আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনে এক বড় ভাই, প্রায়ই তার পিতার একটি উদ্ধৃতি আমাদের বলতেন, ”মোল্লার দ্বীন কঠিন, আল্লহ’র দ্বীন সহজ।”
দাড়ান দাড়ান, এক্ষুনি তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠবেন না। ওই বড় ভাইয়ের পিতা তার এলাকার একজন বিশিষ্ট মাওলানা। ধৈর্য্য ধরে পরের অংশে যান।
বাংলাদেশের কোনো একটি বিশাল ও সুপরিচীত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট অফিস। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তার সব প্রধান কর্মকর্তা মানে জিএম/ডিরেক্টরদের নিয়ে বিজনেস মিটিং করছেন। মিটিং এর এক পর্যায়ে একজন জিএম এর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বদমেজাজী ও অভদ্র চেয়ারম্যান সাহেব বলে উঠলেন, ”ওই শু………রের বাচ্চা, এরপর কিন্তু গালি দিমু।”
গল্পটার মাজেজা ধরতে হলে পরের গল্পটাও পড়ুন।
আরেকবার এক বাড়িতে, এক মায়ের দুই ছেলে। ছোট ছেলেটা একটু রুক্ষ ও বাজে স্বভাবের। আদব লেহাজ কম। তো একদিন মায়ের সাথে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সে মাকে একটা কটূ কথা বলে বসল, “তুমি একটা কু………র বাচ্চা।” [অবাক হবেন না। বাংলাদেশের সমাজে অতি নিম্নবিত্ত সমাজের পরিবারে বাবা-মা ও সন্তানের মিথষ্ক্রিয়ায় এটা খুবই বাস্তব।] তো বড় ছেলে বাড়িতে এলে মা তাকে নালিশ জানালো। বড় ছেলে এসে ছোট ভাইকে ধমক দিয়ে বলল, “এই শু………….রের বাচ্চা, তুই মাকে ‘কু……….র বাচ্চা’ বলে গালি দিস?”
হালকা চালে গল্প করা শেষ। আসুন, এবার একটু সিরিয়াস হই। [সিরিয়াস শব্দটির এই ব্যবহারের কোনো ভাল বাংলা আমি পাইনি।]
কোনটা ধর্ম, কোনটা অধর্ম, প্রকৃত ধর্ম কোনটা, আর কোনটা ধর্মের নামে অধর্ম, তা বোঝাতে গিয়ে আমি উপরের গল্প দুটো প্রায়ই বলি। অন্যের অধর্মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এভাবেই আমরা নিজেরাই অধর্মের কাছে নিজেকে শঁপে দিই। ধর্মের মান রক্ষার নামে প্রগলভ আমরা ধর্মের মূল সুরটাকেই বেমালুম ভুলে বসে থাকি।
এই বিশাল প্রবন্ধের শেষতক পড়ার মতো ধৈর্য্য যদি আপনার না থাকে, তবে ধাপে ধাপে পড়ুন কিংবা একদম নাই পড়ুন। কিন্তু অর্ধেক পড়ে কিংবা না বুঝেই বিচার করতে বসে যাবেন না দয়া করে। এই প্রেক্ষাপটটি নিয়ে লিখব-এমন একটি চিন্তা মাথায় আসে অনেকদিন আগে। কিন্তু লিখে উঠবার সাহস করতে পারিনি। উগ্রপন্থি আর অসহিষ্ণু লোকদের জাজমেন্টাল দৃষ্টিভঙ্গির অন্ধ আক্রমণের শিকার হবার ভয়ে।
দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর কথা যদি বাদও দিই, খোদ আমার প্র্রাণের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কয়েকটা পেজে প্রায়ই এমন সব পোস্ট দেখি, আমার দুয়েকটা লেখায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী (বা পরিচয়ধারীদের) এত অযৌক্তিক ও অন্যায্য ব্যক্তি আক্রমণ হতে দেখি, যে ভয় হওয়াই স্বাভাবিক। তারপরও মনে হল, লেখাটা শেষ করি। হয়তো কখনো প্রকাশ করব না। তবু অনলাইন ও অফলাইনে ধর্মান্ধতা নিয়ে এবং পরধর্মের প্রতি ক্রমবর্ধমান হিংসাত্মক সামাজিক মিথষ্ক্রিয়ার মুখে অন্তত লেখাটা নিজে পড়ে একটা গোপন আত্মপ্রবারনা তো পাব।
সংশয়িত ডিসক্লেইমার: বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে অর্থনীতির সাথে পাল্লা দিয়ে আরো যে বিষয়গুলো নানা কারনেই বাড়ছে তার মধ্যে রয়েছে অস্থিরতা, ধর্মীয় উগ্রতা, ধর্মান্ধতা, বর্ণবাদ, পরমত অসহিষ্ণুতা আর চরমপন্থার প্রতি ঝোঁক। আপনি যদি আমার কাছে জানতে চান, একথা বলার স্বপক্ষে আমার কোনো জরিপ আছে কিনা, তবে আমি লাচার। না, আমার কাছে কোনো জরিপ নেই। আমি স্রেফ আমার পর্যবেক্ষণ হতে বলছি।
একবার মজা করার জন্য (সান্টা ক্লজের মতো) চূড়াওয়ালা টুপি পড়া আমার একটা ছবি প্রোপিক হিসেবে ফেসবুকে দিয়েছিলাম। অনেকের মাঝে একজন প্রশ্ন করেছেন, ”শেষতক শীরক্ করলা?” যদিও জানি না, টুপি পরিহিত ওই ছবির সাথে শীরকের কী সম্পর্ক। আমি কোনো প্রথাগত জ্ঞানী নই। বিদ্বানদের মতো বড় মাদ্রাসা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠোনে পা রাখা হয়নি। কিন্তু তবু বলি, ধর্ম ও নীতিশাস্ত্র নিয়ে আমি অনেকের সাথেই যথেষ্ট শক্ত যুক্তি দিয়ে কথা বলতে পারব বহুক্ষণ। তার পটভূমি আজ না বলি। আর হ্যা, লজিক ও রিজনিং দিতে পারা আমার একটা শক্ত শক্তি।
শবে বরাত (আসলে “নিসফ শাবান” বা “লাইলাতুন নিসফি মিন শা’বান” তথা “শা’বান মাসের মধ্য রজনী”–উইকিপিডিয়া) পরবর্তি ছুটির দিনের ঘুম বাদ দিয়ে কষ্টসাধ্য প্রয়াসে এই লেখা লিখেছি। আমার কথা, লেখা, অনলাইন উপস্থিতির প্রেক্ষিতে কেউ কেউ প্রায়ই আমাকে প্রশ্ন করেন, ”তুমি কোন রাজনৈতিক দল করো?” ”তুমি কোন মতবাদ বিশ্বাস করো?” ”তুমি কি ………ক?” ”তুমি বিসিএস দাওনি কেন?” ”তোমার আইফোন নেই কেন?” ”তুমি এটা কেন, তুমি ওটা কেন, তুমি ……….কেন?”
আমার তাদেরকে বলতে ইচ্ছে করে, আমি যখন একা একাই আমার অপত্য বয়সে একটা গোটা পরিবারকে টেনে নিয়ে তীরে পৌছে দিতে সংগ্রাম করছিলাম, তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
আমি যখন একা একা এই নিষ্ঠূর নগরে নিজের সংগ্রামটা লড়ছিলাম, তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
আমি যখন একা একা আমার শ্বাসরুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পার করছিলাম, তখন আপনি কোথায় ছিলেন? আমি যখন একা একা এই নিষ্ঠূর নগরে একটা চাকরীর জন্য অমানবিক রকমের সংগ্রাম করছিলাম, তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
আমি যখন একা একা চরম একাকিত্বে ভুগে ভুগে প্রায় ক্ষয়ে এসে হাল ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম, তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
আমি যখন একা একা এই নিষ্ঠূর নগরে টাকার অভাবে একবেলা করে খেয়ে বেঁচে ছিলাম, তখন আপনি কোথায় ছিলেন? আমি যখন একা একা এই নিষ্ঠূর নগরে টিউশনি ছাত্রের মায়ের দেয়া পিপড়া পড়া চা খেয়ে চোখের জলে ভাসতাম, তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
আমি যেদিন একা একা এই নিষ্ঠূর নগরে আমার মৃতপ্রায় বাবার শরীরটা নিয়ে এ হাসপাতাল, ও হাসপাতাল ঘুরছিলাম একটা আইসিইউ বেডের জন্যে, সেদিন আপনি কোথায় ছিলেন?
যেহেতু তখন আপনি আমাকে একটি প্রশ্নও করেননি, যেহেতু একদিনও আমার কাছে জানতে চাননি আমার কথা, তখন আজ কেন আমাকে এত প্রশ্ন? আপনার প্রশ্নের জবাব দেব না। শুধু জেনে রাখলে আপনি সুখী হবেন, ”আমি আমার চরমতম দুর্দিনেও বিশ্বাস করে গেছি আর যাব, যে, “আমার ঈশ্বর আমাকে কখনো ভোলেননি আর আমি আমার দয়াময় প্রভূর ওপর কখনো বিশ্বাস হারাইনি।”
লেখাটা পড়বার বিভিন্ন পর্যায়ে আপনার যদি লেখার বিষয়বস্তু বাদ দিয়ে লেখকের ধর্মবিশ্বাস জানার চিন্তা বেশি চাঙ্গা হয়ে ওঠে, তবে জেনে রাখুন, আমি ও আমার আল্লহ’র মধ্যেকার একান্ত বিশ্বাসের জগতটি অন্য বান্দার মাথাব্যথার বিষয় নয়। আর আমি বিশ্বাস করি, আমি আল্লহ’র খুব পূন্যবান বান্দা হয়তো নই, কিন্তু তার প্রতি আমার বিশ্বাসে কখনোই ঘাটতি আসেনি। আর খোদা তার এই বান্দাকে কোনো এক অদ্ভূৎ রহমতের কারনে বারবার রহম দিয়ে রক্ষা করেছেন। এর বেশি আমি আপনাকে বলব না।
এই লেখাটি কোনো বিশেষ ধর্মকে নিয়ে কথা বলার জন্য নয়। কোনো ধর্মকে শ্রেষ্ঠ বা কাউকে অধঃস্তন করার জন্যও নয়। পুরো লেখাটিতে যতবার ধর্ম শব্দটি আমি ব্যবহার করেছি, সেটি কোনো একক ধর্মবিশ্বাসকে মাথায় রেখে নয়। এই লেখায় ধর্ম মানে ধর্ম। কোনো একক ধর্ম নয়।
হ্যা, বাংলাদেশে বসবাসকারী একজন মুসলিম হিসেবে বলব, যেহেতু এই দেশে সিংহভাগই ইসলাম ধর্মের অনুসারি নাগরিক, তাই যেকোনো বিষয়ে বলতে গেলে মুসলমানদের প্রসঙ্গ বেশি চলে আসাটাই স্বাভাবিক। তাই বলে এটা ভাববার অবকাশ নেই, কোনো একক ধর্ম বা বিশ্বাসের মানুষের প্রতি আমার রাগ বা বিরাগ কোনোটাই আছে।
এক; বেদাতী ভাষায় আদাত চর্চা:
আমার ছোটবেলায় একজন ইমাম সাহেব আমাদের কলোনীর ছোট্ট মসজিদে নামাজ পড়াতেন। আর আমরা বাচ্চারা তার কাছে কুরআন পড়াও শিখতাম। তার দু’বেলার খাবার পাঠানো হত কলোনীর বিভিন্ন বাসা হতে। তো, একরাতে তার জন্য খাবার নিয়ে আমি গেলাম। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, মেন্যুতে কী আছে? আমি জানালাম, “হুজুর, গরুর মাংস আছে।” তিনি আমাকে সংশোধন করে বললেন, “না না, বলুন, গরুর ’গোশত’ আছে। আমরা মুসলমানরা ’গোশত’ বলব। ’মাংস’ বলে ‘বিধর্মীরা’। আরেকটা ঘটনা বলি।
আমাদের স্কুলে ক্লাস ৭ বা ৮ এর বইয়ে একটা গল্প ছিল। একজন সমাজ সংস্কারক নারী তার গ্রামে নিরক্ষর লোকদের অক্ষরজ্ঞান দিতে গিয়ে তাদের পড়াচ্ছিলেন, “বলুন, ক আকারে কা”। সবাই বলে “কা”। ”এবার বলুন, ক আকারে কা।” সবাই বলে “কা”। তাহলে ক আকারে কা, ক আকারে কা-একত্রে কী হয়?” ছাত্ররা বলে, “চাচা”। অর্থাৎ ’কাকা’ বলবে না। কারন একটাই, ওই যে, ’কাকা’ ডাকবে বিধর্মীরা।
আমাদের সমাজে খুব নিরবে এই বিভাজন, এই ভাষাগত বিভাজন প্রকটভাবেই আছে। যে কারনেই জল-পানি,কাকা-চাচা,বাবা-আব্বা,মা-আম্মা,মাংস-গোসত,স্নান-গোসল সৎকার-দাফন সালাম-নমষ্কার এরকম হাস্যকর বিভাজনও চোখে পড়ে। ধর্মীয় স্বাতন্ত্র আমাদেরকে ধর্মীয় সংকীর্ণতায় এতটাই আচ্ছন্ন করে দিয়েছে, যে, আমরা এখন খোদ বাংলা ভাষারই দুটি আলাদা প্রতিশব্দকে আলাদা সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষায়িত বানিয়ে নিয়েছি। যদিও পুরো বাংলা ভাষাটাই (তাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী) ’বিধর্মীদের’ ভাষা। সেই ’বিধর্মীর’ ভাষার মধ্যেই আবার আমরা স্বধর্মী ও বিধর্মী খুঁজি।
সদ্যজাত সন্তানের নাম রাখতেও আমরা ভাষাগত বিভাজন কঠোরভাবে বজায় রাখি। ঠিক যেমন এই মরার দেশে, এই সর্ববিভাজনের দেশে ভাগ হয়ে গেছে উৎসব, রীতি, প্রথা, পোষাক, খাদ্য, নৈতিকতা, সম্বোধন, ভাষা, সামাজিকতা সব। শু
নতে খুবই বিচিত্র হলেও সত্যি, বঙ্গসমাজে দুর্বোধ্য, কায়ক্লেশে উচ্চারনযোগ্য আরবী নামে সন্তানদের নাম রাখার প্রবনতা বাড়ছে। বাড়ছে দুর্বোধ্য সংস্কৃত শব্দে নাম রাখার প্রবনতা। যদিও সেই আরবি, ফারসি, সংস্কৃত নাম শেষতক টেকেনা। টেকে সেই বাংলা কিংবা বাংলিন্দি কিঙবা বাঙলিশ নাম বল্টু, পল্টূ, বদনা, মদনা ইত্যাদি। কাউকে মেয়ের নাম সুন্দরী রাখতে বলুন, বলবে, ধূর, ওই নাম থাকে কাজের মহিলাদের। কিন্তু হাসনা রাখতে বলুন, খুশিতে ডগোমগো। যদি বলেন, নাম রাখো সবুজ পাথর, ক্ষেপে যাবে। ঘুরিয়ে আরবীতে জমরুদ রাখতে বলুন, বাহ বাহ। ছেলের নাম গানাম বললে মহাখুশি। কিন্তু যদি বলেন, ছাগল রাখো, খুন হয়ে যেতে পারেন। *গানাম*ছাগল*হাসনা*সুন্দরী
বঙ্গ পুরুষ ও নারীকূল, যারা বেশিরভাগই দুর্ঘটনাক্রমে কিঙবা দায়ে পড়ে বাবা মা, তারা এমনিতে আরবী সংস্কৃতে নাম খুঁজলেও সিরিয়াল কিন্তু হিন্দীই দেখেন। আরবী স্কুল, মানে মাদ্রাসায় সন্তানকে পড়াননা। সংস্কৃত স্কুলেও না, পড়ান ইংরেজ বা বাংরেজ স্কুলে। আরবী, আরব সংস্কৃতি আর ইসলামী বিধানের মধ্যে আমরা সাধারনত গুলিয়ে ফেলি বা ফেলতে পছন্দ করি। এর ফলাফল নিয়ে আরেকটা গল্প বলি।
বিদেশ হতে বড় খালা এসেছেন ভাগনীর মেয়ে হয়েছে শুনে। নাম কী রেখেছ? জ্বী, মবরুকা। ফাযলামি করিস আমার সাথে? মেয়েদের নাম মকবুল খাঁ?
আপনাদের মনে পড়ে কিনা, একটি শিশুতোষ বইয়ের একটি ভূতের ক্যারেক্টারের নাম সোলেমান ভূত রাখায় বাংলাদেশের একটি গোষ্ঠী লেখক ও প্রফেসর জাফর ইকবালকে খুনের চেষ্টা পর্যন্ত করে। তাদের যুক্তি, এতে নবী সোলায়মান আ. কে অপমান করা হয়েছে। জানিনা কোন সময়ে এর শুরু, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান ও জেলার নাম বদলানোর একটা হুজুগ উঠেছিল একবার। ঠিক যেমন ভারতে এখন চলছে। বিভিন্ন রাজ্য, যার নামে ’মুসলমানী গন্ধ’ আছে, সেগুলোকে ’হিন্দু গন্ধ’ করার চেষ্টায়। যেমন, বোম্বে হতে মুম্বাই, বেঙালোর হতে ব্যাঙালুরু।
যাহোক, বাংলাদেশে ’জয়দেব’পুর হতে হয় ’গাজি’পুর, ময়মন’সিংহ’ হতে ’মোমেন’শাহী, ব্রাহ্মনবাড়িয়া হতে বি.বাড়িয়া, ’বিক্রম’পুর হতে ’মুন্সী’গঞ্জ। খোদ, আমার নাম ওয়ালিদ হবে না বিদ্যুৎ হবে-সেই নিয়েই লোকে বিতর্কে নামত। নামের এত জোর এই দেশে।
আমার বেশ কয়েকজন সুহৃদ আমাকে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে আমাকে বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, আমি আমার লেখায় মাঝে মাঝে ’আল্লহ’ না বলে ঈশ্বর কেন বলি? ঈশ্বর তো বিধর্মীদের বিশ্বাস অনুযায়ী তাদের স্রষ্টা। ঈশ্বর তো একক ও অদ্বিতীয় নন। আমি তাকে অনেক যুক্তি দিয়ে বোঝাই।
সর্বপ্রথম বলি, ইসলাম ধর্ম অনুসারী আমাদের বিশ্বাস ও কিতাব মতে, আমাদের স্রষ্টা ও মহাপ্রভূর শুদ্ধ নাম ‘আল্লহ’। কিন্তু বাঙালীরা আমরা সেই নামকে বলি, ‘আল্লাহ’। এই কয়েকটি লাইন পড়ে আপনার নিশ্চই মনে হচ্ছে, লোকটা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। না ভাই ও বোন, আমি আমার যতটা আরবী জ্ঞান, কোরআনের জ্ঞান, ধর্মীয় জ্ঞান আছে, তার আলোকে বলছি, তদুপরি একজন আলেমকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনিও আমাকে এমনটাই জানিয়েছেন। আমাদের মহাপ্রভূর নাম ‘আল্লহ’। তিনি ‘আল্লাহ’ নন। আমরা বাংলায় ‘আল্লহ’ উচ্চারনকে ‘আল্লাহ’ বলি। এখন যদি বলেন, বাংলাতে ‘আল্লহ’তে ‘আল্লাহ’ বলা ঠিকই আছে, তবে আমাদের স্রষ্টা, মহাদয়াময়. মালিককে বাংলা অর্থে ঈশ্বর বললে তাকে কীভাবে শিরক করা হয়, যখন আল্লহকে আপনি বিকৃত নামে আল্লাহ ডাকেন?
শুনতে কষ্ট হবে, তবু বলি, যদিও প্রকাশ্যে আমাদের নেতানেত্রীরা বলে বেড়ান, বাংলাদেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির দেশ, আসলে এই সম্প্রীতির মূলে সংহতি নয়, রয়েছে স্রেফ মেজরিটি ও মাইনরিটির শক্তিমত্তা ফ্যাক্টর। শক্তির বিচারে যারা মাইনরিটি, তারা অনেক কিছু বুঝলেও বা করতে চাইলেও কিছু করে উঠতে পারবেন না, বিধায় সহ্য করেন। ঠিক যেমন ভারতে এর বিপরীত অবস্থা-মেজরিটি ও মাইনরিটির।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও একধরনের অলিখিত আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকায় মেজরিটিও খুব তীব্রভাবে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে না। কিন্তু তার মানে এই নয়, দেশ অসাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িকতার গোপন স্রোত সমাজের নিয়মিত জনজীবনের আড়ালে বয়ে চলেছে। কান পাতলেই তার শব্দ শোনা যায়।
দুই; মোরতাদের বানিজ্য:
বাংলাদেশের নেটিজেন ও ফেসবুক আইনস্টাইন গোষ্ঠীর ধর্মীয় বিদ্যার যা দৌড়, তার একটা মজার কিন্তু অত্যন্ত নিষ্ঠূর দিক হল যখন তখন যাকে তাকে যেভাবে খুশি যেকোনো স্বার্থে নাস্তিক বা কাফের বা মোরতাদ লেবেল লাগিয়ে দেবার প্রবণতা। কাক নাকি কাকের মাংস খায় না। কিন্তু এই নেটিজেনরা শুধু কাক হয়ে কাক না, খোদ নিজের মাংসই খায়। কীভাবে?
আমার খুব পরিচীত একজন ধার্মিক ভদ্রলোক। তিনি ফেসবুকে সবরকম পোস্ট দেন। তার ভিতরে ধর্মীয় পোস্টও থাকে। ধর্মের বিভিন্ন আলোকিত দিক, ধর্মবিশ্বাসের আহবান থাকে তার লেখায়। প্রায়ই অন্যদের ইসলাম বিরোধী কাজের সমালোচনা করেন তার লেখায়।
ভদ্রলোক নামাজি। হজ্বও করেছেন বলে জানি। তিনি একদিন একটা পোস্ট দিলেন, আমার এই পোস্টটার থীমের সাথে মেলে এমন একটা লেখা সম্বলিত। ব্যাস, আমার নেটওয়ার্কের আরেকজন (যিনি নিজে আবার আরেকটু বেশি নিবিড়ভাবে ধর্মচর্চা করেন, তিনি আমাকে ব্যক্তিগত মেসেজ দিলেন,
“ভাই, দেখলেন, লোকটা নাস্তিক।”
বহু যুক্তি দিলাম। তিনি মানলেন না। এ বড় আজব কারবার। নিজের ধারনার সাথে, যুক্তির সাথে না মিললে এদেশে যে কাউকে যেমন রাজাকার বানিয়ে দেয়া হয়, তেমনি দেয়া হয় নাস্তিক তকমা।
যে নিজে এক ওয়াক্ত নামাজও পড়ে না, সেও কোনো সাহিত্য পেজে কারো আঁকা ছবি দেখে কিংবা মৃনাল হকের ভাস্কর্য দেখে শিল্পীকে নাস্তিক তকমা দিয়ে দিচ্ছে। যে ঘুষ খাচ্ছে, সে তার ঘুষের বান্ডিলে একটা জাল নোট পেয়ে ঘুষদাতাকে অসৎ লেবেল দিচ্ছে। পর্ণ তারকার ভেরিফাইড পেজ ফলো করেন, এমন একজন দেখি শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর মৃত্যুর সংবাদে “জাহান্নামে যাও” মন্তব্য দিচ্ছে। প্রকাশ্য দিবালোকে জনসম্মুখে মুত্রত্যাগে রাস্তা ভাসিয়ে দেয়া চাচাও রাস্তায় চুম্বনরত কাপল দেখলে আনমনে বলে ওঠে,”দেশ থেকে কি লাজ-লজ্জা উঠে গেল?”
এ এক মজার দেশ।
সংবিধানে বিসমিল্লাহ/মুসলিম কান্ট্রী/ইসলামিক সংবিধান/শরিয়তসম্মত ভোট/শরিয়তসম্মত ব্যাংকিং/বারো পীরের দেশ বাংলাদেশ-এমন ট্যাগলাইনে প্রায়ই আমরা অনলাইন পোস্ট, লেখালেখি, জনদাবী দেখি। আচ্ছা, আগে বলুন তো, সময়ের ঠিক কতটা আগে গেলে তাকে আমরা ইতিহাস বলি?
আপনার মেজাজ খারাপ হলেও, বাংলা নামক ভূখন্ডে মাত্র কয়েকশো বছর আগে কোন ধর্মের আধিপত্য ছিল, কারা ছিল এই ব-দ্বীপের পত্তনকারী, সেটা একটু গবেষনা করুন। উপরের ট্যাগলাইনে যারা কথা বলেন, তাদের কাছে আমার জানতে ইচ্ছে করে, আচ্ছা, ইসলামে এই ভোট, সংবিধান, ব্যাংক, সংসদ, সুপ্রীম কোর্ট, উকিল, মোক্তার, বিশ্ববিদ্যালয়-এসবতো নেই। তো আপনারা কেন সুপ্রীম কোর্টকে মূর্তিমুক্ত করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চান, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট কনসেপ্টটাই ইসলামে নেই। আপনারা কেন এয়ারপোর্টের সামনে বাউল ভাস্কর্যের বদলে মিনারের ভাস্কর্য বসানোতে ইসলাম রক্ষাকে ট্যাগ করেন, যখন ভাস্কর্য বিষয়টাই ইসলামে নেই।
আজকাল মডারেট ইসলাম-নামে আরেকটা নতুন ধরনের ফেতনা শুরু হয়েছে। তাহলে কি ইসলাম আপনাদের ধারনামতে ওল্ড ও মডারেট নামে দুরকম হবে? ইসলাম সবযুগের জন্যই মডারেট। নতুন করে তার মডারেট ভার্সন কোথা হতে এলো?
এই মডারেট গোষ্ঠীটি মডারেট ইসলামের নামে সূদ, ঘুষ, ওয়েষ্টার্ন কালচার, মদ, টিভি ইত্যাদিকে যায়েজ করার একটা পথ ধরেছেন।
শুনেছিলাম, ইরানে না যেন ইন্দোনেশিয়ায় একবার একটা ব্রোথেল খুলেছিল। যেখানে কাস্টমার ও যৌনকর্মীকে এক ঘন্টার জন্য বিয়ে পড়ানো হয়। টাকার বিনিময়ে যৌনকর্ম সারার পরে আবার সাথে সাথে ডিভোর্স দিয়ে দু’জন দু’জনের গন্তব্যে চলে যায়। কী দারুন পথ! খায়েশও মিটল, পাপও হল না!!!!!
অপচিন্তার বকধার্মিকতা আর কাকে বলে? আমার কাছে মনে হয়, এরা আসলে প্লাস্টিকের চামড়ার স্যান্ডেল বানাতে চাচ্ছেন।
তিন; অন্ধ উটের ধর্মাবতার:
বড় রাস্তা দিয়ে বাসায় ফিরছি। রাস্তার পাশেই একটা বড়সড় উন্নয়নিকা। উন্নয়নিকা বোঝেননি? ওই যে, যেসব দেখে আপনি বুঝবেন, আপনি উন্নয়নে আছেন।
যাহোক, উন্নয়নিকাতে দেশে দুই রকম গাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করা হল: বনজ-ফলদ
-বনজ = বনে জন্মে যা
-জলজ = জলে জন্মে যা
-ফলদ তাহলে কেন?
গত ৪/৫ বছর ধরে কে যেন বুদ্ধি দিয়েছে, আগে যেটাকে ফলজ বলা হত, সেটা ফলদ হবে। নতুন নিয়মে, ফলদ = ফল দান করে যে।
কেন রে ভাই? ফল দেয় যেসব গাছ, সেগুলোর নাম আগেই ছিল। ফলদায়ী বা ফলবান।
কার মাথায় এসব ঘোরে জানি না। বনজ আছে, জলজ আছে, ফলদ না থাকলে হয়? ঈদ হবে নাকি ঈদ-তাই নিয়ে একটা কুরুক্ষেত্রের চেয়েও বেশি যুদ্ধ বঙ্গদেশের ফেসবুক ক্রূসেডাররা করেছেন। ঈদ কবে হবে, চাঁদ দেখা গেছে কিনা, এই যুগেও চাঁদ কেন দেখতেই হবে, সৌদির সাথে কেন ঈদ সিনক্রোনাইজড না, মেশিন দিয়ে কেন চাঁদ দেখা হয় না, সবার প্রস্তুতি নেয়া শেষ-মাংস ভিজিয়ে ফেলেছি এখন কেন ঈদ হবে না-কত্ত যে অস্থিরতা।
তা জনাবরা, রোজা শুরু হবার আগের রাতে পরদিন রোজা নামানোর জন্য কেউ এত ব্যস্ত ছিলেন? ইদের জন্য এত কনসার্ন, রোজার জন্য খবর নেই।
বলতে গেলে এবছর বঙ্গবাসী ফেসবুকে আন্দোলন করেই ঈদকে টেনে নামালো। সরকার যেন ৫ তারিখই ঈদ ঘোষনা করে, তার জন্য একরকম পপুলার সেন্টিমেন্টাল প্রেশার তৈরী হল। দাবী মেনে নেয়ায় একদল লোক তীব্র উচ্ছাসও জানালো। কেউ কেউ আবার একে গণতন্ত্রকামী জনতার চাপে ফ্যাসিবাদী সরকারের পরাজয় বলেও লেবেল এঁটে দিল।
কেন রে, ভাই, ঈদ পালন একটি ধর্মীয় প্রথা। সরকারের ঘোষনা এত গুরুত্বপূর্ন কেন? আপনি নিজেই করুন না? যেদিন ইচ্ছা। ৪ তারিখেও যদি ঈদ করেন, কে আপনাকে আটকায়?
একদল আবার সৌদির সাথে একসাথে রোজা করে, কিন্তু মিল রেখে নামাজের অক্ত ধরে না। দেখেশুনে গালিভারস ট্রাভেলের কথা মনে পড়ে। যেখানে ডিমের মোটা দিক হতে ভাঙা হবে নাকি চিকন দিক হতে-তাই নিয়ে লিলিপুশিয়ান আর বেলেফুসকোর মধ্যে যুদ্ধ হয়ে যায়।
একবার এক আমেরিকান আর বৃটিষ ক্রূসেডারের মধ্যে লাগল ধুন্দুমার ঝগড়া। আমেরিকান বলে, এয়ারোপ্লেন হবে। বৃটিষ বলে, এরোপ্লেন হবে। বৃটিষ বলে, ইংরেজি আমাদের আবিষ্কৃত ভাষা। আমরা বেশি জানি, ওটার বিশুদ্ধ উচ্চারন কী হবে। আমেরিকান বলে, প্লেন আমরা আবিষ্কার করেছি। আমরাই জানি, ওটার উচ্চারন কী হবে।
দোয়াল্লিন আর জোয়াল্লিনের মারামারি জানেন তো?
এক গ্রামে একবার ফজরের নামাযে ইমাম সাহেব ক্বিরআত পড়ার সময় ফাতিহা সুরার শেষে ওয়ালাদ দ্বোয়াল্লিন (মতান্তরে জ্বোয়াল্লিন) পড়লে মুসল্লীরা দুই ভাগ হয়ে গেল। কেউ বলে উচ্চারন দ্বোয়াল্লিন হবে, কেউ বলে জোয়াল্লিন। এই নিয়ে প্রায় হাতাহাতি।
এক মুরব্বী বলল, ভোট হোক। ভোট নিয়ে দেখা গেল, মুসল্লীর সমর্থন সমান সমান। এবার?
একটু পরে এক লোক দেরীতে ঘুম থেকে উঠে মসজিদের পৌছে দেখে মারামারির উপক্রম। তাকে মুসল্লীরা ধরে বসল। সে দোয়াল্লিনের না জোয়াল্লিনের দলে। সে তো দেখে বিপদ। যার বিপক্ষে যাবে, জান যাবে।
সে তাড়াতাড়ি ভয়ে বলে, ভাই, আমি দোয়াল্লিনও না, জোয়াল্লিনও না। আমি নামাজই পড়ি না।
(ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কাম্য নয়। আল্লহ’র নবীরই নিষেধ।)
কারনে অকারনে বুঝে না বুঝে যারা কথায় কথায় সৌদি আরবকে ইসলাম ধর্মের যেকোনো বিষয়ে রেফারেন্স মানতেন, তাদের কপাল ভেঙেছে সৌদি বাদশাহ-হালাল নাইট ক্লাবের ঘোষনা দিয়ে। (দেশের মেইনস্ট্রীম সংবাদ মাধ্যমে এই খবর প্রচার হওয়া স্বত্বেও আবার শুনছি, খবর ভুয়া।
তো ভাই, তাহলে আর কাকে বিশ্বাস করব? কার খবর দেখব? যাহোক, সত্যি হোক বা মিথ্যা, ভাই, হালাল সুদের নামে যখন ব্যাংক খোলা হয় আপনার দেশে, তখন কোথায় ছিলেন? সৌদিতে কোন কোন অপরাধে শরিয়তি বিচারে মুন্ডু বা শিরোচ্ছেদ হয়-তা নিয়ে কথায় কথায় যারা রেফারেন্স দিতেন, তাদের কাছ জানতে ইচ্ছে হয়, এখন তবে “হালাল নাইট ক্লাবও হোক?”
চার; ভূঁইফোড় ধর্মবিশারদগন:
বাংলাদেশে যত কিছুর প্রাচুর্য আছে, তার মধ্যে অন্যতম হল (তথাকথিত) “মুফাসসির” ও “মুহাদ্দিস”। এই বোদ্ধাগন নিজেরা (প্রায় ৯৯.৯% ক্ষেত্রেই) কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা। এদের সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালে আপনি ভূড়ি ভূড়ি কনটেন্ট দেখতে পাবেন যার সিংহভাগই তাদেরই মতো কারো পোস্ট হতে সংগৃহিত। কিংবা তাদের হতেও আরো অতি শিক্ষিতদের উর্বর মস্তিষ্ক হতে উৎসারিত।
এনারা নিজেরা ইংরেজিতেও তথৈবচ, এমনকি বাংলা ভাষাতেও ঠিকঠাক দু’পাতা লিখতে না পারলেও, প্রায়ই অন্যদের উপদেশ দেন, “ভাই, কোরআন পড়েন। ওখানে সব লেখা আছে।“, “কোরআনের বাংলা তরজমা পড়ুন”, “অমুক আয়াতটি বা সুরাটি পড়ুন। যেন, আমার মতো মূর্খ জটিল আরবী সাহিত্যে লেখা মূল কুরআন কিংবা তার সরাসরি বাংলা অনুবাদের দুটি আয়াত বা বাক্যসমষ্টি পড়েই আল্লহ’র প্রেরিত গূঢ় বার্তা মুহূর্তে হৃদয়ঙ্গম করে ফেলতে পারব।
অথচ আমি জানি, কুরআনের ৬৬৬৬ টি আয়াতের এক একটি অত্যন্ত জটিল, গম্ভীর, গূঢ় রহস্যমন্ডিত, বহুধা অর্থবিশিষ্ট, আপেক্ষিক ও তাৎপর্যপূর্ন আয়াত। যার একটি তো দূরের কথা, কখনো কখনো পুরো একটি অনুচ্ছেদ এমনকি পুরো একটি সূরা হতেও কোনো একক সিদ্ধান্ত বের করা একজন সাধারন মানুষ তো বটেই, সুপন্ডিত ইসলামী মূফাসসিরের জন্যও আয়াসসাধ্য।
এক সূরা ফাতিহার ৭ টি আয়াতের গূঢ় ব্যাখ্যা এতটাই বিস্তৃত ও বহুমূখী যে, কেউ কেউ বলেন, তা একাই গোটা কুরআনের আকারের সমান হয়ে যাবে। এক আলিফ লাম মীম-একই শব্দমালার রহস্যই আজ পর্যন্ত মুফাসসীররা সর্বসম্মতভাবে বের করতে পারেননি। হাদীসের ক্ষেত্রেও এমন নজির প্রচুর আছে। অথচ আমার এই বোদ্ধা সুহৃদগন (যাদের আরবী ভাষা ও ভাষাতত্বে দখল প্রায় মাইনাস, যারা নিজেরাই হয়তো আরবী বিশুদ্ধভাবে পড়তে পারে না) তারা আরবী কুরআন পড়ে কিংবা তার বঙ্গানুবাদ পড়ে নিজেরাই মুফাসসীর হয়ে অন্যকে রেফারেন্স দেয়া শুরু করেন। কিংবা কোরআনের একটি একক আয়াত কিংবা একটি একক হাদীস যেকোনোভাবে রেফারেন্স হিসেবে উদ্ধৃত করে তার বক্তব্যের সপক্ষে প্রমান দেবার চেষ্টা করবেন।
অথচ যেকোনো আয়াত বা হাদীসকে যেকোনো ইসলামী শিক্ষা ও বিধানের জন্য ব্যখ্যা করতে হলে অসংখ্য বিদ্যা ও বিশ্লেষনের দরকার হয়। কেউ কেউ আবার ইংরেজিতে কিংবা বাংলায় অনুবাদ করা কুরআন ও হাদীস পড়ে নিজে নিজেই আলেম বনে যান, অন্যকেও রেফারেন্স দেয়া শুরু করেন।
ভাই, নিজে নিজে কুরআন ও হাদীসের বঙ্গানুবাদ পড়ে যদি ফতোয়া দেয়া যেত, তবে মাদ্রাসার তালেবুল এলেমরা ১২টি বছর খেয়ে না খেয়ে মাদ্রাসায় পড়ে থাকে কেন? তারাতো মোবাইলে কুরআন ও হাদীসের পিডিএফ ডাউনলোড করেই মওলানা হয়ে যেত।
এদের অবস্থা সেই গ্রাম্য মোল্লার মতো।
একবার এক মোল্লা গ্রামের কোনো একটা মক্তব ভেঙে বানানোর সময় তার জঞ্জালের মধ্যে একটা পুরোনো কেতাব পেলো যার বেশিরভাগটা উঁইপোকায় খেয়ে ফেলেছে যায়গায় যায়গায়।
তো সেই বই পড়তে গিয়ে সে এক জায়গায় লেখা দেখে, “…………………..নারীকে বিবাহ করা হারাম।” ব্যাস, আর যায় কোথায়? সেতো এক লাফে রাস্তায়। সারা গ্রাম ঢোল পিটিয়ে সে প্রচার করতে লাগল, “জানো তোমরা? হায় হায় হায়! কী ভয়ঙ্কর গুনাহ তোমরা এতদিন করে এসেছ। নারীকে বিবাহ করা হারাম। তোমরা সেই গুনাহ করেছ। তোমরা কী ভয়ানক পাপী।”
তো পুরো গ্রামে ঢ়ি ঢ়ি পড়ে গেল। সারাগ্রাম তো উত্তেজিত। পারলে সারা গ্রাম তাদের বউদের তালাক দিয়ে দেয় পাপ হতে বাঁচতে।
তো একদিন পথে চলার সময় তার সাথে এক বড় মাওলানা সাহেবের দেখা। তিনি ওই মোল্লার সাথেই দেখা করতে আসছিলেন।
তিনি মোল্লাকে জিজ্ঞেস করলেন, সে “নারীকে বিবাহ করা হারাম” এই ফতোয়া কোথায় পেয়েছে। সে বলল, কেতাবে। তো তিনি সেই কেতাবটি দেখতে চাইলেন। মোল্লা তাকে তার বাসায় নিয়ে গেল।
কেতাব বের করে তাকে সেই পাতাটি বের করে পড়তে দিল। মাওলানা সাহেব কেতাব পড়ে দেখেন যেখানে যে লাইনে ওই কথাটি ছিল (………………….নারীকে বিবাহ করা হারাম) সেখানটা উঁইপোকায় খাওয়া।
তিনি চট করে ওই কেতাবখানার একখানা ফ্রেশ কপি তার বাসা হতে আনিয়ে সেই পৃষ্ঠার সেই লাইনটি মিলাতে বসলেন। ভাল কেতাবখানায় দেখেন ঠিক ওই লাইনটির “………নারীকে” শব্দটির আগের অংশটুকু যেটা উঁইপোকা খেয়েছে সেই অংশে লেখাসহ লেখাটি হবে, “দুইউছ (দুশ্চরিত্র) নারীকে বিবাহ করা হারাম।”
উঁইপোকায় খাওয়ায় লেখাটাকে মনে হয়েছিল, “………………….নারীকে বিবাহ করা হারাম।” মানে পুরো উল্টো মিনিং।
তারপরে তিনি মোল্লাকে বুঝিয়ে দিলেন, কেন অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্কর। তারপরে পুরো গ্রামকে শান্ত করলেন। সত্যিটা শেখালেন।
হ্যা, একজন আশরাফ আলি থানবি, বা একজন ইমাম গাজ্জালী, কিংবা একজন আহমদ হাম্বল, অথবা একজন ইমাম বুখারীর লেখা পুরো বই এরা কখনো পড়বে না। যাদের রেফারেন্স বিশ্বব্যাপী গৃহিত।
পাঁচ; টোকানো জ্ঞান:
ফেসবুক ও অসংখ্য সোস্যাল মিডিয়াতে পাওয়া যাওয়া (যে কোনো ধর্ম সংক্রান্ত) পোষ্টের একটা বড় অংশই শেয়ার, রি-শেয়ার হতে ছড়ানো। ওইগুলোর একটা বড় অংশই ফেক, বানোয়াট, মিথ্যা মেশানো, আরোপিত, ইনটেনশনাল ও প্রোপাগান্ডাসূচক। আমি বলছি না, স্পেসিফিক কোনো পোষ্ট এমন। আমি বলছি, ওরকম পোষ্টই প্রায় ৯৯ ভাগ।
ওই পোষ্টগুলো প্রকৃত বুজুর্গ আলেম, মুহাদ্দিস, মূফতি দ্বারা ভেরিফাইড তো নয়ই (ভেরিফাইড কী করে হবে? আলেমরা কি সারাক্ষন ফেসবুকে থাকেন?), কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অন্য ধর্মের কুচক্রীরা ওগুলো বানিয়ে ছড়ায় যার নেগেটিভ লক্ষ্য বিভিন্ন ধরনের। ইদানীংকালে দেখি ধর্মকে (যে কোনো ধর্মেই)
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানের অসংখ্য পোষ্ট অনলাইনে। আমি মনে করি, ধর্মকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি দিয়ে দেখাটাই ভুল। ধর্ম বিশ্বাস দিয়ে দেখার বিষয়। পবিত্র গ্রন্থকে বিজ্ঞানীদের আতশ কাঁচের নিচে পরীক্ষা করার দরকার নেই।
চাঁদে পানি আছে, নাকি নেই; সূর্য স্থীর, নাকি পৃথিবী-কুরআন তা বহু আগেই বলে ফেলেছে-এমন তুচ্ছ বিষয় দিয়ে কুরআনের মাহত্ম্য নতুন করে সৃষ্টির কিছু নেই। কুরআনের মাহত্ম্য আপনি বাড়াবার কে? যখন খোদ আল্লহ তার মাহত্ম্য বাড়িয়েই পাঠিয়েছেন। খোদার স্থান বিশ্বাসীর হৃদয়ে, কোনো বিজ্ঞান ল্যাবে নয়।
পাশাপাশি ধর্মীয় পোষ্ট দেবার আরেকটা দিক বলি। আমি সরল বিশ্বাসে আমার ধর্ম নিয়ে একটা পোষ্ট যদি দিই, তবে অন্য ধর্মেরও বিশ্বাসী কেউ তার ধর্মের একটা পোষ্ট দিতে পারে। দেখাদেখি ধর্ম বিশ্বাস করেনা-এমন একজন আবার তার বিশ্বাস নিয়ে একটা দেবে। আমি ধর্মবিশ্বাস ও না-বিশ্বাস কোনোটার পক্ষে বা বিপক্ষে যাচ্ছি না। বলছি, যে কেউ দিয়ে বসতে বা চাইতে পারে। তখন যেটা হয়, ওই পোষ্টগুলোর কোনো কোনোটা একে অপরের বিরোধী বা কনট্রাডিকটোরী।
ধরুন, অগ্নি পূজক কেউ অগ্নির কোনো স্তোত্র দিল। তখন আমার তো ভালো লাগবে না। আমি দেব দু’কলম বিরুদ্ধে লিখে (আমার দায়ীত্ব মনে করে)। এভাবে না চাইতেও ধর্মীয় বিদ্বেষ ও দাঙ্গা ছড়ায়।
বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, বাংলাদেশের বাস্তবতা, শিক্ষার লেভেল ও (জেনেশুনে) অনলাইনে থাকা বিরাট সংখ্যক ভূয়া পোষ্ট এড়াবার স্বার্থে ধর্মীয় পোষ্ট অনেক যাঁচাই ও বিশ্লেষন করে দিতে হয়। আমাদের মতো ইংরেজি শিক্ষিতদের পক্ষে এত সূক্ষ্ণ যাঁচাইয়ের সময় ও সুযোগ প্রায় নেই। আবারো বলছি, আমি ধর্মীয় পোষ্ট দেয়া বা না দেয়ার-কোনোটারই পক্ষে/বিপক্ষে নই। শুধু না জেনে বুঝে ধর্মকে ওপরে তুলবার প্রয়াসে আরো নামানোর বিরুদ্ধে।
পাঁচ; বিভেদের রাজনীতি আর জাতের বিচার:
মানুষে মানুষে ধর্ম, বর্ণ, গাত্ররং, জাতীয়তা, ভূগোল, জন্ম এসব নিয়ে বিভেদ আর হিংসা আমাদের মাননীয় রাজনীতিবীদরা ও বিশ্বনেতারা নিজ স্বার্থে জন্ম দিয়েছেন। তার তিক্ত ফল হিংসাত্মক কাজ ও অমানুষিক হিংস্রতা। যে আগুন তারা জ্বেলেছেন, তার লেলিহান শিখা গিলে খাচ্ছে সব। কানাডা হতে ভারত, বাংলাদেশ হতে আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড বা পাকিস্তান, ইরাক কিংবা শ্রীলঙ্কা। মুসলমান মানুষ আজ হিন্দু মানুষকে মারে। হিন্দু মানুষ আজ মুসলমান মানুষকে মারে। খ্রীষ্টান মানুষ আজ বৌদ্ধ মানুষকে মারে। বৌদ্ধ আজ মুসলমান মানুষকে মারে। ইহুদী মারে মুসলমানকে। খ্রীষ্টান মারে ইহুদীকে।
শুধু কেউ খেয়াল করে না,মানুষই মারছে মানুষকে।
মানুষ নাকি আবার আশরাফুল মাখলুকাত! রক্তাক্ত হয় না মানুষ। রক্তাক্ত হয় না কোনো বিশেষ ধর্মের মিনার।
রক্তাক্ত হয় মানবতার ঈশ্বর।
আমার এক পরিচীত (তথাকথিত) ভদ্রলোক তার ওয়ালে একবার লিখলেন, “বিধর্মীদের কখনো নিজের বন্ধু বানানো যাবে না। হ্যা, বিধর্মীদের সাথে এমন ব্যবহার করতে হবে, যাতে তারা আমাদের ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহন করে নেয়।”
শেষ অংশটি খুব দারুন কথা। প্রথম অংশটি অত্যন্ত আপত্তিকর।
মদীনা সনদ সাক্ষর করেছিলেন নবীজি। হুদায়বিয়ার সন্ধিও। উভয়টিই তিনি করেছিলেন, রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ শক্তিতে বলিয়ান থাকা অবস্থায়। ক্ষমতাশালী হওয়া স্বত্বেও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন অন্যধর্মীদের প্রতি। এখন আপনিই বলুন, আপনি কি নবীজির চেয়েও ইসলাম বেশি বুঝতে চান?
ইসলাম ধর্মের অনুসারী কারো মারা যাবার খবর পেলে আমরা সাথে সাথে নবীজির শেখানো আমল করি, বলি, “ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রজেঊঊন”। কাছের বা দূরের বিভিন্ন ফোরামে মাঝে মধ্যেই একটা জিনিস আমি দেখি। দেখি এবং ব্যথিত হই। কীভাবে কীভাবে যেন, আমাদের সমাজে একটা চর্চা খুব শক্তভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে। তা হল, অন্য ধর্মের কোনো মানুষ মারা যাবার খবর পেলে “ফি নারে জাহান্নামা খালেদ্বীন” এই বদদোয়া করা। যতটা দেখেছি, এর পেছনে সুনির্দিষ্ট আদেশ আছে বলে বলা হয়। আমি যেহেতু ধর্মীয় আলেম নই, তাই বিস্তারিত বলতে পারব না। তবে আমার জানামতে, নবীজি তার জীবদ্দশায় কখনো এই বাক্যটি উচ্চারন করে কোনো অন্যধর্মীর মৃত্যুতে বদদোয়া করেছেন (যা নাকি খোদার আদেশ) এমনটা কোথাও কখনো পড়িনি। তা
র নিজ চাচা আবু তালেব, যিনি শেষ পর্যন্ত কাফের অবস্থাতেই মারা যান, নবিজী সা. তার জন্য চোখের পানি ফেলেন এবং তার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দোয়া করেন। তো, নবীজি নিজে যেই কাজ করেননি, সেটা আমরা কীভাবে করছি? আমাদের তো কথা ছিল, নবীজি যা করবেন, সেটা সুন্নাত হিসেবে আমরা করব।
আচ্ছা, বলুন তো, আপনার এত বছরের জীবনে এ যাবত কতজন অন্যধর্মীকে আপনি আপনার ধর্মের দিকে দাওয়াত দিয়েছেন? আর তা যদি না করে থাকেন, তাহলে সে অন্যধর্মী অবস্থায় মারা গেলে আবার তাকে জাহান্নামে যাবার বদদোয়া করবেন কোন মুখে?
আমার এক সহকর্মী ঠাট্টাচ্ছলে মাঝে মধ্যে বলতেন, “কিছু কিছু মানুষ এমন ভাব করে, যেন তারা খালেদা জিয়ার চেয়েও বিএনপিকে বেশি ভালবাসেন।” কিছু কিছু অন্ধ লোকের অনলাইন কর্মকান্ডে, ভাবে মনে হয়, যেন তারা ইসলামকে মহান নবিজী হযরত মুহাম্মাদ সাঃ এর চেয়েও বেশি ভালবাসে। (যদিও তা সম্ভব না।) যদিও তাদের ৯৯% ইসলামের জন্য তায়েফে দাঁত শহীদ হতে দেয়া তো দূরে, ফজরের নামাজখানাও পড়ে বলে দৃষ্ট হয় না।
এরা ফেসবুকে দুটো কালেকটেড ছবি, লেখা, কোট দিয়েই হযরত বিলাল রা. হতে চায়, যিনি উত্তপ্ত বালুতে পুড়ে গিয়েও আহাদ আহাদ করতেন। কাউকে নোংরা ভাষায় প্রকাশ্যে বাজে আক্রমন করে নিজেকে হযরত আবু বকর রা. এর সমান দেখাতে চায়, যিনি সর্বস্ব ছেড়ে নবীর সাথে হিজরত করেন। কারো ওয়ালে বা নিজ ওয়ালে অন্য ধর্মাবলম্বিদের গালি দিয়ে হযরত আবু হোরায়রা রা. হতে চায়।
অন্যের ধর্মকে বা তাদের বিশ্বাসকে কতক্ষন অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে নিজেকে বখতিয়ার হিসেবে দেখাতে চায়।
ঠিক একই প্রক্রিয়াতে আবার বঙ্গ মাইনরিটির ফ্যানাটিকরা অন্য ধর্মকে নিয়ে নানারকম ট্রল করে নিজেকে রামকৃষ্ণ’র সমকক্ষ মনে করতে চায়। কেউ বনে যায় পোপের চেয়েও বড় ধার্মিক।
ধর্ম পৃথিবী কেন এসেছিল জানেন? বা মানুষ কখন ধর্মের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা শুরু করে জানেন? বলবেন, এ আবার কেমন কথা? খোদাই তো ধর্মকে ফেরেশতা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। তা সত্যি। তবে তার আরও একটু পটভূমিকা আছে, শুনুন।
জগতের সকল ধর্মকেন্দ্রীক মহাপুরুষ তাদের জীবনের একটা সময়ে তৎকালীন সমাজে নানা অনাচার, অবিচার, অধর্ম, অন্যায়, অমানবিকতা, অশান্তির প্রেক্ষিতে একটি সমাধান ও সমাধানের বিধানের খোঁজে নেমেছিলেন। আমাদের নবীজি হযরত মুহাম্মদ সা. তার যুবা বয়সে নিজ জাতি ও কওমের দুরবস্থার অবসানের পথ ও মানবজাতির মুক্তির পথ খুঁজতে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন হন। তারই পথ ধরে তার কাছে ওহী আসে। হ্যা, তার কাছে সেটা আসবারই ছিল। কিন্তু সেটার ওছিলা ছিল, একজন মহামানবের প্রয়োজনটা অনুভব করার হাত ধরে। কিন্তু সেই শান্তি, সমাধান, ভাতৃত্ববোধের জন্য আসা ধর্মই যদি হয় বিভেদের কারন, তার চেয়ে ব্যর্থতা আর কী হয়?
ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বঙ্গদেশের মানুষ প্রচন্ড কনফিউজড। সাধারনত বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতাকে নাস্তিকতা ও ধর্মহীনতার সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। কিছু না পড়ে, না বুঝে, না জেনে চিলের পেছনে পড়াটাতো এদেশে নতুন নয়।
একবার একজন আমার কাছে জানতে চাইলেন ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা। আমি তাকে বললাম, ভাইরে, সংজ্ঞা যাই হোক, যে যেমনটাই বুঝিয়ে থাকুক, আমার কাছে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি বা সমাজ বা রাষ্ট্র বিষয়টা অত্যন্ত পরিষ্কার। তা হল, ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রে সবাই সবার নিজ নিজ ধর্ম বা বিশ্বাস পালন করবে নির্বিঘ্নে। কেউ কারো ধর্ম পালনে বাঁধা সৃষ্টি করবে না। আবার কোনো একজনের ধর্ম পালন অন্য কারো ধর্ম পালনে বাঁধা সৃষ্টি করবে না। রাষ্ট্র তার সব নাগরিককে কোনো বিশেষ ধর্মের ভিত্তিতে আদর বা অবহেলা কোনোটাই করবে না, রাষ্ট্রশক্তি বা রাষ্ট্র নামক এশট্যাবলিশমেন্ট তার কোনো নাগরিককে ধর্ম পালন বা বিশেষ ধর্ম অনুসরনে বাধ্যও করবে না আবার বাঁধাও দেবে না। এর নাম ধর্মনিরপেক্ষতা। মোট কথা সকল ধর্মের মানুষ একটি রাষ্ট্রে সমান অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করবে-এটাই আমার জ্ঞানে ধর্মনিরপেক্ষতা।
অথবা বলা যায়, আজকের ভারতে বা পাকিস্তানে রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তিকে ব্যবহার করে দুটি আলাদা ধর্মের বাতাবরণে যে শশাঙ্ক রাজত্ব গোটা রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দৃশ্যমান হচ্ছে, তার অনুপস্থিতিই ধর্মনিরপেক্ষতা।
জানি না, কার্ল মার্কস কিংবা জাকির নায়েক সাহেবের মতো স্কলাররা এ বিষয়ে কী বলবেন।
”ধর্ম যার যার উৎসব সবার”-এই নিয়েও বঙ্গদেশে ব্যপক বাহাস হয়ে থাকে। যদিও এই বাহাস পুরোপুরি ফেসবুক নির্ভর। অনেকেই এই নীতির বিরোধীতা করে থাকেন। তাদের ভাষ্য হল, প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব মূলনীতি ও আচার আছে। অন্যের সাথে উৎসব শেয়ার করতে গিয়ে উদারতার নামে সেটাকে ভঙ্গ করা চলবে না। আমার মনে হয়, একটা ভুল বোঝাবুঝি এখানে কাজ করে।
উৎসব হল মানুষের আনন্দ, খুশি, সুখ, অর্জন উদযাপনের উপলক্ষ্য ও অনুষ্ঠানসমূহ। একটি আনন্দ অবশ্যই সবার সাথে শেয়ার করে নেয়া যায়। হ্যা, আমি মুসলিম হয়ে বলির মাংস খাব না-কারন আমার বিশ্বাসে জবেহ’র নিয়ত ও রীতি সেখানে রক্ষিত হয়নি, আবার একজন সনাতন আমার গৃহে এসে গোমাংস খাবেন না-কারন ওই মাংস তাদের কাছে পবিত্র, তাই খাওয়া নিষেধ। কালিমা, রোজা, নামাজ, পূজা, কোরবাণী, সাঙগ্রাই, চিবর দান ইত্যাদি হল সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় আইন ও আচার-যা অন্য ধর্মের লোকেরা শেয়ার করতে পারেন না। কিন্তু একটি উৎসবের সাথে একটি ধর্মীয় আচারের তুলনা করা নিরর্থক।
সামাজিক প্রানী হিসেবে একে অন্যের উৎসবে আনন্দ করা, সামাজিক সৌহার্দ্য বিনিময়, পারষ্পরিক শুভেচ্ছাজ্ঞাপন করার ভিতর দিয়ে উৎসবে অংশ নিলে নিশ্চই তার ধর্মীয় মূলনীতি বা আচার পালন করা হয়ে যায় না। ধর্মীয় আচার আর উৎসবে অংশ নেয়া এক নয়। এটুুকু সামাজিকতা করার কথাই বলা হয় ”ধর্ম যার যার উৎসব সবার” এই কথাটিতে। তবে যারা মনে করেন, অন্য কোনো ধর্মের মানুষ তো আমার ধর্মের কোনো প্রথা (বিশেষত ইবাদত ঘরানার) পালন করেন না, তাহলে শুধু আমরাই কেন?
অন্য কোনো ধর্মের মানুষ আপনার ধর্মের রীতি পালন করে না, লিবারেল হয় না-তাই আপনিও হবেন না-এটা শ্রেষ্ঠ ধর্মের দাবীর বিপরীত।
আপনি যদি কোনো ভাল কাজ করেন, সেটা নিজ গরজে করবেন। কেউ করে নাকি করে না-সেই তুলনা টানা কেন?
ছয়; ঈমান কি কচু পাতার পানি:
কেয়ামত নামক মহাপ্রলয়ের আগে এমন একটা অবস্থা আসবার কথা কিতাবসমূহে আছে, যখন ঈমান বজায় রাখা হাতের তালুতে জলন্ত কয়লা রাখার চেয়েও কঠিন হবে। কিন্তু সেতো গেল কেয়ামতের ঘটনা। আদিতে কেমন ছিল আমাদের পূর্বসুরীদের ঈমান?
একবার এক জেহাদ বা যুদ্ধের ঘটনা। একজন সাহাবী যুদ্ধের এক পর্যায়ে একজন অন্যধর্মীর ওপরে তলোয়ার উঠালেন। সেই ব্যক্তি সেই মুহূর্তে কালিমা বা ইমান আনয়নি বাক্য পড়লেন। সেই সাহাবী না থেমে তাকে মেরে ফেললেন। এই ঘটনা যখন নবিজীর কাছে জানানো হল, তিনি তাকে কঠোরভাবে তীরষ্কার করে জানতে চাইলেন, কালিমা পড়া স্বত্বেও তাকে কেন হত্যা করেছেন। সাহাবী জানালেন, সে তো প্রাণ বাঁচাতে কালিমা পড়েছে। সত্যি সত্যি পড়েনি। নবিজী তাকে বললেন, “তুমি কি তার অন্তরের ভিতরে ঢুকে দেখেছ? কীভাবে জানলে, সে সত্যিই আল্লাহর ভয়ে কালিমা পড়েনি?” (সংগৃহিত)।
আয়নাল হক নামের একজন আল্লহ’র ওলীর ঘটনা পড়তাম। তিনি খোদার প্রেমে এতটাই আশেক হয়ে গিয়েছিলেন, যে, এক পর্যায়ে তিনি সারাক্ষণ বলতেন, “আনাল হক্ক”। তো এরকম কুফরী কথা বলায় তাকে প্রথমে সতর্ক আর তারপর সভাসদদের কূমন্ত্রে এক সময়ে তার শিরোঃচ্ছেদ করান তৎকালীন খলিফা। তাকে হত্যা করার পরে দেখা গেল, তার মৃত শরীর হতে “আনাল হক্ক” শব্দ নিঃসৃত হচ্ছে। (সংগৃহিত)। ইমানের স্থান চোখে ও মুখে না, দ্বীলে। ক্বলবে।
ইসলামের প্রথম শহীদ কে জানেন? আমি যতটা জানি, তিনি হলেন, হযরত সুমাইয়া রা.। তাকে কীভাবে শহীদ করা হয় জানেন? ইসলাম গ্রহনের জন্য তাকে ভয়ানক অত্যাচার করে নিহত করা হয়। তাকে শেষতক বর্শা দিয়ে বিদ্ধ করে মারা হয়। তবু তার ইমান নষ্ট হয়নি। ইমান আনায় হযরত বিলালকে গলন্ত মরুবালুর ওপরে শুইয়ে রাখা হত। তিনি ইমানহারা হননি। একজন সাহাবীকে ইসলাম গ্রহনের জন্য প্রচন্ড অত্যাচার করা হচ্ছিল। তার করুন অবস্থা দেখে মহানবী সাঃ তাকে বললেন, তারা যখন অত্যাচার করে, তোমার মনে কী হয়? তিনি জানান, তারা আমাকে প্রাণটা ওষ্ঠাগত করে বলতে বলে আল্লহ নেই। আমার জান গেলেও তা করব না। নবিজী সা. তাকে বললেন, “যখন তোমার ঈমান এতটাই সুদৃঢ়, সুতরাং এরপর যখন ওরা তোমায় ওভাবে অত্যাচার করে বলতে বলবে, তুমি বলে দিও যে আল্লহ নেই।”
অথচ আমাদের দেশে মানুষ সামান্য প্যাঁচার পটারি দেখেই ইমানহারা হবার আতঙ্কে পড়ছে। ইমান এত সস্তা ঠুনকো মনে হয় আপনার কাছে? প্যাঁচার কাছে হাত জড়ো করে মঙ্গল চাইতে দেখেছেন কাউকে আজতক? শোভাযাত্রা আর প্রার্থনা শব্দদুটোর পার্থক্যও বাঙালী ধরতে পারে না?
সাত; চাপিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি আর ধর্মের খোলসে অধর্ম:
প্রতিদিন আমার কাছে যত সংখ্যক মেসেঞ্জার বার্তা আসে, তার একটা বড় অংশই অনলাইন হতে সংগৃহিত ধর্ম বা আধাধর্মীয় বাণী। আবার সেই প্রেরকদেরই দেখি, বিভিন্ন (আপাতঃ) আপত্তিকর সাইট তাদের লাইক কমেন্টে ভরপুর। আন্দাজ নয়, প্রমান আছে। এমনকি এমন এমন লোককেও আমি ফেসবুকে সূক্ষ্ণ ধর্মীয় বিষয়ে পোস্ট দিতে দেখেছি, যে থার্টি ফার্স্ট এ রঙীন তরলে মাতোয়ারা হয়ে থাকেন।
হ্যা, আমি মনে করি না, একজন আপাত পাপীর কোনো ধর্মীয় কথা বা বিধান নিয়ে কথা বলার অধিকার নেই। কিন্তু তবুও জিনিসটা একটু শ্রূতিকটূই বটে।
সেই গল্পটা জানেন তো? ওই যে, এক ব্যক্তি নবিজীর কাছে এসে অভিযোগ করলেন, যে, তার ছেলে প্রায়ই মিষ্টি খেতে চায়। সে দরিদ্র। রোজ মিষ্টি খেতে দেবার সামর্থ্য নেই। নবিজী তাকে এক সপ্তাহ পরে আসতে বললেন। এক সপ্তাহ পরে আসলে তিনি ওই ছেলেটিকে মিষ্টি খেতে চাইবার বায়না ও তাতে তার বাবা-মায়ের ওপর সৃষ্ট চাপের বিষয়ে তাকে উপদেশ দিলেন। যাবার আগে লোকটি এই এক সপ্তাহ দেরী করার কারন জানতে চাইলে তিনি জানান, যে, তিনি নিজে মিষ্টি খেতে পছন্দ করতেন। তো নিজে মিষ্টি খেয়ে অন্যকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেবেন? তাই এক সপ্তাহ সময় নিয়েছিলেন, নিজের খাদ্যতালিকা হতে মিষ্টিকে বাদ দিতে (শ্রূতলিখন)।
কী বুঝলেন? ধর্ম সবার আগে নিজের জীবনে বিশ্বাস করা আর বাস্তবায়নের বিষয়। সেটা না করে, নিজে সবরকম অপকর্মের সাথে জড়িত থেকে অনলাইনে অন্যকে ধর্মের সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ বিষয় নিয়ে সাইজ করার অভ্যাস ছাড়ুন। ধর্মের সুরক্ষা, ধর্মের মান রক্ষা, ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব, তার প্রবক্তা/প্রচারক/মহাপুরুষকে অবমাননার প্রতিবাদ করতে গিয়ে ইদানীং আমাদের বঙ্গসমাজে উৎকট/হিংস্র/নোংরা/স্ল্যাং অগ্রহনযোগ্য ভাষা/আচরনে কথা বলা ও আঘাত করার সংস্কৃতি প্রসারিত হচ্ছে। বিশ্বাস না হলে, বিগত কয়েক মাসের ফেসবুক দেখুন।
ধর্মকে অবমাননা করেছেন কেউ-এই (তথাকথিত) ধুঁয়া তুলে অনলাইনে বিভিন্ন মানুষের রিঅ্যাঅকশন একটু খতিয়ে দেখবেন। কোনো বিশেষ ধর্মের না। যেকোনো ধর্মের। বাংলাদেশে থাকায় হয়তো মাইনরিটির অমন রিএ্যাকশন আপনার কম চোখে পড়ে। কিন্তু তার মানে এই নয়, যে বিষয়টা মাইনরিটিরা করেন না। সবাইই করছেন।
কয়েকদিন আগেও শ্রীলঙ্কার বোমা হামলার প্রেক্ষিতে ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের নিয়ে একজন ফেসবুক ইউজার (তার নামটি অন্য ধর্মের সাক্ষ্যবাহী। ফেকও হতে পারে।) তীব্র বিষোদগার করেছেন। অন্তত ২০০ জন অন্যধর্মী তাকে আরো কঠোর ও হিংসাত্মক ভাষায় সমর্থন করেছেন। ধর্ম, ধর্মের কিতাব, ধর্মের মহাপুরুষ, ধর্মীয় বিধানের অবমাননা রোধকল্পে পাকিস্তান নামক দেশে ব্লাসফেমী নামে একটা আইন পর্যন্ত আছে। বাংলাদেশেও অমন একটি আইন করার জোরদার দাবী জনসমাজে আছে।
নিজ নিজ ধর্মের (তথাকথিত) অবমাননা কেউ করেছেন কি করেন নাই, (তার দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী), তাতেই ধর্মের মান রক্ষার্থে আমরা যেভাবে উন্মাদের মতো ঝাপিয়ে পড়ি, অবমাননাকারীর ১৭ পুরুষ উদ্ধার করি, দেশ অচল করে ফেলি, সেটা দেখে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, মক্কায় যখন নবিজীকে পাগল, উন্মাদ, যাদুকর বলে বদনামী করা হত (নাউযুবিল্লাহ), যখন মদীনাসহ গোটা মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন, তখনো যখন তাকে নিয়ে নানারকম অপপ্রচার, গালিগালাজ দেয়া হত, নবিজী সা. কতবার ধর্মের মান রক্ষার জন্য তাদের আঘাত করেছেন বা তাদের অভিশাপটুকুও দিয়েছেন?
ধর্মকে বা ধর্মের কিতাব বা নবীকে অবমাননা হতে রক্ষা করার আপনি কে? কে দিল আপনাকে এই রকম হিংস্র দায়ীত্ববোধ? আগুনে কুরআন পোড়েনি-এই পোস্টে সুবহানাল্লাহতে ভাসিয়ে দেন যারা, তাদের কাছে জানতে ইচ্ছে করে, কুরআনের মাহত্ম কি নতুন করে আপনি প্রতিষ্ঠা করার বাকি আছে? পৃথিবীতে (ও আখেরাতে) শান্তির জন্য ধর্মের আগমন। সেই ধর্ম’র সম্মান রক্ষার্থে সহিংস বাকযুদ্ধে নামার সম্পর্ক কীভাবে হয়?
কুরআন বা নবীজিকে অবমাননা নিয়ে আমাদের তীব্র হিংস্র প্রতিক্রিয়াতো আছেই। আজকাল মানুষ আল্লহকেও অবমাননা হতে বাঁচাতে চায়। কোন এক উন্মাদ ফেসবুকে এক ছবি দিয়ে বসল, কী, না, জুতার সোল/তলা বানানো হয়েছে আল্লহ’র নাম ছেপে। গেল গেল গেল, আল্লহকে এভাবে অবমাননা করল, ওর ফাঁসি চাই। কে দিল ভাই, আল্লহ’র সম্মান উদ্ধারে আপনাকে এই দায়ীত্ব?
বলবেন, না, আমার মহব্বতের স্রষ্টাকে নিয়ে কটূ কথা বললে, কাজ করলে, আমার মনে যদি আঘাত লাগে, আমি কি তাতে রিভল্টও করতে পারব না? পারবেন। অবশ্যই। সেটা হতে হবে ইন্টেলেকচুয়াল প্রতিবাদ, র্যাশনাল প্রতিক্রিয়া।
মনে পড়ে? আবরাহা বাদশা ক্বাবা ঘর ধ্বংস করতে এসেছিল। তারা এর খাদেম নবীজির দাদা আব্দুল মুত্তালিবকে ধরে নিয়ে ক্বাবা ঘর ধ্বংস করে দেবে মর্মে হুমকী দিল। তিনি নিঃশঙ্ক চিত্তে বললেন, “যিনি এই ঘরের মালিক, তিনিই রক্ষা করবেন।”
তো ভাই, আজকে আপনাকে কে দায়িত্ব দিল, আল্লহকে, তার নামের আরবী বানানকে, নবীকে, কুরআনকে অবমাননাকারীকে শাস্তি দেবার? হ্যা, একবার এক লোক নবীজির বিচার না মেনে হযরত ওমরের কাছে পুনঃর্বিচার চাইতে গেলে (অসমর্থিত সূত্র মতে) হযরত ওমর নবীজির অবমাননা ভেবে ওই লোককে কতল করেন। কিন্তু আপনি যদি একে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে নাঙা তলোয়ার বা চাপাতি হাতে কাফের বা নাস্তিক নিধনে নেমে পড়েন, নাইকীর জুতার শুকতলায় আল্লহ’র নাম কিংবা নবীজির মোহরের কল্পিত (ও প্রোপ্রাগান্ডায়িত) ছবি দেখে জিহাদে নামার ডাক দিতে চান, তবে আগে নিজেকে ওমর রা. এর মতো আশারায়ে মুবাশশারার পর্যায়ে উন্নীত করুন।
আট; বিশ্বাসের ধর্ম, চর্চার ধর্ম:
ইসলাম ধর্মের মূল ভিত্তি ৫টি। ঈমান, চ্ছলাত (নামাজ নয়), ঝাকাত (জাকাত নয়), সাওমে রামাদ্বন (রোজা নয়), হাজ্জ (হজ নয়)। আল্লহ, তার দেয়া আহকাম ও আরকান, তার রাসূলগণ, কিতাব, পরকাল, তাকদ্বীর বিশ্বাস করা বা ঈমান আনয়ন ইসলামে প্রবেশ ও স্থিতির মূল ভিত্তি। মহাবিশ্বের সমান পূণ্য কর্মও গৃহিত হবে না, যদি ব্যক্তির ঈমান না থাকে।
তারপরেই আসে ধর্মের রোসম বা আমল বা চর্চাগত দিক। এই আমল বা চর্চাগত দিকের দুটি দিক আছে।
আত্মিক/আধ্যাত্মিক বা বিশ্বাসগত কাজ যার ভিত্তি হল হক্কুল মওলা। এর ভিতরে আছে বিশুদ্ধ ধর্মীয় আমল বা ইবাদত।
আরেকটি অংশে আছে হক্কুল এবাদ বা বান্দার হক। এর ভিতরে বিয়ে, সংসার, শিক্ষা, ব্যবসা, রাষ্ট্র পরিচালনা হতে যাবতীয় পার্থিব কাজকর্মকে আল্লহ’র নির্দেশিত ও তার শেষ রাসূলের প্রদর্শিত ও চর্চিত নিয়মে পালন করা।
আমার কাছে মনে হয়, ধর্মের মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সেগমেন্ট ইমান, বিশ্বাস, নিয়ত ও আত্মশুদ্ধির চেয়ে প্রথা, আচার, লেনদেন ও রাষ্ট্রশক্তির ধর্মীয় অবয়ব ও জোর করে ধর্ম পালনে বাধ্য করাটাকে আমরা বেশি বেশি ধর্ম মনে করছি।
এই অন্ধ ধারনা, রক্ষণশীল গোষ্ঠী যে শুধু মুসলিম প্রধান বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আরো অন্যান্য দেশে আছে, তাই না।
ভারত, যাকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র, সেখানেও আজ ধর্মীয় বিভেদ ও জাতিগত বিভেদ প্রকট। ধর্মের নামে নাগরিক ও জনগোষ্ঠীকে ত্রিধাবিভক্ত করে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবার ও টিকে থাকার জন্য রাজনীতিকরা ধর্মের বিষবাষ্প প্রোথিত করেছেন গোটা দেশে। এই বিভেদ বহু পুরোনো হলেও তাকে রাষ্ট্রীয় চেহারা দেয়া হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। শুধু ধর্মের নামটা ভিন্ন। অবয়ব ও চরিত্র একই।
আবার শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বেই বাড়ছে উগ্রপন্থা ও রক্ষণশীল মানসিকতা। কি ব্যক্তিজীবনে, কি রাষ্ট্রীয় জীবনে। কি এশিয়াতে, কি ইউরোপে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেক্যুলার দাবিকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে এখনও ভোটে জেতার বড় হাতিয়ার ধর্ম।
এই লেখাটি যেদিন লিখতে বসি, তার কিছুদিন আগেই আমার কোনো এক লেখায় কোনো এক উযবুকের মন্তব্যে আমার একজন বিজ্ঞ সুহৃদ রিজভান হাসান কিছু কথা বলেছিলেন। এই লেখাটির সাথে সংশ্লেষ থাকায় তার সেই লেখার কিছু অংশ (যা কিছুটা তার নিজের, কিছুটা সংগৃহিত) এখানে উল্লেখ করছি।
[ইসলামিক দেশগুলি কতখানি ইসলামিক এই নিয়ে গবেষণা করেন জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হুসেন আসকারী। ইসলাম ধর্মে রাষ্ট্র ও সমাজ চলার যে বিধান দেয়া হয়েছে তা যে দেশগুলি প্রতিদিনের জীবনে মেনে চলে তা খুঁজতে যেয়ে দেখা গেলো, যারা সত্যিকার ভাবে ইসলামিক বিধানে চলে তারা কেউ রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিম দেশ নয়।
স্টাডিতে দেখা গেছে সবচেয়ে ইসলামিক বিধান মেনে চলা দেশ হচ্ছে আয়ারল্যান্ড এবং দ্বিতীয় অবস্থানে লুক্সেমবার্গ। তারপর এসেছে পর্য্যায়ক্রমে নিউজিল্যান্ড, আইসল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ষষ্ঠ ও কানাডা সপ্তম অবস্থানে। মালয়েশিয়া ৩৮ তম, কুয়েত ৪৮ তম, বাহরাইন ৬৪ তম, এবং অবাক করা কান্ড সৌদি আরব ১৩১ তম অবস্থানে।
গ্লোবাল ইকোনমি জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বাংলাদেশের অবস্থান সৌদীদেরও নীচে। গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলমানরা নামাজ, রোজা, সুন্নাহ, কোরআন, হাদিস, হিজাব, দাড়ি, লেবাস নিয়ে অতি সতর্ক কিন্তু রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে ইসলামের ইথিকসের বিধান মেনে চলেনা।
মুসলমানরা পৃথিবীর সবার চেয়ে বেশি ধর্মীয় বয়ান,ওয়াজ নসিহত শোনে কিন্তু কোন মুসলিম দেশ পৃথিবীর সেরা রাষ্ট্র হতে পারেনি। অথচ গত ষাট বছরে মুসলমানরা অন্ততঃ ৩০০০ বার জুমুয়ার খুতবা শুনেছে। একজন বিধর্মী চাইনিজ ব্যবসায়ী বলেছেন, মুসলমান ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছে এসে দুই নম্বর নকল জিনিস বানানোর অর্ডার দিয়ে বলে, অমুক বিখ্যাত কোম্পানির লেবেল লাগাবেন। পরে যখন তাদেরকে বলি আমাদের সাথে খানা খান, তখন তাঁরা বলেন, হালাল না, তাই খাবোনা। তাহলে নকল মাল বিক্রি করা কি হালাল?
একজন জাপানি নব্য মুসলিম বলেছেন, আমি পশ্চিমা দেশগুলিতে অমুসলিমদের ইসলামের বিধান পালন করতে দেখি, আর পূর্বের দেশগুলিতে ইসলাম দেখি কিন্তু কোন মুসলিম দেখিনা। আলহামদুলিল্লাহ, আমি আগেই ইসলাম এবং মুসলমানদের পার্থক্য বুঝেই আল্লাহর ধর্ম গ্রহন করেছি। ইসলাম ধর্ম শুধু নামাজ রোজা নয়, এটি একটি জীবন বিধান এবং অন্যের সাথে মোয়ামালাত আর মোয়াশারাতের বিষয়।
একজন নামাজ রোজা পড়া আর কপালে দাগওয়ালা মানুষও আল্লাহর চোখে একজন মোনাফেক হতে পারে। নবী (সাঃ) বলেছেন, “আসল সর্বহারা আর রিক্ত মানুষ হচ্ছে তারা, যারা কেয়ামতের দিন রোজা, নামাজ, অনেক হজ্জ্ব, দান খয়রাত নিয়ে হাজির হবে কিন্তু দুর্নীতি করে সম্পদ দখল, অন্যদের হক না দেয়া, মানুষের উপর অত্যাচারের কারণে রিক্ত হস্তে জাহান্নামে যাবে।”
ইসলামের দুটি অংশ, একটি হচ্ছে বিশ্বাসের প্রকাশ্য ঘোষণা যাকে ‘ঈমান’ বলা হয়, আর একটি হচ্ছে বিশ্বাসের অন্তর্গত বিষয় যাকে ‘এহসান’ বলা হয়, যা ন্যায়গতভাবে সঠিক সামাজিক নিয়ম কানুন মেনে চলার মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়। দুটোকে একত্রে প্র্যাকটিস না করলে ইসলাম অসম্পূর্ন থেকে যায় যা প্রতিটি নামের মুসলমান দেশে হচ্ছে। ধর্মীয় বিধি নিষেধ মানা যার যার ব্যক্তিগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং এটি আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার বিষয়। কিন্তু সামাজিক বিধি নিষেধ মেনে চলা একজন বান্দার সাথে অন্য বান্দার মধ্যকার বিষয়। অন্য কথায় ইসলামিক নীতিমালা যদি মুসলমানরা নিজেদের জীবনে ব্যবহারিক প্রয়োগ না করে, মুসলিম সমাজ দুর্নীতিতে ছেয়ে যাবে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ হবে অসম্মানজনক।
লর্ড বার্নার্ড’ শ একবার বলেছিলেন, “ইসলাম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ ধর্ম এবং মুসলমানরা হচ্ছে সর্ব নিকৃষ্ট অনুসারী।”]
নয়; নিজে মানার ধর্ম:
যারা এতক্ষণ ধরে লেখাটি পড়ে মনে করছেন, লোকটা এতক্ষণ ধরে ধর্মের নামে বিষোদগার করে গেছে, তারা জেনে রাখুন, ধর্মের স্থান ব্যক্তির হৃদয়ে। আল্লহ’র সাথে তার বান্দার সম্পর্ক একান্ত গোপনে। আমার ঈমান নিয়ে আমি সন্দিহান নই। আপনিও নিশ্চিত থাকুন।
আমার লক্ষ্য ধর্ম নয়। ধর্ম নিয়ে অতিশায়ন, মাছের গায়ে আল্লহ’র নামাঙ্কিত ছবিতে খোদার মাহত্ম বর্ননার মতো অপদার্থতা, ধর্মীয় জ্ঞান ও কুরআন/হাদিসের ভুল ব্যখ্যা, অন্যের ওপর, অন্য ধর্মের ওপর নিজ ধর্মের কর্তৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব আরোপ করার ভুল চেষ্টার বিরুদ্ধে।
আগে নিজেকে শুদ্ধ করুন। আপনার যেই ধর্মান্ত হৃদয়, আপনার যেই ইমানের জোর আপনাকে ফজরের নামাজে ঘুম থেকে জাগাতে পারে না, তা নিয়ে অন্যকে নসিহত করতে যাওয়া অন্যায়।
জোর করে ধর্ম পালনে বাধ্য করা বা চাপিয়ে দেবার সুযোগ যদি ইসলাম সমর্থনই করত, তবে নবিজী অবশ্যই তা করার মতো আধ্যাত্মিক ও জাগতিক-সবরকম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তিনি তা কখনোই করেননি। বরং খোদার প্রতি মানুষকে তিনি শরীরের রক্ত ঝরিয়ে ডেকেছেন, পেটে পাথর বেঁধে ডেকেছেন। মদীনা কেন্দ্রীক অর্ধ দুনিয়ার শাসক হবার পরেও কাউকে সামান্যতম জোর করেননি।
ইসলাম একটি সমন্বিত সূক্ষ ও স্পর্শকাতর ধর্ম। পুরো ইসলামী শরিয়ত দাড়িয়ে আছে ব্যক্তির নিয়তের ওপরে। ইসলাম সেই ধর্ম, যেখানে একই কাজ যুগপতভাবে পাপ ও পূন্য দুটোই হতে পারে। দান করা পূন্য। কিন্তু সেই একই দান যদি লোক দেখানো বা সুনামের আশায় করে, সেটাই আবার পাপ। আবার মিথ্যা বলা পাপ। কিন্তু কেউ যদি প্রাণ বাঁচাতে মিথ্যা বলে, সেই মিথ্যা পাপ না।
ইসলাম ও ইসলামী জীবন আমাদের ধারনার মতো এত সস্তা না, ইসলাম স্রেফ রুসম নির্ভর কোনো ধর্ম নয়। কে যেন একবার লিখেছিল, ইসলামি রাষ্ট্র ও কুরআনের শাসন সবাই চায়। কিন্তু শুধু নামাজ পড়তে ডাকলেই ”আমার প্যান্টে সমস্যা আছে।”
বঙ্গীয় একদল ফেসবুক কেন্দ্রীক ভন্ড ধার্মিক মনে করে অষ্টপ্রহর ‘নারী’ কে শালিন পোষাক পড়ার নসিহত করাও এবাদত। আমি যতটা জানি, বিধানমতে, প্যান্ট, শার্ট, জাঙিয়া, শু, কেডস, সানগ্লাস-এসব বিজাতীয় পোষাক পড়া সূক্ষ্ণ ইসলামী বিধানমতে নিষিদ্ধ। ফেসবুকও, কারন ওটা অন্যধর্মীদের আবিষ্কার এবং তাদের কালচার। তো ওসব পোষাক পরে নিষিদ্ধ ফেসবুকে একা নারীকে বিধান মানার নসিহত করলে কী করে হবে?
করবেন যখন, নিজে আগে করুন। এবং, নসিহতে দুপক্ষকেই করতে বলুন। তাহলেই সেটা কাজের হবে। আপনি টিভিতে হারাম খেলা আইপিএল দেখতে দেখতে, তথাকথিত ‘বিধর্মীদের’ পোষাক পরিহীত অবস্থায়, রেস্তোরায় নাপাক বাবুর্চির হাতে বানানো ও হারাম পন্থায় জবাইকৃত মুরগী দিয়ে বানানো ফ্রাই চিবোতে চিবোতে. বিধর্মীদের আচার (বেদাত) ফেসবুকে সংগৃহিত একটা সস্তা কনটেন্ট আঙুলের এক ঘষায় শেয়ার দিয়েই ভাবছেন, হযরত আবু বকর কিংবা হযরত ওমরের মতো মুসলিম হয়ে গেলেন, তাহলে এবার আমি আপনাকে বলি,
“কুরআন, হাদিস, ইজমা, কিয়াসের কিতাব ও শুদ্ধ ইসলামী ইতিহাস, গোটা বিশ্বের সবরকম ধর্মগ্রন্থ, গোটা বিশ্বের সবরকম জ্ঞানীদের বই আগে নিজে পড়ুন।”
#religion #fanatic #agnosticism #belief #liberalism #state #worldpolitics #permissive #devidednation #Extremeism #ReligiousFanatism