(আমি জানি ফেসবুক হল শুধু ছবির জগত। তবু অনুরোধ করব প্লিজ এই লেখাটা অন্তত একটু শেষতক পড়ুন) আমার বউ বাসার জাহান্নামি গরমে অতিষ্ট হয়ে বাসা খোজার তাগিদ দিচ্ছে অনেক দিন। আমি আমার সর্বশক্তি নিয়োগ করে কাজটা নিষ্ঠার সাথে করে যাচ্ছি অনেকদিন ধরে। কিন্তু ঢাকা শহরে একটা বাসা মনমতো পাওয়া যে কি সেটা আমি আমার বিগত ৬ বছরের বাসা খোজা ও বদলানোর অভিজ্ঞতায় জানি।
আমি কোনোরকম রাখঢাক না করে বলতে পারি বাসা খোজা ও বদলানোতে আমি একজন বিশ্বমানের বিশেষজ্ঞ। কারন ২০০৬-২০১৫ বছরে বাসা বদল করছি ৭ টা। তার মধ্যে ব্যাচেলর ও বিবাহিত দুরকমই আছে। অনেকে বলেন ব্যাচেলরদের বাসা খোজা বা পাওয়া মহা কষ্টকর ও অপমানজনক। তাদের কষ্ট একটু কমাতে এই লেখাটা ফেঁদে বসলাম।
একটুও বাড়িয়ে বলছি না। আমি এই ৭টা বাসা নেয়া ও তার সংলগ্ন কর্মকান্ডে ঢাকার সেগুন বাগিচা, গোপিবাগ, মিরপুর, মনিপুর, সনি হল, পল্লবি ইত্যাদি স্থানে প্রায় আনুমানিক ১০০০ বাসায় ঢু মেরেছি। অনেকে ভাবতে পারেন আমি নিজেই একটা বদলোক তা নাহলে এতগুলা বাসা বদল বা খোজা লাগে কি?
নারে ভাই, দেখেন কী কী শর্ত দেয়ার কারনে বাসাগুলো নিতে পারিনি?
পানি থাকে ২৪ ঘন্টা?
গ্যাস আসে যায় শীতকালে
ছাদের বাসা, গ্রীষ্মে জাহান্নাম
পচাগলির বাসা, দুপুর ১২টার আগে সূর্য দেখা যায় না
বাড়িওয়ালা মাতাল
বাড়িওয়ালী মুসল্লি
বাড়িওয়ালা লম্পট
বাড়িওয়ালা নোয়াখালি তাই বরিশালের লোককে ঘর ভাড়া দেন না। (স্যরি, আমি বর্ণবাদী না)
ভাড়া আকাশচুম্বি
ভাড়া কম কিন্তু সার্ভিস চার্জ তার অর্ধেক
বাসা বর্ষাকালে ড্যাম শীতে ফকফকা
রাত ১০টা বাজলে গেট বন্ধ
বাসার ডুপ্লিকেট চাবি মালিকের কাছে থাকবে
বাসায় মেহমান আসলে ১ দিনের বেশী থাকা চলবে না
জোরে জোরে গান বাজানো যাবে না
প্রতি বছর ভাড়া বাড়ানো হবে
বাচ্চা কাদতে পারবে না
যেরকম বাসা নিচ্ছেন সেরকম বুঝিয়ে দিতে হবে
৬ মাসের ভাড়া অ্যাডভান্স
দারোয়ান নাই, ৬ষ্ঠ তলা থেকে নেমে গেষ্ট রিসিভ করতে হবে
ময়লা নেবার ব্যবস্থা নেই। নিজেকে ডাস্টবীনে গিয়ে ময়লা ফেলতে হবে
ঈদে বাড়িতে গেলে নিজ দায়ীত্বে বাসার নিরাপত্তা
বাসায় ভূত আছে
ছাদে যাওয়া যাবে না
বাড়িওলাকে দেখলে সালাম দিতে হবে
বাসায় কোনো বড় ফার্নিচার বা ফ্রিজ আনতে হলে ১দিন আগে জানাতে হবে ।
এবার আমি আমার বাড়ি খোজার অভিজ্ঞতা হতে ১০জন চরম খাইশটা (খাচ্চর+ইতর+শয়তান+টাউট) বাড়িওয়ালার অভিজ্ঞতা শেয়ার করব।
খচ্চর ১: চকিদার:
সেগুন বাগিচা:ব্যাচেলর মেস। খচ্চর এক কেয়ারটেকার দেখভাল করে। বাসাভাড়া পেতে হলে শর্ত হল প্রতি ১৫ দিনে তিনি একবার করে রুমে উকি মারবেন ইনভেস্টিগেশানে।
খচ্চর ২: গোপিবাগ: সাবলেট:
জনৈক খচ্চরানী। একা থাকার মুরোদ নেই তাই সাবলেট। বাসার দুই তৃতীয়াংশ আমি নিছি। কিন্তু কর্তৃৃত্ব তার। অষ্ট্রপ্রহর রান্নাঘর দখল করে রাখে। কাজ না থাকলে চুলায় পানি গরম দিয়ে রাখা। তাইলে সাবলেট দেয়া কেন?
খচ্চর ৩: ভাংখোড়: নবীনগর:
গাজাখোর বাড়িওয়ালা। মিস্টি কথা বলে বাসাভাড়া দিল। বারান্দায় গ্রীল নেই। দ্বিতীয় রাতে রাত ১০ টার সময় দরজায় টক টক। কী চাই? না, তিনি ছাদে যাবেন, চাবী পাচ্ছেন না। তাই তরতর করে আমার বাসার বারান্দা দিয়ে পাশের পাইপ বেয়ে অনায়ানে ছাদে গমন এবং জানান দিলেন মাঝে মধ্যেই যেতে হবে। ব্যাস, গৃহ বদল।
খচ্চর ৪:কটকটি:
মিরপুর:বাড়িওলা নাই আছে বাড়িউলী। সব ঠিকঠাক। এখন এ্যাডভান্স করব। হঠাৎ গজব নাজিল। বাড়িউলি বলে দিলেন বাসা ছাড়ার সময় ১০০০ টাকা রিপেয়ারিং ও ডিস্টেম্পারিং চার্জ রাখবেন। ব্যাস, খচ্চরের বাড়ি ত্যাগ।
খচ্চর ৫: কন্যাদায়গ্রস্থ বাড়িওলা:
সকাল ৮টা। চৈত্র মাসের গরমে বাসা খুজছি। টুলেট দেখে ঢু। বাসা দেখানোর নাম নাই। প্রশ্নবান শুরু হল-” নাম কি? বাড়ি কই? কি কর? গার্মেন্টস কেন? সরকারী না কেন? আমার এখানে সবাই সরকারী। কতজন থাকবা? বাচ্চা আছে? মাসে কতজন মেহমান আসবে? সবশেষ প্রশ্ন আপনার ভাই যিনি আপনার সাথে থাকবেন তার বয়স কত? বিয়ে করে নাই? কবে করবে? আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন আপনার মেয়ে আছে? ওমনি ব্যাটা চিৎকার চেচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুলল। তার আবার হাইপ্রেশার। তার বাসার লোকজন দৌড়ে এসে তাকে নিয়ে পড়ল। আমি ফুট।
খচ্চর ৬: গার্মেন্টস?
ছ্যা ছ্যা সবকিছু ঠিকঠাক। ভাড়া সাব্যস্ত হল। রাতে অ্যাডভান্স করতে গেছি। ব্যাটা বলে কোথায় চাকরী করেন? বললাম গার্মেন্টসে। ব্যাস। স্যরি, গার্মেন্টসের লোককে বাসা ভাড়া দেব না। আপনার আগেই বলা উচিৎ ছিল। মনে মনে একটা কুৎসিত গালি দিয়ে গৃহ ত্যাগ।
খচ্চর ৭: বাচ্চা আছে?
টুলেটের সাথে কনটাক্ট নাম্বার। ফোন করলাম। মিনিট দুয়েক আমার গুষ্টির ঠিকুজি নেয়ার পর প্রশ্ন, বাচ্চা কয়টা? উদাসভাবে বললাম, “পৃথিবীর সব শিশু আমার সন্তান”…………..। ব্যাস, রাস্তা দেখিয়ে দিল। বাচ্চা ছাড়া ঘর ভাড়া দেবে না। আগে জানতাম বউ ছাড়া দেয় না, এবারই দেখলাম সাথে বাচ্চাও লাগবে। আরে শালা, ঘর না দিলে বাচ্চা আসবে কোত্থেকে?
খচ্চর ৮: নামাজ পড়েন?
মিরপুর এক নম্বরে বাসা খুঁজতে গেছি। এক বাসায় টু লেট ঝুলছে। কাছে গিয়ে দেখি লেখা, “ভাড়া প্রার্থিকে ফ্যামিলিম্যান ও নামাজে হতে হবে।” দেয়া ফোন নম্বরে বাড়িওলা ব্যটাকে ফোন দিলাম। “আচ্ছা ভাই আমি যে নামাজ পড়ি সেটা আপনি নিশ্চিত হবেন কিভাবে? আপনি কি এলাকার মসজিদের ইমাম? ব্যটাতো রেগেমেগে আগুন। পাশের বাড়ি খোজ নিলাম তাকে নিয়ে। যেটা জানলাম তা হল তিনি এককালে কান্দুপট্টির দালাল ছিলেন। হালে সব ঝেড়ে ঝুড়ে পথে আসছেন।
খচ্চর ৯: ভিসা মুক্ত আন্দোলন:
একবাসায় গেছি। বাড়িওলা খচ্চর আমাকে তার জীর্নশীর্ন বাড়ির নিচতলার ঘর দেখাতে নিলেন। ঘরে ৪টা রুম। তার দুটাতে কোচিং খুলে আন্ডাবাচ্চা পড়াচ্ছেন এক পন্ডিত। এপাশে দুটা রুম। সেদুটো ভাড়া হবে। মাঝে শুধু একটা পলকা দুই পার্টের দরজা যেটা একটা একবছরের বাচ্চার লাথিতে খুলে যাবে। চাচা এই ঘর ওই ঘর তো ভিসা মুক্ত আন্দোলনের মতো খুল্লাম খুল্লা। রাত বিরাতে তো হেরা আমাগো এহানে রেইড দিবে। তখন? চাইয়া দেখি হেতে আমারে খাইয়া ফালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
খচ্চর ১০: প্যান্ট ক্যান?
এক বুড়ি আন্টির বাসা দেখতে গেছি। তো তিনি একটা ম্যাক্সি পড়ে ইজি চেয়ারে বসে আছেন। বাসা না দেখাইয়া আমি ও আমার বউকে তার সামনে পেশ করা হল। তিনি চেয়ারে গা এলিয়ে আমাকে একনজর দেখলেন। তারপর আমার বউরে নিয়া পড়লেন। এই মেয়ে তুমি প্যান্ট পড়ছ ক্যানো? মুসলমান না? মাথা খালি ক্যানো? পর্দা কর না? জানো এসব পাপ?” আমার বউ চাইয়া দেখি ফাইটা পড়ার অপেক্ষায়। খালি বলল “আন্টি নিজের চড়কায় তেল দেন”। আর যায কোথায়. কি বললা, ………………………….. ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি বউরে নিয়া একলাফে গেটের বাইর।
আমি মোটামুটি ২০টা খচ্চর কাহিনী লিখতে চাইছিলাম। সময় ও এনার্জি পাচ্ছি না। আর নিজেরো একরকম হিনমন্যতা বোধ হয় এইসব খবিশ ও ইতরকে নিয়ে লিখতে। তাই ক্ষেমা দিলাম। আমি মনে করি না সবমানুষ একরকম। লেখাটা শুধূ উল্লেখকৃত ২০টি খচ্চেরের জন্য লেখা। অন্যকেউ এর টার্গেট না। শুরুতে শেষতক পড়ার এত অনুরোধ করছিলাম এই জন্য যে, আমার পরিচীত মহলে অনেকেই পয়সাওয়ালা বা হবু উদীয়মান পয়সাওয়ালা আছেন যারা অচিরেই বাড়িওয়ালা হবার দৌড়ে আছেন। অন্তত তারা যেন এই খচ্চরদের দলে নাম না লেখান তাই এত কথা।
#houseowner #rentalhouse #varatia #landlord #tenant