১.
অফিসের গাড়ির অপেক্ষায় বসে আছি। ধনীর আদরিনী স্ত্রীগণ যথারীতি কার ড্রাইভিং শিখছেন পথচারিদের বিপদঘন্টা বাজিয়ে বাজিয়ে। ব্যগ হাতে কোট টাই পড়া কপোর্রেট দাসগণ অন্যের টাকা ফুিলয়ে ফাপিেয় তোলার মহান কম্মে নিত্য দিনের মতো উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে চলেছেন। এখনও প্যান্টে হিস্যু করে এমন বাচ্চারা ঘুমের চোখ ডলতে ডলতে মা কিংবা বাবার হাত ধরে জ্ঞান অর্জনের কিংবা বাবার মতোই ভবিষ্যত সম্ভাব্য কর্পোরেট দাস হবার আন্দোলনে শরিক হয়ে স্কুল নামক জেলখানায় যাচ্ছে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে মুগ্ধ হচ্ছি।
২.
আমার ছোটবেলায় বিটিভিতে অয়োময় নামে হুমায়ুন আহমেদের একটা নাটক হত। মির্জা (আসাদুজ্জামান নূর) নামে প্রবল প্রতাপশালী জমিদার নায়ক। তার স্ত্রী ছিলেন এলাচি (সারা জাকের)। মির্জা ছোট বেগম এলাচিকে খুব ভালবাসতেন। তো এলাচি একবার মির্জাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি আমাকে একটা সত্যি কথা বলবেন?” মির্জার অভয় পেয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “সত্যি করে বলুনতো, আপনার যিনি পাখা টানেন ফরিদ, ও কি আপনার আপন ভাই?” মির্জা অনেকক্ষণ গুম হয়ে থাকলেন। তারপর বললেন, “আমার বাপের আমলে মির্জাদের অনেক স্ত্রী থাকত। পাশাপাশি তাদের বান্দি থাকত যাদের তারা স্ত্রীর মতো ব্যবহার করতেন। কিন্তু তারা বেগমের মর্যাদা পেতেন না। বান্দি পরিচয়ে থাকতেন। বেগমদের ঔরসে সন্তান হলে তাদের বলা হত হেরেম তরফের সন্তান। তারাই পরে যুবরাজ, মন্ত্রী ইত্যাদি হতেন। আর বান্দিদের গর্ভে সন্তান হলে তাদের বলা হত বান্দি তরফের সন্তান। তারা হত নিচু জাত। জমিদারের সন্তান হলেও তাদের মর্যাদা হত বান্দির সন্তানের মতো। তারা কখনো উচু কাজ পেতনা। ফরিদ আমার ভাই তবে বান্দি তরফের ভাই।” গাঁও গেরাম হতে শহরে এসে কোনোমতে হাচড়ে পাচড়ে আমরা কিছু বঙ্গ সন্তান ঢাকার বুকে একটু মাথাগুজে ঢাকাইয়া হয়েছি ঠিকই তবে আমাদের অবস্থা আজও সেই বান্দি তরফের সন্তানের মতোই। আমরা মির্জা সন্তান তবে বান্দি তরফের। দুবেলা দু’মুঠো ভাত আর মোটা কাপড়ের জামা, সাথে একজোড়া লুঙ্গি জোগাড়ের জন্য প্রতিদিন যা করি তাতে মাঝে মধ্যে খুব জীর্ন লাগে।
৩.
ছোডকালে ছিনেমায় দেখতাম আলমগীর বা জসিম ফকিরের পোলা। ধনী মানুষের মাইয়া শাবানা বা রোজিনারে বিয়া করায় তাকে শশুর বা শাশুরী ব্যপক অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। নায়ক শপথ করে বড়লোক হয়ে তাকে দেখিয়ে দেবে। ব্যাস। অতঃপর, নায়ক ও নায়িকা হাতে একটা সামান্য ব্যাগ নিয়ে হাটা শুরু করে। আস্তে আস্তে ক্যামেরা রোল হয়, সময় আগায় আর আলমগীরের জুতা প্যান্ট ব্যাগ দামী হতে থাকে, প্রথমে বাস, তারপর রিক্সা, তারপর স্কুটার, তারপর দামী গাড়ি হতে নায়ক নামেন। হাতে দামী ব্রিফকেস। দুই তিন মিনিটে ফকিরের পোলা হতে নায়ক বিশাল ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। কাইলকা রাইতে শপথ করছি নায়ক জসিম বা আলমগীরের মতো কোনো একটা ছু মন্তর করতে হবে। এইরকম শর্টকাটে গাড়ি আর বাড়ি না হলে আর চলছে না। নিজের গাড়ি না থাকায় কাইল রাইতে ফার্মগেট হতে মাকে ডাক্তার দেখাইয়া রিক্সায় মিরপুর আসছি। রিক্সাওয়ালাকে খালি পায়ে ধরতে বাকি রাখছি রাজি করতে। সিএনজি ওয়ালারাতো আমাদের ঈশ্বর। তারাতো আমার ইচ্ছায় যাবেন না। যেমতে হউক গাড়ি আর বাড়ি আমার লাগবই। বাড়িওয়ালা তার নখদন্ত বের করেছেন এই দু’বছর পর। তাই বাড়িও জরুরী হয়ে পড়ছে। কেউ আমারে নায়ক আলমগীর বা জসিমের ঠিকানাটা দিবেন? একটু তাদের পায়ের ধুলা নিয়া আমার এই গাড়ি/বাড়ির নতুন ধান্দাটা শুরু করতে চাই।
৪.
ধানমন্ডি গেছি বিকালে। না না, ঘুরতে না, একজন অতি আপনজনের বায়োপসি রিপোর্ট নিতে। মনের মধ্যে খারাপ কিছুর দুশ্চিন্তা। অনেক অনেকদিন পর এদিকে এলাম। অনেক বদলেছে ধানমন্ডির আকাশ। মন খারাপের সাথে আরো খারাপ যোগ হল। কেন একদল মানুষের এত টাকা? প্রাসাদের মতো সব বাড়িঘর। নিচ হতে উপর দেখা যায় না। প্রাসাদের ছাদ খুজতে উপরে তাকাতে গিয়ে মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। ঝা চকচকে গন্ডা গন্ডা গাড়ি গ্যারাজে। আমি কোনোদিন হিংসুক ছিলাম বলে মনে পড়ে না। বাট, দেবি আফ্রোদিতিকে দেখলে গান্ধিজিরও মতিভ্রম হতে পারত না? তেমনি আমারও একটা নিষ্ফল ক্রোধ চিরচির করে মাথার মধ্যে। কেন একদল লোকের এত টাকা থাকবে আর আরেকদল তাদের প্রাসাদের সামনে দিয়ে যেতে যেতে নিষ্ফল ইর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরবে? কেন তাদের পকেটে থাকবে মলিন কিছু দু’টাকার নোট যার একটা আবার কচটেপে জোড়া বলে বাসওলা নিতে চাচ্কেছে না। তাদের প্রাসাদ আমাদের কুটিরের সাথে একই শহরে হল? কিংবা ঈশ্বর তো আমার কুড়েটাকে তাদের থেকে অনেক দুরে রাখতে পারত। কোথা হতে আসে এত টাকা?
#status #classstatus #classconflict #classdiscrimination #realvsfabricated #socialstatus #socialclass #cultclassic #hero #cinema #magical #rich #wealth #envy