েন্ট, স্ট্রং পয়েন্ট বিশ্লেষণ হতে পারে। কিন্তু তার জন্য ব্যক্তি অনন্ত, শাহআলম বা মিঃ আহফুজের ব্যক্তিগত চরিত্র, শারিরীক গঠন, বাচনভঙ্গি, সামাজিক স্ট্যাটাস, পারিবারিক জীবন, গেটআপ এসব নিয়ে রসালো প্রচারনা ও গসিপকে আমার নিজস্ব বিচারে অশ্লীল কালচার মনে হয়। অন্যের বেডরুমে উঁকি দেবার মতো অন্যের ব্যাক্তিগত পছন্দ বা ব্যক্তিজীবন নিয়ে এমনকি আদালতও কথা বলার অধিকার রাখেনা।
৮.
মাফ করবেন, অনেকের মতের বিপরীতে হয়তো কথা বললাম। আমি কারো বিপক্ষে বলছি না। কারো দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনাও আমার উদ্দেশ্য না। আমি শুধু চলমান স্রোত যে দিকটাকে কখনো দেখায় না সেটাকে কিঞ্চিত বলার চেষ্টা করি। যাতে কোনো কনসেপ্ট একচেটিয়াভাবে একমুখী বিশ্বাসে পরিনত না হয়। মিঃ আহফুজ, একজন অনন্ত কিংবা শাহআলম আমার লেখার টার্গেট নন। পার্টিকুলারলি ওনাদের সোস্যাল ইমেজ উদ্ধারের দায়িত্বও আমার না।
আমি শুধু ওনাদের নামগুলোকে স্রেফ স্যাম্পল হিসেবে নিয়েছি। আমার দৃষ্টিভঙ্গিটি খুব পরিষ্কার-পাপকে ঘৃনা করো, পাপিকে নয়। আমি গোটা একটা সমাজের, একটা দেশের এই যে একজন মানুষের পিছনে পড়াটা, এই যে, দেশের হাজার হাজার মারাত্মক সমস্যা, ইস্যু বাদ দিয়ে একজন ব্যক্তি আহফুজ বা শাহআলমের পিছনে বিশেষত ব্যক্তিগত চরিত্র হননের ট্রেন্ডটার বিরোধী। একটা শেষ একটা কথা বলি।
হলিউড বা ইউরোপে আমাদের দেশের মতো সেন্সর সিস্টেম নেই। ওখানে বোর্ডের কাজ হল মুভি দেখে সেটাকে নির্দিষ্ট রেটিং দেয়া। রেটিং অনুযায়ী দর্শক বয়স ও অবস্থাভেদে সেটা দেখবে। অশ্লীলতা বা নগ্নতার অপরাধে সিন কেটে দেবার কোনো ঘটনা নেই। টিভির যেকোনো অনুষ্ঠান আপনার ভাল লাগবে না, ব্যাস বাটন টিপে অন্য চ্যানেলে চলে যান। দর্শক না খেলে টিভি চ্যানেল এমনিতে সোজা সিধে হয়ে যাবে। কোয়ালিটি আনতে বাধ্য হবে। কিন্তু আপনার যদি এমন নিজের অজান্তেই টিভির TRP বাড়াতে চ্যানেলের পাতা ফাঁদে পা দিই তবে তাদের আর কিছু করতে হয় না। যা করার সব আমরাই করে দিই।
অস্বীকার করব না, সময়ের ফেরে কখনো কখনো একজন অনন্ত খলিলকে নিয়ে গসিপে নিজেও কখনো কখনো মেতে উঠেছি। আজ সেগুলো মনে করলে বড় শরম পাই। কিভাবে পেড়েছি ওগুলো করতে? না, আর কখনো গীবত নয়। কখনোই নয়। মজা করেও নয়। স্রেফ মজা করার জন্য যদি কেউ ডাক্তার আহফুজকে নিয়ে গত ৩টি দিন নানা টিটকারী বা ট্রল করে থাকেন তবে বলব, “তোমাদের কাছে যেটা মজা সেটাই কারো কাছে মৃত্যু………………….”পুরোনো একটা গল্পের শেষ লাইন। মনে পড়ে?
#blame #humiliation #Mahfuz #criticism #mediadomination #mediamanipulation #mediadestruction #mediahype #mediaaholic #mediatrial #envy #prejudice