আমি প্রায়ই আমার কাছের মানুষদেরকে একটা কথা খুব গর্ব ভরে বলি। সেটা হল “ক্লাস এইট পাশ করার পরে আমি কখনো ক্লাসে যাইনি।” আক্ষরিকভাবেই আমি ক্লাস করিনি। মাস্টার্স করা পর্যন্ত। স্রেফ স্কুল ও ক্লাসে আমার দমবন্ধ লাগত, তাই। আমার সন্তান থাকলে আমি তাকেও স্কুলেই পাঠাতাম না। শুনে আমার সহকর্মী ও বন্ধুরা হাসে। এখনকার সময়ের বাচ্চাদের জন্য আমার একটাই ভাবনা হয়। মাত্রাতিরিক্ত বই, ক্লাস, পড়ার চাপ, কোচিং, পরীক্ষার চাপে তাদের শৈশব ধ্বংস হচ্ছে।
শিশুদের নিয়ে একটি লেখা অনেকদিন থেকেই প্ল্যান করছিলাম। নানা কারনেই লিখে উঠতে পারিনি। ভেতর হতে একটা তাড়া অনুভব করছিলাম। ২৩ ফেব্রূয়ারী রাত জেগে শেষতক লিখে ফেললাম। পাঠকবৃন্দ একটু কষ্ট করে পড়লে খুশি হব।
একটি শিশুর বাবা-মা হওয়া নিশ্চই একজন বিবাহিত নর ও নারীর জীবনের পরমতম পাওয়া। বাবা ও মা হবার অনুভূতি কেমন সেটির কোনো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমাদের দু’জনের নেই। কিন্তু বাবা-মা হবার দায় ও জ্বালা যে কেমন সেটি আমি খুব ভাল করেই জানি। সন্তান জন্মদানের পরে অনেক নারী ও পুরুষকেই আমি তাদের জীবনের বাঁক ঘুরে যাবার দৃষ্টান্ত দেখেছি। কিন্তু অতিরিক্ত স্নেহ ও আদর তাদের যেমন উচ্ছন্নে যেতে বাধ্য করছে তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে সন্তানকে অতিরিক্ত শাসনে রাখাও তাদের সর্বনাশ করছে।
খুব ছোটবেলা হতেই দেখে আসছি, বাবা-মা সন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে মানুষ করার উপরেই জীবনের সর্বাধিক জোর দিতেন। অভিভাবকরা তখন মনে করতেন, যেকোনো প্রকারে সন্তান শিক্ষিত হতে পারলে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় দায়ীত্বটি পালন করা হবে। আজও বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি সন্তানকে শিক্ষিত করা। কিন্তু পরিবর্তন এসেছে দৃষ্টিভঙ্গিতে। পড়াশোনার মূল লক্ষ্য এখন হয়ে গেছে সার্টিফিকেট অর্জন। যেকোনো প্রকারে ভাল রেজাল্ট বা সিজিপিএ তুলে ক্লাস ডিঙোনোই এখন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের একমাত্র ব্রত। তারই ধারাবাহিকতায় পিতামাতা কর্তৃক ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কেনার জোগ্নাল সমিতি ও ফান্ড গঠনের ঘটনাও ঘটছে।
আগে স্কুল ছিল মানুষ গড়ার কেন্দ্র। আমাদের জীবনের প্রাথমিক ও মৌলিক শিক্ষা আমরা পেতাম পরিবারে। যৌথ পরিবার ভেঙে যেতে থাকায় পরিবার কেন্দ্রীক শিক্ষা ব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। একমাত্র ভরসাস্থল স্কুল। অথচ আমাদের স্কুলগুলো এখন শিক্ষা বিক্রীর বানিজ্যকেন্দ্র। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন কিছু মানুষের জীবন, জীবিকা ও ব্যবসার কেন্দ্র। বাচ্চারা স্কুলের গাদা গাদা বই, হোমওয়ার্ক, ক্লাস পরীক্ষা, সাময়িক পরীক্ষা, প্রোজেক্ট, কোচিং, গান, নাচ, আঁকা, আরবী শিক্ষার ক্লাস, বাসার পড়া, পরীক্ষার এক্সট্রা প্রস্তুতি-এত এত চাপে দিনে দিনে শিক্ষার্থী হতে ভারবাহী গাধায় পরিনত হচ্ছে।
বাবা-মা’র জীবনের অপূর্ণতা সন্তানের জীবন দিয়ে হাসিল করার উগ্র দুরাশাই এর পেছনে দায়ী। মাত্র ২ বছর বয়স হলেই বাবা-মা শুরু করে দেয় শিশুদের বিদ্যা গেলানো। স্কুলে ভর্তি হতে হবে যে। বাচ্চাটি তার জীবনে মাত্র ২টি বছর বাবা-মাকে একান্ত করে পেল। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, একটি মানব সন্তানকে তার ৭ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত স্কুলে দেয়া উচিৎ নয়। জীবনের প্রথম ৬-৭টি বছর নিজের শৈশবকে নিরঙ্কূশভাবে উপভোগ করা তার অধিকার। আপনি যদি তাকে দিগ্গজ পন্ডিত বানাতে অতি অল্প বয়সে স্কুলে পাঠিয়ে দেন তাহলে সে শুধু আপনার কাঙ্খিত বিদ্যাই শিখবে না। সাথে সাথে সে অনেক অবিদ্যা ও অতিবিদ্যাও শিখবে।
মনে রাখবেন, কলা কিনলে শুধু কলা কেনা যায়না। তার সাথে খোসাটাও কিনতে হয়। তেমনি আপনি নির্দিষ্ট একটি কালচার, ট্রেন্ড নিজের জন্য বেছে নিলে তার সাইড এফেক্টও সাথে করে বাসায় চলে আসবে। বাচ্চার ওজনের চেয়ে বইয়ের ওজন বেশি। ব্যাপারটা এতটাই মারাত্মক পর্যায়ে গেছে যে, কোর্ট হতে ডিক্রী জারি করতে হয়েছে বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগের ওজন নির্ধারন করতে।
দিগগজ হবার দৌড়ে হারিয়ে যাচ্ছে, চুরি যাচ্ছে শিশুদের শৈশব। তারা জীবনকে দেখছে বই ও ট্যাবের স্ক্রীনে। নিজস্বতা ও মানবীয় মূল্যবোধ তাদের মন মগজে প্রোথিত করার কোনো ব্যাবস্থাই আর বেঁচে নেই।
বই হতে, ক্লাস হতে, স্কুল হতে, পরিবার হতে নৈতিক, মানবিক, সামাজিক শিক্ষা তো একপ্রকার উঠেই গেছে। তার সাথে যোগ হয়েছে স্মার্টফোন, ট্যাব, ইন্টারনেট, ফেসবুক, নানারকম সোস্যাল মিডিয়া, ড্রাগ, গ্যাং, সামাজিক দুষন। তার কুপ্রভাবে আমাদের শিশুরা স্রেফ অসামাজিক, অমানবিক, সৃষ্টিশীলতাহীন ও বোধহীন এক প্রাণীতে রূপান্তরিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সামাজিক দুষণের প্রভাবে বাবা-মাও হচ্ছেন দুষিত। সন্তানের সামনে আদর্শ স্থাপনের মতো কোনো দৃষ্টান্ত তারা রেখে যেতে পারছেন না।
প্রত্যেক বাবা-মায়ের লক্ষ্য এখন সন্তানকে দামী স্কুলে পড়ানো, ক্লাসে ফার্স্ট বানানো, সিজিপিএ-৫ পাওয়ানো, তাদের জন্য বিশাল ব্যাংক ব্যালেন্স রেখে যাওয়া, ঢাকার বুকে এক টুকরা বাড়ি রেখে যাওয়া। সেটা অর্জন করতে গিয়ে বাবা-মা উদয়াস্ত টাকা ও টিচারের পিছে ছুটছেন। কোন পথে টাকা আসছে, ডিগ্রী আসছে-সেটা আর মনে থাকছে না। বাচ্চার অর্জিত ডিগ্রীগুলোর বিপরীতে তাদের মানসিক ও মানবিক সমৃদ্ধি কতটা হচ্ছে তা আর মনে রাখতে পারছেনা না। তার উপর প্রশ্ন ফাঁস, নকল, গোঁজামিলের কোর্স কারিকুলাম, হাস্যকর আদিম শিক্ষা পদ্ধতি, অদক্ষ আদর্শহীন শিক্ষকের পাল্লায় পড়ে তারা এমনকি মৌলিক একাডেমিক শিক্ষায়ও থেকে যাচ্ছে মাকাল ফল। সামান্য দুই দু গুনে চারের গুনও তারা এখন ক্যালকুলেটর ছাড়া পারে না। “I am GPA-5” এর ভিডিওটা দেখেছেনই।
বাবা-মা টাকা, চাকরী, ব্যবসা, সোসাইটি, সোস্যাল মিডিয়া, বিশেষত বাবারা তাদের অফিস ও বন্ধুবান্ধবের আড্ডা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সন্তান তার বাবা-মাকে পাচ্ছে না। আমি প্রচুর পরিণত সংসারের পুরুষদের (এমনকি নারীদের) চিনি যারা সাতসকালে অফিসের জন্য বেরিয়ে গভীর রাতে বাসায় ফেরেন। অফিসের পরে বন্ধুবান্ধব বা কলিগদের নিয়ে সময় কাটান। কখনো কখনো চাকরীর ন্যাচারের কারনে না চাইলেও বাবা বা মা ঘরে ফেরেন সন্তানের ঘুমের সময়ে। ফলে শিশুরা তাদের বাবা-মাকে কাছে পায় না। সন্তান সারাক্ষন যদি থাকে বাইরে, সন্তান থাকে বুয়ার কাছে, সন্তান থাকে ক্লাসে, কোচিং এ, পরীক্ষার করাতের নিচে, তাহলে সেই বাবা-মায়ের সাথে সন্তানের কেমন সম্পর্ক গড়ে উঠবে?
শৈশব হতেই তো বাবা-মা’র সাথে সন্তানের বিচ্ছেদ তৈরী হচ্ছে। যেসব বাবা-মা অভিযোগ করেন, শিশুরা কথা শোনে না, অবাধ্য-তারা একবারও ভেবেছেন কি-শিশুরা কেন অমন হচ্ছে? অবাধে মোবাইল, ইন্টারনেট, ট্যাব, হাতখরচ, রঙিন জগতের মুক্ত ব্যবহার-শিশুদের মগজটাকে চিবিয়ে খাচ্ছে। বাংলাদেশের বিশেষত ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরের বড় সংখ্যক দামী স্কুলের শিশুদের পর্ণ আসক্তি নিয়ে কিছুদিন আগে একটা রিপোর্ট হয়েছিল। একটু বয়সী শিশুরা নানা অপরাধে জড়িয়ে এমনকি খুনের মতো অপরাধে যুক্ত হবার ঘটনা ঘটছে। আমি প্রায়ই অফিসে যাবার পথে দেখি সকাল ৯টা ১০টায় পার্কে, নিরিবিলি স্থানে, হাউজিং এর বেড়াবার যায়গাগুলোতে স্কুল ইউনিফর্ম পড়া বাচ্চারা জোড়া বেঁধে প্রেম করছে। ক্লাস ৬-৭-৮ এর বাচ্চাদের স্কুলের বাইরে বা রাস্তায় সিগারেট হাতে দেখা তো আকছার।
শিশুরা যদি এমন মড়কের শিকার হয়, তবে কেমন হবে আমাদের ভবিষ্যত বাংলাদেশ? কারা চালাবেন আমাদের দেশ? আমরা কীভাবে স্নেহ, দায়ীত্ববোধ ও মমত্বের নামে শিশুদের ধ্বংস করছি শুনুন:
১.মাত্রাতিরিক্ত স্কুল, ক্লাস, পড়ার চাপ, পরীক্ষা, হোমওয়ার্ক, রেজাল্টের চাপ শিশুদের বোধ, বুদ্ধি, সৃষ্টিশীলতার বিকাশকে নষ্ট করছে।
২.প্রতিটি শিশু তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। সে যেই বিষয়ের যোগ্য তার বিপরীত স্বত্ত্বা নিয়ে এগোতে বাধ্য হচ্ছে সে-স্রেফ বাবা-মায়ের জেদ ও ভুল দৃষ্টিভঙ্গির কারনে।
৩.নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা হতে দুরে থেকে তারা একধরনের অসার ডিগ্রী নিয়ে ক্লাস ডিঙোচ্ছে। ফলাফল-I am GPA-5।
৪.আমাদের সন্তানদের ভেতরে ভবিষ্যতের নেতা, ভবিষ্যতের নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, হুমায়ুন, জয়নুল কিংবা একজন আব্বাস উদ্দীন তৈরী হচ্ছে না। গোটা দেশে গাদা গাদা জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী। কিন্তু একজন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ জন্ম নিচ্ছেন না।
৫.বর্তমান সময়ে আমি খুব কমসংখ্যক পরিবারেই দেখি সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা বিশেষত ধর্মীয় শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করতে। ফলে বেশিরভাগ পরিবারে শিশুরা বড় হচ্ছে একরকম না-ধার্মিক, না-বিধার্মীক শিক্ষায়। বড় হয়ে কেউ হচ্ছে ধর্মান্ধ, কেউ হচ্ছে ধর্ম বিদ্বেষী। সত্যিকারে ধর্মীয় শিক্ষার আলো নিয়ে বড় হচ্ছে না তারা। ফলে বড় হবার পর তাদেরকে যতই নীতিকথা শোনানো হবে, সেটা থোরাই কানে যাবে।
৬.কিছু কিছু পরিবারে সন্তানকে অতিরিক্ত আদর, যত্ন, সুবিধা, অর্থ, আহ্লাদে মানুষ করা হয়। সন্তানের যেকোনো আবদার মেটাতে একপায়ে খাড়া পিতামাতা। শিশুটিকে শাসন দূরে থাক, তার সামান্যতম কষ্ট যাতে না হয়, তার কোনো আবদার যাতে অপূর্ন না থাকে সেটা নিশ্চিৎ করতে বাবা-মা ব্যস্ত। সন্তানকে অঢেল পয়সা, হাতখরচ, হিসাবহীন খরচ, অপচয়, বিলাস ব্যবস্থা করে দিতে বাবা-মা সদা উদগ্রীব। শাসনের অভাবে সন্তানরা বিপথে যাচ্ছে। আজকাল প্রায়ই শুনি, বাচ্চাদের শাসন করতে নেই, তাদের শুধু বুঝিয়ে বলতে হবে, আদর দিয়ে মানুষ করতে হবে-ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের বাবা-মায়েরা যেন আমাদের মানুষ করেননি। শাসন ও আদর এর যুগপত প্রয়োগের বদলে কেন যেন অতিরিক্ত আহ্লাদকে আমরা প্রোমোট করছি বলে আমার মনে হয়। ফলে উদ্ধত, একগুঁয়ে, আপোষহীন, বেহিসাবী আচরনকে সঠিক জেনে বড় হচ্ছে শিশুরা।
৭.অর্থকড়ির পেছনে ছুটতে থাকায় সন্তানরা বড় হয় বাসার কাজের বুয়ার কাছে (আমি কাজের বুয়াদের অসম্মান করছি না)। স্কুলে তারা কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে ঘুরছে, কী খাচ্ছে, কোথায় পয়সা খরচ করছে কেউ দেখার নেই। অবাধ স্বাধীনতা ও মনিটরিং এর অভাবে শিশুরা একদিকে অভিমানী ও জেদী হয়ে বড় হচ্ছে, অন্যদিকে তারা বিপথে যাবার সবরকম অপসুযোগ নিচ্ছে।
৮.ডায়েট ও পুষ্টির নামে নানারকম ফুড সাপ্লিমেন্ট, ড্রিংকস, জাংক ফুড, দুষিত পরিবেশ-সব মিলিয়ে এমনকি শারিরীকভাবে সুস্থ্য ও সুস্বাস্থ্যবান একটি প্রজন্ম হতেও আমরা সরে যাচ্ছি। আমাদের শিশুরা তাদের অশিক্ষিত ও বেওকুফ অভিভাবকদের অজ্ঞতার কারনে বড় হচ্ছে শারিরীকভাবে দুর্বল, অসুস্থ্য ও ভগ্নস্বাস্থ্যসম্পন্ন হয়ে। পাশাপাশি প্রবল পরিবেশ দুষন এবং ভেজাল ও জাংক ফুড প্রীতি আমাদের শিশুদের দুর্বল ও রোগাক্রান্ত এবং মেধাহীন প্রজন্মে পরিনত করছে।
৯.স্কুল বা বাড়িতে খেলাধুলার অভাব, সময়ের অভাব, অতিরিক্তমাত্রায় ট্যাব ও কম্পিউটারে আসক্তি শিশুদের ফার্মের মুরগীতে পরিনত করছে।
১০.সিনেমা, টিভি, রেডিও, ইন্টারনেটে সেন্সরবিহীন প্রবেশাধিকার, শিশুদের উপযোগী আইটেমের অভাব শিশুদের অকালেই এডাল্ট (আসলে ইচড়ে পাকা) করে দিচ্ছে। শিশুরা ম্যাচিওরড হবার আগেই অভিজ্ঞ হচ্ছে বড়দের কনটেন্টে। সিনেমা টিভির অনুষ্ঠানগুলো শিশুদের মানুষ না করে অমানুষ ও অনিয়ন্ত্রিত ’বড় মানুষ’ করে দিচ্ছে। অকালে। নোংরা, উদ্ভট, মিথ্যায় ভরা, চটকদার কুৎসিত এ্যাড ভরা বাংলাদেশি চ্যানেল খুললেই টিভিটা আছাড় মারতে ইচ্ছে করে। আমাদের দেড়টা প্রজন্মতো অলরেডি পঁচে গেছে। হরলিক্স কমপ্লান খেয়ে যদি বাচ্চা তরতর করে টেমপো বাড়িয়ে বুলেট গতিতে বড় হয় আর ট্যাবের কল্যানে নরনারির সবকিছু মগজে নিয়ে নেয় তাহলেতো একবছরের ইচড়ে পাকারা বাপ মার কাছে লিভ…….এর আবদার করবে।
১১.আামাদের শিশুরা বড় হচেছ ভয়ানক রকম ইতিহাস বিকৃতির ভেতর দিয়ে। বাংলা ও বাঙালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, নিজস্বতার কোনো পাঠ না পেয়ে বিজাতীয় ও পরদেশী সংস্কৃতিকে আপন জেনে অবাঙালী এক দো-আঁশ সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছে তারা।
১২.আমার কাছে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের দেশের বিরাট সংখ্যক বাবা-মা ই নিজেরা বাবা-মা হিসেবে ম্যাচিওরড নন। বাবা-মা হবার কাবেলিয়াত অর্জনের আগেই তারা বাবা-মা হয়ে বসে থাকেন। ফলে কীভাবে সন্তানকে মানুষ করতে হবে-সেটা তারা নিজেরাই জানেন না। ফলাফল, সন্তানকে হাতে ধরে নষ্ট করা। শুরুতেই বলেছিলাম, একটি শিশুর বাবা-মা হবার প্রত্যক্ষ অনুভুতি না থাকলেও তাদের নষ্ট হবার হাজারটা রাস্তা আমি অন্তত জানি। বাবা-মায়ের হাতে শৈশব চুরি যাওয়া এসব শিশুদের জন্য আমি সত্যিই খুব কষ্ট অনুভব করি। অত্যন্ত ক্রান্তিকালে তাদের জন্ম। নানান চাকচিক্যের আড়ালে তাদের শিশুস্বত্ত্বার গুমড়ে মরাটা আমাকে ভাবায়।
আমার কাছে মনে হয়, শিশুদের বাবা-মা হিসেবে তাদের বেশি ভাল করতে গিয়েই আমরা তাদের বেশি নষ্ট করছি। সন্তানদের কোনো এক অজানা ‘ভবিষ্যত’ এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা বাবা-মা ও সমাজই তাদের ভবিষ্যত সবচেয়ে বিপদসঙ্কূল ও কন্টকাকীর্ন করে দিচ্ছি। কথা না বাড়িয়ে শুধু বলব, সন্তানকে বুঝুন, তাকে জানুন, তাকে স্বাধীনতা দিন, তাকে নিজের পছন্দে ক্যারিয়ার গড়তে দিন, তার সৃষ্টিশীলতাকে উৎসাহিত করুন, তার কথা শুনুন, তাকে সময় দিন, তাকে শাসন করুন, তাকে ধমকও দিন, তাকে আদরও দিন। আর হ্যা, শিশুদের বন্ধু হোন, শুধু বাবা-মা নয়। তাদের জন্য কাড়ি কাড়ি টাকা রেখে যাবার চেষ্টায় সময় খোঁয়াতে গিয়ে তাদের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে শিশুগুলোর জীবনকে আরো ধ্বংস করার বদলে অল্প টাকায় তাদের জীবন গড়তে শিখান। তাতেই তাদের বেশি ভাল হবে।
#childhood #baby #grooming #education #ambition #generation #parenting #generationgap #nationaldeviation