Skip to content

আলো আঁধারে

  • by

রাজধানী নগরে থাকি দুই যুগ হল। জন্ম ও দাদা পরদাদার বাড়ি ছিল বৃহত্তর বরিশাল। সেখানে বসত বছর খানিক।

এরপর ১৫-১৬ বছর কাটল বাঘের দেশ বাগেরহাটে। এই দেশে সেটলার ৪০ বছরের বেশি। বাপের বাড়ি আছে বাগেরহাটে। এক অর্থে বাপের বাড়ি তাই বাগেরহাট। তার ভেতরে আবার গত দুই যুগ ঢাকায়। বাকি সময়টা বাগেরহাট কেবলই স্মৃতির শহর, এবং, উৎসবে, পার্বণে হঠাৎ কিছু মুহূর্তের অতিথী হয়ে যাবার শহর।

দুই যুগের প্রবাসে চেনা মানুষ বলতে গেলে নেই হয়ে গেছে। নিজ বাপের শহরে নিজেই অতিথী। বহিরাগতের মতো শহরে ঢুকি। লোকজন ঢাকার দুর্গন্ধ পেয়ে ইতিউতি তাকায়।

কেউ কেউ শুধিয়ে বসে,

”কোন বাড়ির পোঁয়া বাহে তুমি? কোনে যাবা?”

বরিশাল ১ বছর। দাদার বাড়ি।

বাগেরহাট একটানা ১৫-১৬ বছর। বাপের বাড়ি।

ঢাকা ২৪ বছর। (নিজের বাড়ি নেই যদিও।)

নারীর নাকি নিজের ঘর বলে কিছু হয় না জীবনে। পুরুষ হয়েও কি হল আমার?

মানুষ শুধায়, “বাড়ি কই আপনের?”

আমি বলি-দাদার বাড়ি বরিশাল, বাপের বাড়ি বাগেরহাট, নিজের (ভাড়া) বাড়ি ঢাকা। বুঝলেন দাদা, আমার ঠিকুজি, কুষ্ঠি সবই ফাঁকা।

ভাসমান কচুরীপানার মতো জলে ভাসা জীবন আমার। কোথায় নোঙর করা হল না। কোথাও শেকড় গজালো না। কোনো “দেশের বাড়ি” ঠিক হল না। ঢাবিয়ান, কুবিয়ান, বুয়েটিয়ান, বরিশাইল্লা, বাগেরহাইট্টা, ঢাকাইয়া, গারমেন্টস, আম্লীগ, বিম্পি, ৯৬/৯৮ইয়ান-কোনো লেবেলই গায়ে এঁটে বসানো গেল না।

পেটের টানে রাজধানীতে এসে দুই যুগ ধরে কামলার প্রস্তুতি আর কামলা দানেই কাটল।

সকাল হতে সন্ধ্যা-কামলা দিই। সূর্যের মুখ দেখি না। কাক ভোরে শ্রমদানের যাতাকলে গিয়ে যোগ দিই। রাত নামলে ধুঁকতে ধুঁকতে ডেরায় ফিরি। নষ্টালজিয়া আমাদের জন্য পাপ। শুধু আরও দুটো টাকার বাড়তি সংস্থান কোথায় কীভাবে হবে-তার তত্ত্ব-তালাশই দিবানিশী।

জলে ভাসা পদ্ম নিয়ে কাব্য হয়, গীত হয়।

এই রাজধানীর বুকে রাস্তায়, জনস্রোতে, কর্মব্যস্ততায়, জীবন বাঁচাবার উর্দ্ধশ্বাস কোলাহলে ভাসমান একদার এক ‘মিস্ত্রী’ পূত্রের, বা পূত্রদের জীবন ও জগত নিয়ে কাব্য নয়, কেবলই দীর্ঘশ্বাস লেপ্টে থাকে শহরের দেয়ালে দেয়ালে। এই মন খারাপ করা নিশুতি রাতে বাঁধের নিরিবিলি রাস্তাটা দিয়ে শহরতলীর বাসায় ফিরছি। মাঝে কিছুটা বাঁক নেয়া পথের পাশে নদী, ধানক্ষেত, জলাভূমি। তার ওপাড়ে দূরে টিমটিম করে দূর শহরের আলো জ্বলে।

ক্ষনিকের তরে মনে হয়, ওই তো যেন আমার প্রিয় বাগেরহাট শহর। যেই শহরে আজও আছে আমার মা। জীবিকার জ্বালায় বহু বছর ধরে জন্মদাত্রীকে বছরের বড় কমসময় দেখি। তিনি থাকেন ওই ওপাড়ের আঁধো আলোর মফস্বলে। রাত বিহনে হঠাৎ মন হু হু করে উঠল। গাড়ির জানালার কাঁচে দুচোখ পেতে আমি আঁধারে মায়ের মুখটা দেখার চেষ্টা করছি। ভিজে ওঠা ঝাপসা চোখে। গাড়ি দ্রুত ছোটে।। দূর শহরটাও পেছনে পড়ে। শুধু মা’র মুখ ঝাপসা চোখে ভাসে। শিগগীরই আসব মা। খুব শিগগীর।

ঈদযাত্রা: আচ্ছা, পথেরও কি মন আছে? সেও কি মন পড়তে পারে? তা না হলে বাঁধের ওপর দিয়ে রাতের বেলায় ঢিমে গতিতে বাড়ি ফেরার সময়ই কেন এতসব চিন্তা মাথায় ভীড় করে? চোখের সামনে একটু একটু করে খালি হচ্ছে প্রিয় কিংবা অপ্রিয় শহর। অপ্রিয় কারন, সে নিয়েছে অনেক কিছু। অনেককে। আবার প্রিয় শহর দিয়েছে বাঁচার মতো সহায়। কখনো সঙ্গ পেতে হ্যাংলার মতো হেঁদিয় মরা সামাজিক প্রাণী নই। তবু কেন শহর খালি হতে দেখে, স্টেশন পানে ছুটে চলা জনস্রোত দেখে, মন আলুথালু কাঁদে? কারন? কারন আমার একটি বাড়ি নেই। আমার কোনো ফিরবার মতো শহর নেই। কেউ কোথাও আমার অপেক্ষায় নেই। আমার কোথাও আজ যাবার নেই।

#hometown #nativeland #mother #affection #return #eidcelebration #loneliness #life #city

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *