ইস্যূপাগল জাতির জন্য আগামী কয়েকদিনের ইস্যূ হল ’ধর্ষণ’। ’ধর্ষণ’ নিয়ে গরম গরম পোস্ট দেখে সবার মতো করে আমার একচেটিয়াভাবে মেনে নিতে কষ্ট হয়, যে, আমাদের সমাজে ধর্ষন সার্বজনিনভাবে পরিত্যাজ্য কাজ। ফেসবুকের গন্ডি ছাড়িয়ে ‘ধর্ষণ’ এখন লিংকডইনেও। হোক।
ফেসবুক আর লিংকডইনের ‘ধর্ষনের’ বর্ষন দেখে আমার মনে হচ্ছে, দেশের সমস্ত মানুষ ওলি আওলিয়া। দেশে কোনো ‘ধর্ষক’ নেই। না থাকুক। সেটাই তো চাই।কিন্তু খটকা অন্যত্র। যেমন:-আমি প্রায়ই মধ্যবয়সী বা তরুন বয়সী ছেলেদেরকে কয়েকজন একত্র হলেই দেখি, তাদেরই দলেরই মেয়েদের নিয়ে রসালো আধাযৌন বা যৌন ইঙ্গিত করতে। কৌতুক বলতে।
তাদের শরীরি আকর্ষন নিয়ে মজা করতে। বাধা দিলে শুনতে হয়, “আহ, বন্ধুদের মধ্যেও কি একটু মজা করা যাবে না?” এই হাফ ধর্ষকদের কেউ কেউ আবার ফুল ধর্ষকের ফাঁসি চাইছে। আপনার কি মনে হয় না, ধর্ষনের বীজ এখানে রোপিত হচ্ছে?ধর্ষক হিসেবে পুরুষের একচেটিয়া বদনাম থাকলেও সত্যিটা ভিন্ন। আপনি মানেন বা না মানেন, (বিশ্বে তো বটেই) বাংলাদেশে নারী ধর্ষকের অস্তিত্বও আছে। কীভাবে? আরো ভাবুন।
“চোখের দৃষ্টিতে ধর্ষণের কথা তো শুনেছেন? সেই ধর্ষণের অপরাধে তরুণ পুরুষ যেমন আছে, তরুণ নারীও আছে আকছাড়। নারীকে চোখের লালসা দিয়ে বিদ্ধ করা যদি দৃষ্টির ধর্ষণ হয়ে থাকে, বান্ধবীদের ভিতরে তাদের সঙ্গী বা অপরিচীত হ্যান্ডসাম পুরুষকে নিয়ে “যৌন” বা “আধাযৌন” ইঙ্গিত, কৌতুক বা দৃষ্টি কেন তবে পুরুষকে ধর্ষণ করা হিসেবে গণ্য হবে না?
এটাতো সত্যি, একজন নারী ধর্ষিত হলে (বিশেষত) সে বিধবা হলে “ছেনাল ….গী’র উচিত শিক্ষা হইছে” কিংবা দরিদ্র হলে, “আরে ছোটলোকগুলা এগুলাই করে….” ডায়লগ খুব কমোন। আর এই জাজমেন্টালিটি নারীদের মধ্যেও সমানে আছে।
যারা মনে করেন, সব নারীই অবশ্যম্ভাবিভাবে ধর্ষণের প্রতিবাদী-তারা বোকার স্বর্গে আছেন। আমি নিজে দেখেছি, ধর্ষিত নারীকে খোদ আরেকদল নারী ’উপযুক্ত বিচার হয়েছে’ বলে আরেকবার ধর্ষন করতে। আপনাদের মনে হতে পারে, ইদানীং ফেসবুক, ইন্টারনেট, ডিশ টিভি, ভারতীয় সিরিয়াল-এসবের জন্য ধর্ষণ বেড়ে গেছে। আহা, “আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম!” স্যরি, ধর্ষণ বাড়েনি। ধর্ষণের খবর প্রকাশ হওয়া, সামনে আসা বেড়েছে। সেই যুধিষ্ঠিরের যুগ হতেই ধর্ষণ ছিল। নানা ফর্মে।
দাস প্রথার যুগে দাসকে ইচ্ছেমতো যৌনসম্ভোগ করাকে আপনার কাছে কী মনে হয়-পবিত্র প্রেম? যুধিষ্ঠিরের যুগে ধর্ষণ হত, কেউ বলত না। বা সেটাকেই স্বাভাবিক ধরা হত। আধুনিক যুগে ধর্ষণ হত, লজ্জা বা বিয়ে না হবার ভয়ে কেউ প্রকাশ করত না। এখন যেহেতু সার্বিকভাবে লাজ লজ্জা বিষয়টা যাদুঘরে চলে গেছে, ধর্ষণের প্রতিবাদ বেড়েছে। পিডোফিলিয়া বা শিশুকাম নিয়েই আপাতত বেশি কথা হচ্ছে। তবে জানেন কিনা, ধর্ষণের প্রকৃত ও গভীর যে তাত্বিক কনসেপ্ট, তার আওতায় স্বামী কর্তৃক তার স্ত্রীরাও ধর্ষিত হচ্ছে। এমনকি ধর্ষণের প্রতিবাদে ফেটে পড়া কেউই হয়তো তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করেন আজীবন। তিনি ওটাকে বলেন, “ব্যাটাগিরী।” কী? এটার কথা কখনো ভেবেছেন?
আরেকটু যদি এ্যাডভান্সড হতে পারেন, তবে আরেকটু বলি। ’যৌনকর্মীরাও’ ধর্ষিত হয়। এবার বোধহয় হেসে দিলেন। দিন। হাসা থামলে শুনুন। একজন পুরুষ বা নারী যখন বলেন, “না”, তখন সেই ”না” মানে “না”। সেটাকে অগ্রাহ্য করে জোর করে যাই করবেন, যার সাথেই করবেন, সেটা ধর্ষণ। একজন “বেশ্যা”কে ধর্ষণের অধিকার বিধাতা কাউকে দেননি। ধর্ষণ নিয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়ারা অবশ্য “বেশ্যা”র ধর্ষিত হওয়া নিয়ে তবু হেসেই যাবেন। যান। আপনারা হাসতেই থাকুন। হাসতে হাসতে যেমন ধর্ষক ‘ধর্ষণ’ করে, ‘ধর্ষিতাকে’ নিয়ে হেসে হেসে তেমনি আমরা আরেকবার, না না বহুবার তাকে আবার ধর্ষণ করি।
বাজার কাটতি ও ইস্যুপাগল জাতি পরবর্তি কিছুদিন ‘ধর্ষনে’ মজে থাকবে। থাকুক। পেসবুকে গত কিছু দিনে ধর্ষণ নিয়ে যত রোনাজারি বর্ষন হয়েছে, তার মোটামুটি একটা বড় অংশ হল, আমার ছেলে বা মেয়েটাকে কী করে বাঁচাব।আমি একটা অন্য দিক বলি?
আপনার সন্তান যাতে ধর্ষিত না হতে পারে-তার প্রেসক্রিপশন তো অনেক হল। এবার আপনার সন্তান যে ধর্ষক হয়ে বড় হচ্ছে না-সেটা নিশ্চিত করার কিছু প্রেসক্রিপশন যোগাড় করুন। আপনি যদি আপনার বাসার ১৩ বছর বয়সী কাজের মেয়েটির ভেজা কাপড়ের শরীরের দিক হতে চোখ ফেরাতে না পারেন, আপনার সন্তানকে আপনার মতো করে আপনার তৈরী করতে হবে না।
অলরেডী তার জীনে আপনার ওই বদ খাসলত কপি হয়েই আছে। তাই তাকে ওটা হতে বাঁচান। কিছু কিছু ধান্দাবাজ ছাগল আবার এই সুুযোগে “৭১ সালেও এতগুলো ধর্ষণ হয় নাই” এই মহান বাক্য চকিতে লেখায় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। ব্যাটা ইতর, ’৭১ এর বিরাঙ্গনাদের ধর্ষিত হবার সার্বিক পটভূমি ও থীমের সাথে অন্য কিছুর তুলনা হয় রামছাগল? [’বেশ্যা’ শব্দটি নিয়ে বঙ্গট্যাবু জানা থাকা স্বত্বেও শব্দটি আমি সামাজিক কদর্যতা নিয়ে লিখবার জন্যে ব্যবহার করেছি। নিজের সংকোচ হওয়া স্বত্বেও। তাদের প্রতি আমি ক্ষমাপ্রার্থী সেজন্য।]
মানুষ ও তাদের সৃষ্ট নষ্ট সমাজের কদর্যতা নিয়ে লিখতে বসলে, নিজেরই মনে হয়, ইস্যুটাকে নিয়ে নিজের লেখকগীরি ফলাতে আমিও হয়তো কলম ধরেছি। কিংবা সমাজের সবার সাথে ”এট পার” থাকার যে চেষ্টা সমাজে আছে, সেটাকে হয়তো আমিও ফলো করলাম। সেই বদনাম মাথায় নিয়েই লিখলাম।
আচ্ছা, তনু নামের মেয়েটার বয়স কত ছিল কেউ কি জানেন?
শাজনীন কি বেপর্দা চলাচল করত? রূপা নামের মেয়েটাকে রেপ করে ঘাড় মটকে মেরে ফেলেছে কিছু বীর পুঙ্গব-কেন শুধু ধর্ষণ করে ক্ষান্ত হল না জানেন?
রিশার কি কোনো বয়ফ্রেন্ড ছিল?
গাজীপুরের যে মেয়েটি ধর্ষণের বিচার না পেয়ে বাবাকেসহ রেলে আত্মাহুতি দিল, ওর নামটা মনে পড়ছে কি?
বনানীর মেয়েদুটো কি ধর্ষকদের পাওয়ার অব এটর্নি দিয়েছিল ’রাতবিরাতে’ পার্টিতে যাবার অপরাধের বিচার করার?
একবছর বয়সের যে বাচ্চাটি রেপড ও কিলড হয়েছে ও কি উত্তেজক পোষাক পড়ে ধর্ষককে প্ররোচিত করত?
পূর্ণিমাকে মনে পড়ে? ওর মা যখন ওকে জন্মদান করেন, তখন কি ভেবেছিলেন, কোন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ে ওকে বড় করলে একদিন অপরিণত বয়সে ওকে একদল হায়েনার মুখের গ্রাস হতে হবে না?
ধর্ষিতা ও নির্যাতিতা ইয়াসমিনকে যখন ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন তার দু’পায়ে কি আলতার লেপটে থাকা দাগ সারাপথের সব পুরুষকে প্ররোচিত করছিল?
সাভারে যে গার্মেন্টস কর্মী মেয়েটা বাসে ধর্ষিত হয়েছিল ও কি বুঝতে পেরেছিল দিল্লীর অভয়ার মতো ওর নারী জন্মটাও ছিল একটা পাপ?
কিছু কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতে কিংবা কিছু লিখতে গেলেও হীনমন্যতাবোধ হয়। কেন যেন মনে হয়, খুব হিপোক্রেসী করছি। আমাদের নানারকম হিপোক্রেসী করার বা সুশীল চর্চা করার সুযোগ করে দিতেই বোধহয় রূপারা ধর্ষিত হয় কিংবা তাদের ধর্ষকরা ধর্ষণ করে।
আমি আজকাল লিখতে বসে প্রায়ই ভাবি, আমি কি আমার নিজের জন্য লিখছি? আমি কি রাইটার সেলিব্রেটি হতে চেয়ে লিখছি? আমি কি সমাজ উদ্ধারের নামে হিপোক্রেসী করছি?
খুব ছোটবেলায় মাঝে মধ্যেই আমাদের পাড়াগাঁয়ে হঠাৎ রৈ রৈ পড়ে যেত। আমরা মানুষের ভীড়ের মধ্যে মাথা গলিয়ে ঘটনা জানার চেষ্টা করতাম। সবাই ফিসফিস করত, ‘ছেড়িটারে নষ্ট করল’, ‘মাগিরও (দুঃখিত) দোষ আছিল’, ‘ক্যাডায় বিয়া করব’, ‘ঢ্যামনা বেটি, যেমন গেছে তেমনি……” ইত্যাদি ফিসফাস।
নাবালক আমরা বুঝতাম না। মা’কে কিংবা নানীকে জিজ্ঞেস করলেও ধমক খেতাম। একসময় আমাদের কোনো ইঁচড়ে পাকা সহপাঠীর মাধ্যমে শুনতাম, ‘অমুক বাড়ির একটা মেয়েকে মাস্তানরা নষ্ট করেছে’ যদিও বুঝতাম না মানুষ আবার নষ্ট হয় কী করে।
আপনারা কেউ কি বলতে পারবেন, ধর্ষিত হলে কেন কেউ নষ্ট হয়ে যায়? আচ্ছা, কেন কেউ ধর্ষিত হন কিংবা, বিপরীত দিক হতে বললে, কেন কেউ ধর্ষণ করে?
আমি একজন খুব সাধারন বাঙাল যে কিনা মাঝে মধ্যে টুকটাক লেখালেখি করি। আমি নিজেও কোনোদিন ভাবিনি, ধর্ষণের মতো একটি ইস্যুতে লম্বা প্রবন্ধ ফেঁদে বসবার মতো অবস্থা আমাদের বাংলাদেশে আসবে। কিন্তু খুব অবিশ্বাস্যভাবে, বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যেখানে অত্যন্ত বিরল ঘটনাক্রমে সরকার প্রধান ও বিরোধী দলীয় প্রধান হলেন নারী, যেদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষেরা বিশ্বে তাদের রাজধানীকে পরিচীত করেছেন মসজিদের নগরী হিসেবে, যে দেশে বিশ্ব ইজতেমার মতো বিশ্বস্বীকৃত জমায়েত হয়, যেদেশ বয়ে বেড়াচ্ছে ২-৪ লক্ষ বীরাঙ্গনার সম্ভ্রম হারানোর বিচার না হবার গ্লানি, যে দেশ এখন হতে দুই যুগ আগেই রীমার হত্যায় খুকু নামক একজন নারীকেও ছাড় দেয়নি, যে দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী, যেদেশে বিশ্বের খুব অল্প দেশের মধ্যে অন্যতম নারী আর্মি রয়েছে, যে দেশ সিডো সনদে সাক্ষর করেছে কোনো রকম দ্বিধা না করে সেই দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩ জন নারীর উপর রেপিষ্ট আক্রমণ হয় এবং তা নিয়ে প্রতিবারই একটা মৃদু নড়াচড়া সৃষ্টি হয়ে আবার মিইয়ে যায়-এটা খুবই বিপরীতধর্মী।
খুব ঠান্ডা মাথায় একটু চিন্তা করলে বুঝতে পারা যায়, বাংলাদেশে নিরব কিন্তু ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণ একটি স্বীকৃত সামাজিক ব্যাধির রূপ নিচ্ছে যা একসময় ছিল একটি বা দুটি বিচ্ছিন্ন সামাজিক অপরাধ। একটা সময় ছিল যখন এই দেশে সিঁদেল চোর নামক একটি বিশেষ শ্রেনীর মানুষই শুধু গ্রামেগঞ্জে চুরি করত। মানুষ তাদের কারনে তটস্থ থাকত। তবে ধরা পড়লে মৃদু মারধোর করে ছেড়ে দিত।
আপনি কি কখনো অনুভব করেছেন, ধর্ষণও এখন আমাদের শহর ও গ্রাম-উভয় সমাজে সিঁদেল চুরির মতো ডালভাত অপরাধে পরিণত হয়েছে? আপনি যদি সংখ্যাতত্ত্বে বিশ্বাসী হন তবে জেনে রাখুন, বাংলাদেশে প্রতিদিন (নথিভূক্ত) ধর্ষনের ঘটনা ঘটে ৩ টি যা মাসে ৯০টি, বছরে ১০৮০ (সংখ্যাটি কমবেশি হতে পারে।) মানে হল প্রতিবছর এই দেশের ১০৮০ জন নারী তার আজীবনের সুরক্ষিত সম্ভ্রম আক্রান্ত হবার নারকীয় যন্ত্রনায় বিদ্ধ হন এবং বাকি জীবনের জন্য সাইকোলজিক্যালী পঙ্গু হয়ে যাবার উপক্রম হন। মুশকীল হল আমরা সবাই ‘তনুর ভাই’ বনে গেলেও বিয়ের পাত্রী যদি শুনি ধর্ষিত হয়েছিলেন তবে তাকে বিয়ে করার কোনো প্রশ্নই ওঠেনা।
আরেকদল ধান্দাবাজ আবার বিপন্ন রোহিঙ্গাদের মানবতা উদ্ধারের নামে তাদের তরুনীদের বিয়ের অনলাইন আহবান জানাচ্ছে যার আড়ালে আছে ওই একই দুরহ ভোগ লালসা। বিভিন্ন দেশকে নিয়ে জাতিসংঘের করা পুরুষ ও সহিংসতা সংক্রান্ত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের গ্রাম ও নগর এলাকায় জরিপের আওতাভুক্ত পুরুষদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তারা তাদের জীবনের কোনো সময়ে কোনো মহিলার সাথে বলপূর্বক শারিরীক সম্পর্ক করেছেন কিনা। বাংলার গ্রামাঞ্চলের ১৪.১% এবং শহরের ৯.৫% পুরুষ বলেছেন ’হ্যা’। গ্রামের ২.৭% এবং শহরের ০.৫% পুরুষ বলেছেন তারা গত ১ বছরের মধ্যে রেপ করেছেন। গ্রামের ৪৭.৪% পুরুষ বলেছেন তারা একাধিকবার এটেম্প নিয়েছেন, ৩.৭% বলেছেন তাদের হাতে ৪ বা তার বেশি মানুষ ধর্ষিত হয়েছেন, ৪০% প্রথম রেপ করে যখন সে টিনএজার, ৮২% গ্রাম্য পুরুষ এবং ৭৯% শহুুরে পুরুষেরা মনে করেন, ধর্ষণ করা তাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে, ৬১.২% শহুরে পুরুষ রেপ করার জন্য কোনোরকম গ্লানিবোধ করেন না, ৯৫.১% রেপের জন্য কোনোরকম আইনগত শাস্তির মুখোমুখি হননি, ৩.৭% গ্রাম্য পুরুষ অন্যকোনো পুরুষকে রেপ করেছে, ৮৯.২% শহুরে পুরুষ সিরিয়াসলি বিশ্বাস করেন ‘রেপ করবার সময় যদি ভিকটিম শক্ত প্রতিরোধ না করেন’ সেটি কোনো রেপই নয়
(https://en.wikipedia.org/wiki/Rape_statistics#Bangladesh)।
সংখ্যাতত্ত্ব বাদ দিন। ধর্ষিতর সংখ্যা, ফ্রিকোয়েন্সি-ওগুলো স্রেফ কয়েকটা অঙ্ক। ধর্ষণের ফলে একজন মানুষ ঠিক কিভাবে বারে বারে তিলে তিলে প্রতিদিন মরে তার তীব্রতা ওই সংখ্যাতত্ত্ব বোঝাতে পারবে না। তবে জেনে খুশি হবেন, এখনকার রেপিস্টরা অবশ্য ধর্ষিতকে আর তিলে তিলে মরার কষ্ট না দিয়ে তাকে সোজা ঘাড় মটকে মেরে ফেলে মুক্তি দেবার মতো দয়াটুকু দেখানো শুরু করেছে।
আমরা যখনি রেপ নিয়ে কিছু বলি সেটাকে অবচেতনভাবেই মনে করা হয় একজন পুরুষ কর্তৃক মহিলার রেপ। কিন্তু বাস্তবতা হল, এই দেশে প্রতিটি দিন, বছরে যেসব রেপ এটাক হয় তার ভিকটিম ছেলে ও মেয়ে-উভয়ই। ধর্ষিত হবার পরে ধর্ষিতকেই প্রমান করতে হয় যে তিনি ধর্ষিত হয়েছেন। আমার একটা প্রশ্ন জাগে মনে। একজন ছেলে বা পুরুষ যখন ধর্ষিত হবেন, তখন তার প্রমানের জন্য কোনো ডাক্তারী পরীক্ষা আছে কিনা যেমনটা মেয়েদের জন্য আছে? বাংলাদেশে পুরুষ (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে) ধর্ষিত হলে তার জন্য কোনো মামলা ফাইল হবার নজির কি আছে? আমি উভয়শ্রেনীর মানুষের ধর্ষিত হওয়াটাকেই বোঝাচ্ছি। হাসবেন না, অবস্থা এখন উড়িয়ে দেবার মতো সংখ্যায় নেই।
পিংক মুভিটা দেখেছেন? শেষদিকের ট্রায়ালের ডায়লগগুলো একটু মন দিয়ে শুনবেন……….একজন মহিলা একজন পুরুষের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, তার মানে এই নয় যে তিনি এভেইলেবল। আমার কাছে রেপের একটাই সংজ্ঞা-এমনকি বিবাহিত স্ত্রীও যদি বলেন ‘না’ তার মানে হল ‘না’।
আমি জানি এই বাক্যটা পড়ার পরে আমার পুরুষ পাঠকরা আমাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করবেন। স্ত্রীকে রেপ? জ্বি, স্ত্রীও যদি বলেন ‘না’ তারপরও যদি আপনি এগোন, তবে ওটা রেপ। বাদবাকি আর বোধহয় বলা লাগে না।
তবু বলছি-বনানীতে ধর্ষিত দু’জন তরুনীকে (ব্যতিক্রমীভাবে) অনেক পুরুষ (ও অনেক মহিলাও) বলেছেন, ‘রাত বিরাতে হোটেলে বয়ফ্রেন্ড নিয়ে গেলে তো তাদের…………….ই…………..উচিৎ।” না, কখনোই না। আপনার গার্লফ্রেন্ড (বা বয়ফ্রেন্ড) যদি গতকাল আপনার সাথে বিছানায় গিয়ে থাকেন হৃদয়ের আবেগে-সেটা রোমান্স। আজ রাতে যদি তিনি শেষ মুহূর্তেও বলেন ‘না’ তবে সেটা ‘না’। এরপরও যদি আপনি জবরদস্তি করেন তো ওটা রেপ।
বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে নাইট আউট বা রুমডেটের ভাল বা মন্দ-কোনোটা নিয়েই আমি কথা বলছি না। আমি কোনো বৈধ বিচারক নই নৈতিকতার মানদন্ড নির্ধারনের। আমি শুধু বলতে চাই, বয়ফ্রেন্ডের সাথে হোটেলে যাওয়াটা একজন নারীর ধর্ষিত হবার যৌক্তিক দাবি তৈরী করে না।
আমার খুব দমবন্ধ লাগে যখন দেখি এইরকম বাস্তবতার মুখেও আমাদের চারপাশের মানুষদের (নারী ও পুরুষ উভয়) মধ্যে অনেকেই মনে করেন, ধর্ষিত হবার পেছনে ধর্ষকের চেয়ে ধর্ষিতের দায় বেশি। কেন কেউ রেপড হন-আমার কাছে এই প্রশ্নটি একটি অন্যায় প্রশ্ন মনে হয়। আমি কেন ধর্ষিত হলাম-সেই উত্তরও যদি আমাকে দিতে হয় তাহলে সেই সমাজের মুখে থুথু মারা উচিত। আমি তাই প্রশ্নটি করব-ধর্ষক জানোয়াররা কেন ধর্ষণ করে? আমার কাছে এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই।
আমি শুধু প্রশ্নটার উত্তরে সামাজিক মনমানসে ঘুরে বেড়ানো উত্তরগুলোই বলছি:
১.
উপরে বলেছি, পুরুষদের একটা বিরাট অংশ মনে করেন, ধর্ষণ করার অধিকার তাদের আছে। আচ্ছা, তাহলে এই অধিকার কে আমাকে দিল? আর যদি কেউ দেয়ই, তাহলে আমার খানদানের মেয়েদের ধর্ষণের অধিকারওতো সমাজের অন্য পুরুষদের আছে। তো আমরা তাহলে ধর্ষণ ও পাল্টা ধর্ষণের মতো পাকিস্তানী সমাজে পরিণত হই?
২.
মেয়েদের উত্তেজক সাঁজ/পোষাক তাদের প্ররোচিত করে। আচ্ছা, তো তনু কেন ধর্ষিত হল?
৩.
রাতবিরাতে বাইরে চলাচল, হোটেলে পার্টি করে বেড়ালে তো ধর্ষকরা সুযোগ নেবেই।
আচ্ছা, আপনি কি তাহলে কখনো পাল্টা প্রশ্ন করেছেন, হোটেলগুলোতে রাতবিরাতে পার্টি কেন হয়? আর আপনি রাতের পার্টিতে আপনার পার্টনারকে কখনো নিয়ে যান না? ধর্ষকদের ভয়ে তাহলে মেয়েদের সূর্যাস্ত আইন মানতে হবে।
আচ্ছা, মনে করুন, হঠাৎ করে একটি পরিবারের পুরুষ সদস্যটি বিছানায় পড়ে গেলেন। তো তার নারী সদস্যটি তখন কী করবেন? এমন কাজ খুঁজবেন যেটাতে সূর্যাস্ত হবার আগে ঘরে ফেরার গ্যারান্টি আছে?
৪.
পুরুষ ছাড়া নারী রাতে একা কোথাও কেন যাবে? গেলে তার পরিণতিতো ভুগতেই হবে। তো আপনি কি মনে করেন, বাংলাদেশের সব নারীরই বাইরে যাবার মতো একজন পুরুষ সঙ্গী সবসময়ই আছে? আর বুকে হাত দিয়ে বলতে পারেন, কোনো নারী রাতে তার কোনো পুরুষ প্রতিবেশিকে নিয়ে ইমার্জেন্সীতে বাইরে গেলে ওই পুরুষ প্রতিবেশির হাতেও তিনি নিরাপদ? বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, আপনার মেয়েকে দূর শহরে হোস্টেলে যাবার জন্য রাতের গাড়িতে তুলে দিতে আপনি একদম নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন? যেমনটা পারেননি হ্যাপির মা।
৫.
টিভি/মিডিয়া/ইন্টারনেট আমাদের ধর্ষকদের চারিত্রিক অধঃপতন ঘটিয়ে, সমাজের চিরকালের সংস্কারে ভাঙন ধরিয়ে ধর্ষণকামী সমাজ বানাচ্ছে। আচ্ছা, তো আপনি বলুন, ওগুলোকে বন্ধ করে কি দেশ চালাতে পারবেন? আর ওগুলোর সবই তো সুইডেনে, সুইজারল্যান্ডে, সৌদি আরবেও আছে। ওখানে বছরে কয়টা রেপ হয়?
মিডিয়া আর ইন্টারনেট আমাদের মধ্যে রেপের বীজ বোনেনি। ওর বীজ আমাদের রক্তে আগে থেকেই ছিল। সস্তা ইন্টারনেট শুধু সেই সুপ্ত বীজকে জাগিয়েছে।
৬.
ধর্মীয় অনুশাসন না থাকায় রেপের মাত্রা বাড়ছে। আচ্ছা, তো রেপ রোধ করতে হলে দেশকে ভ্যাটিকান হতে হবে? কি মনে হয়? সেটা সম্ভব? আর সিরিয়াসলি বলুন তো, ধর্মীয় অনুশাসন কিভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব? অটোম্যান সম্রাজ্যের পতনের পর বিগত হাজার বছরে ওইরকম কোনো সম্ভবনা তৈরী হয়েছে কোথাও? দয়া করে আফগানিস্তানের উদাহরন দেবেন না।
আর কখনো কি ভেবেছেন, আমাদের সমাজ হতে ধর্মবিশ্বাস দিনে দিনে কেন আলগা হয়ে যাচ্ছে? শুধু জুমার দিনে রাস্তা উপচে পড়া কিংবা পুজায় চোখ ধাঁধানো আয়োজন মানেই ধর্মের প্রতি ভক্তি বাড়ছে-এমনটা নিশ্চই ভাবেন না?
৭.
কঠোর সাজা না হওয়ায় ধর্ষণ বাড়ছে। আচ্ছা, তো ধর্ষকরা সব অপেক্ষায় আছে কঠিন একটা আইন ও বিচারব্যবস্থা তৈরির। ওটা হলে তারপর তারা থামবে? বগুড়াতে মেয়েকে ধর্ষণ করে যখন মা ও মেয়েকে ন্যাড়া করে অত্যাচার করা হয় তখন দেখেছেন, ধর্ষকের বউ, বোন, পরিবার তাকে কেমন দারুন সমর্থন দিয়েছে? গোটা সমাজ যখন পঁচে যায়, তখন আইন কী করতে পারবে?
৮.
পুরুষ মানুষতো একটু আধটু অমন করবেই…………………………আমার মতে আমাদের আপামর জনগোষ্ঠি (নারী-পুরুষ উভয়ের) মধ্যে এই কু-বিশ্বাসটিই হচ্ছে ধর্ষণের মূল ও একমাত্র কারন। আজ যে মা তার কন্যাটি ধর্ষিত হলে খোদার নামে বিচার দেন, সেই মা বা তার মতো অসংখ্য মা আবার তার পূত্র সন্তানটি ধর্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে ‘পুরুষ মানুষ তো’-বলে ধর্ষিতার নামে বিষোদগার আর সন্তানের জেলমুক্তির যাবতীয় চেষ্টাচরিত্র করেন।
আমরা যদি আরেকটা কাজ করতে পারতাম তবে হয়তো ধর্ষণের মাত্রা কমতো না কিন্তু ধর্ষণের শিকার মানুষটি তার জীবনভর বয়ে চলা নারকীয় যন্ত্রণা হতে কিছুটা হলেও মুক্তি পেতেন। সেটা হল, ধর্ষিত হওয়াটাকে কলঙ্কিত না ভেবে ধর্ষণ ও ধর্ষককে কলঙ্কিত ভাবার সামাজিক মানস তৈরী করা।
আমাদের সমাজে একটি ধর্ষণকান্ড ঘটলে উপরে উপরে ধর্ষিতার জন্য সহানুভুতি আর ধর্ষকের ব্যাপারে ঘৃণা দেখানো হলেও আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, ওসবের পাশেই ধর্ষিতার প্রতি একটি সুপ্ত ক্রোধ ও ঘৃণা আর ধর্ষকের জন্য মৃদু প্রশ্রয়ের একটা চোরা স্রোত প্রবহমান থাকেই।
কিন্তু আমরা একটি গোটা সমাজ-
-যদি ধর্ষিত বা ধর্ষিতাকে সম্মিলিতভাবে, আবেগ ও অনুরাগের সাথে, সহমর্মিতা ও একাত্মবোধের সাথে আপন করে নিতে পারতাম,
-যদি ‘একদা ধর্ষিত’ পাত্রীর সাথে নিজের সন্তানের বিয়ে দেবার ব্যাপারে কুসংস্কারমুক্ত হতে পারতাম,
-যদি ধর্ষককে আজীবনের জন্য সামাজিকভাবে বয়কট করতে পারতাম,
-যদি দেশের সমস্ত মেয়েরা কোনো ধর্ষককে বিয়ে করতে অস্বীকার করতে পারত,
-যদি প্রতিটি ধর্ষণকান্ডের ১ মাসের মধ্যে তার বিচার শেষ করতে পারতাম,
-যদি রেপ হওয়া মানেই জীবন শেষ হয়ে গেল বা রেপ হলাম মানেই আমি কলঙ্কিত হয়ে গেলাম-এই হাস্যকর মানসিক দৈন্য হতে বের হবার মতো যথেষ্ট সাহসী ও বেপরোয়া আমাদের ভিকটিমরা হতে পারত,
-যদি ‘ভার্জিনিটি’ নামক হাস্যকর ও অবমাননাকর একটি কনসেপ্ট আমাদের বিয়ে নামক সামাজিক প্রথার সাথে জড়িয়ে না থাকত,
-যদি ‘একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ব্যতিত সন্তান কেউ দিতে পারেন না’-এই সত্যটা মেনে নেবার মাধ্যমে সন্তানের আশায় ভন্ড দরবেশদের ছোবল নারী ও তাদের পুরুষরা স্বেচ্ছায় না নিত,
-যদি বিয়ে পূর্ব প্রেমিক-প্রেমিকার শারিরীক সম্পর্ক করার প্রেমময় দুঃসাহসটি হঠাৎ পুরুষটির বিয়ে করতে না চাওয়ার পরও সেই আগের মতোই বহাল থাকত,
-যদি আমাদের বিবাহিত নর ও নারী বিয়ের মাধ্যমে একটি রক্ত মাংসের বেড-পার্টনার পাবার আশায় বিয়ে না করত,
-যদি আমাদের মিডিয়াগুলো ও তাদের নির্মাণগুলো ধর্ষণ ইস্যুটাকে পুরুষের জন্য বীরত্বপূর্ণভাবে উপস্থাপন না করে ওই নারকীয় অপরাধটিকে কুৎসিততম কাজ হিসেবে উপস্থাপন করতে শিখত,
-যদি একদল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেধাবী ছাত্র তাদের আরেকজন সহপাঠীর ধর্ষণের সেঞ্চুরী উদযাপনে শামিল হবার মতো কুৎসিত মানসিকতা ধারন না করত,
-যদি কেউ ধর্ষিত হয়েছেন এমন সংবাদ আমাদের ফিসফিস করে কানাকানি করে আলাপ করবার মতো ট্যাবুতে আটতে না থাকতে হত,
-যদি ধর্ষণকে অন্যান্য চুরি ছ্যাচরামীর মতো শুধুমাত্র একটি ফৌজদারী অপরাধ হিসেবেই বিবেচনা করা হত,
-যদি আমাদের তাবৎ সমাজ কেউ ধর্ষিত হলে তাকে ‘ওতো নষ্ট হইয়া গেছে’ এই অন্যায় অভিধায় ততোধিক বিদ্ধ না করত,
-যদি ধর্ষিত হবার পর ভিকটিমকেই তার ওপর ঘটা নারকীয় অপমানের প্রমাণ নিজেকে আরেকবার বা বহুবার অশ্লীল ও অপমানজনক মধ্যযুগীয় পন্থায় না দিতে হত,
-যদি ভিকটিমের সাথে সাথে আসামীরও একই বা ততোধিক অপমানজনক পন্থায় ডাক্তারী পরীক্ষা করা হত,
-যদি সিনেমাগুলোতে ধর্ষিত হবার পর ‘পোড়ামুখি তোর মরণ হয় না কেন’-এমন আমানবিক ও অন্যায্য ডায়লগ ধর্ষিতার মায়ের মুখে পরিচালক না তুলে দিতেন,
-যদি ধর্ষিত মানে অবশ্যম্ভাবিভাবে শুধু একজন নারীকে না বোঝানো হত কিংবা নারীর ধর্ষিত হবার মতো পুরুষ/ছেলেশিশুর ধর্ষিত হওয়াটাকেও সমহারে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হত,
-যদি এদেশের অধিকাংশ পরিবারে ছোট ছোট বাচ্চারা তাদের বাবা (বেশিরভাগক্ষেত্রে) কিংবা মা’কে (কিছু কিছু ক্ষেত্রে) তাদের পার্টনারের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত কর্তৃত্বপূর্ণতায় খবরদারি করার সংস্কৃতির মধ্যে বড় না হত,
-যদি সামাজিক ট্যাবু হতে বেরিয়ে এসে ধর্ষণের জঘন্যতা ও তার প্রতিকার নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার সামাজিক মনন আমাদের হত,
-যদি যৌতুক কিংবা পণ-দু’টোর মতো অসভ্য কুপ্রথার বলি হয়ে আমাদের তরুণ বা তরুণীদের বিয়ের বয়স আইবুড়োতে ঠেকবার মহামারিতে না পৌঁছাতো,
-যদি আমাদের উঠতি প্রজন্ম প্রিম্যাচিওরড বয়সেই অতি আধুনিক হবার দুরাশায় পশ্চিমা হবার ভ্রান্তিতে না পড়ত,
-যদি আমাদের পরিবার প্রথায় মায়েরা তাদের কমবয়সি সন্তানদের ব্যাপারে কিংবা স্বামী-স্ত্রীরা তাদের পার্টনারকে তাদের অন্যান্য আত্মীয়বান্ধব হতে অবাধে বিশ্বাসের বদলে আরেকটু আগলে রাখতেন,
-যদি ’ধর্ষিতা’ এই শব্দটি বাংলা অভিধান ও যাবতীয় প্রকাশনার পাতা হতে বিলুপ্ত হয়ে শুধু “ধর্ষক’ শব্দটিই বেঁচে থাকত,
-যদি আমরা আমাদের কন্যাদিগকে শোকেসে সাজানো পুতুলের মতো জড়ভরত না করে রেখে আরেকটু মারদাঙ্গা করে বড় করার মতো সাহস সঞ্চার করতে পারতাম,
-যদি একজন ধর্ষকের যেকোনো নোংরা প্রাথমিক এপ্রোচের মুখেই ভিকটিমকে লুকিয়ে না রেখে খোলাখুলি তখনি ধর্ষককে সামাজিক ধোলাই দেবার ব্যবস্থা হত,
-যদি আমাদের সার্বিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পরতে পরতে ধর্ষণকে প্রকারান্তরে নানাভাবে ধর্ষিত/ধর্ষিতার ব্যক্তিগত দায় হিসেবে চাপিয়ে না দেবার মতো ব্যবস্থা না থাকত,
-যদি………………………..আমাদের দেশমাতার প্রসবযন্ত্রণায় যে ২-৪ লক্ষ নারী নিজেদের সম্ভ্রমের আত্মদান করতে বাধ্য হয়েছেন-তাদের সম্ভ্রমহানিকারীদের বিচার হত আর এই অকৃতজ্ঞ দেশ যুদ্ধের পরে সেই বীরাঙ্গনা মায়েদের/বোনেদের সমস্ত মহিমা ভুলে তাদের ছেঁড়া কাগজের মতো ছুড়ে ফেলবার মতো অকৃতজ্ঞ না হত,
-যদি এদেশের সমস্ত বীরাঙ্গনার সম্মিলিত স্মৃতিতে একটি কালো সৌধ এই নিমকহারাম দেশ অন্তত নির্মাণ করত!!!
তবে, তবেই আমার মতো দুর্বল চিত্তের মানুষগুলোকে আর কখনোই টিভি বা পত্রিকার সামনে বসে একজন ধর্ষিত/ধর্ষিতার ধর্ষণ পরবর্তি হাজারবার সম্ভ্রমহানি দেখতে হত না, একজন মা বা বোনের হৃদয়বিদারক অপমান পর্দায় দেখে অবোধ যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যেতে হত না, নিজেকে একজন মানুষ হিসেবে ভাবতে কখনোই আর কুঞ্চিত হতে হত না।
যদি তা হত, তবে আর কখনোই একজন পূর্ণিমার মাকে উচ্চারন করতে হত না শতাব্দীর সেই কলঙ্কজনক বাক্যসমষ্টি,
”বাবারা, আমার মেয়েটা ছোট…………………………………….”। ছিঃ ছিঃ ছিঃ
#Tonu #Rape #rapist