নিজের শৈশব নিয়ে নিশ্চই আপনার অনেক নষ্টালজিয়া কাজ করে। কখনো কখনো একা অবসরে বা বউ বাচ্চার সাথে গল্প করার সময় নিজের শৈশবের মজার স্মৃতি নিয়ে স্মৃতিকাতর হন না-এমন মানুষ খুব বিরল। ধারাবাহিক একটা লেখা লিখছি শৈশব নিয়ে যেটা ৪০ টি পর্বে শেষ করতে চাই। ৮০’র দশকের শৈশব। আমার মতো একজন পাতি লেখকের লেখালেখি সংক্রান্ত সাহিত্যিক নর্মস ও ডিসকোর্স নিয়ে বাঁচবার কথা নয়। তাই ও রাস্তায় হাঁটি না। তবু মনের মধ্যে যতগুলো লেখা গুছিয়ে রেখেছি (যেগুলো না লিখে গেলে খুব কষ্ট পাব), তার অন্যতম একটা হল আমাদের শৈশব।
আমরা যারা অত্যন্ত ক্রান্তিকালের মানুষ মানে ইয়ো ইয়ো ট্যাব প্রজন্ম আসার আগে শেষ প্রজন্ম, তাদের শৈশব ও শৈশবের বাংলাদেশ নিয়ে আমি খুবই গর্ব করি। আমার খুব ইচ্ছা আমাদের শৈশবটা নিয়ে একটা দীর্ঘ দিনলিপি লিখি। সময়, সুযোগ ও যোগ্যতার অভাবে করা হয়ে ওঠে না। লিখব, শৈশবের স্মৃতি, দুষ্টুমি, বাদরামো, শয়তানি, মায়া, খেলাধুলা, স্কুল, মাস্টার, নানান ট্যাবু, আম চুরি, নদীতে ডুবানো, ভেলার ভাসান, রূপকথার আসর, মাছ ধরা, আমের বাঁশি, পাটকাঠি নিয়ে সিগারেট, চারা খেলা, সিগারেট, প্যাকেটের তাস-এসব নিয়ে মজার স্মৃতিগুলো নিয়ে-যা মনে আসে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘আমার ছেলেবেলা’। আমি লিখব ‘আমাদের ৮০’র ছেলেবেলা’।
পর্ব-১: ডান্ডা কুলূখ খেলা:
আমাদের ছেলেবেলায় একটা খেলা খুব জনপ্রিয় ছিল-ডান্ডা কুলুখ যাকে অঞ্চলভেদে ডান্ডা কুলু, ডাঙ্গুলিও বলে। আমাদের ছেলেবেলায় ডান্ডা-কুলুখ ছিল বাবা-মা’র দৃষ্টিতে মানুষ খুন করার মতো কাজ। ডান্ডা বানানো হত গাছের মোটামুটি লাঠির মতো ডাল কেটে। হাতখানিক ডাল মসৃন করে কেটে ডান্ডা বানানো হত। কুলুখও একই ডালের তবে এটির আকার বিঘত খানেক আর দুই দিক পেন্সিলের মতো সরু করে কাটা যাতে সেটাতে ডান্ডা দিয়ে আঘাত করলেই সেটা লাফিয়ে ওঠে।
ডান্ডা কুলুখ খেলা দুইরকম হত। একটা হল ডান্ডা হাতে রেখে কুলুখ দাগের ওপারে ছুড়তে হত। তারপর ডান্ডা ছুড়ে কুলুখ টাচ করাতে হত। টাচ হলে প্লেয়ার ডান্ডা দিয়ে কুলুখের সাইডে বাড়ি দিত। কুলুখ লাফিয়ে উঠলেই সেটাকে ডান্ডা দিয়ে বাড়ি মেরে দুরে পাঠানো হত। মোট তিনবার এমন করে দূরে পাঠানো হত। আবার কুলুখ শূন্যে থাকতে সেটাকে ডবল, ট্রিপল টাইম শূন্যে নাচিয়ে দূরে মারা হত যাতে পয়েন্ট ডাবল, ট্রিপল হয়। তিনবার বাড়ি দেবার পর কুলুখ যত দূর যেত সেখান হতে ঘরের দূরত্ব আন্দাজ করে প্লেয়ার পয়েন্ট দাবী করত। যদি প্রতিপক্ষ চ্যালেঞ্জ না করত, তবে সরাসরি পয়েন্ট পেত। চ্যালেঞ্জ করলে চ্যালেঞ্জকারীকেই আবার একহাত পিঠমোড়া করে অন্য হাতে ডান্ডা দিয়ে মেপে মেপে দেখিয়ে দিতে হত পয়েন্ট ঠিক আছে নাকি নেই। মাপার মাঝপথে যদি পিঠ হতে হাত সরে যায় সাথে সাথে বিপক্ষ তাকে দুম করে কিল দিত।
যদি প্লেয়ারের ডিমান্ড ভুল প্রমান করতে পারত, তবে সে আউট। যত ডান্ডা দুরত্ব তত পয়েন্ট। আরেকভাবেও খেলা হত, যাতে ডান্ডার মাথা মাটিতে কিঞ্চিত ঢুকিয়ে তার উপর কুলুখ রেখে দূরে থ্রো করত। প্রতিপক্ষ সেখান হতে কুলুখ ছুড়ে ডান্ডায় লাগানোর চেষ্টা করত। না লাগলে প্লেয়ার ডান্ডা দিয়ে কুলুখ একইভাবে তিনবার বাড়ি মেরে দুরে পাঠাত। নির্দিষ্ট সংখ্যকবার খেলা হলে পয়েন্ট তুলনায় হারজিত হত।
যে জিতত, সে প্রতিপক্ষকে খাটানোর সুযোগ পেত। সেটাও এক মজা। বিজয়ী পক্ষ ডান্ডা দিয়ে সোজা কুলুখ ব্যাডমিন্টনের মতো করে দূরে মারবে আর প্রতিপক্ষ সেটাকে আটকানোর বা ক্যাচ ধরার চেষ্টা করবে। না পারলে দূর দূর হতে কুলুখ কুড়িয়ে আনবে। কুলুখকে এভাবে মারার সময় বিজয়ী দল বিজীতকে অপমান করে ছড়া বলত যেটার কিছু অংশ আজও মনে আছে: একে ইঁন্দুর, দুইয়ে দাঁতাল, তিনে তেলি, চারে চোর, পাঁচে প্যাঁচা, ছ’য়ে ছুঁচো, সাতে শালী, আটে আটকুঁড়ে, ন’য়ে না……কী, দশে দামড়া।
পর্ব-২: মার্বেল খেলা:
আপনারা মার্বেল বলতে নিশ্চই ঘরের ফ্লোর সাজাবার টাইলসকে বোঝেন? আমাদের ছেলেবেলায় মার্বেল নামক কাঁচের বল নিয়ে আমরা খেলতাম। তখনো আজকের মতো ট্যাব, ফেসবুক, গেমস, জিপিএ-৫ নামক দানবেরা আমাদের শৈশবকে গ্রাস করেনি। বলছি ৮০ হতে ৯০ দশকের শৈশবের গল্প। নানা রঙের কাঁচের মার্বেল ছিল দুই নয়নের মণি। আর বাবা-মায়েদের চোখের শূল ছিল মার্বেল। তাদের দৃষ্টিতে মার্বেল খেলা মানেই হল বখে যাওয়া। তো আব্বা-আম্মার চোখ এড়িয়ে স্কুলে, স্কুল ফাঁকি দিয়ে কোনো রাস্তার পাশে, দালানের আড়ালে, ছুটির দিনে বসত মার্বেল খেলার মচ্ছব। ছোট ছোট কাঁচের বলের আবার ডিজাইন অনুযায়ী নাম হত-পিঞ্চি, পিনুচ, ভোম্বল, কামরাঙা-অনেক নাম। বেশিরভাগ খেলায় ২ থেকে ৩ জন প্রতিযোগি। প্রত্যেকের ভাগ হতে ২টি বা ৩ টি করে মার্বেল নিয়ে একত্র করে তা একহাতে নিয়ে ছোড়া হত কোর্টের ওধারে। এরপর হাতে একটি মার্বেল নিয়ে ওইগুলোকে হিট করতে হত। হিট করতে পারলে সব মার্বেল তার। যার হাতের তাক ভাল তাকে দলে নিতে সবার কাড়াকাড়ি হত। যার কাছে কামরাঙা থাকত কিংবা যার হাতের সুতীব্র ঝটকা মুহূর্তে মার্বেলকে তাকমতো হিট করত ছেলেমহলে তাকে নিয়ে ব্যাপক সমীহ দেখানো হত। দু’চোখের তীক্ষ শিকারীর দৃষ্টি নিয়ে কী এক অদম্য উল্লাসে সে খেলা চলত সেটা আজকের ট্যাব প্রজন্মকে বোঝানো যাবে না।
পর্ব-৩: যত দেশী খেলা:
দ্বিতীয় পর্বে মনে করেছিলাম খেলা নিয়ে আর লিখব না। কিন্তু লেখার পরে মনে পড়ল, আমাদের ছেলেবেলা/মেয়েবেলার মতো সেই সুতীব্র প্রাণশক্তির দেখা কি আজ আর মিলবে? আজকালকার বাচ্চারা সময় পায় কি আমাদের মতো বনে বাঁদাড়ে, পাড়ার মাঠে, ধান কাটার পরে এবড়ো থেবড়ো জমিতে দুরন্ত সব খেলা খেলতে? তাদের সময় কাটে ট্যাব নয়তো ডোরেমনে। আপনি কখনো খেয়াল করে দেখেছেন, আমাদের বাচ্চারা কি ভয়ঙ্কর আনফিট ও অচল চর্বির ডিব্বা হয়ে বেড়ে উঠছে? ফার্মের মুরগীর মতো তারা এক পা যায়গাও হাটতে পারে না? ইস! কত শ্বাসরুদ্ধকর খেলা আমরা খেলতাম:-বুড়ি চীঁ বা বৌ চীঁ, গোল্লাছুট, দাড়িয়া বান্ধা, হাডুডু, বিঘত বিঘত, এলোন্ডি লন্ডন, উপান্টূ বায়োস্কোপ, টিলো এক্সপ্রেস, কলম খেলা, লুডু, ষোলো গুটি, সাত চারা, বোম্বাস্টিক, রান্নাবাটি, দোকান দোকান, যুদ্ধ যুদ্ধ, চোর ডাকাত, এক্কা দোক্কা বা কুতকুত, কানামাছি, দাস কোষ, ইচিং বিচিং, এলাটিং বেলাটিং, লুকোচুরি, কক ফাইট আরও কত!
পর্ব-৪: ঝিনুক দিয়ে মুক্তা হয় তাতো জানেন।
কিন্তু আমাদের কাছে ঝিনুক ছিল আম কাটার যন্ত্র। পুকুরের তলা হতে ঝিনুক তুলে সেটা আগের আরেকটা ঝিনুক দিয়ে খুলে পরিষ্কার করে তারপর শানে (কংক্রীটে) ঘষে পিঠের নীচটাতে একটা বড়সড় ফুটো করা হত। ওটা দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে কাঁচা আমের ছিলকা তুলে ফেলা যেত। ওই আজকালকার হ্যান্ড পীলারের মতো। এলাকায় কারো আম গাছের কাঁচা আম পাকার জো ছিলনা। কারন আমাদের হাত হতে তার পেঁকে যাওয়া পর্যন্ত বয়স পাবার জো কই। মাটির বড় ঢিল নিচ হতে মেরে আম পাড়া হত। হাতের নির্ভুল নিশানায় কাঁচা আম পড়ত মাটিতে। কখনো বাঁশের বড় লগি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে ফেলা হত। অতঃপর বাসা হতে চুরি করে আনা নুন, মরিচের গুড়া বা বাটা মরিচ, কিঞ্চিত গুড় দিয়ে অমৃতের মতো সেই কাঁচা টক আম পরম উল্লাসের সাথে গিলতাম গোগ্রাসে। হাত মোছার কোনো বালাই নেই। আজকালকার মতো অষ্টপ্রহর স্বাস্থ্যহানীর আতঙ্ক আর লাইফবয় সোপ ছিলনা বিধায় প্যান্টের পিছনে এক ঘষা দিলেই হাতের অপকর্মের কোনো সাক্ষী নেই।
পর্ব-৫: পুকুরে ডুবানো:
বর্ষার টলটলে দীঘির জল হতে গ্রীষ্মের হাটুজলের পুকুরের ঘোলা জল-কোনোটাতেই আমাদের অরুচী ছিল না। বর্ষার ভরা পুকুরে ডুব দিয়ে তলার মাটি তুলতে পারা ছিল বিশাল বীরত্বের ব্যাপার। বর্ষাকালে যখন পুকুর টলটলে পানিতে টইটুম্বুর থাকত, তখন পুকুর ঘাটে দূর হতে দৌড়ে এসে ডিগবাজি দিয়ে পানিতে পড়া কিংবা গাছের ঝুলন্ত ডাল হতে পানিতে ঝাপানোর দুঃসাহস কী করে করতাম ভাবলে আজও গা শিউড়ে ওঠে। শীতকাল এলে ঘাড়ে গামছা ফেলে দুই কানে সরিষার তেল দিয়ে পুকুর পাড়ে রোদ পোহাতাম বহুক্ষন। মনে করতাম, রোদে গা গরম করে তারপর জলে নামলে শীত লাগে না। মাঝে মাঝে কেউ দুষ্টামী করে এক ঘড়া জল ঢেলে দিতে মাথায়। উহ! তীব্র ঠান্ডার ঝটকায় জমে যাবার দশা হত। যে পানি ঢালত তাকে মুহূর্তের মধ্যে কয়েক গন্ডা কাঁচা গালি উপহার দিয়ে ঝাপ দিয়ে পড়তাম জলে। পুকুরে বেশি ডুবালে চোখ লাল হয়ে যেত। মা’র বকুনীর হাত হতে রেহাই পেতে চোখের উপর কচুপাতা রেখে রোদে বসে থাকতাম। মনে করতাম ওতে চোখ সাদা হয়ে যাবে।
পর্ব-৬: স্কুল পালানো:
আমাদের প্রাইমারী স্কুল ছিল বাশের বেড়ার যার অনেক যায়গাতেই ভাঙা। ওপরে টীনের চাল। মাটির ফ্লোরে কাঠের লম্বা লম্বা বেঞ্চে বসতাম আমরা। স্কুলের চারপাশে ছিল না কোনো বাউন্ডারি। বৃষ্টির দিনে ইচ্ছা করে ভিজে স্কুলে যেতাম যাতে ছুটি পাই। কিন্তু স্যাররাও আমাদের ট্রিকস বুঝতেন। প্রায়ই তাই ভিজা কাপড়েই ক্লাসে আটকে রাখতেন। তবে সুযোগ পেলেই আমরা ওই ভাঙা বেড়ার ফাঁকা দিয়ে পেছন দিক হতে ক্লাস পালাতাম। আর যদি শোনা যেত, কোনো টিচার আসেননি। ব্যাস, কাতারে কাতারে স্কুল পালাতাম। পালিয়ে কোথায় যেতাম সেটা আন্দাজ করুন তো? পর্ব-৭: টিকা আতঙ্ক: আমাদের ছেলেবেলার অন্যতম আতঙ্ক ছিল টিকা। আজকালকাল মতো হাতের বাজুতে টিকা দেয়া যেমন হত তেমনি কে যেন রটিয়ে দিয়েছিল, টিকা দেয়া হয় হাতের বাজুতে ঠিকই তবে সেটা একসাথে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ৪-৫ টিকা দেয়া হয়। কখনো বলা হত টিকা দেয় নাভিতে ইনজেক্ট করে। এতেই আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র আতঙ্ক। তখনকার দিনে বগলে কেরানী ব্যাগ বা হাতে একটু বড় কোনো ব্যাগের মতো দেখলেই ভাবতাম টিকা দিতে এসেছে। একবার হল কি, আমাদের পিটিআই হতে একজন ইন্সট্রাকটর এলেন দরকারী কাগজ নিয়ে একটা বড় ট্রাভেল ব্যাগে। ব্যাস, পুরো স্কুল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল আজ টিকা দেবে। আর যায় কোথায়? পুরো স্কুল কাচকী মাছের মতো যে যেদিক দিয়ে পারে ভো কাট্টা। টিফিনের পরে স্যার ক্লাসে এসে দেখেন পুরো ক্লাস ফাঁকা। বাধ্য হয়ে স্কুল ছুটি দিয়ে দেয়া হয় ওইদিন।
পর্ব-৮: কাঁদামাঠে ফুটবল:
আমরা থাকতাম সরকারী কলোনিতে। ওখানে একটা বড় মাঠ ছিল। ছোটবেলায় ওই মাঠটাকে মনে হত বিশাল এস্তেমার মাঠের মতো। বড় হয়ে যতবারই গিয়েছি ততবার সেই একই মাঠকে পুঁচকে একটা মাঠের চেয়ে বড় কিছু মনে হয়নি। একই ভ্রম হত কলোনির পুকুর নিয়ে। ওটাকে মনে হত বিশাল সাগরের মতো বড়। অথচ এখন যখন ওখানে যাই ওটাকে সামান্য একটা ডোবার মতো লাগে। চাইল্ডহুড ফ্যান্টাসি। তো ওই মাঠে বর্ষার জল জমত। কাঁদা ভরা মাঠে আমরা একটা পাম্প ছেড়ে দেয়া ফুটবল নিয়ে ফুটবল খেলতাম। খেলার চেয়ে বেশি মজা ছিল কাঁদাপানিতে বল নিয়ে হুটোপুটি। কাঁদাপানি ইচ্ছে করে ছিটিয়ে অন্যদের ভূত বানানোতেই ছিল বেশি মজা। আজকাল যখন টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখি, বর্ষার জল কাদায় নানা পদের অসুখ বিসুখ হবে তখন হাসি পায়। ওইসব অসুখকে আমরা থোরাই কেয়ার করতাম।
পর্ব-৯: আমাদের ঈদ:
আমাদের ছেলেবেলায় বিশেষত মফস্বলে শপিং মল বলে কিছু ছিল না। টিনের আধাপাকা দোকানই ছিল আমাদের শহরের শপিং সেন্টার। তো সেই সময়ে মাত্র একটা দুটো দোকান ছিল রেডিমেড পোষাকের। সেটাও আমাদের মতো মফস্বলি নিম্নবিত্তদের নাগালের বাইরে। তাই বাবা-মা আমাদের দর্জির দোকান হতে পোষাক বানিয়ে দিতেন। আজকালকার অতি ভাগ্যবান বাচ্চাদের মতো আমাদের সময়ে ঈদের পোশাক সুনিশ্চিত কোনো আশির্বাদ ছিলনা। বাবা পাত্তা দিতেন না। রোজা হয়তো ১৫ টা চলে গেছে। মা’র কাছে ঘ্যান ঘ্যান, বাবাকে আড়ালে আবডালে মনে করিয়ে দেয়া, অন্যরা কী কী কিনে ফেলেছে-এতসব ঘাই কিচিং করার পরে অতঃপর একদিন বাবা গম্ভীর গলায় বলতেন, “কাল আজিজ দর্জি আসবে।” ব্যাস, ওতেই আমাদের ঈদ চলে আসত। আজিজ দর্জি পুরো কলোনির সব বাচ্চাদের মাপ নিয়ে যেতেন। পরের দিন বাবা-মায়েরা বাজারে গিয়ে ছিট কাপড় (প্রিন্টেড থান কাপড়) কিনে দর্জির দোকানে দিয়ে আসতেন আমাদের ঈদ পোশাক বানাতে। মজার বিষয় হল, বাসার সব ভাই এর একই প্রিন্টের পোশাক (শুধু সাইজ আলাদা) আর আপার জন্য একটা আলাদা প্রিন্ট। ঈদের দিন সব ভাই একই পোশাক পড়তাম (আমাদের পোলাপাইন ইদানিং এই ট্রেন্ডটা চালু করছেন মানে বন্ধুরা বা বাবা-মা, সন্তানরা একই পোশাক। আমরা ওটা সেই ৮০’র দশকেই মশক করে ফেলেছি।) ঈদের জামার টুকরা কাপড়ও চরম সাবধানতার সাথে লুকোনো হত যাতে কেউ ঈদের আগে দেখতে না পারে কোন পোশাক বানাচ্ছি। এমনকি (হাস্যকরভাবে) দর্জি কাকাকেও বলে আসতাম, যদি কলোনির কেউ আসে আর জানতে চায়, তবুও যেন তাকে না বলা হয়। এমনটা হত কারন দর্জির দোকান হত সেই কয়েকটা হাতে গোনা যাতে সবাই কাপড় বানিয়ে নিত। তখনকার দিনে সালামি ছিল ২ টাকা। বড় ছোট সবার ২ টাকা।
পর্ব-১০: রস চুরি:
কলোনিতে প্রচুর খেজুরের গাছ ছিল। পাশেই ছিল ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের ওয়াপদা। দুই কলোনিতেই প্রচুর খেজুর গাছ। শীত এলেই গাজ কাটার জন্য গাছি হাজির হত। গাছিদের সাজসজ্জা ছিল অদ্ভূৎ। একটা মোটা কাছি (রশি), বাকানো তূনীর, ভয়াল দর্শন ক্ষুরধার দা, নিয়ে সে তরতর করে উঠে যেত গাছের মাথায়। চেঁছে চেঁছে সে পুরোনো মরা জঞ্চাল সরিয়ে গাছের সজীব অংশ বের করে আনত। তারপর সুন্দর করে খাঁজ কেটে সেখানে একটা মাটির কলসি বেঁধে দিয়ে যেত। সারারাত তাতে রস জমত। আমরা দলবল মিলে রাতের বেলা বের হতাম। গাছ হতে রিস্ক নিয়ে রস নামাতাম। তারপর কাঁচা রস খাওয়া হত পালাক্রমে। আজকালকার মতো তখন বার্ড ফ্লু কিংবা নিপাহ নামক আজব রোগের উদ্ভব হয়নি। আজকের দিনে পদে পদে বাচ্চাদের জন্য নিষেধাজ্ঞা। আমাদের সময়ে আমরা ছিলাম মুক্ত বিহঙ্গ। কখনো কখনো বেশি রস একত্র করে সকালে তা দিয়ে পায়েস (স্থানীয়ভাবে শিরনী বলে) রান্না হত। আহা, সেই শিরনীর সুবাস প্রিয়ার কালো চুলের ঘ্রাণের চেয়ে কম নয়। গাছি মামা যাতে ধরতে না পারে যে রস চুরি করা হচ্ছে, তার জন্য খালি হাড়িতে পানি দিয়ে দেয়া হত। কিছু কিছু ফাজিল আবার আরো এককাঠি সরেস। তারা কী করত আন্দাজ করে নিন।
পর্ব-১১: ঘুড়ি ওড়ানো:
শরত এলে ঘুড়ি ওড়ানোর মৌসুম শুরু হত। পাতলা কাগজের আট আনা ও এক টাকা দামের ঘুড়িগুলো কিনতেই আমাদের দফরফা হত। কারন কোনো বাবা-মা ঘুড়ি ওড়ানোর টাকা দিতে চাইত না। আট আনার ছোট ঘুড়িগুলোতে লেজ লাগানো হত যাতে সেগুলোর ব্যালেন্স ভাল হয়। বড় ঘুড়িগুলোতে বেশিরভাগ লেজ থাকত না বিধায় সামলানো খুব কঠিন ছিল। বড় ঘুড়ি আর নাটাই যার থাকত তাকে ছেলেমহলে বেশ উঁচু স্তরের ভাবা হত। কোন হারামী যেন একবার রটিয়ে দিল, ঘুড়ির সুতার মাঞ্জার আঠার মধ্যে শুকরের চর্বি থাকে। ব্যাস, যায় কোথায়? যার যার মাঞ্জা দেয়া সুতা লুকানো শুরু। কারন মা জানতে পারলে ঘর হতে ফেলে দেবে। বাসার পুরোনো বাল্ব আর আঠা দিয়ে নিজরাই মাঞ্জা দিতাম। মাঞ্জা দেয়া সুতোয় কতবার যে হাত কেটেছে। ভো কাট্টা করে ঘুড়ি কাটতে যে মজা ছিল তার সাথে আমাদের বাচ্চাদের ক্লাশ অব ক্ল্যানের মজা স্রেফ নস্যি।
পর্ব-১২: রূপকথা শোনা:
আজকের বাচ্চাদের কাছে হয়তো লজ্জাদায়ক মনে হবে। কিন্তু যাই হোক, আমাদের বয়সে আমরা অনেক বড় হবার পড়েও দাদী, নানী বা খালাদের কাছে রূপকথার গল্প শুনতাম। রাতে পড়া শেষে কিংবা পরীক্ষার পরে নানাবাড়িতে বেড়াতে গেলে উঠানে গোল হয়ে বসে আমরা বর্ষিয়ান খালা বা নানীর কাছ হতে দেশ বিদেশের নানান রূপকথা শুনতাম। নানী তার কৌটায় সাজানো পান একটার পর একটা খেতেন আর গল্প বলতেন। আমরা গোগ্রাসে গিলতাম কাজলরেখার গল্প, রাপুনজেল বা রহিম বাদশাহ বানেছা পরীর গল্প। আর পরদিন সারাদিন আমাদের মধ্যে চলত তার নানা বিশ্লেষণ। আজকে যেমন টিভি সিরিয়াল দেখে তার চর্বিত চর্বন চলে, আমাদের ছিল রূপকথার গল্প নিয়ে সেই ফ্যান্টাসি।
পর্ব-১৩: ধান টোকানো:
প্রতিবছর বার্ষিক পরীক্ষার পরে আমরা গ্রামে যেতাম নানাবাড়ি। তখনকার দিনে তো মোবাইল বা টেলিফোন ছিল না। স্কাইপ বা ভাইবারের তো কথাই নেই। ছোট মামা দিন আন্দাজে পরীক্ষার মাঝামাঝি আসতেন। থাকতেন অনেকদিন। তারপর আমাদের পরীক্ষা শেষ হলে আমাদের (মানে সব বাচ্চাদেরই কমবেশি একই রুটীন ছিল।) নিয়ে নানাবাড়ি/দাদাবাড়ি যেতেন। অনেকদিন আমরা বেড়াতাম নিজের নিজের শেকড়ের মায়াবি গ্রামে। শেষের দিকে মা, বাবা আসতেন। তাদের সাথে আবার ফিরতাম। বাড়ির সবাই অশ্রূসজল চোখে নদীর ঘাটে আমাদের বিদায় দিতেন। মানুষের ছিল প্রাণভরা মায়া। আজকের মতো আর্টিফিশিয়াল যুগ তখন ছিল না। নানাবাড়িতে গেলে খুব মজার একটা কাজ ছিল। মামাদের কামলারা ধান কেটে বাড়িতে আনতেন। আমরা ছোটরা পেছন পেছন আসতাম। ধানের বড় বোঝা হতে যে শীষটা পড়ে যেত, বা ধান কাটার পরে ক্ষেতে যে দু’একটা শীষ থাকত সেটা আমরা টোকাতাম। সবারটা জড় করলে বেশ বেশি পরিমান হত। সেটাকে ফেরিওলাকে দিলে সে আমাদের দিত মজার সলটেড বিস্কিট, কাঠি লজেনস, হাওয়াই মিঠাই এসব। বাড়ির কাজিনরা মিলে সেগুলো খেতাম পরম আনন্দে। তখনো জীবনে দারুন প্রাকৃতিক সুখ ছিল। আজকের মতো আমাদের জীবন তখনো নানা পঙ্কিল ও গ্যাজেটময় হয়নি লাইফ।
পর্ব-১৪: ভিসিআর:
বাবা-মা’র খুব দয়া হলে ঈদে ভিসিআর দেখতে পেতাম। সবার সালামির টাকা একত্র করে কারো বাসায় ভিসিআর আনা হত। কলোনীতে আমরা প্রায় ৩০ টা বাচ্চা যাদের বয়স কাছাকাছি। ভিসিআরে বেঁদের মেয়ে জোসনা, সাজান, দিওয়ানা, ডিসকো ডান্সার, চাঁদনী টাইপের বাংলা, হিন্দী মুভি দেখতাম রাত জেগে। কখনো কখনো কোনো বদ ছেলে হয়তো নিয়ে আসতো লিনজা টাইপ সেমি ভালগার মুভি। তখনকার দিনে হাতা কাটা ব্লাউজ বা নাগীন সাজে নূতনের সাজই ছিল সর্বোচ্চ নগ্ন দৃশ্য। তাতেই আমাদের মার খাবার তীব্র সম্ভাবনা থাকত বিধায় পাহারা বসিয়ে দেখতে হত। আজ কী জামানা এলো! ক্লাস ৪/৫ এর বাচ্চারা দিব্যি মোবাইলে এডাল্ট কনটেন্ট দেখে। সেই দিন দুরে নয়, যখন বাবা-মা এতে আরো উৎসাহ দেবেন। গভীর রাতে দেখা শেষ হলে দিব্যি হেঁটে বাসায় ফিরতাম। তখনকার সময়ে ছিনতাই, ডাকাতি ছিল বিরল ঘটনা। মায়েরা আমাদের রাত বিরাত চলাফেরা, ছেলে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে খুব ভাবতেন না। তাছাড়া আমরা পিডিবির কলোনীতে থাকায় সারা শহরেই একটা সমীহ পেতাম। সবাই বলত, “কারেন্টের অব্দা (ওয়াপদার লোকাল নাম)।
পর্ব-১৫: নিউজপ্রিন্ট আর বইয়ের মলাট:
উদয়ন পেপার নামে একটা সোভিয়েত ম্যাগাজিন ছিল। ওটার ভারী আর ছবিওলা পেজ দিয়ে বইয়ের মলাট দিতাম। প্রথমদিকে পারতাম না বিধায় বড় আপা বা ভাইয়া করে দিত। ওদের তেল দিতে হত ব্যাপক। এরপরে আসে বাঁশপাতা কাগজ দিয়ে মলাট দেয়া। সবচেয়ে অভিনব হল সিমেন্টের বস্তা। তখনকার সময়ে সিমেন্টের বস্তা হত কাগজের। ভিতরের কাগজ পরিষ্কার করে, মুছে এরপর ওগুলো দিয়ে বইয়ের মলাট দেয়া হত। পর্ব-১৬: গুড়ো দুধ আর কনডেন্সড মিলক চুরি:- আমাদের ভয়ে মা মিটশেফের মধ্যে রেখে তালা বন্ধ করে রাখত। আমাদের মতো দস্যূদের তাতে কি দমানো যায়? মিটশেফের দরজা টেনে ফাঁকা করে, জাল ছিড়ে, হাত বাঁকা করে ঢুকিয়ে কনডেন্সট মিল্ক বা গুড়ো দুধের টিন চুরি করা হত। তারপর গুড়ো দুধ আর চিনি হাতের চেটো বা কাগজে নিয়ে জিহবা দিয়ে চেটে চেটে সারা মুখে মাখিয়ে অমৃত ভক্ষন হত। কনডেন্সড মিল্ক চুরি করতে পারলে তো সেদিন ঈদ। পুরো কৌটো ফুটো দিয়ে একবারে সাবাড়। বহুদিন হয়েছে, মা যখন সেমাই রান্না করতে যেত, দেখত কৌটায় একফোঁটাও দুধ নেই।
পর্ব-১৭: শবে বরাত:
এখকার শবে বরাতের সাথে আমাদের শৈশবের একটাই মিল আছে। তা হল বাজি ফোটানো। আমি নিজে কখনো বাজি ফোটাতাম না যদিও কিন্তু দলেবলে ঠিকই ঘুরতাম। তারাবাজি, হাতুড়া বাজি, চকলেট বোমা এগুলো শবে বরাতের ২/৩ দিনে আগেই কিনে আনা হত। আগের রাত হতেই ট্রায়াল শুরু হয়ে যেত। শবে বরাতে মা, খালারা সবচেয়ে কমোন যেটা বানাতেন, সেটা হল আটা বা চালের গুড়ার রুটি। আমরা ছোটরা বলতাম, কেয়ামতের দিন এই রুটি মাথায় ছায়া দেবে। তাই বেশি বেশি রুটি বানানো হত। সাথে থাকত সুজির হালুয়া, ডালের হালুয়া। আমাদের মফস্বলে ওই যুগে আজকালকার মতো এত কমার্শিয়াল রাজকীয় খানাখাদ্যের আয়োজন হত না। আজকালতো শবেবরাত মানে খানাপিনার মহোৎসব। তখনকার সময়ে আমাদের মধ্যে প্রদর্শন ও জাকজমকের বদলে আন্তরিকতাটুকু বেশি ছিল। বিকাল হতে আমরা পাজামা পাঞ্জাবী পড়ে ঘুরতাম। সারাবছর নামাজ না পড়লেও ওইদিন মসজিদে সারারাত নামাজ পড়া বা ঘুমানো দুটোই চলত। সন্ধ্যায় আমরা বাসায় বাসায় রুটি, হালুয়া বিতরন করে আসতাম। তারাও তাদের বানানো খাবার দিয়ে দিতেন। কী যে আনন্দ হত।
পর্ব-১৮: বাঁশের ফটুক:
চিকন বাঁশের সরু কম্পার্টমেন্ট বিশিষ্ট টুকরা কেঁটে তা দিয়ে বানাতাম ফটুক নামক অস্ত্র। তেল মাখিয়ে রোদে দিয়ে সেটা একটু শুকানো হত। তারপর আরেকটা বাঁশের টুকরা দিয়ে বানানো হত তার লিভার বা প্রেসার বাটন। ওই আজকালকাল পান ছেঁচনির দন্ডের মতো তবে চিকন করে। তো সেই বাঁশের টুকরার ছিদ্রে তেল দিয়ে পিচ্ছিল করা হত। তারপর তার দুই ছিদ্রের মুখে শক্ত করে কাঁচা খেজুর ঠেসে ঢোকানো হত। এরপর সেই লিভার বা হাতলটা এক মাথা হতে জোর করে ঠেসে জোরে চাপ দেয়া হলে অন্যমাথা হতে খেজুর টুকরো দুটো সবেগে সশব্দে ছুটে বেড়িয়ে যেত। গায়ে লাগলে ব্যথা লাগত। ওটাই ছিল বন্ধুদের ঘায়েল করার অস্ত্র। তবে খেজুরের কষে জামা নষ্ট করায় মা’র হাতে পিটুনি খেতে হত। কার ফটুকে কত জোরে আর শব্দে গুলি বের হয়-তাই নিয়ে প্রতিযোগীতা হত। তবে ওই অস্ত্র শুধু খেজুরের সিজনেই কাজে লাগত। সিজন শেষ হলে কোথায় সেটা হারাতাম আর খোঁজ থাকত না। আমার বন্ধু অলকদের বাঁশ বাগান ছিল। ওকে প্রায়ই তেল দিতে হত বাঁশের ফটুকের স্বত্ত্ব পেতে।
পর্ব-১৯: কোরবানী:
গরুর ভূড়ির ওপরে থাকা একরকম পাতলা মেমব্রেন যেটাকে আমরা বলতাম ‘ফ্যাপসা’, সেটা দিয়ে কনডেন্সড মিল্কের কৌটা বা রেডকাউ দুধের কৌটার খালি মুখে বেঁধে রোদে শুকিয়ে ঢোল বানাতাম। কার ঢোল কত জোরে বাজে সেটার প্রমান দিতে গিয়ে অবশ্য খুব শিঘ্রই সেটা ছিড়ে যেত। আজকালকার মতো সে কালেও আমরা ছোটরা প্রতিযোগীতা করতাম-কাদের গরু কত বড়। কার গরুর শিং কত চোখা। কারটাতে বেশি মাংস। সবচেয়ে হাসি পায় মনে করলে, প্রতিযোগীতা করতাম কার গরুর ব্যক্তিগত পার্টস বড় আর কার ছোটো-সেটা নিয়ে। হা হা হা। এখনকার মতো শেষ সময়ে আমরা গরু কিনতাম না। বেশ কিছুদিন আগেই গরু কিনে আনা হত। সেটাকে ঘাস কেটে খাওয়াতে পাড়া ছিল বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার। কাগজের মালা দিয়ে সেটার গলায় দিতাম। তবে কখনোই জবাইয়ের সময় কাছে থাকতাম না। খুব মায়া লাগত। গরুর মাথার মাংস ছাড়িয়ে নেবার পরে তার মাথার খুলিটাকে বাবা বাসার চালে লটকে দিতেন। মনে করা হত, ওটা টাঙানো থাকলে ভূত বাড়িতে ঢোকে না। আজও মনে পড়লে হাসি পায়।
পর্ব-২০: একজিবিশন/যাত্রাপালা:
শহরে প্রতিবছর একবার একজিবিশন আসত। অনেকটা সার্কাস টাইপ তবে সার্কাস না। জেলা স্টেডিয়ামে মাসব্যাপি একজিবিশন হত। ওখানে যাত্রা থাকত, সার্কাস থাকত, আরো থাকত দেশ বিদেশের বিচিত্র সব প্রাণী, বস্তু, ডেথ রাইডসহ ছেলেপিলের মাথা খারাপ করানোর মতো নানা আয়োজন। একপাশে অবশ্যম্ভাবিভাবে থাকত হাউজি আর পুতুল নাচ। সম্ভবত সুরাপান আর নারীঘটিত কোনো আনন্দেরও ব্যবস্থা থাকত। হয়তো বলছি এজন্য, কারন একজিবিশন আসলেই দেখতার পাড়ার ঘরে ঘরে পুরুষকূলের মধ্যে চাঞ্চল্য, নারীকূলের মধ্যে ফিসফিস। মা’র কাছে যখনই বলতাম, “মা, একজিবিশনে যাব”, মা ধমকে থামিয়ে দিত। অতঃপর বহু অনুনয় বিনয়ের পরে একদিন বাবা সব ভাইবোনকে নিয়ে যেতেন। যাত্রা দেখতাম, বায়োস্কোপ, পুতুল নাচ, ডেথ রাইড, মিনি সুন্দরবন, বাঁদর নাচ, সার্কাস দেখে, মন ভরে নোংরা পানতুয়া খেয়ে, মুরালী প্যাকেটে নিয়ে বাসায় ফিরতাম রাত করে। তবে একজিবিশনের বিশেষ কোণে কখনো যেতে দেয়া হত না। তখনকার দিনে লাইভ যাত্রাপালা দেখা আজকালকার ভদ্দরলোকদের থিয়েটার বা শিল্পকলায় দামী নাটক দেখার চেয়ে বিন্দুমাত্র কম বিনোদিত করত না।
পর্ব-২১: বড়শি ধরা:
কঞ্চি (যাকে আমরা বলতাম ’টুনি’) দিয়ে ছিপ বানাতাম আর নাইলনের সূতো দিয়ে লাইন। ছোট মাছ ধরতে ছোট ছিপ আর বড়শি। পুঁটি মাছটাই বেশি ধরা হত বিশেষত বর্ষার টলটলে পুকুরে। বিকেলটাতে মাঠে কাঁদা থাকায় খেলতে না পেরে আমরা বড়শিতে মাছ ধরতাম। হঠাৎ করে বেড়ে যেত ময়ুরের পালকের চাহিদা-বড়শির ফাতনা বানাতে। খুঁজে খুঁজে কেঁচো ধরা হত। জ্যান্ত কেঁচো হাতে ধরে ছিড়ে আমরা বড়শিকে গেঁথে খাবার (আমরা বলতাম আদার) বানাতাম। কে কয়টা মাছ ধরতে পারে তাই নিয়ে প্রতিযোগীতা হত। বড় বড়শিতে পুঁটি মাছের পিঠে গেঁথে রাতে বড়শি পাতা হত। রাতের বেলা বড় শোল, গজার, রুই মাছ সেই ছোট পুঁটি খেতে এসে বড়শিতে আটকাতো। সকালে ঘুম ভেঙে দৌড়ে গিয়ে বড়শি চেক করা হত। প্রায়ই দেখা যেত বড় মাছ আটকে আছে। মাঝে মধ্যে মেছোকানা সাপও আটকাতো। তখন সব বাচ্চারা দলবেঁধে সেই সাপ (প্রায়ই মরে যেত যদিও) মারা হত। আমরা ভাবতাম, সাপের মাথা শরীরের সাথে থাকলে রাতে তারা জিন্দা হয়ে আবার এসে কামড়াবে। তাই পিটিয়ে টেনে মাথা আলাদা না করা পর্যন্ত রেহাই দেয়া হত না। আমার মনে আছে, একবার আমার বন্ধু অলোক দারুন একটা ছিপ বানিয়ে দিয়েছিল ওদের বাঁশঝাড়ের কঞ্চি দিয়ে। ওটাতে রং করে তারপর জর্দার কৌটা আর জিআিই তার পেচিয়ে দারুন একটা হুইল বড়শির মতো বানিয়ে দিয়েছিল। আমার বন্ধুদের কাছে সেই হুইল বড়শিরই ব্যাপক কদর ছিল।
পর্ব-২২: একুশে ফেব্রূয়ারী/১৬ই ডিসেম্বর/২৬ মার্চ:
আমাদের ছোট্ট একটা ফুল বাগান ছিল। তখনকার দিনে আজকের মতো ফুল বিক্রির দোকান ছিল না। তাই অন্যের বাগানের চুরি করা ফুলই ছিল আমাদের ভরসা। একুশে ফেব্রূয়ারীতে সারারাত জেগে ফুল পাহারা দিতাম যাতে অন্যরা চুরি করি নিয়ে যেতে না পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেষরাতে ঘুমিয়ে গেলে চোরেরা এসে ঠিকই চুরি করে নিয়ে যেত জবা, গোলাপ, গাঁদা ফুল। আজকের মতো বিদেশি ফুলের ঝকমারি থাকত না। তবে তখনকার মা চাচীরা শহীদ মিনারে যাওয়াকে বেদাত মনে করে যেতে দিতে চাইতেন না। মাঝে মাঝে আমরা যেতে পেতাম বড়দের সাথে বা স্কুলের প্রোগ্রামে। আমরা তাই কলাগাছ কেঁটে মাটির প্রলেপ দিয়ে নিজেরাই বানাতাম শহীদ মিনার। তারপর সেটাতে ফুল দিতাম। সেকালে ক্যামেরার বালাই ছিল না বলে কোনো সেলফী তোলা হত না। তবে শহীদদের জন্য মনে একটা শ্রদ্ধার ছবি ঠিকই থাকত। আজকালকার মতো দিবসগুলো রেওয়াজে পরিণত হয়নি তখনো। ১৬ই ডিসেম্বর আর ২৬ মার্চে স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠান হত। স্কুল হতে পিটি টীমে অংশ নিতাম। একমাস আগে হতে রিহার্সাল শুরু হত। নির্দিষ্ট দিবসে স্টেডিয়ামে নিয়ে যেতেন স্যাররা। মাঝে মাঝে ভাইয়া বা আপা আমাদের সাথে যেত। কী দারুন পিটি, ডিসপ্লে হত। বড়রা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভিন্ন ডিসপ্লে, নাটক করত। পুরষ্কার দেয়া হত বেষ্ট পিটি, বেষ্ট মার্চ পাষ্ট আর ডিসপ্লের জন্য। একবার আমার প্রাইমারী স্কুল পিটিতে থার্ড হয়েছিল। আমি সেবার পিটি ক্যাপ্টেন ছিলাম। স্কুলের পাশেই ছিল সরকারী শিশু সদন তাও আবার মেয়েদের। ওদের আলাদা টীম যেত। প্রতিটি অনুষ্ঠানে আমরা প্রতিযোগীতা করতাম যেন ওরা না জিততে পারে। কিন্তু ওদের মেয়েরা সারাবছর প্রাকটিসের কারনে প্রতিবারই অনেকগুলো পুরষ্কার পেত। সারা পাড়ায় ৩/৪ দিন মুখ দেখাতে পারতাম না। মাঠে পিটির পর আমাদের বনরুটি আর দানাদার (চিনি আর হালকা ছানা দিয়ে বানানো মিষ্টি) দিয়ে টিফিন করানো হত। আমাদের রসূল স্যার যখন টিফিনের ব্যাগ নিয়ে মাঠে আসতেন মনে হত স্বর্গীয় সুখ হাতে এলো।
পর্ব-২৩: খেজুর পাকানো:
খেজুর বোধহয় ফাল্গুনে পাঁকতে শুরু করত। আমরা গাছে উঠে কাস্তে দিয়ে খেজুরের কাঁদি কাটতাম। খেজুরের কাঁটা খুব মারাত্মক ছিল। একবার ফুটতে পারলে সেটা ২/৩ মাস ভোগাতো। মা বলত, খেজুর কাঁটা সারা গায়ে ঘুরে চোখে চলে আসে। সেই তীব্র আতঙ্ক নিয়েও খেজুর কাঁটতে যেতাম। কেঁটে সেটা কচা পাতায় মুড়ে পানিতে ভিজিয়ে রাখতাম। সারারাত পানিতে থাকলে পরদিন তা পেকে যেত। কখনো কখনো গরমেও রাখা হত। পাকা খেজুর পকেটে নিয়ে স্কুলে যেতাম। বন্ধুদেরও দিতাম। আবার গাছে উঠে পাকা খেজুরও পারতাম। মা টের পেলে মহা পিট্টি দিত। খেজুর কাটতে গিয়ে বহুবার কাঁটা বিধিয়ে মাকে জ্বালিয়েছি। একবারতো ডাক্তারও দেখাতে হয়েছিল। তবে একবার গাছে উঠে সাপ দেখে পড়ে মরার দশা।
পর্ব-২৪: গুলতি ও পাখি শিকার:
সাইকেলে পাম্প দেবার নজেলে একরকম রাবার টিউব পড়ানো হত যার নাম বল টিউব। ওটা দিয়ে আমরা বানাতাম গুলতি। কখনো কখনো ওটা দামী বিধায় সোজাসুজি চাকার টিউব দিয়েও বানানো হত। তবে বল টিউবেরটা বেশি দূরে ছোড়া যেত। গাছের ভি আকৃতির চিকন ডাল কেটে তার ভি অংশটা ছোট করে কেটে নিতাম। দুই প্রান্তে বল টিউব জুড়ে তাতে গুলি বসাবার জন্য দুই প্রান্ত জড়ো করে লাগানো হত চামড়ার একটুকরা ম্যাগজিন যা কেনা হত বেশিরভাগ সময় মুচির কাছ থেকে। কখনো কখনো সেই ম্যাগজিন বাজার হতে কেনার পয়সা থাকত না। তাই পুরোনো চামড়ার জুতা হতে তার ফিতার একটা অংশ কেটে নিজেই বানিয়ে নিতাম। কাউকে বলতাম না যে ম্যাগজিনের চামড়া পুরোনো জুতার। বললে বন্ধুমহলে আর মুখ দেখানো যেত না। মাটি ছেনে তা দিয়ে ছোট ছোট বল বানানো হত। তারপর তা শুকিয়ে আগুনে কয়লা বানিয়ে তাতে রেখে পোড়ানো হত। একটু পয়সা পাতি হাতে থাকলে মার্বেল দিয়েও গুলি বানানো হত। গুলতি নিয়ে পথে প্রান্তরে ঘুরতাম। পাখি মারার জন্য। পাখিতো কখনো তাক করে মারতে পারিনি তবে জানালার গ্লাস আর কলাগাছের গায়ে তাক প্রাকটিস করেছি প্রচুর। মাস না ঘুরতেই গুলতির প্রতি আগ্রহ কমে আসত। তখন অন্য কোনো দুষ্টুমীতে লিপ্ত হতাম। গুলতি পড়ে থাকতে খাটের তলায়।
পর্ব-২৫: টারজান:
কলাগাছের পাতার ডাটো নিয়ে তার পাতা চিকন চিকন করে ছিড়ে দিয়ে তারপর সেই কলার পাতা ডাটোসহ পায়ের মাঝে দিয়ে পড়ে টারজান সাজতাম। কলাবাগানে কলাগাছের পাতা ঝুলে ঝুলে বাঁশের চটা দিয়ে বানানো ধনুক আর পাটখড়ির তীর নিয়ে আমরা টারজান টারজান খেলতাম। কলাগাছের পাতা ধরে ঝুলে ঝুরে এধার ওধার করতাম। কলাগাছ লাগানো হত ছোট ছোট নালা (পাগাড়) কেটে যার মধ্যে পানি থাকতো। আমরা সেই কলাপাতার ডাটোতে ঝুলে নালার এপাড় ওপাড় করতাম। আর মুখে টারজানের মতো শব্দ করতাম…………..আ আ আ আঁআঁআঁ। কখনো কলাপাতা ছিড়ে নালায় পড়তাম। তবে বাবা যদি টের পেতেন তার সাধের কলার বাগানের কী হাল করেছি, তবে পিট্টি আর তলায় পড়ত না। জানি না কেন, ছোটবেলার সব খেলাই কেন যেন বিপজ্জনক ছিল। সেই তীর ধনুকের কথা মনে হলে আজও গা শিউড়ে ওঠে। ওতে চোখ কানা হতে পারত। তবু সেই বয়সেই যাবতীয় দস্যিপনাতেই ছিল আনন্দ।
পর্ব-২৬: হকি প্লেয়ার:
গাছের এল শেপের ডাল কেঁটে হকি স্টিক বানানো হত। শীত এলেই আমরা হকি খেলা নিয়ে পড়তাম। টেনিস বল দিয়ে হকি খেলতাম। তবে খেলার চেয়ে সারাক্ষণ লাঠির আঘাত হতে পা বাঁচানোতেই বেশি নজর থাকত। খুব হাস্যকর শোনাবে, তবু বলছি। ওই হকি স্টিক দিয়ে আবার আমরা গলফও খেলতাম। যদিও এবড়ো থেবড়ো মাঠ আর টেনিস বলের লাফালাফির কারনে কখনোই গর্তে বল পড়ত না। শেষমেষ বিরক্ত হয়ে আবার হকিতে ফেরত। তারপর হকি না জমলে সেই বল দিয়েই ক্রিকেট। আমার মনে আছে, একবার আমার হকির স্টিক (মানে ওই ডাল আরকি) দিয়ে মা ধান সেদ্ধ করার তাফালে (চুল্লী) খড় লোডিং এর কাজে ব্যাবহার করেছিলেন। বিধায় আগুনে আমার স্টিকের বাঁকানো মাথাটা পুড়ে যায়। মা’র ওপর সেকি অভিমান হয়েছিল।
পর্ব-২৭: মসজিদ সংস্কার:
কলোনীতে একটা পুরোনো ওয়ার্কার ব্যারাক ছিল। ব্যারাকটার দেয়ালে নোনা ধরা, চাল ফুটো, ফ্লোর ফেটে গাছ গজিয়েছে। তার ইটের হাড় জিরজিরে বুক বেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ অব্যবহারে তার এপ্রোচ রোডটি বুনো গাছে ভরা। প্রতিবছর রোজা আসার আগে দিয়ে আমরা পোলাপান মিলে সেই পরিত্যাক্ত ব্যারাক হাউসটি নতুন করে পরিষ্কার করতাম। আগাছা কেটে রাস্তা বের করতাম। পানি ঢেলে ফ্লোর পরিষ্কার করতাম। নতুন করে আতর গোলাপজল দিয়ে পবিত্র করতাম। পুরোনো ইট এনে আজানের স্থান বানাতাম। অনেকটা মজিদের লালসালু গল্পের মতো। ঘর টিক করা হয়ে গেলে কলোনীর সবচেয়ে ধর্মপ্রাণ নাসির কাকাকে ধরতাম ওখানে আমাদের নামাজে ইমামতি করতে হবে। তিনি আমাদের উৎসাহ দেখে রাজি হতেন। অতঃপর রোজার ১/২ দিন আগে হতে আমাদের সেই নতুন মসজিদ উদ্বোধন হত। বড়রা আমাদের উৎসাহ দিতে নামাজ পড়তে আসতেন। প্রথম রোজায় মসজিদে যায়গা হত না। গমগম করত আমাদের নতুন মসজিদ। যত রোজ গড়াত, তত মুসল্লী কমত। রোজাও শেষ, মসজিদে মানুষের আনাগোনাও শেষ হত। আমাদের উৎসাহে ভাটা পড়ত। নতুন কোনো কিছুতে আমরা ব্যস্ত হতাম। মসজিদ ঘর মানে সেই ব্যারাক বাড়ি আবার আগাছায় পূর্ণ হত।
পর্ব-২৮: নোট লুকানো:
আমাদের স্কুলে খুব প্রতিযোগীতা হত ফার্ষ্ট সেকেন্ড হবার। একজন আরেকজনের সাথে তীব্র প্রতিযোগীতা। সবাই ভাব করতাম সবাইকে খুব হেল্প করছি। কিন্তু মনে মনে চিন্তা, কী করে ফার্ষ্ট হতে হবে। কেউ একজন হয়তো কোনো বড় ভাই বা ভাল স্যারের কাছে হতে একটা ভাল নোট জোগাড় করেছে। সে সেটা সযত্নে অন্যদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখত। স্কুলে তো আনতই না, এমনকি বাসায়ও কোনো দুর্ভেদ্য ড্রয়ারে রাখত যাতে কালেভদ্রে কেউ তার বাসায় গেলে না পায়। কিন্তু স্কুলের খাতায় স্যার কিছু লিখতে দিলে যখন সে লিখে ভাল নম্বর পেত, আমরা সবাই মিলে চেপে ধরতাম। মীনমীন করে হয়তো কিছুটা স্বীকার করত। আমরা আমেরিকা আবিষ্কারের মতো করে উল্লাস করতাম। অতঃপর সবাই মিলে তার সেই গোপন ট্রেজার ভাগ করে নিতাম মানে ফটোকপির দোকানে গিয়ে। সবাই গণহারে তার নোট ভাগ করে নিচ্ছে অথচ সে রাগও করতে পারবে না। করলে তাকে একঘরে করা হবে। তার গোপন ধনসম্পদের এমন গণবিতরন দেখে তার দুঃখে মরে যাওয়া মুখ সবাই তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করতাম।
পর্ব-২৯: এসেম্বলী ফাঁকি আর ফিটের ব্যামো:
আমাদের হাইস্কুলে রোজ এসেম্বলী হত। স্কুলের কম্পাউন্ডে ক্লাসওয়াইজ লাইন দিয়ে দাড়াতাম। প্রত্যেক লাইনের সামনে যার যার মনিটর দাড়াতো। গ্রীষ্মে আমরা কেউ রোদে এসেম্বলী করতে না চাইলেও কোনো মাফ ছিল না। গরমে ঘেমে নেয়ে আমরা পিটি করতাম্ তারপর জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে শপথ। আজও সেই শপথের খানিকটা মনে আছে, “আমি শপথ করিতেছি যে, মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখিব।……..দেশের প্রতি অনুগত থাকিব।” তবে গরমে অতিষ্ট হয়ে একবার কিছু বাঁদর ছেলে নতুন এক ট্রিকস বের করল। ট্রিকসের নাম ফিটের ব্যামো। এসেম্বলী শুরু হলে লাইনের পেছন হতে পাইকারী হারে ছেলেরা অজ্ঞান হওয়া শুরু করত। দুই তিনজন পড়লেই এসেম্বলী বাতিল। পরপর কয়েকদিন যাবার পর স্যাররা এসেম্বলী করানো স্থগিত করেন। তবে শীতে আবার আমরাই এসেম্বলী করতে চাইতাম। কারন তাতে ক্লাস একটু দেরীতে শুরু হত। হা হা হা।
পর্ব-৩০: বৈশাখি মেলা/দরগার মেলা:
প্রতিবছর সম্ভবত বৈশাখ মাসে আমাদের বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজার প্রাঙ্গনে মেলা বসত যাকে আমরা বলতাম দরগার মেলা। দেশের নানা প্রান্ত হতে প্রচুর মানুষ আসত সেই মেলায়। বিচিত্র সব জিনিসপত্রও আসত। কাঠের জিনিস, ঘরের তৈজসপত্র, খাবার বিশেষত নোংরা রসগোল্লা আর পানতুয়া সাজানো থাকত বড় বড় গামলায়। আমাদের চোখ চকচক করত সেসব মিস্টির বাহার দেখে। মেলায় মা খুব একটা যেতে দিত না। তবে পাশের বাসার কাকীরা যেতেন। ওনাদের দিয়ে মা টমটম গাড়ি, ঈগল গাড়ি, হুইসেল বাঁশি, বারুদের পিস্তল, মাটির কুমির, ঢোল-এসব আনিয়ে দিতেন। বুবুর জন্য ফিতা, চুড়ি, নেলপলিশ, আলতা। মেলাতে জারি গান হত, রাত জেগে পালাগান। মা ওসব দেখতে দিতেন না। তবে ভাগ্যবান হলে কোনো কোনোবার যেতে পেতাম।
পর্ব-৩১: চোতরা পাতা/বিঁছুটি পাতা:
গ্রামগঞ্জে একরকম গাছ হয় যার নাম বিঁছুটি পাতা। আমরা গ্রামে বলতাম চোতরা পাতা। পাতাটার একটাই গুণ। কারো চামড়ায় লাগলে ভয়ঙ্কর রকম রিএ্যাক্টিভ এলার্জি শুরু হত। চুলকাতে চুলকাতে চামড়া তুলে ফেললেও রেহাই মিলত না। আমরা দুষ্টুমী করে প্রায়ই আরেকজনের গায়ে লাগিয়ে দিতাম এই পাতা। তার চুলকানি আর জ্বলুনী দেখে বিমল আনন্দ পেতাম বাকিরা। চুলকাতে চুলকাতে যেসব কাঁচা গালি দিত তার বর্ণনা দেবার ভাষা নেই। কাউকে ভয় দেখাতে হল চোতরা পাতা হাতে রাখলেই হত।
পর্ব-৩২: হাফ প্যাডেল বাইক আর এক্সরে ফিল্ম:
আব্বার একটা বৃটিশ বাইসাইকেল ছিল-হাম্বার। বিরাট আকৃতির। আমি সেটার সীটে বসে প্যাডাল নাগালে পেতাম না। তাই সীটের নিচের বডিতে হাত রেখে হাফ প্যাডেল করে সেটা চালাতাম। আব্বা খুব কমই দিনের বেলায় বাসায় থাকতেন। কখনো থাকলে আমার হত ঈদের দিন। আব্বা একটু ঘুমালে আমি সাইকেল নিয়ে দুপুরের রোদে কলোনীর রাস্তায় হাফ প্যাডেল করে টো টো সাইকেল চালাতাম। আরেকটা মজার কাজ করতাম। এক্সরে ফিল্ম কেটে সেটা সাইকেলের বডিতে বেঁধে চাকার মধ্যে দিতাম। স্পোকের ঘষায় সেটায় প্রবল শব্দ হত। সারা পাড়া সচকিত করে সশব্দে সাইকেল চালাতাম। তবে সেটা অবশ্যই নিজের সাইকেল পাবার পর। মনে আছে, এক রোজায় আব্বা রাতে ঘুম ভাঙিয়ে আমাকে আস্ত একটা বাইসাইকেল গিফট করেন। লটারীতে জিতেছিলেন তিনি। সেদিন মনে হয়েছিল, ঈদ চলে এসেছে। কখনো হাতছাড়া করিনি সেই সাইকেল। সহপাঠিদের সাথে হেব্বি ভাব নিতাম সাইকেল থাকায়। অবশ্য সাইকেলটা পেয়ে আমাকে আর প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার হেঁটে হেঁটে স্কুলে যেতে হত না।
পর্ব-৩৩: স্যালাইন পুশ:
কারো বাসায় কাউকে স্যালাইন পুশ করলে ব্যবহৃত স্যালাইন ব্যাগ ও এ্যাম্পুল জমিয়ে রাখতাম। তারপর সেই স্যালাইনের ব্যাগে পানি ভরে সেটা দিয়ে আমরা স্যালাইন দেয়ার খেলা খেলতাম। বিশেষত কুমড়ো গাছের ফাঁপা ডাটোতে সুই ফুটিয়ে স্যালাইন দেয়াতে বেশি মজা ছিল।
পর্ব-৩৪: চড়ুুইভাতি:
আমরা পোলাপান মিলে প্রায়ই চড়ুইভাতি করতাম। কারো বাসা হতে চাল, কারো ডাল, কারো নুন মরিচ, কারো বাসার পিয়াজ, কেউ দিত ডিম, কেউ আনত সবজি। তারপর কুড়োনো লাকড়ি বা গাছের ডালপালা দিয়ে মাটিতে খোড়া চুলায় আগুন জ্বালতাম। বাসা থেকে আনা বা আমাদের ছোট ছোট খেলনা হাড়িতে ভাত বা খিচুড়ি চড়ানো হত। ভাত রান্নাটা যেমন তেমন কিন্তু তরকারীটা কিছুতেই পারতাম না বিধায় বড় আপুদের হেল্প নিতে হত। বিনিময়ে ভাগও দিতে হত। ব্যাপক আয়োজন করে রান্নার পরে সবাই গোসল করে এসে গোল হয়ে বসতাম। তারপর পরিবেশন হত কলাপাতায়। সামান্য একটু ভাত বা খিচুড়ি সাথে ডিম ভাজি। আহ! মনে হত অমৃত।
পর্ব-৩৫: ২ টাকার টিফিন:
সেই যুগে মায়েরা আমাদের হাতে টাকা দিতেন না। ভাবতেন, টাকা হাতে পেলে ছেলে নষ্ট হয়ে যাবে। তারপরও মা’র সাথে বহু ঘ্যানঘ্যান করে ২টাকা ম্যানেজ করতাম। স্কুলে দেলো ভাই ছিলেন যিনি ছোলা মুড়ি কখনো ডাবলীর ঝোল রান্না করে আনতেন। তার বিশাল হাড়িতে ঘনঘন ঠনঠন শব্দ করতেন টিফিন টাইমে। আমাদের কাছে ব্যপক চাহিদা ছিল তার সেই টিফিনের। কখনো কখনো আনতেন চালতার বা বড়ই’র আচার। নোংরা কাগজের টুকরার উপর এক চামচ আচার বা এক ঠোঙা ছোলা মুড়ি। সেই ২ টাকার টিফিনেই আবার ভাগ বসাতো একাধিক ফ্রেন্ড। তবু সুখ ছিল জীবনে। পরম আতিথ্য আর নির্মলতা ছিল সম্পর্কে।
পর্ব-৩৬: মালাই:
সেকালে আজকের মতো হাজার হাজার দামী আইসক্রীম বাজারে আসেনি। আসলেও সেটা আমাদের মফস্বলে ততটা প্রচলিত ছিল না। তখন একটা চকোবার আইসক্রীমের দাম ছিল ১২ টাকা যা আমাদের মতো মফস্বলী কিশোরদের হাতের নাগালের বাইরে। আমাদের সম্বল ছিল মালাই আইসক্রীম। পায়ে টানা বক্স গাড়িতে করে মালাইওয়ালা আসত। টুনটুন করে বাজতে থাকত তার ঘন্টাটি। মালাইওয়ালার ঘন্টার আওয়াজ পেলেই বাচ্চারা সব বাসার সামনে হাজির। দু’রকম আইসক্রীম ছিল-আট আনার ও এক টাকার। একটাকারগুলো একটু সাদা আর আটআনারটা বেশি সস্তা ও বাদামী। সেই মালাই আইসক্রীমের ভিতর থাকত বাঁশের তৈরী স্টিক যেটা ধরে আইসক্রীম খেতে হত। মাঝে মাঝে পলিব্যাগের চিকন টিউবেও আসত রঙ বেরঙের স্টিক আইসক্রীম। আসলে সেগুলো তৈরী হত স্রেফ বরফ আর রং দিয়ে। আমাদের সেই সময়ে সেগুলোই অমৃত।
পর্ব-৩৭: জয়ঃতু বিটিভি:
আমাদের পুরো কলোনীতে টিভি ছিল দু’টো। বহুদিন পর্যন্ত সেই দু’টো টিভিই ছিল পুরো কলোনীর বিনোদনের মাধ্যম। তবে আমাদের বাসারটাতে সবার একসেস বেশি ছিল বলে, বিকেল হলেই আমাদের বসার কাম শোবার ঘরে পাটি বিছিয়ে কলোনীর সব বাচ্চারা কার্টুন দেখতে বসতাম। থান্ডার ক্যাটস, ক্যাপ্টেন প্লানেট, টিনেজ মিউট্যান্ট, টম জেরি, ডিফেন্ডার্স অব দি ইউনিভার্স-এসব কার্টুন গোগ্রাসে গিলতাম। শুক্রবারে বিকেলে বাংলা সিনেমা হত। ওইটাই সপ্তাহের একমাত্র মুভি। কলোনীর বাচ্চা বুড়ো সবাই একসাথে বসে শাবানা, রাজ্জাক, কবরী, ববিতা, আলমগীরের সিনেমা দেখতাম। জসিম বা সোহেল রানারা বিখ্যাত ছিল মারামারির জন্য। আজকালকার মতো তখন সিনেমা দেখতে বসে কাউকে বিব্রত হতে হত না। আমরা বাচ্চারা একটা ছড়া বলতাম, “শাবানার কোলে, রাজ্জাক দোলে; এই ছবি চলে, মণিকা হলে।” শুক্রবারে দুপুর ১২ টায় টানজান হত। টারজান দেখতে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হত। কারন জুম্মার আজান হয়ে যেত। মা তাড়া লাগাতো, কখনো পিট্টি।
পর্ব-৩৫: বাটি ছাট ও আর্মি কাটের মাহত্ম:
কলোনীতে সবার চুল কাটার জন্য মাসে একবার নাপিত কাকু আসত কোনো শুক্রবার সকালে। তিনি আমাদের সবার কমোন শত্রূ। কারন বিভিন্নজনে যে নানান স্টাইল করে চুল রাখত তার কাঁচির ঘায়ে সেটা মুহূর্তে কাকের রূপ ধারন করত। যাহোক, কাকু আসলেই ঘরে ঘরে সাড়া পড়ত। বাবারা বা বড় ভাইরা ছোটদের ধরে ধরে নাপিত কাকুর সামনে বসিয়ে দিয়ে যেত। একটা ছোট্ট কাঠের টুলের ওপর বসিয়ে তিনি একে একে সবার চুল কাটতেন। স্টাইলে কোনো ভেরিয়েশন নেই। সবারই বাটি ছাট। বাটি ছাট বোঝেননি? ওই যে, মাথার সব চুল লন মোয়ারের ছাটার মতো করে গুড়া গুড়া করা হত। তারপর মাথার চারপাশ হতে কানের নিচের সবচুল ক্ষুর দিয়ে চেছে দেয়া হত। মনে হত যেন বাটি বসিয়ে চুলটা ছাটাই করে দেয়া হয়েছে। সেই হাস্যকর চুলের স্টাইল দেখে অন্যরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করত। আবার একটু পরে নিজেই সেই মেশিনে ছাটাই হয়ে নিজেই হাসির পাত্র হত। বড়রা এসেই, “এই তোর চুলের স্টাইলটাতে রাজ্জাকের মতো হয়েছে” বলে মনের জ্বালা আরো দ্বিগুন বাড়িয়ে দিতেন।
পর্ব-৩৬: খেজুর ডালের পিপিপ গাড়ি:
শীতের দিনে যখন গাছি খেজুর গাছ কাটতে আসতেন, তখন তিনি খেজুরের অনেকগুরো পাতা তার ডাটোসহ গোড়া হতে কেটে রস নিঃসরনের স্থান বানাতেন গাছের গায়ে। সেই বাঁকানো গোড়াযুক্ত খেজুরের ডালকে মাপমতো কেটে আমরা গাড়ি গাড়ি খেলতাম। আরেক ধরনের গাড়ি বানানো হত তালের শাঁস দিয়ে। তালের শাঁসের রসালো অংশ খাওয়া হয়ে গেলে একটা শক্ত গাছের ডাল হাতখানেক কেঁটে তার দুপ্রান্তে দু’টো তালের কাটা শাঁস জুড়ে এরপর একটা নারকেলের পাতার ডাটো মাথায় হালকা গর্ত করে তা দিয়ে সেই গাড়ি চালাতাম। আমরা এমনকি সুপারি পাতার চওড়া বাকল যেটাকে আমরা সুপারির খোল বলতাম, সেটাতে একজনকে বসিয়ে দুই তিনজন মিলে উঠানে টেনে নিতাম। পালাক্রমে সবাইকে একবার চড়তে দেয়া হত। ডুমুরকে চাকা বানিয়ে ছোট মাটির গাড়িও বানাতাম। ডুমুরের মধ্যে শলার কাঠি ঢুকিয়ে লাটিমও বানাতাম। কচুরীপানার ডাটো যেগুলো একটু পেটমোটা হত, সেগুলোতে নারকেলের পাতার শলা ছোট করে ঢুকিয়ে গরু, ভেড়া বানাতাম। নারকেল পাতা দিয়ে বানাতাম চশমা, ঘড়ি, পাখি, বাঁশি; খেজুর পাতার কচি অংশ দিয়ে সূর্যমুখি ফূল, বল ইত্যাদি। কাগজ কেটে বানাতাম নৌকা, বল, পদ্মফুল, পাখি। আজকালকার বাচ্চাদের কাছে ওগুলো স্বপ্ন মনে হবে।
পর্ব-৩৭: গাড়িরে পেছনে ছোটা:
আমাদের মফস্বলে প্রাইভেট কারের উপস্থিতি ছিল খুব বিরল। হঠাৎ কোনো একদিন হয়তো শহরের কোনো ধনী মানুষ তার গাড়ি নিয়ে আসতেন। আমরা বাচ্চারা দলবেঁধে সেই গাড়ি দেখতে যেতাম। গাড়ির পিছন পিছনে দৌড়াতাম। গাড়ির মালিক ঘরে ঢুকলে আমরা গাড়ি নিয়ে গবেষনা করতাম। কলোনীতে একটা পুরোনো সার্ভিস জীপ (ওই যে বীচে ভিলেনরা নায়িকাকে অপহরন করতে যেগুলো ব্যবহার করত) ছিল। বহুকাল অব্যবহারে জীর্ন, ভঙ্গুর। আমরা ওটাতে চড়ে গাড়ি গাড়ি খেলতাম। আকাশ দিয়ে কোনো হেলিকপ্টার বা প্লেন গেলে ঘর হতে সবাই ছুটে বেড়িয়ে সেই প্লেন দেখত। তখনকার দিনে আমরা জেট প্লেন চিনতাম না। আকাশে অনেক উপরে দিয়ে জেট প্লেন গেলে তার যে ধোয়া পেছনে পড়ে থাকত সেটা দেখে আমরা বলতাম ওগুলো হল রকেট।
পর্ব-৩৮: ক্যাসেট প্লেয়ার আর হাওয়া হাওয়া:
সেই সময় আমাদের গান শোনার একমাত্র উপায় ছিল ক্যাসেট প্লেয়ার তথা টু ইন ওয়ান। ন্যাশনালের একটা টু ইন ওয়ান আমাদের বাসায় ছিল। আব্বার কঠোর তত্বাবধানে ওটা থাকত। শুধু আব্বা বাসায় না থাকলেই ওটার মালিকানা যথাক্রমে ভাইয়া, তারপর বড় আপা, তারপর আমার দখলে আসত। একেক জনের একেক পছন্দের গান ছিল। তবে কমোন ছিল একটা-ক্যাসেটের ফিতার পুরোনো হেড খুলে আব্বার আনা নতুন ফিতার হেড লাগিয়ে সেগুলোর সাউন্ড বাড়ানোর চেষ্টা। আব্বা টের পেত না। তখনকার দিনে খুব জনপ্রিয় ছিল দেশী গান বিশেষত গুনাই বিবি, বেদের মেয়ে, সিরাজ বয়াতি, মদীনার পথে, বেলালের জারি, আব্দুল আলীম, বাইজু বাউরা এগুলো ছিল প্রত্যেক ঘরে ঘরে। রেডিওরও খুব কদর ছিল। সন্ধ্যার পরে সবাই সাড়ে সাতটায় গোল হয়ে বসে বিবিসি শুনত। বিবিসির খবরকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখা হত।
পর্ব-৩৯: দোকানদারী খেলা:
কলার খোল দিয়ে বা নারকেলের মালা দিয়ে দাড়িপাল্লা বানানো হত। চুনামাটি দিয়ে দই, সুড়কি দিয়ে মরিচের গুড়া, বুনো শটি দিয়ে হলুদ, বড়ই পাতার কয়েন আর সিগারেট প্যাকেটের টাকার নোট। সমস্যা হল সবাই দোকানদার হতে চাইত। কাষ্টমার কেউ হবে না। তাই পালাক্রমে সবাইকে দোকানদার বানাতে হত। টাকা বানানো হত সিগারেটের প্যাকেটের তাস দিয়ে। তবে সেটা আমাদের পক্ষে যোগাড় কঠিন হত বিধায় প্রায়ই বিকল্প হিসেবে বড়ই পাতাকে কয়েন বানানো হত।
পর্ব-৪০: ক্যাওড়ার মূল দিয়ে শাটল:
শীতকাল এলে আমরা কলোনীর মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। প্রথম দিকে প্লাস্টিকের শাটল দিয়ে খেলতাম। তবে বড় ভাইয়েরা খেলত ফেদারের শাটল দিয়ে। তো আমাদের সেই প্লাস্টিকের শাটলের চেয়ে ফেদারের শাটলে ভাল খেলা হত। কিন্তু পয়সা দিয়ে সেই দামী শাটল (১২ টাকা পিস তখন) কেনার মতো হ্যাডম আমাদের থাকত না। তাই আমরা বড়ভাইদের পরিত্যাক্ত শাটল যোগাড় করতাম। ওরা সাধারনত ২/৩ গেম খেললেই শাটলের নীচের হোল্ডারটা ভেঙে যেত কারন তখন বেশিরভাগ শাটলের হোল্ডার তৈরী হত কর্ক দিয়ে (যেটা দিয়ে হোমিও ওষুধের বোতলের ছিপি তৈরী হয়)। কিন্তু মূল শাটলের ফেদার অক্ষত থাকত। আমরা সেই ড্যামেজড শাটল নিয়ে নিতাম। তারপর ক্যাওড়া গাছের শ্বাসমূল এনে সেটা শুকিয়ে নিলে সেই কর্কের মতো হত। সেটাকে শাটলের হোল্ডারের শেপে কেটে তাতে মাপমতো ফুটো করে ফেদারের বডিটা আঠা দিয়ে বসিয়ে শুকিয়ে নিতাম। সেই রিমেক শাটল দিয়ে আমাদের বেশ চলে যেত। শুধু একটু ভারী বলে সেটাকে সাবধানে মারতে হত। আজ যখন নিজে টাকা আয় করি, হাজার টাকা উড়াই তখন সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে হাসি পায়। তবু মনে হয় সেই দিনগুলোই ভাল ছিল।
পর্ব-৪১: লাটিম:
আমাদের শৈশবের মারাত্মক আসক্তির যেসব বস্তু ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল লাটিম। বিভিন্ন আকার ও রঙের লাটিম কয়েকটা করে থাকত সবার। তবে কিছু লাটিম ছিল ফাইটিং করার আর অন্যগুলো মূলত ঘোরাবার জন্য। লাটিম ঘোরাতে একটা ছোট্ট চিকন কটনের বা নাইলনের দড়ি ব্যবহার হত যাকে বলতাম লেপ্তি। লাটিমে লেপ্তি পেঁচিয়ে সেটাকে হাত দিয়ে কায়দা করে ছোড়া হত। লেপ্তির টানে লাটিম বনবন করে ঘুরত। প্রতিযোগীতা হত কার লাটিম কতক্ষণ ঘোরে। কেউ কেউ আবার আরো কারিকুরি পারত। লেপ্তি হতে লাটিম কায়দা করে ছুঁড়ে সেটাকে মাটিতে পড়তে না দিয়ে টেনে হাতের তেলোয় ঘোরানোর দক্ষতা যাদের ছিল, ছেলেমহলে তাদের ব্যাপক ভাব ছিল। তবে যথারীতি বাবা-মা’র কাছে লাটিম খেলা ছিল নিষিদ্ধ। ধরা পড়লে খবর হয়ে যেত। বাসায় লাটিম লুকিয়ে রাখা হত।
পর্ব-৪২: মুরগী জবাই:
মা তখন গরু মুরগী পালতেন। শখের পালন্ মুরগীগুলো ছিল মা’র জানের জান। পালতেন ঠিকই কিন্তু জবাই করতে পারতেন না, মায়ার টানে। নিজে হাত খাবার নিয়ে মুরগীকে খাওয়াতেন না। তখনকার দিনে বাসাবাড়িতে মুরগী বা গরু খুব রেগুলার রান্না হত না। মফস্বলের বাসিন্দা মধ্যবিত্ত আমাদের প্রধান খাবার মেন্যু ছিল মাছ ও ডিম। তো তারপরও মাঝে মধ্যে অবেলায় মেহমান এসে পড়ত। মাজারের শহর হওয়ায় প্রায়ই মাজার দর্শনের জন্য বাসায় ২/৩ দিনের জন্য মেহমান এসে থাকতেন। তখনকার দিনে কারো বাসায় ২/৩ দিনের এমনকি মাসখানেকের জন্য মেহমান হওয়া কোনো ব্যাপারই ছিল না। তো মুরগী জবাই করা ছিল এক হ্যাপা। কারন মুরগী জবাই দিতে ওজু করতে হবে। তাছাড়া নামাজ পড়েনা এমন কাউকে মা মুরগী জবাই করতে দেবেন না। কলোনীতে একজন কাকী ছিলেন মোটামুটি নামাজি। তো মুরগী জবা করলেই তাকে ডাকা হত। তিনি মুহূর্তে মায়া দরদ শিকেয় তুলে জবাই করে ফেলতেন। তারপরও আরেক হ্যাপা। সহকারী লাগবে যে মুরগীর পা আর পাখনা ধরবে। এখনকার মতো বাজারে ব্রয়লার পাওয়া যেতনা। আর এখনকার মতো পিচ্চি পিচ্চি মানুষ বা যে কেউ যেমন পায়ের তলায় মুরগী চেপে ধরে জবা করে ফেলে-অমন ছিলনা। তো কাকীর সাথে ধরত আরেকজন যাকে অবশ্যই শীত হোক গরম হোক অযু করতে হত। তারপর জবাই করে দিতেন। রান্না শেষে ছোট্ট একবাটি মুরগীর ছালুন (কারী) ওই কাকীকেও কৃতজ্ঞতাস্বরুপ পাঠানো হত। ইস, ঘরে পালা দেশী মুরগীর ছালুনের ঝোল দিয়েই এক থাল ভাত খেয়ে ফেলতাম।
আমাদের সময়কার সেইসব ঐতিহ্য যা আজকাল আর দেখা যায়না বা প্রায় বিলুপ্ত-সেগুলো নিয়ে। খুব স্বল্প পরিসরে। যা যা পেয়েছিলাম নাম হিসেবে, তার একটা তালিকা দিলাম। আপনার আরো জানা থাকলে যোগ করুন মন্তব্যে। অথবা এমন কিছু, যা শৈশবে ছিল, এখন মিস করেন। ১.গুলতি২.বাঁশের ফটকা৩.রুহ আফজা শরবত৪.হক বিস্কিট৫.কোহিনূরের প্রোডাক্ট৬.শীতকালের পিঠা (বাসা বাড়িতে প্রায় বানানোই হয় না। )৭.মার্বেল খেলা৮.পালকি৯.বৈঠায় চলা নৌকা১০.বাটন বিশিষ্ট মোবাইল ফোন১১.বন্দুক (আগে অনেক বাড়িতেই থাকত।)১২.কর্ণফুলি সাদা কাগজ আর নিউজপ্রিন্ট কাগজের খাতা১৩.পেপসির পাইপে গুড়ো দুধ১৪.নাবিস্কো লজেন্স১৫.টীনের পিস্তল আর কাগজের রোলের গুলি১৬.বাচ্চাদের ল্যাংগোট১৭.লুঙ্গী ও ধূতি পড়া১৮.বলপয়েন্ট কলম১৯.দোয়াত, কলম২০.টিফিন ক্যারিয়ার বাটি২১.গান: জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদী, মারফতি, টপ্পা, হামদ, নাত, কবি গান, কীর্তন, শ্যামা।২২.প্রদীপের কালিতে তোলা কাজল২৩.স্যান্ডো গেঞ্জি ২৪.খড়ম ২৫.রানার২৬.পোস্ট অফিস২৭.চিঠি লেখাআরো অসংখ্যা জিনিস, কাজ বা ঘটনা হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। যেটা আপনার মনে পড়ে, লিখে ফেলুন না?
শৈশব এক অবিচ্ছিন্ন জীবনগাঁথা। বিস্মরন অযোগ্য স্মৃতি আমাদের শৈশব। আমি জানি আমাদের সবারই এমন অসংখ্য রঙে রঙ্গীন শৈশব স্মৃতি আছে। যা কখনো ভুলবার নয়। আমি আমার দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন হিসেবে এই শৈশব গাঁথাটি লিখতে শুরু করি। ইচ্ছে ছিল আরো অনেক বিষয় তুলে ধরব। এখনকার বাচ্চারা যাদের সত্যিকার অর্থে শৈশব বলে কিছু নেই তারা পড়বে আমাদের সেই বর্নাঢ্য শৈশবকে। হয়তো তারা আগ্রহী হবে নিজেদের এই ভয়ানক স্মৃতিবিহীন শৈশবকে বদলাতে। তবে কলেবর খুব বড় হয়ে যাওয়ায় আর পেটের তাগিদে রুজির পেছনে সময় দেয়ার তাগাদায় আর পারলাম না। তাই ৪২ পর্বে ইতি টানলাম। অনেকগুলো পর্ব এর আগে প্রকাশ করেছি ছোট ছোট করে।
আমার সবসময় একটা ভয় হয়, না জানি পুরোটা লেখা দেবার আগে মরে যাই। তাই আর অপেক্ষা না করে বাকি পুরোটা আজ একসাথে রিলিজ করলাম। হয়তো বিশাল হল। তবে আমি বিশ্বাস করি, শৈশব যত বড়, এই লেখা তত বড় হবে না। আমার কোনো উত্তরাধিকার নেই যার বা যাদের কাছে দিয়ে যাব, বলে যাব আমার পরম্পরা শৈশবকে। তাই বাংলাদেশের এই ক্রান্তিকালের অগনিত শিশু, কিশোর, যুবার জন্য লিখে রেখে ইথারে ভাসিয়ে গেলাম বাংলাদেশ, আমাদের প্রাণের বাংলাদেশের একটি বিশেষ সময়ের ডায়েরী। হয়তো কেউ পড়বে না। হয়তো অনেকেই পড়বে।
পড়ুন বা না পড়ুন, একটা অনুরোধ রইল। বাংলাদেশের শিশুরা ভয়ঙ্কর এক শূন্যতা, শৈশবহীনতার ভিতর দিয়ে মেকানিক স্মৃতি নিয়ে যন্ত্রমানব হয়ে বড় হচ্ছে। ওরা এক রোবট জেনারেশন হবার দিকে এগোচ্ছে। উচ্চ ডিগ্রীধারি রোবট। প্রানহীন, প্রাণশক্তিহীন, মায়াবিহীন প্রাণের রোবট। ওদের একটু মুক্তি দিন। ওদের আবার মানুষ হয়ে বড় হতে দিন।
#childhoodmemories #legacy #heritage #lostnostalgia #NostalgiaOf90s