রক্তদান হল কোন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের স্বেচ্ছায় রক্ত দেবার প্রক্রিয়া। রক্তদান-যেকোনো বিচারে মানব সভ্যতার একটি মহত্তম ও মানবিক সদগুন। মেডিক্যাল সাইন্স বিগত কয়েক শতাব্দীতে প্রভূত উন্নতি করলেও আজও যে কয়েকটি বিষয়ে প্রকৃতির দয়ার কাছে অসহায়, রক্ত তার মধ্যে একটি। রক্ত মানব স্বত্ত্বার বেঁচে থাকার মূল লাইফ লাইন। একটি মানব শরীরে রক্তই জীবন সঞ্চালনের প্রধান উপচার। কারন এই রক্তের মাধ্যমেই ফুসফুসের মাধ্যমে নেয়া অক্সিজেন শরীরে বাহিত হয়, যেই অক্সিজেন ব্যতিত মানুষ বাঁচতে পারে না। রক্তের মাধ্যমেই পরিবাহিত হয় মানব দেহের পুষ্টি। মানব দেহে রক্তের একটি নির্দিষ্ট পরিমান থাকে। তার নিচে নেমে গেলে মানুষের জীবন সংকট হয়। এ কারনেই যেকোনো দুর্ঘটনা বা ইনজুরিতে ডাক্তাররা সবার আগে চেষ্টা করেন আক্রান্তের রক্তপাত বন্ধ করতে এবং রক্তের ঘাটতি পূরনে রক্ত দিতে।
রক্ত এখনো কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা যায় না। কোনো মানুষের রক্তের প্রয়োজনে আরেকজন মানুষের রক্তদানের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের অনেকেরই রক্তদানের ব্যাপারে অনিহা আছে। কারো আছে ভীতি। কেউ বা আবার স্রেফ অজ্ঞতার কারনে রক্তদানে উৎসাহ দেখান না। আসুন দেখা যাক, রক্তদান নিয়ে আমাদের ভিতরে কী কী ভয় বা অনিহা কাজ করে আর তার সত্যিকারের সমাধানটি ঠিক কী:
১.কেউ কেউ মনে করেন, রক্ত দিলে ডোনারে শরীরে রক্তে ঘাটতি হয়। ফলে তার নিজের ক্ষতি হয়। এটা একদম অমূলক। কারন একবারে সর্বোচ্চ ৫০০ মিলি রক্ত নেয়া হয় যেটা মানব দেহের গড়পড়তা রক্তের পরিমান (প্রায় ৫-৬ লিটার) এর খুব সামান্য অংশ।
২.প্রতি চারমাস অন্তর অর্থাৎ ১২০ দিন পর পর মানবদেহে নতুন রক্ত তৈরি হয়। রক্তের লোহিত কণিকাগুলোর সর্বোচ্চ আয়ুষ্কাল ৪ মাস। তাই রক্ত না দিলেও প্রতি ৪ মাসে নতুন তৈরী হওয়া রক্তের কিছুটা অংশ এমনিতেই নষ্ট হয়।
৩.রক্ত দিলে শরীরের ক্ষতি হয়-এমন একটি অমূলক ধারনা প্রচলিত আছে আমাদের মধ্যে। ডাক্তারদের মত অনুযায়ী, রক্ত দিলে শরীরের কোনোরকম ক্ষতি তো হয়ই না, এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রক্ত দেবার পরে বিষয়টাকে আলাদাভাবে অনুভূতও হয় না।
৪.রক্ত দিলে বরং কিছু কিছু শারিরীক উপকার হয়, যেমন:-রক্তচাপ নিয়ন্ত্রন, ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে যাওয়া ইত্যাদি।
৫.রক্ত দেবার ব্যাপারে যাদের তীব্র ভীতি আছে তাদের বলব, রক্ত দিলে অন্তত প্রাণ চলে যাবার কোনো তথ্য কখনো পাওয়া যায়নি।
৬.যাদের অনিহা বা উন্নাসিকতা আছে, রক্ত দেবার ব্যপারে, তাদের বলব-হতে পারে আপনার কোনো আপনজনেরই কাল রক্ত লাগবে। আপনি যদি অন্যকে দিতে না চান, তবে অন্যরা কাল আপনাকে কেন দেবে?
৭.কারো কারো ভিতরে সুঁই ফোটাবার ব্যাপারে ফোবিয়া থাকে। ফোবিয়া ফোবিয়াই। আপনি একটু চেষ্টা করলেই ওই ফোবিয়া হতে মুক্ত হয়ে রক্ত দিতে পারেন। ৮.রক্তদান অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, তবে কিছু রক্তদাতার যে জায়গায় সূঁচ প্রবেশ করানো হয় সেখানে কালশিরে পড়ে, আবার কেউ কেউ রক্তদানের পর সামান্য দুর্বলতা অনুভব করেন বলে মনে করেন।
রক্তদানের উপকারিতা:
১.রক্তদানের প্রথম এবং প্রধান কারণ,একজনের দানকৃত রক্ত আরেকজন মানুষের জীবন বাঁচাবে। রক্তদান স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। রক্তদান করার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের মধ্যে অবস্থিত ‘বোন ম্যারো’ নতুন কণিকা তৈরির জন্য উদ্দীপ্ত হয় এবং রক্তদানের ২ সপ্তাহের মধ্যে নতুন রক্তকণিকার জন্ম হয়ে ঘাটতি পূরণ হয়ে যায়। বছরে ৩ বার রক্তদান আপনার শরীরে লোহিত কণিকাগুলোর প্রাণবন্ততা বাড়িয়ে তোলার সাথে সাথে নতুন কণিকা তৈরির হার বাড়িয়ে দেয়। উল্লেখ্য রক্তদান করার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দেহে রক্তের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে যায়।
২.নিয়মিত রক্তদান করলে হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
৩.গবেষণায় দেখা যায়, যারা বছরে দুই বার রক্ত দেয়, অন্যদের তুলনায় তাদের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।
৪.নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে নিজের শরীরে বড় কোনো রোগ আছে কিনা তা বিনা খরচে জানা যায়। যেমন : হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, সিফিলিস, এইচআইভি (এইডস) ইত্যাদি।
৫.প্রতি পাইন্ট রক্ত দিলে ৬৫০ ক্যালরি করে শক্তি খরচ হয়। অর্থাৎ ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৬.রক্তদান ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত পুণ্যের বা সওয়াবের কাজ। একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সমগ্র মানব জাতির জীবন বাঁচানোর মতো মহান কাজ।রক্তদানের
সতর্কতা:
১.১৮ হতে ৬০ বছর বয়সী যেকোনো সুস্থ্য পুরুষ বা নারী যাদের ওজন কমপক্ষে ৪৫ কেজি, তারা নির্দিধায় রক্ত দিতে পারেন। যদি না তার রক্তবাহিত কোনো রোগের মেডিক্যাল হিস্ট্রি না থাকে।
২.রক্তের গ্রূপ ৬টি-A+, A-, B+, B-, O+ & O-। গ্রহীতা যেই গ্রূপের রক্তধারী, দাতাকেও সেই গ্রূপের হতে হবে।
৩.রক্তদান করবেন নির্ধারিত বয়স ও ওজন মাত্রা ঠিক রেখে।
৪.একবার রক্তদান করার ৪ মাসের মধ্যে আর রক্ত দেয়া যাবে না।
৫.রক্ত দেবার বা নেবার আগে অবশ্যই রক্ত পরীক্ষা করে নেবেন।
৬.রক্তের গ্রূপ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নেবেন।
৭.ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতিত রক্ত শরীরে সঞ্চালন করবেন না। কমপক্ষে একজন অভিজ্ঞ প্যারামেডিক বা প্যাথলজিষ্ট ব্যতিত দাতার রক্ত সংগ্রহ করা যাবে না।
৮.রক্ত সংগ্রহ করার পর সেই রক্তের ব্যাগটি ৬ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায় দ্রুত সংরক্ষন করতে হবে। সংগৃহিত রক্ত সর্বোচ্চ ৪২ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়।
৯.রক্তদানের পরে পর্যাপ্ত পরিমানে পানি ও পুষ্টিকর খাবার খাবেন।
১০.রক্তদানের পরপরই হাঁটাচলা না করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবেন।
১১.ব্যবহৃত সুঁই, সিরিঞ্জ রক্তদানে বা গ্রহনে ব্যবহার করবেন না।মাঝে মধ্যেই আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে রক্ত চেয়ে আবেদন প্রকাশ হতে দেখি। বাংলাদেশে বছরে ৫ থেকে ৬ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়, যার মাত্র ৩০ ভাগ আসে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে।
দয়া করে আসুন আমরা প্রত্যেকে সোৎসাহে এগিয়ে আসি। এক ব্যাগ রক্ত মানে একটি জীবন। অন্যের প্রয়োজনে রক্ত দিলে আপনার প্রয়োজনেও অন্যরা এগিয়ে আসবে। যেকোনো সময় প্রয়োজন হয়ে পড়তে পারে জীবনদায়ী রক্তের। তাই রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।
#blooddonation #donorexperience