আর ক’দিন পরেই কোরবানি। অনেকেই গরু, ছাগল কিনবেন। কেউ কেউ কিনবেন না। মানে কিনতে পারবেন না। কিন্তু সেটা কাউকে প্রকাশ করতে পারবেন না। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াবেন, কোরবানির কয়েকদিন। মধ্যবিত্তের চির অভ্যাস-পলায়নপরতা।
যাহোক, সেটা বড় বিষয় না। আমি আমার জীবনে মাত্র একবারই কোরবানির পশু নিজে কেনার সুযোগ পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাড়িতে গেলাম। টাকা নিয়ে বাজারে গিয়েছি। বাজারের এক কোণায় ছাগলের হাট। একটা বড়সড় ছাগল ধরে বিক্রেতাকে দাম জিজ্ঞেস করলাম। তিনি দাম চাইলেন, আমি একটু কম বললাম। তিনি রাজি হলেন। ৫ হাজার টাকায় সেই ২০০২/০৩ সালের দিকে মাত্র ১৫ মিনিটে ছাগল কিনে বাড়িতে রওনা হলাম।
আমি দেখতে পাই, আমাদের উৎসবের মুডে থাকা তপুরুষ ভাইজানেরা ট্যাকভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে যান। কোন বাজারে কম দামে বড় গরু (মানে বেশি মাংসওলা গরু আরকি) পাওয়া যায় তার খোঁজ আগেই নিয়ে নেন। তারপর বাজারের এমাথা হতে ওমাথা তোলপাড় করেন। কখনো কখনো একাধিক বাজারে গমন করেন। গরু দেখেন, তাদের দাঁত, পা, চূড়, শিং বেছে তারপর তীব্র দামাদামী করে গরু কেনেন। সারা রাস্তায় অসংখ্য লোক দাম জানতে চান, আমরাও সহাস্যে সোৎসাহে দাম বলি। এটাকেই আমরা রেওয়াজ বলে জানি।
সবাই এই কাজটিকেই রীতি বলে করে থাকি। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন, কোরবানি স্রেফ খোদার খুশি ও তার আদেশ পালনের জন্য একটি কঠোর ধর্মীয় রীতি। যার উৎপত্তির ইতিহাসে জড়িয়ে আছে, একজন নবী (ইব্রাহিম আঃ) কর্তৃক তার পুত্র (হযরত ইসমাইল আঃ) কে জবেহ করতে উদ্যত হবার বেদনাতুর কিন্তু ইমানী ঘটনা। আজকের দিনে আমাদের জন্য বিধান হয়েছে পুত্র নয়, প্রিয় অর্থ/টাকা দিয়ে পশু কিনে তাকে জবেহ করে গরীবকে বিলিয়ে দেবার ত্যাগ স্বীকারের সিম্বলিক প্রথা। তার সাথে সাথে নিয়ত করা, আমার ভিতরে থাকা যাবতীয় কূ-রিপু কোরবানি করে দেবার। কিন্তু যখন সেই টাকায় কষ্ট ইফেকটিভ, অর্থাৎ কম দামে বড়, তাগড়া, তরুন, পুরুষালি গরু কেনার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা বাজারে খরচ করেন, তখন কি কখনো এটা মনে হয়, এই কোরবানি, কোরবানির পেছনে খরচ হওয়া টাকা, গরুর গোস্ত-সবই আল্লাহর জন্য। তো আমার গরুর মাংস যাই হোক, তাতে তো খোদার কিছু যায় আসে না।
আমি যেই পরিমান টাকা খোদার খুশির জন্য খরচ করব বলে মনে করেছি, সেটা দিয়ে ২ মণী, ৫ মণী, ১০ মণী-যেই গরুই কিনি-সেটাতো খোদার কাছে একই। আমার টাকা খরচ কবুল হবার জন্য তো গরুর সাইজ ম্যাটার করে না। তাহলে কম দামে বেশি গোস্ত (স্যরি, বড় গরু) কেনার পেছনে কেন সময় ব্যায়? সেটা নিয়ে কেন প্রতিযোগীতা? যদি কেউ বলেন, ভাই, গরীব দুঃখিকে গোস্ত দেব, কম টাকায় বেশি মাংসওলা গরু কিনলে আরো দু’জনকে বেশি দিতে পারব। ভা
ই, আপনার সারাবছরের সার্বিক ভ্রাতৃত্ববোধের যা ইতিহাস, তার সাথে এই সাময়িক ভ্রাতৃত্ববোধের মিল থাকে কি? যেহেতু আল্লাহ পাকের জন্য গরু কোরবানি দেয়া, তাই কোরবানি দেবার সাথে সাথে সবার হিংসা, ইর্ষা, লোভ, কামনা, বদবুদ্ধি, পশু প্রবৃত্তি, রিপু, কুমতলব, নারিপ্রীতি-এসব পাশবিক বজ্জাতি কোরবান বা ত্যাগ হয়ে যাবার কথা। আশা করা যায়, কোরবানির মধ্য দিয়ে দেশের কয়েক লাখ মানুষ চরম ভাল মানুষ হয়ে সাদা মনের মানুষ হয়ে যাবেন।
যেহেতু মনের পশু কোরবানি করে খোদাতালাকে খুশি করতেই সবাই নিয়মমাফিক কোরবানি করলাম। আর সেটা যদি না করে থাকি, তবে সারাদিন এত সেলফি, কাউফি, শুভ কামনা, চোস্ত মেসেজ, ছুরি কাঁচির ঝনঝনানি বৃথা। মাঝখান হতে বেচারা গরুরা আমাদের পিউরিফাই করতে জীবন দেবে। আল্লাহ শুধু গরু জবাই করতে বলেননি। সেইসাথে আরও অনেক কিছু করতে বলেছেন। আল্লাহপাক তো ছোট গরু বড় গরুর কোনো ভেদ করেননি। তাহলে বিশাল বিশাল গরুর ছবি ফেসবুকে দেবার হিড়িক কেন পড়ে আমাদের এখানে? ছোট গরুর ছওয়াব কম নাকি?
নাকি ছোট গরু আর ছাগলের সামাজিক স্টাটাস কম বলে? সেই সাথে কোরবানি সংলগ্ন অন্তত ১৫ দিন টিভিতে মাংসের নানা রেসিপি, কী রাঁধবেন, কোনটা কেমন মজা, ফ্রিজ কেনার ও কেনানোর ধুম-পশুর মাংস কেন্দ্রীক এই উৎসব কোরবানির মাহত্ম ও ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতি অবজ্ঞা বলে আমার মনে হয়। মনে রাখবেন, কোরবানি মাংস খাবার উৎসব নয়, আত্মত্যাগের শিক্ষা নেবার উৎসব।আরেকটা অনুরোধ। পশু জবাই কোনো আনন্দের বিষয় নয়। বরং যেকোনো আত্মদান, বলিদান, প্রানহানি একটি গুরুগম্ভীর, মর্যাদাপূর্ন সমীহপূর্ন, বিষয়। ছুরি হাতে, জবাইয়ের, গরু/ছাগলকে বাঁধা অবস্থায়, মাংস প্রসেসিং, কাটাকুটি, জবাইকৃত পশুর সাথে সেলফী-এই ছবিগুলো সোস্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করা অত্যন্ত দুঃখজনক, হাস্যকর, বিব্রতকর, ভয়ানক, সহিংস ও অবিবেচকের কাজ। কোরবানির ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যকে খেলো করে দেয় এরকম কাজ। বহু আগে আমি নিজে একটা গরুর সাথে ছবি তুলে একটা শিক্ষামূলক লেখা লিখেছিলাম। ওই ছবির জন্য আজও শরম পাই।
আরেকটা কথা। প্রায়ই দেখি শিশুদের ছুরি হাতে, রক্তাক্ত পশুর সাথে শিশু, পশুর কাটা অঙ্গসহ শিশুর ছবি, কোরবানিস্থলে রক্ত মাংসের ভিতর শিশুর উপস্থিতি, জবাইয়ের সময় হাত পা বাঁধা পশুর সাথে শিশুকে নেয়া, এমনকি শিশুদের দিয়ে পশু জবাই করাতে।
এই কাজগুলো শিশুদের মনোঃজাগতিক ক্ষতি করে। একাজগুলো হতে বিরত থাকি। পশুর এমন ছবির, এমনকি আপনি যে গরুটি কিনেছেন, তার ছবি প্রদর্শনী নিজের একধরনের অহমিকা, প্রদর্শনেচ্ছার প্রতিফলন। তাছাড়া, যাকে জবেহ করে ফেলবেন-তার আগে তার ছবি প্রচার করবেন, তার দাম, আকার, উৎস, জাতপাত, রং, ম্যানলি চেহারা-এসব নিয়ে আলাপ হবে, কমেন্ট হবে-এই পুরো বিষয়টা কি পশুগুলোর প্রতি একধরনের তাচ্ছিল্য আর ধর্মীয় মাহত্মের প্রতি একধরনের অবজ্ঞা মনে হয় না?
একটি প্রাণীকে জবাই করবেন, তাকে নিয়ে প্রচার, তার চেহারা প্রদর্শনকে মানুষ হিসেবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ও উদ্ধত বলে মনে হয় না? আপনি মানুষ, আর ওরা পশু, ওদের ওপরে কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা বিধাতা আমাদের দিয়েছেন। তাই বলে, ওদের জবাই করব, আবার সেটার আগে প্রদর্শন করে মজা/ভাব নেব-খোদা তা পছন্দ করবেন তো? প্রচার ও প্রদর্শন-ধর্মের মূল থীমের পরিপন্থী বলেই আমি জানি। বুজুর্গরা ভাল বলতে পারবেন। আমার পোস্টের লক্ষ্য কোরবানিকে নিরুৎসাহিত করা নয়। আমাকে নব্য পশুপ্রেমী ভাববেন না। কোরবানি করুন। সাদকাহ দিন। গোস্ত বিতরন করে দিন। পাশাপাশি ধর্মাচরন পালনকে বিনীত, মহিমাময় ও খোদার সন্তুষ্টিতে নিবেদন করার পথ দেখানোই আমার উদ্দেশ্য। নিরবে, সম্মানের সাথে, রিয়া বর্জিত সহিহ সংকল্পে কোরবানি করাই নিয়ম। সেটাই আল্লাহ আমাদের কাছে চান, যা চেয়েছিলেন তার পয়গম্বরের কাছে।
একটুকরো প্রাণীজ আমিষ-গরুর গোসতের স্বাদ পেতে মানবতার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা-বাবুদের সিংহদ্বারে করাঘাত। ধনী গৃহকর্তাদের দয়া বিলি করার আয়েশি আস্বাদন আর আভিজাত্যপূর্ণ বন্টন। হে সর্বশক্তিমান! তুমি নিশ্চই তোমার প্রিয় মানবসন্তানকে কল্যাণ দেবার জন্যই দু’টি শ্রেণীকেই যার যার কাজ করে যেতে দিয়েছ। তোমার ইচ্ছাতেই আর শেষ দিবসে তোমার করুণা পাবার আশাতে তবু তারা বুক বাঁধে। তা না হলে মানবসভ্যতা লজ্জায় বহু আগেই ধরনী দ্বিধা করে নিজেকে লুকাতো।
কোরবাণী একটি ত্যাগের ভাবাদর্শিক (থীমেটিক) ধর্মীয় ও সামাজিক দায়ীত্ব। এমন কোনো কাজ, কথা বা আচরণ করা উচিৎ নয়, যা থেকে প্রতীয়মান হয়, যে, আপনি বিষয়টিকে স্রেফ একটি খুনের, বলির কিংবা মাংস খাবার হোলি উৎসব হিসেবে দেখছেন। এখন আপনি গরুর ছবি দিয়ে ফেসবুক ভরবেন কিনা, ছুড়ি কাঁচি নিয়ে কসাইয়ের পোজ দেবেন কিনা, রক্ত মাংসের স্তুপের মধ্যে বসে হিংস্র পোজ দিয়ে তা ফেসবুকে ছড়িয়ে দেবেন কিনা-নিজেই ঠিক করুন। আপনার শিশুটিকে মর্দে মুমীনের মতো কোরবাণীস্থলে দাড় করিয়ে তাকে বাপকা বেটায় পরিণত করবেন কিনা, দুপুরের মধ্যে রান্নাকৃত লোভনীয় গোসের ড্যাগের ছবি দিয়ে বাহবা নেবেন কিনা-সেটাও ভেবে রাখবেন।
[বহু আগে একবার এই কাজ আমি নিজে করেছিলাম। আজও সেই জন্য অনুতাপ করি।]
কোরবাণীর টাকার উৎস কী ও কতটা হালাল-সময় পেলে একবার ভেবে নিন। কোরবাণীর চেয়ে নামাজ বহু বহু উঁচু ও গুরুত্ববহ ফরজ। কোরনাণীর দিন সকালে বা সারাদিনেও কোনো ফরজ নামাজ না পড়ে কোরবাণী দিয়ে আল্লহকে কতটা খুশি করতে পারবেন-সেটা ঠিক করে নিন।
আর যার সাথেই মস্করা করুন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ফলান, আল্লহ এইসব মশকারী সহ্য করবেন কিনা-দুইবার ভেবে নিন।
[উপদেশ দেয়া বা নেয়া-দুটোই আমি অপছন্দ করি। এই কথাগুলোকে উপদেশ ভাববার দরকার নেই। বাতুলতা ভাবলেই চলবে।
সুহৃদ জিতুর দেয়াল হতে একজন বিজ্ঞ মানুষের একটি চমৎকার লেখা দিলাম। আরো বিস্তারিত পাবেন: https://www.facebook.com/shamimahmedjituq
#celebrationofEid #korbani #showoffatitsbest #exhibitionism #exposure #hypocrisy #hypocritenation #sacrifice