এই পোস্টটি অনেকের জন্যই এলার্জির কারন হতে পারে। তাই আগেই চোৎরা পাতার রস হাতের কাছে নিয়ে তারপর বসে বসে পড়ুন। বা, বসে পড়ুন। চোৎরা পাতার সাথে কিছু নাম-সংকীর্তন জপলে বেশি কাজে দেবে-কলসিন্দুর, এশিয়া কাপ, কার্ডিফ, আইসিসি কাপ৯৭, ডানা-গোথিয়া কাপ।
এই ছবিটি গতকাল ভাইরাল হয়েছে। ছবিটি নয়, আসলে ছবির প্রেক্ষাপটটি। কী হয়েছে? না, তেমন কিছু না, বাংলাদেশের ’মাইয়া মাইনষের’ ফুটবল টিম সাফ নারী ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এটা তারই ছবি। ভাল মানুষেরা সবকিছুতে পজিটিভিটি খোঁজে। আমার মতো বদ ও নেগেটিভ মানুষেরা সবকিছুতে নেগেটিভিটি খোঁজে। এখানেও খুঁজেছি।
গতকালকে ‘মাইয়া’গুলোকে প্রশংসা ও সাধুবাদে ভাসিয়ে দেয়া ফেসবুকীয় ক্ষণপতনা জনতার কতজন অতীতে একই প্রশংসার বন্যায় ভাসানো মুশি, ম্যাশ, সাকি, রিয়াদ বা বুমবুম তামিমকে নিয়ে ট্রল করেছেন-সেটা ক্রসম্যাচ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সাফ নারীতে ‘মাইয়া’রা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ছবিটা দেখে আমার কলসিন্দুরের সেই মেয়েদের কথা মনে পড়ে গেল। সেই মেয়েরা বিরাট কীর্তি স্থাপনের পরেও এমনি করে জাতি উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। যদিও জাতির সেই তীব্র ডোপামিন বা টেস্টোস্টেরন উত্তেজনা অবদমিত হতে টাইম লাগেনি। কারন, দুর্মুখেরা বলে, বাঙালী ক্ষণপতনা।
সেই মেয়েরা টুর্নামেন্ট শেষে পাবলিক বাসে গরু-ছাগলের মতো করেই বাড়ি ফিরেছে। আর, গত ২ বছরে, তাদের সবার ‘নিকাহ’ হয়ে জীবন সেটেল হয়ে গেছে। কলসিন্দুর উপাখ্যান আমাদের জাতীয় জীবনের একটা বড় সিম্বল। আজকে ‘মাইয়া’ মানুষগুলোকে অভিনন্দনে ভাসানো এই জাতিই আবার খুব শীগগীরই পঞ্চপান্ডবের বিষয়ে করা অকৃতজ্ঞ বলাৎকার আবারও রিপিট করবে। গ্যারান্টেড। হয়তো বেশিও করবে, কারন, এবারের সাবজেক্টরা ‘মাইয়া মানুষ”। ইতিহাস তাই বলে।
এজন্যই আমি সাফ নারী চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ‘মাইয়া’র দলকে অভিনন্দন জানাতে দেরী করে ফেলেছি। তোমরা আমাদের গর্বিত করেছ হে বঙ্গবীরাঙ্গনার দল। আর কিছু কখনো না করলেও চলবে। পরের কথায় যাই। এই নারীদের বিজয়ের আইকনিক ছবিটা দেখে আমাদের সদ্যজাগ্রত ‘বাঙালী কৃষ্টি’র ধারকরা, যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও উত্তর-দক্ষিণ বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্প্রতি দানববন্ধন করেছিল, তারা তিনটা ইস্যু তুলে ধরে এবার দানববন্ধন করতে পারে-
এক-মাইয়াগুলার পরনে খাটো পোষাক। মাইয়াদের উরু দেখা যাচ্ছে। এই পোষাক কোটি কোটি বাঙালী ফেসবুকীয় জাগ্রত জনতাকে ‘সিডিউস’ করছে। পোস্টারে মাইয়াগো উরুতে ও ‘চেস্টে’ আলকাতরা লেপে দিয়ে প্রকাশ করা উচিত ছিল। (যদিও রোনালডো, আলফাজ, জামাল ভূঁইয়া কিংবা নাদাল কেন তাদের ‘সেক্সী’ উরু উন্মুক্ত রেখে খেলে-সেই প্রশ্ন এই দানববন্ধকরা কখনো করেননি।)
দুই-মাইয়াগো ফুটবল খেলা ’শরিয়তে’ নিষেধ। ’দেশীয় কৃষ্টি’তেও নিষেধ। মাইয়ারা কেবল ‘খাটে’ খেলবে। তিন-মাইয়ারা পশ্চিমা পোষাক পরে খেলল কেন? তাদের বিশুদ্ধ দেশীয় বাঙাল পোষাক পরে খেলানো উচিত ছিল। হতে পারে, এবার তারা জাতিসংঘও এমন পশ্চিমা পোষাক পরবার সমালোচনা করেছে-সেই তত্ব বের করে ফেলতে পারে। [তিনটা পয়েন্ট সারকাজম, নাকি ট্রল, নাকি স্যাটায়ার-সেটা বলে দেবার চাপ আমাকে দেবেন না।] কার্ডিফ গাঁথার নায়কেদের, আই.সি.সি৯৭ গাঁথার নায়কদের, এশিয়া কাপের নায়কদের আমরা যেমন খুব শীগগীরই ভুলে গিয়েছি, খুব দ্রূতই যেমন আমরা হিরোদেরকে ভিলেন বানিয়ে ট্রল করতে অভ্যস্ত, ঠিক যেভাবে কলসিন্দুরের মেয়েদের আমরা ’নিকাহ’ দিয়ে দেশকে পাপমুক্ত করেছি, ঠিক সেভাবেই সাফ নারী চ্যাম্পিয়ন ‘মাইয়া’দের আমরা খুব শীগগীরই ভুল যাব। ট্রল করব। তাদের পান থেকে চুন খসলে গালিতে ভাসিয়ে দেব।
’মাইয়া’রা ক্রিকেটে ভাল করায় প্রশংসা করব, আবার তারা একটু টিকটক করলে গুষ্টি উদ্ধার করব। জাহানারা একটু রঙঢঙ করলেই ‘দুশ্চরিত্রা’র তকমা দেব।
একটা ভয় হয়। মাইয়াদের একান্ত নিজেদের চেষ্টা ও ত্যাগের বিনিময়ে এই বিজয় এলেও খুব শীগগীরই অনেক কর্তা ব্যক্তিরাই ক্রেডিট কার্ড, মানে ক্রেডিটের ভাগ পেতে দাড়িয়ে যাবেন। সংবর্ধনার ফুল হতে শুরু করে খাম ও প্লটের ভাগের উমেদার বহুজন হবেন।
একদল আবার নারী ফুটবল ফেডারেশনের পদ পদবী বাগাতে যুদ্ধে নামবেন। কারন, ওটা পরবর্তি সম্ভাবনাময় ধান্দা। ঠিক যেমন, ৯৭ তে বা এশিয়া কাপে ক্রিকেট জাগরণের পরে ক্রিকেটটা ক্রিকেটারদের হাতছাড়া হয়ে ধান্দাবাজদের হাতে চলে গেল, ঠিক সেভাবেই। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা যতদিন না আসবে, এই ’মাইয়া’ মানুষের দলটা আরও কিছু করলেও করতে পারে। সরকারী পৃষ্ঠ ও পোষকতার মরণস্পর্শ যেখানেই লেগেছে, সেটা পুড়ে গেছে। এটাও যেতে বাধ্য।
তাই দোয়া করি, সরকারের নেকদৃষ্টি না পড়ুক।
[একজন কলামিস্টের মতো ভদ্র, সুমন্দ ও সুভদ্র বচন ও শব্দাবলিতে কেন লিখি না-সেই প্রশ্ন অবান্তর। আমি কবে দাবী করেছি, যে, আমি একজন কলামিস্ট হবার যোগ্য? একজন হোমড়াচোমড়া কর্পোরেট কেন এমন ন্যাক্কারজনক ভাষায় লিখবে-সেই প্রশ্ন করলেও আমি লাচার। আমি কবে হতে কর্পোরেট পরাধীনতার দাস বনে গেলাম?]
#religiousfanatism #extremeism # medievalsociety #womenfootball #conservative