Skip to content

আমজনতার গণশত্রু HR কে নিয়ে দু’কলম

  • by

মাঠে, ময়দানে, আগানে-বাগানে যেই পেশার মানুষদের ‘মানুষ’ সবচেয়ে বেশি গালাগাল করে, ঘৃনা উগড়ে দেয় অকাতরে, যে পেশার মানুষদের প্রতি বিদ্বেষ নির্দিধায় ঢেলে দেয় সামাজিক মাধ্যমে, সম্ভবত সেই পেশাটির নাম…………………….না, যা ভাবছেন, তা না। ওই পেশাটির নাম এসকর্ট গার্ল বা মেথর না। (With all my personal respect to these two professions.)

ওই পেশার নাম “এইছাড়”। ’মানুষ’ আমাদের গালি দেয়, ‘হুদাই রাকচে ডিপারমেন’, মানে HRD .

এই সেদিনও একজন লিংকডেইনে রাগ ঝাড়লেন, “’এইছাড়’ একটা পয়সাও আর্ন করে না, খালি পটর পটর কথা।” তার রাগ অবশ্য পুরোপুরি অমূলক নয়। এইছাড় ষাড়েরাও এর জন্য দায়ী।

আমার পেশা যদি চুরি হত, তাহলেও হয়তো, জগতের কেউ কোথাও চোরদের বকা বা গালি দিলে আমার গায়ে লাগত। সে কারনেই জগতের কেউ কোথাও HR Profession কে গালি দিলে বা জেনারেলাইজ করে HR Professional কে গালি দিলে আমার খুব গায়ে লাগে। হয়তো লাগাটা ঠিক না, তবে কী করি বলুন, লাগে।

এখন, ডাক্তারদের বকা দিলে তারা চিকিৎসা আটকে আপনাকে সাইজ করতে পারবেন। আমরা তো সেটা পারব না। কারন, আমাদের আটকের কলিজা নেই। আবার, আমাদের আটকে কারো কিচ্ছু আটকাবে না। তাই আটকাই না। গায়ে মাখি না, মাখলেও মেনে নিই। তবে মাঝে মধ্যে একটু আধটু গর্জন করে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করি। যদিও, সেটা শ্রোতাদের কাছে বিড়ালের মিঁউ মিঁউয়ের মতোই শোনায়।

যাহোক। কিন্তু, ইদানিং, আমার মনোভাব পাল্টেছে। আমি আপনাদের মুক্ত মনে, উদারভাবে বলতে চাই, আপনারা আমাদের গাইলান। বকুন। সমালোচনা করুন। আমাদের প্যান্ট খুলে নিন। মাইন্ড করব না।

কারন, আমার কখনো কখনো মনে হয়, ওটা আমরা ডিজার্ভ করি। আমাদের খাসলত, আওকাত, কাবেলিয়াত ওটা ডিজার্ভ করায়।

তবে, তারপরও বলব, আমরা HR Professional তবুও একটা ওয়াকওভার পেতে পারি। এটা বিবেচনায় নিয়ে, যে, আমাদের যখন আপনারা হায়ার করেন, তখন কি বাজারের সবথেকে সেরা, যোগ্য, প্রতিভাবান ও সৎ HR Professional কে হায়ার করেন? নাকি চামবাজ, দামবাজ, আকামবাজ, চাপাবাজ, নোটঙ্কিকেই ঘরে তোলেন? যদি সুযোগ্য লোকটি আসেও, তাকে কি আপনার সেরা প্যাকেজ ও বেনেফিটটা দিয়ে ঘরে তুলবার মানসিকতা ধারন করেন? আর, দেশের সবথেকে মেধাবী ও প্রমিজিং শিক্ষার্থীরা কি HR Professional হবার স্বপ্ন নিয়ে হাজারে হাজারে এই ফ্র্যাটারনিটির জবের জন্য ভীড় করে থাকেন?

না তো।

তাহলে, যাকে আপন জন্ম হতেই ঘেঁটুপুত্র হিসেবে স্থান করে দিয়েছেন, তার কাছে শাহজাদার এক্সপোজার চাওয়া কেন?

পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মিথস্ক্রিয়া গড়ে ওঠার জন্য প্রতিষ্ঠানে প্রচুর এনগেজমেন্ট ও এক্সচেঞ্জিং এফোর্ট থাকতে হয়। সমস্যা হল, প্রতিষ্ঠান, HR ইটসেলফ এবং বাকি বিভাগগুলো-এরকম ইনিশিয়েটিভে খুব আগ্রহী না।

বাংলাদেশে আমরা আইকন বা পীর সংস্কৃতির খুব পাবন্দ।

আমরা আজীবন স্বপ্ন দেখি, একদিন আমি বা আমরা পাহাড় হব।

আমি কারও কাছে যাব না, কারও সাথে ওপেন হব না, পার্টিসিপেটরি হব না। আমি টেবিলে, আমার দরবারে জলদগম্ভীর পীর হয়ে বসে থাকব। আর মানুষ আমার দরবারে এসে এসে কদমবুচি করে হাত কচলে করুণা ভিক্ষার মতো করে সার্ভিস ভিক্ষা করবে-আমরা নিজেদের এমন সম্রাটের ভূমিকায় দেখার অবসেশনে ভূগি। সমস্যা সেখানে।

এই চরিত্র এইচ.আরের, এই চরিত্র অন্য অনেকেরই। একচেটিয়াভাবে কোনো বিভাগ বা ব্যক্তির না। 

ফলে, বিভাগে বিভাগে, অফিসে অফিসে, ডিভিশনে ডিভিশনে দ্বন্দ্ব তৈরী হয়, সমন্বয়হীনতা তৈরী হয়, অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরী হয়।

অথচ, সেই কবেই স্বামী শ্রী বিবেকানন্দ বলে গিয়েছিলেন,

”পাহাড় যদি মহম্মদের কাছে না যায়, তাহলে মহম্মদই পাহাড়ের নিকট আসবে।”

হাসবেন না, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাই বলে। আর, যে পেশার মানুষেরা ’এইছাড়’কে সবচেয়ে বেশি গালি দেয়, (আমার একটি বায়াজড ও দুর্বল জরিপ বলে) সেটা হল সেলস আর মার্চেন্ডাইজিং পেশার মানুষেরা।

এইছাড়দের প্রতি গালাগাল, হিংস্র বাক্যবাণ, বিদ্বেষ, শ্লেষ সত্যিই সবচেয়ে বেশি কিনা তা প্রমাণ করা যাবে না। তবে অনলাইনে আমি প্রচুর কনটেন্ট প্রায়শই দেখি। এর মধ্যে সবচেয়ে মজা লাগে সেই ছবিটা দেখে, যেখানে দেখানো হয়েছে, ইনক্রিমেন্ট হবার পরের দিন একদল কর্মী হাতে ইটের আধলা নিয়ে মোড়ের কাছে অপেক্ষা করছে, ওই পথ দিয়ে কখন এইছাড় আসবে, আর তখুনি…………..।

অনেক আগে একবার আমি HR Dept. কে নিয়ে মানুষের ভুল ধারনার ওপর একটি লেখা লিখেছিলাম। এইচ.আরকে নিয়ে মানুষের ঘৃনা বা বিদ্বেষের সূত্রপাতের সবচেয়ে বড় উৎসই যেহেতু এইচ.আর সম্পর্কে আমজনতার যথাযথ ধারনার অভাব, তাই সেই ভুল ধারনার আলোকপাত ছাড়া এই লেখা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

কী বলতে চেয়েছিলাম সেখানে?

এইচআর নিয়ে এক ডজন ভুল ধারনা আর তার উত্তর:

ভ্রান্তি ১: এইচআর হল খরচের খাত এবং ”না থাকলেও চলে” টাইপ ডিপার্টমেন্ট:- প্রথম ভুলটা এখানেই ঘটে।

ভ্রান্তি ২: প্রডাকশন বা মার্কেটিংকে সবথেকে জরুরী বা একমাত্র জরুরী বিভাগ। এইচআরকে মনে করেন গতানুগতিক একটি বিভাগ যেখানে তেমন মেধাবীর দরকার পড়বেনা:- ওয়েল, সেই সবথেকে “এসেনশিয়াল” বা “পশ” বিভাগগুলোর ভিআইপি কর্মী নিয়োগ করে কিন্তু এইচআর। তারা নিজেরা ট্যালেন্ট না হলে ওইসব পশ বিভাগে ট্যালেন্ট লোক নিয়োগ দিতে পারবেনা। ফলাফল অনুমেয়।

ভ্রান্তি ৩: এইচআর বিভাগে কাজ করবে শুধুমাত্র এইচআরে এমবিএ করেছেন এমন কর্মীরা:-ভুল। এইচআরে থাকতে হবে সব ধরনের শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ডের কর্মীরা।

ভ্রান্তি ৪: এইচআর মানে হল লেবার ল, ডিসিপ্লিন, পে রোল আর OHS ট্রেইনিং:- স্যরি, ওগুলো এইচআরের খুব প্রাইমারি পার্ট। এককথায় এইচআর মানে হল আপনার কোম্পানীর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এ্যাসেট “মানব” কে আপনার সম্পদে পরিণত করার ও ধরে রাখার যাবতীয় কর্মযজ্ঞ।

ভ্রান্তি ৫: সিইও নিজেই এইচআর। এইচআর বিভাগ শুধু তার ইন্সট্রাকশন বাস্তবায়ক:-ওয়েল, তাহলে বাকি সব ডিপার্টমেন্ট কেন অন্যের অধীনে দিয়েছেন? আপনি কেন প্রোডাকশন নন? কেন একাউন্টস নন, শুধু এইচআর কেন?

ভ্রান্তি ৬: ”এইচআরের কর্মী, ভাত ছড়ালে কাকের অভাব নেই”:-ওয়েল, ভাত ছড়ালে কাক পাবেন, কাকাতুয়াও পেতে পারেন (আপনার কথা স্টেরিও করবে)। তবে কোকিল পাবেন না।

ভ্রান্তি ৭: এইচআরকে যা বলব, তারা শুধু সেটা তামিল করবে। নিজেদের কিছু উদ্ভাবনের দরকার নেই:-ওয়েল, তাহলে একটা রোবট কিনলেই তো ভাল হত। নতুন আইডিয়া কী করে আসবে ওখানে?

ভ্রান্তি ৮: এইচআরের কথা অত মন দিয়ে শোনার কিছু নেই। ওরা শুধু ত্যানা প্যাচানো ঘ্যানর ঘ্যানর করে যা কাল শুনলেও চলবে:-ওয়েল, এইচআর কোনো অপারেশনাল উইং না যে, “ধর তক্তা মার পেরেক” প্যাটার্নে কাজ করবে। এইচআর হল, “মারব এখানে, লাশ পড়বে শ্বশানে” প্যাটার্নে কাজ করার উইং।

ভ্রান্তি ৯: HRD ও HRM এর তফাৎ আছে বলে মনে করেন না:-ওয়েল, HR মানেই হল HR-D। HR-M হল তার একটি পার্ট।

ভ্রান্তি ১০: এইচআরে একান্ত নিজস্ব লোক, পারলে আত্নীয়-স্বজন নিয়ে সাজানো উচিৎ যাতে নিয়ন্ত্রন ও বিশ্বস্ত থাকে:-স্যরি, শুধু একটি বিভাগকেও যদি রিয়েলি কোয়ালিফাইড লোক দিয়ে সবার আগে সাজাতে হয়, সেটা এইচআর। কোয়ালিফাইড লোক বাদ দিয়ে যদি ’নিজের লোক’ কনসেপ্টকে বেশি গুরুত্ব দেন, তবে সেই নিজের লোকেরা বিপদের সময় শুধু আপনার জন্য চোখের জল ফেলতে পারবে। বিপদ উদ্ধার করতে পারবে না। কোয়ালিফাইড লোক যদি নেন, তারা হয়তো বিপদে চোখের জল ফেলবে না কিন্তু তাদের প্রফেশনাল অবলিগেশন হতেই বিপদ উদ্ধার করতে যা যা করার সব করবে। নিজের লোক যদি কোয়ালিফাইড হয় তবেতো সোনায় সোহাগা।

ভ্রান্তি ১১: এইচআরকে বেশি বেতন দেবার দরকার হয়না:-ওয়েল, এইচআরের ইমপ্যাক্ট হল ঘরের বউয়ের মতো, ষোলো কলায় পূর্ণ। তাদের যদি ডিমটিভেটেড করে রাখেন, ইমপ্যাক্টটা দীর্ঘমেয়াদী।

ভ্রান্তি ১২: এইচআরের বস হবেন তার নিজের কেউ কিংবা আর্মি পার্সন:-ওয়েল, এই বিষয়টাতে নো কমেন্টস। মনে করুন, আমরা একটি অত্যন্ত রাইজিং, প্রমিজিং এবং এ্যাডভান্সড কালচারড প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলছি। আবার শুনুন, একটি রাইজিং, প্রমিজিং এবং এ্যাডভান্সড কালচারড প্রতিষ্ঠান।এমন একটি প্রতিষ্ঠানের HR বাদে বাদবাকি কর্মীরা তাদের HR নিয়ে খুব খুশি এবং তারা যদি বিশ্বাস করেন, যে, তাদের HR বিভাগ অসাধারন কাজ করছে, অসামান্য তাদের টীম ক্যালিবার-তাহলে, আপনি আন্দাজ করে নিতে পারেন, যে, ওনাদের HR নেহাতই অথর্ব এবং তারা বেশিরভাগই আকামা কাজে জড়িত।

আবার, এমন একটি প্রতিষ্ঠানেই, যদি বিপরীতক্রমে, HR বাদে বাদবাকি কর্মীরা তাদের HR নিয়ে অসন্তুষ্ট থাকে, এবং তারা যদি ইন জেনারেল বিশ্বাস করেন, যে, তাদের HR বিভাগ যতসব ফালতু কাজ করে বেড়াচ্ছে, এবং তাদের টীম ক্যালিবার একেবারেই যাচ্ছেতাই, মানে একটা হুদাই রাখছে ডিপারমেন-তাহলে আপনি ধরে নিতে পারেন, যে, ওই প্রতিষ্ঠানের HR একটি দারুন টীম এবং তারা দারুন কাজ করে যাচ্ছে।

[এইটা ট্রল করলাম, নাকি সারকাজম, নাকি প্রলাপ-সেই ভাবনা না ভেবে আরেকটু গভীরে ভাবুন। আর দ্বিমত থাকলে লিখুন।] দারুন একটি আধুনিক এইচআর প্রতিষ্ঠা করুন। তারপর নাকে তেল দিয়ে ঘুমান কিংবা দুবাই সিঙ্গাপুর ঘুরে বেড়ান। যা করার ওই এইচআরই করে দেবে, আপনার কোম্পানীর জন্য জুতো সেলাই হতে চন্ডিপাঠ-সবকিছুর জন্য উপযুক্ত কর্মীবাহিনী সাজিয়ে দিয়ে।

এবার তবে মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি।

অ্যাবসলুটলি HR Dept. কে নিয়ে মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা, বিদ্বেষ, ও কার্যত ঘৃনার সলুক সন্ধান নিয়ে এখন বলব। এই নাতিদীর্ঘ লেখার জন্ম মি. কাইয়ুম সোহেলের অনুরোধের প্রেক্ষিতে। যদিও, এমনিতে পাবলিক সেন্টিমেন্ট, মব ডিমান্ড বা জনতার অতি আদর বা ঘৃনা-আমাকে খুব একটা ভাবায় না। আমি আমার কাজ করি। পাবলিকের রিএ্যাকশন দেখতে গেলে কাজ বন্ধ করে দিতে হবে।

You simply can’t pay attention to all the barking on your way.

কথা না বাড়িয়ে আসুন, একটু গোড়া হতে দেখি, কেন এই ঘৃনা ও বিদ্বেষ।

এক;

একদম প্রথমে এই ঘৃনা ও বিদ্বেষের যৌক্তিক একটি কারণ বলি। মানুষ, বিশেষত বাঙালরা ক্ষমতাপ্রিয়। এরা সুযোগ পেলেই প্রতিপত্তি, দাপট, হ্যাডোম দেখাতে এবং নিজের স্বার্থে তার সর্বোচ্চ ব্যবহারে অভ্যস্ত। এটা সত্য, যে, HR Dept. বাই ডিফল্ট, কর্মীদের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের কিছু অথরিটি Inherit করে। বাঙালির চিরাচরিত চরিত্র হল, ক্ষমতা পেলেই তার অপব্যবহার করা। সুযোগ পেলে তার সদ্ব্যবহার (আসলে অপব্যবহার) করা। বিধায়, বাঙালিরা যখন HR Dept. এ কাজ পায়, মানে তারা HR হয়, তখন সেই ক্ষমতার দাপটে ওপরের বা নিচের মানুষদের মূষিক বিবেচনা করে দাপটের স্টিমরোলার চালাতে তারা সিদ্ধহস্ত হবে-সেটাই স্বাভাবিক। ধরাকে সরা জ্ঞান বোধহয় একেই বলে। আমি নিজ চোখে দেখেছি, HR Dept. এর একজন সামান্য জুনিয়র ম্যানেজার কোম্পানীর ডিরেক্টরকেও ঘোল খাওয়াতো। তার ডরে বাঘে মহিষে একঘাটে ঘোল ও ঘোলা জল খেত। তার আবার সার্বক্ষণিক ৪টা বউ। বিকৃত মস্তিষ্কের একটা লোক। তার কোম্পানী কিন্তু বিশাল আর ব্র্যান্ডেড কোম্পানী। খামাখা, স্রেফ নিজের হীন মানসিকতা ও মনঃস্তাত্বিক সীমাবদ্ধতার (আসলে বিকৃতির) জন্য কাস্টমার, তথা সাধারন কর্মীদের ওপর ছড়ি ঘোরানো, ব্যুরোক্রেসি চাপানো, হয়রানি করা, ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করাসহ, হাস্যকর সব অপকর্ম করবার হাজারো অভিজ্ঞতা সত্যিই রয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহারকারীকে ও নির্যাতককে যে মানুষ ঘৃনা করবে, এক স্থানের ঘৃনা অন্যস্থানে প্রকাশিত হবে-সেটা খুব অস্বাভাবিক নয়। (হ্যা, সেটা যে সবাই না, এবং, বাঙালি মাত্রই ক্ষমতা পেলে সেটা করবে-তা মনে রাখতে হবে। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব পেলে বাদবাকি বিভাগের বা প্রফেশনের মানুষেরাও যে একই কাজ করেন-তারও ভুড়ি ভুড়ি উদাহরন দেয়া যাবে। ক্ষমতা ও সুযোগ পেলে সব বাঙালই একবার হলেও হোটেলে গিয়ে ‘মুরগী’ খেতো। সব মাছই গু খায়, পাঙাসের দোষ হয়।)

দুই;

বাংলাদেশে HR এর কনসেপ্ট খুব দীর্ঘ ইতিহাসের নয়। HR এর আনুষ্ঠানিক জন্ম ও তার (মোটামুটি) প্রতিষ্ঠার আগে সবরকম সেক্টরে ও প্রতিষ্ঠানে HR এর কাজটি করতেন সবাই। একটা পর্যায়ে সেটা কিছুটা ডাইভার্ট হয় এ্যাডমিনিসট্রেশনে। এখনো বাংলাদেশের আপামর প্রফেশনাল গোষ্ঠী, কোম্পানী ও এমনকি খোদ HR প্রফেশনালবৃন্দই এ্যাডমিনিসট্রেশন ও HR এর তফাত বোঝেন না। এখনো অবশ্য HR বাদে বাকি সবাই ঘোরতরভাবে বিশ্বাস করে, যে, তিনি বা তারাই HR। তিনি বা তারা HR সম্পর্কে সবই জানেন আর সেটার জন্য তারাই যথেষ্ট। এইছাড় একটা হুদাই রাকচে ডিপারমেন। এখন এই যে এত এত HR এক্সপার্ট কোণাকানচিতে ছড়িয়ে আছে, তাদের কনসেপ্টের HR এর সাথে তো সত্যি HR মেলে না। ফলে HR যদি ভালও করে, তাও তাকে গালি শুনতে হবে-এই ভূঁইফোড় HR বা সাবেক ভাবনায় HR দের নিকট হতে। একই সাথে, সাবেক ওসব HR দের হাত হতে যে ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছে, তার একটি প্রতিহিংসাত্মক বহিঃপ্রকাশ তো আকাশে বাতাসে থাকবেই।

তিন;

HR নিয়ে যারা এখন কাজ করছেন, তারা যে সবাই সমান ও প্রত্যাশিত গুনগত মানের ও যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পেরেছেন-তা অবশ্যই নয়। অবনমনের পাল্লাটাই বরং ভারী। মামাতো ভাইয়ের বেকার শালা, কিংবা, বড় বউয়ের আগের ঘরের বখে যাওয়া পোলা-এমন বান্দাদের ’হেডফ এইছাড়’ বনে যাওয়া খুব বিরল না বাংলাদেশে। অবশ্য অমন আরো লাখো লাখো ‘Headoff’ বা ‘Headless’ সব বিভাগেরই চুড়ায় বসে থাকেন এদেশে। এহেন গুনগতমান ও ব্যক্তিগত যোগ্যতার কম্বিনেশন যখন হয়, তখন সেই পেশার মানুষদের ইন-জেনারেল সেবার মান ও ভেতরের গুনের প্রকাশ বিকটই হবার কথা। এরকম যেসব এইছাড়েরর গুনের বহর, তাদের (সিংহভাগ, নাকি মূষিকভাগ বলতে পারব না) কারণে বাকিদের গালাগাল খেতে হয়। আর জানেনই তো, বাঙালরা জেনারেলাইজেশনে অভ্যস্ত। চুন খেয়ে গাল পোড়ে, দই দেখে ভয় করে।

চার;

একসময়ে HR বলতে ছিল টিম লিডাররাই। HR বানাতেন ও চালাতেন বিভাগীয় প্রধানরাই। অনেকটা যিনি রাজা, তিনিই ঋষির মতো। ওই যে, বলেছিলাম, যে, ক্ষমতার একটা ম্যাজিক আছে। HR এসে পড়ায় তাদের সেই ক্ষমতা সিজড হয়ে গেছে আর তাদের চোখের সামনে HR এর চ্যাংড়া চ্যাংড়া বাচ্চারা ফটর ফটর করে HR কেলাচ্ছে। ক্ষমতা হারানোর এই জ্বালা আর অন্যের কাছে নিয়ন্ত্রিত হবার ক্রোধও HR এর প্রতি নির্বিচার গালাগালের অন্যতম কারণ। অক্ষমের বা সব হারানোর বিষম জ্বালায় তারা অহর্নিশি HR কে নিয়ে যৌক্তিক, অযৌক্তিক-সবরকম প্রতিহিংসা জাহির করবেন-এটাই তো স্বাভাবিক।

পাঁচ;

মানুষের স্বাভাবিক চরিত্র হল, যেটা তার মতের সাথে মিলবে, যেটা তার পক্ষে যাবে, সেটিকে সে সাধুবাদ দেবে; আর যেটা তার মতের বিরুদ্ধে, যেটা তার ফেভারে হবে না-সেটাই খারাপ। বাঙালদের ক্ষেত্রে এটি ১০০% প্রযোজ্য। HR Dept. এর কোর ফাংকশনগুলো সবসময় যে সবার ফেভারে যাবে-তা অবশ্যই সম্ভব নয়। বিশেষত চাকরি দেয়া, প্রমোশন হওয়া, ইনক্রিমেন্ট, ফায়ারিং, ডিসিপ্লিন-এসব কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই অনেকের স্বার্থহানি হয়। আমার চেনা এক লোক আমাকে প্রায়ই পোক করত, “ভাই, কুমপানিতে ফালতু লোকে সয়লাব, কিছু একটা হরেন।” তো সত্যিই একদিন ’কুমপানি’ এ্যাকটিভ হয়ে কাতারে কাতারে অযোগ্য লোক ছাটাই করে দেয়। ওই লোকও তার মধ্যে ছিল। সে বাইরে গিয়ে ব্যপক বদনাম করে বেরিয়েছে HR এর। একবার একজন আমাকে টয়লেটের দরোজায় আটকে বলল, “ভাই, আমাদের লোক লাগবে, দেন না কেন?” আমি বললাম, ”অফিশিয়ালি রিকুইজিট করুন, দিয়ে দেব।” তিনি বললেন, “কেন ভাই, চাইতে হবে কেন, আপনারা এনালিসিস করে দেখবেন, কার কী দরকার, সেই মতো অটো লোক দিয়ে দেবেন।” আমি বললাম, “ভাই, যা যেভাবে চলছে, সেভাবে চলতে দিন আর শুকরিয়া করুন। আমরা, মানে HR যদি সত্যি সত্যিই আমাদের এনালিসিস শুরু করি, তাহলে প্রথমেই এখানকার ২৫% লোকের চাকরি ছাটাই হবে। তাই সাঁকোটা নাড়িয়েন না। লোকজন বেশ করে খাচ্ছে, তাদের খেতে দিন। যমকে বাড়ি ডেকে আর কাজ নেই।” অনেকের মনমতো প্রার্থীকে জব দেয়া যায় না। অনেকে নিজেকে মেসি ভাবে অথচ নিয়মতান্ত্রীকভাবেই তাদের প্রমোশন হয় না। তাদের ব্যক্তিগত বা দলগত হতাশা HR ওপর গালাগালে রূপ নেয়। (অবশ্য ভিনডিকটিভ HR এর ষড়যন্ত্রও যে অনেক সময় থাকে না-তাও না)। HR Dept. এরও যথেষ্ট দায় অনেক সময় থাকে। তারাও সবসময় ধোয়া তুলশি পাতা নন।

ছয়;

’মালিক’ নামে একটি অদ্ভুৎ বস্তু বাংলাদেশে রয়েছে। তাছাড়া এদেশে এখনো রয়েছে ‘পারসোনাল লিমিটেড কোম্পানী’র অস্তিত্ব। এখানে এখনো (সিংহভাগ) প্রতিষ্ঠান ‘মালিক’ বা ‘ম্যানেজমেন্ট’ এর অ্যাবসলুট নিয়ন্ত্রণে। আমার চেনা একজন বিলিয়নেয়ার অহরহ বলতেন, “আমিই HR”। এহেন ধরনের প্রতিষ্ঠানে HR যেমনই হোক, তারা যেমনটাই চাক বা না চাক, ‘মালিক’ বা ‘ম্যানেজমেন্টর’ ফিলোসফিই কিন্তু আসলে HR। স্বাভাবিকভাবেই HR এর সকল কাজ ও কালচারে তার প্রভাব থাকবে। মালিক ভদ্রলোকেরা যেহেতু HR এর সত্যিকার প্রফেশনাল নন, ওই বিষয়ে পড়াশোনা বা অভিজ্ঞও নন, তারা যখন HR বনে যাবেন, তার ফলাফল ভয়াবহ হতে বাধ্য। কিন্তু, বাঙালরা মালিককে গালাগাল করতে, তার প্রতি গ্রিভ্যান্স প্রকাশ করতে অভ্যস্ত নয়। সাহসী তো নয়ই। তারা এক্ষেত্রে মক্কার শয়তানের মতো HR কে শয়তানের খাম্বা হিসেবে মনঃস্তাত্বিকভাবে দাড়া করে তাকেই ঢিল ছুড়ে মনের ক্ষেদ প্রশমন করে। আমরা সেটার বহিঃপ্রকাশই সামাজিক মাধ্যমে দেখতে পাই।

হ্যা, অযোগ্য HR কর্মী, বিশেষত ওই Headoff HR’রা চাইলে ‘মালিক’দের অনেক রকম অসঙ্গতিই মিনিমাইজ করতে পারে। কিন্তু, তারা তাদের চেয়ার, খেতাব, চারচাক্কার গাড়ি, সুপুষ্ট মানিব্যাগ-এসব নিয়ে এত ব্যস্ত, যে, ওইসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তারা মাথা ঘামাতে চান না। আবার, অনেকে ঘামাতে অক্ষমও। ফলে, ”দুইয়ে মিলে অপরুপ।” প্রাইভেট লিমিটেড বা পারসোনাল লিমিটেড জবে ইস্যু, প্রবলেম, এনগেজমেন্ট আর কাজের লোড হল যেন পুকুরের পানির মতো, বা পানির ওপরের টোপাপানার মতো। যতই সরান, সাথে সাথে চারদিক হতে হাজারটা, লক্ষটা ঝামেলা এসে ঠিকই মেক আপ হয়ে যাবে। অথবা, ফার্মেসীতে একটু পেছনের দিকে রাখা ‘রাবারের টুকরো’র প্যাকেট্রে মতো, নিচের দিক হতে একটা ছোট প্যাকেট বের করার সাথে সাথে ওপর হতে বাকি ১১ টা প্যাকেট নেমে এসে সেই জায়গা নিয়ে নেয়।এখানে আপনাকে হতে হয় মা দূর্গার মতো দশ হাতওয়ালা, আবার গ্রেইট রাবণের মতো দশ মাথাওয়ালাও। একসাথে দশটা হাতে দশদিক সামাল দিতে হবে। আবার, রাবণের মতো দশটা চিন্তা একই সময়ে চালিয়ে যেতে হবে, সমান কোয়ালিটিতে। সাই অব রিলিফ বলে কিছু প্রাইভেট জবের ডিকশনারিতে নেই। ধুয়ে-মুছে উঠলাম-এই জিনিস কখনো চোখেও দেখবেন না। ”ইটস আ হানড্রেড পারসেন্ট………..ফ্রি” বলে কিছু চাইলে পাবলিক লিমিটেড জবে যান। যা নেই, তা বৃথাই না খুঁজে, ঝামেলা মুক্ত হবার ধান্দা বাদ দিয়ে, বরং গায়ে একটা ঝাড়া দিন, তিনবার ইয়া মুকাদ্দেমু পড়ে বুকে ফূঁ দিন, আর বলুন ”ওকে, হু ইজ নেক্সট”?

সাত;

HR বিভাগের সাথে বাদবাকি কাস্টমারদের কমিউনিকেশনের ঘাটতি, কমিউনিকেশন চ্যানেলের ব্লকেজ, নন-পার্টিসিপেটরি HR এবং কোম্পানীতে ট্রান্সপারেন্সীর অভাবও HR এর দিকে আক্রমণের তীর আসার অন্যতম কারণ। সহজ কথায় যাকে বলে, খায় দায় কালু মিয়া, মোটা হয় আলু মিয়া। মূল দোষটা হয়তো অন্য কারো, দোষটা পড়ে HR এর ওপর। আবার, HR ভাল কিছু করলেও ক্রেডিটের ক্রিমটা যায় অন্যের পাতে। HR নিজেও প্রায়শই তার কাস্টমারদের গোণায় ধরে না। যা করে, একা একাই। আবার, তাদের কী কাজ, তারা কী করে, কোনটা তারা করে না-সেসব তাদের কাস্টমাররা খুব একটা ওয়াকিবহাল না। ফলে, পাবলিক খেতে চায় ফজলি আম, HR তাকে পাঠায় আইক্কা গাম। এর ফলাফলে গালি তো জুটবেই। অনেক সময় অনেক অজনপ্রিয় কাজও HRকে বাধ্য হয়ে করতে হয়। কিন্তু সেই অজনপ্রিয় উদ্যোগের ইমপ্যাক্টও চাইলে আলোচনা, পরামর্শ, ডায়ালগ করে কমিয়ে আনা যায়। কিন্তু, সেটি অনেক সময়ই হয় না। ফলে, কাস্টমার বেজ তথা এমপ্লয়ীদের ভিতরে ভুল ধারনা বা ভুল ক্ষোভ দানা বাঁধে। তারই আউটবার্স্ট আমরা উন্মুক্ত মাধ্যমে দেখতে পাই। অবশ্য বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে উগড়ে দেয়া বিপ্লব, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, সংগ্রাম ও বিদ্বেষের সিংহভাগই উন্মুক্ত মাধ্যমের Freedom of speech নামের স্বেচ্ছাচার সুবিধা নিয়ে কৃত। কারণ, সেখানে যা মনে চায়, তা বলা যায়-এমন একটা কালচার এখানে প্রতিষ্ঠিত। সেখানে কোনো জবাবদিহিতা নেই। একই ধারায়, বাংলাদেশের নেটিজেনদের বদৌলতে সব ডাক্তার কসাই, সব উকিল শকুন, সব শিক্ষক পরিমল, সব একাউনট্যান্ট কঞ্জুস। এবার আপনিই বলুন, আসলে ব্যাপারটা তেমন কিনা।

আট;

Overall, বাংলাদেশে (বিশ্বেও) পারসোনাল লিমিটেড টাইপের প্রতিষ্ঠানই বেশি। সেখানে কাজ করে ক্লান্ত, বিদ্ধস্ত, ক্ষুদ্ধ, হতাশ, ত্যক্ত কর্মীরা দিন শেষে কোথাও একটা তাদের রাগ ও গোস্বা উগড়ে দিতে চায়। সেটা উদোর পিন্ডি বুঁদোর ঘাড়ে দিয়ে হলেও। কোম্পানীর প্রতি হতাশা ও ক্ষোভ তারা উগড়ে দেয় অধিকাংশ সময়ে HR এর ওপর। কারণ, তারা মনে করে, HR চাইলেই তাদেরকে MNC ফ্লেভারের সেবা দিতে পারত। কিন্ত, তারা নিজেরাও জানে না, যে, পারসোনাল লিমিটেড কোম্পানীগুলোতে HR নামে কিছু থাকলেও সেটা শোকেসে সাজানো পাপেটই। বড়জোর সেটা Administrative HR হতে পারে। তার আসলে চাইলেও কিছু করবার ক্ষমতা সত্যিই থাকে না।

নয়;

ফেসবুক বা লিংকডইনে HR কে নিয়ে ঘৃনা ছড়ানো মানুষদের একটি অংশ আবার নিজেরাই যোগ্যতায় লবডঙ্কা। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের চমৎকার HR এর পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক উন্নয়ন ও পরিবর্তনের নেগেটিভ শিকার হয়ে হয় কোণঠাসা, না হয় বঞ্চিত অথবা চাকরিচ্যুত। এঁরা এই সত্যটা গোপন রেখেই সামাজিক মাধ্যমে HRকে নিয়ে চান্স পেলেই গালাগাল করবে। আর, ওভারঅল সমাজের বঞ্চিত বা ফ্রাস্ট্রেটেড জনগোষ্ঠী সেটাকে লুফে নিয়ে ভাইরাল করে। ফলে, ঘৃনা পৌনঃপুনিকভাবে বাড়তে থাকে। আমি নিজে দেখেছি, যোগ্যতায় ক্যাতর আলী। HR তাকে সরিয়ে যোগ্য লোক নিয়োগ দিয়েছে। সেই লোক ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে-HR kala parena । অবশ্য এমন মানুষও এই ফেকবুক জগতে বিরাজমান, যিনি তার একাধিক কর্মস্থল হতে চারিত্রিক অবনমন কিংবা অসততার জন্য বহিষ্কৃত হয়েছেন, সে-ই আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, তাদের HR অথবা বিভিন্ন HR প্রফেশনালদের অযোগ্যতা নিয়ে কটাক্ষ করে পোস্ট দেন।

দশ;

কিছু মানুষ অবশ্য ফেসবুক বা লিংকডইনে HR কে নিয়ে গাল পাড়ে স্রেফ ‘এমনি এমনি’। কাজ নেই তো খই ভাজ। এরা আসলে বরের পিসি, কণের মাসি। আপনি HR কে নিয়ে আজকে গাল দিন, তিনিও তাতে গলা মেলাবেন। কাল সেলসকে নিয়ে সত্যি কথা বলুন, তিনিও আপনাকে সমর্থন দেবেন। আর কিছু আছেন বেকার জনগোষ্ঠী। এঁরা স্রেফ সময় কাটাতে যাকে মন চায়, তাকে নিয়েই রগঢ় করেন। এঁরা আসলে সরকারী দল করেন। বাতাস যখন যেদিকে, এঁরা সেদিকে বাদাম তোলেন।

এগারো;

এই পয়েন্টটি কিছুটা পাঁচমিশালী। বাঙালদের স্বভাব হল, শক্তের ভক্ত, নরমের যম। প্রাইভেট সেক্টর এমপ্লয়ী হিসেবে তাদের ভেতর জমা ক্ষেদ, ক্ষোভ, বঞ্চনাবোধ বা ক্রোধ প্রশমিত করবার জন্য তাদের প্রিয় প্রতিপক্ষ হল HR। কারণ, শিকার হিসেবে সবথেকে দুর্বল হল এঁরা। হ্যা, আপনি স্বীকার করুন, বা, না করুন, HR বিভাগ ও HR কর্মীরা বাংলাদেশে সবথেকে দুর্বল শত্রু। নানা কারণেই। (তার একটা হল, HR এখনো প্রফেশন বাই চয়েজ না, প্রফেশন বাই চান্স। বাপে ক্ষেদানো, মায়ে তাড়ানো পোলাপান আর কিছু না পেয়ে কোনো জবে এলে সেটাকে বাই চান্স বলে।) ঠেকায় পড়ে যে চাকরি করতে আসা, সে তো দুর্বল হবেই। এদের মার্চেন্ডাইজিং বা সেলসের মতো হ্যাডোম নেই। বিধায়, যত কলঙ্ক, সব উগড়ে দাও HR এর ওপর। সেলসের কথা বলেছিলাম, এঁরাই HR সবথেকে বড় সমালোচক। এঁনাদের রাগের সবথেকে বড় কারণ হল, এঁরা মনে করেন, কোম্পানীতে তারাই একমাত্র টাকা আয় করেন আর HR ঘরে ঠান্ডায় বসে বসে সেটার শ্রাদ্ধ করে। আর তাদের কষ্টার্জিত সেই রেভিনিউয়ের প্রতিদান তারা যে পান না, তার একমাত্র কারণ HR এর ষড়যন্ত্র। এ্যাডমীনের কিছু প্রাপ্য গালাগাল মিস ফায়ার হয়েও এইচআরে চলে আসে। সেটাও গালাগালের কারন এই বঙ্গদেশে।

আপনার কোম্পানীতে একজন ডেজিগনেটেড ‘হেড অব এইচ.আর’ নিশ্চয়ই আছে?

মজার একটা কথা বলি। তিনি কিন্তু আসল হেড অব এইচ.আর নন।

আপনার প্রকৃত হেড অব এইচ.আর হলেন আপনার মার্কেটিং হেড, আপনার হেড অব একাউন্টস, আপনার প্রকিওরমেন্ট ম্যানেজার, আপনার সেলস টিম লিড, আপনার স্টোরের ডেপুটি ম্যানেজার, আপনার কমার্শিয়াল টিম লিডার, প্রোডাকশন ম্যানেজার, লাইন লিডার-এনারা।

আপনার সব ক’জন জোনাল ম্যানেজার, ডিভিশনাল হেড, সব ক’জন টেরিটরি ম্যানেজার হলেন আপনার একেক জন হেড অব এইচ.আর।

এককভাবে যে হেড অব এইচ.আরকে আপনি শয়তানের খাম্বার মতো ঘেন্না করেন, ওই বেটা আসলে দেবতাদের দেবতা মাত্র। আসল দেবাদিদেব ওই মানুষেরা।

তারাই মূল এইচ.আর। তাদের কাজ, চিন্তা, ডিরেকশন, কালচারই প্রকৃত এইচ.আর। পিপল সিলেকশন, কমপিটেন্সি জাজমেন্ট, সাকসেশন প্ল্যান, পারফরম্যান্স মেজারমেন্ট, লিভ ম্যানেজমেন্ট, ওয়ার্ক প্ল্যান, ক্যারিয়ারিজম প্ল্যান, অরগানোগ্রাম, রিওয়ার্ড, পানিশমেন্ট-সবকিছুই আসলে কে ভাবেন ও করেন? কে মূল বিচার ও জাস্টিফিকেশন করেন? কে মনিটর করেন? ভেবে দেখুন তো।

এইচ.আর একটা জটিল ও মজার কনসেপ্ট। এটা সেলস বা ব্র্যান্ডিং কিংবা প্রোডাকশনের মতো জব না।

প্রকৃত অর্থে সবগুলো টিমের হেড বা ম্যানেজার ও লাইন লিডাররাই এইচ.আর।

আর যাকে হেড অব এইচ.আর হিসেবে ডেজিগনেটেড দেখেন, যে টিমকে এইচ.আর নিয়ে কাজ করতে দেখেন, তারা হলেন এইচ.আরের সমন্বয়ক ও মডারেটর।

যাহোক, একপাক্ষিক, একপেশে, বায়াজড ও ইনটেনশনাল এই লেখাটি মি. কাইয়ুম সোহেলের অনুরোধে লিখলেও মুদ্রার দুই পিঠই দেখানোর হালকা চেষ্টা অবশ্য ছিল। ছিল আপেক্ষিকতা ও বাস্তবতারও ছায়া। এর বাইরে একটি কথাই বলব, ঘটনা তলিয়ে দেখুন-সেটা প্রশংসা বা সমালোচনা-যেটাই হোক। আর সবসময় দুই পাশ দেখবেন। এইচ.আর প্রফেশনালরা কোনো দেবতা বা অতিমানব নন। তারাও আপনার, আমার মতো প্রফেশনাল। আর আপনি জানেন, বাংলাদেশের কোনো পেশার মানুষেরাই ধোয়া তুলশি পাতা নন। সব পেশাতেই আলুর দোষ থাকে। (সব মানুষের নয় অবশ্যই।) জেনারেলাইজ করবেন না। এবং, ব্যক্তির দোষকে কখনোই দলের দোষ বা একটি পুরো পেশার কালিমা হিসেবে দেখবেন না, দেখাবেন না। মনে রাখবেন, এমনকি, একটি পেশার ৯৯ জনও যদি বদ হয়, ১ জন যদি সৎ হয়, তার পরেও আপনাকে বলতে হবে, এই পেশার অধিকাংশ মানুষ বদ (এই পেশার সবাই বদ বলতে পারছেন না।)। সব পেশাকে সম্মান করুন, সব পেশাজীবিকে তার প্রাপ্য সম্মান দিন। HR কে আপনার সহকর্মী ভাবুন,। What is game to you, is DEATH GAME to me.

ছোট বেলায় গল্পের বইয়ে পড়া সেই ব্যঙ ভরা এঁদো ডোবায় খেলাচ্ছলে শিশুদের ঢিল ছোঁড়া আর তারপর ব্যঙেদের ভিতর হতে একজনের বলা ওপরের বিখ্যাত আর্ত উক্তিটি মনে পড়ে?

জ্বি, আপনার কাছে যেটি মজা, ফূর্তি, জাস্ট চিল, সেটিই হতে পারে অন্যের জন্য অপমান, অবমাননা, অসম্মান, চরমাঘাত; কিংবা, জীবন-মরণের প্রশ্ন।

মজা করে, হালকা মেজাজে, হঠাৎ মনে আসা কোনো ঝোঁকে, কথাচ্ছলে, হাসতে হাসতে, ইঙ্গিত করে কাউকে, কোনো গোষ্ঠীকে, কোনো বিশ্বাসকে, কোনো পেশাকে নিয়ে আপনার করা একটি সামান্য উক্তি আপনার কাছে “আরেহ, কিছু না।” কিন্তু, সেটিই হতে পারে (সূক্ষ্ণ বিচারে) অন্যের কাছে একটি দগদগে সূক্ষ্ণ অপমান।

ভেবে দেখবেন। আপনি কারনে, অকারনে একটি পেশাকে, একটি পেশার মানুষকে, একটি ক্লাসকে তাচ্ছিল্য ও গণ-অবমাননা করে ফেলেন কিনা।

পেশা হিসেবে এই দেশে ডাক্তাররই বোধহয় সবচেয়ে বেশি গণ-অপমানের শিকার হন। অথচ, জীবন বাঁচানোর জন্য এই ডাক্তারই আমাদের শেষ ভরসা। করোনার বছরগুলোতে তাদের অবদান ১০০ বছর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেও শেষ হবে না। অথচ, অকৃতজ্ঞ আমরা অহরহ ‘কসাই’ উপাধিটা তাদেরই দিয়ে বসি। অকৃতজ্ঞ আমাদের জন্য নিজেই লজ্জিত হই আমার খুব সীমিত নেটওয়ার্কের অতি মানবিক ডাক্তার সুহৃদদের (ডাক্তার শরিফ কলিনস, ডা. ফরহাদ, ডা. শাওলি, ডা. পারভেজ, ডা. সাঈদ ও অন্যান্য) বিপরীতে ওই ট্রলকে তুলনা করে।

 এরপর কে আছে? পরিসংখ্যান ও গবেষণা নেই বিধায়, আমি মনে করি, এই দেশের পেশাজীবিদের নিকট সবচেয়ে বেশি ঘৃনা ও অসম্মানের শিকার হন HR প্রফেশনে থাকা মানুষেরা।

আমি অন্য যেকোনো পেশার মানুষকে নিয়ে অন্য পেশার মানুষদের (পেশা হিসেবে) অপমানকর, ইঙ্গিতময়, তুচ্ছতাচ্ছিল্যকর কথা বলতে, পোস্ট করতে প্রায় দেখিনা। (হয়তো করেন, আমার চোখে পড়েনি।) কিন্তু, কী এক অদ্ভুত ঘটনা, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, সবাই HR প্রফেশন ও পেশাজীবিদের নিয়ে হাস্য পরিহাস, ট্রল, অভব্য তুলনা, ইঙ্গিত করতে বেশ সিদ্ধহস্ত। (না, সবাই সেটা করেন না, আর বিষয়টা ডাক্তারদের কৃত অপমানের তুলনায় খুবই কম।) মজার বিষয় হল, আমি একজন এইচ.আর প্রফেশনালকে প্রায় কখনো দেখিনি, অন্য একটি প্রফেশন ও তার প্রফেশনালকে নিয়ে জেনারেল নেগেটিভ পোস্ট করতে। (আই মীন, প্রফেশনটাকে ইঙ্গিত করে।)

অন্য প্রফেশনের (কিছু কিছু) মানুষের বক্তব্য দেখে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, (বাকি সব পেশার মানুষ, যারা কাজটা করেন, তাদের তুলনায়) এইচ.আরে কাজ করা ১০০% পেশাজীবিরাই খুবই কম শিক্ষিত, লেস ট্যালেন্টেড, নিচু মানসিকতার, কুচুটে, চক্রান্তকারী, গরীবের হক বিনষ্টকারী, মালিকের চামচা, কর্মীদের শত্রু, ফোঁপর দালাল, মালে বেহুদা।

না, আমি আবারও বলছি, সবাই করেন না। আর, এইচ.আর প্রফেশনালবৃন্দ সবাই ও ১০০% বিশুদ্ধ তুলসীপত্র নন। ঠিক যেমনটা অন্য যে কোনো পেশার ১০০% মানুষও নন। কিন্তু, ট্রলটি শুধু এইচ.আরকে নিয়ে।

না, আমি আবারও বলছি, আমি পুরো এইচ.আর কমিউনিটিকে রিপ্রেজেন্ট করি না। সবার মান রক্ষার দায় আমার নয়। কিন্তু, হ্যা, আপনার, আপনাদের সাথে (আপনাদেরই সম্মতিতে) সোশ্যাল মিডিয়াতে (তথাকথিত বন্ধু হিসেবে) কানেকটেড থাকবার সুবাদে এইচ.আর নিয়ে করা আপনার ফান, ট্রল একজন এইচ.আর প্রফেশনাল হিসেবে আমাকে বিদ্ধ করে। সেটি হোক সামান্যতমও।

কেন? সামান্য ফানও আমাকে কেন অফেনডেড করে?

কারন, আমি আমার পেশা নিয়ে প্যশনেট। স্রেফ ভাত-পানি যোগাড়ের জন্য চাকরি করি, কিন্তু, সেটি এইচ.আরে চাকরি করে করি প্যাশন হতে। অন্যথায় দরকারে রাস্তা ঝাড়ুর কাজ করতেও আমার আপত্তি নেই। প্রিজুডিস নেই।

কারন, আমি জ্ঞানত কখনো আমার পেশার এথিকস ভঙ্গ করিনি।

কারন, আমি জ্ঞানত কখনো অন্য কোনো প্রফেশনকে (প্রফেশন হিসেবে) খাটো করে কথা বলিনি।

কারন, আমি জ্ঞানত কখনো অযোগ্যতা নিয়ে কোনো পজিশন বাগাইনি।

কারন, আমি জ্ঞানত আমার পেশাটিকে ও সবার যেকোনো পেশা বেঁছে নেবার স্বাধীন অধিকারকে সম্মান দেখিয়েছি। এমনকি সেটি ‘যৌনকর্মীর’ পেশা হলেও।

আপনি (এবং হয়তো আপনার কানেকশনের অনেকেই) যেকোনো প্রতিষ্ঠানের এইচ.আর বিভাগ হতে ও এইচ.আরের কর্মীদের হতে প্রত্যাশিত সেবা ও ব্যবহার পাননি। হতে পারে, তিনি ও তারা রীতিমতো দৈত্য। কিন্তু, তার জন্য তার গোটা প্রফেশনকে তো অপমান করা অনুচিত।

আপনি বলতে পারেন, আপনি সিরিয়াস নয়, মাঝে সাঝে ফান করে পোস্ট করেন। এই কিছুদিন আগেই একটি রাইড শেয়ারিং সেবার একজন কর্মী তার পণ্যের প্রমোশনাল ভিডিওর জন্য থীম হিসেবে বেঁছে নিয়েছিলেন এইচ.আর প্রফেশনকে বেহুদা ও খামোখা প্রতীয়মান করাকে। কেন ভাই? আপনার বাদে অন্য প্রফেশনকে শ্রদ্ধা করতে অসুবিধাটা কোথায়? সমাজে একজন সুইপারের আপেক্ষিক গুরুত্ব কতটা, আপনার জানা আছে? কেন আপনার ফানের মধ্যে দিয়ে গ্রেটার প্রফেশনাল কমিউনিটি ও উঠতি প্রফেশনালরা একটি ভুল বার্তা পাবেন, যে, এইচ.আর মানেই বেহুদা, খামোখা, উটকো ও বদ লোকে ভরপুর? কেন?

প্লিজ, জেনারেলাইজ করবেন না। অ্যামবিগুয়াস হবেন না। রং এনালজি টানবেন না।

মনে রাখবেন, যেটা আপনার কাছে নেহাতই মজা, সেটাই হতে পারে অন্য কারো জন্য অপমানের বোঝা। [এবং, এই লেখাকে কোনো কিছু বা কারো কিছুর রিঅ্যাকশন হিসেবে দেখবেন না। আমি শপথ করে বলছি, আমি ঝিকে মেরে বউকে শেখানোর নীতি ফলো করি না।] HR প্রফেশনালরা আপনাদের সহকর্মীদের প্রজা নয়, সহযাত্রী হিসেবে ট্রিট করুন। আর মনে রাখবেন, “মেহেম্মেদ যদি পাহাড়ের কাছে না যায়, তাহলে পাহাড়কে মেহেম্মেদের কাছে আসতে হবে।”

#grievancewithHR #misconceptionwithHR #criticisingHR #blamingHR #wrongparception #hatredwithHR #icon #mentorship #fanbase #fanatic #stardom #celebrity #apetheosis #misconceptionwithHR #misunderstandingwithHR

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *